#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ১৮
#লেখনীতে_তানিয়া
” তোমাকেইতো ভালোবাসতাম শুরু থেকে। তোমারইতো প্রেমিক পুরুষ হতে চেয়েছিলাম জীবনের শেষ মুহুর্ত অবধি। ভালো স্বামী হওয়ার চেষ্টাতো তোমার জন্যই করতাম। তুরফা তুমি শুধু নিজের জেদ, অহং”কার, অবুঝপনা আর বোকামির জন্য আমাদের সম্পর্কটাকে অসম্মান করেছো। ছোট করেছো আমাকে সাথে আমার ভালোবাসাকেও। পুরো দুনিয়ার সামনে নিজের চরি”ত্রের দিকে আঙুল উঠিয়েছো। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অ”পবিত্র করেছো। আমি শুধু এইটুকু জানতে চাই তোমার কাছে বিনিময়ে তুমি জীবনে কি সুখ পেলে এসব করে? আজ তুমি দুনিয়ার অন্য প্রান্তে একা একা লড়াই করছো জীবনের কঠিন মুহুর্তের সাথে। আজ সেই মানুষগুলো কোথায় যার জন্য আমার তোমার বিচ্ছেদ হলো? কেমন কা”টে তোমার এখনকার রাত আমার জানতে ইচ্ছে করে? রাতে যখন ঘুম আসতো না তখন বিড়ালের বাচ্চার মতো আমার বুকে গুটিসুটি দিয়ে ঢুকে যেতে। এখন কোথায় সেই বুকের উষ্ণতা খুঁজে পাও? মনে আছে তুরফা পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গেলে আমায় তুমি কাঁচা ঘুম থেকে উঠিয়ে বলতে মাথা ধরেছে টিপে দাও। এখন তোমার এই কঠিন সময়ে তুমি কাকে পাশে পাচ্ছো তুরফা? কেনো করলে এমন? আমি কি এতোটাই তোমার কাছে তুচ্ছ ছিলাম?
নিয়াজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে একমনে প্রশ্ন করে যাচ্ছে তুরফার ছবির দিকে তাকিয়ে। আবার কখনো নিজেই নিজের সাথে বিড়বিড় করে উত্তর আওড়াচ্ছে। কতশত স্মৃতির আড়ালে কত প্রশ্ন জমা হয়ে আছে। কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই। কে দিবে উত্তরগুলো? সেই মানুষটাইতো ধোঁকা দিয়ে চলে গেছে। কিসের আশায় বেইনসাফিটা করলো সেটা সে নিজেই জানেনা। অন্যকে উত্তর দিবে কি। নিয়াজ ফোস করে শ্বাস ফেললো। মনটা প্রচণ্ড বিক্ষিপ্ত বিছিন্ন হয়ে আছে। তুরফার অসুস্থতার খবর শুনে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেছে তার। সে তার সাথে যা করেছে সেটার জন্য নিয়াজ তুরফাকে মাফ না করতে পারলেও সে কখনো মেয়েটাকে অভি”শাপ দেয়নি৷ মাফ করার চেষ্টা যে করেনি তা না। করেছে সেটাও। মাফ জিনিসটা মন থেকে না আসলে সেটা কারো বলায় কাউকে করা যায়না। সেতো ভেবেছিলো তুরফা তার নতুন জীবনে অনেক ভালো আছে। নিয়াজের কাছ থেকে যা পায়নি সেটা হয়তো যার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলো তার কাছে পেয়েছে কিন্তু ভাগ্য যে এতো নিদারুণ হবে কে জানতো। নিয়াজ কি ভেবে ফোনটা হাতে নিয়ে সেই বন্ধুকে কল করে। টেক্সট দেখার পরে নিয়াজ নিজের মধ্যেই ছিলো না। খবরটা ধাতস্থ করতে তার সময় লেগেছে। তাই বন্ধুকে হু হা কিছু জবাব দেওয়াও হয়ে উঠেনি। রিং বাজতেই কয়েক সেকেন্ড পরে সেই বন্ধুটি কল রিসিভ করে সালাম জানায়। নিয়াজও সালামের জবাব নেয়। নিয়াজ কোনো ভনিতা না করে বললো,
