#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১১
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
আজ রাতে ইমরান আর সানজিদার গায়ে হলুদ। সব ব্যবস্থা ইমরান নিজের হাতেই করেছে। এপার্টমেন্টের ছাদ সুন্দর করে লাইটিং করা হয়েছে সেখানেই স্টেজ করা হয়েছে। একই এপার্টমেন্টে বিয়ে হওয়ার দরুন আনন্দ যেন দ্বিগুণ হয়ে উঠেছে। ইশাত সানজিদার শাড়ি পরিপাটি করে দিচ্ছে আদিবাও সাথে রয়েছে সে ফুলের গহনাগুলো ড্রেসিং টেবিলে এনে সাজিয়ে রাখছে। সানজিদার পড়া শাড়িটা কাঁচা হলুদ রঙের সাথে সবুজ পাড় করা। পার্লারের মেয়েদের বাসায়ই ডেকে আনা হয়েছে। মেয়েগুলো সানজিদাকে নিজের মতো করে সাজাতে ব্যস্ত।
সাজানো শেষ হতেই এক এক করে হাতে,গলায়, কানে, মাথায় কাঁচা ফুলের গহনা পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাকে। গহনাগুলো মূলত গোলাপ, বেলি আর রজনীগন্ধার মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে। কাঁচা ফুলের সুবাসে চারপাশ মৌ মৌ করছে। ইশাত আর আদিবাও শাড়ি পরেছে হলুদ রঙের। তবে ইশাত শাড়ির সাথে ফুল হাতা ব্লাউজ আর হিজাব পড়েছে। সাথে পড়েছে সামান্য পরিমাণ কাঁচা ফুলের গহনা।
সানজিদাকে সাজানো শেষ হলে ইশাত ছাদে উঠে ভাইকে দেখতে চলে গেল। সেদিকে ইমরানের গায়ে হলুদের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। ইমরানকে হলুদ লাগানো শেষ করেই সানজিদাকে হলুদ লাগানো শুধু হবে। একজন ইশাতের দিকে এগিয়ে এসে বলল।
— তাড়াতাড়ি গিয়ে হলুদ লাগাও ভাইকে গিয়ে। তুমি হলুদ না লাগানো পর্যন্ত সে কাউকেই হলুদ পড়াতে দিচ্ছে না এভাবে বসে থাকলে অনুষ্ঠানে দেরি হয়ে যাবে।
ইশাত মাথা দুলিয়ে হাস্যজ্বল মুখে এগিয়ে গেলো স্টেজের দিকে। দেখলো ইমরান স্টেজে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে আছে তার অপেক্ষায়। সামনেই কয়েকধরণের ফল নকশা করে ডালায় সাজিয় রাখা। যেটা ইশাতই কেটে সাজিয়েছিল কিছুক্ষণ আগে। সাথে রয়েছে কয়েক পদের মিষ্টি আর হলুদের কেক। কেকটা ইশাত অনলাইন থেকে কাষ্টমাইজ করে আনিয়েছে।
সবার প্রথমে ইশাত ভাইকে হলুদ লাগিয়ে দিতেই একে একে বাকিরা সুযোগ পেল। ইমরান এতক্ষন কাউকে হলুদ লাগাতে দিচ্ছিল না তার কথা ছিল ইশাতই তাকে সবার প্রথমে হলুদ লাগিয়ে দিবে। বাকিরা এতক্ষন অপেক্ষায় বসে ছিল। চেনা পরিচিত কিছু সংখ্যক আত্মীয়স্বজনরা সেখানে উপস্থিত রয়েছে। বিয়ে বাড়ির সুসজ্জায় তাদের পুরো এপার্টমেন্টে একটা উৎসব উৎসব আমেজ বিরাজ করছে।
বাটিতে হলুদ ফুরিয়ে এলে ইশাতকে পাঠানো হলো নিচে হলুদ নিয়ে আসতে। তখন নিচে গেটের সামনে এসে থামলো একটি প্রাইভেট কার। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো হলুদ পাঞ্জাবি পরিহিত আসিফ। আসিফ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে প্রথমেই তার সামনে পড়লো ইশাত। আসিফকে দেখেও অদেখা করলো সে। তখন আসিফ মনে জমিয়ে রাখা ক্লেশ নিয়ে বলল।
— আমাকে ইগনোর করছো?
ইশাত জানতো আসিফ কথা না বলে নড়বে না তাই সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— ভাইয়া উপড়ে ছাদেই আছেন গিয়ে হলুদ লাগিয়ে আসুন।
— আমি তো তোমাকে কিছু বললাম।
ইশাত বুঝলো আসিফ হাল ছাড়ার ছেলে নয় তাই তাকে বুঝাতে সে বলল।
— আপনি আমাকে নিয়ে মনে যা পোষণ করেন সেটা জানার পর আপনাকে ইগনোর করাটা কি স্বাভাবিক নয় বলুন?
— তাহলে কি আমরা অন্য সবার মত স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারি না? তুমি আমাকে ভালো নাই বাসলে কিন্তু অন্তত আমার বন্ধুত্বটা গ্রহণ করো। একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকুক আমাদের মাঝে। এটা আমার রিকুয়েস্ট তোমার কাছে। মানা করো না প্লীজ।
— ঠিকাছে করবো তবে এক শর্তে।
— কিসের শর্ত?
— আমাকে আপনার ভুলে যেতে হবে। মন থেকে মুছে ফেলতে হবে সেইসব অনুভূতি যা আপনি আমাকে নিয়ে পোষণ করছেন। বলুন পারবেন? পারলে তবেই গ্রহণ করব আপনার বন্ধুত্ব।
— দেখো ইশাত এই অবাধ্য মনের উপর আমার নিজের কোনো জোড় নেই। থাকলে অনেক আগেই ভুলে যেতাম তোমাকে এভাবে বিরক্ত করতাম না বারবার। কিন্তু তুমি যদি এতে খুশি থাকো তাহলে আমি নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। বল বন্ধু হবে? হয়তো এই খাতিরে আমার জন্য মুভ ওন করাটাও সহজ হবে। নাহলে সারাদিন তোমার ভাবনাই আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকবে।
ইশাত এতক্ষনে সহজ হয়ে বলল।
— ঠিকাছে হব, আপনি উপরে যান আমি হলুদের বাটি নিয়ে ফিরছি।
আসিফ আস্কারা পেয়ে বলল।
— আমি আসবো তোমার সাথে? সাহায্য লাগবে কোনো?
