#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২৭
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
ইশাত অফিসে যাওয়ার পথে হঠাৎ তার চলতি রিকশাটা একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা লাগায়, রিকশা উল্টে ইশাত তার দু কনুইয়ের উপর ভর করে সড়কের উপর পড়ে গেলো। গাড়িটাও তখন থেমে গেলো। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ধাক্কাটা জোরালো না হওয়াতে তার তেমন কোনো ক্ষতি হলো না। তবে ইশাত হাতের কনুইয়ে বেশ ব্যথা পেলো। তৎক্ষণাৎ তার কনুই ছুলে ক্ষ’ত থেকে র’ক্ত বেরিয়ে এলো। ইশাতের হাতে যে অফিসের ফাইল গুলো ছিল সেগুলোও পড়ে রইলো রাস্তার মাঝে। ঘটনাটা এমন ভাবে চোখের পলকের মধ্যে ঘটলো যে ইশাত কিছুই ঠাহর করে উঠতে পারল না। কিন্তু সে শক্ত মনবলের মেয়ে হওয়াতে এমন দুর্ঘ’টনার কবলে পড়ে ঘাবড়ে গেল না। বরং গাড়িটার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে হাতের ক্ষ’ত চেপে হাত ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা লোকটাকেও উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করলো। বৃদ্ধ লোকটা পায়ে ব্যাথা পেয়েছেন।
গাড়ির ড্রাইভারের এমন অসতর্ক ড্রাইভিং দেখে ইশাত ক্ষুব্ধ হলো। সে গাড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে কিছু বলতে যাবে তখন দেখলো গাড়ির সামনের দরজা আপনাআপনি খুলে গেল।ততক্ষণে ঘটনাস্থলে লোকজন জড় হয়ে গেছে। অপরদিকে তাড়াহুড়োতে দরজা ঠেলে গাড়িতে বসা লোকটা বাহিরে বেরোতেই সুপরিচিত মুখ দেখে ইশাত ব্রু কুচকালো। ইশাতের রিকশাটা দুর্ভাগ্যক্রমে আসিফের গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে এটা উপলব্ধি করতেই ইশাত মুখ ফিরিয়ে নিলো। সে যে কথাগুলো ড্রাইভারকে শুনাবে ঠিক করেছিল সেই কথাগুলো বলতে গিয়েও আর বলল না। বরং রোডে পড়ে থাকা ফাইলগুলো হাতে তুলে সহানুভূতি নিয়ে রিকশাওয়ালাকে বলল।
— চলুন চাচা আপনাকে হসপিটাল নিয়ে যাই। পায়ে মনেহয় অনেক বেশি ব্যথা পেয়েছেন?
ব্যথায় লোকটা কথাও বলতে পারছে না তখন আসিফ দ্রুত এগিয়ে আসতে নিলে ভিড়ে দাড়িয়ে থাকা একজন লোক তাকে আটকে দিয়ে বলল।
— ওই মিয়া গাড়ি কেমনে চালান, দেইখা চালাইতে পারেন না?
আসিফ তখন বিরক্ত হয়ে লোকটাকে ঝাড়ি মে’রে বলল।
— সরুন এখান থেকে, ও আমার ফিয়ন্সে হয়। আমি দেখছি কি করতে হবে আপনারা যান এখান থেকে।
আসিফের ঝাড়িতে লোকজন ভিড় ছেড়ে চলে যেতে শুরু করলো। অফিস তখন ইশাতের হাত ধরতে এলে ইশাত সরে গিয়ে তাকে বাধা দিয়ে বলল।
— প্লীজ এভাবে হাত ধরতে আসবেন না। আমার এসব পছন্দ না। হারাম হালাল সম্পর্কে নিশ্চই জানেন? আর লোকজনকে এসব ভুলভাল পরিচয় দিবেন না। আমার সাথে আপনার কোনো ধরনের সম্পর্ক তৈরি হয়নি আর আল্লাহ চাইলে হবেও না।
আসিফ নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে বলল।
— আম সরি, আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম তাই এমন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছি। তাও তোমার সাথেই। ট্রাস্ট মি তোমাকে ছাড়া আমার সবকিছু উলটপালট লাগে। তুমি এভাবে আমাকে দূরে কেন সরিয়ে দেও বারবার? আমার অপরাধটা কোথায়?