” দোস্ত তুই যে খবরটা বললি তুরফার অসুস্থতার সেটা কি তুই নিশ্চিত হয়ে বলেছিস? সত্যিই তুরফা এতো অসুস্থ? ওর একটা ব্যাচমেট আমার হসপিটালেই নতুন জয়েন করেছে কিছুদিন আগে। সেতো বলেছিলো তুরফা পি এইচ ডি করতে দেশের বাহিরে গেছে। তাহলে এই অসুস্থতার খবর? আমার কিছুই বুঝে আসছে না”।
নিয়াজের বন্ধু বললো,
” আমরাও এমনই জানতাম। বিশেষ করে তোর আর তুরফার মাঝে যা হয়েছে সেটার জন্য আমরা সবাই অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। তুরফার ওই বিষয়টা এতো বাজে ভাবে ছড়িয়েছিলো সে ওর পুরো পরিবারের ভীষণ সম্মানহানি হয়৷ বিশেষ করে তুরফার বাবার। এতো সিনিয়র একজন নামকরা ডাক্তার। অনেক ভোগান্তিও পোহাতে হয় কিন্তু মা -বাবা হয়ে সন্তানকেতো আর ফেলে দিতে পারেনা৷ তারাও পারেনি। আসলে তুই যা শুনেছিলি সেটা আমরাও শুনেছি। তুরফার বাবা আর আমি একই হসপিটালে আছি এখন। আমি এম ফিল এর রেসিডেন্ট হিসেবে তার সুপারভিশনেই আছি। ইদানীং স্যারকে খুব চিন্তিত দেখা যায়। চোখে মুখে সারাক্ষণ একটা উৎকন্ঠা। একদিন কোর্স রিভিউ করতে গিয়ে কৌতুহলবশত জিজ্ঞেস করেই ফেললাম স্যার আপনাকে অনেক চিন্তিত দেখা যায় আজকাল। কিছু নিয়ে কি খুব ডিস্টার্বড? স্যার খুব আফসোস করে বললেন যে মেয়েকে তিনি কোনোদিন ফুলের টোকাটাও লাগতে দেননি সেই আদরের মেয়েটা তার অসুস্থ। এতো বড় একটা কান্ড হওয়ার পরেও যাকে নিজের থেকে আলাদা করতে পারেনি সেই মেয়েটা আজকে জীবন মৃ”ত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিদিন একটা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
নিয়াজ যেনো জমে গেলো। প্রতিটা কথা তার বুকে হাহাকার তৈরী করছে। সেওতো অনেক আদরে রাখতো তুরফাকে। যখন যা চেয়েছে যেভাবে চেয়েছে কোনো কিছু পূরন করতে বাদ রাখেনি। নিয়াজ নিষ্প্রাণ গলায় বললো,
” তারপর কি হলো”?
নিয়াজের বন্ধু ফের বলা শুরু করলো,
” আমি জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে তুরফার? স্যার বললেন নিয়াজের মতো এতো ভালো ছেলের সাথে মেয়েটা যে অ”ন্যায়, অবিচা”র করেছে সেই শা”স্তি হয়তো খোদা দুনিয়াতেই দেখিয়ে দিয়ে আবার তার জিম্মায় নিয়ে নিবে। একজন নিরপরাধ ভালো মানুষকে কষ্ট দেওয়ার ফলই পাচ্ছে সে। তুরফার ব্রেইন টিউমার হয়েছে। সেটা ম্যালিগন্যান্ট ক্যা”ন্সারে পরিণত হয়েছে। খুব দ্রুত বডিতে ছড়িয়ে পড়ছে৷ লাস্ট স্টেইজ চলছে এখন। বিষয়টা ধরাই পড়েছে এতো দেরিতে যে খুব বেশি কিছু করতে চাওয়াটাও এখন রিস্কি। আমি জিজ্ঞেস করলাম তুরফা এখন কোথায় স্যার? উনি বললেন নিউইয়র্কে একটা হসপিটালে ভর্তি আছে। তুরফার মা সাথে আছে তার কাছে। আনি বললাম স্যার নিয়াজ কি জানে এসব কিছু? স্যার বললেন কেউই জানে না। তুরফা কাউকেই জানাতে বারণ করেছে। নিয়াজকেতো আরও না৷ ওর মনে হয়েছে এই খবরটা শুনলে নিয়াজ হয়তো মনে মনে অনেক খুশি হবে৷ তাকে নিয়ে উপহাস করবে। তার অসুস্থতার খবর শুনে আনন্দিত হবে। এজন্য সবাইকে বলেছি পি এইচ ডির জন্য বাহিরে গেছে। তবে নিয়াজের সাথে আমার কথা বলা দরকার। মেয়েটার হয়ে আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইবো। আমার মেয়েটাকে যেনো ও ক্ষমা করে দেয়”।
