#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ১৯
#লেখনীতে_তানিয়া
” আপনার জীবনটা তছ”নছ করার জন্য যেমন তুরফা দায়ী আমিও ঠিক একই ভাবে সমান দায়ে দায়ী ডাঃনিয়াজ । আপনার অপ”রাধী আমরা দুজনেই। আমাদের দুজনের করা অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য আজকে একসাথে অনেকের জীবন টালমাটাল অবস্থায় আছে। সেদিন যদি আমি বেতাল না হতাম আর যদি তুরফা আমাকে প্রশ্রয় না দিতো তাহলে এতো বড় অন্যা”য়ের বোঝা মাথায় উঠতো না। মানুষ যখন নিজের জীবনের আবেগ অনুভূতির উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে তখনই হয়তো এই বিপর্যয় গুলো আসে। ঠিক আমাদের তিন জনের সাথে যা হয়েছে। আপনার মতো একজন ভালো মানুষকে কত সাফার করতে হয়েছে এইটা আমিও একটু হলেও বুঝতে পারি কারন আপনার জীবনের এই অধ্যায়টা আমার জীবনেও আছে। সেখান থেকেই আমার জীবনের বিপর্যয় শুরু। শুনেছি তুরফা অসুস্থ। খুব অসুস্থ। কখন কি হবে তার ঠিক নেই। ও হয়তো নিজের করা কাজের জন্য কি রকম উপলব্ধি করেছে জানিনা কিন্তু একটা উপলব্ধি প্রতিদিন আমাকে আত্ন দ”হনে শেষ করে দিচ্ছে। খুব ইচ্ছে হতো আপনার পা জড়িয়ে ধরে মাফ চাই কিন্তু সাহসে কুলায়নি। সকালে যখন আপনাকে দেখেছিলাম হোটেলে ঢুকতে চিনতে পেরেই মনকে কত শত বার বুঝিয়ে টেনে টুনে আপনার সামনে আসার জন্য তৈরী করেছি”।
হোটেলের ব্যাকইয়ার্ড গার্ডেনে টেবিলের দুই প্রান্তে মুখোমুখি নিয়াজ আর রাকীন। নিয়াজ যখন তাদের রুমে যাচ্ছিলো তখন ডাঃ রাকীন তাকে পেছন থেকে ডাক দেয়। নিয়াজ প্রথমে চিনতে পারেনি তাকে। পরে রাকীন যখন তার নাম বললো তখন চিনতে পেরেছে। এই সেই লোক যার সাথে তুরফা নিজেকে জড়িয়ে তার ভালোবাসাকে অসম্মান করেছিলো । তার জীবনটা টালমাটাল করেছিলো। নিয়াজ ভালো করে দেখলো ডাঃ রাকীনকে। আসলেই সে সুদর্শন পুরুষ মানুষ। উচ্চতা,চেহারা, কাপড় চোপড় এবং ভাব ভঙ্গিমায় তাকে হ্যান্ডসাম বলা যায়। এই জন্যই হয়তো তুরফা এতো সহজেই ফল করেছিলো। নিয়াজের কানে এখনো তুরফার বলা কথাগুলো বাজে। সে বলেছিলো স্বামী হয়ে সে আমার প্রতি সন্তুষ্ট না। আমার ভালোমানুষী তার অসহ্য লাগে। সে যাই হোক এতোগুলো দিন পর ডাঃ রাকীন নিয়াজের সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করলো কেনো? শুধু ক্ষমা চাওয়ার জন্য? নিয়াজ রাকীনের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বললো,
