Home "ধারাবাহিক গল্প তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে পর্ব-০৬

তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে পর্ব-০৬

0
786

#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ৬
#লেখনীতে_তানিয়া

“স্যার আমার মাইয়াডারে বাঁচান। ওয় বাচঁবোতো? চোখ খুইলা আমারে আবার আব্বা ডাকবোতো”?

নিয়াজের ডাক্তার হওয়ার জীবনে এরকম একটা কেইস প্রথম পেলো সে। এতোদিন সে টিভি, খবর, ইন্টারনেটে দেখেছিলো। আজকে সে এমন কিছুর মুখোমুখি হবে কল্পনাতেও আসেনি তার। বাচ্চা মেয়েটার অবস্থা ভালো না। ক্রমশ শরীর খারাপ হচ্ছে। অর্গান কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। ইন্টারনাল ব্লি///ডিং হচ্ছে অনেক। কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবুও সামনে থাকা রোগীর অসহায় পিতামাতা কে কিছুতো বলতে হবে। সে যথেষ্ট শান্ত হয়ে আর ঠাণ্ডা মাথায় বললো,

” সৃষ্টিকর্তাকে ডাকুন। ডাক্তারতো ওছিলা মাত্র। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি”।

রোগীর বাবা মা কি বুঝলো কে জানে। ডুকরে কেঁদে উঠলো। গগণবিদারী আহাজারিতে হাসপাতালের পরিবেশ গুমোট হচ্ছে যেনো। নিয়াজ ভাবলো দুনিয়াতে সব মানুষ ভালো হলে কি খুব বেশি কিছু অস্বাভাবিক হয়ে যেতো? সদর হাসপাতালে যা যা চিকিৎসা দেওয়া যেতো সবই যথাসাধ্য করা হয়েছে। মেয়েটা পুরোপুরি অচেতন এখন। শরীরের যে অবস্থা জ্ঞান কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। আদতে ফিরবে কিনা সেটাও বলা যাচ্ছে না। মেয়েটার সাথে লম্বা সময় ধরেই ওসব হয়েছে। মেয়েটা নিতে পারেনি। অচেতন হওয়ার পরেও হয়তো তারা থামেনি। যার জন্য পেশেন্ট শ/কে চলে গেছে। মেয়েটার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা করলো নিয়াজ। প্রতিটা সেকেন্ড এখন অনেক দামি। হায়াত বিষয়টা মানুষের হাতে নেই। সেইটা সৃষ্টিকর্তার হাতে। দুনিয়াতে ডাক্তার কেবল ওছিলা মাত্র। কাগজপত্র যা ছিলো সব ঠিক ঠাক করে ফাইল রেডি করে ময়নাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পাঠানো হলো। এরই মধ্য খবরটি ছড়িয়ে গেছে। নিউজ মিডিয়া গুলোতে এখন এইটা পিক টপিক।

____________________________

কয়েক ঘন্টা আগে,

“ও আল্লাহ আমার মাইয়াডার কি হইলো গো? কারা আমার মাইয়ার এতো বড় ক্ষ”তি করলো? এখন কি হইবো? ও মা কথা ক। কথা কস না ক্যান। মা মাগো!!!আমার ক্যাডায় এতো বড় ক্ষ”তি করলো গো? আমার ময়নারে শেষ কইরা দিছে রে। ময়না মা ও মা!! কথা ক মা। আমি আব্বা। চোখ খুইলা চাইয়া দেখ। কে কোথায় আছো রে!! আমার ময়নারে ওরা কি কইরা দিছে রে!!

