Home "ধারাবাহিক গল্প ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৩১+৩২

ক্লান্তিহীন তুই আমার ফরিয়াদ পর্ব-৩১+৩২

0
132

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩১
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

রাতে বাসায় পৌঁছে ইশাত আগে ভাইয়ের কাছে গিয়ে এভিয়ানের রুমের লকারটার কথা জানালো। ইশাত একা এভিয়ানের বাড়িতে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছে বলে ইমরান আপত্তি করলো। সে চিন্তিত হয়ে বলল।
— তুই আমাকে না জানিয়ে এই কাজটা কীভাবে করলি? যতই হোক একজন মেয়ে হয়ে তোর নিজের নিরাপত্তার কথা আগে ভাবা উচিত ছিল।

ইশাত তাকে শান্ত করে বলল।
— তুমি আমাকে একজন মেয়ে হিসেবে নয় বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে বড় করেছ। তাছাড়া আমি একা এই রি’স্ক নেই নি। আমাকে এভিয়ানের বন্ধু রিজভী সাহায্য করেছে। তিনিই আমাকে এভিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করিয়ে সব সুযোগ করে দিয়েছেন।

ইমরান সন্দেহ নিয়ে বলল।
— এভিয়ানের বন্ধু তোকে কেন সাহায্য করবে? এমন তো নয় যে এর পেছনে কোনো ষড়’যন্ত্র আছে?

— ভাইয়া তুমি জানো আমি মানুষ চিনতে ভুল করি না। আমি দেখেছি রিজভী ভাইয়া আর জেরিন আপু কখনো এভিয়ানের এসব কাজের সাথে জড়িত ছিল না। তারা ফিরিয়ে আনতে চায় তাদের বন্ধুকে তার তৈরি করা কালো দুনিয়া থেকে। অকারণে আমাকে কেনই বা তারা সাহায্য করবে? তারা বলেছে প্রয়োজন পড়লে আমাকে সব ভাবে সাহায্য করবে। এটাই আমাদের সুযোগ নাহলে ওই অফিসে আমার জয়েন করা বৃথা যেত। তুমি চিন্তা করো না আমার কিছুই হবে না। আমি নিজের খেয়াল রাখতে জানি। এখন বলো আমি কি করে সেই লকটা খুলবো?

— তুই কোনো ভাবে এভিয়ানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট এনে আমাকে দিবি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট পেলে সেটা ফরেন্সিক লেবে পাঠিয়ে আমি একটা থ্রী ডি মোল্ড তৈরি করে এনে তোকে দেব। আর সেটা ব্যবহার করেই তুই লকটা খুলতে পারবি।

ইমরানের কথা মন দিয়ে শুনে ইশাত হ্যাসূচক মাথা দোলালো। পরেরদিন ইশাত সময়মত অফিসে গিয়ে পৌঁছালো যেন এভিয়ান তার আগে অফিসে না থাকতে পারে। নিজ জায়গায় বসে সবার অগচরে সে ফি’ঙ্গারপ্রিন্ট জোগাড় করতে কাজে লেগে গেল। কিছুক্ষণ পর এভিয়ানকে অফিসে প্রবেশ করতে দেখা গেলো। সবাই তাকে দেখা মাত্র উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানালো। সবার মাঝে তখন এভিয়ানের চোখ ইশাতকে খুঁজছিল। তাকে দেখা মাত্র এভিয়ান মৃদু হাসলো। হাসির সাথে তার চোখ দুটোও হেসে উঠল। প্রত্যুত্তরে ইশাতও মুচকি হাসলো। সবাইকে চোখের ইশারায় বসার অনুমতি দিয়ে এভিয়ান সোজা তার কেবিনে চলে গেলো। তখন সায়মা ইশাতের কানে কানে বলল।
— দেখলে স্যার কেমন হাসিখুশি ছিল? আজকে মনেহয় স্যারের মুড ভালো আছে।

ইশাত মাথা দুলিয়ে হেসে সিট থেকে উঠে এভিয়ান বলার আগেই আজ নিজে থেকে তার কফি বানিয়ে নিয়ে কেবিনে গেলো। ভেতরে প্রবেশ করে ইশাত কফির কাপটা টেবিলে রাখার সময় ইচ্ছে করে এভিয়ানের সামনে একটা ক্লে দিয়ে তৈরি কার্টুনের চাবি রিং ফেললো। এভিয়ান সেটা তুলে হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে গিয়ে, তার আঙুলের চাপ লাগায় সেটায় তার ফিঙ্গা’রপ্রিন্ট চলে এলো। সেটা খেয়াল করে নিজের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার আনন্দে, আনমনে ইশাতের চোখের তারা চকচক করে উঠলো। তখন এভিয়ান ইশাতকে সেটা ফিরিয়ে দিতে দিতে মজার ছলে বলল।
— এখনো তুমি বাচ্চাদের মতো এসব সাথে রাখতে পছন্দ করো?