” আপনি কি এসব পুরনো কথা শোনানোর জন্য আমার সাথে কথা বলতে চাইছে ডাঃ নিয়াজ? দেখুন সেসব সময় আমি ফেলে এসেছি। যেভাবেই হোক সেই সময়গুলো আমি শেষ করেছি। এখন সেগুলো মনে করে নিজের জীবনের সুন্দর সময়গুলো ন”ষ্ট করতে চাইনা। তুরফা আমার কাছে শুধুই ফেলে আসা একটা অতীত ছাড়া কিছু নয়। ওর অসুস্থতার খবর আমি শুনেছি । সৃষ্টিকর্তা তাকে সুস্থ করে দিক এটা ছাড়া আর কিছু বলার নেই আমার। কিছু করারও নেই। আপনাদের প্রতি আমার কোনো অভি”যোগ নেই। নিয়াজ কখনো কাউকে অভি”শাপ দেয়না। তবে মাফ জিনিসটা সহজে আসেনা তার মধ্য এটাই সমস্যা। আমার জীবনে নতুন করে একজন এসেছে যে আমাকে আবার গুছিয়ে উঠতে প্রানপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সে আমার আশেপাশে থেকেও আমি আহাম্মক তাকে বুঝার চেষ্টা করিনি। চেষ্টা করলে হয়তো আমার জীবনে এই অসফল বিয়ের একটা অতীত থাকতো না। নতুন করে আবারও সুযোগ হয়েছে সেই মানুষকে আগলে নেওয়ার জন্য। আমি আমার জীবনের পুরো মনোযোগ এখন সেই মানুষটিকে দিতে চাই”।
ডাঃ রাকীন গভীর মনোযোগ দিয়ে নিয়াজের বলা কথাগুলো শুনলো। একটা মানুষ কতটা সহনশীল এবং বিবেকবান হলে তার পক্ষে এতো সাফার করার পরেও এইভাবে স্থির হয়ে কথা বলা সম্ভব। তাও আবার সেই লোককে সে বলছে যে কিনা তার জীবন টালমাটাল করার জন্য অনেকাংশে দায়ী। রাকীন বললো,
” আপনার বিয়ের পোস্ট রীতিমতো ভাই”রাল হয়ে গিয়েছিলো দুদিন আগে। অনেকেই আপনাদের নিয়ে সুন্দর করে কথা বলেছে। কেউ কেউ পুরনো কথা নিয়ে হা হুতাশও করেছে”।
নিয়াজ রাকীনের দিকে তাকালো । ভাবলো সবার কাছেই পৌছেঁ গেছে এই পোস্ট। সে বললো,
” একটা পেইজ থেকে আমাদের ছবি নিয়ে তারাই ক্যাপশন দিয়েছে। কিভাবে কি হয়েছে তারাই জানে৷ আমি শুধু তাদের মনে উঠা প্রশ্নের জবাব দিয়েছি যাতে আমার স্ত্রীকে নিয়ে কেউ কিছু বলার সাহস না করতে পারে। এইটা আমার সহ্য সীমার বাহিরে চলে যেতো “।
রাকীন কিছুটা থমকে যায়। ভালোভাবে নিয়াজকে দেখে। কোথায় কমতি এই ছেলেটার মাঝে যে তুরফার এতো অভিযোগ ছিলো নিজের স্বামীর প্রতি। সে কি আদতে কখনো মন দিয়ে বুঝার চেষ্টা করেছে নাকি সে এটা বুঝেইনি আসলে ভালোবাসা কাকে বলে? নিয়াজকে যথেষ্ট সুদর্শন এবং বিবেকবোধ সমপন্ন ঠান্ডা মাথার একজন মানুষ মনে হচ্ছে তার। এই মানুষটার সাথে তুরফা কেনো সংসার করতে পারলো না এই প্রশ্ন তাকে ভাবাচ্ছে। তুরফা অনেক অভি”যোগ করতো সে নিয়াজের সাথে খুশি না। হ্যাঁ ও বলেছিলো নিয়াজের এই শান্ত আর ঠান্ডা মেজাজই তার ভালো লাগতো না। অদ্ভুত হলেও তার কথাগুলো এমনই ছিলো। কিছু কিছু মানুষ আসলে জীবনে এটাই বুঝতে পারেনা সে আসলে কি চায়। কাকে চায়। রাকীনকে চুপ করে থাকতে দেখে নিয়াজ বললো,
” একটা কথা বলবো”?
রাকীন বললো,
” একটা কেনো হাজারটা বলুন। আমি আজকে সব বলবো বলেই আপনার মুখোমুখি হয়েছি”।
নিয়াজ বললো,
” তুরফা আমাকে বলেছিলো আপনারা দুজন দুজনকে পছন্দ করেন। আমার কাছ থেকে মুক্তি নিয়ে সে নতুন করে শুরু করবে সব। আমার সাথে থেকে সে সন্তুষ্ট না। আপনারা পরে আর আগাননি কেনো”?