কালাম ব্যাপারির বুকফাটা আহাজারিতে তোলপাড় হয়ে গেলো পুরো রাজাপুর গ্রাম। মেয়ের বি’বস্ত্র, ক্ষ” ত, বি”ক্ষ’ত আর নিথর দেহ সামনে নিয়ে আকাশ পাতাল কাঁপিয়ে বিলাপ করে চলেছেন তেরো বছর বয়সী ময়নার বাবা। কে বা কারা স্কুল থেকে ফেরার পথে ময়নাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। ময়নার বাবা মা সারা গ্রাম খুঁজেছেন মেয়েকে। ময়না এবার ক্লাস এইটে পড়ে। মেয়ের স্কুল ছুটি হয় সাড়ে চারটায়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে বড়োজোর পাঁচটা বেজে যায়। মেয়ে যখন সাড়ে পাচঁটা বাজার পরেও ঘরে ফিরলো না তখন তারা মেয়েকে খুঁজতে যান। ময়নার বান্ধবী যার সাথে ময়না আসে তাকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে অসুস্থ থাকায় সে আজকে স্কুলে যায়নি। ময়নার বাবা-মার চিন্তা বাড়ে। দিন কাল ভালো না। গাঁয়ে কত ধরনের পোলাপান ঘোরাফেরা করে। ওলিতে গলিতে আড্ডা দেয়। তন্ন তন্ন করে সারা এলাকা খোঁজার পরেও মেয়েকে যখন তারা পেলো না তখন চিন্তায় তারা চেয়্যারম্যানকে জানায়। চেয়্যারম্যান তখনই আরও লোকবল নিয়ে ময়নাকে খোঁজার জন্য লোক পাঠায়। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে আসে কিন্তু ময়নার খোঁজ মেলে না। এদিকে এক কান দুই কান হতে হতে পুরো গ্রাম কথা ছড়িয়ে যায়। কথায় আছে না কথা বাতাসের চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়ায়। নানা মানুষের নানা কথা। পাশের বাড়ির রহিমা ময়নার মাকে বলছে,

” মেয়েরতো চেহারা সুরাত ভালাই আছিলো। দেখো গিয়ে কোনো পোলা টোলার লগে ভাইগ্যা গেছে। আজকাল পোলা মাইয়্যাগো কথা কওন যায় না। তলে তলে কে যে কি কইরা বেড়ায় কে টের পায় “।

ময়নার মায়ের এমনিতেই চিন্তায় মাথা দপ দপ করছে। উঠতি বয়সের মেয়ে। গায়ের গড়ন ভালো। যদি কিছু হয়ে যায় কি হবে তাদের। কোন বি”পদে পড়লো তারা কে জানে। আবার আশেপাশের বাড়ি ঘরের পুরুষ মানুষ বলে উঠলো,

” মাইয়া কাউরে পছন্দ করে তোমরা টের পাও নাই? আমাগোতো মনে হয় পালায় টালায় বিয়্যা বইছে। তোমরা খামোখাই চিন্তা করতাছো। সকালটা হউক দেখবা জামাই সহ বাড়িতে আইবো”।

ময়নার বাবা সবার মুখের দিকে চেয়ে দেখে। সবাই মেয়েটার চরি”ত্র নিয়ে কথা তুলতেছে। মেয়ে মানুষ এমনিতেই অ বললে চন্দ্রবিন্দু হয়ে যায়। সেখানে মেয়েই নিখোঁজ। মেয়ে তার পড়ালেখাতে ভালো। চালচলনে মেয়ের মধ্য কখনো তিনি উলটা পালটা কিছু দেখে নাই। মেয়েতো রাস্তা ঘাটে কারো সাথে কথাই বলতো না। ঘর থেকে বেরইতো হইতো কম। সেই মেয়ে কাউকে কিছু না বলে কোথায় গেলো। চারদিকে যখন মেয়েরে নিয়ে এতো কথা তখন কেউ কেউ মালেক ব্যাপারিকে থানায় যেয়ে রিপোর্ট করতে বললো। তারা বললো,

” দিন দুনিয়া এখন ভালো না। টিভিতে খবররে দেখোনা কত ঘটনা ঘটতেছে। মেয়েটা সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে ফিরে আসলেই ভালো। অনেক কিছুইতো হতে পারে। থানায় যেয়ে পুলিশকে জানানো দরকার। তারাতো আমাদের সাহায্য করতেই পারে।

