#তুমি_বৃষ্টি_হয়ে_নামলে
#পর্বঃ১১
#লেখনীতে_তানিয়া
কফিশপে নিয়াজকে একটা মেয়ের সাথে হেসে কথা বলতে দেখে বেজায় রাগ হলো জাফরিনের। পুরনো সেই কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। সেই সাথে অদ্ভুত এক ভ”য়ও চেপে ধরলো তাকে। কিন্তু কেনো? সেতো আর এই বিষয় নিয়ে ভাবতে চায়না। নিয়াজকে নিয়েও না৷ তবুও কেনো এই লোকটাকে অন্য কোন মেয়ের সাথে দেখে এতো খারাপ লাগছে তার? কেনো রাগ হচ্ছে? নিয়াজ স্বাধীন মানুষ। সে যার সাথে ইচ্ছা কথা বলুক তাতে জাফরিনের খারাপ লাগবে কেনো? তাহলে কি জাফরিন এখনো নিয়াজকে সেই প্রথমদিনের মতো ভালোবাসে? এখনো তাকে চায়? অদ্ভুত সব অনুভূতি আর প্রশ্ন জাফরিনের মনে ঘুরঘুর করছে। জাফরিন মনে মনে আওড়ালো,
” শহরে আর কোনো কফিশপ ছিলো না। এই লোককে এখানেই ডেটে আসতে হলো”?
জাফরিন বান্ধবীদের সাথে আজকে একটা গেট টুগেদার এর জন্য এসেছে। সে দেশে আসার পর সব বান্ধবীরা মিলে একদিন এক জায়গায় হওয়ার প্ল্যান করেছিলো। অনেক দিন থেকেই করছিলো। মাঝে জাফরিন এর জ্বর ঠান্ডা হওয়ায় সেটা পেছাতে পেছাতে আজকে এক জায়গায় হয়েছে তারা। আর কাকতালীয়ভাবে নিয়াজও এই কফিশপে এসেছে একটা মেয়ের সাথে। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ শিক্ষিত এবং আধুনিক ঘরানার। একটা হালকা কচি কলা পাতা রঙের শাড়ি পড়েছে। চুলগুলো ছেড়ে দেওয়া। হয়তো কলিগ হবে। একসাথে চাকরি করে। দুজনেই ডাক্তার। নতুন করে প্রেম করছে। কফিশপটা বেশ বড় হওয়ায় জাফরিন নিয়াজকে ভালো ভাবে দেখতে পেলেও নিয়াজ পারছে না। কারন তারা পেছনের স্পেসে অন্য কর্নারে। অদ্ভুত এক জেলাসিতে মন মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। তারা কি কথা বলছে জানার উপায় নেই। এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ চার পাঁচ বছরের একটা কিউট বাচ্চা মেয়ে প্লে গ্রাউন্ড থেকে দৌড়ে তাদের কাছে গেলো। বাচ্চাটা বেশ হাপাঁচ্ছে। হয়তো অনেকক্ষন ছোটাছুটি করে খেলেছে তাই। নিয়াজ তাকে যত্ন করে কোলে বসিয়ে পানি খাওয়াচ্ছে জাফরিন বেশ অবাক হলো। নিয়াজ কি তবে একজন বাচ্চার মার সাথে প্রেমে জড়িয়েছে? হতেই পারে৷ এতোসব প্রশ্ন আর চিন্তার মধ্য জাফরিনের এক বান্ধবী তাকে ডাক দিলো। চিন্তার ছেদ হলো তার। জাফরিনের বান্ধবী সুমনা বললো,
” কিরে তখন থেকে সামনের দিকে তাকিয়ে কি সব ভাবছিস? কোন খেয়ালে ডুবে আছিস? আমরা সেই কখন থেকে বকবক করে যাচ্ছি আর তুই কিছুই বলছিস না। কতদিন পর একসাথে হলাম আমরা “।
জাফরিন মুখে হাসি নিয়ে বললো,
” কোথায় কিছু নাতো। কিছু ভাবছি না। তারপর বল তোদের কি অবস্থা। কার কেমন দিন যাচ্ছে? সবাই বিয়ে শাদী করা শেষ”?
