#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২৫
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সকাল সকাল অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে ইশাত। তখন সানজিদার তার রুমে এসে তাকে একটা পারফিউম এগিয়ে দিয়ে বলল।
— এটা ট্রায় করে দেখো পারফিউমের গন্ধটা অনেক সুন্দর। তোমার পছন্দ হবে।
ইশাত সেটা না নিয়ে ফিরিয়ে বলল।
— ভাবি, আমি আগের মতো আর পারফিউম ব্যবহার করি না। নারীদের বাহিরে পারফিউম ব্যবহার করা জায়েজ না।
সানজিদা অবাক হয়ে বলল।
— কেন? আমি তো বাহিরে গেলে সব সময় ব্যবহার করি। এমনকি তুমি জানো আমার কাছে অনেক সুন্দর কালেকশন রয়েছে পারফিউমের। আর আমি পারফিউম লাগাতে কতটা ভালোবাসি। আমাকে একটু ঠিক করে বলো তো এটা জায়েজ কেন নয়? এটাতে এমন কি সমস্যা?
ইশাত তখন বিষয়টা গুছিয়ে বলল।
— ভাবি তুমি জানো আমাদের ইসলামে কোনো কিছুই অকারণে বলা হয় নি। এর পেছনেও একটা গভীর মহিদ্য রয়েছে। এই বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কতা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“কোনো নারী যদি সুগন্ধি মেখে কোনো জনসমষ্টির পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, যেন তারা তার সুগন্ধ পায়, তবে সে ব্যভি’চারিণী।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং ৫১২৬; তিরমিজি)
সানজিদা আশ্চর্য হয়ে বলল।
— তাই নাকি? এই হাদিসটা আমি জানতাম না। কিন্তু এই ছোট একটা কাজের জন্য ব্যভি’চারিণী কেন বলা হয়েছে?
— ব্যভি’চারিণী বলার কারণ হলো, এই কাজটি মানুষকে গুনাহের দিকে বা পরপুরুষকে আকৃষ্ট করার দিকে ধাবিত করে।
সানজিদা তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলল।
— এখানে ইসলামের বিষয় আসলে আমরা তো আর সব নিয়ম মেনে চলতে পারি না। না জেনে কত কত গুনাহ করে বসি। এমনকি জেনেও কত গুনাহ করি। সেই অনুযায়ী পারফিউম দেওয়া গুনাহ হলেও কি আর করার? আগে তো গুনাহ করেই ফেলেছি, তাছাড়া বাহিরে গেলে তো শরীরে ঘাম দুর্গন্ধ ছড়ায় যেটা পাশের মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। যেটা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার মতোন। ইসলামে তো অন্যকে কষ্ট দেওয়ার কথা বলা হয় নি। তাই আমি মনে করি একটু হলেও পারফিউম ব্যবহার করা আবশ্যক। আল্লাহ তো বড় বড় গুনাহও মাফ করে দেন। আর এটা তো সামান্য একটা বিষয়। তিনি নিশ্চই সেটা বুঝবেন।
সানজিদার এই ভুল ভাঙতে ইশাত বলল।
— ভাবি তুমি কি জানো, পরি’ত্যক্ত শয়’তান আমাদের এসব কথার ফাঁদে ফেলে পথভ্রষ্ট করে, গুনাহ করা বান্দার নীতি। কিন্তু তাই বলে আল্লাহ সেই গুনাগার বান্দাকে পরি’ত্যক্ত করেন না। তিনি অপেক্ষা করেন তার গুনাহের অনুতাপ নিয়ে ফিরে আসার। আল্লাহ সেই গুনাহকারীকে পছন্দ করেন যে কিনা গুনাহ করে সেটা স্বীকার করে এবং ক্ষমা চায়। আল্লাহর এই ছোট ছোট আদেশগুলো মেনে আমরা আল্লাকে খুশি করে নিজেদের ঈমান মজবুত করতে পারি। তাই এসব ছোট ছোট গুনাহকে অদেখা করা যাবে না। যতটুকু পারা যায় চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যদি গুনাহ করেও ফেলি নিজেকে পরি’ত্যক্ত ভেবে সেই কাজ পুনরায় না করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। নিজের ভেতর একটা জেদ রাখতে হবে, যদি শ’য়তান বারবার আমাকে দিয়ে সেই গুনাহটা করিয়েও ফেলে তখন আমরাও হার না মেনে বারবার অনুতাপ নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হবো। এটাই হবে শয়’তানের বিরুদ্ধে আমাদের অদৃশ্য ল’ড়াই। আমি গুনাহগার তো কি হয়েছে? সে যতবার আমাকে নিচে ফেলে আমি ততবারই নিজেকে টেনে উঠে দাঁড়াব। একদিন না একদিন এই চেষ্টার মাধ্যমে শয়তা’নকে আমরা হারিয়েই দেব ইনশাআল্লাহ। একমাত্র আমাদের নবীজি বাদে কোনো মানুষই ত্রুটিহীন নয়। আল্লাহ তো পারদর্শিতা নয় বরং আমাদের চেষ্টাটা দেখেন।
সানজিদা ইশাতের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে বলল।
— বাবাহ্ ইশাত তুমি তো আগে এতকিছু জানতে না? তোমার মাঝে এতো সুন্দর পরিবর্তন এলো কি করে?
