#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ৭
#লেখনীতে_তানিয়া
“তুই তাহলে শেষমেষ দেখতে আসলি যে আমি বেচেঁ আছি কিনা? যেভাবে কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ করে সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে গিয়েছিলি তাতে আমার মনে হয়েছিলো তুই যেনো এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারলি বাচিঁস। ফিরলি তাহলে। যাক এতো দিনের অপেক্ষার অবসান হলো। আমিতো প্রায়ই ভাবি তুই আর ফিরবি না এজীবনে”।
ডোরবেল বাজাতেই কয়েক সেকেন্ড এর মধ্য দরজা খুলে নিয়াজ অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু বহুল অপেক্ষিত এক নারীকে দেখতে পেলো। যাকে সে এই মুহুর্তে দেখবে বলে কল্পনাও করতে পারেনি। ভূ” ত দেখার মতো চমকে উঠলো সে। হঠাৎ করে বুকের মধ্য যেনো একটা ছোট খাটো ভূমি” কম্প হয়ে গেলো। নিয়াজ নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে কি ভুল দেখছে? ক্লান্ত শরীর বলে তার ভ্রম হচ্ছে। এটা ঠিক করে বুঝতেই সে শার্টের পকেটে থাকা চশমাটা বের করে চোখে দেয়। না কোনো ভ্রম নয় সত্যিই দেখছে সে। স্পষ্ট এবং বাস্তবেই সেই মেয়েটা তার চোখের সামনে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। নিয়াজকে হতভম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি বললো,
” তুমি কি এভাবেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি ঘরের ভেতরেও আসবে? এমন ভাবে ফ্রিজ হয়ে আছো যেনো আমাকে জীবনে প্রথম দেখলে”।
মেয়েটার কথায় নিয়াজের ঘোর কা”টে। সে এই চঞ্চল মেয়েটাকে অনেক মিস করেছে এতো বছর। ছোট বেলা থেকে মেয়েটাকে বড় হতে দেখেছে সে। প্রায় এক সাথেই বড় হয়েছে। খুবতো বেশিদিন বয়সের তফাত না। গুনে গুনে চার বছর। মেয়েটি আর কেউ নয় নিয়াজের চাচাতো বোন জাফরিন। প্রায় পাচঁটা বছর পর মেয়েটাকে দেখছে সে। নিয়াজের বিয়েতে জাফরিন উপস্থিত ছিলোনা। কাকতালীয়ভাবে সেদিনই সে বিদেশে পড়তে চলে যায়। তারপর একে একে পাচঁটা বছর চলে গেলো। নিয়াজকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাফরিন আবার ডাকলো,
” ভাইয়া ভেতরে আসো। এসেওতো আমাকে দেখা যায়। আমিতো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না”।
পালিয়ে যাওয়ার কথা শুনেই উপরের কথাগুলো বললো নিয়াজ। নিয়াজের গলায় বেশ ক্ষোভ তা বুঝলো জাফরিন। ঠোঁট এলিয়ে হাসলো সে। তারপর বললো,
” পালিয়ে যাবো কোথায়? ফিরেইতো এলাম। যদিও ফেরার ইচ্ছে ছিলো না কিন্তু তোমার চাচী এক প্রকার ব্ল্যাক”মেইল করে নিয়ে এসেছে। আমি না আসলে তিনি খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়ে অনশন করতে শুরু করবেন এমন কিছু বলেই এনেছে। তাই অনেক তাড়াহুড়ো করেই এসেছি”।
নিয়াজ উত্তরে বললো,
” কখন এসেছিস? আমিতো টানা দুদিন ধরে হসপিটালেই ছিলাম। তুই যে আসবি জানিনাতো। কেউ আমাকে বলেনি। তা হলেতো তোকে এয়ারপোর্টে নিতে যেতাম “।
জাফরিন আবার হাসে। নিয়াজ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে সে যেনো একটা জোকস বলেছে। সেটা শুনতে বেশ ভালো ছিলো তাই সে হাসছে। জাফরিন বললো,
” কেউ তোমাকে কি করে বলবে? কেউতো জানেই না যে আমি আসবো। হঠাৎ করে এসে সবাইকে সারপ্রাইজ দিয়েছি”। গতকাল রাতে এসেছি। বড়মা বললো তুমি হসপিটাল নিয়ে বেশি বিজি থাকো ইদানীং। কাজের চাপে বাড়ি ফেরার সময় খেয়াল থাকে না। কখন আসো তার ঠিক নেই। তাই আর তোমাকে ফোন করে জানানো হয়নি। এতো কাজ করলেতো নিজে অসুস্থ হয়ে পড়বে। তখন রোগীদের সেবা দিবে কিভাবে”?