সুমনা বললো,
” সবার বিয়ে শাদী হয়ে বাবু পয়দা করাও শেষ। গ্রুপে একমাত্র তুই হতভাগি সিঙ্গেল হয়ে আছিস । তারপর বল তুই কবে বিয়ে করছিস?
জাফরিন হেসে বলে,
” কপালে যেদিন বিয়ে লিখা আছে সেদিনই হবে। তবে বাড়িতে কথা হচ্ছে এই নিয়ে। হয়তো খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা শুনতেও পারিস”।
অন্য এক বান্ধবী বললো,
” যাক ব্যাপারটা ভালো। বিয়েতে কিন্তু দাওয়াত দিবি। কারো বিয়েতে তুই ছিলি না কিন্তু তোর বিয়েতে আমরা সবাই থাকতে চাই”।
জাফরিন হ্যা সূচক মাথা নাড়িয়ে বলে,
” আচ্ছা। সেই দিন আগে আসুক। সবাইকে বলবো।
তাদের কথার মাঝেই তাদের খাবারের অর্ডার চলে আসলো। জাফরিন আড়চোখে নিয়াজদের টেবিলের দিকে তাকালো। নিয়াজ এখনো বাচ্চা মেয়েটাকে কোলে নিয়েই আছে। গল্প করছে। বাচ্চার মাও হেসে হেসে তাদের সাথে গল্প করছে। দেখে মনে হচ্ছে তিনজনের একটা হ্যাপি ফ্যামিলি। হঠাৎ করে জাফরিনের বুকের ভেতরে অদ্ভুত ব্যাথা অনুভব হলো। কষ্ট হচ্ছে তার। শ্বাস ভারি হয়ে আসছে। এতোবছর পরেও সে কিছুই ভুলতে পারেনি অথচ নিয়াজকে ভুলে থাকার জন্য সে কম চেষ্টা করেনি। জামার হাতাটা সরিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালো সে। এই বিষয়টা তাকে কত কষ্ট দিয়েছে আর দেয় একমাত্র সেই জানে। যখন খুব বেশি খারাপ লাগে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায় তখন এসব উল্টো পালটা করে নিজের সাথে। কাউন্সলিংও করিয়েছে। মেডিসিন আর মেডিকেশন সবকিছুর মধ্য দিয়েই সে গেছে। তবুও সে বের হতে পারেনি। অন্যদিকে নিয়াজ এখানে এসেছে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে। এই যে ছোট্ট কিউট বাচ্চা মেয়েটা জন্ম থেকেই ফুসফুসের একটা ত্রুটি নিয়ে জন্মেছে। ফুসফুসের গঠন ত্রুটিযুক্ত তাই একটু হাটাঁহাটি আর ছোটাছুটি করলেই হাঁপিয়ে যায়। এই বাচ্চাটা তার পেশেন্ট। সামনে তার একটা মেজর সার্জারী আছে। তার আগে বাচ্চার সাথে একটা লাইভ সেশনের জন্য আজকে এই কফিশপে আসা। বাচ্চাকে কোলে নিয়েই নিয়াজ বললো,
” আপনার বাচ্চা বেশ শান্ত। ও কি এখানেই কথা কম বলছে নাকি বাসায়ও এমনই শান্ত কথা কম বলে?