ইশাত হাত বাড়িয়ে নিজের আঙুলের স্পর্শ না লাগতে দিয়ে সাবধানে সেটা নিলো। মুখে মেকি হাসি নিয়ে সে বলল।
— হ্যা শখের বসে রাখি।

এভিয়ানের কথার প্রত্যুত্তর করে ইশাত কোনো মতে কেবিন থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে চলে এলো। কিছুক্ষণ পূর্বে সে নরম ক্লেতে কর্ন স্টার্চ লাগিয়ে নিয়েছিল বলে এভিয়ান ধরার পর সেখানে সুন্দর করে তার আঙুলের ছাপ বসে যায়। ইশাত ক্লেটাকে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে শুকিয়ে একটা পেপার এভিডেন্স খামে সংগ্রহ করে রাখলো। রাতে বাসায় গিয়ে এটা সে তার ভাইয়ের হাতে দিবে বলে সাবধানে রাখলো।

কিছুক্ষণ পর দুপুরের নামাজ আর লাঞ্চ শেষে আবারও কাজের জন্য ডেস্কে এসে বসেছে ইশাত। লাঞ্চ টাইম তখনও চলমান। বাকিরা এই সময় লাউঞ্জেই রয়েছে। শুধু ইশাত এখানে একা বসে কাজ করছে। কিবোর্ডে অনবরত তার হাত চলছে আর লিখা টাইপ হচ্ছে। অকস্মাৎ তখন ইশাত অনুভব করলো আস্ত চেয়ারসহ সে নড়ে উঠলো। ভূমিকম্প ভেবে সে চোখ তুলে আশেপাশে তাকাতেই দেখলো এভিয়ান ঠিক তার পেছনে দাড়িয়ে। তাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে এভিয়ান তখন বলল।
— বাঁকা হয়ে বসে কাজ করলে কোমর ব্যথা করবে। তখন অফিসে এসে কাজ করবে কে?

ইশাত তখন বুঝলো এখানে কোনো ভূমিকম্প হয়নি। বরঞ্চ এভিয়ান তার চেয়ার টেনে সোজা করে দিয়েছে। ইশাত তখন মনে কৌতূহল নিয়ে এভিয়ানকে প্রশ্ন করলো।
— কেন? আপনি কি আমার জন্য চিন্তিত? আমার এসবের খেয়াল আপনি কেন রাখছেন?

এভিয়ান তার ধারণা শুধরাতে বলল।
— এটা ইনভেস্টমেন্ট। তোমার অসুস্থতা মানে আমার অফিসের কাজে লস।

এভিয়ান মুখে যাই বলুক না কেন এভিয়ানের চোখে ইশাত নিজের প্রতি যত্ন দেখছে। তবুও তার এভাবে কথা ঘুরানো দেখে ইশাত ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বলল।
“কেয়ার আছে কিন্তু স্বীকারোক্তি নেই।”

এভিয়ান এক ব্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করলো।
— কিছু বললে আমাকে?

— নাহ আপনাকে কে কি বলবে?

— বাই দ্যা ওয়ে, তুমি যে অডিওটা কাল দিয়েছ সেটা অনেক রিলাক্সিং ছিল এন্ড অলসো মাইন্ড সুথ করতে হেল্পফুল ছিল।

ইশাত খুশি হয়ে বলল।
— তাই? আপনি চাইলে আমি এরকম আরো কিছু সূরা আপনাকে পাঠাতে পারি।

— বাই এনি চান্স, তুমি কি কোনোভাবে আমাকে হি’পনোটাইজ করতে এটা দিয়েছ? এটাতে কি হি’পনোটাইজ করার মতো কিছু ছিল?

ইশাত মজা করে বলল।
— থাকলে থাকতে পারে। লাঞ্চ করেছিলেন?

— হুম।

— কি খেয়েছেন?

— বাহির থেকে আনা স্যুপ এন্ড স্টেক। বাট ইটস নট এজ গুড এজ ইওর কুকিং।

ইশাত যেন আরেকটা সুযোগ পেল এভিয়ানের বাসায় ঢোকার। সেই সুযোগে সে বলল।
— কাল তো শুক্রবার, আপনি চাইলে আমি কাল জেরিন আপুর সাথে এসে আপনার জন্য রান্না করে দিয়ে যেতে পারব।

এভিয়ান যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পেয়ে গেল। সে সম্মতি দিয়ে বলল।
— ওকে ডান।

তাদের মুহূর্তে বিঘ্ন ঘটিয়ে তখন বাকিরাও সেখানে এসে উপস্থিত হলো। লাঞ্চ টাইম তখন শেষ। সবাই নিজ নিজ ডেস্কে এসে বসছে, এভিয়ানও সেখান থেকে চলে গেলো। সায়মা ইশাতের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো।
— স্যারকে দেখলাম তোমার ডেস্কের কাছে দাড়িয়ে ছিল। কি বললেন উনি?

ইশাত পুনরায় তার কাজে মন দিয়ে বলল।
— তেমন কিছু না।

সায়মাও আর কোনো প্রশ্ন করলো না। ইশাত তার কাজ দ্রুত শেষ করে সন্ধ্যার সময় সবার আগে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। কিন্তু দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পরও সে কোনো রিকশা পেলো না। আচানক তখন একটা গাড়ির হর্নের আওয়াজ তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। ইশাত পেছনে তাকিয়ে দেখলো এভিয়ান গাড়িতে বসে হর্ন দিচ্ছে। সে ভাবলো হয়তো এভিয়ান তাকে গাড়ির সামনে থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য হর্ন দিচ্ছে, তাই সে সরে দাড়ালো। কিন্তু সে সরার পরেও গাড়ি সামনে এগোলো না। উল্টো এভিয়ান তার গাড়ি থেকে নেমে ইশাতের বরাবর এসে দাঁড়ালো। ইশাত তাকে হাতের ইশারায় কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করাতে, এভিয়ান এবার মুখ ফুটে বলল।
— গাড়িতে উঠো আমি পৌঁছে দিচ্ছি।

ইশাত হাত নাড়িয়ে মানা করে বলল।
— সমস্যা নেই আরেকটু সময় দাঁড়ালেই রিকশা পেয়ে যাব।

এভিয়ান তখন তার জোড় খাটিয়ে বলল।
— আমি কি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি?