নিয়াজ বললো,
” তুরফাকে মাফ করতে এখনো পারিনি এইটা সত্যি কিন্তু আমি ওকে কখনো এমন কিছুর জন্য অভি”শাপ দেইনি। আমিতো এটাই চাইতাম যে আশায় ও এতোকিছু করেছে সেগুলো নিয়েই ও ভালো থাকুক। শান্তিতে থাকুক”।
নিয়াজের বন্ধু বললো,
” মানুষের জীবন খুব অনিশ্চিত নিয়াজ। কখন কার সাথে কি হবে কেউ বলতে পারে না। সব সৃষ্টিকর্তার হাতে। আমি জানি এবং বুঝিও তোর সাথে যা হয়েছে ভীষণ অবিচার হয়েছে। তারপরেও তোর যদি মনে হয় তুরফাকে মাফ করা উচিত তাহলে মেয়েটাকে মাফ করে দিস। এর বেশি কিছু বলার এখতিয়ার আমার নেই”।
নিয়াজ ফের বললো,
” তুরফার শারীরিক কন্ডিশন এখন কেমন”?
নিয়াজের বন্ধু বলে,
” স্যারতো বললো তেমন ভালো না। এখন নাকি মেডিসিনও কাজ করতে চাইছে না বডিতে। তবুও ডাক্তাররা চেষ্টা করছে”।
নিয়াজ বললো,
“ও আচ্ছা “।
নিয়াজের বন্ধু বললো,
” হ্যাঁ তাইতো স্যার বলছিলেন। আচ্ছা শোন না নিয়াজ আমার একটা ক্লাসে যেতে হবে এখন। ইদানীং ভীষণ ব্যস্ততা যাচ্ছে। থিসিস এর কাজ করতে করতে বেহাল দশা। তবুও পাশ করতে পারবো কিনা কে জানে। আমি এখন রাখছি দোস্ত। পরে আবার কথা হবে। তুই মন খারাপ করিস না। শুনলাম বিয়ে করেছিস। নতুন জীবনের জন্য শুভ কামনা বন্ধু। এখন একদমই সময় নেই। না হলে আরও কথা বলতাম। এখন রাখি হ্যাঁ “।
নিয়াজ বললো,
” আচ্ছা আবার পরে কথা হবে “।
নিয়াজ কান থেকে ফোনটা নামিয়ে পকেটে রেখে দেয়। উদাস হয়ে বাহিরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো। আকাশে মেঘ জমেছে। বৃষ্টি হবে। অভিযোগ এর দূরে বললো খোদা একটা সুস্থ জীবনের দাম অনেক তাইনা? হঠাৎ করে সব এলোমেলো হয়ে গেলো। নতুন জীবনে পা দিয়েও পুরনো ভালোবাসার স্মৃতি পিছু ছাড়ছে না। বুক থেকে একটা দীর্ঘশাস আসলো নিয়াজের। ঘরে ঘুমন্ত বউ রেখে বাহিরে এসে প্রাক্তন বউকে নিয়ে হা হুতাশ করছে। নিজের উপর বিরক্তও লাগছে আবার খারাপও লাগছে এই ভেবে যতই হোক তুরফাতো তার কেউ ছিলো একসময়। ভুলতে চেয়েও ভুলে যাওয়াটাই আর হচ্ছে না। অনেকটা সময় হলো সে বারান্দায় এসেছে। জাফরিনের কাছে যাওয়া দরকার। বর্তমানকে আকড়ে ধরা দরকার। এখন জাফরিনই সব তার জীবনে। মেয়েটাকে ক”ষ্ট দেওয়া যাবে না। দিতে পারেনা সে। না জেনে না বুঝে অনেকতো দিয়ে ফেলছে। নিয়াজ গুটি গুটি পায়ে ঘরে ঢুকলো। নিয়াজ দেখলো জাফরিন এখনো ঘুমাচ্ছে। জাফরিনের কাছে গিয়ে আধশোয়া হয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। চুলের ভাজে নিয়াজের হাতের ছোঁয়া পেতেই জাফরিন এর ঘুম আলগা হয়ে গেলো। চোখ মেলে চাইলো সে নিয়াজের দিকে। নিয়াজ একটা নরম হাসি দিলো আর বললো,
” ঘুম কেমন হলো? বিকেলে বাহিরে যাওয়ার কথা ছিলো যে? যাবি না”?