কথা বলতে বলতে আসিফের নজর ইশাতের হাতার দিকে পড়তেই সে অস্থির হয়ে বলল।
— তোমার হাতার কাপড়টা র’ক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে, চলো তোমাকে হসপিটাল নিয়ে যেতে হবে।
ইশাত অসম্মতি জানিয়ে বলল।
— আমি ড্রেসিং করিয়ে নেব। তাছাড়া আমার থেকে বেশি রিকশাওয়ালা চাচা ব্যাথা পেয়েছেন ওনাকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে।
আসিফ তখন বৃদ্ধ লোকটাকে ধরে বলল।
— দোষটা আমার তাই ওনাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বটাও আমার। আমার গাড়িতে উঠে বসো আমি নিয়ে যাচ্ছি।
বৃদ্ধ লোকটার চিকিৎসার জন্য ইশাত অসম্মতি করতে পারলো না। লোকটা তখন অস্পষ্ট গলায় দুশ্চিন্তা নিয়ে বলল।
— আমার রিস্কা কে দেখব? রিস্কা ফালাইয়া থুইয়া গেলে চুরি হইয়া গেলে আমার কপাল ফুটব।
আসিফ তখন লোকটাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— সেই টেনশন করতে হবে না আপনাকে, আমি দেখছি সেটা।
কথাটা বলে আসিফ ফোন করে একজন লোক ডাকিয়ে এনে রিকশা দেখে রাখতে বলে সে ইশাত আর বৃদ্ধ লোকটা সমেত গাড়িতে উঠে বসলো। হসপিটালে পৌঁছে আসিফ ডক্টরের সাথে কথা বলে লোকটার চেকআপের জন্য সব ফর্মালিটি পূরণ করলো। লোকটাকে এরই মধ্যে চেকআপের জন্য নেওয়া হলো। এর মাঝে ইশাতও তার হাতের ড্রেসিং করিয়ে বেরিয়ে এলো। আসিফ আর ইশাত তখন একা করিডোরে দাড়িয়ে। সেই সুযোগ লুফে নিয়ে আসিফ কথা এগোতে বলল।
— আমি ফোন দিলে কেন ধরছো না?
ইশাত তড়িৎ উত্তরে বলল।
— বাড়তি কোনো কথা বলা পছন্দ করি না বলে।
— দেখো ইশাত, তুমি আমাদের বিয়ের দিন হঠাৎ করে গায়েব হয়ে গেলে। কোথায় গেলে, কেন গেলে, কিছুই জিজ্ঞাসা করি নি। কেন করি নি জানো? কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি আর এতকিছুর পরেও আমি তোমাকেই চাই। কেন আমাকে তুমি মানতে পারছো না? আমার মধ্যে কি এমন আছে যা তোমার অপছন্দ বলো? আমি সেটাই বদলে ফেলব।
ইশাত অপ্রস্তুত হয়ে বলল।
— আমার একটা অনুরোধ আপনার কাছে, রাখবেন?
— তুমি যা বলবে তাই করবো।
— আমাকে সত্যিকার অর্থে যদি ভালোবেসে থাকেন তাহলে আমাকে ভুলে যান।
— তুমি কি আমার অবস্থাটা বুঝতে চাইছ না?
ইশাতের উত্তর দেওয়ার আগেই ডক্টরের চেম্বারে আসিফের ডাক পড়ল। সে ভেতরে চলে গেল। ইশাতও সাথে গেলো। আসিফ আর ইশাত ভেতরে গিয়ে বসতেই দেখলো ডক্টর চেকআপের রিপোর্ট হাতে পেয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন। রিপোর্ট হাতে তাদের দেখে তিনি হাসি মুখে বললেন।
— চিন্তা করার কিছু হয়নি নি। পায়ে ছোটখাটো একটা চোট পেয়েছে মাত্র। বয়স্ক লোক তাই চোট সারতে সময়ের প্রয়োজন। ওষুধ লিখে দিয়েছি। সময় মত খেলে সেরে যাবে ইনশাআল্লাহ।
ইশাত মাথা নেড়ে প্রেসক্রিপশন হাতে নিলো। সে চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতেই আসিফ ইশাতের হাত থেকে প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে ওষুধ আর ক্রাচ কিনে আনলো। বৃদ্ধ লোকটা ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে সক্ষম হলো। বৃদ্ধ, গরিব লোকটার কষ্ট দেখে ইশাতের অনেক খারাপ লাগলো। তাই আসিফ যখন হসপিটালের বাহিরে গাড়ি বেড় করতে গেল তখন ইশাত নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বেড় করে লোকটার হাতে দিয়ে বলল।
— চাচা এই কয়দিন আপনাকে রেস্টে থাকতে হবে। রিকশা চালাতে পারবেন না। তাই এই টাকাটা রাখুন, অন্তত পরিবারকে বাজার করে খাওয়াতে পারবেন।
লোকটা ইশাতের মনে তার প্রতি মায়া আর শ্রদ্ধা এবং উদারতা দেখে আবেগী হয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে বলল।
— তোমার মনটা অনেক ভালা মা। তোমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এই গরিবের এতো উপকার করতো না। কি সুন্দর কইরা আমারে চাচা ডাকলা, আমার মনটা ভইরা গেল। আমি গরিব বইলা কেউ আমারে এইভাবে সম্মান করে না। উল্টা তুই তুকারি করে, ন্যায্য ভাড়া চাইলে রাস্তায় মাইর পর্যন্ত দেয়। বয়সের সম্মানও করে না। আমি অল্প বয়সেরতে রিস্কা চালাইতে চালাইতে বুড়া হইলাম। এই কয় বৎছড়ে অনেক মানুষ দেখসি কিন্তু তোমার মতো দেখি নাই। আল্লাহ তোমার মনের সকল আশা পূরণ করুক।
ইশাত মুচকি হেসে লোকটাকে আসিফের গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসিফকে অনুনয় করে বলল।
— একটু কষ্ট করে চাচাকে তার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিন। আর তার রিকশাটাও জায়গামত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
আসিফ গাড়ির জানালা থেকে মাথা বের করে বলল।
— কেন তুমি কোথায় যাচ্ছো? গাড়িতে উঠো তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেই।
ইশাত মুখ ফসকে তখন বলে ফেলল।
— না আমি অফিসে যাচ্ছি।
আসিফ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো।
— অফিসে যাচ্ছ মানে? তুমি কি জব করছো? কবে থেকে? আর কোন অফিসে?