— না কোনো প্রয়োজন নেই আমি পারব।
— এসো তবে অপেক্ষা করছি।
আসিফকে ছাদে পাঠিয়ে ইশাত হলুদের বাটি আনতে ভেতরে চলে গেল। পুরো এপার্টমেন্টের মহল আজ আনন্দঘন। সবাই একত্রে হৈচৈ আর আনন্দে মেতে আছে। অথচ ইশাতের মন যেয়ে আছে কোন এক অজানা অচেনা ব্যক্তির খেয়ালে। তাকে মনে করে বারবার ইশাতের হৃদয় ভালো লাগায় ছেয়ে যাচ্ছে। সেদিন তাকে দেখার পর থেকে মনে অনুভূতির রেশ যেনো কাটতেই চাচ্ছে না। আগে বিয়ের নামে যে মেয়ে গরম তেলে পানির ছেটার মতো করে ছ্যাৎ করে উঠতো ইদানিং সে মেয়ে মনের গহীনের অচেনা পুরুষটিকে নিয়ে স্বপ্ন সাজায়। আল্লাহ ভাগ্যে রাখলে হয়তো একদিন তাদেরও এমন শুভ দিন আসবে এসব ভাবতেই আনমনে লজ্জায় ইশাতের ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসির ঝলক ফুটে উঠলো। অস্ফুটে বলে উঠলো।
— আমি আল্লাহর খাতিরে আমাদের সর্ম্পকটা হালাল করতে চাই। কোনো প্রকার হারামে জড়ানো ছাড়াই পবিত্রতার রূপ দিতে চাই। আপনি কি কোনোদিন বুঝবেন আপনাকে ঘিরে আমার ক্লান্তিহীন ফরিয়াদ? কখনও কি জানবেন আপনাকে ঘিরে আমার হৃদয়ের বেসামাল কাতরতা?
সহসা তার চোখের কোনে পানি জমে এলো। হাতের পিঠে গড়িয়ে পড়া পানিটুকু মুছে সে আবারো আওরালো।
— এইযে সবাই কত আনন্দ করছে মন খুলে উপভোগ করছে হাসছে। আমি কেন পারছি না বলুন? পদে পদে প্রত্যেকটা মুহূর্তে আপনার বিরহ কেন আমায় পোড়ায়? কে হন আপনি আমার? কতটুকু চিনি? কতটুকুই বা জানি আপনাকে? কিছুই তো জানি না। আপাতত নন মাহরাম ব্যতিত তো আর কেউই নন। আপনার ভাবনাও যে আমার জন্য হারাম। কবে ঘুচবে এই বিরহের দহন? কবে জুড়বে আপনার নামের সাথে আমার নাম? আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ যেহেতু আমাকে হাত তুলে আপনাকে চাওয়ার তাওফিক দিয়েছেন সেভাবেই আপনাকে হাসিল করারও তাওফিক তিনিই দিবেন। যে মেয়ে এক ওয়াক্ত নামাজ আগে ঠিক মতো পড়তে চাইতো না সে মেয়ে এখন আপনাকে রবের কাছে চাইতে রোজ রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে আপনাকে পাওয়ার আবেদন করে। হৃদয় ভেঙে চুড়ে নিজেকে রবের কাছে তুলে ধরে। আল্লাহ চাইলে একদিন আপনার মনেও তিনি আমার জন্য জায়গা করে দিবেন। সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।
ওদিকে মায়ের ডাকে ইশাতের সংবিৎ ফিরে এলো। আজ তার ভাইয়ের জীবনের সুন্দর একটি দিন অনেক দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে তার উপর। এই ভেবে কতশত কল্পনা জল্পনার ইতি টেনে মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ছুটে চলে গেলো সেদিকটায়।
_________________________
নিস্তব্ধ আধারে পুরোনো একটি সমাধির সামনে সটান হয়ে দাড়িয়ে আছে এভিয়ান। সমাধির শিয়রে ফলকে স্পষ্ট করে গুটি গুটি ইংরেজি অক্ষরে লিখা একটি নাম “মারিয়া রোজারিও”। আশেপাশে জংলা লতাপাতায় অর্ধেকটা ঢেকে আছে। এভিয়ান শূন্য নয়নে সেই সমাধিটির দিকে পকলহীন চেয়ে আছে। তার অভিব্যক্তিতে কঠোরতা দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই তার ভেতরে কি চলছে। অযাচিত কোনো এক পুরোনো ক্ষত দৃশ্যপটের মতো করে চোখের সামনে ভেসে উঠতেই মনের গহীনের শাঁ শাঁ করে বয়ে চলা ঝড় দমানোর ক্ষুদ্র প্রয়াসে দাঁতে দাঁত চেপে রাখাতে ক্রমশ সুগঠিত শক্তপোক্ত চোয়ালে তার পুরুষালী সৌন্দর্য আরও দৃঢ়তা টেনেছে।
এই সমাধিটির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে তার জীবনের কোনো এক অধ্যায় জড়িয়ে রয়েছে। ভাবনার গভীরে তলিয়ে যেতেই এভিয়ান নীরবে তার পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেলো। ভাবনা থেকে বেরিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করতেই একটা পুরুষালী হাত এসে তার কাঁধ ছুলো। এভিয়ান পেছনে না ফিরেই অনুভূতিশূন্য গলায় আওরালো।
— তুই এখানে কি করছিস?