সবার কথা শুনে মালেক ব্যাপারি তার স্ত্রীর দিকে চায়। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় বউ এর চোখ মুখ শুকিয়ে গেছে। মেয়ের নিখোঁজ হবার দুশ্চিন্তাতো কম কিছু না। স্ত্রী ঘরের বারান্দায় এক পাশে অসাড় হয়ে বসে মুখে আচঁল গুজে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সৃষ্টিকর্তাকে ডেকে ডেকে বলছে,

” আমার মেয়েকে তুমি রক্ষা করো মাবুদ। বুকের মানিকরে ফিরায়া দাও। ওর কোনো ক্ষ”তি যাতে না হয় “।

ময়নার ছোট ভাইটা ওর থেকে পাচঁ বছরের ছোট। প্রচন্ড বোন ন্যাওটা। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া বোনের সাথেই থাকে সবসময়। খায়ও বোনের হাতেই। আজকে বোন হারিয়ে গেছে শুনে সেও যেনো পাথরে পরিণত হয়েছে। মায়ের পাশে চুপ করে বসে আছে আর প্রার্থনা করছে বোনের ফিরে আসার জন্য। গ্রামের লোকজনের কথা শুনে মালেক ব্যাপারী আর দেরি করলো না। কয়েকজনকে নিয়ে থানায় গেলো। থানায় গিয়ে সব জানাতেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি রহমত আলী এস আইকে বললেন রিপোর্ট নিতে। ময়নার বাবা থানায় ডায়েরি করলো। তারপর কয়েকজন পুলিশ সদস্য ময়নাকে খুঁজতে বের হয়ে গেলো। কোনো খবর পেলে তারা জানাবে। এদিকে রাত বাড়তে থাকে। দুশ্চিন্তায় ময়নার বাবা-মা ভাইয়ের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কারো খাওয়া নেই। চোখের মুখ ঘুম উধাও। মেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না এটা যেমন দুশ্চিন্তার তেমনি তার সাথে যদি কিছু হয়ে যায় বা মেয়েই যদি খারাপ কিছু করে বসে তাহলে লোকসমাজের ভ” য়ও তারা পাচ্ছে। কি করবে, কোথায় যাবে, কাকে বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না তারা। দিশেহারা অবস্থা তাদের। রাতভর দাপাদাপির পর ঘরের বারান্দাতেই তারা বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। ঘুমানো আর কি চোখ লেগে এসেছিলো। ভোর তখনো হয়নি অন্ধকার আছেই এমন সময়ে ঠিক তখনই একটা কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ হলো বাড়ির সামনে বড়ো রাস্তায়। ভারি কিছু গড়গড়িয়ে পড়লো এমন শব্দ। সবাই হুড়মুড়িয়ে উঠলো। ময়নার বাবা-মা ভাই সহ রাতের বেলা আরও কিছু আত্নীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী তাদের সাথে ছিলো। সবাই একসাথে ছুটলো বড় রাস্তার দিকে। সবাই ছুটে গিয়ে যা দেখতে পেলো তাতে তাদের পায়ের তলার মাটি সরে গেলো। ময়নাকে বস্তায় ভরে কে যেনো ফেলে রেখে গেছে। বস্তার মুখ খোলা। মেয়েটা অচেতন কিন্তু শ্বাস নিচ্ছে । ময়নার বাবা ছুটে গিয়ে মেয়েকে বস্তা থেকে বের করলো। মেয়েটার পড়নের স্কুল ড্রেস জায়গায় জায়গায় ছেড়া। উপস্থিত সবার কারো বুঝতে বাকি রইলো না কি হয়েছে। ময়নার মা মেয়েকে ওই অবস্থায় দেখেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। কেউ একজন দ্রুত বাড়িতে ছুটে গিয়ে একটা চাদর নিয়ে আসলো মেয়েটাকে ঢাকার জন্য। কেউ থানায় ফোন করলো। সবাই বলাবলি করছে,