নিয়াজের সামনে যে ভদ্রমহিলাটা বসা উনার নাম নীলা। পেশায় একজন ব্যাংকার। সিংগেল মাদার। সে বললো,
” না শান্ত না। অনেক দুষ্ট। অনেক একটিভ বাচ্চা কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বাহিরে আসলে সে এমন চুপচাপ হয়ে যায়”।
নিয়াজ বললো,
” বাহ দারুনতো। আপনার মেয়েতো বেশ বুদ্ধিমতী সাথে অনেক আদুরে “।
নীলা বললো,
” আমার বাচ্চাটার জন্ম থেকেই এই সমস্যা। প্রেগ্ন্যাসির সময়ে ডাক্তার বলেছিলো কিছু সমস্যা হতে পারে”।
নিয়াজ বললো,
” বাচ্চার বাবা আসেনি যে? বাচ্চাটা অসুস্থ। আপনাদের দুজনকেইতো এখন বাচ্চাকে প্রপার কেয়ার আর সময় দেওয়া দরকার”।
নীলা হঠাৎ করে বিমর্ষ হয়ে গেলো। শুকনো গলায় বললো,
” বাচ্চার বাবা এই দুনিয়াতে নেই। আমি একজন সিংগেল মাদার। বাচ্চার যখন দু বছর বয়স তখন হঠাৎ করে স্ট্রোক করেছিলো। হসপিটালে যাওয়ার সময়টুকু পাওয়া যায়নি। তারপর থেকে একাই মেয়েকে বড় করছি”।
নিয়াজ এর পলক স্থির হলো নীলার দিকে। কত অবলীলায় কঠিন একটা স মত্য বলে দিলো। আসলে এই সত্যের উপর আর কোনো সত্য হতে পারে না পৃথিবীতে। নিয়াজ বিনয়ের সাথে বললো,
” স্যরি আপনাকে কথাটা বলে কষ্ট দেওয়ার জন্য। আসলে বাচ্চা খুব ছোট আর কেসটাও ক্রিটিকাল। এসময় বাচ্চার নিজের প্যারেন্টস এর প্রপার কেয়ার দরকার হয়। আমি এভাবে কোন আউটডোর পেশেন্ট দেখিনা। আপনি আমার ফ্রেন্ড এর কাজিন। রাকিব আমাকে রিকোমেন্ড করেছিলো আপনার বেবির এই বিষয় এর জন্য। আপনি আমাকে যে রিপোর্টসগুলো মেইল করেছিলেন সেগুলো আমি সব মনোযোগ দিয়ে স্টাডি করেছি। যেহেতু বেশ কয়েকটা ডাক্তারের কন্সাল্ট নিয়েছেন আপনি। দেখুন সব রিপোর্ট একই কথাই বলছে। বেবির এই অবস্থায় সার্জারি টাই করতে হবে। যত দেরি হবে ওর হেলথ কন্ডিশন এও এর প্রভাব পড়বে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এইটা করে নেওয়াই ভালো”।
নীলা আশা’হত চোখে নিয়াজের দিকে তাকায়। এতোটুকু বাচ্চা মেয়ে কি জটিল রোগ নিয়ে দুনিয়াতে এসেছে। নীলা চিন্তিত হয়ে বললো,
” এতোটুকু বাচ্চা এই সার্জারির ধকল নিতে পারবেতো”?
নিয়াজ বললো,
” বিষয়টা ক্রিটিকাল তবে এটা ছাড়া কোনো বেষ্ট অপশন নেই। আপনাকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই আগাতে হবে। আর সৃষ্টিকর্তা চাইলে সবকিছু সুন্দর মতো হবে। এতো বেশি চিন্তা করবেন না “।
নীলা বললো,
” ঠিকাছে। আমি সার্জারি করাতে চাই বেবির। আল্লাহ ভরসা। যা হবে ভালোর জন্যই হবে”।
নিয়াজ স্মিত হেসে বললো,