রিজভী বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে জানতে চাইলো।
— ওয়াও তুই আমার কন্ঠ না শুনেই আমাকে চিনে গেলি? হাও? এতো ভালবাসিস বুঝি আমায়?
এভিয়ান বিরক্তি নিয়ে বলল।
— হেয়ালি করিস না।
রিজভী আবারো তার প্রশ্নে অনড় থেকে বলল।
— বল না কিভাবে বুঝলি? তুই তো ফিরে তাকাসও নি। দেখিসও নি আমাকে।
এভিয়ান ব্যস্ত হাতে পকেট থেকে সি’গারেটের প্যাকেট বের করে লম্বা লম্বা আঙুলের ভাজে একটা সি’গারেটের শলা নিয়ে লাইটারের সাহায্যে আগুন ধরাতে ধরাতে বলল।
— তুই জানিস দুনিয়ার আড়ালে আমার অস্তিত্ব কি? আমি মেন্টালি ট্রেইন্ড এসব তুচ্ছ অনুমান আমার কাছে কোনো বড় বিষয় না।
রিজভী চিবুকে তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে বলল।
— ওহ হ্যা আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম আমাদের এভির আবার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তীক্ষ্ম।
এভিয়ান নাকে শব্দ করে উচ্চারণ করলো।
— হুম, তুই কোন কাজে এসেছিস?
— আমি তো তোকে খুজতে এসেছিলাম গার্ডরা বলল তুই নাকি বাড়ির পেছনের দিকে আছিস তাই চলে এলাম। কিছু ফাইল নিতে এসেছিলাম তোর কাছ থেকে।
— ফাইল আমার রুমে।
— তাহলে চল এখানে দাঁড়িয়ে থেকে মশার কামড় খেয়ে যদি আমার ডেঙ্গু হয়ে যায় তখন আমার বউ বেচারিটা অল্প বয়সেই বি’ধবা হতে বসবে।
রিজভীর এমন অহেতুক কথাবার্তায় এভিয়ান বিরক্তিতে বড় বড় কদম ফেলে পরিত্যক্ত জায়গাটি ত্যাগ করলো। রিজভীও তার পিছু পিছু ছুটলো। রিজভী এভিয়ানের রুমে এসে তার বেডে লাফ দিয়ে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে নিজের মত বকবক করতে লাগলো।
— তোর রুমটা অনেক জোস। মন চায় এখানেই থেকে যাই। সমস্যা নাই তোর রুম মানেই তো আমার রুম। তাই না?
রিজভীর কথায় কান না দিয়ে এভিয়ান এগিয়ে গিয়ে কাবার্ডের স্লাইডিং ডোর ঠেলে ড্রয়ার থেকে কিছু ফাইল বের করছিল তখন ড্রয়ারের একপাশে রাখা একটা পুরোনো অ্যালবাম তার হাতে এসে লাগলো। সে বিরক্তিতে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো রুমের এক কোনায়।
সেটা দেখে রিজভী এক ঝটকায় উঠে অ্যালবামটা হাতে তুলে নিলো। দ্রুত হাতে অ্যালবামের পাতা উল্টে ছবিগুলো দেখতেই রিজভীর চোখে চমক ফুটে উঠলো। ছবিতে দেখা যাচ্ছে হাস্যজ্বল এভিয়ানকে। যাকে এর আগে কখনো সে দেখে নি। তখন তার বয়স হয়তো ১৩-১৫ এর মাঝামাঝি। ছবিতে বেশ চঞ্চল এক যুবক সে। হাতে ফুটবল আর মুখে প্রাণবন্ত নিষ্পাপ হাসি। এ যেন বর্তমানের গম্ভীর এভিয়ানের পুরো বিপরীত একটি চরিত্র। বাকি ছবিগুলো উল্টে পাল্টে দেখার আগেই এভিয়ান ছো মে,রে তার হাত থেকে সেটা নিয়ে বদলে একটা ফাইল তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল।
— ফাইল নিতে এসেছিস ফাইল নিয়ে চলে যা। এসব ঘাটতে যাবি না।
রিজভী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— আগের ছোট্ট এভিয়ানকে দেখে যা বুঝলাম সে আগে এমন রুক্ষ ছিল না। একটা নিষ্পাপ চঞ্চল যুবক থেকে কিভাবে এক নৃ’শংস ব’র্বর জগতের সম্রাট হয়ে উঠলি? নিশ্চই এর পিছনে নি’র্মম কোনো রহস্য লুকিয়ে? নিশ্চই অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে তোকে? আমি তোকে সারাজীবন এভাবে দেখতে চাই না। সময় থাকতে এই আধার জগতে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগেই বেরিয়ে আয়। নিজের মনের কষ্টগুলো এভাবে মনে চেপে রাখিস না। প্রকাশ করতে শিখ।
— সম্ভব না। সেই দিন অনেক আগেই পেছনে ফেলে রেখে এসেছি। অনেক সময় ভাগ্য মানুষকে বদলাতে বাধ্য করে। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। আমার জীবন গভীর আধারে তলিয়ে গেছে এর থেকে নিস্তারের কোনো পথ নেই। ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই। যতদিন বেঁচে আছি এভাবেই বাঁচতে হবে আমাকে। এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে তোর লাভ নেই।
— যদি কোনো আশার আলো পাঠিয়ে সৃষ্টিকর্তা এই অসম্ভবকে সম্ভব করতেন?
— আমি কোনো সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করি না। কোনো ধর্মেই বিশ্বাস করি না। সৃষ্টিকর্তা যদি আসলেই এক্সিস্ট করতো তাহলে আজ আমার জীবনটা এমন হতো না। আমিও স্বাভাবিক মানুষের মতো বাঁচতে পারতাম। এমন অমানবিক হতে হতো না।
— এসব কারণে তুই সৃষ্টিকর্তার থেকে বিমুখ হতে পরিস না। নিশ্চই তার পরিকল্পনা ভিন্ন। তার থেকে একবার কি কখনও কিছু চেয়ে দেখেছিস?