ইশাত এক ব্রু উঁচিয়ে বলল।
— অফিসের বাহিরে অর্ডার চলে না স্যার।

এভিয়ান বেপরোয়া উত্তরে বলল।
— আমি অফিস আর অফিসের বাহিরে মানি না।

ইশাত বুকে হাত ভাঁজ করে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল।
— এভাবে অর্ডার করে বললে উঠব না।

— কীভাবে বললে উঠবে?

— সুন্দর করে বললে।

এভিয়ান তখন তার গাড়ির দিকে ফিরে গেলো। ইশাত ভাবলো এভিয়ান বুঝি তার কথায় এসব করবে না, সে হয়তো এখন মুড দেখিয়ে একাই গাড়িতে উঠে চলে যাবে। কিন্তু এভিয়ান তাকে আবারও ভুল প্রমাণ করে গাড়ির দরজা মেলে ধরে চোখের ইশারায় উঠে বসতে বলল।
— বসুন মেডাম।

ইশাত এবার মুখে হাত চেপে হেসে ফেলল। সঙ্গে এভিয়ানও হেসে ফেলল। ইশাত আর দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসলো। এভিয়ানও ঘুরে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসলো। তারা দুজন উঠে বসার পর, এভিয়ানের গাড়ি সীমানার আড়াল হতেই দেখা গেলো পেছনের একটা কালো রঙের গাড়ি। ভেতরের কাচে আবছা দেখা যাচ্ছে ড্রাইভিং সিটে আসিফ বসা। সে এতক্ষন বসে থেকে এভিয়ান আর ইশাতকে দেখছিল। তাদের দুজনকে একসাথে হাসাহাসি করে কথা বলে, একই গাড়িতে উঠে চলে যেতে দেখে সে হিংসায় জোড়ে স্টিয়ারিং হুইলে একটা ঘুষি বসালো। মাথায় তার তখন উল্টা পাল্টা চিন্তা ঘুরতে শুরু করলো।

ওদিকে ইশাতের কথায় এভিয়ান তার বাড়ির এক গলি আগে তার গাড়ি থামালো। ইশাত গাড়ি থেকে নেমে তাকে হাতের ইশারায় বিদায় জানিয়ে বাকিটা হেঁটে চলে গেলো। এভিয়ান পেছন থেকে তার যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাকিয়ে রইলো। বাসায় পৌঁছেই ইশাত আগে ভাইকে কল করলো। ইমরান ইশাতের কল পেয়ে বাসায় এসে ইশাতের কাছ থেকে খামটা নিয়ে ফরেন্সিক লেবে চলে গেলো। সেই রাতের মধ্যেই ইমরান ফরেন্সিক লেব থেকে সেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট বের করে সেটার থ্রী ডি সিলিকন মোল্ড তৈরি করে এনে ইশাতের হাতে এনে দিলো। এখন বাকি যা করার ইশাতকেই করতে হবে।

——————–

লাল নীল লাইটের তীব্র আলোর ঝলকানির নিচে অ’শ্লীল ভঙ্গিতে নৃত্য করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাচ্ছে কয়েকজন রমণী। পড়নে তাদের খোলামেলা জমকালো পোশাক। উপস্থিত সকলে লা’লোসা নিয়ে তাদের নৃত্য দেখে যাচ্ছে। আসিফ বারের টুলে বসে একেরপর এক ম’দের বোতল শেষ করে যাচ্ছে। অতিরিক্ত নে’শায় তার সামনের দৃশ্যপট ঘোলা হয়ে এসেছে। তখন আচানক তাদের মধ্য থেকে একজন রমণী অফিসের সামনে এসে তার কাঁধে হাত রেখে নাচতে শুরু করলো। ঘোলা চোখে আসিফের মেয়েটাকে তখন ইশাত মনে হলো। আসিফ ইতিমধ্যে তার হুসে নেই। সে ক্রোধে মেয়েটার হাত চেপে ধরে এক টানে তার উরুতে বসিয়ে ঠোঁট কাছাকাছি নিয়ে বলল।
— আমি এতোগুলো বছর তোর জন্য অপেক্ষা করেছি আর তুই কিনা আমার থেকে অন্য কাউকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিস? তোকে আজ আমি ছাড়ব না।

কথাটা বলে সে মেয়েটার কোমর শক্ত করে চেপে ধরলো। মেয়েটা তখন তার শার্টের কলার ধরে তাকে টেনে উঠিয়ে সঙ্গে নিয়ে যেতে যেতে বলল।
— এখানে নয় ভেতরের রুমে গিয়ে দেখো।

আসিফ নে’শায় বুদ অবস্থায় মেয়েটার সঙ্গে চললো। পুরো রাত কেটে গেলো। ভোর সকালে তীব্র মাথা ব্যাথা নিয়ে তার ঘুম ভাঙ্গলো। তার নে’শার ঘোর এখন কেটেছে। কিন্তু আশেপাশে তাকিয়ে সে খেয়াল করলো যে সে অন্য একটা বিছানায়, এমনকি অন্য একটা রুমে। ধীরে ধীরে তার হুস ফিরল। পাশে তাকিয়ে বিছানায় পাশাপাশি সে অন্য একটা মেয়েকে শুয়ে থাকতে দেখে, আস্তে আস্তে রাতের কথা তার মনে পড়লো। সাথে এটাও মনে পড়লো যে সে ইশাত ভেবে মেয়েটার সাথে রাতে যা তা করে বসেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে বিছানা ছেড়ে ফ্লোরে পড়ে থাকা কাপড় গায়ে দিয়ে চলে যেতে নিলো। কিন্তু পেছন থেকে মেয়েটা তার হাত টেনে ধরলো। সে রাগে ক্ষোভে মেয়েটার হাত ঝাড়া মে’রে সমস্ত শক্তি নিয়ে মেয়েটার গালে চর বসিয়ে সেখান থেকে চলে গেল।

চলবে ……………………….