রাকীন বললো,
” আমার আর তুরফার বিষয়টা অনেক বাজে ভাবে ছড়িয়েছিলো। যা হয়নি সেটাও বলা হয়েছিলো। তুরফার সাথে আমার একবারই শুধু সেসব হয়েছিলো যখন আমি নিজের হুশেঁ ছিলাম না। এই দায় আমার। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। তুরফার সবচেয়ে বড় অপ”রাধ হচ্ছে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায়নি ইচ্ছা করেই অথচ সে চাইলে সেদিন রাতে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারতো। তার কাছে সব দরজা খোলাই ছিলো। যখন সে এটা করেনি আর আমি যখন বুঝতে পারলাম তখন আমার মধ্য একটা অপরাধ”বোধ কাজ করতোই। আমারও তখন ডিভোর্স হয়ে বেশিদিন হয়নি। প্রতিনিয়ত এক্স ওয়াইফ এর একটার পর একটা প্যারা নিয়ে আমি অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম। কি থেকে কি হয়ে গেলো বুঝতেই পারিনি। তুরফাকে জিজ্ঞেস করলাম কেনো নিজেকে সঁপে দিয়েছো এমন করে। উত্তর করলো এমন কিছু যেটা মনে করলে এখনো নিজেরই লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে।
ওর উত্তরে আস্কারা পেলাম দিন দিন বেপরোয়া হওয়ার কিন্তু সেসব আর বিছানা অবধি যায়নি। একদিন বায়না করলো বাহিরে ঘুরতে যাবে। দুজনে গেলাম। খাবার অর্ডার করলাম। খেলামও কিন্তু আমাদের গ্লাসের কোকের মধ্য কিছু মেশানো হয়েছিলো। যার ফলে আমরা দুজনেই তখন নিজেদের প্রতি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলাম। ঘুম থেকে যখন উঠলাম তখন আমরা নিজেদেরকে একটা ঘরে দেখতে পাই। কি হচ্ছিলো নিজেরা বুঝে উঠার জন্য অনেকক্ষন কথা চলতে থাকে৷ যেটা ভিডিওতে অন্যভাবে দেখানো হয়েছে। এই কাজটা আমারই সাথে বদলা নেওয়ার জন্য আমারই এক্স ওয়াইফ লোক লাগিয়ে করিয়ে নিয়েছে। যাতে আমাকে ব্ল্যাক”মেইল করে বাচ্চার ভরণপোষনের জন্য মোটা অংক নিতে পারে। আফসোস এইটা যখন জেনেছি ততক্ষনে আপনার সাথে তুরফার সম্পর্কের শেষ পেরেক দেওয়া হয়ে গেছে। তুরফাকে যখন বললাম সে বললো আপনি তাকে তিন তা”লাক দিয়ে ফেলেছেন। তার জোড়াজুড়িতেই দিয়েছেন। তারই আর এই সম্পর্ক ভালো লাগছিলো না।
নিয়াজ বললো,
“তারপর কি হলো”
রাকীন আবার বলতে শুরু করে,
“আমি আমার সমস্ত সোর্স কাজে লাগিয়ে এই বিষয়টার সত্যতা বের করতে পেরেছিলাম। আমার এক্স ওয়াইফ তিয়া এখন জেলখানায় আর আমার বাচ্চার কাস্টডি এখন আমার কাছে। এতোকিছুর পরেও আমি প্রতিদিন এক অশান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার জন্য একটা মেয়ের সংসার ভেঙে গেছে। তুরফার সাথে ততদিনে যোগাযোগ অনেক কম হতো আমার। সে হসপিটাল থেকে ছুটি নিয়েছিলো অনেকদিনের। অনুশোচনা আর আত্নগ্লানি থেকে তুরফাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিলাম। জানতাম তুরফা না করবে না। কারন এই ধ্বং”সের বীজ আমার জন্যই সে নিজের জীবনে বুনেছিলো। পরিবারের কেউই অমত করলো না। কারন তারা শান্তি আর সম্মান ফিরে পেতে চায়। বিয়ের দিন ঠিক হলো। কাজী তুরফাকে কবুল পড়ানোর সময় খবর এলো তুরফা জ্ঞান হারিয়েছে। প্রথমে ভাবলাম হয়তো টেনশনে এমন হয়েছে কিন্তু জ্ঞান যখন ফিরছিলো না তখন হসপিটালে এডমিট করা হলো। সব পরীক্ষা করে দেখা গেলো তুরফার ব্রেইন টিউ”মার হয়েছে। স্টেজ ফোর এবং সেটা দ্রুত ছড়াচ্ছে শরীরে৷ এরপর আর কি তুরফা নিজে দিকেই সমস্ত কিছু থেকে আমাকে বিদায় জানিয়ে নিউইয়র্কে চলে গেলো। যাওয়ার আগে একটাই কথা বলে গেলো নিয়াজের রুহের হায় লেগে এমন হয়েছে। আমি সেদিন বুঝেছিলাম রুহের হায় লাগলে বোধ হয় জীবন এইভাবেই থমকে গিয়ে শোধ নেয়”।
নিয়াজ সব কথা শুনলো। বেশ মনোযোগ দিয়েই শুনলো। সত্যিই কি তার রুহের হায় লেগে এমন কিছু হয়েছে? নাকি এসব তাদেরই কর্মফল কোনটা? নিয়াজ বুঝে উঠতে পারেনা জীবনের এতো জটিল মা”রপ্যাঁচ। ধুন্ধুমার লাগে সব। তবুও ভালো কেউতো অনুশোচনার অনলে ছাই হয়ে তার মুখোমুখি হয়ে সত্য বলে ক্ষমা চাওয়ার সাহস করেছে। যাই হোক এসব শুনতে তার ভালো লাগছে না। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। জাফরিন অপেক্ষা করছে তার জন্য। রুমে যাওয়া দরকার। শেষবেলায় নিয়াজ একটা প্রশ্ন করলো রাকীনকে।
” বিয়ে শাদী পরে আর করেছেন? এখানে কি স্ত্রী সন্তানসহ এসেছেন?