নিয়াজের কাজের মাত্রা বেড়ে গেছে এটা ঠিক। তার বাড়ি আসার আসলেই কোনো বাধা ধরা নিয়ম নেই এখন। কখন যায় কখন আসে ঠিক নেই। ইচ্ছে করেই সে এমন করে। বেশি বেশি কাজ নেয়। কাজের মধ্য থাকলে সবকিছু ভুলে থাকে সে। বাড়ি ফিরে একা থাকলেই তার পুরনো কথা মনে পড়ে। খারাপ লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। হাসফাস করে। তাই কাজে ব্যস্ত সময় পার করে। কাউন্সিলিং করিয়েছে সে নিজের। পুরনো কথা ভুলতে নতুন কিছুকে জায়গা দিতে হবে কিন্তু সে এখনো সেখানেই পড়ে আছে। এতো সহজে কি সব ভুলে যাওয়া সম্ভব? সেগুলো রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। রাত বাড়লে সেগুলো মন মস্তিষ্কে জেঁকে বসে। কিছুতেই ঘুমাতে দেয়না। স্থির থাকতে দেয়না। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে জাফরিন বললো,
” কি ভাবছো”?
নিয়াজ স্মিত হেসে বলে,
” না কিছু না। ডাক্তারদের জীবন এমনই। কাজের কোনো শেষ নেই”
জাফরিন বললো,
” তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। চোখ মুখ শুকনো লাগছে। ফ্রেশ হয়ে খেতে আসো। আমি বড়মাকে গিয়ে বলি তুমি এসেছো। আমার মায়ের সাথে গল্প করছে। কি যে গল্প করে ওরাই ভালো জানে”।
নিয়াজ উপরে নিচে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। যেতে যেতে বলে,
” মাকে ডিম আর আলু সিদ্ধ করার কথা বলিসতো সাথে শুকনো।মরিচ কড়কড়ে করে ভাজতে বলবি। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। ক্ষু”ধা লাগছে “।
জাফরিন বিরবির করে বলে,
” ছেলে দুদিন ধরে ঘরের বাহিরে বলে মা ভালো ভালো খাবার রান্না করলো। আর এই ছেলে ডিম আলু সিদ্ধ করতে বললো। হয়তো খিদে পেটে এটাই খেতে মন চেয়েছে। বড়মাকে আবার কষ্ট করে রান্নাঘরে যাওয়ার কি দরকার। এইটাতো আমি নিজেই করতে পারি”।
ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে নিয়াজের আসতে প্রায় আধঘন্টার মতো লাগলো। একটা লম্বা শাওয়ার নিয়েছে সে। সারাদিনে হসপিটালে দৌড় ঝাঁপ তার মধ্য ময়নার মেয়েটার ঘটনা সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিলো তার। শেষ খবর পাওয়া অবধি মেয়েটার এখনো জ্ঞান ফেরেনি। অবস্থা নাজুক। যেকোনো মুহুর্তে কিছু একটা হতে পারে। এটাই জীবন আর এটাই নিয়তির এক নিদারুণ পরীক্ষা। খাবার টেবিলে এসেই নিয়াজ তার মায়ের দেখা পেলো।চাচী বাড়ি চলে গেছে তাদের। পাশাপাশি দুটো ফ্ল্যাট। নিয়াজের ছোট চাচা ব্যবসায়ী মানুষ। তার উপর তার আর চাচীর দুজনেরই ডায়াবেটিস আছে। তাই তারা রাত আটটার মধ্যই খাওয়া দাওয়া সেরে ফেলে। যত অনিয়ম সব নিয়াজই করে নিজের জন্য। মাকে দেখেই নিয়াজ বলে,
” আমার জন্য অপেক্ষা করে নিজেও খাওনি এখনো? রাত কত হয়েছে দেখেছো? বয়স হচ্ছে এরকম অনিয়ম করলে কেমনে কি মা? তোমাকেতো বলেছি আমার ফেরার কোনো ঠিক নেই। তুমি সময়মতো খেয়ে নিবা। তোমার ওষুধ থাকে প্রেশারের। কথা শোনো না কেনো?