ইশাত তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বলল।
— এতকিছু বলার সময় নেই অলরেডি অনেক লেট আমি, আসছি।
ইশাত আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে সেখান থেকে চলে গেল। পেছনে ফেলে রেখে গেলো ভাবনায় বিভোর আসিফকে।
————————-
তাড়াহুড়োতে অফিসে পৌঁছে পুলিং ডোর ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই ইশাতকে দেখা মাত্র সায়মা এগিয়ে এসে চিন্তিত গলায় বলল।
— এতো দেরি হলো কেন তোমার?
ইশাত তার সাথে ঘটা ঘটনার কথা বুঝিয়ে বলল।
— আসার পথে রাস্তায় ছোটখাটো একটা এক্সিডেন্ট হয় এরপর হসপিটাল থেকে সোজা অফিসে এলাম।
— কি বলো? ঠিক আছো তো তুমি?
— হ্যা ঠিক আছি, স্যার কি অফিসে?
— হুম, স্যার অনেক রেগে আছে। তুমি অফিসে আসলেই তার কেবিনে পাঠাতে বলেছেন।
সায়মার কথা শুনে ইশাতের মনে শঙ্কা কাজ করলো। মনের শঙ্কা চেপে শান্ত গলায় সে সায়মাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— ঠিকাছে আমি দেখছি।
সায়মার সাথে কথা শেষে এভিয়ানের কেবিনের সামনে এসে দাড়িয়ে ইশাতের মনে এই পর্যায়ে ভীতি কাজ করতে শুরু করলো। ঠিক তখন ভারী একটা কন্ঠে তার কানে হীম ধরে গেলো। ভেতর থেকে এভিয়ানের অনুমতি পেয়ে ইশাত দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই সে দেখলো এভিয়ান নাকের সরু অস্থিতে বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনী ঠেকিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে তার ইজি চেয়ারে বসে আছে। তার কপালের রগটা দৃশ্যমানরূপে ফুলে উঠেছে। দুর থেকেই দেখে মনে হচ্ছে সে বেশ রেগে। ইশাত মুখ খোলার আগেই এভিয়ান ঠান্ডা গলায় বলল।
— ফোর্টিফাইভ মিনিটস লেইট! কি অজুহাত সাজিয়ে নিয়ে এসেছ?
এই মুহূর্তে এভিয়ানের ঠান্ডা গলাটাও যেন ইশাতের কানে ধারালো ঠেকলো। ইশাতের আত্মসম্মানে লাগলো কথাটা। সে তখন স্পষ্ট গলায় জানালো।
— কাল থেকে আর লেট হবে না।
এভিয়ান এবার চোখ তুলে ইশাতের মুখের উপর আদেশ ছুঁড়ে বলল।
— মেইক মি আ কফি রাইট নাও, গো।
ইশাত রাগে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে একবার এভিয়ানের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণপর এভিয়ানের কফি বানিয়ে তার কেবিনে দিয়ে আসার পর এভিয়ান আর কোনো প্রশ্ন করে নি তাকে। ইশাতও তার ডেস্কে বসে মন দিয়ে কাজ করতে লাগলো। কাজের মাঝে তার ফোনে আসিফের কল এলো। রিকশা ওয়ালা লোকটার খবর নিতে ইশাত কলটা ধরলো। ওপাশ থেকে তখন আসিফ বলল।
— তোমার অফিস কখন শেষ হবে?
ইশাত আসিফের প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— চাচা কেমন আছেন? ওনাকে ঠিকঠাক বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন তো?
