Home "ধারাবাহিক গল্প তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে পর্ব-২০ এবং শেষ পর্ব

তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে পর্ব-২০ এবং শেষ পর্ব

0
1436

#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ২০ ( অন্তিম পর্ব)
#লেখনীতে_তানিয়া

“জাফু একটা আপ্পা দেতো। তোর আপ্পা এতো মিষ্টি কেনো? সুন্দরবনের খাটিঁ মধু খাওয়ার ফল এটা। আর বেশিদিন নাই সুগার বেড়ে যেতে। দে অফিসে যাওয়ার আগে একটু আদর করে দে। তাহলে অনেকক্ষন ক্ষু”ধা লাগবে না”।

জাফরিন লজ্জায় কাঁথার নিচে মুখ লুকায়। ভেটকায় ঘুমের ভান করে পড়ে থাকে। নিয়াজ তা দেখে হাসে। কাছে গিয়ে বলে,

” আপ্পা না দিলে কিন্তু আমি আজকে নাইট ডিউটি নিবো হসপিটালে। বাড়ি ফিরবো না। তখন তুমি ফোন করে কাঁদবা তা হবে না।

নাইট ডিউটির কথা শুনে জাফরিন ঝটকা দিয়ে মুখের উপর থেকে কাঁথা ফেলে দেয়। নিয়াজ এর শার্টের হাতা টেনে একদম কাছে নিয়ে আসে। জাফরিন রাগ দেখিয়ে বলে,

” কোনো নাইট ডিউটি হবে না। রাত দশটার মধ্যে বাড়ি না ফিরলে আমি বাপের বাড়ি চলে যাবো বলে দিলাম”।

নিয়াজ হেসে বলে,

” দশ মিটার দূরেই তোমার বাপের বাড়ি। সেই বাড়ি তুমি দিনে পঞ্চাশবার আসো যাও। এইতো কাল রাতেও ওখান থেকে কোলে করে এই ঘরে নিয়ে আসছি। কি সব যে হু”মকি দাও!! তার চেয়ে একটু আদর করে দাও”।

জাফরিন ন্যাকা গলায় বলে,

” কোনো আদর হবে না। কপাল খারাপ আমার। সেকেন্ড হ্যান্ড বর পাইছি”।

নিয়াজ এই কথায় অনেক মজা পেলো। হঠাৎ করে দুষ্টমি মাথায় চা”ড়া দিলো। জাফরিনের কোমড়ের নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে শক্তকরে জড়িয়ে নিলো তাকে। জাফরিন শান্ত। ছোটার চেষ্টা করছে না কারন লাভ নেই। নিয়াজ বললো,

” কে যেনো নিজেই আগে এসে এই সেকেন্ড হ্যান্ড মানুষকে পাগ”লের মতো আদর করে কাছে টেনেছিলো? অফিস চুলোয় যাক আজকে। আজকে তোমাকে সারাদিন এই সেকেন্ড হ্যান্ড বরের আদর সহ্য করতে হবে। যেরকম উ”স্কে দিয়েছো তেমনি সামলাও “।