— প্রয়োজনবোধ করি নি। এসব কথা বাদ দে। কাল ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে সব ফাইল ঠিকঠাক মতো রেডি রাখিস।
রিজভী পেটে হাত রেখে শরীর ছেড়ে দিয়ে বলল।
— বাসায় গিয়ে করবো। তুই আগে কিছু খেতে দে আমায় খিদে পেয়েছে ভীষণ। পেটে দুষ্টু ইদুর দৌড়াচ্ছে।
— বাসায় কি তোর বউ তোকে খাওয়ায় না?
রিজভী অসহায় মুখ করে বলল।
— এমন করিস কেন? ফ্রেন্ডের বাসায় আসলে বুঝি ফ্রেন্ড এভাবে না খাইয়ে তাড়িয়ে দেয়? কেমন নির্দয় ফ্রেন্ড রে তুই?
— অভিনয় বন্ধ কর। যা খাওয়ার নিচে গিয়ে ফ্রিজ থেকে বের করে খেয়ে নে।
— ওইসব রেডিমেড খাবার তো চাইলে আমি দোকানে গিয়েই কিনে খেতে পারি।
— এমন ভান করছিস যেন জানিস না আমার বাড়িতে রান্না করার মতো কেউ নেই।
— এর জন্যই বলি বিয়েটা কর। কিন্তু তা করবি কেন? যাহ খাওয়ার মুডই চলে গেছে আমার। তোকে দেখে এখন আমারই মায়া হচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে আসার আগে তোর জন্য আমার বউয়ের হাতের হোম মেড খাবার নিয়ে আসা উচিত ছিল। বুঝি না কিসব খেয়ে থেকে তুই এতো সুন্দর বডি বিল্ড করেছিস?
— সাট আপ! এর জন্যই তো খেয়ে খেয়ে এমন হচ্ছিস।
— এহহ! তোর মতো এতো মাসাল না থাকলেও আমি ফিট আছি বুঝেছিস।
— আমার সাথে একদিন লড়তে আসিস তোর এই বডি নিয়ে। একটু যাচাই করতাম তোর শরীরের শক্তি কেমন।
এভিয়ানের কথার জালে ফেঁসে রিজভী ঘাবড়ে গিয়ে বলল।
— না বাবা থাক, এসব কু’প্রস্তাব আমাকে দিবি না। এখন আমি গেলাম তাহলে। পরে আবার এসে জ্বালিয়ে যাব।
এভিয়ান রিজভীকে ধাওয়া করে বলল।
— আমার হাতের মা’র খাওয়ার আগেই চোখের সামনে থেকে দুর হ।
রিজভী ছুটতে ছুটতে বলল।
— যেটা বললাম সেটা ভেবে দেখিস। একটা বিয়ে কর। দেখবি ভালো ভালো খেতে পারবি সাথে বউয়ের হাতের মা’র তো একদম ফ্রী।
রিজভীকে আর কে পায় সে তার কথাটা বলেই উধাও। এভিয়ান আর তাকে তাড়া করলো না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডিভানে বসে শরীরের সকল ভার ছেড়ে দিলো। মাঝে মাঝে তার মনেহয় তার জীবন অর্থহীন কোনো উদ্দেশ্য নেই তার জীবনে যেটা আঁকড়ে ধরে সে বেঁচে থাকবে। সকল ক্ষমতা অধিপতি তখন তুচ্ছ ঠেকে। কপালে আঙুল ঘষতে ঘষতে ডিভানে মাথা এলিয়ে দিতেই নানান ভাবনা এসে মাথায় জায়গা করে নিলো। অকস্মাৎ বদ্ধ চোখে ভেসে উঠলো এক জোড়া মায়াবী মেয়েলি চোখ। সাথে সাথেই সে চোখ মেলে তাকালো। দুচোখে চকচক করে উঠল শুধুই প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধ। ঠোঁটের বক্রহাসিতে ভেতরের পৈশাচিক সত্ত্বাটা আবারো দপদপ করে জেগে উঠলো। মুখে বিড়বিড়িয়ে বলল।
— এই অশুভ নজর যে জিনিসেই পড়ে তা ধ্বং’স হয়ে যায়। আইজিপি ইমরান হাসান তোর একটা মাত্র ভুলের মাশুল দিতে তোর বোনের জীবন ধ্বং’সের পথে। অচিরেই বুঝবি কোন সিংহের গুহায় হাত রেখেছিলি তুই। তোকে তোর জায়গা দেখিয়ে দিতেই হবে। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায়।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১২
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
আজ দিন তারিখ অনুযায়ী বাদ জুমা আনুষ্ঠানিকভাবে সানজিদা আর ইমরানের কবুল পড়ানো হবে। বরযাত্রায় সানজিদার বাবা মা বাড়ির কাছাকাছি একটা কনভেনশন হলে সব আয়োজন করেছেন। বরপক্ষ এসে পৌঁছাতেই কনে পক্ষের বাড়ির ছেলেমেয়েরা হইচই করতে করতে গেট আটকে টাকা দাবি করে বসলো। দুপক্ষের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ দরকষাকষি চলল। অবশেষে ইমরান পাঁচ হাজার টাকা বের করে তাদের হাতে ধরিয়ে দিতেই সানজিদার একজন কাজিন এসে ইমরানের সামনে একটা ট্রে বাড়িয়ে ধরলো। যেটাতে ছিল শরবতের গ্লাস আর মিষ্টি। ইমরান শরবতের গ্লাসটা হাতে তুলতেই যাবে তার আগেই ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন ইমরানের কানে কানে ফিসফিস করে বলল।