নিয়াজের মা অভিমানের সুরেই বলে,
” দুই দিন ধরে তুই বাড়ি আসিস না৷ কি খাইসিস কিছুই জানিনা। তোর যাওয়া আসার কোনো সময় বুঝিনা। আজকে ছয়টা মাস ধরে তুই কখন যাস আবার কখন ঘরে ফিরিস কিছুই বুঝতে পারিনা। তোর সাথে ভালোমতো কথাও হয় না। দেখাও হয়না। ছুটির দিনেও আজকাল তোর চেম্বার থাকে। ছেলে কি খাচ্ছে এটাও মা হয়ে পাশে বসে থেকে দেখতে পারিনা”।
নিয়াজ বললো,
” কাজের চাপ থাকে মা। সরকারি চাকরি বুঝোইতো। তার উপর ডাক্তারদের সারাক্ষনই দৌড় এর উপর থাকতে হয়”।
নিয়াজের মা বললো,
” হয়েছে আমাকে তুই বুঝাস না। তুই মনে করিস মা লেখাপড়া কম জানা মানুষ। মা কে যা ইচ্ছা তাই বুঝানো যাবে তাই কিছু একটা বলে দেই। মা চুপ হয়ে যাবে। আমিতো সেই কবেই চুপ হয়ে গেছি কিন্তু আমি সবই বুঝি”।
নিয়াজ মায়ের চোখে পানি দেখতে পায়। আসলেই তার মা সবই বুঝে৷ সে যতই কিছু বলে কথা উল্টানোর চেষ্টা করুক মা তো মা। সে সবই বুঝে। নিয়াজ বলে,
” আচ্ছা ছাড়ো খেতে দাও এখন। ক্ষু”ধা লাগছে। ক্ষু’ধাতে পেটের মধ্য গুড় গুড় করতেছে”।
নিয়াজ খাবার টেবিলে দেখে হরেক রকম খাবার। সে যা যা পছন্দ করে মাছ ভাত, ভর্তা সবই আছে কিন্তু জাফরিনকে যে বললো মাকে বলতে আলু আর ডিম সিদ্ধ করতে। সে কি বলেনি ভুলে গেছে? নিয়াজ বললো,
” মা জাফরিন কি চলে গেছে? শাওয়ারে যাওয়ার আগে ওকে বলেছিলাম আলু আর ডিমসিদ্ধ করার কথা যেনো তোমাকে বলে। বলেনি? হয়তো ভুলে গেছে”।
নিয়াজের মা বলে,
” তোর সাথে জাফরিনের দেখা হয়েছে? তোকেতো বলাই হয়নি জাফরিন হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে সবাইকে সারপ্রাইজ দিয়েছে। গতকাল রাতে এসেছে। যাক ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরেছে। ওর মা কত দুশ্চিন্তা করতো ওরে নিয়ে। আমি আর ওর মাতো গল্প করছিলাম ঘরে। কই ওতো কিছু বলেনি আমাদের। দেখতেইতো পাচ্ছিনা”।
তখনই রান্নাঘর থেকে জাফরিন বের হয়ে এসে বলে,
” এই যে আমি। রান্নাঘরে ছিলাম। আলু আর ডিম সিদ্ধ করতে। ভাইয়া খাবে বললো। তুমিতো এই গরমে সারাদিন রান্নাঘরে ছিলে। তাই ভাবলাম এটা আমিই করি। এই আর কি এমন। ভাইয়া খেতে বসেছে? দেরি হয়ে গেলো নাকি”?
