#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩৫
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
মাঝ রাতে খু’নের ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরা নষ্ট করে ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেল আসিফকে। আজ সকালে নিউজে সে দেখেছিল ইমরান কোনো একটা ক্লু নিয়ে কথা বলেছে। সেটা খুঁজে বের করে সে মুছে দিতে এসেছে। এমন সময় ভেতরের সব লাইট হঠাৎ করে চালু হয়ে গেল। ইমরান সারারাত এখানেই ছিল। সে আড়াল থেকে বেরিয়ে আসিফের সম্মুখে দাঁড়িয়ে অবিশ্বাস নিয়ে বলল।
— আসিফ! এর মানে খু’নটা কি তুমি করেছ?
আসিফ ধরা পড়ে অস্বিকার করে বলল।
— না আমি করি নি। আমি কিভাবে করব?
— অজুহাত দেখিও না। ইশাত আমাকে বলেছে সেদিন রাতে তুমিও পার্টিতে উপস্থিত ছিলে। আমার চোখকে তুমি ফাঁকি দিতে পারবে না। এখন আমার চোখের সামনে সব স্পষ্ট। তুমি এটা কেন করেছ?
— কেন করেছি মানে? এই জা’নোয়ারটা আমার হবু বউয়ের সাথে জবরদস্তি করতে চেয়েছে, আর আমি নাকি ওকে ছেড়ে দিতাম? কখনোই না, তাই ওর ওই হাত আমি কু’চিকু’চি করে কে’টে দিয়েছি।
— তাই বলে তুমি আ’ইন হাতে তুলে নিবে? তুমি ভাবতে পারছো কতবড় অ’পরাধ করেছ তুমি?
আসিফ উল্টো বিরক্তি নিয়ে বলল।
— আশ্চর্য! যা করেছি আপনার বোনের জন্যেই তো করেছি। এমন রিয়েক্ট কেন করছেন?
ইমরান তাজ্জব বনে বলল।
— তুমি লা’শটার যেমন নি’র্মম অবস্থা করেছ এতে বোঝা যাচ্ছে তুমি এই কাজে একটুও ঘাবড়াও নি। এমনকি এখনও তোমার চোখে কোনো অনুশোচনা আমি দেখছি না।
— হবেও না, লাগলে আরো করবো।
— তোমার মাথা ঠিক আছে তো?
— দেখুন, আপনার বোনের সাথে আর কয়দিন পর আমার বিয়ে। ভেতরে যা দেখেছেন সেটা নিজের মাঝে গোপন রেখে কে’সটা এখানেই ক্লোজ করুন। এতে আপনার বোনের জন্যই মঙ্গল।
ইমরান এবার তাকে বুঝিয়ে বলল।
— আমি আমার প্রফেশনের সাথে কখনও বেইমানি করতে পারবো না। তুমি যেভাবে নৃ’শংস ভাবে লোকটাকে খু’ন করেছ এটা কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব না। এই লা’শের বর্ণনা শুনলেই তো সবার ভেতর আতকে উঠছে আর সেখানে তুমি এতো স্বাভাবিক কি করে? দেখো ভালো হবে তুমি তোমার অ’পরাধ শিকার করে নেও। কথা দিচ্ছি তোমার শাস্তি আমি কমিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
প্রত্যুত্তরে আসিফ বক্র হেসে স্বীকারোক্তি দিয়ে বলল।
— আমাকে এতো বোকা পেয়েছেন? খু’নের শাস্তি যাবত জ্জীবন কারা’দ’ন্ড নাহয় ফাঁ’সি। অ’পরাধ স্বীকার করে আমি জে’লে পচে ম’রি আর আপনি আপনার বোনের বিয়ে অন্য কোথাও দিয়ে দিন? এমনটাই তো করবেন নাকি? কিন্তু আমি সেটা হতে দেব না। আমি যেখানে ইশাতকে পাওয়ার জন্যে নিজের দাদীকেও পর্যন্ত মে’রেছি সেখানে তুইতো চুনোপুটি।
কথায় কথায় আসিফ সেদিনের তার দাদির মৃ’ত্যুর কারণটাও উগরে দিলো। সব জেনে ইমরান মনে মনে আফসোস করলো সে তার বোনের জন্য কাকে পছন্দ করেছিল। এখন সত্য তার চোখে সামনে স্পষ্ট হওয়ার পর সে তার করা ভুল সংশোধন করে বলল।
— আমি তোমার মত অপ’রাধীর সাথে আমার বোনের বিয়ে কখনোই হতে দেব না।