— ভাবি আমি নিজেকে রোজ একটু একটু করে সংশোধন করার চেষ্টা করছি। আগে যে ভুলগুলো করেছি সেটা থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনতে চাইছি। আল্লাহ ভালো জানেন কতটুকু আমার চেষ্টা সফল হচ্ছে।
— মাশাআল্লাহ অনেক পরিবর্তন হয়েছ তুমি। আল্লাহ তোমাকে তার পছন্দের বান্দি হিসেবে কবুল করুক।
— আমিন, আর ভাবি তুমি যে বললে বাহিরে গেলে ঘাম আর দুর্গন্ধের কারণে আশেপাশের মানুষের সমস্যা হতে পারে? সেই ক্ষেত্রে একটা সমাধান আমি তোমাকে দিতে পারি।
— তাই? কি সেটা?
— যেহেতু পারফিউমের গন্ধ খুব তীব্র হয় সেটা একটু ব্যবহার করলেও গন্ধ ছড়াবেই। সেই ক্ষেত্রে তুমি বাহিরে গেলে পারফিউমের বদলে একটা ভালো ডিওড্রাইন ব্যবহার করতে পারো। সেটায় খুব হালকা একটা সুগন্ধ হয় যেটা বাতাসে ছড়ায় না। দূর থেকে কারো নাকেও পৌঁছাবে না। আর দুর্গন্ধও হবে না। সাথে অনেক রিফ্রেশিংও লাগবে। আমিও ব্যবহার করি। ইসলামে শর্ত হচ্ছে যেন সুগন্ধিটি এমন হালকা হয় যার ঘ্রাণ বাইরে ছড়ায় না, বা অন্য পুরুষদের আকৃষ্ট করে না। যদি উদ্দেশ্য কেবল শরীরের ঘাম বা দুর্গন্ধ দূর করা হয় এবং পরিচ্ছন্নতার খাতিরে তা ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে। ইসলামের মূল লক্ষ্য হলো এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি না করা যা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আকর্ষণের সৃষ্টি করে।
— ঠিকাছে, কিন্তু এখন আমার এতগুলো সখের দামি দামি পারফিউম আমি কি করব?
— কেন ব্যবহার করবে, তোমাকে তো আর ঘরে ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয় নি। ঘরে বা মাহরামদের সামনে এটা জায়েজ ও প্রশংসনীয়। ঘরের ভেতরে স্বামী, পরিবার এবং মাহরাম পুরুষদের সামনে নারীদের পারফিউম বা সুগন্ধি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ জায়েজ এবং এটি খুবই প্রশংসনীয় কাজ। বিশেষ করে স্বামীর জন্য সুসজ্জিত হওয়া এবং সুগন্ধি ব্যবহার করার ব্যাপারে ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে। পারফিউম ব্যবহারের পার্থক্যটা শুধু জায়গা বুঝে।
সানজিদা মুচকি হেসে ইশাতের হাত ধরে বলল।
— তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এতো সুন্দর করে আমাকে বুঝিয়ে বলার জন্য। আর আমার ভুলটা ভেঙে দেওয়ার জন্য।
তখন ঘড়ির দিকে সানজিদার নজর পড়তেই সে আবারো বলল।
— তুমি না অফিসে যাবে দেরি হয়ে যাচ্ছে না? নাস্তা করে নিবে তো?
— হ্যা করব, ভাইয়া তৈরি হয়েছে?
