Home "ধারাবাহিক গল্প খুঁজেছি তোকে খুঁজেছি তোকে পর্ব-০৪

খুঁজেছি তোকে পর্ব-০৪

0
458

#খুঁজেছি_তোকে (০৪)
#ছনিয়া_তাবাচ্ছুম_অনি

“- ভাইয়……

নূরা পুরো কথা শেষ করতে পারল না। তার আগেই নিহালের সাথের মানুষ টা কে দেখে গলায় ভাত বেধে ভিষণ বাজে ভাবে বিষম খেলো। বোনের অবস্থা দেখে দৌড়ে এলো নিহাল! স্বপ্না বেগম দ্রুত মেয়ে কে পানি দিলেন। নূরা পানি পেয়ে ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি খেয়ে নিলো। নূরার নাক মুখ খুব জ্বলছে। সুলাইমান আহমেদ টেবিল ছেড়ে মেয়ের কাছে এসে পিঠে চাপড় দিতে লাগলেন। নূরা খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সেটা দেখে স্বপ্না বেগম বললেন,

“- খাবার ছেড়ে উঠছিস কেন?

“- এখন আর খাবো না নাক মুখ খুব জ্বলছে আম্মু।

“- কিন্তু..

“- আম্মু প্লিজ জোর করো না।

নিহাল নূরার সামনে এসে দাঁড়ায়। নূরা ভাইয়ের সাথে কথা না বলে মুখ ঘুরিয়ে চলে গেলো। বোনের কান্ড মাথার উপর দিয়ে গেলো নিহালের। নিহাল ভাবুক হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে রইল।

সামির ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে নূরা কে দেখে যাচ্ছিল। মেয়ে টা গলায় ভাত বেঁধে চোখ মুখ কান সব লাল করে ফেলছে। সামিরে মনে প্রশ্ন জাগে আচ্ছা হঠাৎ করে মেয়ে টা এমন ভিষম খেলো কেন? তাকে দেখে? ভেবে সামিরের ভ্রু কুঁচকে আসে। নূরা ডাইনিং ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সিঁড়িতে উঠার সময় সামিরের মুখোমুখি হয়ে যায় নূরা। নূরা রাগী চোখে সামিরের দিকে তাকায়। তারপর মুখ ঘুরিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে যায়। এদিকে সামির আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইল। নিহাল সামিরের কাছে এসে কনুই দিয়ে বন্ধুকে গুতা দিয়ে বলল,

“- বন্ধু হা হয়ে আমার বোনের দিকে তাকিয়ে কি দেখছো?

সামির আনমনে বলে,

“- তোর বোনের দিকে না। তিন কবুল বলে বিয়ে করা আমার বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছি। তাতে তোর প্রবলেম কোথায় ভাই ?

নিহাল চোখ বড়বড় করে চেচিয়ে বলল,

“- দুলাভাইইই…….

সামিরের হুঁশ আসতেই চমকে তাকালো নিহালের দিকে। নিহাল বার বার দুলাভাই বলে জব করছে। সামির কপট রাগ দেখিয়ে বলে,

“- এই শা*লা চুপ কর।

নিহাল রসিকতা করে বলে,

“- বন্ধু আমি কিন্তু সব জানি….

সামির নিহালের পিঠে কিল মেরে বলে,

“- কি জানিস তুই হ্যাঁ। চুপ থাকতে পারিস না বেটা। সবসময় বাচাল দের মতো বকবক করিস কেন?

নিহাল রেগে সামিরের পিঠে সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে বলল,

“- শা*লা তুই আমায় বাচাল দের সাথে তুলনা করিস? যাহ তোর সাথে আর কথা’য় বলব না। আড়ি! বলে মুখ গোমড়া করে অন্য দিকে ফিরে তাকায়। বন্ধুর অভিমান দেখে মনে মনে হাসল সামির৷ তারপর পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,

“- তুই বাঁচাল তাতে কি? তোর মতো বাঁচাল বন্ধু পেয়ে আমি অনেক লাকি বন্ধু। তাই নাটক কম করো পিও!

নিহাল আড়চোখে তাকায়৷ সেটা দেখে সামির শব্দ করে হেসে বলে,

“- আমি কি মেয়ে মানুষ তুই বাঁকা চোখে তাকাস ক্যান?