জাফরিন চুপ করে আছে। নিয়াজের দিকেই তাকিয়ে আছে পলক ফেলছে না। জাফরিন নিয়াজের আরও কাছে যায়। আরেকটু ঘনিষ্ঠ ভাবে মিশে যায় নিয়াজের শরীরের সাথে। নিয়াজের নাকের সাথে নিজের নাকটা ঘষে। চুলের ভাজে হাত গলিয়ে দেয়। কপালে গভীর স্পর্শ করে একটা আদর দেয়। নিয়াজ বুঝার চেষ্টা করছে বউ কি করতে চাইছে। বেশিদূর যেতে চাইছে নাকি অল্পতেই থামিয়ে দেবে? নিয়াজকে হতাশ করলো না জাফরিন। নিয়াজের মনে তুরফা নামক যে একটা দোটানা চলছে তার জন্য জাফরিন নামক সুনামির খুব প্রয়োজন এখন। জাফরিন নিয়াজের ঠোঁটজোড়া দখল করে নিলো। নিয়াজের শরীর আর মন দুটোতেই জাফরিন দ”স্যুর মতো তান্ডব করছে। জাফরিন এর সাথে সাথে নিয়াজও যেনো অশান্ত হলো। নিয়াজ জাফরিনের বুকের কাছ থেকে এলোমেলো শাড়ির আচঁল সরিয়ে একটা আশ্রয় নিতে চাইলো। জাফরিন বিনা বাক্য বেয়ে আশ্রয়ও দিলো তাকে। নিয়াজের আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না এখন। সে এই উষ্ণতায় নিজেকে হারিয়ে শীতল হতে চায়৷ অতীত বর্তমানের টানাপোড়েন নিয়ে পরেও ভাবা যাবে। এখন সে শুধু জাফরিনকে চায়। শুধু জাফরিনকে। নিয়াজ জাফরিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
” আর কত উপায়ে আমাকে অশান্ত করতে চাস তুই?
জাফরিন নিয়াজের গলায় ঠোঁট ঠেকিয়ে বললো,
” যত উপায়ে তোমার মধ্য নিজেকে তলিয়ে নিয়ে যেতে পারি তত উপায়ে “।
বাহিরে মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। তুমুল বৃষ্টিও হচ্ছে। বাতাসে জানালার সাদা পর্দা উড়ছে। আর সেই সাথে নিয়াজ নিজেকে জাফরিনের মধ্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে।
_________________________
সেদিন সন্ধ্যায় বের হয়ে টুকটাক শপিং করতে করতে অনেক কিছুই কিনে ফেললো তারা। জাফরিন বেশ এক্সসাইটেড এই বেড়াতে যাওয়া নিয়ে। স্বামীর সাথে প্রথমবার বেড়াতে যাচ্ছে সে। যেটাকে রোমান্টিক ভাষায় হানিমুন বা মধুচন্দ্রিমা বলে। মনে মনে কত কি যে ভাবছে সে। সব গুছিয়ে নিয়ে পরের দিন রাতের বেলা তারা রওনা হলো কক্সবাজারের উদ্দেশ্য। সারারাত জার্নি করে বেশ সকালে তারা পৌছাঁলো হোটেলে। নিয়াজ আগে থেকেই হোটেলে বুকিং দিয়ে রেখেছিলো। একদম সমুদ্রের কাছেই একটা অভিজাত ফাইভ স্টার হোটেলটায় উঠেছে তারা। নিয়াজ তাদের জন্য একদম সমুদ্রমুখী একটা রুম নিয়েছে। রুমের স্পেসটাও বড় সাথে বারান্দা আছে যাতে একটা ভালো সময় পার করা যায় একসাথে। অনেকটা সময় আর অনেকটা পথ জার্নি করে এসে তারা ক্লান্ত। রিসেপশন থেকে চাবি নিয়ে তারা রুমে ঢুকলো। রুমে ঢুকেই এতো সুন্দর পরিবেশ দেখে জাফরিনের মন ভালো হয়ে গেলো। শরীরের ক্লান্তি আধা নেমে গেলো। ঘুরে ঘুরে দেখলো ঘরটা। সবচেয়ে বেশি যেটা পছন্দ হয়েছে সেটা হচ্ছে রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা। যেটা সমুদ্রের এক অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়। নিয়াজ তাদের ব্যাগপত্র রুম সার্ভিস থেকে নিয়ে তাকে বিদায় জানিয়ে রুমে ঢুকে দেখে জাফরিন এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে। নিয়াজ বললো,
” রুম পছন্দ হয়েছে”?