রাকীন নিয়াজের কথা শুনে হাসলো। নিয়াজ বিদ্রুপ বা উপহাস করে বলেনি ঠিকই কিন্তু কথাটা তার গায়ে সেরকমই লাগলো যেনো। রাকীন ফোস করে একটা শ্বাস ফেলে বললো,
” আর বিয়ে!!! এই জনমে বিয়ের শখ এবং রুচি মিটে গেছে আমার। এই জীবনে বিয়ে করবোনা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ছেলেকে নিয়ে বেশ আছি। চলে যাচ্ছে। পি এইচ ডির জন্য এপ্লাই করেছি বেশ কয়েক জায়গায়। কোনো রেসপন্স পেলে ছেলেকে নিয়ে এব্রোড চলে যাবো। এখানে এসেছি পরিবারকে নিয়ে। একঘেয়েমি আর বিতৃষ্ণা উঠেছিলো সব কিছুর উপরে। সেই ঘটনার জন্য পরবর্তীতে পোস্টিং হয়েছে অনেক দূরে। প্রত্যন্ত এলাকায়। নিজেকেই সহ্য হচ্ছিলো না। জানিনা কতকাল এসব বয়ে বেড়াতে হবে। তাই এখানে আসা একটু হাওয়া বদলের জন্য”।
রাকীন হাত জোড় করলো। নিয়াজের দিকে তাকিয়ে মলিন দৃষ্টিতে বললো,
” যদি উচিত মনে হয় আপনার জন্য পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন নিয়াজ। আমার ইদানীং বড্ড ভয় হয় আমার কৃতকর্মের ফল আমার মাসুম বাচ্চার উপর না পড়ে যায়। তাই যদি সম্ভব হয় এই আপনার জীবনের এই অপরা”ধীকে ক্ষমা করে দিবেন প্লিজ”।
নিয়াজ এর প্রচণ্ড খারাপ লাগে। সে সামনে শুধু অনুশোচনা বইতে থাকা একজন পুরুষকে দেখছে না সে একজন মাসুম বাচ্চার বাবাকেও দেখছে। মানুষ অনু”তপ্ত হলে সৃষ্টিকর্তাও বার বার ক্ষমা করে দেয়। আর সেতো তুচ্ছ মানুষ। নিয়াজ রাকীনের কাঁধে হাত দিয়ে বললো,
” আমি কখনো আপনাদের কাউকেই অভি”শাপ দেইনি। আমি মাফ করেছি রাকীন। ভয় পাবেন না। আমার কোনো কিছুর জন্য আপনার অবুঝ দুধের বাচ্চার উপর কোনো হায় লাগবে না। তার জন্য সৃষ্টিকর্তা আছেন। আর হ্যাঁ যা ফেলে এসেছেন আর যা হয়ে গেছে সেটা নিয়ে না ভেবে নতুন করে ভাবুন। এভাবে একটা মানুষ বাঁচতে পারেনা একা একা। ভালো কাউকে দেখে শুনে বিয়ে করুন যে আপনার জীবনের সব সত্য মেনে নিয়ে আপনাকে আপন করে নিবে। আপনার জন্য শুভকামনা ডাঃ রাকীন। আপনার ছেলেকে আমার আদর দিবেন”।
রাকীন অবাক হয়ে শুধু নিয়াজের কথা শুনে গেলো। ফ্যালফ্যাল করে সে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে আছে। অদ্ভুত এক শ্রদ্ধার অনুভূতি প্রকাশ পেলো নিয়াজের প্রতি। এরকম একটা পানির মতো স্বচ্ছ মানুষকে কিভাবে তাদের করা এক নিদারুণ নি”ষ্ঠুর অনৈতিক একটা কাজের জন্য সাফার করতে হয়েছে এই ভেবেই আবারও বিব্রতবোধ করছে সে। তবে একটা ভালো বিষয় হচ্ছে রাকীনের নিজেকে হালকা লাগছে ভীষণ। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে কত বড় পাথর নেমে গেছে। দুজন দুজনকে বিদায় জানিয়ে তারা এগোচ্ছে নতুন সময়ের দিকে। যেখানে আর পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেছে নিয়াজ জাফরিনকে একা রেখে বাহিরে আছে। কি ভাবছে মেয়েটা কে জানে। বেশ দ্বিধা আর জড়তা নিয়ে রুমে নক করলো সে। দুবার নক করতেই ভেতর থেকে জাফরিন নরম গলায় বললো,
” কে”?