“- শা*লা তুই মানুষ টায় খারাপ!
বলে গটগট পায়ে ডাইনিং এ গিয়ে বসল। নিহালের পিছন পিছন সামিরও গেলো। সামির কে দেখে সৌজন্যতার হেসে স্বপ্না বেগম বললেন,

“- তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন বাবা? খেতে বসো।

সামির ভদ্র ছেলের মতো চেয়ার টেনে বসল৷

এখানে আসার কোনো পরিকল্পনায় সামিরের ছিলো না। দুই বন্ধু আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। তখন নিহাল সামির কে জোর করে তাদের বাসায় নিয়ে এসেছে৷ অবশ্য এর একটা কারণ আছে। নিহাল সেটা সামির কে বলে নি। স্বপ্না বেগম নিহাল কে নূরা’র আসার খবর দেয়। এতদিন পর বোনের ফেরার খবর শুনে নিহাল খুব খুশি হয়। খুশির ঠেলায় সামিরকে প্রায় বলেই দিছিলো। পরমুহূর্তে কিছু একটা মাথায় আসতেই চুপ হয়ে যায় নিহাল। নিহাল সামির কে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য বাসায় নিয়ে আসে কিন্তু তাদের দেখে তার বোন টা এমন ভাবে ভিষম খেলো যে খাবার না খেয়েই তাকে উঠে যেতে হয়েছে। এমনকি ঠিক করে কথাও বলা হলো না। নিহাল ভাবনায় এতটায় বিভোর ছিল যে কারোর ডাক ই তার কানে যায় নি। এদিকে স্বপ্না বেগম কখন থেকে নিহাল কে ডেকেই চলেছেন কিন্তু নিহাল কোনো সাড়াশব্দ দিচ্ছে না। বিষয় টা লক্ষ করে সামির মনে মনে শয়তানি হেসে বলল,

“- দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা তোকে।

বলে সামির টেবিলের নিচ থেকে নিহালের পায়ে পাড়া দেয়। নিহাল ব্যথায় চিৎকার করে ওঠে। রাগী দৃষ্টিতে সামিরের দিকে তাকায়। সামির ইনোসেন্ট ফেস করে বলে,

“- বন্ধু কি হলো? চিৎকার করছিস কেন? কোনো সমস্যা?

সুলাইমান আহমেদ ছেলে কে বললেন,

“- খাবার খাওয়ার সময় মনোযোগ কোথায় যায় তোমার? হুটহাট এভাবে চিৎকার করছো কেন?

নিহাল পায়ে ব্যথা নিয়ে হালকা হেঁসে বলল,

“- কিছু না বাবা। আমি ঠিক আছি।

“- তাহলে চিৎকার করলে কেন? এটা কোন ধরনের ভদ্রতা?

নিহাল বাবার কথার প্রতিত্তোরে কিছু বলল না। দাঁত কিড়মিড় করে সামিরের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,

“- খুব মজা লাগছে তাই না? পায়ে ব্যথা দিয়ে ন্যাকামি করে শুনছিস বন্ধু কি হয়েছে? শা*লা একটা। শোন, এখানে আব্বু আম্মু রয়েছে নয়তো তোকেও দু ঘা বসিয়ে দিতাম।

সামির মুচকি হেঁসে বলল,

“- বলবো আঙ্কেল আন্টি কে?

নিহাল অবাক হয়ে বলল,
“- কি বলবি?

সামির বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হেসে বলে,

“- বলি তাদের একমাত্র মেয়ের জামাই কে তুই অকারণে বকাবকি করছিস। এমনকি আমাকেও থ্রেটও দিচ্ছিস।

নিহাল আশ্চর্য হয়ে বলল,

“- আমি কখন তোকে বকাবকি করলাম আর থ্রেট ই বা কখন দিলাম ভাই?

“- মাথা মোটা। চুপ করে খা নয়তো বাঁশ খাইয়ে দিবো।

নিহাল কিছু না বলে চুপ করে গেলো। সামির কে দিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই। এই বেটা চাইলেই তাকে বাঁশ খাইয়ে দিতে পারে। তাই চুপ থাকায় শ্রেয় বলে মনে হলো নিহালের। নিহাল কে চুপ করে যেতে দেখে মনে মনে হাসলো সামির।

সকলে চুপচাপ খাচ্ছে। স্বপ্না বেগম সবাই কে খাবার সার্ভ করে দিচ্ছেন। সুলাইমান আহমেদ খেতে খেতে সামির কে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“- সামির বাবা, তোমার বাবা মা কেমন আছেন?