— হুম, ভালো আছেন, ভালো মতো পৌঁছে দিয়েছিলাম তখন।
— ঠিকাছে রাখছি, কাজে ব্যস্ত এখন আমি।
ইশাত ব্যস্ততা দেখিয়ে ফোন রেখে পুনরায় কাজে হাত দিলো।একটুপর যুহরের আজান পড়লো। ইশাত সায়মাকে বলে লাঞ্চ ব্রেকের আগে আগে ফাঁকা লাউঞ্জটাতে গিয়ে ওযু করে নামাজ পড়ে নিলো। নামাজ শেষ করে সে সায়মার সাথে দুপুরের লাঞ্চ করে আবারো কাজে ফিরে গেলো। কাজের ফাঁকে আসরের ওয়াক্তে সে আসরের নামাজও একইভাবে পড়ে নিলো।
সন্ধ্যায় অফিস টাইম শেষ হলে ইশাত ব্যাগ গুছিয়ে বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে এসে দেখলো তার অফিসের সামনে আসিফ গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। ইশাত অবাক হয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল।
— আপনি এখানে কি করছেন? আমার অফিসের খোঁজ পেলেন কি করে?
আসিফ হেসে জবাব দিলো।
— দরকার ছিল তাই জোগাড় করেছি। অনেক্ষন যাবত তোমার বেরোনোর অপেক্ষায় ছিলাম। তখন তো পৌঁছে দিতে পারি নি এখন চল বাড়ি পৌঁছে দেই।
ইশাত আসিফের প্রস্তাবে নাকচ করে বলল।
— প্রয়োজন নেই একাই যেতে পারব।
আসিফ তাকে মানাতে বলল।
— সকালেই তোমার সাথে একটা দুর্ঘটনা ঘটালাম আমি অনুতপ্ত, প্লীজ মানা করো না। অনুশোচনা প্রকাশের জন্য অন্তত এতটুকু করতে দাও। আর কোনো আবদার করবো না।
ইশাত এবার আসিফের দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো। আসিফ মাথা দুলিয়ে বলল।
— সত্যি বলছি।
ইশাত ভাবলো আসিফ হয়তো তার অনুশোচনা থেকে এমনটা করছে। কথা মানলে হয়তো সে আর এমন পিছু নিবে না। তাই সে আসিফের থেকে পিছু ছোটাতে তার কথা মানলো। আসিফ খুশি হয়ে তার গাড়ির দরজা মেলে ধরলো। ইশাত সিটে উঠে বসলো। গাড়ি স্টার্ট হতেই মুহূর্তেই তা চোখের আড়ালে চলে গেল। এতক্ষন যাবত উপর থেকে অফিস বিল্ডিংয়ের স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে এই মুহূর্তটুকু সূক্ষ্ম চোখে দেখছিল এভিয়ান।
———————————-
মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুমের ঘোরেই আসিফের দাদির কেমন যেন হাসফাস লাগতে শুরু করলো। একা রুমে শুয়ে ছিলেন তিনি। সেই অবস্থাতেই হঠাৎ শ্বাসকষ্টে রীতিমত তার হাত পা কাপতে শুরু করেছে, শরীর থেকে ঘাম অঝোরে ঝরছে, বুক অতিমাত্রায় ধড়ফড় করছে, সাথে খিঁচুনি উঠছে। তখন আসিফ নিঃশব্দে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলো। অফিসকে দেখা মাত্র তার দাদি কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে হাতের ইশারায় তাকে সাহায্য করতে বললেন। শ্বাসকষ্টে তিনি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেন না। আসিফ তখন বৃদ্ধার কাছে এগিয়ে গিয়ে পৈশাচিক হাসি নিয়ে বলল।
— তোর জন্য আমার ইশাতকে আমি পেতে পেতে হারিয়েছি। তুই আমার ইশাতকে যা ইচ্ছে তাই বলেছিলি তাই না? তোর জন্য ওর ভাই আমার সাথে ইশাতের বিয়ে ভেঙে দিয়েছে। আমার ভালো করে বুঝা হয়ে গেছে, তুই বেঁচে থাকতে আমার আর ইশাতের বিয়ে তুই হতে দিবি না। তাই তোর বাঁচারও কোনো অধিকার নেই। তুই বরং ম’রে যা বুড়ি।
আসিফের মুখে এমন কথা শুনে তার দাদি চোখ বড় বড় করে ফেললো। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে নিজের কানকে তার অবিশ্বাস হতে লাগলো। কিন্তু ভাগ্যের দায়ে তিনি কিছু বলতে বা করতে পারছেন না। এভাবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তার ছটফটানি বন্ধ হয়ে চোখ দুটো নিভে এলো। আসিফ তখন চোখের সামনে এমন মর্মা’ন্তিক দৃশ্য দেখে অস্বাভাবিকের ন্যায় তৃপ্তির হাসি নিয়ে শব্দহীন সেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যেন কিছুই সে দেখে নি বা করে নি।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২৮