আসিফ ঠান্ডা নির্দয় গলায় বলল।
— তাহলে তো তোকেও পথ থেকে সরাতে হয় দেখছি।
কথাটা বলে আর এক মুহূর্ত সে অপেক্ষা করলো না। পকেট থেকে একটা গা’ন বের করে ইমরানের দিকে পরপর কয়েকবার শুট করলো আসিফ।
———————–
ফেলিক্সের মা’র্ডার কে’সটার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কয়দিন যাবত নি’খোঁজ ইমরান। তার নি’খোঁজের খবর পেয়ে পরিবারের সকলে ভেঙে পড়েছে। আসিয়া বেগম দিনরাত নামাজে কেঁদে আহাজারি করছে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায়। চারিদিকে গুজব রটেছে সেই খু’নের অ’পরাধীই নাকি ইমরানকে গুম করে মে’রে ফেলেছে। ইশাত সংবাদটা শুনে শক্ত হয়ে গেছে। তার প্রত্যেকটা প্রয়োজনে যে ভাই তার জীবনে ঢাল হয়ে পাশে থেকেছে, আজ কয়টা দিন যাবত সেই ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই।
ইশাত ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। তার মধ্যে আর আগের আত্মবিশ্বাসের ছিটে ফোঁটাটাও অবশিষ্ট নেই। তার ভাই ছিল তার শক্তি, জীবনে উৎসাহের অন্যতম নাম। ভাইয়ের অবর্তমানে সে সেই শক্তিটা হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আপনজননের কোনো ক্ষতি হলে হয়তো সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটাও ভেঙে পড়ে। ঠিক তেমনই ইশাতও আর আগেই ইশাত নেই। ইমরানের স্ত্রী সানজিদা স্বামীকে হারিয়ে কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে আছে। আহনাফ সারাদিন বাবাকে খুঁজে বেড়ায়। তাকে বুঝিয়ে রাখতে সবার বেশ কষ্ট হয়।
দুপুরে আসিয়া বেগম যখন নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে কাদছেন তখন তিনি বাহিরে দরজায় বেল বাজার আওয়াজ পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে ফিরেছে ভেবে তিনি ছুটে গেলেন দরজা খুলতে, কিন্তু তাকে হতাশ করে দরজার বাহিরে দাড়িয়ে আছে আসিফ। আসিয়া বেগম তাকে ভেতরে আসতে বললেন। আসিফ ভেতরে এসে বসতেই আসিয়া বেগম মুখে আঁচল চেপে ফুপিয়ে কেঁদে বললেন।
— এটা কি হচ্ছে আমাদের সাথে আসিফ? ইমরান হঠাৎ কোথায় চলে গেলো?
আসিফ আসিয়া বেগমকে সোফায় বসিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল।
— আন্টি কোনো চিন্তা করবেন না। আমি ইমরান ভাইয়াকে খুঁজে বের করতে যা যা করতে হয় সেইসব করব। ভাইয়া না ফেরা পর্যন্ত আপনাদের সংসারের দায়িত্ব আমি নিতে চাই। আপনার, ভাবির, আহনাফের আর ইশাতের দায়িত্ব এখন থেকে আমার।
আসিয়া বেগম আপত্তি করে বললেন।
— বাবা তুমি বলেছ তাই অনেক। শুধু দোয়া করো যেন ইমরান ফিরে আসে।
আসিফ ছ’লনা নিয়ে আসিয়া বেগমকে বলল।
— আন্টি আমি জানি এখন এই কথাটা বলা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু আমি উপায় না পেয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি। আপনি যদি কিছু না মনে করেন তাহলে আমি ইশাতকে আমাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গোপনে বিয়ে করতে চাচ্ছি।
আসিয়া বেগম অবাক হয়ে বললেন।
— গোপনে কেন?