— হ্যা, উনি তৈরি হয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
— তাহলে চলো সবাই একসাথে নাস্তা করে নেই।
ইশাত একটা কালো রঙের আবায়া পড়েছে সাথে নিজেকে সামান্য পরিপাটি করে নিয়েছে। সে অফিসে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি তৈরি, তাই তারা দুজন নাস্তা করার উদ্দেশ্যে একসাথে বেরিয়ে গেলো। ডাইনিংয়ে বসে সবাই একসাথে নাস্তা করে উঠতেই, আসিয়া বেগম ইশাত আর ইমরানের জন্য লাঞ্চ বক্স প্যাক করে এনে দিলেন। ইমরান নিতে না চাইলেও আসিয়া বেগম জোর করে দিয়ে দিলেন। ছেলেকে বাহিরের খাবার তিনি আর খেতে দিবেন না। ইশাত আর ইমরান বেরোনোর আগে আসিয়া বেগম ইশাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দিলেন। যেহেতু আজ ইশাতের অফিসে প্রথম দিন। মাকে এতদিন পর তার সাথে ভালো মতো কথা বলতে দেখে ইশাতের মনেও শান্তিময় অনুভূতি কাজ করলো। বেরোনোর পূর্বে আহনাফ ইশাতের পিছু নিলো। তখন ইশাত তাকে আদর করে বুঝিয়ে বলল আসার সময় তার জন্য ভালো ভালো চকলেট নিয়ে আসবে। তাতেই আহনাফ মেনে গিয়ে মায়ের কাছে ফেরত গেলো।
ইমরান যাওয়ার পথে বোনকে বাইকে করে অফিসের সামনে নামিয়ে দিল। ইশাত বাইক থেকে নামতেই সে দায়িত্বশীল বড় ভাইয়ের মতো ইশাতকে সব বুঝিয়ে পরিয়ে দিলো। ইশাতও ভাইয়ের কথা মন দিয়ে শুনে সম্মতি দিয়ে বিদায় জানিয়ে ভেতরে চলে গেল। বোন ভেতরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ইমরান সেখানেই দাড়িয়ে ছিল। পরক্ষণে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইক টান দিল।
—————————
বিশাল আয়তন জুড়ে জায়গা দখল করে অনড় দাড়িয়ে আছে এজে ইন্ডাস্ট্রির ভবনটি। অফিসের ইনডোরে সকল ধরনের আধুনিকতা এবং নান্দনিকতার ছোঁয়াসহ ভবনের নকশা জুড়ে সৌন্দর্য বর্ধনে বড় কাঁচের জানালা ব্যবহার করা। তারই সঙ্গে কর্মীদের সুবিধার জন্য অভিজাত লাউঞ্জ এরিয়ার ব্যবস্থা তো রয়েছেই।
ইশাত এলিভেটরে করে উপর তলায় পৌঁছাতেই দেখলো ভেতরে সিকিউরিটি আগের তুলনায় আরও শক্তপোক্ত করা হয়েছে। কর্মীদের জন্য রয়েছে কিউবিকলের দেয়ালের পরিবর্তে খোলামেলা ডেস্কে কাজ করার পরিবেশ। তখন ইশাতকে দেখা মাত্র একজন মহিলা কর্মকর্তা এগিয়ে এসে জানালো এভিয়ান তাকে অফিসে পৌঁছানো মাত্র দেখা করতে বলেছে। ইশাত সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে স্টাফের দেখিয়ে দেওয়া নির্দেশনায় যেতেই পেয়ে গেল এভিয়ানের কেবিন।
সে দরজায় নক করার আগেই এভিয়ান ভেতর থেকে গম্ভীর গলায় বলল।
— কাম।
অতর্কিতে হকচকিয়ে গেল ইশাত। পরক্ষণে নিজেকে স্বাভাবিক করে সে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো। এভিয়ান তখন ইজি চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে হাতের কিছু ফাইল ঘাটছিল। পড়নে তার কালো ফরমাল স্যুট। ইশাত ঢুকতেই সে তার দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ইশাত খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
— আমাকে দেখা করতে বলেছেন স্যার?
এভিয়ান তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে বলল।
— ফাইভ মিনিটস লেট ওন দ্যা ভেরি ফার্স্ট ডে? ইটস ভেরি আনপ্রফেশনাল।
ইশাত মাথা নামিয়ে ভুল স্বীকার করে বলল।
— সরি স্যার।
এভিয়ান আদেশ করে বলল।
— এই সরি কথাটা যেন নেক্সট টাইম রিপিট না হয়।
ইশাত মাথা নাড়িয়ে জবাব দিলো।
— ওকে।
এভিয়ান কল করে একজন এমপ্লায়কে তার কেবিনে ডাকলো। সঙ্গে সঙ্গে একটা মেয়ে এসে হাজির হলো যে মেয়ে একটু আগে ইশাতকে এভিয়ানের কেবিন দেখিয়ে দিয়েছিল। এভিয়ান মেয়েটাকে উদ্দ্যেশ্য করে বলল।
— ওকে ওর কাজ বুঝিয়ে দাও।
মেয়েটা মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। এভিয়ান ইশাতের দিকে পুনরায় তাকিয়ে বলল।
— ইউ মে গো নাও। কোনো প্রয়োজন হলে তোমাকে ডাকা হবে।
তখন ইশাত আর ওই মেয়েটা কেবিন থেকে একসাথে বেরিয়ে আসলো। মেয়েটা ইশাতকে তার পরিচয় জানিয়ে বলল।
— আমার নাম সায়মা, তুমি ইশাত রাইট?
ইশাত সৌজন্যতা নিয়ে বলল।
— জ্বী আপু।
মেয়েটা অসন্তুষ্ট হয়ে বলল।
— আপু কেন বলছো? তুমি আমাকে নাম ধরে ডাকতে পারো।আমরা তো কলিগ তাই না?
— হ্যা, ঠিকাছে।
ডেস্কে গিয়ে সায়মা ইশাতকে তার কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার পর ইশাত তার কাজে মন দিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতে না হতেই ইশাতের ডেস্কে কল এলো। ইশাত ব্যস্ত হাতে কল তুলতেই কলে এভিয়ান তাকে আদেশ ছুঁড়ে বলল।
— মেক মি আ ক্যাপাচিনো।
ইশাত চকিতে বলল।
— কে আমি?