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
ফজরের আজানের পরপর আসিফের দাদির মৃ’ত্যুর খবর মসজিদের মাইকে শুনে ইশাতদের পরিবার তাদের বাসায় উপস্থিত হলো। ইশাত গিয়ে দেখলো আসিফের দাদির নিথর দেহটা সাদা কাপড়ে ডেকে রাখা হয়েছে। বাড়িতে আরও অনেক আত্মীয়রা মরহুমাকে শেষ দেখা দেখতে এসেছেন।শুধু মহিলারাই ভেতরে ঢুকে মরহুমাকে দেখে যেতে পারছে। পাশেই আসিফ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। ইশাতের তার জন্য খারাপ লাগা কাজ করলো। আসিফের মা রোকেয়া বেগম শাশুড়ির লা’শের পাশে বসে চোখের পানি ফেলে যাচ্ছেন। আসিয়া বেগম গিয়ে তার পাশে বসে তাকে সান্তনা দিতে লাগলেন।
আসিফ ইশাতকে দেখে অসহায় মুখ করে কাছে গিয়ে দাড়ালো। ইশাত তখন তাকে সান্তনা দিয়ে বলল।
— জানি আপনার কষ্ট হচ্ছে। আপনজন হারানোর যন্ত্রণা আমি বুঝি। কিন্তু যার যাওয়ার সে কি আর ফিরে? একজন মানুষের মৃ’ত্যুর পর তার পরিবারের লোকজন আজ শোক কাটিয়ে কালই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। কারো জন্য করো জীবন থেমে থাকে না। কিন্তু যে চলে যায় সে ইয়াতীম হয়ে যায়। মৃ’ত ব্যক্তির পরিবারের থেকেও মৃ’ত ব্যক্তি বেশি অসহায়। দাদির এখন আমাদের দোয়ার প্রয়োজন। নামাজ পড়ে প্রত্যেক ওয়াক্তে তার জন্য দোয়া করবেন।
আসিফ মাথা দুলিয়ে কন্ঠে অসহায়ত্বের ভান নিয়ে বলল।
— ঠিকাছে, দাদি চলে যাওয়ার পর আমি অনেক ভেঙে পড়েছি, একা একা মনে হচ্ছে নিজেকে। কোনো সময় অনেক বেশি খারাপ লাগলে কি তোমাকে কল করে কথা বলতে পারি? তুমিও তো আপনজন হারিয়েছ, আমার কষ্টটা তুমি বুঝবে।
ইশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাকে শব্দ করলো।
— হুম।
আসিফের পরিবারকে বুঝ দিয়ে ইশাতের পরিবার কিছুক্ষণ পরই বাড়িতে ফিরে এলো। আসিয়া বেগম বাড়িতে এসেই বাজারের লিস্ট করে ইমরানের হাতে দিয়ে তাকে বাজারে পাঠালেন। ইমরান বাজার করে আনলেই তিনি আসিফদের বাসায় খাবার পাঠানোর জন্য চুলায় রান্না চড়াবেন। ওই বাড়িতে এই শোকের মাঝে নিশ্চই এখন কারো রান্না বান্না করার মতো মানসিকতা অবশিষ্ট নেই। সেটার কথা চিন্তা করে আসিয়া বেগম আজ পুরো পরিবারের জন্য রান্না করে ইমরানকে দিয়ে পাঠাবেন। ইশাত বাড়িতে ফিরেই অফিসের জন্য তৈরি হয়ে গেল। তার আজ আর নাস্তা করার ইচ্ছে কাজ করলো না।
আজ আগে আগেই অফিসের জন্য বেরিয়েছে বলে ইশাত অফিসে পৌঁছে দেখলো এভিয়ান এখনও অফিসে আসে নি। সেই সুযোগ হাতিয়ে নিতে সে কারণ দেখিয়ে এভিয়ানের কেবিনে ঢুকে, এভিয়ানের গোপন ফ্যাক্টরিগুলোর সম্পর্কে তথ্য জোগাড়ের আশায় তার সকল নতুন থেকে পুরোনো ফাইল পত্র ঘাটা শুরু করে দিলো। অনেক ঘাঁটাঘাঁটি করার পরেও ইশাত যেটা খুঁজছে সেটা পাচ্ছে না। তবুও সে হার মানলো না। নিজ কাজে অটুট থেকে খোঁজাখুঁজি চালিয়ে গেল। তখন হঠাৎ করে একটা পরিচিত আওয়াজে তার হাত থমকে গেল।
“যেটা খুঁজছো সেটা এখানে নেই।”
ইশাত চমকে ফিরে তাকিয়ে দেখলো এভিয়ান ঠিক তার পেছনে কালো ফরমাল স্যুটে, পকেটে হাত গুজে সে দাড়িয়ে। মুখে তার সেই চিরচেনা বাকা হাসি। ইশাত ঘাবড়ে গিয়ে কিছুটা পিছিয়ে যেতেই স্বচ্ছ কাচের টেবিলটায় লেগে পায়ে ব্যথা পেয়ে সে হিসিসিয়ে উঠলো। এভিয়ান সেটার তোয়াক্কা করলো না উল্টো এক পা এক পা করে তার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে সন্ধিহান চোখে বলল।
— কি করছিলে?