— ভাইয়ার অবর্তমানে ইশাতের একজন অভিবাবকের অনেক প্রয়োজন। আর তাছাড়া যে ইমরান ভাইয়াকে গু’ম করেছে নিশ্চয়তা কি যে ইশাতকে একা পেলে কিছুই করবে না? আমি ওকে নিজের স্ত্রীর স্বীকৃতি দিয়ে ওর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছি। অলরেডি আপনি আপনার একজন সন্তানকে হারিয়েছেন। হারানোর কষ্টটা আপনি ভালো বুঝেন।
আসিয়া বেগম দ্বিধা নিয়ে বললেন।
— কিন্তু ইমরানের অবর্তমানে আমি কিভাবে ইশাতের বিয়ে দেই?
আসিফ তাকে ভুলভাল বুঝ দিয়ে বলল।
— আন্টি জান বাঁচানো ফরজ। বিয়েটা এখন আবশ্যক হয়ে গেছে ওর জন্য। ইশাতের পেছনে এমনিতেই অনেক খারাপ নজর লেগে আছে। আর বিয়েটা বারবার হয়েও থেমে আছে। ইমরান ভাইয়ারও তো মত ছিল বিয়েতে। তাই শুধু শুধু বিলম্ব করে কি লাভ? আপনার অনুমতি থাকলে আমি কাল ইশাতকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই। বিয়ের পর নাহয় আপনাদের সবাইকে সেখানে নিয়ে যাব। মোট কথা ইশাতকে বাঁচাতে চাইলে আপনার এখান থেকে ওকে সরানো প্রয়োজন। বিপদ ওর উপরেও ঘুরছে।
আসিয়া বেগম বুকে পাথর রেখে বললেন।
— ঠিকাছে কাল নিয়ে যেও ওকে।
পরদিন কথামতো সন্ধ্যার দিকে আসিফ ইশাতকে নিতে এলো। মাগরিবের নামাজের পর সানজিদা ইশাতকে তৈরি করে রেখেছিল। আসিফ দেখলো মেয়েটা কেমন পাথর হয়ে আছে, কোনো কথাই বলছে না। এসবে অবশ্য সে বিশেষ কোন পাত্তা দিলো না। আসিয়া বেগমের থেকে বিদায় নিয়ে ইশাতকে গাড়িতে বসিয়ে সে দ্রুত ট্রেন স্টেশনের দিকে রওনা দিল। অন্যদিকে এভিয়ানের কানে এতক্ষনে এই খবর পৌঁছে গেছে। সে এতদিন ইশাতের সাথে যোগাযোগ করে নি কারণ সে ইশাতকে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সময় দিতে চেয়েছিল। এমন খারাপ পরিস্থিতিতে তাকে দেখে ইশাত আরো ভড়কে যেত বলে সে নিজের মনকে দমিয়ে রেখেছিল এতদিন। ইশাতকে না দেখে প্রত্যেকটা রাত তার দূরস্বপ্নের মত কেটেছে। আর এইদিকে ইশাত কিনা তার অগচরে বিয়ে করে নিচ্ছে। এভিয়ান এটা বরদস্ত করতে পারলো না। বেঁচে থাকতে সে কিছুতেই ইশাতকে অন্য কারো হতে দেবে না। তাই সেও তাদের আটকাতে ট্রেনস্টেশনের দিকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। স্টিয়ারিং হইলে হাত রেখে সে ক্রোধ নিয়ে মনে মনে ভাবছে ইশাতকে সে আর সময় দিবে না, এমন স্পর্ধা দেখানোর জন্য এবার সোজা তুলে নিয়ে আসবে।
————–
আসিফ ইশাতকে নিয়ে ট্রেনে উঠে বসেছে অনেকক্ষণ হবে। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল আর হুইসেল বাজতেই ট্রেন ছাড়ার অনুমতি পেল। ট্রেন তখন চলতে শুরু করলো। আসিফ সেটা দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে হাফ ছাড়লো। কিন্তু হঠাৎ করেই চলতি ট্রেনটা থেমে গেলো। আসিফ আশ্চর্য হয়ে জানালা দিয়ে মাথা বের করতেই দেখলো। সামনেই এভিয়ান আর তার লোকেরা ট্রেন থামিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। আসিফ বুঝলো এভিয়ান খবর পেয়ে এখানে এসেছে। সে মাথা ভেতরে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ইশাতের দিকে তাকালো। যেকিনা মাথা সিটে এলিয়ে নিস্তেজ হয়ে চুপচাপ পুতুলের মতো বসে আছে। যেন তার ভেতর কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না।
আসিফ আর সময় অপচয় করলো না সে ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করে ইশাতের নাকের কাছে স্প্রে করলো। সঙ্গে সঙ্গে ইশাত জ্ঞান হারালো। সেই সুযোগে আসিফ তার হাত থেকে একটা বালা খুলে তাকে ট্রেন থেকে কোনোভাবে সরিয়ে ট্রেনে আগুন ধরিয়ে দিলো। এভিয়ান যখন সামনের কেবিনগুলোতে ইশাতকে খুঁজছিল ঠিক তখন পেছনের কেবিন থেকে আচমকা অনেকগুলো চিৎকারের আওয়াজ ভেসে এলো। সে ফিরে দেখলো ট্রেনে আ’গুন লেগেছে। দাউ দাউ করে সে আ’গুন জ্বলছে। চারিদিকে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে সামনের দৃশ্যপট ঘোলা হয়ে সব ডেকে আসছে। এমন দৃশ্য দেখে তার মাথা তখন নষ্ট হয়ে গেলো। সে ইশাতের কথা ভেবে তৎক্ষণাৎ সেদিকে ছুটলো।
আ’গুন অনেক দ্রুত পুরো ট্রেনে ছড়িয়ে পড়েছে। বেশকিছুক্ষণ যাবত সেই আ’গুন দাউ দাউ করে ভেতরে জ্বলছে। বাকি কেবিনগুলোতে যত যাত্রী ছিল সবাই নেমে গেছে। শুধু একটা কেবিনে আ’গুনের কারণে সবাই আটকা পরে আছে। ফায়ার সার্ভিস ততক্ষণে এসে আ’গুন থামানোর কাজে লেগে গেছে। এভিয়ান উন্মাদের মতো প্রত্যেকটা কেবিনে খুঁজেছে, কিন্তু এতগুলো কেবিনের মধ্যে একটাতেও সে ইশাতকে পায় নি। এখন বাকি রইলো একটা মাত্র কেবিন যেখান থেকে ফায়ার সার্ভিস এসে আ’গুনে দগ্ধ’দের উদ্ধার করছে।
এভিয়ান তার কাপা কাপা পা নিয়ে সেদিকে এগোতেই দেখলো আসিফ একটা লা’শের সামনে বসে আহাজারি করছে। লাশটা কোনো এক নারীর যে আ’গুনে দগ্ধ হয়ে পুরোপুরি বি’কৃত হয়ে আছে। এমনকি তার শরীরের আকৃতি পর্যন্ত বিগড়ে গেছে। এভিয়ান সেখানে থমকালো, এমন সময় আসিফ কান্নাবিজরিত কন্ঠে অভিনয় করে বলে উঠলো।
— আমি তো তোমার জন্য একটু পানি আনতে গিয়েছিলাম ইশাত। এর মধ্যেই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে?
এভিয়ানের মাথায় যেন পুরো আকাশটা ভেঙে পড়লো। সে ভারসাম্য হারিয়ে লা’শটার পাশে ধপ করে বসে পড়লো। কিন্তু ভালোমত পর্যবেক্ষণ করে দেখার পর লা’শটাকে তার একটুও ইশাত মনে হলো না। এমন সময় রিজভী আর জেরিন দৌড়ে এলো। এভিয়ানকে তারা টেনে তোলার চেষ্টা করলো। এভিয়ান তখন উ’ন্মাদের মতো করে বলতে লাগলো।
— এটা আমার হোয়াইট মুন না!! এটা অন্য কেউ। ওকে আমার চিনতে ভুল কখনোই হবে না। এটা ও না। ও কোথায়? ওকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে?