নিয়াজ জাফরিকে নিজের পুরো শক্তি দিয়েই জড়িয়ে ধরে রেখেছে। নড়ন চড়ন এর কোনো উপায় নেই জাফরিনের। নিয়াজের তপ্ত শ্বাস জাফরিনের গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে। জাফরিন নিশ্চল হয়ে চেয়ে আছে নিয়াজের দিকে। তাদের বিয়ের মাস খানেক পেরিয়ে গেছে। হানিমুনে বেশ সুন্দর একটা মুহুর্ত কা’টিয়ে এসে নিয়াজ খুব কম সময়ের মধ্য রিসেপশনের আয়োজন করেছিলো তাদের। সে চেয়েছিলো আরও কিছুদিন পর করতে কারন তার ছুটি শেষ হয়ে গেছে। এইটুকু সময়ের মধ্য একটা বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা তার জন্য খুবই কঠিন হয়ে যাবে যেহেতু বেশিরভাগ কাজ নিয়াজকে সামলাতে হবে কিন্তু জাফরিন জেদ ধরেছিলো সে স্বামীর বাড়ি যেতে চায়। খুব ধুমধাম করে আয়োজন করতে হবে না। সেইতো লোক খেয়ে দেয়ে বদ” নাম করবেই। কথা তুলবে। নিয়াজ সেটা মানতে নারাজ। এমনিতেই বিয়ে হঠাৎ করে হয়েছে বলে কি রিসেপশনটাও ছোট করে করবে তা হয়না। আর সব মেয়েদের একটা শখ আহ্লাদ থাকে এইসব সময়ে। নিয়াজের জন্য সবদিক সামলানো কষ্টসাধ্য হলেও সে চেষ্টা করেছে একটা ভালো আয়োজন করে জাফরিনকে পুরো সম্মানের সহিত নিজের ঘরে আনতে। জাফরিন এর আগেও নিয়াজের ঘরে বহুবার গিয়েছে। কিন্তু এবার সে নিয়াজের ঘরে প্রবেশ করেছে তার স্ত্রী হয়ে। এই ঘরটা আজকে থেকে তারও। এক সময় অবুঝ মনে কত স্বপ্ন দেখেছিলো সে। নিয়াজের বউ হয়ে এই ঘরে আসার। মাঝখানে কত কি হয়ে গেলো। আজকে তার সেই স্বপ্ন পূরন হয়েছে। এই ঘর এই সংসার সবই তার। গোটা নিয়াজই তার। জাফরিনকে একমনে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিয়াজ বলে,

” তুই হঠাৎ হঠাৎ আমার দিকে এভাবে একধ্যানে তাকিয়ে থেকে কি দেখিস বলতো? আমার কেনো জানি মনে হয় তুই এভাবে তাকিয়ে থেকে আমার ভেতর বাহির স্ক্যান করতে পারিস। আমার ভেতরে কি চলছে না চলছে বুঝতে পারিস”।

জাফরিন বলে,

” হুম ঠিকই বলেছো। আমি তোমার দিকে তাকিয়ে থাকি কারন তোমার চোখের গভীরতায় আমি আমাকে খুঁজি সবসময় “।

নিয়াজ বলে,

” খুঁজে পাস নিজেকে?

জাফরিন এর সোজা সাপ্টা উত্তর,

” আগে পেতাম না এখন পাই একটু আধটু “।

নিয়াজ বললো,

” পুরোটা পাস না কেনো?

জাফরিন বলে,

” তুমি তোমার মনের দরজা পুরো খোলোনি আমার জন্য তাই পাই না “।

নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে জাফরিনের দিকে তাকালো। জাফরিন ঠিকই বলেছে।ওর এমনটা মনে হওয়ার কারন আমার বেখেয়ালির জন্যই পেয়েছে। হঠাৎ করে আমার বে”ঈমান মন পুরনো কথা মনে করে বর্তমান এর সাথে গুলিয়ে ফেলে কিন্তু দিন যত যাচ্ছে তত সে জাফরিনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ওর মায়ায় জড়িয়ে পড়ছে। ওকে বেশিক্ষণ না দেখলে বুকের মধ্য অদ্ভুত দুরুদুরু কাপঁন শুরু হয়। ঘরে ফিরে ও দরজার সামনে না দাঁড়ালে আজকাল ভালো লাগে না। এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে। ওর কাছাকাছি মিশে থাকতে ইচ্ছে করে। জাফরিনের গায়ে একটা মিষ্টি আদুরে গন্ধ আছে সেটা না পেলে তার ঘুম আসতে চায়না। হচ্ছে নিজের মধ্য অনেক পরিবর্তন ঘটছে নিয়াজের। নিয়াজ জাফরিনের চোখে স্থির হয়ে তাকিয়ে বললো,

” এবার তাকিয়ে দেখোতো আমার চোখে নিজেকে পুরোটা দেখতে পাও কিনা?