ইশাত দেখলো এভিয়ান একদম তার কাছাকছি চলে এসেছে। তার পেছনে টেবিল থাকায় তার পেছানোর আর কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। তখন সে আঙুল তুলে বলল।
— কাছে আসবেন না। নাহলে চেঁচাবো আমি।
ইশাতকে সুযোগ করে দিয়ে এভিয়ান বলল।
— ওকে গো আহেড।
কিন্তু ইশাত চুপ রইলো। তখন এভিয়ান আবারো বলল।
— কি নিতে এসেছিলে?
— যা প্রয়োজন সেটা নিতে এসেছিলাম।
— ওহ আচ্ছা, তো কি প্রয়োজন তোমার?
— আপনার পাপের রেকর্ড।
এভিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে ইশাতকে নিয়ে উপহাস করে হেসে বলল।
— তোমার সাহসের প্রশংসা করতেই হয়, ধরা পড়েও মিথ্যে বললে না।
ইশাত চোখ রাঙিয়ে বলল।
— আপনার মতো আমি মিথ্যা বলতে শিখি নি।
— যাও মানলাম তুমি সত্যি হলে আমি মিথ্যা, তবে তুমি কি ভেবেছ আমার বিরুদ্ধে লেগে সফল হবে? উহু,ইম্পসিবল। এর আগে তোমার সাথে কি ঘটেছে এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?
— হু’মকি দিচ্ছেন? ভয় করি না আপনাকে। জেনে রাখুন এটা ন্যায় আর অন্যায়ের লড়াই।
— যারা আমাকে ভয় করে না তাদের আমি ভয় করাই।
— অনেক অসুস্থ মানসিকতার আপনি। সরুণ আমাকে যেতে দিন।
এভিয়ান সরে গেলো ঠিকই তবে ইশাতকে ভয় দেখিয়ে কাবু করার জন্য দরজা লক করে দিলো। তাকে দরজা লক করতে দেখে ইশাত আতঙ্কিত হয়ে বলল।
— কি করছেন? দরজা কেন লাগাচ্ছেন? আমাকে বেরোতে দিন।
এভিয়ান তখন দরজা থেকে সরে গিয়ে তার ইজি চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে বলল।
— বের হওয়ার জন্য নিশ্চই আমার অগচরে ভেতরে আসো নি।
ইশাত এবার নিয়ন্ত্রিত হারিয়ে বলল।
— আর কতদিন? আর কতদিন নিজের সত্যি লুকিয়ে সবার সামনে নিজেকে ভালো দেখানোর নাটক করবেন?
এভিয়ান চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল।
— আমি তো এখানে বসে আছি, নাটক কই করলাম?
— আমি আপনার সাথে কোনো ফাজলামু করতে আসি নি এখানে।
এভিয়ান তার এক ব্রু উঁচিয়ে বলল।
— তো?
— আপনি কি এসব অন্যায় কাজ ছাড়বেন না? আর কতদিন এভাবে দিকশূন্য হয়ে চলবেন?
— যতদিন দরকার।
— দরকার? শহরে কতশত মানুষের জীবন নষ্ট হচ্ছে আপনার কারণে, আর আপনার দরকার? আপনি একজন অপরাধী।
এভিয়ান তখন উঠে দাড়ালো। চোখে ক্রোধ নিয়ে সে বলল।
— আর তুমি একটা কাঁটা। অফিসে জয়েনের পর থেকে আমার পেছনে লেগে ভাইয়ের সাথে মিলে ষড়যন্ত্রে মেতেছো।
ইশাত চোয়াল শক্ত করে বলল।
— কারণ আমি জানি আপনি আসলে কী। সবাই আপনাকে সফল বিজনেসম্যান ভাবে। কিন্তু এর পেছনে আপনার কালো দিকটা কেউই জানে না আমি জানি।
এভিয়ান টেবিলে চাপড় মারে গর্জন করে বলল।
— একদম চুপ! তুমি কিছুই জানো না। এই শহর, এই সিস্টেম আমাকে বাধ্য করেছে। তুমি বুঝবে না।
ইশাতও একই ক্রোধ নিয়ে বলল।
— বুঝতে চাইও না। আমি শুধু জানি ন্যায়-অন্যায়। আর আপনি অন্যায়ের দিকেই আছেন। প্রমাণ নেই বলে বেঁচে যাচ্ছেন, কিন্তু মনে রাখবেন…
ইশাত তার বাকি কথা সম্পূর্ণ করতে পারলো না, তার আগে এভিয়ান মুহূর্তেই ইশাতের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল।
— কী? কী করবে তুমি? পু’লিশ? মিডিয়া? তোমার কাছে কিছুই নেই ইশাত। শুধু আছে সন্দেহ। আর সন্দেহ দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না।
ইশাত এবার পেছালো না, সে চোখও সরালো না। উল্টো চোখে প্রখরতা নিয়ে বলল।
— প্রমাণ আমি বের করব। আজ না হয় কাল। একদিন আপনি নিজেই ধরা দেবেন। কারণ অপরাধী যত চালাকই হোক, একটা ভুল করেই। সেই ভুলের অপেক্ষায় আমি থাকব।