রিজভী আর জেরিন ভাবলো এভিয়ান অতি শোকে পাগলামি করছে। তারা আরও গার্ডদের সাথে নিয়ে এভিয়ানকে সেখান থেকে সরিয়ে আনলো। এভিয়ান শরীরের ভারসাম্য পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে। এতজন মানুষ মিলেও তাকে তুলতে পারছে না। একটা সময় সে পাগলামি করতে করতে চেতনা হারালো। এই সুযোগে জেরিন আর রিজভী তাকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে গেল। পেছন থেকে আসিফ এসব দেখে বাকা হাসলো।
————–
সামনে শুভ্র কাফনের কাপড়ে ডেকে রাখা ইশাতের লা’শ। আসিয়া বেগম থ হয়ে লা’শের সামনে বসে আছেন। লা’শ ধোয়ানোর সময় একমাত্র হাতের বালাটা দেখে বোঝা গিয়েছিল যে এটা ইশাত। তারা কেউ যেন মানতে পারছো না যে ইশাত আর নেই। আসিয়া বেগমের পাশে সানজিদা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ফুপিয়ে কাদঁছে। আহনাফ বারবার ফুপিকে দেখতে চাচ্ছে কিন্তু কেউ তাকে দেখতে দিচ্ছে না। কারণ এমন বি’কৃত লা’শ দেখে ও ভয় পেয়ে যাবে। যেখানে বড় মানুষরাই লা’শ দেখে আতকে উঠছে। আসিফের পরিবার এসে তাদের সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছে। আদিবা এসেও বান্ধবীর জন্য কাঁদছে।
আসিয়া বেগম নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে নিঃস্ব হয়ে বসে আছেন। তার চোখে বিন্দু পরিমাণ অশ্রু নেই আছে শুধু নীরব য’ন্ত্রণা। অল্প বয়সে তিনি স্বামী হারিয়েছেন, জীবনের সখ আহ্লাদ সব ভুলে তিনি দুইটা সন্তান নিয়ে একা যুদ্ধ করে বড় করেছেন তাদের। যখন তারা বড় হওয়ার পর তিনি সুখের মুখ সবে মাত্র দেখতে শুরু করলেন এমন সময় ছেলেটাকে গু’ম করা হলো। ছেলেটা বেঁচে আছে নাকি নেই, কোনো কিছুই তার জানা নেই। তারউপর এখন মেয়েটার মৃ’ত্যুর সংবাদ। সব মিলিয়ে তিনি শক্ত পাথরের রূপ ধারণ করেছেন। তার হারানোর এখন আর কিছুই বাকি রইলো না। এভাবে তিনিও মনেহয় আর বেশিদিন বাঁচতে পারবেন না। শুধু ছেলেটার শেষ খবর পাওয়ার জন্য যেন আল্লাহ তাকে টিকিয়ে রেখেছে। এভাবে মুহূর্তেই যে তাদের জীবনের চিত্র এমন পাল্টে যাবে কারো কল্পনায়ও ছিল না।
কালবিলম্ব না করে দ্রুত ইশাতকে দা’ফনের ব্যবস্থা করা হলো। এই লা’শ কেউ আর বেশিক্ষণ রাখতে চাইলো না। লাশের খাটিয়া টেনে আসিফ জানাজায় শরিক হলো।অন্যদিকে এভিয়ান জ্ঞান ফিরে পেতেই ছুটে আসতে আসতে দেখলো ইশাতের দা’ফন কাজ শেষ করা হয়েছে। সে তার কবরের সামনে দাড়িয়ে কঠিন গলায় বিড়বিড় করে বলল।
— এটা সত্য না!! সত্য হতেই পারে না!! আমার ইশাতের কিছুই হয় নি। আমাকে ওই জা’নোয়ারটা বোকা ভেবেছে? এসবই আসিফের সাজানো নাটক। সবাই মানলেও আমি মানি না। আমার ভালোবাসা বাকিদের মতো এতো ঠুনকো না। আমি আমার হোয়াইট মুনকে খুঁজে বের করবোই।
এভিয়ান তখন ফোন করে চারিদিকে ইশাতকে খুঁজতে মানুষ লাগিয়ে দিল। নির্জীব শরীরে দিনভর ছোটাছুটি করেও সে ইশাতের কোনো খোঁজ পেল না। রাতে বি’ধ্বস্ত অবস্থায় সে বাড়িতে ফিরে এলো। নিজের রুমে গিয়ে সে অ্যাল’কোহলের বোতলটা হাতে নিলো। কিন্তু ইশাতের বারন মনে করে আজ আর সেটা মুখে দিতে ইচ্ছে হলো না। সবকিছু হাতে ঠেলে সরিয়ে নিস্তব্ধ রুমে এভিয়ান উ’ন্মাদের মতো আ’র্তনাদ করতে লাগলো। তার করা প্রত্যেকটা আর্ত’নাদ বদ্ধ ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ঝংকার তুলে পুনরায় ফিরে এলো, মনের দুর্বিষহ যন্ত্র’ণাগুলো মস্তিষ্ককে হানা দিতেই একাধারে আহাজারি করে আওড়ে গেলো একই সুর।