#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩২
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা

দুপুর ১২ টার দিকে জেরিন আর রিজভী ইশাতকে তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে এভিয়ানের বাড়িতে এসে পৌঁছালো। রিজভী, জেরিন আর ইশাত বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখলো দিনের বেলায়ও ভেতরটা কেমন অন্ধকার করে রাখা। শুধু হলুদ লাইটের মৃদু আলো এভিয়ানের উপর পড়ে আছে। যে কিনা ইতোমধ্যে সোফায় বসা। সামনে তার দা’বার বোর্ড। আর সে গুটি চালছে। খেলা অর্ধেক হয়ে এসেছে। সাদা গুটি এগিয়ে আর কালো গুটি কোণঠাসা। রিজভী তখন তার পাশে গিয়ে বসে বলল।
— কিরে একা একা কার সাথে খেলছিস? ভূত টুত আছে নাকি এখানে? যেমন অন্ধকার করে রেখেছিস ভাই ভয়ই করে।

এভিয়ান গুটির দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হেসে বলল।
— নিজের সাথে নিজেই খেলছি। জিতলেও আমি হারলেও আমিই।

রিজভী মাথা চাপড়ে বলল।
— তুই পাগল হয়ে গেছিস।

জেরিন তখন এভিয়ানের সামনে থেকে দা’বার বোর্ড সরিয়ে বলল।
— ইশাত আর আমি কিচেনে যাচ্ছি। সেই পর্যন্ত তুই ফ্রেশ হয়ে আয়। আজকে একসাথে সবাই আনন্দ করবো।

এভিয়ান উঠে ইশাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে উপরে চলে গেলো রিজভীও তার পেছনে গেলো। ইশাতের কাছে এভিয়ানের আচরণ আজকে একটু রহস্যজনক মনে হলো। তখন জেরিন ইশাতকে নিয়ে কিচেনে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর এভিয়ান আর রিজভী নিচে নেমে এলো। রিজভী হলরুমে বসে ভিডিও গেম নিয়ে পড়লো। এভিয়ান পাশে গিয়ে বসলো। কিন্তু মনযোগ তার রান্নাঘরের দিকে। জেরিন ইশাতকে যখন কাজে টুকটাক সাহায্য করছিল তখন জেরিনের ফোনে একটা কল এলো। জেরিন ইশাতকে বলে কল রিসিভ করতে বেরিয়ে গেল।

এভিয়ান তখন উঠে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানির বোতল নেওয়ার অজুহাতে কিচেনে গেলো। ইশাত চপিং বোর্ডে সবজি কাটছিল। এভিয়ান যখন ফ্রিজ থেকে বোতল বের করতে ফ্রিজের দরজা খুললো তখন সেদিকে তাকাতে গিয়ে অমনোযোগে ছু’রি দিয়ে তার হাতে পোচ লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে ধা’রালো ছু’রির আ’ঘাতে একটা আঙুল তার কে’টে র’ক্ত গড়িয়ে পড়লো। এটা দেখে র’ক্ত থামাতে এভিয়ান দ্রুত তার হাত চেপে ধরতে এলে ইশাত সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল।
— খবরদার ছুবেন না।

এভিয়ান আশ্চর্য হয়ে বলল।
— তোমার হাত থেকে র’ক্ত ঝরছে।

— ঝরুক তবুও ছোঁবেন না।

— আমি ছুলে কি এমন হবে?

— এটা হা’রাম। ইসলামে কোনো নারীকে নন মাহরামের ছোঁয়া হা’রাম।

— এর অর্থ কি?

— ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী নন-মাহরাম হচ্ছেন তারা যাদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ। আমাদের ধর্মে বিয়ের বাহিরে নারীদের স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। স্বামী ব্যতীত তাকে অন্য কোনো পুরুষ স্পর্শ করলে জিনার গুনাহ লিখা হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও তাই। তারা স্ত্রী ব্যতীত অন্য নারীদের স্পর্শ করতে পারবে না।

এভিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— তাহলে তোমাকে ফার্স্ট এইড এনে দেই হাতে ড্রেসিং করে নাও।

ইশাত সম্মতি জানালো। এভিয়ান বক্স এনে তার সামনে দিলে সে নিজেই নিজের ড্রেসিং করে আবারও রান্নার কাজ করতে নিলো। এভিয়ান তখন তাকে বাধা দিয়ে বলল।
— তুমি বলো যা করার আমি করে দিচ্ছি, এই হাত নিয়ে তোমাকে আর এসব করতে হবে না।

— আমি পারব।

— আমি বলেছি না আমি করে দিচ্ছি।

ইশাত তাকে সবজি এগিয়ে দিয়ে কিভাবে কাটবে বুঝিয়ে দিল। এভিয়ান সেগুলো কাটতে লাগলো। জেরিন সেই সময় রান্নাঘরে ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে বোকা বনে গেল। সে রিজভীকে ডাক ছেড়ে রান্নাঘরে আসতে বলল। রিজভী এসে এমন দৃশ্য দেখে চোখ কপালে তুলে বলল।
— জীবনে এই প্রথম এমন দৃশ্য দেখলাম মনেহয়।