“তারা যে আশংকা করছিলো সেটাই হয়েছে। শেষ রক্ষা হলো না মেয়েটার। কারা করলো এতো বড় ক্ষ”তি মেয়েটার”।

মিনিট দশেকের মধ্য থানা থেকে লোকজন আসলে তারা মেয়েটাকে নিয়ে এম্বুলেন্স করে দ্রুত সদর হাসপাতালে ছোটে। চেয়্যারম্যান খবর পাওয়া মাত্র সেও ছুটে যায় হাসপাতালে। পুলিশের গাড়ি আর এম্বুলেন্স এর সাইরেন এর আওয়াজ পাওয়া মাত্রই দুজন ওয়ার্ড বয় স্ট্রেচার নিয়ে বাহিরে আসে। তারপর ময়নাকে দ্রুত হাসপাতালের ওয়ানস্টপ মেডিকেল সার্ভিস জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়৷ নিয়াজের আজকে নাইটি ডিউটি ছিলো হাসপাতালে। এক ঘন্টা পরেই তার ডিউটি শেষ। তারপর শিফটিং করে বাড়িতে যাবে সে। তখনই জরুরি বিভাগে যাওয়ার জন্য তাকে ডাকা হলো। বর্তমানে এই সদর হাসপাতালের ইনচার্জ সে। একজন নার্স হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বললো,

” ডাঃ নিয়াজ আপনাকে এখনি জরুরি বিভাগে যেতে হবে। একটা ক্রিটিকাল কে’ইস এসেছে”।

নিয়াজ প্রচণ্ড ক্লান্ত। ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে এমন অবস্থা। নিয়াজ বললো,

” আমার ডিউটিতো এখনকার মতো শেষ। অন্য ডাক্তারকে রেফার্ড করো”।

নার্স নিয়াজকে বললো,

” স্যার এইটা পুলিশ কেইস। পেশেন্ট একটা বাচ্চা মেয়ে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ফিজিক্যালি এ”বি”উ”জ”ড হয়েছে। তার অবস্থা ভালো না। খুবই ক্রিটিকাল।

কথাটা শুনে নিয়াজ এর ঘুম ছুটে গেলো। সে বললো

” কি বললে? তুমি বলতে চাইছো শী ইজ…..

নার্স উপরে নিচে মাথা নাড়িয়ে বললো

” জি স্যার। আপনি ঠিকই ধরেছেন। আরেকটা বিষয় হচ্ছে আমরা যে গ্রামে গত দুই সপ্তাহ আগে হেলথ ক্যাম্পেইনে গিয়েছিলাম পেশেন্ট সেই গ্রামের “।

কথাটা শুনেই নিয়াজ কোনোরকমে এপ্রোনটা গায়ে দিয়ে দৌড় দেয়। ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে গিয়ে যা দেখে তাতে সে হতবাক হয়ে যায়। অস্ফুট স্বরে বলে,

” ময়না ”

ময়নাকে যেভাবে নিয়াজ দেখলো তাতে তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো। দুই সপ্তাহ আগে তারা গিয়েছিলো ময়নাদের গ্রামে হেলথ ক্যাম্পেইনের জন্য। ময়নাদের স্কুল মাঠেই ক্যাম্পের আয়োজন হয়েছিলো। সেখানে সে ময়নাকে দেখেছিলো। অসাধারণ মেধাবী একজন মেয়ে। প্রানচঞ্চল এবং প্রাণবন্ত একটা মেয়ে। নিয়াজের সাথে তার আলাপের একটা বিশেষ ঘটনা আছে। প্রথমদিন নিয়াজরা যখন ক্যাম্পে ছিলো তখন সে তার বান্ধবীকে নিয়ে আসে। নিয়াজ তখন অন্য রোগী দেখছিলো। হঠাৎ করে একটা মেয়ে এসে বলে,