” আপনি দুদিন সময় নিন। ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। তারপর আপনার যেখানে ভালো মনে হয় সার্জারির জন্য ডাক্তার কনসাল্ট করবেন। আর যদি আমাদের হসপিটালে করাতে চান তাহলে আপনাকে হসপিটালে এসে সব ইনফর্মেশন এবং প্রসিডিউর সম্পর্কে জানতে হবে”।
নীলা মুখে হাসির রেখা টেনে বললো,
” জি আচ্ছা। আমি সবকিছু জানার চেষ্টা করবো হসপিটালে এসে “।
নিয়াজ বাচ্চা মেয়েটার মাথায় বুলালো আর বললো,
” আজকে তাহলে উঠি মিসেস নীলা। হসপিটালে দেখা হবে আশা করি”। চিন্তা করবেন না আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। এবার তাহলে উঠা যাক”।
নীলা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বাচ্চাকে কোলে নিলো। তারা বের হয়ে আসতেই নিবে এসময় পেছন থেকে কেউ বেশ জোরে জাফরিন বলে ডাক দিলো। নিয়াজ বেশ অবাক হলো। জাফরিন এখানে এসেছে নাকি? পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে একটা গার্লস গ্রুপ কর্নারে বসে গল্প করছে। তার মধ্য জাফরিনও আছে। জাফরিন এখানে কখন এসেছে? সে এতোক্ষন এখানেই ছিলো। নিয়াজ নীলাকে বিদায় জানিয়ে আবার কফি শপে ঢুকলো। জাফরিনদের টেবিলের দিকেই যাচ্ছে। জাফরিন নিয়াজকে বের হয়ে যেতে দেখেছে কিন্তু আবার আসতে দেখে একটু ভড়কে গেলো। কিভাবে বুঝলো সে এখানে। এখন কত কি প্রশ্ন করে বসে কে জানে। নিয়াজ জাফরিনকে দেখেই বললো,
” তুই এখানে? কতক্ষন এসেছিস? আমিওতো এতোক্ষন এখানে একটা কাজেই ছিলাম। একটা বাচ্চা পেশেন্ট এর সাথে লাইভ সেশন ছিলো”।
জাফরিন তব্দা খেলো মনে হয়। বাচ্চা মেয়েটা পেশেন্ট ছিলো। আর ওই মহিলাটা বাচ্চার মা। আর সে এতোক্ষন কি কি ভাবলো। জাফরিন মুখ ফুটে কিছু বলতেই যাবে তখনই তার ফোনে রিং বেজে উঠলো। ফোন বের করে দেখে তার মা কল করেছে। কল ধরে জাফরিন বললো,
” হ্যা মা বলো “।
জাফরিনের মা বললো,
” একটু তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে পারবি? বান্ধবীদের সাথে দেখা হয়েছে?
জাফরিন বেশ অবাক হলো,
” হ্যাঁ দেখা হয়েছে। কি হয়েছে মা? কোনো জরুরি কাজ আছে?
জাফরিনের মা বললো,
” তুই বাসায় আয় তারপর বলছি। একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে”।
জাফরিন আচ্ছা বলে ফোন রেখে দিলো। তারপর বান্ধবীদের বললো,
” আমাকে বাসায় যেতে হবে। কি একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে মা বললো এখনই যেতে। স্যরি রে। আড্ডার মাঝখানে যেতে হচ্ছে। আজকে যেতে হবে। কিছু মনে করিস না “।
নিয়াজ জাফরিনের হুটপাট দেখে বললো,
” আমি রেখে আসতেছি তোকে। তোকে বাড়িতে ড্রপ করে হসপিটালে যাবো “।
নিয়াজ আর জাফরিন বের হয়ে গেলো কফি শপ থেকে। ওরা গেলেই জাফরিনের বান্ধবীরা বলে উঠলো,
” এই হ্যান্ডসাম ছেলেটা কে রে? জাফরিনের পরিচিত কেউ?