“বলো কিভাবে রবো এভাবে, আমায় গুছাবে কে দু হাতে? ফিরে আসো না আর তো পারি না,
বাচি চলো না, আবার একসাথে।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )………………
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ৩৬
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
সারা রাত চোখের পাতা এক হয়নি এভিয়ানের। মাঝ রাতে তার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল যার উত্তর তার কাছে নেই, এমন সময় এলাকার কোনো এক মসজিদের মাইক থেকে আজানের সুমধুর সুর ধ্বনিত হলো চারিপাশে। মনের অশান্তির মাঝে আজানের ধ্বনি এভিয়ানের কাছে কোনো এক সংকেতের মতো ঠেকলো। তার মনে হতে লাগলো আজানের সুমিষ্ট সুরের লহরী যেন তাকে ভেতর থেকে টানছে। ব্যাস! সে উঠে দাড়ালো। পা বাড়ালো মসজিদের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে সে দেখলো সারিসারি মুসল্লিরা নামাজের জন্য জড় হয়ে ভেতরে ঢুকছে।
সকলে এক এক করে উপস্থিত হতেই ইমামের পেছনে কাতার ধরে দাঁড়িয়ে সকলে একত্রে নামাজ শুরু করলো। তার চোখে ভাসলো ইশাতও এভাবে নামাজ পড়তো। এভিয়ান বাহিরে দাড়িয়ে থেকে শান্ত দৃষ্টিতে সবার নামাজ দেখলো। নামাজ শেষে একেক করে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছে। এভিয়ান তখনও একই জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে। মসজিদের ইমাম অনেক্ষন যাবত তাকে লক্ষ্য করেছে। তিনি নিজেই তখন বেরিয়ে এসে এভিয়ানকে প্রশ্ন করে বলল।
— তুমি কে বাবা? এর আগে তো তোমাকে দেখি নি কখনো মসজিদে? নামাজের সময় এতক্ষন বাহিরে দাড়িয়ে ছিলে, অথচ নামাজ কেন পড়লে না?
এভিয়ান সরাসরি জবাব দিলো।
— আমি না’স্তিক।
ইমাম মুচকি হেসে বললেন।
— তাহলে আল্লাহর ঘরের সামনে কেন এসেছ? তুমি কি কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজছো?
এভিয়ান ভাঙ্গাচোরা গলায় বলল।
— অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু চাইতে এসেছি, আমার হোয়াইট মুন আল্লাহকে বিশ্বাস করে। তাই ওর আল্লাহর কাছে ওকে চাইতে এসেছি। ওকে চাইতে হলে আমার কি করতে হবে?
ইমাম শান্ত গলায় বলল।
— তুমি যার কথা বলছো সে আল্লাহর উপর বিশ্বাস করে, কিন্তু তুমি করো না তাই তো? আল্লাহর কাছে চাওয়ার আগে তোমাকে আল্লাহর উপর বিশ্বাস আনতে হবে। আমাদের প্রিয় নবী বলেছেন মনে বিশ্বাস নিয়ে দোয়া করতে। কেননা উদাসীন মনের দোয়া আল্লাহ পছন্দ করেন না এবং তা কবুল করেন না। তুমি যদি আল্লাহর উপর বিশ্বাসই না আনো তাহলে দোয়া কি করে করবে?
— নবী আবার কে?
— নবী হলেন আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত এমন একজন পবিত্র ব্যক্তি, যিনি মানুষের হেদায়েতের জন্য ওহী লাভ করেছেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের হেদায়েতের উসিলা। পরকালে তিনি আমাদের জন্য সাফায়েত করবেন।
— পরকাল কি?