এভিয়ান হাসলো, কিন্তু ঠান্ডা হাসি। সে বলল।
— তাহলে অপেক্ষা করো সেই ভুলের জন্য। আর আমি অপেক্ষা করব তুমি কখন ক্লান্ত হয়ে হেরে যাও। কারণ এভিয়ান কখনো ভুল করে না সে তার কাজে নিখুঁত।
কয়েক সেকেন্ড দুইজন একেওপরের চোখে চোখ রাখলো। ঘৃণা, রাগ, আর অদ্ভুত এক টান তাদের মাঝে কাজ করলো। ইশাত সেই অনুভূতি কাটিয়ে বলল।
— এই যুদ্ধ শেষ হবে এভিয়ান। হয় আপনি জিতবেন, নয় আমি। মাঝামাঝি কিছু নেই।
এভিয়ানের মাঝে তখন কি যেন একটা হলো সে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো ইশাতের মুখে নিজের নাম শুনে। তবে নিজেকে স্বাভাবিক করে পূর্বের ন্যায় দাম্ভিকতা ধরে রেখে সে বলল।
— যুদ্ধ তো শুরু থেকেই চলছে। দেখা যাক কার দম আগে ফুরায়।
ইশাত আর দাড়ালো না সে লক খুলে বেরিয়ে গেলো। ইশাত যাওয়ার পর এভিয়ান জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলো। তারা দুইজনেই জানে এখন আর পেছনে ফেরার পথ নেই।
ইশাত কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে আর কোনো কিছু না ভেবে কাজে লেগে গেলো। আজকে বাহিরের থেকে নতুন ক্লায়েন্ট আসার কথা। সায়মা আর আরও তিনজন মিলে সেই প্রজেক্টে কাজ করছে। ইশাত অফিসে নতুন তবুও এভিয়ান তার উপরও প্রেজেন্টেশনের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে। কাল রাত জেগে সে তার প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছে।
আজ যুহরের ওয়াক্ত পড়তেই আজানের আগে আগে ইশাত ল্যাপটপ গুছিয়ে রেখে যুহরের নামাজের জন্য চলে গেল। এমনই সময় এভিয়ান তার কেবিন থেকে উঠে এমপ্লয়ীদের ডেস্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সবাই উঠে তাকে সম্মান জানালো। কিন্তু তার নজরে পড়লো ইশাত নিজের ডেস্কে নেই। এভিয়ান ব্রু কুঁচকে সায়মাকে জিজ্ঞাসা করলো। সায়মা জানালো ইশাত লাউঞ্জে আছে, নামাজ পড়তে গিয়েছে। বিষয়টা এভিয়ানের একদমই পছন্দ হলো না। সে হুড়মুড়িয়ে লাউঞ্জের দিকে যাওয়া ধরলো সেটা দেখে সায়মা ঘাবড়ে গেলো। সে মনে মনে ভাবলো কথাটা বলে সে ভুল করে ফেলেছে। অন্যদিকে এভিয়ান লাউঞ্জে গিয়ে দেখলো ইশাত এক কোনায় দাড়িয়ে নিরিবিলিতে নামাজ আদায় করছে।
এমন দৃশ্যে যেন তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দিলো। ইশাত ততক্ষণে সালাম ফিরিয়ে বসে অঙ্গুলে তাজবিহ গুনছে আর মনে মনে ভাবছে একটু আগের কথা। এভিয়ান ঠিক তার সামনে গিয়ে দাড়িয়ে ক্রুদ্ধ স্বরে বলল।
— এখানে এসব কি হচ্ছে? এটা কি অফিস নাকি মসজিদ? এখানে তোমাকে অফিসের কাজের জন্য রাখা হয়েছে এসব করার জন্য না। কাজ রেখে এখানে সময় অপচয় করার অনুমতি কি দিয়েছে তোমাকে?
ইশাত তখন উঠে দাঁড়িয়ে জায়নামাজ ভাঁজ করে নিয়ে বলল।
— আমি আমার কাজ শেষ করে এসেই নামাজে দাঁড়িয়েছি।
এভিয়ান মানলো না, সে কন্ঠে একই ধাঁচ নিয়ে বলল।
— আমি এখানে এসব শুনতে আসি নি। অফিসে আরও তো কত মুসলিম কর্মী আছে তারা তো তোমার মতো কাজ ফেলে এসব করছে না। হয়তো তুমি জানো না আমি আমার প্রফেশনের ক্ষেত্রে কতটা কঠোর। কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্লায়েন্ট এসে হাজির হবে, তোমাকে আমি প্রেজেন্টেশনের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সেটা রেডি করেছ? যদি নিজের কাজ ঠিকঠাক মত না করতে পারো তাহলে সেটার মাশুল দিতে প্রস্তুত থেকো।
ইশাত আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল।
— আর যদি প্রেজেন্টেশনে ভালো করি তখন?