_ স্যার আমার বান্ধবীর পিরিয়ড অনিয়মিত। যখন হয় তখন পেটে খুব ব্যাথা হয়। এমন ব্যাথা হয় যে দুদিন বিছানা ছেড়ে উঠতেও পারে না। সে ঠিকমতো খেতেও চায়না। ওজনও কম। রুচি নেই তার মুখে। তাকে অনেকবার বলেছি ডাক্তার দেখাইতে কিন্তু তার মা বলছে এগুলো মেয়েলি অসুখ। বয়স হইলে সবার হয়। বিয়ে হইলেই ঠিক হয়ে যাবে। আপনি বলেন স্যার এগুলো নিয়ে কি বসে থাকা ভালো? এখন সময় কত উন্নত হয়ে গেছে। এখন কি মানুষ রোগ পুষে এভাবে? যদি ছোট থেকে বড় কিছু হয়ে যায়?

ময়নার কথা শুনে নিয়াজ সহ বাকি ডাক্তার আর নার্সরাও কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো। রাজাপুর গ্রাম খুব একটা উন্নত নয়। গ্রামটা খুব একটা বড়ও নয়। এখানে বেশিরভাগ মানুষ কৃষি কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করে। রাস্তাঘাটও তেমন ভালো না। সেখানে একজন মেয়ে পুরুষ ডাক্তারকে সরাসরি পিরিয়ড অনিয়মিত নিয়ে কথা বলছে এইটা বেশ অবাক করার মতো। এখনো অনেক মানুষ পিরিয়ড নিয়ে করা থা বলতে নাক সিটকায়। ট্যাবু মনে করে অথচ এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়াজ ময়নাকে বললো,

” তোমরা কোন ক্লাসে পড়ো? এই স্কুলেই পড়োতো তাই না?

ময়না বললো,

” জি স্যার আমরা এই স্কুলেই পড়ি। ক্লাস এইটে পড়ি”।

নিয়াজ দুজনকেই বসতে বলে। তারপর টুকটাক আরও আলাপ করে ময়নার সাথে থাকা বান্ধবীকে বলে,

” এই যে পিরিয়ড অনিয়মিত। পেটে ব্যাথা হয়। খেতে চাওনা এসব নিয়ে কখনোই ডাক্তারের কাছে যাওনি?

মেয়েটা লজ্জায় নুয়ে যায়। একটা পুরুষ মানুষ তাকে পিরিয়ড নিয়ে কথা বলছে। এইটা ভেবে সে আরও বেশি লজ্জায় মাথা নিচুঁ করে। এটা দেখে ময়না খুবই বিরক্ত হয় আর বলে,

” দেখছেন স্যার দেখছেন এমনভাবে লজ্জা পাইতেছে মনে হচ্ছে নতুন বউ। আরেহ তোর সমস্যা যদি তুই বুঝায় না বলিস ডাক্তার তোকে কি ওষুধ দিবে”।

নিয়াজ হেসে ফেলে ময়নার কথা শুনে। বান্ধবীর জন্য কি চিন্তা তার। নিয়াজ ময়নার সেই বান্ধবীকে প্রাথমিক অবস্থায় কিছু ওষুধ লিখে দিলো। আয়রন ট্যাবলেট দিলো। খাবারে রুচি বাড়ানোর ওষুধও দিলো। আর বললো,

” যদি ওষুধে কাজ না হয় তাহলে যেনো দেরি না করে হাসপাতালে যায় ডাক্তার দেখাতে”।

মেয়েটা ওষুধগুলো নিয়ে চিলের মতো দৌড় দিলো ময়নাকে রেখেই। ময়না সালাম দিয়ে ফিরে আসতে নিলেই নিয়াজ বলে,

” এই যে পিচ্চি মেয়ে কি নাম তোমার? এতোক্ষণ বান্ধবীর রোগ নিয়েতো বললে। তোমার জন্যও কিছু বলো। তোমার কোনো সমস্যা?