জাফরিন তাকায়। আবারও নিজের স্বামীর সেই চোখের গভীরতায় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে। নিয়াজ ডান হাতের আজলায় জাফরিনের মুখটা আলতো করে নেয়। অন্য হাত দিয়ে মাথার চুলে হাত বুলায়। জাফরিন নরম গলায় বলে,

” নিজেকে খুঁজে পেয়েছি তবে আগের চেয়ে একটু বেশি “।

নিয়াজ জাফরিনের কপালে অধর ঠেকিয়ে ছোট ছোট উষ্ণ স্পর্শ দিয়ে বলে,

” আমি তোমার জাফরিন। শুধুই তোমার। আমার উপর একচ্ছত্র আধিপত্য তোমার। আমার রাজ্যের রানী তুমি। আমি তোমার কাছে নিজেকে পুরোপুরি সমপর্ণ করেছি। আমার জীবনের সুখের একটা দীপশিখা তুমি। আমি তোমাকে ভালোবাসি জাফরিন। প্রতিদিন একটু একটু করে ভালোবেসে ফেলছি। তবে একটা কথা কি জানো? আমি নিজের মনের কথাগুলো গুছিয়ে বলা ভুলে গেছি। তাই হয়তো তোমার মনে হয়েছে আমার মনের দরজা তোমার জন্য পুরোপুরি খুলিনি। এমনটা না। পুরোটাইতো তোমারই। তুমিই এই মনে তা”ন্ডব চালাও। উথাল পাথাল করে ফেলো আমাকে। আমি তোমার মধ্যেই নিজের খেই হারিয়ে ফেলি জান। তবুও এমন কিছু মনে হলে আমি স্যরি। খুব স্যরি “।

জাফরিন নিয়াজের শার্টের একে একে সব বাটন খুলে ফেলে। এলোমেলো করে কুঁচকে দেয় নিয়াজের কাপড়চোপড়। তারপর নিয়াজের উন্মুক্ত বুকে একের পর এক ছোট ছোট অসংখ্য চু” মু দেয়। গা ঘেষা বেড়ালের মতো বুকে নাক ঘষে আদর করে। বুকের বাঁ পাশে গভীরভাবে ঠোঁট ছোঁয়ায়। নিয়াজ মনে মনে ভাবে তার বউ এতো রোমান্টিক। বেশি বেশি আদর নিতে আর দিতে গিয়ে কোনদিন না জানি তার চাকরিটাই চলে যায়। জাফরিন বলে,

” আজকে অফিসে না গেলে হয়না”?

জাফরিনের গলাটা শুকনো আর দূর্বল শোনালো অন্য সময়ের চেয়ে। নিয়াজ বললো,

” যেতেতো আমিও চাইনা জান কিন্তু যেতে হবে। বর্তমান স্থানীয় এম পি খুব কড়াকড়ি করেছে। বিনা ছুটি নিয়ে বিনা কারনে হসপিটালে না গেলে অনেক কৈফিয়ত দিতে হয়। কি হয়েছে বলতো গলা এমন শোনাচ্ছে কেনো? শরীর খারাপ? তোকে এরকম ক্লান্ত দেখাচ্ছে কেনো? মা”ও বললো গতকালকে তোমাকে দেখতে অসুস্থ লাগছে। কত বার বলেছি ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে আমার জন্য বসে না থাকতে। কে শোনে কার কথা। চলো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই”

জাফরিন বলে,

” না আমার কিছু হয়নি। আমি ঠিক আছি কিন্তু…………”

নিয়াজ বলে,

” কিন্তু কী?

জাফরিন বলে,

” এই যে এতো সুন্দর একটা মুহুর্ত উপহার দেওয়ার জন্য তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমিও তোমাকে এর জন্য একটা কিছু দিতে চাই।

নিয়াজ জাফরিন এর দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। জাফরিন নিজেইতো তার জন্য একটা উপহার। আবার কি দিতে হবে?

নিয়াজ অনেক আগ্রহ নিয়ে বললো

” কি হতে পারে বলোতো জাফরিন”?