— পরকাল হলো মৃত্যুর পরের জীবন, যেখানে মানুষের ইহকালের কর্মের হিসাব নেওয়া হবে এবং তার ভিত্তিতে চিরস্থায়ী পুরস্কার হিসেবে জান্নাত বা শাস্তি হিসেবে জাহান্নাম নির্ধারণ করা হবে।
এভিয়ান কি যেন একটা ভেবে মনে সংকোচ নিয়ে প্রশ্ন করে ফেলল।
— আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি আমাকে কি হেদায়েতের জন্য কবুল করা হবে?
ইমাম মুখে হাসি নিয়ে বললেন।
— আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
আল্লাহ তা’আলা বলেন,
হে আদম সন্তান!
তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে ডাকবে ও আমার নিকট ক্ষমার আশা পোষণ করবে, তোমার অবস্থা যা-ই হোক না কেন, আমি কারো পরোয়া করি না, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো।
হে আদম সন্তান!
তোমার গুনাহ যদি আকাশ পর্যন্তও পৌঁছে, আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিবো, আমি কারো পরোয়া করি না।
হে আদম সন্তান!
তুমি যদি পৃথিবী সমান গুনাহ নিয়েও আমার সাথে সাক্ষাৎ করো এবং আমার সাথে কাউকে শরীক না করে সাক্ষাৎ করো, আমি পৃথিবীসম ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে উপস্থিত হবো।
রেফারেন্স : সহীহ তিরমিযী ৩৫৪০, সহীহাহ্ ১২৭, সহীহ আত্ তারগীব ৩৩৮২, সহীহ আল জামি‘ ৪৩৩৮।
কথাগুলো এভিয়ানের বুকে গিয়ে বিধলো। যেন প্রত্যেকটা কথা তার উদ্দেশ্যেই ছিল। তার পরিস্থিতির সাথে কথাগুলো মিলে গেল। সে চোখে বিস্ময় নিয়ে বলল।
— আপনাদের আল্লাহ এতো দয়ালু? তিনি সত্যিই কি সবাইকে ক্ষমা করেন?
— তুমি খাস দিলে করেই দেখো না?
— তিনি আমার হোয়াইট মুনকে আমার কাছে এনে দিবে?
ইমাম তাকে মসজিদের ভেতরে স্বাগতম জানিয়ে হাত মেলে দিয়ে বলল।
— তুমি ভেতরে এসে মনে বিশ্বাস রেখে দোয়া করতে পারো।বান্দার নিঃশব্দে অশ্রুসিক্ত দোয়াগুলো আল্লাহর কাছে এতোটাই প্রিয় আর শক্তিশালী হয় এবং তিনি তা এমন ভাবে ফিরিয়ে দেন যা তুমি কল্পনাও করতে পারবেন না। কেননা আল্লাহ বলেন “আমি তোমার হৃদয়ের সেই গোপন থেকে গোপন কথাগুলোও জানি যা তুমি নিজেই নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছ।”
এভিয়ান কথামতো জুতো খুলে প্রথমবারের মতো মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলো। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে অলৌকিকভাবে কেমন যেন তার অশান্ত মন শান্ত হতে শুরু করলো। অস্থির মস্তিষ্ক শিথিল হতে শুরু করলো। সে হাত তুলে ইশাতের মতো করে চাইতে শুরু করলো।
— জীবনে কখনো তোমার কাছে এসে কিছু চাই নি। অবিশ্বাস করেছি তোমাকে। আমি জানি না তুমি সত্য নাকি মিথ্যা। কি ভেবে আমি তোমার কাছে এসে হাত পাতলাম। কিন্তু এই অসহায় মুহূর্তে এসে কেন আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার সবচেয়ে কাছের। তুমিও আমাকে সাহায্য করতে পারো।আমাকে শুনতে পাচ্ছ? এটা কেমন অনুভূতি? তুমি যদি সত্যি হও তাহলে আমাকে একটা ইশারা দাও। আমি সত্য জানতে চাই। কথা দিচ্ছি তুমি সত্য হলে আমি তোমার দেখানো পথেই হাটবো। নিজেকে বদলে ফেলব। ইসলাম গ্রহন করবো।
এভিয়ানকে তখন চমকে দিয়ে হঠাৎ পরিষ্কার আকাশ গর্জে মুষলধারে বৃষ্টি হতে শুরু করলো। যেন এটা ছিল আল্লাহরই পক্ষ থেকে এভিয়ানের প্রশ্নের উত্তর। ইশারা পেয়ে এভিয়ান কয়েক মুহুর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। সে ঘুরে ইমামকে জিজ্ঞাসা করলো।
— এর অর্থ কী?