নিয়াজ বেশ অবাক হলো। জাফরিন মা কে না বলে নিজেই গেছে রান্নাঘরে। মেয়েটার দিকে তাকালো সে। কপালে বিন্দু বিন্ধু ঘাম জমেছে। গরমে রান্নাঘরে কাজ করতে গিয়ে। ঠিক ও যা বলেছিলো তাই করে এনেছে সে। আলু আর ডিম সিদ্ধ তার সাথে শুকনো মরিচ কড়কড়ে করে ভাজা। আবার একটু রসুন পেয়াঁজও কুচি করে এনেছে। নিয়াজের মা বললো,
” তুই গেছিস কেনো এই গরমে রান্নাঘরে। কালই বাড়ি এসে আজকেই রান্নাঘরের তাপে যেতে হবে? আমাকে বলতে পারতি”।
জাফরিন বললো,
” বিদেশে নিজের কাজ নিজেকেই করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি বড়মা। ওখানেতো সবই নিজেই করতে হয়। গরম শীত বলে কিছু নেই। নিজের খাবার রান্নার জন্য চুলার কাছে যেতেই হয়। এটা আর কি কাজ ছিলো এমন?
ছেলের প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বলে,
” জাফরিন মা তুইও বসে পর এক সাথেই। তুইও খাস নাই। তোর পছন্দের চিংড়ি ভর্তা করছি আজকে খাবারে। তুই কত পছন্দ করিস এটা আমার মনে আছে”।
জাফরিন তার বড় মা কে মুখের উপর না করতে পারলো না কিন্তু তার অস্বস্তি হচ্ছে নিয়াজের সাথে খেতে। সে মুখে বলতে পারছে না। তবুও কি আর করার বড় মানুষ বলেছে। খেতে বসলো তার সাথেই। প্লেটে হাতে নিতে যাবে তখনই নিয়াজ তার খাবারের প্লেটটা জাফরিনের দিকে এগিয়ে দিলো। প্লেটের দিকে তাকাতেই মেয়েটা যারপর নাই অবাক হয়ে গেলো। নিয়াজ তার জন্য শুকনো মরিচ এর ঝালভর্তা দিয়ে গরম ভাত মাখিয়ে দিয়েছে আর সাথে ডিম আলুর ভর্তা। যেটা জাফরিনের অনেক পছন্দ কিন্তু সবার হাতের না। শুধু নিয়াজের হাতেরই। জাফরিন এ বাড়ি আসলেই নিয়াজের কাছে বায়না করতো এভাবে ভাত মাখিয়ে দেওয়ার। এই নিয়ে একটা গল্পও আছে যদিও। জাফরিন প্লেট দেখে বললো,
_” তোমার এখনো মনে আছে”?