সুমনা বললো,
” জাফরিনের কাজিন আর ছোটবেলার ভালোবাসা। উনি ডাঃ নিয়াজ। কিন্তু কপাল পো”ড়া মেয়েটার ভালোবাসা এখনো এক তরফা হয়েই আছে। জাফরিন মনের কথা বলার আগেই ডাঃ নিয়াজ বিয়ে করেছিলো তার মেডিকেল কলেজের জুনিয়র জি এফ কে। কিছু মাস আগে তার বউ তাকে চি”ট করে। অন্য আরেক সিনিয়র ডাক্তারের সাথে সম্পর্ক তৈরী করে। ডিভোর্স হয়েছে তাদের। এই সেই মানুষ যার জন্য জাফরিন ঘর বাড়ি দেশ সব ছেড়ে চলে গেছিলো। এখন সময়ই জানে যদি কিছু হয় আবার এখন”।
সবাই একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। কেউ জানতো এসব সুমনা ছাড়া। বেশ অবাক হলো সে। এদিকে জাফরিনকে বাড়ি পৌছেঁ দিলো নিয়াজ। নিয়াজ ভাবলো বাড়ি যখন এসেছে তখন তার মা কেও দেখে যাক। জাফরিন হন্তদন্ত হয়ে ডোরবেল দিতেই কয়েক সেকেন্ড পর ফরজা খুলে গেলো। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে নিয়াজের মা। নিয়াজ আর জাফরিনকে একসাথে এসময় বাড়িতে দেখে অবাকই হলো। জাফরিন বলতেই নিবে কি হয়েছে তখন জাফরিনের মা এসে জাফরিনের ওড়না তার মাথায় তুলে দিলো। মেয়েকে দুহাতে আগলে নিয়ে বসার ঘরে নিয়ে গেলো। জাফরিন হতভম্ভ। কিছুই বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। বসার ঘরে গিয়ে জাফরিন দেখলো তার মায়ের সেই বান্ধবী। সাথে দুজন পুরুষ মানুষ। একজন মধ্য বয়স্ক আর অন্যজন ইয়্যাং। জাফরিন যা বুঝার বুঝে গেলো। এই তাহলে জরুরি কাজ। জাফরিন প্রচন্ড রাগ হলো মায়ের উপর কিন্তু এই মুহুর্তে কিছুই বলতে পারছে না। হতবাক নিয়াজও।জাফরিনের মা পরিচয় করিয়ে দিলো সবার সাথে। তারপর বললো সালাম করতে। জাফরিন ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে শুধু। ভদ্রতা বজায় রেখে সালাম দিলো। জাফরিনের মায়ের বান্ধবী বললো,
” তোমার মা বললো তুমি বাহিরে গিয়েছিলে বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে। আমরাতো তোমার মা কে না বলেই এসেছি। এতোদিন ধরে বলছি তোমার মা আজকাল করতে করতে সময়ই দিচ্ছিলো না। তাই আজকে ছেলে আর ছেলের বাবাকে সহ নিয়ে আসছি। এই হচ্ছে আমার ছেলে আদিব। আর উনি হচ্ছে ছএর বাবা। আমার ছেলের জন্য তোমাকে অনেক পছন্দ সেই বহু দিন আগে থেকেই। তোমার মাকে আমি বলেছিও অনেকবার। এর মধ্য তুমি বিদেশে পড়তে গেলে তাই আর কথা আগায়নি। তাই আজকে ছেলেকে নিয়েই এসেছি”।
আদিব আড়চোখে জাফরিনকে দেখলো। জাফরিন অন্য দিকে চোখ ফিরে আছে। অস্বস্তি বোধ করছে হয়তো তাদের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণে।মেয়েটাকে প্রথম দেখেই ভালো লাগলো তার। ছেলের বাবা বলে উঠলো,
” ভাবী ভাই থাকলে ভালো হতো। সব অভিভাবক মিলে কথা বলা যেতো”।
জাফরিনের মা বললো,
“আসলে ভাই জাফরিনের বাবার ব্যাবসাতে এখন অনেক কাজের চাপ যাচ্ছেতো। আপনার ভাই বাড়িতে সময় দিচ্ছেই খুব কম। সেতো ঢাকাতে গেছে ব্যবসায়িক কাজে। আপনারা আগে থেকে জানিয়ে আসলে থাকতে পারতো হয়তো। উনি রাতে ফিরবে।
জাফরিনের মায়ের বান্ধবী বললো,
” ভাই আজকে নেইতো কি হয়েছে। দিন ফুরিয়ে গেছে। আবার কথা বলা যাবে। তুমি বলো ছেলের জন্য বউ কেমন লাগছে? বলেছিলাম না চাঁদের মতো বউ পছন্দ করেছি”।
জাফরিনের রা”গের পারদ তরতর করে বাড়ছে। মন চাইছে এখনই ছুটে গিয়ে সবকিছু আছাড়া দিয়ে ভাঙতে। ছেলের বাবা বললো,