— ইট উইল বি অ্যাপ্রিশিয়েটেড ইফ ইউ কুড।
— আমি অ্যাপ্রিসিয়েশন চাই না।
— তাহলে কি চাও?
— আমি চাই যেন আপনি আমাকে পরবর্তীতে কখনো নামাজ পড়তে দেখলে বাধা দেবেন না অথবা আপত্তি করবেন না।
— সেটা পরে দেখা যাবে। প্রেজেন্টেশন নিয়ে কনফারেন্স রুমে চল রাইট নাও।
এভিয়ানের আদেশে ইশাত তার ডেস্কে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে কনফারেন্স রুমে হাজির হলো। সেখানে সায়মাসহ আরো তিনজন এমপ্লয় উপস্থিত। তারাও তাদের নিজেদের প্রেজেন্টেশন তৈরি করে এনেছে। এই প্রজেক্টের হেড হিসেবে রয়েছে সায়মা। কিছুক্ষণের মাঝেই ক্লায়েন্ট আসার পর এভিয়ান তাকে নিয়ে কনফারেন্স রুমে ঢুকলো। এভিয়ানের সাথেই রয়েছে সিয়াম আর রিজভী। মিটিং শুরু হতেই এভিয়ানের অনুমতিতে একেক করে প্রজেক্টের টিমের এমপ্লয়িরা তাদের প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করতে শুরু করলো।
কিন্তু সেখানেই আপত্তি ঘটলো। চারজনের প্রেজেন্টেশন শেষ হওয়ার পরেও ক্লায়েন্টের মাঝে কোনো আগ্রহ কাজ করলো না। এভিয়ানও তাদের এমন প্রেজেন্টেশন দেখে রেগে আছে। তার নিজের টিমের উপর পুরো বিশ্বাস ছিল যে তারা প্রজেক্টটা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারবে। কারণ তারা এর আগেও আরো ভালো ভালো প্রজেক্টে কাজ করেছে। কিন্তু তাদের এইবারের এমন ব্যর্থতায় এভিয়ান সন্তুষ্ট হতে পারলো না।
এখন অবশিষ্ট রইলো ইশাত, যার কাছে এভিয়ানের বিন্দুমাত্র প্রত্যাশা নেই। ইশাত এবার তার চেয়ার থেকে উঠে প্রজেক্টরে তার ল্যাপটপ সংযুক্ত করলো। সঙ্গে সঙ্গে প্রজেক্টরের পর্দায় তার প্রেজেন্টেশন প্রতিফলিত হলো। সে হাসি মুখে নিখুঁত ভাবে তার প্রত্যেকটা কাজের বর্ণনা দিতে শুরু করলো। ক্লায়েন্ট মন দিয়ে শুনলো এবং পছন্দ করলো। এতক্ষনে ক্লায়েন্টের মাঝে ভাবান্তর দেখা দিলো। এভিয়ানও বিস্মিত হলো।
ইশাতের প্রেজেন্টেশন শেষ হতেই ক্লায়েন্ট এভিয়ানের সাথে হাত মিলিয়ে ডিল ফাইনাল করলো। কথাবার্তা শেষ করে তার প্রস্থানের পর এভিয়ান ইশাতের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলো।
— এটা কিভাবে করলে?
ইশাত পূর্বের ন্যায় আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে বলল।
— আপনি যেমন আপনার প্রফেশন নিয়ে সিরিয়াস ঠিক তেমন আমিও নিজের কাজ নিখুঁত ভাবে করতে পছন্দ করি। তখন নামাজের খোটা দিয়েছিলেন না? আল্লাহর ইবাদত করলে মানুষ কখনো অসফল হয়না। বরং তার সফলতা আর সম্মান আরো কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়।
রিজভী তখন পেছন থেকে এসে বলল।
— আজ আমাদেরকে ডিলটা ছাড়া হওয়া থেকে বাঁচলো মেয়েটা। চাইলে তো থ্যাঙ্কস দিতেই পারিস ওকে নাকি?
কিন্তু এভিয়ান টোললো না। সে তার দাম্ভিকতা ধরে রেখে বলল।
— এসব ডিল আমার কাছে আহামরি কিছু না যে ওকে ধন্যবাদ জানাতে হবে।
রিজভী তখন হতাশ হয়ে বলল।
— তুই তো তুইই। তোর কাছে সবকিছুই ডালভাত মনেহয়। এটা অনেক বড় ডিল ছিল। ইশাত নতুন তবুও অনেক ভালো কাজ করে দেখিয়েছে, প্রশংসা ওর প্রাপ্য।
রিজভীর কথায় পাত্তা না দিয়ে এভিয়ান সেখান থেকে বিরক্তি নিয়ে চলে গেল। রিজভী ইশাতকে কিছু মনে করতে না বলে সেও এভিয়ানের পিছু গেল। সায়মা এসে খুশি হয়ে ইশাতকে তার প্রথম সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানালো। সায়মার সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও জানালো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………..