— তো কাকে কল করলাম?
— আমি তো এইখানকার কিছুই চিনি না।
— দেন আস্ক সামওয়ান।
ইশাত এক হাতে মনিটরে কিছু টাইপ করছিল। সে এভিয়ানের কাছে সময় চেয়ে বলল।
— আমি তো একটা কাজ করছি, পাঁচ মিনিট পর নাহয় দিচ্ছি।
এভিয়ান তার কথায় তোয়াক্কা না করে বলল।
— রাইট নাও।
ইশাত বিরূপতা নিয়ে কল কেটে পাশের ডেস্কে বসা সায়মাকে জিজ্ঞাসা করলে সায়মা তাকে অফিসের প্যান্ট্রি দেখিয়ে দিলো। ইশাত গিয়ে দেখলো সেখানে ক্যাফের মতন আবহ তৈরি করা। ভেতরে চমৎকার লাইটিং, দেয়ালে অনুপ্রেরণামূলক উক্তি এবং মার্বেলের কাউন্টার। সেখান থেকে ইশাত অটোমেটিক কফি মেশিনে এভিয়ানের বলে দেওয়া ক্যাপাচিনো বানিয়ে নিয়ে তার কেবিনের দরজায় নক করলো। এভিয়ান মুখে সারা দিতেই সে ভেতরে ঢুকে কোনো দিকে না তাকিয়ে এভিয়ানের টেবিলে কফির কাপটা রেখে সোজা বেরিয়ে যেতে নিচ্ছিল, তখন এভিয়ান তাকে পিছু ডেকে বলল।
— এসব কি পড়েছ?
— কেন?
— নাহ এমনি! বাই দ্যা ওয়ে, এখন থেকে রোজ আমি বলার আগেই আমার কফি রেডি করে আনবে।
ইশাত আপত্তি নিয়ে বলল।
— আমাকে কি আপনি কফি বানিয়ে খাওয়ানোর জন্য রেখেছেন এই অফিসে?
এভিয়ান তার দাম্ভিকতা নিয়ে বলল।
— আমার অফিস, আমার ইচ্ছা, আমি যে কাজই দেই না কেন তুমি করতে বাধ্য।
— এখানেও প্রতি’শোধ তুলছেন? সব জায়গায় নিজেকে এতো ডমিনেটিং কেন দেখাতে হবে আপনাকে?
— কারণ আমি মানুষটাই পুরোটা ডমিনেটিং।
ইশাত বুঝলো সে এভিয়ানের সাথে কথায় লাগাটা অহেতুক। তাই আর কথা না বাড়িয়ে সে বেরিয়ে গেল। বাহিরে বেরিয়ে আসতেই সে রিজভীর মুখোমুখি হলো। রিজভী ইশাতকে দেখে বিস্মিত হয়ে বলল।
— তুমি এখানে কি করছো ইশাত? এভিয়ান কি আবারো তোমাকে…
ইশাত মাঝ দিয়ে রিজভীর ভুল ভেঙে বলল।
— আমি আজ থেকে এই অফিসে জয়েন করেছি।
রিজভী বিচলিত হয়ে বলল।
— কিভাবে কি হলো? আমি একদিন অফিসে আসি নি আর এতকিছু হয়ে গেলো? এভিয়ান কি তোমাকে জোর করে এই অফিসে এনে কাজ করাচ্ছে? ও তো বলেছিল তোমাকে একবারের জন্য ছেড়ে দিবে। দেখো ইশাত আম সরি। আমি আমার বন্ধুর হয়ে ক্ষমা চাচ্ছি। ও কখন কি করে একমাত্র ওই জানে। ও তোমার সাথে অনেক অ’ন্যায় করেছে। আমরা সব দেখেও কিছুই বলতে পারি নি। আমি ওকে নাহয় বুঝাবো যেন তোমাকে ছেড়ে দেয়।
ইশাত হাত নাড়িয়ে বলল।
— আপনি যেমনটা ভাবছেন তেমন কিছুই না, আসলে আমি নিজে থেকেই এখানে এসেছি।
রিজভী পূর্বের ন্যায় বিস্মিত হয়ে বলল।
— কি বলছো? তুমি সব জেনে শুনে আবারো কেন নিজেকে বিপদে ফেলতে এলে?