_ “ভুলে যাইনিতো যে মনে থাকবে না।
_ তারপরেওতো কত বছর হয়ে গেলো এসব এর। আরওতো মানুষ ছিলো তোমার জীবনে। তাদের কথা মনে রাখতে গিয়ে ভুলে যাওয়ার কথা। তাই বলছিলাম।
_” আমার সবকিছুই মনে থাকে। নিজের ভুল থেকে শুরু করে কার কি পছন্দ অপছন্দ সবই মনে থাকে।
জাফরিন আর কিছু বললো না। চুপচাপ খেতে লাগলো। এক লোকমা মুখে দিতেই তার কত স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। বিদেশে পড়তে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম খাবার খেতে খুব অসুবিধা হতো। খেতেই পারতো না। লন্ডনে বার এট ল করতে গিয়েছিলো। যাকে সোজা ভাবে বলে বলে ব্যারিস্টার হওয়া। দেশের খাবার অনেক মিস করতো সে। সেখানে জাফরিন শুরুর দিকে হোস্টেলে থাকতো। খাবারে তেমন ঝাল মশলা থাকতো না। এমনও দিন গেছে খাবার খেয়ে বমি করেছে। সারাদিন পেটে কিছুই পড়েনি। তারপর দোকানের কেনা খাবারই একমাত্র ভরসা। সেখানেতো এখানের মতো কেউ সেধেঁ মাথায় হাত বুলিয়ে প্লেটে খাবার নিয়ে রেডি থাকে না। সেসব দিনও পার হয়ে গেছে। তবু যেটার জন্য সব ছেড়ে চলে গিয়েছিলো সেটা কিছুতেই তার পিছু ছাড়েনি। আজও তাড়া করে বেড়ায়। জফারিন না খেয়ে অন্যমনস্ক হয়ে এসবই ভাবছিলো। নিয়াজ লক্ষ্য করলো ব্যাপাটা। একটু জোরে ডাক দিয়ে বললো,
” জাফরিন? কি ভাবছিস খেতে বসে? ঝাল বেশি হয়ে গেছে?
জাফরিন না সূচক মাথা নাড়ালো। হেসে বললো,
” পাচঁ বছর পর তোমার হাতের মাখানো ভাত খাচ্ছি। তাই আগের অনেক কিছু মনে পড়ে গেলো”।
নিয়াজ বলে উঠে,
“যাক ভুলিসনি তাহলে। আমিতো ভাবছিলাম আমাকে ভুলেই গেছিস”।
জাফরিন নিরবে নিভৃতে একটা লম্বা শ্বাস নেয়। তারপর মনে মনে বলে
” ভুলে যাওয়া কি খুব সহজ? চাইলেই কি সবাইকে ভুলে থাকা যায়”।
দুজনের খাওয়া বাদ দিয়ে গল্প বাড়তেছে দেখে নিয়াজের মা তাড়া দিলেন দ্রুত খাবার শেষ করার জন্য। আগে খাবার খেয়ে তারপর গল্প করতে বললো। গরম খাবার ঠান্ডা হলে ভালো লাগে না। তারপর তাদের আর কোনো কথা হয়নি। দুজনেই চুপচাপ খেয়ে দেয়ে নিজেদের ঘরে চলে যায়। জাফরিন বেশিক্ষণ নিয়াজের মুখোমুখি হতে চায়না। যেনো নজর এড়িয়ে যেতে পারলে বাঁচে। নিয়াজের কাছেও যে বিষয়টা এড়ালো না তা না। দুজন মুখোমুখি হলেই জাফরিন কেন যেনো চোখ সরিয়ে নেয়। পালাই পালাই করে। নিয়াজ ভাবলো অনেকদিন পর এসেছে তাই হয়তো অস্বস্তি হচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন পর নিয়াজ ছাদে চলে গেলো। উদ্দেশ্য কিছুক্ষণ হাটাহাটি করা ছাড়াও আরেকটা আছে। সেটা হচ্ছে সিগা”রেট খাওয়া। এই অভ্যাস তার ছিলো না। তুরফার সাথে ডিভোর্স হওয়ার পর থেকেই হয়েছে। বাড়িতে খায় না। নিয়াজের মা জানলে কুরুক্ষেত্র করবে৷ নিয়াজ কখনও এসব এর ধারের কাছেও ছিলো না। পরিস্থিতি মানুষকে কত কিছুর দাস বানিয়ে ফেলে। যেই না সিগা”রেট ধরিয়ে মুখে পুরবে ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো,
” Smo”king is inju”rious to health “.