জাফরিন চোখে মুখে উচ্ছাস নিয়ে বললো,
” খুউউব পছন্দ হয়েছে। অনেক সুন্দর। অনেক বেশি সুন্দর “।
এই বলে জাফরিন নিয়াজকে জড়িয়ে ধরে। নিয়াজ আর কিছু বলে না শুধু পিঠে হাত বুলিয়ে দেয় । চুপচাপ হয়ে যায় তখনকার মতো পরিবেশ। ফ্রেশ হতে হতে দুপর হয়ে যায়। লাঞ্চ শেষ করে দুজনের কারো এই রোদের মধ্য সমুদ্র বিলাস করার সাহস হলো না। ক্লান্তিতে জাফরিনের ঘুম পাচ্ছে। তাই ঠিক করলো বিকেলের দিকে ঘুরতে বের হবে তারা। এর আগে কিছুক্ষণ ঘুমানো দরকার। রুমে এসে ঘুমানোর জন্য দুজনেই শুয়ে আছে ঠিকই কিন্তু কেনো যেনো নিয়াজের ঘুম পাচ্ছে না কিছুতেই। জাফরিন ঘুমিয়ে গেছে খুব দ্রুতই। নিয়াজ মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতেই ঘুমিয়ে গেছে। বাহির থেকে সবই ঠিক আছে এরকমটা দেখাচ্ছে নিয়াজ কিন্তু ভেতর থেকে এক অদৃশ্য বিষাদে মন ভারি হয়ে আছে। এপাশ ওপাশ করলেও কিছুতেই মন স্থির হচ্ছে না। শেষে বিছানা ছেড়ে উঠেই পড়লো সে। ঘরের এক কোণায় সোফা পাতানো আছে। যেখান থেকে বাহিরে রাস্তা আর সমুদ্র দেখা যায়। নিয়াজ গিয়ে বসলো সেখানে। বাহিরে তাকালো। অনেকক্ষন তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবলো। তারপর চোখ ফিরতেই বিছানায় তার ঘুমন্ত বউকে দেখলো সে। নিয়াজের মস্তিষ্কে অদ্ভুতভাবে যেনো একটা ধাক্কা খেলো। গত কয়েকমাসে পেছনে ঘটে যাওয়া সব কিছু যেনো ডায়েরির পাতার মতো চোখের সামনে ভাসতে লাগলো তার। শেষে গিয়ে নিয়াজ একটা কথাতেই নিজেকে থিতু করলো,
” জাফরিন তার স্ত্রী। তার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। সেখানে তুরফার আর কোনো জায়গা নেই। নেই মানে একদম নেই। প্রাক্তনকে কখনো বর্তমানের সাথে মেলাতে নেই। তুলনা করতে নেই। প্রতিটা মানুষের নিজস্ব জায়গা আছে। জাফরিনের জায়গা জাফরিন এর জন্যই বরাদ্দ। সেখানে দ্বিতীয় কারো স্থান নেই। মানুষ হিসেবে তুরফার জন্য সহানুভূতি থাকলেও তাকে আর মন মস্তিষ্কে জায়গা দেওয়া যাবে না। তাহলে জাফরিনকে ঠকানো হবে। নিয়তির লিখন এটাই ছিলো। এটাই হয়েছে “।