সামির ভাত গিলে শশুর কে জবাব দেয়।

“- জ্বি আঙ্কেল, আব্বু আম্মু আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন।

“- তারা তো আমাদের ভুলেই বসেছেন? সেই যে গেলো আর আসল না বেড়াতে। মাঝে মধ্যে আসলে আমাদের ভালো লাগে তো। বাসায় ফিরে কিন্তু অবশ্যই আমাদের কথা বলবে। এসে বেড়ায় যেতে বলবে।

সামির মুচকি হেঁসে বলল,

“- জ্বি আঙ্কেল, অবশ্যই বলব।

“- এত আঙ্কেল আঙ্কেল করো কেন? এখন থেকে বাবা বলে ডাকবে।

“- জ্বি।

দু’জনের কথার ভিতর নিহাল ফরং কেটে বলে,

“- মা তোমাদের আদরের জামাইকে আরেকটু ভাত দাও। বেচারা লজ্জা চাইতে পারছে না।

সামির রেগে তাকায়। নিহাল বোকা হেঁসে বলল,

“- এভাবে তাকাস ক্যান ভাই? আমি তো তোর ভালোর জন্য বললাম। আজকাল কারুর ভালো করতে নেই। যে ভালো করবে সেই খারাপ হয়ে যাবে। হায়রে নিষ্ঠুর পৃথিবী।

সামির দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলে,

“- তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস নিহাল।

“- তুই ও করেছিস। এখন শোধবোধ। আম্মা এখন তোর প্লেট ভর্তি ভাত দিবে তুই সেটা খেয়ে বুইড়া বেডাদের মতো ভুড়ি বানিয়ে উঠবি।

“- তোকে তো….

“- এই নাও বাবা, চাইতে লজ্জা কিসের? আমরা তো তোমার আপনজন। আমি তো তোমার আরেকটা মা। মা’য়ের কাছে চাইতে লজ্জা কিসের?

বলতে বলতে স্বপ্না বেগম এক চামচ ভাত সামিরের প্লেটে বেড়ে দিলো। বেচারা সামির মহা বিপদে পড়ে গেলো। স্বপ্না বেগম যখনই আরেক চামচ ভাত সামিরের প্লেটে দিতে যাবেন তখনই সামির চেচিয়ে বলে,

“- আন্টি আর লাগবে না। এমনিতেই আমার পেট ভরে গেছে খেতে পারছি না। তাই প্লিজ আর দিয়েন।দিলে অযথা অপচয় হবে।

স্বপ্না বেগম বললেন,

“- সেকি বাবা মাত্র একটু খেলে তো আরেকটু দেই?

‘- প্লিজ আন্টি…!

“- আহা! ছেলে টা কে আর জোর করো না। যেটুকু খেতে পারে দাও। জোর করে খাওয়ালে পেটে সমস্যা হবে।

সামির শশুরের দিকে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকায়।

,
,
,

দুই বন্ধু ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। সামির খাওয়ার পরই চলে যেতে চাইছিল কিন্তু নিহাল যেতে দেয়নি। বলেছে সবে মাত্র সাড়ে নয়টা বাজে দশটার সময় যাস। বন্ধু কথা’য় রাজি হলো। সামির দুর আকাশের দিকে তাকিয়ে নিহাল কে প্রশ্ন করে,

“- নূরা যে বাসায় সেটা আমাকে বলিস নি কেন?

“- বললে সারপ্রাইজ থাকতো না।

“- সারপ্রাইজ!

“- হ্যাঁ তোকে সারপ্রাইজ দেবো বলে বলিনি। আম্মু তখন ফোন দিয়ে জানায় নূরা এসেছে। তাই তোকে জোর করে এনেছি। কোন তুই নূরা কে দেখে খুশি হোসনি?

সামির কিছু বলল না। চুপ করে থেকে হাঁটা ধরল। সামির কে চলে যেতে দেখে নিহাল বলল,

“- কোথায় যাচ্ছিস?

সামিরের সোজা জবাব,

“- বউয়ের কাছে যাচ্ছি ।

চলবে~