#খুঁজেছি_তোকে (০৩)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি
দীর্ঘ ২ বছর পর নূরা নিজের বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছে। এতগুলো দিন দুরে থেকে এখন যখন সবার কাছে আসতে চেয়েছে তখন কি সবাই তাকে খুশি মনে মেনে নিবে। নূরা’র মনে খুব ভয় হচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে। নূরা কাঁপা হাতে কলিং বেল বাজায়। কিছুক্ষণ পরই দরজা খুলে দেন নূরা’র মা সপ্না আহমেদ। সপ্না আহমেদ এতদিন পর মেয়ে কে দেখে খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরেন। নূরা ও মা কে পেয়ে ঝাপটে ধরে কান্না মাখা গলায় বলে,
“- কেমন আছো আম্মু?
সপ্না আহমেদ ভাঙা গলায় বললেন,
“- তোকে ছাড়া কি আমরা ভালো থাকতে পারি মা? তোকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো ছিলাম না নূরা কিন্তু এখন ভালো হয়ে গেছি। তোকে পেয়ে আমি খুবউ খুশি হয়েছি মা।
সুলাইমান আহমেদ সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে স্ত্রী কে জিজ্ঞেস করেন,
“- সপ্না কে এসেছে?
বাবার গলা পেয়ে নূরা মা কে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সপ্না বেগম মেয়ে কে অবলোকন করেন। নূরা ভয় ভয় চোখে দাঁড়িয়ে আছে। বিষয় টা বুঝতে পেরে সপ্না আহমেদ বললেন,
“- ভয় পাস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
“- আব্বু কি খুব রেগে আছে আম্মু?
সপ্না আহমেদ মৃদু হেসে বললেন,
“- তা তো আছেই তবে তুই গিয়ে জড়িয়ে ধরলে সব রাগ পানি হয়ে যাবে।
নূরা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে বলে,
“- সত্যি বলছো তো? যদি রেগে মেগে মেরে বসে।
“- তুই তো মাইর খাওয়া কাজই করেছিস। এখন না হয় একটু মাইর খা। না হলে সব ঠিক হবে কি করে?
নূরা ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,,
“- আম্মুওওও
তখনই আবার ভেসে এলো,
“- কি হলো এতক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে কি করছো?
কে এসেছে?
নূরা মায়ের হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“- তুমিও আমার সাথে আসো।
মেয়ের ভয় দেখে তিনি হাসলেন। নূরা মা কে পিছনে ফেলে ছুটে গেলো বাবা-র কাছে। সুলাইমান আহমেদ সোফায় বসতে যাচ্ছিলেন তখনই ছুটে এসে বাবা কে জড়িয়ে ধরে নূরা। সহসা এমন হওয়ায় সুলাইমান ঘাবড়ে যান৷ সচারাচর তাকে কেউ এভাবে জড়িয়ে ধরে না। সেখানে আজ হঠাৎ করে কে এমন কাজ করল। তিনি রাগী গলায় বললেন,
“- এই কে তুমি? ছাড়ো আমায়? বলা নেই কওয়া নেই এভাবে কেউ হুটহাট জড়িয়ে ধরে?
বাবা-র কথা’য় হাত টা আপনা আপনি আলগা হয়ে যায় নূরা’র। দু-চোখে অশ্রু এসে জমা হয়। নূরা বাবা কে ছেড়ে একটু দুরে সরে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। সুলাইমান আহমেদ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সামনে তাকাতেই থমকে যান।
নূরা দাড়িয়ে দু’হাত দিয়ে জামা খামচে ধরে নিরবে কাঁদছে। আদরের মেয়ের চোখে পানি দেখে সুলাইমান আহমেদ এর বুক দুমড়ে মুচড়ে যান। তিনি সহ্য করতে পারেন না আদরের মেয়ের কান্না। ছুটে গিয়ে মেয়ে কে বুকে জড়িয়ে নেয়। নূরা ডুকরে কেঁদে উঠে বলে,
“- আমাকে ভুলে গেলে বাবা? তোমার আদরের নূরা কে তুমি ভুলে গেলে? আমাকে তুমি চিনতে পারলে না বাবা ?
আদরের মেয়ের অভিযোগ শুনে ভাঙা গলায় বললেন,
“- তুই ও তো তোর বাবা কে ভুলে গেছিস? এই দুই বছরে কি একটা বার বাবা-র কথা মনে পড়েনি? মনে হয়নি বাবা কে গিয়ে জড়িয়ে ধরি।
নূরা জোরে জোরে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
“- সেদিনের জন্য আই এম সরি বাবা। এমন ভুল আর করবো না। প্লিজ তুমি আমায় মাফ করে দাও।
সুলাইমান আহমেদ মেয়ের মাথা ডলতে ডলতে বললেন,
“- সেই কবেই তো তোকে মাফ করে দিছি মা কিন্তু এখনো আমি রেগে আছি।
নূরা বাবার বুক থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ঠোঁট উল্টে বলল,
“- তুমি এখনো রেগে আছো?