ময়না বললো,

” স্যার আমার নাম ময়না। আমার সমস্যা আছেতো। আমার খালি চোখ চুলকায়। কিছু খাইলে চোখ চুলকায়। পড়তে বসলে চোখ দিয়ে পানি পড়ে”।

নিয়াজ বুঝলো মেয়েটার চোখে এলার্জির সমস্যা। তাকেও ওষুধ লিখে দিতে দিতে বললো,

” তুমিতো দারুন কথা বলতে পারো ময়না। বড় হয়ে কি হতে চাও?

ময়না বলে,

” আপনাগো মতোই বড় ডাক্তার হইতে চাই। এই গাঁয়ে ভালো কোনো হাসপাতাল নাই। ডাক্তার নাই। মানুষ রোগে শোকে দুনিয়া থেকে চিকিৎসা ছাড়াই চলে যায়। তাই আমার স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া”।

নিয়াজ খুশি হয় মেয়েটার কথা শুনে। তারপর বলে,

” দোয়া রইলো ময়না তোমার জন্য তুমি অনেক বড় ডাক্তার হও। এই নাও তোমার ওষুধ। ঠিকমতো খাবে। তাহলে সেরে যাবে “।

নার্সের ডাকে হুঁশ ফেরে নিয়াজের। নিয়াজ এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না মেয়েটার সাথে কি হয়ে গেলো। তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ময়নাকে নিয়ে। যথাসম্ভব চেষ্টা করলো মেয়েটাকে যত ভালো চিকিৎসা দেওয়া যায় কিন্তু নিদারুণ সত্য এই যে অবস্থা খুবই নাজুক। মেয়েটাকে কিছুতেই স্ট্যাবল করতে পারছে না তারা। সেন্সলেস অবস্থাতেই খিচুনি উঠেছিলো মেয়েটার। অনেক চেষ্টার পরে সেটা থেমেছে কিন্তু ইন্টারনাল সবকিছুই ধীরে ধীরে নিস্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত উন্নত চিকিৎসা দিতে হবে। নিয়াজ যখন ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার জন্য নিজের অফিস কেবিনের দিকে যেতে নেয় তখন তাকে পেছন থেকে কেউ ডেকে উঠে। নিয়াজ পেছনে ফিরে তাকাতেই অনাকাঙ্ক্ষিত সেই মানুষটিকে দেখে বলে,

” তুমি এখানে”?

নিয়াজের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ। গ্রামের চেয়্যারম্যান এর ছোট ছেলে। বয়স কত হবে এই সতেরো বা আঠারো। তাদের ক্যাম্পের শেষ দিনে তার সাথে আলাপ হয়েছিলো। শহরের কলেজে পড়ে। কথাবার্তায় ভালো মনে হয়েছে। রনি নাম তার। নিয়াজ কিছু বলতে নিবে তার আগেই ছেলেটা বললো,

” মেয়েটা বাচঁবেতো স্যার? ও যেখানে থাক ভালো থাক। যা মন চায় করুক। যত পড়তে চায় পড়ুক তবুও বেচেঁ থাক”।

নিয়াজ রনির চোখের দিকে তাকালো। এই চোখের ভাষা সে জানে। এই ভাষার মায়ায় জড়িয়ে সেওতো কম কিছুর মুখোমুখি হয়নি। নিয়াজ স্বাভাবিক গলায় বলল,

” কিছুই বলা যাচ্ছে না। অবস্থা খুবই নাজুক “।

রনি বাচ্চাদের মতো হু হু করে কেঁদে উঠলো। নিয়াজের হাত জড়িয়ে ধরে বললো,

” আমি ওর চোখের সামনে কোনোদিন যাবোনা। দূর থেকেই দেখবো। দূর থেকেই ভালোবাসবো। তবুও ও বেচেঁ থাক। শ্বাস নিক”।

নিয়াজ ওর কাধেঁ হাত দিয়ে পিঠ চাপড়ে বললো,

” সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করো। তোমার মতো আমিও চাই সে এই দুনিয়াতে প্রান খুলে বাঁচুক”।

নিয়াজের বুকের ভেতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগলো। তার মনে হলো দুনিয়াতে ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখার মতো কঠিন কিছু হয়তো আর নেই।

চলবে…………