এভিয়ান চোখ পাকিয়ে বলল।
— এতো অবাক হওয়ার মতো কিছুই করি নি। ওর আঙুল কে’টে গিয়েছিল তাই সাহায্য করছি বেস।

জেরিন তখন চিন্তিত হয়ে ভেতরে গিয়ে ইশাতের আঙুল নেড়ে চেড়ে দেখে এভিয়ানকে কিচেন থেকে বের করে দিয়ে বলল।
— তুই যা, আমি এসে গেছি। বাকিটা আমি সামলে নেব।

এভিয়ান আর রিজভী জেরিনের তাড়া খেয়ে আবারো বাহিরে এসে বসলো। কিছুক্ষণ পর খাবার রেডি করে ইশাত টেবিলে নিয়ে রাখলো। জেরিন দুজনকে বেড়ে দিলো। রিজভী তাদেরকেও সাথে বসতে বললে জেরিন চোখের ইশারায় তাকে কিছু একটা বুঝিয়ে বলল ইশাত আর সে পরে খাবে। জেরিন তখন তরকারি বাড়তে গিয়ে ইচ্ছে করে ইশাতের বোরকায় ফেলে দিলো। এরপর সে নাটকীয়তা ধরে রেখে অফসোস করে বলল।
— সরি ইশাত খেয়াল করি নি। চলো তোমাকে উপরে ওয়াসরুমে নিয়ে জায়গাটা ধুয়ে নিয়ে আসি।

ইশাত সম্মতি জানিয়ে তার সাথে যেতে নিলে এভিয়ান বলল।
— ওয়াশরুম তো নিচেও রয়েছে।

জেরিন বাহানা বানিয়ে বলল।
— উপরে ড্রায়ার আছে। স্টেইন সহজে উঠবে না তাই ওইটুকু ধুয়ে ড্রায় করে দেব। আর উপর থেকে আমরা নাহয় একেবারে জুম্মার নামাজটাও পড়ে নিলাম। তোরা খেতে থাক আমরা আসছি।

কোনমতে এটা ওটা বুঝিয়ে বিষয়টা সাম্ভাল দিয়ে জেরিন ইশাতকে নিয়ে উপরে এসে এভিয়ানের রুমে চলে গেলো। সেখানে ওয়াশরুম থেকে কোনো মতে ইশাতের বোরকা পরিষ্কার করে ইশাত এভিয়ানের ক্যাবিনেট খুললো। যেখানে লকারটা ছিল। জেরিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল। ইশাত তখন দ্রুত ব্যাগ থেকে ফি’ঙ্গারপ্রিন্ট মোল্ডটা বের করে নিজের আঙুলের পরে নিয়ে লকারে ফি’ঙ্গারপ্রিন্ট বসানোর জায়গায় বিসমিল্লাহ বলে চেপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে স্ক্যান শুরু হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেখানে সবুজ বাতি জ্বলে লিখা উঠলো ফিঙ্গা’রপ্রিন্ট ম্যাচড। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিপবিপ শব্দ তুলে লকারের দরজা আপনাআপনি খুলে গেল। এই খুশিতে জেরিন আর ইশাত একে অপরের হাতের তালুতে সশব্দে চাপড় মেরে হাই ফাইভ তুলল।

কিন্তু পরক্ষণে তাদের খুশি মিইয়ে গেল লকারের ভেতর সম্পূর্ণ খালি দেখে। জেরিন তখন আতঙ্কিত হয়ে বলে উঠলো।
— তাহলে কি এভিয়ান আমাদের প্লেন আগেই ধরে ফেলেছিল?

ইশাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
— হয়তো, নাহলে উনি এমন কোনো ভুল করেন না।

জেরিন হতাশ হয়ে বলল।
— কি আর করার চল ফিরে যাই তাহলে।

জেরিন ফিরেই যাচ্ছিল তখন ইশাত কিছু একটা লক্ষ্য করে তাকে থামিয়ে বলল।
— এটা কি লকারের উপরে?

ইশাতের কথায় জেরিন লকারের উপর হাত দিয়ে একটা কাগজ পেল। সে সেটার ভাঁজ খুলতেই দেখলো, কাগজে বড় করে কোনো শহরের নকশা আঁকা। মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় লাল দাগ দিয়ে মার্ক করা। জেরিন তখন আন্দাজ করে বলল।
— এটা ওর ফ্যাক্টরির ম্যাপ তো নয়?

ইশাত মনে সন্দেহ নিয়ে বলল।
— এই গুরুত্বপুর্ন জিনিস উনি এভাবে কেন ফেলে রাখবেন? সব সরিয়ে রাখলে এটায় তো ভুল হওয়ার কথা না।

জেরিন কাগজটা তার হাতে দিয়ে তাকে তাড়া দিয়ে বলল।
— এতকিছু জেনে লাভ নেই, যা দরকার ছিল পেয়ে গেছ। চলো এখন নামাজ পড়ে তাড়াতাড়ি নিচে যাই নাহয় আরও সন্দেহ করবে।

ইশাত কাগজটা সাবধানে ব্যাগে ভরে রেখে ওযু করে জেরিনের সাথে নামাজে দাড়ালো। নামাজ শেষে তারা ফিরে এসে দেখলো। এভিয়ান আর রিজভী খাওয়া শেষ করে উঠে পড়েছে। এবার জেরিন আর ইশাত একসাথে খেতে বসবে। ঠিক তখন ইশাতের ফোন বাজলো। সে দেখলো মায়ের কল। রিসিভ করে কানে ধরতেই আসিয়া বেগম বললেন।
— জলদি বাসায় আয় আসিফ তার মাকে নিয়ে এসেছে আমাদের বাসায়।

ইশাত আসছি বলে ফোনটা কেটে ব্যাগে রেখে উঠে দাড়ালো। জেরিন তখন প্রশ্ন করে বলল।
— কি হলো উঠলে কেন?