জাফরিন নিয়াজের ডান হাত তার পেটের উপর রেখে বলে

” তোমার সাথে গল্প আর খেলা করার জন্য সে আসছে “।

নিয়াজ প্রথমে বুঝলো না। দু মিনিট এর মতো শুধু জাফরিনের দিকে চেয়েই আছে। দু মিনিট পর যখন বুঝলো তখন সে আর নিজের জ্ঞানেই নেই। জাফরিনের বুকের উপর প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। জাফরিন চিৎকার করে উঠলো,

” নিয়াজ “!!!!

নিয়াজ জাফরিনের বুকের উপর থেকেই মুখ না তুলে বললো,

” সত্যি বলছো তুমি জান? সত্যি বউ? এটা স্বপ্ন নাতো?

জাফরিন বালিশের নিচ থেকে টিস্যু দিয়ে মোড়ানো প্রেগ্ন্যাসি কিটটা হাতে নিয়ে বললো,

” তুমি নিজেই দেখো”।

নিয়াজ জাফরিনের বুকে মাথা রেখেই বউয়ের হাতে থাকা প্রেগ্ন্যাসির কিটটা নিয়ে দেখলো তাতে দুটো লাল দাগ স্পষ্ট দেখাচ্ছে। নিয়াজ এতোটাই চমকে গেছে যে তার আবেগ অনুভূতি আনন্দ সে শব্দে প্রকাশ করতে পারছে না। বউয়ের পেটের উপর থেকে শাড়ির আচঁল সরিয়ে সেখানে আলতো করে হামি দেয়। একটা দুটো দিতে দিতে অসংখ্যবার দিয়ে ফেললো সে। এখানে তার অনাগত সন্তান আছে। জাফরিনের ভাষায় ও যেটাকে বলে কমলালেবু। নিয়াজ জাফরিনকে বলে,

” এই জন্য শরীরটা খারাপ লাগছে বউ।তুমি জানোনা আমাকে তুমি কত বড় খুশির খবর দিয়েছো। সবচেয়ে বেস্ট একটা রিটার্ন গিফট দিয়েছো আজকে তুমি আমাকে। এই জন্যই হয়তো ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চলো একটা চেক আপ করিয়ে আনি”।

জাফরিন বলে,

” আজকে না গেলে হয়না৷ অন্যদিন যাই। আজকে ভালো লাগছে না। কেমন গা গুলায়। মাথা ঘুরে উঠে একটুতেই “।

নিয়াজ উঠে বসলো। দ্রুত গতিতে শার্টের সব বোতাম লাগিয়ে জাফরিনকে কোলে তুলে নিয়ে বললো,

” বউয়ের অসুস্থতায় ছাড় দিতে নিয়াজ রাজি না সোনা। যেতে যখন হবে তখন এখনই যাবো”।

যেই বলা সেই কাজ। নিয়াজ বউকে নিয়ে ও যে হসপিটালে রোগী দেখে সেখানে নিয়ে গেলো। সিম্পটমস দেখেতো মনে হচ্ছে জাফরিন প্রেগন্যান্ট। নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তার কিছু পরীক্ষা করতে দিলেন। পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার রিপোর্ট দেখে বললো,

” কংগ্রাচুলেশানস মিসেস জাফরিন এবং ডাঃ নিয়াজ। আপনারা বাবা-মা হতে যাচ্ছেন। ইটস দ্যা ফোর্থ উইকস অব প্রেগন্যান্সি”।

নিয়াজ এবং জাফরিন দুজনেই অনেক খুশি হয় আবারো খবরটা নিশ্চিত হওয়ার পরে। নিয়াজ হেসে রিপোর্ট হাতে নিতে নিতে বলে,

” অসংখ্য ধন্যবাদ ডাক্তার আপনাকে। স্পেশাল কোনো রিমার্কস আছে কি?