মেয়ের আহ্লাদীপনা দেখে হাসলেন সুলাইমান আহমেদ। নূরা চেচিয়ে বলল,
“- তুমি হাসছো? আমি কিন্তু রেগে যাচ্ছি।
সুলাইমান আহমেদ হাসি বন্ধ করে মুখ গোমড়া করে বললেন,
“- কাজ টা তুই মোটেও ঠিক করিস নি নূরা। তোর যে প্রবলেম ছিল এটা আমাদের বলতে পারতি। আমি তাদের সাথে কথা বলতাম কিন্তু তুই এমন একটা কাজ করলি যেখানে আমাদের মাথা হেট হয়ে গেলো। লজ্জায় তাদের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। নেহাৎ তোর শশুর মশাই খুব ভালো মানুষ। তিনি হাসি মুখে সবটা মেনে নিলেন। কিন্তু তারপর ও তো আমাদের অসম্মান টা হয়েছে। বুক ফুলিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে পারে নি।
নূরা মাথা নিচু করে বলে,
“- কাজ টা একদম ঠিক করিনি বাবা কিন্তু কি করবো বলো? তোমরা তো আমার কোনো কথা’য় শুনতে চাওনি।
“- থাক তোকে আর কাঁদতে হবে না। বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছিস এখন ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। তোর আম্মু তোকে খাবার খাইয়ে দিবে।
খাবারের কথা শুনে চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে নূরা’র। খুশিতে গদগদ করে বলে,
“- উফস আগে বলবে না? কত্তওওও দিন হলো আম্মুর হাতের রান্না খায় না। খুব মিস করেছি সবকিছু।
সুলাইমান আহমেদ হেসে বললেন,
“- পাগলী মেয়ে আমার।
নূরা ব্যাগ নিয়ে ছুটে নিজের রুমে চলে গেলো। নূরা’র দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল নূরা’র বাবা মা। নূরা’র মা স্বপ্না বেগম মুচকি হেঁসে স্বামী কে বললেন,
“- এতদিন বাড়ি টা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতো। আজ যখন আমাদের মেয়ে টা ফিরে এলো এখন মনে হচ্ছে বাড়ি টা আগের মতো সতেজ হয়ে গেছে। আবারও বাড়িতে খিলখিল করে কেউ হাসবে।তার হাসির শব্দে সারা বাড়ি ঝনঝন করে উঠবে।
সুলাইমান আহমেদ মৃদুস্বরে বললেন,
“- সত্যি বলছো। আমার মেয়ে টা এতদিন কত কষ্ট করে দুরে থেকেছে। শুধু মাত্র রাগের জন্য। আমরা কেউ রাগ করে কথা বলিনি দেখে সেও রাগ করে সবকিছু ছেড়েছে। বড্ড পাগলী মেয়ে। এত রাগ জেদ হলে হবে? ওকেও তো বুঝতে হবে ও এখন বড়ো হয়েছি।
“- ওসব বাদ দাও। নূরা আমাদের কাছে সেই ছোট্ট নূরায় থাকবে। বাবা মায়ের কাছে সন্তান রা কখনো বড়ো হয় না। সবসময় ছোট ই থাকে।
সুলাইমান আহমেদ হেসে বললেন,
“- ভাবছিলাম মেয়ে টার সাথে রাগ করে কথা বলবো না। দেখি কি করে। কিন্তু তোমার মেয়ে যা করল? আচমকা নীরবে কেঁদে ই চলেছে। মেয়ের কান্না দেখে নিজের রাগ কে পুশে রাখতে পারলাম না। পরম যত্নে মেয়ে কে আগলে নিলাম
স্বপ্না বেগম হাসতে হাসতে বললেন,
“- মেয়ে ঠিক তার বাপের মতো হয়েছে। রাগ জেদ ত্যাড়ামি সব বাপের কাছ থেকে পেয়েছে। বলতে বলতে তিনি কিচেনে চলে গেলেন। এদিকে স্ত্রী র কথা শুনে সুলাইমান আহমেদ হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
,
,
রাত নয়টা। নূরা ফিরে আসায় আহমেদ বাড়িতে আজ আমেজ লেগেছে। নূরা’র চাচি আর মা মিলে নূরা’র সব পছন্দের খাবার রান্না করেছে।। নূরা আর ওর চাচাতো বোন প্রিয়া দু’জনে বসে খেয়েই চলেছে। নূরা মা কে উদ্দেশ্য করে বলে,
“- আম্মু লতীর তরকারি টা আরেকটু দাও না। এটা খুব টেস্টি হয়েছে।
নূরা’র সবচেয়ে পছন্দের একটা তরকারি কচুর লতি আর ইলিশ মাছ। স্বপ্না বেগম মেয়ের জন্য সেটায় রান্না করেছেন। নূরা’র আবার মাংসের প্রতি তেমন ইন্টারেস্ট নেই। সেজন্য মাংস রান্না করেননি। স্বপ্না বেগম নূরা’র প্লেটে তরকারি দিয়ে সরে আসলেন। তখনই দেখলেন সদর দরজা পেরিয়ে তার ছেলে নিহাল আসছে। তার সাথে আরও একজন মানুষ আছে। নূরা ভাইকে দেখে মুখে ভাত নিয়ে উৎফুল্ল হয়ে বলল,
“- ভাইয়……
নূরা পুরো কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই নিহালের সাথের মানুষ টা কে দেখে গলায় ভাত বেধে ভিষণ বাজে ভাবে বিষম খেলো। বোনের অবস্থা দেখে ছুটে এলো নিহাল!
চলবে~