— আপু আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে। আম্মু কল করেছিল।

— কি বলো! এতো কষ্ট করে রান্না করলে না খেয়ে যাবে?

— কিছু করার নেই আপু।

— আমি এভাবে যেতে দিচ্ছি না, একটু হলেও খেতে হবে।

জেরিনের জোরাজুরিতে ইশাত বাধ্য হয়ে প্লেটে সামান্য খাবার বেড়ে কয়েক লোকমা মুখে তুলে খেয়ে, হাত ধুয়ে উঠে দাড়ালো। জেরিন এবার তাকে যাওয়ার অনুমতি দিলে, রিজভী গাড়িতে করে ইশাতকে পৌঁছে দিয়ে এলো। বাসায় পৌঁছে ইশাত দেখলো আসিফ মায়ের সাথে সোফায় বসে। সামনেই নানান পদের মিষ্টির খাপ রাখা। তাকে দেখে আসিফ মুচকি হাসি উপহার দিলো। আসিফের মা রোকেয়া বেগম তাকে টেনে নিয়ে সাথে বসিয়ে বললেন।
— তোমার আর আসিফের বিয়ের কথাটা আবারো পাকাপাকি করতে এলাম। আসিফ আমাকে জানিয়েছে বিয়েটা নাকি ওর দাদি এসে ভেঙে দিয়ে গিয়েছিল। আসিফের দাদি তো এখন আর নেই যিনি আপত্তি করতেন। তাই এখন আর কেউ বাধা দিবে না তোমাদের বিয়েতে। তোমার মা আমাকে জানিয়েছে বিয়েটা ভাঙার পর সমাজের মানুষ তোমাকে নানান কথা শুনিয়েছে। তোমাকে বলেছে তোমার আর কোথাও নাকি বিয়ে হবে না। কিন্তু আমি আমার ছেলের সাথে তোমার বিয়েটা দিয়ে তাদের উচিত জবাব দিয়ে দিতে চাই।

আসিফের মায়ের কথা শুনে ইশাত থ হয়ে গেল। মায়ের দিকে ফিরে তাকাতেই দেখলো আসিয়া বেগম অনেক হাসিখুশি। এরমানে সে হয়তো চাচ্ছে এই বিয়েটা হোক। ইশাত কি তাহলে ঘুরেফিরে আবারো সেই একই পরিস্থিতিতে এসে পড়লো? তারা যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ ইশাত সেখানে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে ছিল। তারা যাওয়ার পর ইশাত নিজের রুমে চলে এলো। আসিয়া বেগম তাদের বাহিরে পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে দরজা আটকে ইশাতের রুমে এলো। তিনি মেয়েকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন।
— আমি জানতাম আল্লাহ সহায় হবে। আমার দোয়া তিনি শুনবেন। কোনো মাই তার সন্তানের খারাপ চায় না। সেদিনের ভুলের পর তুই আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলি আমি তোকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। আশাকরি ওই একই ভুল তুই দ্বিতীয়বার করবি না। এখনো সময় আছে নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নে। তোর সাথের বান্ধবীরা তাদের জীবন অনেক আগেই গুছিয়ে নিয়েছে। আসিফ ছেলেটাকে আমার অনেক পছন্দ। তোর জন্য কয়টা বছর অপেক্ষা করলো। এতো কিছুর পরেও যে সে তোকে বিয়ে করতে চাইছে এটা তোর সৌভাগ্য। এই সৌভাগ্য পায়ে ঠেলে দিস না। আমি তোর ভাইয়ের সাথে কথা বলে কথা ফাইনাল করে ওদের জানাব। এখন যত জলদি পারি তোদের বিয়েটা দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাই আমি।

নিজের কথা শেষ করে আসিয়া বেগম রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ইশাত সারাদিনেও আর তার রুম থেকে বের হলো না। রাতে ইমরান এসে তার দরজায় কড়া নেড়ে ভেতরে আসলো। ইশাত ভাইকে দেখে ব্যাগ থেকে বের করে কাগজটা দিল তার হাতে। ইমরান খুশি হয়ে বলল।
— অনেক ভালো কাজ করেছিস তুই ইশু। কালই আমার টিমকে ইনভেস্টিগেশনে লাগিয়ে দিব।

— কিন্তু তুমি যেটা কথা দিয়েছিলে মনে আছে তো?

— যেহেতু তোকে কথা দিয়েছি, তাই চিন্তা করিস না এভিয়ানের নাম ফাঁ’স করবো না। শুধু অবৈ’ধ কারখানাগুলো খুঁজে খুঁজে সরকারিভাবে সিলগালা করে দেব। যেন সে এই ব্যবসা আর না করতে পারে।

— হুম, আজ অফিস আর ওর মা এসেছিল আবারো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তোমার কি মত?

— হ্যা আম্মু বলল। আসিফ ছেলেটাকে আমার পছন্দ। তখন আপত্তি করেছিলাম ওর দাদির ব্যবহারের কারণে। এখন তো তিনি আর নেই। তাই আমার আর আপত্তিও নেই। আমি চাই আমার বোন সুখে থাকুক। ছেলেটা তোকে ভালো রাখবে, বিয়েটা করে ফেল।

— তুমিও কি এটাই চাচ্ছ?