“এই শরবত খাস না ওরা ঝাল মিশিয়ে দিয়েছে ওটাতে।”
ইমরান কথাটা মন দিয়ে শুনল পরক্ষণে ক্ষীণ হেসে শরবতের গ্লাসটা হাতে নিলোও। তবে খাওয়ার নাম করে নাটকীয়ভাবে হাত থেকে ফেলে দিয়ে বলল।
“ওহহো এটা কি হলো! আচ্ছা সমস্যা নেই ভেতরে গিয়ে নাহয় পানি খেয়ে নেব।”
ঝাল শরবতটা পড়ে যাওয়াতে মেয়েগুলো হতাশ হয়ে গেল। আর উপায়ন্তর না পেয়ে তারা পথ ছেড়ে দাড়ালো। ইমরান তখন সানন্দে দলবল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো।
কাজী সবে মাত্র এসে উপস্থিত হলো। সানজিদাকেও পার্লার থেকে সাজিয়ে আনা হয়েছে এতক্ষনে। ইশাত আর আদিবা দুদিক থেকে সানজিদার ভারী লেহেঙ্গা সামলে তাকে সামনে এগোতে সাহায্য করছে। তারা সানজিদাকে স্টেজে তুলে ইমরানের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে বসিয়ে দিলো।
সানজিদার হাত ভর্তি মেহেদী। পড়নে লেহেঙ্গাটি নুড কালারের তাতে খুবই ভারী স্টোনের কারুকাজ করা। সাথে মিলিয়ে হিজাব আর গহনায় তাকে অপরূপ দেখাচ্ছে। ইমরান ক্রিম কালারের শেরওয়ানি পড়েছে তাকেও বেশ সুদর্শন লাগছে আজ। ইমরানের সাথে চোখাচোখি হতেই সানজিদা দেখলো সে কেমন মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে সাথে সাথে লজ্জা পেয়ে মাথা নুইয়ে ফেললো।
ইশাত মব কালারের লেহেঙ্গা পড়েছে কাজের সাথে মিলিয়ে মসৃণ সিল্ক কাপড়ের ধূসর রঙের হিজাব পড়েছে। আদিবা পেস্টেল গ্রিন রঙের লেহেঙ্গা পড়েছে সাথে সুন্দর একটা চুলের স্টাইল করেছে। ইশাত তাকে বুঝিয়েছে হিজাব পড়তে কিন্তু সে অজুহাত দেখিয়ে কেটে পড়েছে। ইশাতও আর তাকে জোরাজুরি করে নি।
স্টেজের কিছুটা দূরত্বে বুকে হাত বেঁধে আনমনা হয়ে দাড়িয়ে আছে আসিফ। তার মুগ্ধ নয়নজোড়া ইশাতেই আবদ্ধ। দুনিয়ার সকল মুগ্ধতা যেন তার চোখেই ঠাঁই নিয়েছে আজ। যেন সহস্র অনুভূতিরা হৃদয়ের কোনে অনায়াসে জায়গা করে নিয়েছে চোখের তারায় ভেসে থাকা এই রমণীকে ঘিরে। এভাবে সে কতক্ষন দাঁড়িয়ে ছিল তার জানা নেই তবে হঠাৎ মায়ের ডাকে তার হুস ফিরে।
ওদিকে বড়দের উপস্থিতিতে ইমরান আর সানজিদার কবুল পড়ানো শুরু হয়ে গেছে। সেদিকটায় আসিফকে ডাকা হচ্ছে। তাই সে সেদিকে এগিয়ে গেল। কাজী উভয় পক্ষের সম্মতিতে ধার্যকৃত মোহরানার পরিমাণ নিশ্চিত করে সাক্ষীদের যাচাই করে নিলেন। ইজাব-কবুলের আগে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলের (সা.) এর সুন্নাহ সম্বলিত একটি সংক্ষিপ্ত খুতবা পাঠ করলেন। খুতবা শেষ করে তিনি ইমরানকে প্রথমে কবুল বলতে বললেন। ইমরান অকপটে বলল।
“কবুল করলাম।”
ইমরানকে তিনবার কবুল পড়ানো শেষ হলে কাজী এবার সানজিদার দিকে ফিরে তাকে কবুল বলতে বললেন। মুখে কবুল উচ্চারণ করার আগে সানজিদার চোখের কোনে পানি জমে এলো। বাবা মাকে ছেড়ে শশুর বাড়িতে চলে যাবে ভাবতেই তার কষ্টে বুক ভার হয়ে এলো। সে মুখ উঁচিয়ে মায়ের দিকে একবার চাইলো। তার মা তাকে চোখের ইশারায় আশ্বস্থ করতেই সে থেমে থেমে তিনবার কবুল পড়ে নিলো। দুজনের কবুল পড়া শেষ হতেই সবাই খুশিতে আলহামদুলিল্লাহ পড়ে একেঅপরকে অভিনন্দন জানাতে লাগলো।
মুখে কবুল পড়ার পর কাজী নিকাহনামার নির্দিষ্ট কলামগুলো পূরণ করে বর কনের স্বাক্ষরের জন্য এগিয়ে দিলেন। ইমরান আর সানজিদার স্বাক্ষর হয়ে গেলেই ওয়ালী এবং সাক্ষীরা নির্দিষ্ট স্থানে স্বাক্ষর করে নিলো। সবশেষে কাজী দোয়া পরিচালনা করে নবদম্পতির জন্য মঙ্গল কামনা করলেন। সবাই একসাথে মোনাজাতের জন্য হাত তুললো। মোনাজাত শেষ করে সকলের মাঝে খেজুর বিতরণ করা হলো। বর কনেকে সবাই এসে অভিনন্দন জানাতে লাগলো। অবশেষে সানজিদার নাম জুড়ে গেলো ইমরানের নামের সাথে। সেটা ভেবেই সানজিদা লজ্জায় মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলল।