নিয়াজ বললো,
” আমি নিয়াজ “।
জাফরিন দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই নিয়াজ যা দেখলো তাতে তার চক্ষু চড়ক গাছ। জাফরিনকে দেখে সে ভিমড়ি খেলো। বুকের মধ্য হার্টবিট বেড়ে গেলো। বউকে দেখে বার কয়েক শুকনো ঢোক গিললো সে। ঘর মোমবাতি দিয়ে সাজানো। অসংখ্য লাল গোলাপের পাপড়ি আর বেলুন মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। বেডের সাদা চাদরের উপর লাল গোলাপের পাপড়ির ছড়াছড়ি। এবার নিয়াজের কাছে আসলেই হানিমুন ভাইব ফিল হচ্ছে। আর জাফরিন তার বউ, তার বর্তমান এবং তার জীবন এখন যার কাছে জিম্মায় রেখেছে সে, তার অবতার দেখে নিয়াজ এর ভেতরের সব কিছু কালবৈশাখীর ঝড়ের মতো তোলপাড় হওয়ার অবস্থা। লাল শিফন শাড়ি সাথে ব্যাক আর স্লিভলেস ব্লাউজে অসম্ভব রকমের এক আবেদনময়ী অপ্সরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাফরিন তার সামনে। ঠোটেঁ চেরি রেড শেইড এর লিপ্সটিক এই মেয়ে আজকে তাকে পা” গল করে ছেড়ে তারপর দম নিবে। মাথা চক্কর দিচ্ছে তার। বাসররাতে হালকা সাজেই যে অবস্থা করেছিলো নিয়াজের। জাফরিন আজকে কি করবে? জাফরিন নিয়াজের আরও কাছে এসে দাঁড়ায়। জাফরিন বলে,
” এভাবে কি দেখছো”?
নিয়াজ বললো,
” এক আবেদনময়ী লাল অপ্সরীকে দেখছি “।
জাফরিন লজ্জা পেলো যেনো। নিয়াজ বললো,
” এতোসব কখন করলি? কিভাবে করলি?
জাফরিন বললো,
” তোমার আসতে সময় লাগছিলো। ভাবলাম এই সুযোগে একটা সারপ্রাইজ মোমেন্ট ক্রিয়েট করি। হানিমুন বলে কথা। বেলুন আর মোমবাতি আমি সাথে করে নিয়েই এসেছিলাম। গোলাপ ফুলগুলো রুম সার্ভিসকে বলা মাত্রই দিয়ে গেলো। ভালো হয়নি ঘর সাজানো? চোখে লাগছে? আমি ভালো করে সাজাতে পারিনি। এইটুকু সময়ে যা পেরেছি তাই। শুধু মনে হচ্ছিলো এই বুঝি তুমি আসো আর সব ভেস্তে গেলো “।
নিয়াজ বললো,
” সুন্দর হয়েছে। অনেক বেশি সুন্দর হয়েছে ঘর সাজানো। আমি সত্যিই আপাদমস্তক সারপ্রাইজড হয়েছি “।
জাফরিন নিয়াজের এক হাত ধরে টেনে ঘরের সেন্টারে আসলো। রিমোট দিয়ে টিভিতে সফট রোমান্টিক একটা মিউজিক প্লে করলো। তারপর দু হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলো,
” উইল ইউ ডান্স উইথ মি”?