রিজভীর সাথে কথা বলতে বলতে ইশাতের হুট করে মায়ের শর্তের কথা মনে পড়ে গেলো। সে তখন চট করে বলে ফেললো।
— আপনার কাছে আমার একটা সাহায্য লাগবে ভাইয়া।
ইশাতের সম্বোধনে রিজভী আপ্লুত হয়ে আন্তরিকতা নিয়ে বলল।
— অবশ্যই বলো, তুমি আমার ছোট বোনের মতো। অবশ্যই সাহায্য করব।
ইশাত সমস্তকিছু বুঝিয়ে বলার প্রয়াসে বলল।
— জেরিন আপুর নাম্বারটা আমার দরকার। বাড়িতে ফেরার পর যখন আম্মু প্রশ্ন করেছিল আমি এতদিন কোথায় ছিলাম? কার সাথে ছিলাম? তখন আমি জেরিন আপুর কথা বলেছি। এখন আম্মু বলছে আপুকে আমাদের বাসায় গিয়ে দেখা করতে।
সবকিছু শুনে রিজভী তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— ওহ এই ব্যাপার, সমস্যা নেই আমি তোমাকে নাম্বার দিচ্ছি। তুমি টেনশন করো না, জেরিন সব সামলে নেবে। সি নোস হাও টু হ্যান্ডেল দ্যা সিচুয়েশন ওয়েল।
এবার ইশাতের মাথা থেকে যেনো অনেক বড় একটা বোঝা নামলো। সে প্রশস্থ হাসিতে বলল।
— অনেক অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ ) ……………….
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২৬
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
দরজায় দুয়েকবার বেল বাজাতে আসিয়া বেগম তাড়াহুড়োতে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলেন লম্বা আর ফর্সা গড়নের একটা মেয়ে হাতে কিছু ব্যাগ সমেত দাড়িয়ে। পড়নে তার ফরমাল পোশাক। তিনি তখন আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে বললেন।
— মা তুমি কে?
মেয়েটা আন্তরিকতার সাথে সালাম জানিয়ে বলল।
— আন্টি আমি জেরিন, ইশাতের বান্ধবী। আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন।
আসিয়া বেগম তখন বিচলিত হয়ে বললেন।
— ওহ হ্যা, তুমি জেরিন? ভেতরে এসো।
আসিয়া বেগম জেরিনকে ভেতরে নিয়ে রুমে বসালেন। জেরিন তখন তার আনা ব্যাগগুলো আসিয়া বেগমের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
— আন্টি এগুলো আপনার জন্য, আসার সময় ইশাতকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আপনার কি পছন্দ। অনেক করে জিজ্ঞাসা করার পর ও বলল আপনার ছানা মিষ্টি পছন্দ তাই কয়েক ধরনের নিয়ে এলাম।
আসিয়া বেগম আপত্তি করে বললেন।
— এসব কেন আনতে গেলে? এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি তোমাকে ডেকেছি কথা বলার জন্য।
— হ্যা আন্টি নিশ্চই কথা বলবো, আপনার যা জিজ্ঞাসা করার আমাকে করবেন। তার আগে নাহয় এটা গ্রহণ করুন। আপনার জন্য অনেক সখ করে নিয়েছি। আমাকে নিজের মেয়ের মতোই মনে করবেন।
আসিয়া বেগম জেরিনের কথায় ভদ্রতাসুলভ তার এগিয়ে দেওয়া ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে ইশাতকেও ডাকলেন। ইশাত বেরিয়ে এসে জেরিনকে দেখে পাশে বসলো। সে মাকে বলল।
— আমিই আপুকে কল করে আসতে বলেছিলাম। তুমি না দেখা করতে চেয়েছিলে?
আসিয়া বেগম হাতের ব্যাগগুলো টি টেবিলে রাখতে রাখতে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন।
— আপু মানে? ইশাত তুই না বললি জেরিন তোর ফ্রেন্ড?
মায়ের প্রশ্নে ইশাত হকচকিয়ে গেল, তার কিছু উত্তর দেওয়ার পূর্বে জেরিন তখন বিষয়টা সামলে আসিয়া বেগমকে বুঝিয়ে বলল।
— আসলে আমি ওর সিনিয়র আপু। কাজের সূত্রে ওদের ভার্সিটিতে গিয়েছিলাম তখন থেকে পরিচয়। ইশাতের সঙ্গে দরকারে মাঝে মাঝে ম্যাসেজে কথা হতো। এভাবে যোগাযোগ বাড়তে থাকলে ঘনিষ্ঠতাও বাড়লো, আর সিনিয়র আপু থেকে ভালো ফ্রেন্ড হয়ে উঠলাম। আমি ওকে অনেকবার বলেছি বন্ধুত্বের মধ্যে আপু না বলতে, নাম ধরে ডাকতে। কিন্তু আমি সিনিয়র বলে সম্মানের খাতিরে ও আমাকে নাম ধরে ডাকতে চায় নি, তাই আপুই বলে।
আসিয়া বেগম তখন জেরিনের কথা মেনে নিলেন। তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন।
— তোমার বাড়িতে কে কে আছেন?