ক্যামেরাম্যানরা তাদের সামনে দাড়িয়ে মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্ধি করছিল। সবার একসাথে কয়েকটা পারিবারিক ছবি তোলা শেষ হলে তাদের খাবার টেবিলে বসিয়ে দেওয়া হলো। একদিকে স্টেজে প্রফেশনাল ক্যামেরাম্যান ইমরান আর সানজিদার ভিন্ন ভিন্ন পোজে ছবি তুলে দিচ্ছিল। অন্যদিকে আত্মীয়স্বজনদের খাওয়ানোর পর্ব শুরু হয়ে গেল। এরমধ্যেই সানজিদার কাজিনরা এসে বারবার উঁকিঝুঁকি মেরে সুযোগ খুঁজে যাচ্ছে ইমরানের জুতা চুরি করার। কিন্তু ইমরান সেই সুযোগই দেয় নি কাউকে।
ইশাত তার মাকে আসিফের মায়ের সাথে খেতে বসিয়ে দিলো। সে পরে তার ভাইয়ের সাথে খাবে। ওইদিকে আসফিও খায়নি ইশাতের অপেক্ষায়। কিছুক্ষণ পর ইমরান আর সানজিদার স্টেজে ছবি তোলা শেষ হলে তারাও এসে খেতে টেবিলে বসে গেলো। এতক্ষনে বেশিরভাগ আত্মীয়স্বজনরাই দেখা করে ফিরে গেছে। ইমরান একপাশে তার বোনকে বসালো অন্যপাশে সানজিদাকে সে জানে তার বোন এখনো তাকে ছাড়া কিছুটি খায় নি। আদিবাও তাদের সাথে বসে পড়লো। ইমরান আসিফকেও ডেকে এনে বসালো।
টেবিলে বরের জন্য আলাদা করে রাজকীয় আয়োজন করা হয়েছে। সেখান থেকে ইমরান ভালো ভালো আইটেম বেছে ইশাত আর সানজিদার প্লেটে তুলে দিচ্ছে। তখন আসিফ বাদশেধে বলল।
— ভাইয়া আপনি আপনার বউকে দেখে দেখে খাওয়ান। আমি ইশাতকে দেখে খাওয়াচ্ছি।
কথাটা বলে আসিফ ইশাতকে এটা ওটা এগিয়ে দিলো। ইশাত এতে ইতস্তত বোধ করলেও এতগুলো মানুষের সামনে মুখে কিছু বলল না। অন্যদিকে ইমরান নিজের বোনের প্রতি আসিফের যত্নশীলতা দেখে আসিফের প্রতি সন্তুষ্ট হলো। ছেলেটাকে তার বোনের জন্য ভালোই মনে ধরলো।
________________________
মাত্র কাঁচা ফুলে সাজানো গাড়িটি এসে থেমেছে ইশাতদের এপার্টমেন্টের সামনে। ভেতর থেকে পরপরই বেড়িয়ে এলো ইমরান, সানজিদা,আর আসিয়া বেগম। ইশাত আর আদিবা অনেক আগেই বাড়িতে এসে পৌঁছেছিল বাসরঘর সাজানোর উদ্দেশ্যে। গাড়ি থেকে নামার সময় ইমরান লক্ষ্য করলো সানজিদার ভারী লেহেঙ্গা সামলে হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে। আসিয়া বেগমও সেটা লক্ষ্য করে ছেলেকে বললেন সানজিদাকে সাহায্য করতে ইমরানও মায়ের কথা মান্য করে এগিয়ে গিয়ে সানজিদার লেহেঙ্গা সামলে তাকে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে সাহায্য করলো।
সানজিদা তাদের ফ্লেট পেরিয়ে উপর তলায় উঠার সময় ফুপিয়ে কেঁদে ফেলল। সারা রাস্তায় সে এভাবেই কেঁদে কেঁদে এসেছে। আসিয়া বেগম তাকে অনেক বুঝাতে বুঝাতে নিয়ে এসেছেন। সেরকমভাবে এখনো আসিয়া বেগম তাকে বুঝিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন।
— কেদো না মা। বিয়ের প্রথম প্রথম এমনটা লাগেই পড়ে সব ঠিক হয়ে যায়। তাছাড়া তুমি তো একই বাড়িতে আছো। মন চাইলেই যখন তখন মা বাবার কাছে ছুটে চলে যেতে পারবে।
ইমরান কিছু বলল না সে চুপচাপ গিয়ে দরজায় বেল বাজাতেই ইশাত এসে দরজা খুলে দিলো। সে ভেতরে ঢুকে তার নিজের ঘরে প্রবেশ করতে যাবে এমন সময় আদিবা আর সানজিদার দুইজন কাজিন গেট ধরে দাড়িয়ে হাত পেতে বলল।
— টাকা না দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা নিষিদ্ধ।
এতক্ষনে সানজিদা আর আসিয়া বেগমও এসে গেছেন। ইমরান দেখলো ইশাত একপাশে দাড়িয়ে আছে চুপচাপ আর বাকিদের কান্ড দেখে মিটিমিটি হাসছে। তখন ইমরান ইশাতের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে বলল।
— ওরা গেট ধরলো তুই গেট ধরিস নি কেন?
সানজিদার কাজিনরা তখন মজা করে হেসে হেসে বলল।
“এই প্রথমবার দেখলাম কোনো ভাইকে জিজ্ঞাসা করতে তার বিয়ের গেট বোন কেন ধরে নি!”
ইশাত মুচকি হেসে বলল।
— সমস্যা নেই তোমারই ধরো।
ইমরান তখন আবারো প্রশ্ন করে বলল।
— কেন আমার বোনও তো কষ্ট করে সাজিয়েছে। তার কি টাকা প্রাপ্য নয়?
সানজিদার একজন কাজিন তখন তাড়া দেখিয়ে বলল।
— দুলাভাই বাদ দিন আমাদের গেটের টাকা দিয়ে আপুকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করুন।
ইমরান তাদের জিজ্ঞাসা করে জানতে চাইলো।
— বলো কত চাই তোমাদের?