” আমারতো মেয়ে অনেক পছন্দ হয়েছে”।
ছেলের মা বললো,
” দেখতে হবে না কার পছন্দ। এখন যাদের বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে তারা নিজেদের মধ্য আলাপ করুক। তাদেরতো সারাজীবন থাকা নিয়ে কথা “।
জাফরিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। এই মহিলা কখন কি হবে সব সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছে। এখানে যে তার মতটাও দরকার সেটা জরুরি বলে মনে করছে না। জাফরিন মাথার ওড়নাটা নামালো। তারপর নিজেকে সংযত করে বললো,
” আন্টি মাফ করবেন। আমার পছন্দ হয়নি কিছুই। আমি এখন বিয়ে করতে চাইও না। আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুতও নই এখন বিয়ে করার জন্য। আমি একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে। আমার মতামতটা এই বিয়েতে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আমার এই বিয়েতে মত নেই”।
এই বলে জাফরিন উঠে চলে গেলো। উঠে গিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দিলো। এদিকে জাফরিনের মা ঠিক যে ভ”য় পাচ্ছিলো সেটাই হলো। এখন কিভাবে সামলাবে সে মেয়েকে। বাড়িতে তার বাবাও নেই। তার বাব্ধবী এমন হুটপাট করলো। এদিকে জাফরিনের মায়ের বান্ধবী হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে আছে। কি হলো সেটা বুঝতে তার সময় লাগলো। তারপর জাফরিনের মাকে বললো,
” তোর মেয়েকে আমার ছেলের জন্য অনেক পছন্দ হয়েছিলো। এভাবে না করলেও পারতো তোর মেয়ে “।
জাফরিন এর মা বললো,
” তুই ভুল বুঝিস না। শুধুতো বড়দের মত থাকলেই হবে না। মেয়ের মতও দরকার। মেয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক। ওর মতামত ছাড়া ওর বিয়ে দেই কি করে। কিছু মনে করিস না “।
ছেলের বাবা বললো,
” না ভাবি কি বলছেন। সমস্যা নেই। আমাদেরই ভুল হয়েছে এভাবে তাড়াহুড়ো করে আসাটা।আপনার বান্ধবী বুঝতে পারেনি।
অনেক মন খারাপ নিয়ে তারা চলে গেলো। আদিব ছেলেটাও খুব আশা”হত হলো।।মায়ের সঙ্গে এসে বিপাকে পড়লো সে। জাফরিনকে তারও ভালো লেগেছিলো। কিন্তু কি আর করার মেয়ের অমতেতো আর বিয়ে করা যাবে না। জাফরিনের মায়ের বান্ধবী বিরবির করতে করতে গেলো আজকালকার মেয়েরা বড়দের কথার দাম দেয়না। সম্মান করে না। নিজে যেটা ভালো মনে করে সেটাই তাদের কাছে বড়। ছেলের বাবা বুঝাতে বুঝাতে গেলো ভুলতো তারই হয়েছে। মেয়ের মত না জেনেই মেয়ে দেখতে আসা উচিত হয়নি।
এদিকে জাফরিন ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। জাফরিনের মা অনেক ডাকছে কিন্তু কোন সাড়া শব্দ নেই। হু হা কিছুই নেই। নিয়াজ বেশ অবাক হলো সাথে ভ”য়ও পেলো। জাফরিনের হাতের দাগগুলোর কথা মনে করলো। রা”গ জিদে কিছু করে বসলো নাকি আবার। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে তারা সবাই ডাকাডাকি করছে কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। নিয়াজ জোরে দরজা ধাক্কা দিতে দিতে দরজার লক ভেঙে গেলো। ঘরে ঢুকে যা দেখলো তাতে সবার পায়ের নিচে মাটি সরে গেলো। জাফরি মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। আর মেঝে লাল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। জাফরিন আবারও নিজের হাত……….