জেরিন প্রত্যুত্তরে বলল।
— আমি আর আমার হাসবেন্ড থাকি। আমি পেশায় একজন সার্জেন। প্রফেশনের কাজে সবসময় ব্যস্ত থাকা হয়। হঠাৎ সেদিন রাতে ইশাত আমার বাড়িতে এসে আশ্রয় চাইলো। তখন আবার অফিসের কাজে আমার হাসবেন্ড কয়েকমাস যাবত আমেরিকায় ছিল। আমি বাড়িতে একাই ছিলাম। আমি ভাবি নি ও হঠাৎ এভাবে বিয়ের আসর থেকে আমার বাসায় এসে পড়বে। আমি ওকে তখন ফিরিয়ে দিতে পারি নি, তবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফিরত পাঠানোর চেষ্টা করি। মেয়েটা অনেক ঘাবড়ে গিয়েছিল। আমি ইশাতকে জানি ও অনেক ভালো একটা মেয়ে। ও খারাপ কিছু কখনোই করবে না। আমি চাইছিলাম আপনাদের সাথে যোগাযোগ করার কিন্তু ধীরে ধীরে ইশাতই ওর ভুল বুঝতে পারলো আর ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলো। দেখুন আন্টি, আমি চাইব আপনি ওকে ক্ষমা করে দিন, ভুল তো মানুষের ধারাতেই হয়। আর ও ওর ভুল বুঝতে পেরেছে।
আসিয়া বেগম নিজের মনে অনুশোচনা নিয়ে বললেন।
— সেদিন জিজ্ঞাসা করাতে ইশাত যখন আমাকে তোমার কথা বলল, আমার মনে খটকা কাজ করছিল। কারণ জেরিন নামের কোনো ফ্রেন্ডের কথা এরআগে ও আমাকে কখনো বলে নি। আর যখন ও বলল, তুমি ওকে আশ্রয় দিয়েছ তখন আমি ভেবেছিলাম এর পেছনে হয়তো তুমি ওকে প্রশ্রয় দিয়েছ বলে ও এমন কাজ করার সাহস পেয়েছে। নিজের মেয়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণে তোমার ব্যাপারে আমার মনে ভুল একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল। ভাবি নি আমার বিচক্ষণ মেয়ে এমন একটা ভুল নিজে থেকে করতে পারে। ভেবেছিলাম হয়তো ওকে উস্কানো হয়েছে। কিন্তু তুমি অনেক ভালো একটা মেয়ে। এমন একটা পরিস্থিতিতে ওকে বুঝিয়েছো, সামলেছো। আমাকে ক্ষমা করে দিও। পরিস্থিতির চাপে পড়ে না জেনে বুঝে আমি তোমাকে ভুল বুঝেছি। আমার এমন ধারণা করা উচিত হয়নি। এখন বুঝতে পারছি আমার শিক্ষায়ই ভুল ছিল। আমি ওকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি নি। এটা আমার ব্যর্থতা।
জেরিন আসিয়া বেগমের ধারণা বদলাতে বলল।
— আন্টি এখানে ইশাত অথবা আপনার কোনো দোষই ছিল না। আমাকে ও সব জানিয়েছে, যার সাথে ইশাতের বিয়ে ঠিক হয়েছিল ওনার পরিবারের কেউ একজন নাকি ওকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারে নি। নতুন জীবন নিয়ে ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। ওর মনে হয়েছে এই বিয়েটা করা ওর জন্য ঠিক হচ্ছে না। ওর মন সায় দিচ্ছিল না এই বিয়েতে। ও কাউকে এটা বুঝাতেও পারে নি, আর ওর মাথাও কাজ করছিল না তখন। তাই এই ভুল পদক্ষেপটা ও নিয়ে ফেলেছে। এই সময়টা একটা মেয়ের জীবনের অনেক কঠিন একটা সময়।
এতক্ষন ইমরান তাদের সব কথাই শুনতে পাচ্ছিল। সে তাদের কথার মাঝে এসে বলল।
— উনি ঠিক বলেছে আম্মু, আসিফের দাদি তো ইশাতকে মেনে নেয় নি। যা তা ব্যবহার করেছে। তুমি কি এর পরেও ওই পরিবেশে নিজের মেয়েকে দিতে পারতে? তখন হয়তো বুঝো নি কিন্তু এখন তো বিষয়টা স্বচ্ছ। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।
আসিয়া বেগম তখন হতাশা নিয়ে বললেন।
— সবই নাহয় বুঝলাম, কিন্তু এলাকার মানুষের কাছে ওর যে বদনামটা হলো সেটা কি আর ফেরানো যাবে? ওকে আর কোন ছেলে বিয়ে করতে চাইবে?
ইমরান মায়ের কথার প্রত্যুত্তরে চোখমুখে দৃঢ়তা টেনে বলল।
— আমার বোনকে কে কি বলে আমিও দেখে নেব। আর পাঁচটা মেয়ে যেভাবে সমাজে মাথা উঁচু করে চলে আমার বোনও ঠিক সেভাবেই চলবে। ওর পেছনে ওর ভাই আছে। সময় হলে ওর জন্য ভালো ছেলে আমি খুঁজে আনব। তুমি আর কোনো চিন্তা করো না আম্মু। তোমার ছেলে এখনো বেঁচে আছে।
ইশাত এতক্ষন মাথা নামিয়ে বসে ছিল। ভাইয়ের কোথায় তার চোখের কোণে পানি জমে গেল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সে বসা থেকে উঠে ভাইকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদে বলল।
— আমি অনেক কপাল করে তোমার মতো একটা ভাই পেয়েছি। আমি নিজের মুখে পুরোটা ঘটনা না বলার আগ পর্যন্ত তুমি জবাবদিহিতা চাও নি। আমার কথা না জেনে না শুনে শাসন চাপিয়ে দাও নি। আমার প্রতি তোমার এত বিশ্বাস ভাইয়া?
