Home "ধারাবাহিক গল্প খুঁজেছি তোকে খুঁজেছি তোকে পর্ব-০২

খুঁজেছি তোকে পর্ব-০২

0
867

#খুঁজেছি_তোকে (০২)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

“- মিস নূরা কাম হেয়ার।

স্যারের মুখে নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে নূরা। নূরা ঠায় বসে রইল বেঞ্চে। এদিকে সামির স্যার নূরা’র দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। স্যারের লুক দেখে নূরা বসে না থেকে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে স্যারের দিকে। নূরা যত আগাচ্ছে তত ওর বুক ধড়ফড় করছে। হার্টবিট দ্রুত উঠা নামা করছে। নূরা গিয়ে স্যারের সামনে দাঁড়ালো। সামির স্যার বাঁকা হেসে বললেন,

“- ম্যাথ সলভ করবে এন্ড ফাইভ মিনিটস এর মধ্যে।

নূরা চোখ বড়বড় করে স্যারের দিকে তাকায়। স্যার এ্যাটিটিউট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লাসের সবাই সামনে তাকিয়ে আছে। নূরা ভেবে পাচ্ছে না এতবড় অংক টা সে কিভাবে ফাইভ মিনিটস এর মধ্যে সমাধান করবে।এই নয় যে সে ম্যাথে খুব কাঁচা। নূরা যথেষ্ট ভালো স্টুডেন্ট। তবে নতুন স্যার তো সেজন্য ই একটু ভয় পাচ্ছে। নূরা কে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সামির স্যার মনে মনে ভেবে নিলেন নূরা বোধহয় অংক টা পারবে না। তাই তিনি নূরা কে অপমান করার জন্য কিছু বলতে যাবেন তখনই দেখলেন নূরা মার্কার নিয়ে বোর্ডে অংক করা শুরু করছে। সামির অবাক হয়ে দেখছে নূরা’র লেখা। নূরা খুব দ্রুত অংক করছে। মাধে মধ্যে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছে। নূরা ম্যাথ শেষ করে হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ফের স্যারের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে বলে,

“- এখনো ৪০ সেকেন্ড বাকি আছে স্যার।

সামির স্যার এ ব্যাপারে কিছু না বলে গম্ভীর মুখে বলেন,

“- সিটে গিয়ে বসো।

নূরা স্যারের কাছে একটু এগিয়ে গেল। নূরা কে আগাতে দেখে সামির স্যার কিছু টা ঘাবড়ে গেলেন। তবে নিজেকে যথাসম্ভব ঠিক রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। নূরা আশেপাশে তাকিয়ে স্যারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে হিসহিসিয়ে বলে,

“- কি ভাবছিলেন ফাইয়ান চৌধুরী সামির ওরফে আমার নতুন স্যার? সবার সামনে এই নূরা কে অপমান করবেন? কিন্তু না স্যার মাইশা বিন নূরা কখনোই কাউকে অপমান করতে সুযোগ দেয় না।

নূরা’র কথা শুনে সামির স্যার মুচকি হাসলেন। তারপর বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললেন,

“- মিসেস নূরা চৌধুরী আমার নামও ফাইয়ান চৌধুরী সামির। ফাইয়ান চৌধুরী সামির ও কাউকে অপমান করার সুযোগ দেয় না। বাট তোমাকে তো আমি….

নূরা থমকালো। বিস্মিত, হতবাক হতবিহ্বল চোখে স্যারের দিকে তাকায়। স্যারের মুখে মিসেস নূরা চৌধুরী শুনে অস্বস্তিতে পড়ে গেল। স্যারের কথার পরিপ্রেক্ষিতে নূরা কিছু না বলে হনহনিয়ে নিজের সিটে গিয়ে বসল। নূরা কে এভাবে যেতে দেখে মনে মনে হাসলো সামির কিন্তু সেটা বাইরে প্রকাশ করল না।

,
,
,
,

রুম জুড়ে পায়চারি করছে নূরা।চিন্তায় অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। তার কাছে সবটা গোলমাল লাগছে। ২ বছর আগে সে সবকিছু ছেড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল। তারপর রাগ করে এখনো সে নিজের বাড়ি ফেরে নি।

~অতীত~

২ বছর আগের ঘটনা। নূরা তখন সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। বাবা মায়ের খুব আদরের সন্তান নূরা। ভাইয়ের চোখের মনি। হঠাৎ করে একদিন নূরা’র বাবা সুলাইমান আহমেদ মেয়ে কে বিয়ে দিতে চাইলেন। আহমেদ পরিবারের সবাই নূরা’র বিয়ে নিয়ে খুব এক্সাইটেড ছিল। কিন্তু নূরা কিছুতেই এই বিয়ে করতে চাইনি। সামির স্যার যার সাথে নূরা’র বিয়ে ঠিক হলো। সে ছিল নূরা’র ভাইয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড। নিহালও চাইছিল সামিরের সাথে নূরা’র বিয়ে হোক। নূরা কাউকে বোঝাতে পারিনি সে এই বিয়ে টা করতে চাই না। অতঃপর সামিরের সাথে নূরা’র বিয়ে হয়ে গেলো। কিন্তু বিয়ের রাতেই নূরা নিজের বাসা থেকে পালিয়ে আসে। পালিয়ে বান্ধবীর বাসায় কিছু দিন থাকে। যেহেতু বিয়ে টা দুই পরিবারের সদস্য দের নিয়ে ই হচ্ছিল তাই নূরা’র পালিয়ে যাওয়া টা কেউ ই জানতে পারেনি। নূরা’র বাবা মেয়ের উপর রাগ করে খোঁজখবর নেওয়া বাদ দিলেন। কিন্তু নিহাল আদরের বোনের পালিয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি। বিয়ে করেই বা কেন পালালো? পালালে বিয়ের আগে পালাতো।