গাইনী ডাক্তার বললেন,

” সাধারণ রিমার্কস। টেনশন ফ্রি থাকতে হবে৷ ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে হবে। ভারি কাজ করা যাবে না। পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে এবং হাটাঁহাটিঁ করতে হবে নিয়মিত। হসিখুশি থাকতে হবে”।

নিয়াজ বললো,

” জি ডক্টর। আমি এগুলোর দিকে সম্ভাব্য উপায়ে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখার চেষ্টা করবো।

ডাক্তারককে বিদায় জানিয়ে হসপিটাল থেকে বের হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হলো তারা। জাফরিন অনেক যত্ন করে এখনো ডাক্তারের রিপোর্ট ধরে আছে। দুই মিনিট পর পর রিপোর্ট খুলে দেখছে সে। প্রেগ্ন্যাসি টেস্ট এর জায়গায় কালো রং দিয়ে বোল্ড করে পজিটিভ লেখা জায়গায় বারবার হাত বুলাচ্ছে। নিয়াজের চোখ এড়ালো না এটা। জাফরিনের হাতটা শক্ত করে ধরলো। নিয়াজের চোখে মুখে একটা খুশি দেখতে পেয়েছে জাফরিন। ভালো লাগছে তার। বিশ মিনিট পর বাড়ি ফিরে আসলো তারা। বাড়িতে ঢুকতেই তারা দেখে দরজা খোলা রেখেই উন্মুখ হয়ে সবাই তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। দুজনকে দেখতেই তাদের দুই মাই একসাথে এগিয়ে আসে। জাফরিনের মা বললো,

” সবকিছু ঠিক আছে মা? ডাক্তার কি বললো? যা ভেবেছিলি সেটাই?

জাফরিন লজ্জা পায় খুব। লজ্জায় মাথা নুয়ে ফেলে৷ নিয়াজ একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। বউয়ের লজ্জা পাওয়া দেখে সে মুচকি হাসে। জাফরিন মাথা নিচু করেই মাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে কিছু একটা বলে। বলার সাথে সাথেই জাফরিনের মা আলহামদুলিল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। নিয়াজের মা মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। জাফরিন আর সেখানে এক মুহুর্তের জন্যও দাঁড়ায় না। এক প্রকার ছুটেই চলে যায় নিজের ঘরে। নিয়াজ মিষ্টির প্যাকেটটা টেবিলে রাখছিলো।নিয়াজের মা আর শ্বাশুড়ি দুজনেই নিয়াজের দিকে এগিয়ে আসে। নিয়াজ এর মা প্যাকেট থেকে একটা মিষ্টি নিয়ে ছেলের মুখে দিলো আগে তারপর বললো,

” বাবা হতে চলেছিস। অনেক দোয়া রইলো। জাফরিনতো ভেতরে চলে গেলো। ওকেও মিষ্টিমুখ করাতে হতো। এগুলো না খেলে ক্ষীর বানিয়ে দিবো। ডাক্তার কি বললো? কি কি খেয়াল রাখার দরকার আছে”?

নিয়াজ বললো,

” স্বাভাবিক বিষয়ই সব খেয়াল রাখতে বলেছে। হাসি খুশি থাকতে বলেছে জাফরিনকে৷ ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া আর হাটাঁহাটিঁ করতে হবে। স্ট্রেস নেওয়া যাবে না। সাবধানে থাকতে হবে “।

জাফরিনের মা নিয়াজের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিয়াজ দুজনকেই মিষ্টিমুখ করায়। নিয়াজ বলে,

” আমি ওকে একটু দেখে আসি “।

নিয়াজ নিজের ঘরের গিয়ে দেখে জাফরিন চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে উপুড় হয়ে। নিয়াজ দ্রুত এগিয়ে যায়। জাফরিনকে আগে সোজা ভাবে পাশ ফেরায়। তারপর নিয়াজ বললো,

” এভাবে উপুড় হয়ে শোয়া যাবে না এখন। ভারি জিনিস উঠানো যাবে না। সিড়ি বেয়ে সাবধানে উঠানামা করতে হবে। আর ম্যাডাম এরকম ধুপধাপ করে জোরে জোরে হাঁটাও যাবেনা। প্রথম তিনমাস সাবধানে থাকতে হবে অনেক। বাথরুমে যাওয়ার সময় সাবধানে যেতে হবে। বুঝেছো কমলালেবুর মা ?