ইমরান তখন ইশাতের চোখের পানি মুছে গম্ভীরতা ছাপিয়ে মুখে কোমলতা টেনে বলল।
— হবে নাই বা কেন? আমি নিজের হাতে তোকে বড় করেছি। আমার বোনকে আমি তার শেকড় থেকে চিনি।
জেরিন তখন তাদের ভালোবাসা দেখে মুচকি হেসে বলল।
— এখনকার ভাই বোনের মধ্যে এমন নির্ভেজাল সম্পর্ক খুব কমই দেখা যায়। আল্লাহ তোমাদের এই বন্ধন সব সময় অটুট রাখুক।
ইমরান সন্তুষ্ট হেসে সম্মতি জানিয়ে তাদেরকে নিজেদের মধ্যে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে নিজের রুমে ফিরে গেল। ইশাত তখন অসহায় মুখ নিয়ে অনুনয় করে আসিয়া বেগমকে বলল।
— আম্মু তুমি কি এখনও আমাকে মন থেকে ক্ষমা করতে পারো নি? আমি স্বীকার করছি আমার ভুল ছিল কিন্তু তাই বলে আর কতদিন আমাকে দূরে সরিয়ে রাখবে? আমার সাথে কথা না বলে থাকবে? আমার যে ভীষণ কষ্ট হয়।
আসিয়া বেগম তখন ইশাতকে অবাক করে দিয়ে তার দুহাত মেলে ধরলেন। ইশাত খুশি হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। তিনি তখন স্নেহময় কন্ঠে বললেন।
— একজন মা তার সন্তানের সাথে অভিমান করেই বা আর কতদিন কথা না বলে থাকতে পারে? আমি তোকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এসব মানতে কষ্ট হচ্ছিল বলে অভিমান করে ছিলাম।
ইশাত ভারভার কন্ঠে বলল।
— আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি আম্মু তাই না? কথা দিচ্ছি আর এমনটা হবে না। তবুও আর আমাকে দূরে সরিয়ে দিয়ো না। নিজের দেওয়া শিক্ষার উপর প্রশ্ন তুলো না। তুমি সব সময় সঠিক ছিলে আর থাকবে।
আসিয়া বেগম মাথা নাড়িয়ে বললেন।
— ভুল আমিও করেছি, আমিও তোকে ভুল বুঝেছি। মা হওয়া শর্তেও তোর মন বুঝি নি। সমাজের লোকের কটু কথা শুনে তোকে দূরে ঠেলেছি। তুই আম্মুকে ক্ষমা করে দিস।
— তুমি ক্ষমা চেও না আম্মু।
আসিয়া বেগম মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিয়ে জেরিনকে ধন্যবাদ জানালেন বাসায় এসে সব বুঝিয়ে বলার জন্য। ইশাত তখন জেরিনকে জিজ্ঞাসা করলো।
— বলো আপু তুমি কি খাবে? আমি এখনই করে নিয়ে আসছি।
জেরিন নাকচ করে বলল।
— উহু, আজ আর না। অন্য আরেকদিন।
ইশাত আপত্তি দেখিয়ে বলল।
— না, এভাবে খালি মুখে তোমাকে আমি যেতে দেব না। এই প্রথম তুমি আমাদের বাসায় এসেছ।
আসিয়া বেগম তখন তার বিষন্নতা কাটিয়ে মুখে হাসি নিয়ে বললেন।
— তোমারা গল্প করো, আমি নাস্তা তৈরি করে আনছি।
কথাটা বলে আসিয়া বেগম আর জেরিনের উত্তরের অপেক্ষা করলেন না। দ্রুত কদমে তিনি রান্নাঘরে চলে গেল। জেরিন তখন ইশাতকে বলল।
— আমার তোমার সাথে একান্তে কিছু কথা ছিল।
— চলো তাহলে আমার রুমে গিয়ে বসি।
জেরিন মাথা নেড়ে সম্মতি দিতেই ইশাত তাকে নিজের রুমে নিয়ে গেলো। জেরিনকে সে তার বিছানায় বসিয়ে নিজেও পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলো।
— এবার বলো কি বলতে চাও।
জেরিন তখন চিন্তিত দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— আমার প্রশ্ন তুমি কেন এভাবে সত্য লুকাচ্ছ তাদের থেকে? তুমি তো চাইলেই সবাইকে সবটা জানিয়ে দিতে পারতে? তাহলে সব দোষ নিজের ঘাড়ে কেন নিলে? এর পেছনে কি কোনো কারণ লুকিয়ে আছে?
এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে ইশাত কিছুক্ষণ চুপ রইলো। তখন জেরিন আবারো জিজ্ঞাসা করলো।
— এভিয়ান কি তোমাকে কোনো হুম’কি দিয়েছে?
ইশাত তড়িৎ উত্তর দিলো।
— না।
জেরিন চোখে গভীর প্রশ্ন নিয়ে বলল।
— তাহলে?
ইশাত গলার স্বর নামিয়ে বলল।
— আমি তাকে একটা সুযোগ দিতে চাইছি।
জেরিন অবাক হয়ে বলল।
— সুযোগ? রিজভী বলল তুমি ওর অফিসে কাজ করছো তাও আবার নিজের ইচ্ছেতে। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এর পেছনে তোমার কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। আমাকে তুমি বিশ্বাস করে নিশ্চিন্তে সেটা জানাতে পারো।
ইশাত এবার ভরসা পেয়ে মনে সাহস জুগিয়ে বলল।
— আপু আল্লাহর ইচ্ছে থাকলে আমি চাইছি তাকে পরিবর্তন করতে। আমি চাই তার কালো ব্যবসাগুলো সব ধ্বং’স করে তাকে এই কালো জগৎ থেকে বের করে আনতে। আমি চাই আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করুক। সে ন্যায় অ’ন্যায় বুঝুক।
জেরিন মৃদু হেসে ইশাতের হাতে হাত রেখে বলল।
— ইশাত দেখো এভিয়ান আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি জানি ও হাজার নিজেকে নি’ষ্ঠুর দেখাক না কেন, ওর ভেতরেও একটা কোমল হৃদয় রয়েছে, যা ওর অতীতের কালো স্মৃতিতে চাপা পড়ে আছে।
ইশাত দৃঢ়তা নিয়ে বলল।
— আমি চাইছি তাকে এই নিষ্ঠু’রতা থেকে বের করে আনতে। কিন্তু এই বিষয়ে তুমি ওনাকে কিছু বলবে না প্লীজ।
জেরিন সন্দেহ নিয়ে বলল।
— কিন্তু তুমি এটা কেন করবে?
— ধরে নাও আমি তার এক শুভাকাঙ্ক্ষী।
জেরিন তখন তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— কিন্তু তোমার চোখ দুটো তো অন্য কিছু বলছে।
ইশাত অপ্রস্তুত হয়ে বলল।
— কি বলছো আপু?
— হুম, আই ক্যান ফিল। ডু ইউ লাইক হিম?
ইশাত তার দৃষ্টি আড়াল করে বলল।
— তোমার এমন কেন মনে হচ্ছে?
জেরিন রহস্যময় হেসে বলল।
— কারণ তোমার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলো এমনটা করতো না।
ইশাত তার অনুভূতি অস্বীকার করে বলল।
— এমন কিছুই না।
জেরিন তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
— তুমি ঘাবড়িও না, আমি তোমাকে সাহায্য করব। তোমার যেকোনো সময় যেকোনো দরকারে আমাকে বলতে পারো।আমিও চাই এভিয়ানের জীবনে এমন কেউ আসুক যে তার এলোমেলো জীবনটা ভালোবাসা দিয়ে গুছিয়ে নিবে। ছেলেটা ভেতরে ভেতরে ভালোবাসার কাতর। আমি জানি ওকে কেউ একটু ভালোবালেই ও তার জন্য পুরো পৃথিবী উজাড় করে দিতে জানে। কিন্তু ভাগ্য ওকে বারবার সেই ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করেছে। এটা সত্য যে ও জীবনে অনেক পা’প করেছে কিন্তু পূর্বে সে ভালোবাসা পাওয়ার লোভে যার কাছেই গিয়েছে তারাই ওকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। অবহেলা করেছে, অ’ন্যায়ভাবে ওকে ঠকিয়েছে, একা করে ছেড়েছে। এরপর থেকে ও আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। ওর এই ভয়ান’ক পরিবর্তনের পেছনে তার আপনজনেরা অনেকাংশে দায়ী।
ইশাত চোখে সহানুভূতি নিয়ে বলল।
— সেই সময়টা তার জন্য অনেক কষ্টকর ছিল তাই না?
জেরিন মাথা নাড়িয়ে বলল।
— হ্যা, এই কষ্টই তাকে কঠিন করে দিয়েছে। কিন্তু আমি চাই ওর জীবনটাও সুন্দর হোক।
ইশাতের মনের মধ্যে তখন একটা প্রশ্ন ঘুড়লো। সেটা সে প্রকাশ করে বলল।
— তুমি তো তোমার বন্ধুকে চেন, আমি কি পারবো তার হৃদয়ের এই কঠিনত্ব দূর করতে?
জেরিন প্রশস্ত হেসে তাকে অনুপ্রাণিত করে বলল।
— মন দিয়ে চেষ্টা করলে কেন নয়?
ইশাতও পলক ঝাপটে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )……………………..