তাদের মধ্য থেকে অন্যজন আগ বাড়িয়ে বলল।
— পাঁচ হাজার দিলেই হবে। কম করেই বললাম।
ইমরান আর কথা না বাড়িয়ে শেরওয়ানির পকেট থেকে এক হাজার টাকার পাঁচটা কচকচে নোট ধরিয়ে দিলো তাদের হাতে। তারা টাকা পেতেই বেশ খুশি হয়ে গেল। কিন্তু তাদের খুশি বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলো না যখন তারা দেখলো ইমরান ইশাতের কাছে গিয়ে তাকে পাঁচ হাজার টাকার নোট ধরিয়ে বলল।
— নে এটা তোর।
ইমরানের এমনটা করাতে বাকিরা প্রতিবাদ করে বলল।
— দুলাভাই এটা কি করলেন? আমাদের তিনজনকে দিলেন পাঁচ হাজার আর ইশাতকে একাই দিলেন পাঁচ হাজার এটা কি ঠিক হলো?
ইমরান তখন শব্দ করে হেসে বলল।
— তোমারা যা চেয়েছ তাই তো দিলাম আরো চাইলে আরো দিতাম। চাও নি কেন তোমাদের দোষ।
তারা তখন হতাশ হয়ে গেট ছেড়ে দাড়ালো। ইমরান সানজিদাকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলো। বাকিরা যার যার মতো নিজেদের কাজে চলে গেল। ইমরান রুমে ঢুকেই সানজিদাকে বলল সব পাল্টে ফ্রেশ হয়ে ওযু করে আসতে। সানজিদাও তাই করলো। দুজন ওযু করে একসাথে নফল নামাজ আদায় করে বৈবাহিক জীবনের কল্যাণের জন্য হাত তুলে মোনাজাত ধরলো। মোনাজাত শেষে ইমরান সানজিদার দিকে ঘুরে বসলো। সানজিদা এখনো লজ্জায় ইমরানের মুখের দিকে তাকাচ্ছে না সেটা বুঝতেই ইমরান তার চিবুকে হাত রেখে তার মুখ উঁচু করে বলল।
— লজ্জা পেলে মেয়েদের অপরূপ লাগে। তোমার এই লজ্জায় রাঙ্গা মুখটাই যে আমার আকর্ষন সেটা কি জানো?
সানজিদা মাথা দুলিয়ে না বুঝালো। ইমরান তখন বলল।
— এখন তো জানলে?
সানজিদা পুনরায় মাথা দুলিয়ে হ্যা বুঝালো। ইমরান আবারো নিজে থেকে কথা এগিয়ে বলল।
— তুমি কি কিছু বলবে না?
এতক্ষনে সানজিদা মুখ খুলে বলল।
— আমি কি বলবো?
— তাহলে কি কিছুই বলার নেই তোমার?
সানজিদা হকচকিয়ে বলল।
— আছে!
— হুম, বল শুনছি।
সানজিদা তোতলানো ভঙ্গিতে বলল।
— আ..আমাকে কি আপনার স্ত্রী হিসেবে পছন্দ হয়েছে?
— ভালো না লাগলে কি বিয়ে করতে প্রস্তাব নিয়ে যেতাম?
— নাহ।
— শুনো এখন থেকে আমি তোমার স্বামী তোমার অভিবাবক। তুমি তোমার মনের সকল কথা আমাকে বিনা দ্বিধায় বলতে পারো। আমি সর্বদা তোমার পাশে আছি কথা দিলাম।
ইমরানের স্বীকৃতিতে ভরসা পেয়ে সানজিদা জড়তা কাটিয়ে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে লাগলো। সে একটু একটু করে নিজের অনুভূতিগুলোর প্রকাশ করতে সক্ষম হলো। তাদের এই সুন্দরতম রাত তারা একান্তেই শত প্রতিশ্রুতি আর অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে অতিবাহিত করতে লাগলো।
________________
ইশাত মাত্র এশার নামাজ পড়ে জায়নামাজ ভাঁজ করে উঠলো তখন আসিয়া বেগম তার রুমে এলেন। আসিয়া বেগমকে দেখে ইশাত মিষ্টি হেসে বলল।
— আম্মু কিছু কি বলবে?
আসিয়া বেগম উচ্ছ্বাসের সাথে মেয়ের হাত টেনে তাকে বিছানায় বসিয়ে বললেন।
— আজ আমি আর তোর আণ্টি মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোর আর আসিফের বিষয়ে।
মায়ের কথার মানে বুঝতে না পেরে ইশাত জানতে চাইলো।
— কিসের সিদ্ধান্ত?
আসিয়া বেগম তখন ইশাতের পিঠে হাত বুলিয়ে অকপটে নিজের মতো করে বলে গেলেন।
— তোর আর আসিফের বিয়ের বিষয়ে। ফেরার সময় গাড়িতে তোর ভাইয়ার সাথেও এ নিয়ে আলোচনা করেছি। ইমরানও বলছে ওর নাকি আসিফকে ছেলে হিসেবে ভীষণ ভালো লেগেছে। তোর আন্টি জানতে চেয়েছিল তোর মত কি? তখন
আমি তাকে সাফ সাফ বলেছি আমার ছেলে মেয়ে তার মায়ের পছন্দের বিরুদ্ধে কখনো যাবে না। এইটুকু বিশ্বাস আছে আমার তোদের প্রতি। তোর বাবার মৃ’ত্যুর পর ওরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল অনেক উপকার করেছিল আমাদের। পরে ইমরানের চাকরিটা হয়ে যাওয়ার পর আল্লাহ আমাদের উপর রহম করেছেন। এতো উপকারের পর তোর আন্টি তার ছেলের জন্য তোর হাত চাওয়াতে আমি মানা কি করে করি বল? তাছাড়া আসিফদের ফ্যামিলি স্ট্যাটাস ভালো। আমাদের চেনা জানা এমনকি তোরা একই ভার্সিটিতে পরিস। তোদের দুজনের মধ্যে ভালো একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং রয়েছে। তাই সবকিছু বিবেচনা করে বিয়ের সিদ্ধান্তটা আমরা পাকাপাকি করে ফেলেছি এখন শুধু দিনখনের বিষয়টা আলোচনা করা বাকি। তোর ভাইয়ের বিয়ে দিয়ে আমার অর্ধেকটা চিন্তা কমেছে এখন তোর বিয়েটা দিতে পারলে আমি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হবো। ফরজ কাজটা সারতে পারলেই মাথার বোঝাটা হালকা হবে আমার। তোর বাবার মৃ’ত্যুর পর তোদের দুই ভাই বোনের সকল দায়িত্ব তো সব আমার উপরেই। আল্লাহ চাইলে তোকে আসিফের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে এবার নাহয় একটু চিন্তামুক্ত হব।
মায়ের মুখে আসিফের সাথে নিজের বিয়ের কথা শুনে সে ইশাত আঁতকে উঠলো। সে তার মিস্টার গোল্ডেনের জায়গায় অন্যকাউকে কল্পনা করতেও অক্ষম। এতদিন সে যাকে হালাল করে পাওয়ার জন্য রবের কাছে ক্লান্তিহীন ফরিয়াদ করে গেছে তাকে নিজের করে পাওয়ার আগেই হারানোর নিঃশব্দ যন্ত্রণায় কেঁপে উঠলো তার পুরো অস্তিত্বখানা। হৃদয়ের গহীন চিরে কোনো এক সুতীব্র আবেগের লহরি মূর্ছনা হয়ে প্রবল তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়লো। সেই অমোঘ তরঙ্গে ভেঙে পড়লো মনের বেলাভূমি। বাক্যহীন আড়ালে শুধু চোখ দিয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আর্তনাদ করে মনের ভেতরে পুঞ্জীভূত আবেগগুলো কিছু অব্যক্ত শব্দের রূপ ধারণ করে বলে উঠলো।
Aazma raha mujhe kyun
Aa bhi ja kahin se ab tu
Kaise main jiyunga tere bina
Seene mein jo dhadkane hain
Tere naam se chale hain
Kaise main jiyunga tere bina…….