জাফরিন মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। নিয়াজ জাফরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,

” হসপিটালে যাবো আমি এখন? থাকতে পারবা”? বাসায় সবাই আছেতো”।

জাফরিন নিয়াজের শার্ট টেনে ধরে তা দেখে নিয়াজ বুঝে এর অর্থ হচ্ছে সে তার স্বামীকে আজকে কোথাও যেতে দিবে না। নিয়াজ জাফরিনের পাশে বসতেই জাফরিন নিয়াজের চুল এলোমেলো করে দেয়। আবার শার্টের বোতাম সব খুলে ফেলে। তা দেখে নিয়াজ বলে,

” আচ্ছা বুঝেছি। আমার কোথাও যাওয়া হবে না এখন। আমি ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি হসপিটালে যে আমি আজকে বাড়ি থেকে বের হবো না। বউ বারণ করে দিয়েছে”।

জাফরিন নিয়াজকে জড়িয়ে ধরে। স্বামীর উন্মুক্ত বুকে আদুরে বেড়ালের মতো নাক ঘষে। নিয়াজের আজকে অদ্ভুত একটা শান্তি লাগছে কেনো জানি। একটা আরাম আরাম অনুভূতি হচ্ছে।

_________________________

তুরফা আর এই দুনিয়াতে নেই আজকে সাতদিন হচ্ছে। জাফরিনের প্রেগ্ন্যাসির ব্যাপারটা জানার তিনদিন পরেই তুরফার দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার খবরটা আসে। তুরফার বাবা ডাক্তার আর সে নিজেও একজন ডাক্তার ছিলো তাই খবরটা স্বাভাবিকভাবেই জেনেছিলো নিয়াজ পরিচিতদের মারফত। তুরফার বাবাও ফোন করেছিলো নিয়াজের কাছে। নিজেই সংবাদ দিয়েছে। মেয়ের হয়ে ক্ষমাও চেয়েছে। নিয়াজকে বলেছে মেয়েটাকে যেনো শেষবেলায় ক্ষমা করে দেয়। নিয়াজ তখন একটা কথাই বলেছিলো,

” দুনিয়াতে যে আর নেই তার প্রতি তার আর কোনো অভি”যোগ নেই। সে যেখানেই থাকুক ভালো থাকুক। শান্তিতে থাকুক৷ খোদা তাকে ক্ষমা করে দিক এটাই প্রার্থনা “।

এই খবরটা শোনার পর থেকে মন খুব একটা ভালো না থাকলেও জাফরিনকে সেটা বুঝতে দেয়নি নিয়াজ। এই সময় মেয়েদের মন এমনিতেই স্পর্শকাতর হয়। নমনীয় হয়। একটু কথাতেই হুটহাট মন খারাপ হয়। মুড সুইং হয়। কান্না পায়। কষ্ট লাগে। বিশেষ করে স্বামীর থেকে পাওয়া ব্যবহারটাই এই সময় তাদের আরও বেশি মনে থাকে। নিয়াজই বাসার সবাইকে বলেছে। জাফরিন শোনার পর বলেছিলো,

” তুমি চাইলে ওর জানা”জার নামাযে যেতে পারো।আমি কিছুই মনে করবো না”।

নিয়াজ তবুও যায়নি ইচ্ছে করেই। সেখানে গেলেই আবারো সেসব পুরনো কথা উঠবে। লোকে নতুন করে গসিপ করার সুযোগ পাবে। কি দরকার লোকের মুখে কথা তুলে দেওয়ার জন্য।
নিয়াজ রোজকার মতো হাসপাতালে রোগী দেখছিলো। এরই মধ্য তার নামে একটা চিঠি আসে। দপ্তরি চিঠিটা নিয়াজকে দিয়ে গেলো। চিঠির প্রেরকের জায়গায় তুরফার নাম দেখে সে অবাক হয়ে গেলো। এতোদিন পর তুরফার তরফ থেকে চিঠি। বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে মো”চড় দিয়ে উঠলো যেনো। প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা আর শখের ভালোবাসার মানুষকে কি এতো সহজে ভোলা যায়? হাজার হোক তুরফা তার স্ত্রী ছিলো। কি করে ভুলে যায় সে। এখনোতো মনে সবকিছুই তাজা হয়ে আছে। একটু ফ্রি হয়ে চিঠিটা খুলে নিয়াজ। পড়তে শুরু করে। চিঠিতে লিখা,