— হ্যা, আর আম্মুও এটাই চাচ্ছে।

ইশাত মাথা ঝুঁকিয়ে দাড়িয়ে রইলো। ইমরান তখন বোনের গালে হাত বুলিয়ে বলল।
— আমি বিয়েটা হোক চাইছি কারণ, তুই যে মরীচিকার পেছনে ছুটছিস সেটার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আর অফিসের সাথে বিয়ে হলে এমনিতেই ওকে ভুলে যেতে পারবি। অনেক তো হলো এখন তোর ভবিষ্যৎ জীবনের কথা ভাব। আমি আসিফদের ফোনে জানিয়ে দিচ্ছি তাহলে কেমন?

ইশাত বুকের উপর পাথরের সমান বোঝা চেপে বলল।
— তোমারা যা ভালো মনে করো।

ইমরান খুশি হয়ে আসিফকে ফোন করে জানাতে চলে গেলো। সারা রাত ইশাত আর চোখের পাতা এক করতে পারলো না। সকালে অফিসে গিয়েও সে অন্যমনস্ক হয়ে রইলো। সে যখন আনমনে বসে ছিল তখন অকস্মাৎ তার কানে এভিয়ানের কন্ঠ ভাসলো।
“আনা উহিব্বুকা।” ( আমি তোমাকে ভালোবাসি )

ইশাত চমকে পাশে ফিরে দেখলো এভিয়ান তার পাশ কেটে চলে গেল। কেউ তাদের খেয়াল করে নি। ইশাত সঙ্গে সঙ্গে উঠে এভিয়ানের পিছু তার কেবিনে গিয়ে প্রশ্ন করলো।
— আপনি কি আমাকে এই মাত্র আরবিতে কিছু বললেন?

এভিয়ান কিছু না জানার ভান করে বলল।
— আমি কি বলবো? তুমি কি শুনেছ?

এভিয়ান আরবি কী করে জানবে এই ভেবে ইশাত তার কথা মেনে বলল।
— বাদ দিন কিছুনা। আমার মনের ভুল হবে হয়তো।

ইশাত ফিরে যাবে তখন রিজভী তরতরিয়ে এভিয়ানের কেবিনে ঢুকে, তাকে ফোনে একটা নিউজ দেখালো। খবরে দেখাচ্ছে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে গোপন কিছু জায়গা থেকে অ’বৈধ মা’দক তৈরির ফ্যাক্টরিগুলোর খোঁজ পাওয়া গেছে। পুলিশ টিম সেটা সরকারিভাবে সিল’গালা করে দিয়েছে। কিন্তু কারখানার মালিকের ব্যাপারে কোনো তথ্য জানা যায়নি। এতটুকু দেখিয়ে রিজভী ফোন বন্ধ করলো। কিন্তু অবাক করা বিষয় এভিয়ান এখনো নির্বিকার রয়েছে যেন কিছুই হয়নি। ইশাত ভেবেছিল এভিয়ান মনেহয় রেগে যাবে এতো এতো লসের সম্মুখীন হয়ে। কিন্তু সামান্যতম রাগ টুকুও তার মধ্যে দৃশ্যমান হলো না।

রিজভী এভিয়ানকে চুপ থাকতে দেখে আতঙ্কিত হয়ে বলল।
— তুই কোনো রিয়েক্ট করছিস না কেন? অতি শোকে পাথর হয়ে গেলি নাকি?

এভিয়ান তখন শব্দ করে হেসে বলল।
— তোদের কি মনেহয় আমি সুযোগ করে না দিলে তোরা এটা এতো সহজেই বের করে ফেলতে পারতি? আমি বলেছিলাম আমার কাজে আমি কোনো ভুল করি না।

রিজভী ধরা পড়ে ভয়ে সেখান থেকে কেটে পড়তে অজুহাত দিয়ে বলল।
— আমি তো ভুলেই গেছি, আমি আমার ল্যাপটপে কাজ পেন্ডিং রেখে এসেছি। আমি গেলাম তুই থাক।

কথাটা বলে কোনো মতে কেটে পড়লো রিজভী। কিন্তু ইশাত ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। সে বিস্মিত চোখে জিজ্ঞাসা করলো।
— আপনার উদ্দেশ্য আসলে কি? ইচ্ছে করে এমনটা করে থাকলেও বা কেন করলেন?

এভিয়ান তখন তাকে আঙুল দিয়ে সত্য ধরিয়ে দিয়ে বলল।
— তুমি আর তোমার ভাই মিলে আমার দেশের কয়েকটা ফ্যাক্টরি বন্ধ করেছ শুধু। কিন্তু বাদবাকি দেশের বাহিরের ফ্যাক্টরিগুলো? সেগুলো কিভাবে করবে? যদি আমি না ইনফর্মেশন দেই তাহলে তোমার ভাইয়ের আর তার সো কল্ড টিমের সাধ্যের বাহিরে সেগুলো বের করা।

এভিয়ান একটা ফাইল ইশাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
— এই নাও এটায় আমার বাহিরের ফ্যাক্টরিগুলোর রেকর্ড আছে। চাইলে সেগুলোও বন্ধ করাতে পরো।

— আপনি তো এগুলো এমনি এমনি দেওয়ার মানুষ না। এর পেছনে কি উদ্দেশ্য লুকিয়ে রেখেছেন বলুন?