নিয়াজ তাকিয়ে আছে জাফরিন এর দিকে। সে জবাব দিলো না তার বদলে জাফরিনের কোমড় জড়িয়ে টেনে নিজের কাছে একদম বুকে এনে ফেললো। বউয়ের চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিয়ে বললো,
” শিওর মাই প্রিটি লেডি ”
দুজনে ডান্স করছে সেই সফট মিউজিকের ছন্দে । চারদিকে কি হচ্ছে তাদের জানার আপাতত কোনো দরকারন নেই। তারা এখন শুধু নিজেদের মধ্য বিভোর থাকলেই হবে। দুজন দুজনকে চাইলেই হবে এবং তারা চায়। তারা চায় তাদের কোনো অশুভ দূরত্ব ছুঁতে না পারুক। তারা চায় এভাবেই যেনো তারা একসাথে বাকি জীবন পারি দিতে পারে। একসাথে জীবনের সকল উঠানামায় একে অপরের ছায়া হয়ে থাকতে পারে। ডান্স শেষ করে নিয়াজ জাফরিনকে জড়িয়ে ধরে আছে অনেকক্ষন। হঠাৎ করে নিয়াজ জাফরিনকে কোলে উঠিয়ে নেয়। জাফরিনও নিয়াজের গলা জড়িয়ে ধরে রাখে। বিছানায় গিয়ে রাখে জাফরিনকে। নিয়াজ জাফরিনের কপালে আদর দিয়ে বললো
” ধন্যবাদ জান আমার জীবনে আসার জন্য। ভেঙে যাওয়া এই মানুষটাকে আবার টেনে তুলে নিজের বুকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। আমাকে ভালোবাসার জন্য”।
জাফরিন বলে,
“আজকে আমার তোমার কাছে একটা রিটার্ন গিফট চাই “।
নিয়াজ বললো,
” একবার বল কি চাই তোর। সব কিছু তোর পায়ে এনে রেখে দিবো “।
জাফরিন খিলখিল করে হাসে। নিয়াজ জাফরিনের গলায় ঠোঁট ছুইয়ে বলে,
” হাসছিস কেনো? পারবো কিনা সন্দে’হ আছে নাকি”?
জাফরিন নিয়াজের ডান হাতটা তার পেটের কাছে এনে রাখলো। বললো,
” যা চাই সে পায়ে নয় এখানে এসে থাকবে। একটা বাবু দাও আমাকে। তোমার মতোই একটা ছোট্ট টসটসে কমলা লেবু চাই আমার “।
নিয়াজ অবাক হলো সাথে তার চোখে পানিও আসলো যেনো। দুনিয়ার সবচেয়ে দামি উপহার চাইছে জাফরিন। নিয়াজ বললো
” মাত্রতো বিয়ে হলো। বিদেশে একটা সুন্দর ক্যারিয়ার রেখে দেশে এসেছিস। এখনই বাবু নিতে চাইছিস? পারবি সামলাতে?
জাফরিন বললো,
” আমি ক্যারিয়ার নিয়ে আগেও কঠিন হয়ে ভাবিনি এখনো ভাবি না। আমার স্বামীর ঢের কামাই আছে আমাকে সুখে রাখার জন্য। আর বাচ্চা হলেই ক্যারিয়ারে সমস্যা হবে এইটা আমি মানিনা। যদি হয়েও যায় তাহলে ছেড়ে দিবো সব। আগে আমার বাচ্চা তারপর ক্যারিয়ার”।
নিয়াজ বললো,
” বাচ্চার জন্য তোমাকে ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে হবে না। বাচ্চার জন্য তার বাবা, দাদী, নানা- নানী সবাই আছে। তোমার জন্য আমি আছি। জীবনে সবই গুরুত্বপূর্ণ৷ মেয়েদের জন্য নিজের পায়ে দাড়ানোটাও অনেক জরুরি। শুধু দরকার একটু সাপোর্ট আর বোঝাপড়া”।
জাফরিন বলে,
” তাহলে দাও আমার রিটার্ন গিফট”।
নিয়াজ জাফরিনের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। পুরো মুখ জুড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে আদর করলো। ঠোঁটের সাথে ঠোঁট মিশতেই জাফরিন নিয়াজের শার্ট আকঁড়ে ধরলো। বেশ কিছুক্ষণ পর ঠোঁট জোড়া ছেড়ে দিয়ে জাফরিনের কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
” রিটার্ন গিফটটা চলো তোমাকে দেওয়া যাক তাহলে “।
চলবে…….