নিয়াজ,

তোমাকে প্রিয় বা ভালোবাসার মানুষ বলে সম্বোধন করার অধিকার আমি খুব নিদারুণ আর বা”জেভাবেই হারিয়েছে। শুধু হারায়নি বলতে গেলে হেরে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার হাতে বেশি সময় নেই। আমার দুনিয়াতে আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। তুমি যখন এই চিঠিটা পাবে তখন আমি হয়তো এই দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে গেছি অনেক দূরে। আমার তোমাকে বেশিকিছু বলার মুখ নেই নিয়াজ। আমি তোমাকে সম্মান করতে পারিনি। তোমার ভালোবাসা, মায়া, আদর যত্ন, শ্রদ্ধা কোনোকিছুর মূল্য দিতে পারিনি। যে দম্ভ করে তোমাকে অসম্মান করেছি আর যে সুখের আশায় তোমার মতো একজন মানুষকে ছেড়ে এসেছি, ঠকিয়েছি তার শা”স্তি খোদা দুনিয়াতেই বুঝিয়ে দিলো অনেকটা আর পরপারের জীবনতো আছেই। যদি সম্ভব হয় আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। তোমার নতুন বউ অনেক মিষ্টি দেখতে। সে অনেক ভাগ্যবতী যে তোমার মতো মানুষকে স্বামী হিসেবে পেয়েছে। সে তোমাকে অনেক ভালো রাখবে। সুখে থেকো আর আমাকে ভুলে যেও।

ইতি,

তোমার অপ্রিয় নাম তুরফা

নিয়াজ চিঠিটা ভাঁজ করে আবার খামের মধ্য রেখে দেয়। একটা সময় গিয়ে মানুষের করা সব কিছুর জন্যই উপলব্ধি হয় কিন্তু তখন খুব দেরি হয়ে যায়। ফেরার পথ থাকে না। চিঠিটা আবার ড্রয়ারে রেখে দেয়। থাকুক এটা। মাঝে মাঝে পড়ে দেখবে আর ভাববে জীবন কতটা অনিশ্চিত। চিঠি রাখতেই নিয়াজের ফোনটা বেজে উঠলো। লেখা জাফরিন কলিং। ফোন ধরে হ্যালো বলতেই জাফরিন বলে,

” অফিস শেষ হতে আর কত দেরি? কখন আসবা? আমার ভালো লাগছে না আজকে। তোমাকে দেখতে মন চাচ্ছে “।

নিয়াজ বলে,

” এইতো আর কয়েকটা রোগী আছে। দেখেই চলে আসবো। খেয়েছো দুপুরে?

জাফরিন বলে,

” খেতে ইচ্ছে করে না বমি পায়। গা গুলায় “।

নিয়াজ বলে,

” তবুও খেতে হবে জান। পেটে যে আছে তারতো খাবার খেতে হবে। তুমি খেলে তবেই না ও খাবার পাবে। শক্তি পাবে বেড়ে উঠার। পুষ্টি পাবে”।

জাফরিন বলে,

” আচ্ছা খাবো এখনই তাইলে। তুমি তাড়াতাড়ি আসবা কিন্তু “।

নিয়াজ আসবো বলে ফোন রেখে দেয়। নিয়াজ এর জীবনটা যখন মরুভূমির মতো শুস্ক হয়ে গিয়েছিলো তখন বৃষ্টি হয়ে জাফরিন এসে সেখানে আবার নতুন করে প্রাণ দিয়েছে। এই মানুষটিই এখন তার জীবন, তার স্ত্রী, তার ভালোবাসার মানুষ আর তার কমলালেবুর মা।

সমাপ্ত