নিয়াজ লম্বা একটা শ্বাস নিলো। ধীরে ধীরে সেই শ্বাসটা ছেড়ে দিলো। এখন ভালো লাগছে তার। হালকা লাগছে। বিছানায় আবার গা এলিয়ে দিলো। অদ্ভুত লাগলেও সত্য নিয়াজের এবার ঘুম পেলো। শুধু ঘুম না বেশ ঝরঝরে একটা ঘুম। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে দুজনে ঘুরতে বের হলো। জাফরিন ওয়েস্টার্ন স্টাইলের একটা লং কুর্তি পড়েছে। চুলটাও সুন্দর করে বেধেঁছে ক্লিপ দিয়ে। দেখতে সুন্দর লাগছে। নিয়াজ বললো,
” তোকে বিদেশি পুতুল এর মতো লাগছে “।
জাফরিন বললো,
” আমিতো পুতুলই। তোমার পুতুল বউ “।
নিয়াজ হঠাৎ করে দুষ্টমি করে বললো,
” স্ট্যাচু”
জাফরিন বুঝে নিয়ে স্ট্যাচু হয়েও গেলো। এখন সত্যিই জাফরিনকে একটা পুতুলই লাগছে। জীবন্ত পুতুল। নিয়াজ কয়েকটা ছবি তুললো ফোনে। এরপর তার পুতুল বউয়ের একদম কাছে গিয়ে টুকুস করে গালে আর ঠোঁটে গভীর করে আদর দিলো। বললো,
” এই সুযোগ মিস করলে পা”প হতো। রিলিফ জাফরিন “।
জাফরিন স্বাভাবিক হয়ে একটা শ্বাস ফেললো। বর তার পুতুল হওয়ার সুযোগ নিয়েছে। সেও এটার শোধ নিবে তবে বলে কয়ে নয়। দুজনে ঘুরতে বের হলো। সম্মুদ্রের পাড়ে একে অপরের হাত ধরে হাঁটছে তারা। সমুদ্রের পানি তাদের পায়ের কাছে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে। ভালো লাগছে। বাতাস হচ্ছে। গরম কম লাগছে।নিয়াজ জাফরিনের কয়েকটা ছবি তুলে দিলো। জাফরিনও তুললো। জাফরিন বালুর মধ্য বসে একটা ক্যাসেল বানিয়ে ফেললো। নিয়াজ বেশ অবাক হলো। নিয়াজ বললো,
” বাহ্ ক্যাসেলতো দারুন বানিয়েছিস “।
জাফরিন হেসে বলে,
” এইটা জাফরিন আর নিয়াজের ক্যাসেল “।
নিয়াজ বললো,
” একটা ছবি তুলে নেই। খোদা তোর এমন একটা ক্যাসেল বানানোর ইচ্ছা পূরন করুক”।
নিয়াজ কয়েকটি সেলফি আর ছবি তুললো তার আর জাফরিনের। একটা দুটো করতে কত রকমের ছবি যে তারা তুলেছে একদিনেই। নিয়াজ ভালো ছবি তুলতে পারে। ফোনটাওতো বেশ দামি। ছবি উঠেছেও ভালো। ফটোগ্রাফার দিয়ে ছবি তারা উঠালো না। যদিও নিয়াজ বলেছিলো তুলতে। জাফরিন চাইলো না। ওর ভ’য় লাগে এভাবে র্যান্ডম কারো ক্যামেরায় ছবি তুলতে। বিষয়টা আসলেই ঠিক। সুন্দর কিছু মুহুর্ত উপভোগ করে ঘোরাঘুরি শেষ করে বাহিরেই তারা ডিনার করলো। ডিনার শেষে রুমে ফেরার জন্য হোটেলে ঢুকবে। জাফরিন কিছুটা এগিয়ে গেছে। নিয়াজ পেছনে পেছনে আসতেই কেউ নিয়াজের নাম ধরে ডেকে বললো
” ডাঃ নিয়াজ ”
চলবে………..