এমনিতেই আগে থেকে বিয়ের বিষয়ে কথা শুনতে পারতো না ইশাত। বিয়ে নিয়ে ছিল তার ভিন্ন ধারণা। ছোট থেকেই তার আশেপাশে সে সব সময় বিবাহিক জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো দেখে বড় হয়েছে। তাই বিয়ের প্রতি ছিল তার এক আকাশ সমপরিমাণ অনিহা। আসিয়া বেগম তা ভালো করেই জানেন এবং প্রায়শই মেয়েকে বুঝাতেন এ নিয়ে। তিনি এবারো এমন কিছুই ভেবে মেয়েকে বুঝিয়ে বললেন।
— বিয়ে নিয়ে আর অনিহা করিস না মা। প্রত্যেককেই জীবনে বিয়ে করতে হয়। এটা ফরজ কাজ।
ইশাতের ভেতরটা কেমন হাসফাস করতে লাগলো। যেন এখনই তার দমবন্ধ হয়ে আসবে। কথাগুলো যেন গলায় দলা পেকে গেলো। আসিয়া বেগম মেয়েকে সময় দিতে বললেন।
— একটা জিনিষ সব সময় মাথায় রাখবি তোদের মা কখনো তোদের খারাপ চাইবে না। আমি তোকে ভাবতে সময় দিচ্ছি আশা করি নিজের ভালোটা বুঝবি।
আসিয়া বেগম কথাটা বলে উঠে চলে গেলেন। ইশাত হৃদয়ের যন্ত্রণা দমাতে বুকে দুহাত চেপে ধরলো। হঠাৎ এ কেমন পরিস্থিতিতে এসে পড়লো সে? এখন তো মাকে বুঝাতেও পারবে না তার মনের অনুভূতি। সে কোন মুখে তার মিস্টার গোল্ডেনের কথা মাকে জানাবে সে তো নিজেই চিনে না তাকে। না জেনে না চিনে সোধবোধ হারিয়ে ভালোবেসে বসে আছে এক আগুন্তুককে। এখন সে কি করবে?
সারারাত চিন্তায় তার আর ঘুম হলো না। মাঝ রাতে বিছানা ছেড়ে ওযু করে এসে জায়নামাজ বিছিয়ে দুরাকাত সালাতুল হাজত নামাজের নিয়ত করে দাড়িয়ে পড়লো সে। এই নামাজের নিয়ত হলো মনে মনে বৈধ কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য এই নামাজ পড়ার নিয়ত করতে হয়। সালাতুল হাজত পড়ার পরপর সে তাহাজ্জুদের নামাজও পড়ে নিলো। এরপর আল্লাহর উপরে প্রশংসায় ইসমে আজম,বিশেষ তাজবিহ আর নবীজি (সাঃ) এর উপর দরুদ পড়ে সিজদায় গিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতে কাদতে দোয়া করে সে বলল।
“আল্লাহ তুমি তো জানো আমার মনের হাল। দুনিয়ার কাউকে প্রকাশ না করতে পারলেও আমি তোমার কাছে আমার ফরিয়াদ বিনা দ্বিধায় প্রকাশ করতে পারি। এমনকি তুমি না বললেও সব জেনে যাও। আমার রব দয়া করো আমাকে পথ দেখাও। তাকে হালাল ভাবে হাসিল করাও। আমি তো তাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভাবতে পর্যন্ত পারছি না সেই ক্ষেতে বিয়ে করে সারাজীবন কি করে কাটাব? তুমি সহায় হও। মিস্টার গোল্ডেন আমার জন্য কল্যাণকর হলে তাকে আমার জীবনসঙ্গী করে দাও। আর যদি অকল্যাণকর হয় তাহলে তাকে আমার মন থেকে চিরতরে মুছে দাও।”
দীর্ঘ সিজদা থেকে মাথা তুলার পর তার হৃদয়ের ভার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলো। মনের বিশ্বাস আরো দৃঢ় হলো। রবের কাছে চাওয়ার প্রবণতা আরো বৃদ্ধি পেলো। যখন গভীর রাতে সবাই ঘুমে তলিয়ে তখন নীরবে একা সে রবের কাছে নিজের ক্লান্তিহীন ফরিয়াদ ব্যক্ত করতে মরিয়া।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………