বিয়ের রাতেই নূরা কল দিয়ে ভাইকে জানায় এখনই সে শশুর বাড়ি যেতে চায় না। এসব সংসারের ঝামেলায় নিজেকে জড়াতে চায় না। তাই বাসা থেকে চলে এসেছে কিন্তু সে কোনো ছেলের সাথে যায়নি। তার ফ্রেন্ডের বাসায় আছে। নিহাল শুধু একটা কথা’য় বলেছিল,

“- ঠিক আছে তাই বলে তুই বাসা থেকে চলে গেলি কেন? বাবা মা তোর উপর খুব রেগে আছেন। রাগ করা টায় স্বাভাবিক বনু। সামিরের পরিবারের কাছে আমাদের মাথা হেট হয়ে গেছে। তুই বিয়ের ওরও আমাদের কাছেই থাকতি তারপর না হয় পরে এ ব্যাপারে কথা বলা যেতো। তুই কাজ টা একদমই ঠিক করিসনি বোন।

“- সরি ভাইয়া।

নিহাল কল কেটে সবাই কে সবটা জানায়। সামিরের মা একটু রাগারাগি করলেও সামিরের বাবা আলতাফ চৌধুরী হাসি মুখে বলেন,

“- বাচ্চা মেয়ে, সংসারের ভয়ে এমনটা করেছে। আমরা কিছু মনে করিনি। ওদের বিয়ে টা তো হয়ে গেছে। তাহলে আর সমস্যা নেই। নূরা মামনি পড়াশোনা শেষ করুক তারপর ওকে আমার বাড়ির বউ করে নিয়ে যাবো বেয়াইসাব। এ নিয়ে আপনারা কোনো টেনশন করবেন না।

সামিরের বাবার আন্তরিকতা দেখে আহমেদ বাড়ির সকলে খুব খুশি হন। সেদিনের মতো চৌধুরী বাড়ির সবাই চলে যান। সকলের সামনে সুলাইমান আহমেদ চুপ করে থাকলেও তারা চলে যেতেই তিনি হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন। বাবার এমন রুপ দেখে নিহাল ভয় পেয়ে যান। সুলাইমান আহমেদ রেগে মেয়ের সাথে যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেন। সেদিনের পর থেকে নূরা আজও আহমেদ বাড়ি ফেরেনি। বাবার উপর বড্ড অভিমান করেছে নূরা। সুলাইমান আহমেদ যতই রেগে থাকেন না কেন নিহালের মাধ্যমে নূরা’র জন্য সুন্দর বাসা ঠিক করে দিয়েছেন। নূরা সেখানেই থাকে ৷ কিন্তু নূরা এটা জানে না। নূরা জানে এই দুই বছর তার ভাই তার সব খরচ দিচ্ছে। বাবা তার উপর রাগ করে খোঁজখবর ই নেয় না সেখানে এগুলো তো বিলাসিতা। এসব ভেবে নূরা মনে মনে খুব কষ্ট পেতো। অনেক রাত গেছে বাবা মা’র কথা ভেবে নূরা কেঁদে রাত পার করেছে। ভাইয়ের সাথে নূরা’র প্রতিদিন কথা হতো। দু’দিন পরপর দেখা হতো। যতই রাগ থাকুক না ক্যান ভাইয়ের থেকে ঠিকই বাবা মা’র খোঁজখবর নিতো নূরা। এই দুই বছরে বাপ মেয়ের অভিমান এখনো ভাঙেনি।

~বর্তমান ~

কিন্তু নূরা ঠিক করেছে আজ সে এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরবে। যেই ভাবা সেই কাজ। নূরা ব্যাগ পত্র গুছিয়ে আহমেদ বাড়ির দিকে রওনা দেই। নূরা’র আজ খুব খুশি খুশি লাগছে কতদিন পর সে তার বাবা কে জড়িয়ে ধরবে। মায়ের বুকে মাথা রেখে ঘুমাবে। কিন্তু হঠাৎ করে নূরা’র হাসি মুখ টা কালো হয়ে গেল।এই ভেবে যে তার বাবা যদি তার সাথে রাগ করে কথা না বলে। তাকে দুরে সরিয়ে দেয়। তাহলে সে বাঁচবে না মরেই যাবে।

চলবে~