নিয়াজ চমকে উঠলো। হুটপাটে ধাতস্থ হতে গিয়ে ঠোটেঁ কিছুটা তাপও লাগলো। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশ ফিরে দেখে জাফরিন দাঁড়িয়ে৷ জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে। কৌতুহল নিয়ে৷ আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললো
” যে ছেলে জীবনে এসবের ধারের কাছেও যায়নি সে এখন এসব খায়। কি অদ্ভুত ব্যাপার। বড় মা জানে “?
নিয়াজ দমে গেলো না। সিগারেট মুখে নিয়েই সোজাসাপ্টা বললো,
” জানলে নিজের ঘরেই বসে খেতাম। ছাদ এসে খেতাম না”। তা ব্যারিস্টার সাহেবা আপনি কি মনে করে এতো রাতে ছাদে এসেছেন”? মেয়েদের রাতে ছাদে আসতে নেই জানেন না?
জাফরিন বললো,
“গরম লাগছিলো তাই হাওয়া খেতে ছাদে এসেছিলাম। মাত্র রাত এগারোটা বাজে। এটা আর কি সময়? বিদেশেতো সারারাতই মানুষ জাগে কোনো না কোনো কারনে। অভ্যস্ত এসবে”।
নিয়াজ বললো,
” একেবারে ফিরেছিস নাকি আবার উড়াল দেওয়ার মতলব আছে”?
জাফরিন হেসে বললো,
” দেখি কি করা যায়। কিছু বলতে পারছি না এখনই। তবে থেকে যাওয়ার কোনো কারন নেই “।
জাফরিন চলে যেতে নিলেই নিয়াজ তাকে ডাকলো,
– জাফরিন?
_হুম বলো।
_”কত দিন পর দেখা হলো আমাদের”?
_ এইতো গুনে গুনে পাচঁ বছর।
_যে মেয়ে আমাকে ছাড়া এক সময় কিছুই বুঝতি না সেই মেয়ে আমাকে না দেখে কথা না বলে পাচঁটা বছর পারি দিলি কি করে সেটাইতো বুঝে উঠতে পারিনা।
_ ভুল বললে। কথা হতোতো তোমার সাথে।
_হ্যাঁ সেই কথা হতো। ছয় মাসে একবার। তাও আমি যদি নিজে ফোন করতাম। আমাকে ভুলে গেছিস?
_ তোমারতো কথা বলার মানুষ ছিলো। আমার সাথে কথা না বললেও তোমারতো বিশেষ কোনো খারাপ লাগতো না।মানুষতো একান্ত ব্যক্তিগত মানুষ এর সাথেই কথা বলতে বেশি পছন্দ করে। তোমাকে ভুলবো কেনো? তোমার সাথে কি আমার ভুলে যাওয়ার সম্পর্ক বলো?
_ একান্ত ব্যক্তিগত মানুষ?? মানুষ জীবনে অনেক ভুল করে। সেই ভুল শুধরেও নেয় কিন্তু আমি ভুল করিনি যে শোধরাতে পারবো। আমি নিজের সাথে অ”ন্যায় করেছি। সেটাকে পা” পও বলা যায়।
আকাশে মেঘ করেছে। কিছু বুঝার আগেই হঠাৎ করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। বর্ষাকাল চলছে। বৃষ্টি হওয়ার ঠিক নেই।
_ যাক ছাড়ো এসব কথা। মানুষ মাত্রই ভুল। যা হয়ে গেছে দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাও। দেখো কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে। চলো ভিজি। ভিজবে?
_ বলছিস? চল তাহলে। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয়না।
নিয়াজ অনেকদিন পর গুনগুন করে উঠলো।
” আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে মনে পড়লো তোমায়………
চলবে………….