____________________
রাত দশটা। জাফরিন এর জ্ঞান ফিরেছে কিন্তু মুখ ফিরিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। জাফরিনের মা বিলাপ করে কাঁদছেন। মেয়ে হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত নিলো কেনো। নিয়াজ ওর সমস্ত কাগজ বের করেছে। বিদেশে থাকাকালীন ওর সমস্ত ক্লিনিক্যাল রিপোর্ট দেখছে সে। নিয়াজের মা জায়ের সাথে বসে তাকে শান্তনা দিচ্ছে। হঠাৎ করে নিয়াজ বললো,
” তোমরা একটু বাহিরে গিয়ে বসো। জাফরিনের সাথে আমার কিছু কথা আছে “।
নিয়াজ আর জাফরিনের মা মাথা নাড়িয়ে ঘর থেকে চলে গেলো। নিয়াজ জাফরিনের পাশে গিয়ে বসলো। জাফরিনের মাথায় হাত রাখলো। আজকে জানতে হবে জাফরিন কি নিয়ে এতো ডি”প্রেসড। নিয়াজ বললো,
” জাফরিন ”
জাফরিন মুখ তুলে তাকালো কিন্তু সে চুপ। তার কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না এখন। নিয়াজ আবারও বললো,
“আমি তোর সব রিপোর্ট দেখেছি। এসব কি জাফরিন?
জাফরিন এখনো চুপ। নিয়াজ জাফরিনকে আবারও শান্ত গলায় বললো,
“এতো পাগলামো কেনো করছিস জাফরিন? কি হয়েছে বল আমাকে? একবার বল? কি নিয়ে কষ্ট পাচ্ছিস? কেনো কষ্ট দিচ্ছিস নিজেকে এইভাবে”?
জাফরিন দৃষ্টি ফিরিয়ে চাইলো নিয়াজের দিকে। নিয়াজের চোখে মুখে তাকে নিয়ে অনেক চিন্তা। নিয়াজ হাত ধরে আছে জাফরিন এর। জাফরিন এর পুরো শরীর যেনো ঝনঝন করে কেঁপে উঠলো। এই মুহুর্তে তার মাথা কাজ করছে না। মুহুর্তের মধ্য একটা কান্ড করে বসলো যেটা নিয়াজ বুঝতেই পারলো না। জাফরিন নিজের দ্বিধা, লজ্জা, হায়া, মন এর পর্দা সরিয়ে নিয়াজের এর ঠোঁট জোড়া আকড়ে ধরেছে। উ”ন্মাদ এর মতো আদর করছে সে নিয়াজকে। এমনভাবে আদর করছে যেনো যেনো জাফরিন তার মধ্য নেই। কপাল, গাল, নাকে গলায় জাফরিনের আদরের স্পর্শ যেনো আরও পাথর করে ফেললো নিয়াজকে। এই এক অন্য জাফরিন। নিয়াজ যতক্ষনে বুঝলো তখন জাফরিন শার্টের কলার টেনে বললো,
” আমার আজকের এই ভেঙে যাওয়ার কারন একমাত্র তুমি। পাচঁটা বছর ধরে প্রতিদিন একটু একটু করে শেষ করে দিয়েছো তুমি আমাকে। আমি ভেঙে চূড়ে শেষ হয়ে গেছি ভেতর থেকে । যে জাফরিনকে প্রতিদিন চোখের সামনে দেখো সে একটা পুতুল এর মতো বেচেঁ আছে। একটা জীবন্ত কিন্তু নিস্প্রভ পুতুল “।
নিয়াজ তখনও জাফরিনকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে কারন জাফরিনের ক্লান্ত শরীর বার বার ভর ছেড়ে দিচ্ছে। নিয়াজ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে জাফরিন এর দিকে। নিয়াজ বিরবির করে আওড়ালো,
” পাচঁ বছর ধরে আমি মেয়েটাকে ভাঙছি। কোথায় কিছুইতো বুঝতে পারিনি কখনো? ও নিজেইতো কোনোদিন এসে বলেনি”।
চলবে………….