— উদ্দেশ্য তো আছেই। উদ্দেশ্য ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? আমার উদ্দেশ্য আমি এই পথ থেকে সরে আসতে চাই। তোমাকে ধন্যবাদ আমার জীবনকে এসে খারাপ ভালো বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে। নয়তো আমি এই ক্ষমতার হিং’স্রতায় অন্ধ হয়ে থাকতাম সারাজীবন। কথা দিচ্ছি এই পথে আর ফিরব না। কিন্তু এর বদলে তোমাকে আমার একটা আবদার রাখতে হবে।

— বলুন কি আবদার?

— এখন না সময় হলে চেয়ে নেব। তখন ফেরাতে পারবে না।

ইশাত কিছু বলার আগে এভিয়ানের ফোনে রিং বাজলো। সেটা দেখে এভিয়ান বাকা হেসে ফোনের স্ক্রিন ইশাতের সামনে ধরে বলল।
— তোমার ভাই কল করেছে।

ফোনটা পুনরায় ঘুরিয়ে সে কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ইমরান ওপাশ থেকে বলল।
— আপনার অফিসের পাশের কফিশপে আছি চলে আসুন।

এভিয়ান উত্তর দিয়ে কল কেটে উঠে দাড়ালো। ইশাত তাকে উঠে যেতে দেখে প্রশ্ন করলো।
— কোথায় যাচ্ছেন?

এভিয়ান চেয়ার থেকে ব্লেজার নিয়ে পড়তে পড়তে বলল।
— তোমার ভাই মুখোমুখি হয়ে কথা বলতে চাইছে।

ইশাত তখন এভিয়ানের দেওয়া রেকর্ডের ফাইলটা তার কাছে এগিয়ে দিয়ে বলল।
— তাহলে এই ফাইলটা আপনি নিজের হাতে ভাইয়ার কাছে তুলে দিয়ে কথা এখানেই শেষ করুন।

এভিয়ান ইশাতের দিকে একবার তাকালো পরক্ষণে ফাইলটা নিয়ে বলল।
— এতো বড় প্রমাণ হাতে পেয়েও বিশ্বাস করে সেটা আবারো আমার হতেই ফেরত দিয়ে দিলে? যদি না দেই?

ইশাত চোখে প্রখরতা নিয়ে বলল।
— আমি আপনাকে বিশ্বাস করি।

ইশাতের কথাটা যেন এভিয়ানের বুকে গিয়ে বিধলো। সে ইশাতের চোখের দিকে তাকালো যার ভাষা ছিল একদম সত্য আর স্বচ্ছ। এভিয়ান ফাইলটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। কথা মতো সে অফিসের সামনের কফি শপটায় পৌঁছে দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলো ইমরান এক কোনার একপাশের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। এভিয়ান তার বিপরীতে পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারের হাতলে হাত মেলে দিয়ে বসলো। ইমরান তখন তাকে দেখে উপহাস করে বলল।
— মিস্টার এভিয়ান জারিয়াথ, আমাকে আপনি একটা সময় চ্যালেঞ্জ করেছিলেন পথ থেকে সরিয়ে দিবেন। তখন বিপরীতে আমি বলেছিলাম আপনাকে এক্স’পোজ করবো। এখন কে হারলো আর কে জিতলো চোখের সামনে সব স্পষ্ট।

এভিয়ান তখন এমনভাবে হেসে ফেলল যেন ইমরান তাকে কোনো এক কৌতুক শুনিয়েছে। সে পাল্টা উত্তরে দাপট দেখিয়ে বলল।
— ভুল বলেছেন, আপনার জেতা পুরোপুরি হয়নি। আপনি বলেছিলেন আমাকে এক্স’পোজ করবেন। নিউজে তো কোথাও আমার নাম উল্লেখ হয়নি। তা ছাড়া কিছু পেতে হলে কিছু হারাতে হয়। আমি সেটাই করেছি। বড় কিছু পেতে ছোট কিছু ছেড়েছি মাত্র।

ইমরান মনে মনে ভাবলো সে চাইলেই পারতো এভিয়ানের নাম এক্সপোজ করতে কিন্তু ইশাতের ওয়াদা তাকে আটকে দিয়েছে। ইমরান এভিয়ানের বাকি কথার মানে না বুঝে বলল।
— মানে? কি বলতে চাচ্ছেন আপনি?

— সেটা বোঝার ক্ষমতা আপনার এখনো হয়নি। তবে সময় হলে বুঝে যাবেন।

ইমরানের কাছে এভিয়ানের প্রত্যেকটা কথা রহস্যময় ঠেকলো। এতো কিছুর পরেও সে এভিয়ানকে পূর্বের ধাঁচে নির্বিকার দেখে আশ্চর্য হলো। এভিয়ান তখন তার হাতের ফাইলটা সন্তপর্নে ইমরানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
— এটায় আমার দেশের বাহিরের ফ্যাক্টরিগুলোর বিষয়ে তথ্য রয়েছে। চাইলে সেগুলোও সরকারিভাবে সিল করে দিতে পারেন। আই ডোন্ট মাইন্ড।

ইমরান আশ্চর্য হয়ে বলল।
— নিজে থেকেই ধরা দিচ্ছেন? এতে আপনার লাভ কি?

— বললামই তো এটা আমার পলেসি। লাভ ছাড়া কিছুই করছি না। বড় কিছু পেতেই ছোট ইনভেস্টমেন্ট করছি।

ইমরান এবার বিভ্রান্ত হলো। বিপরীতে এভিয়ান মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করলো।
— ক্যাপাচিনো অর ব্ল্যাক কফি?

ইমরান ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে উত্তর দিল।
— ব্ল্যাক কফি।

চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………………..