ইমাম মুখে কোমলতা নিয়ে বললেন।
— বৃষ্টি মানে রহমত, হয়তো আল্লাহ তোমার উপর রহমত বর্ষণ করছেন।
এভিয়ানের মনের দাম্ভিকতা আর অহংকার তখন ভেঙে চুরমার হলো। সকল কঠিনত্ব ভেঙে তার হৃদয় নরম হলো। চোখে দেখা এই আশ্চর্যজনক ঘটনা চিরসত্য মনে হলো। সে তখন তার পূর্বের কৃতকর্মের অনুশোচনা নিয়ে হাত তুলে বলল।
— তুমি আমার অহংকার ভেঙে দিয়েছ আল্লাহ। এতদিন আমি ক্ষমতার লোভে অন্ধ ছিলাম। আমি এতটাই অ’ন্যায় অ’বিচার করেছি, অন্যের প্রতি জু’লুম করেছি যে সেটা উপলব্ধি করার পর নিজের চোখে নিজেই নেমে গেছি। আমাকে তুমি ক্ষমা করো, আমি তোমার পথে চলতে চাই। আমাকে কবুল করো।
এভিয়ান ইমামের দিকে দৃষ্টি রেখে বলল।
— আমি মুসলিম হতে চাই। ইসলাম গ্রহন করতে চাই। আমার চোখে এখন সব স্বচ্ছ যে ইশাতের আল্লাহই সত্য।
ইমাম খুশি হয়ে তাকে কালেমা পড়ানোর জন্য নিজের সাথে বলতে বললেন।
— আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু।
অর্থ: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।
এভিয়ান ইমামের সাথে সাথে কালেমা উচ্চারণ করলো। কালেমা পড়ানো শেষে ইমাম তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন।
— তুমি আল্লাহর কালেমা পড়ে আল্লাহর উপর বিশ্বাস এনেছ। এখন থেকে তুমি মুসলিম। ইসলামের যাবতীয় সব আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব।
হাসির তরে এভিয়ানের চোখের চারপাশের পেশি প্রসারিত হলো। সে উজ্জ্বল দৃষ্টি নিয়ে বলল।
— এখন থেকে ইশাতের আল্লাহ আমরো আল্লাহ। এখন কি আমাকে আমার নাম পরিবর্তন করতে হবে?
— সেটা তোমার ইচ্ছে।
— আমি অতীতের সবকিছু ভুলে নতুন করে শুরু করতে চাই।আমার নাম আপনি বদলে দিন।
ইমাম একটু ভেবে বললেন।
— ঠিকাছে যেহেতু তুমি নতুন করে সব শুরু করতে চাইছ তাই তোমার নাম আমি দিব “আরিয়ান জারিয়াত”। আরিয়ান অর্থ হচ্ছে উন্নত চরিত্র। আর জারিয়াত অর্থ বয়ে যাওয়া অথবা চলমান। কোরআনে ব্যবহারিত সূরা জারিয়াত ৫১ নং সূরা। এখানে “ওয়াজ-জারিয়াতি যারওয়া” বলতে বোঝানো হয়েছে
“সেই বায়ুগুলোর শপথ, যারা ধুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়” এখানে বোঝানো হয়েছে যা থেমে থাকে না, সবসময় গতিতে থাকে।
নাম সুন্দর এবং অর্থবহ হওয়া উচিত কারণ নাম মানুষের ব্যক্তিতে প্রভাব ফেলে। তুমি আল্লাহর কাছে হেদায়েত উপহার পেয়েছ এটা অনেক মর্যাদার বিষয়। অনেক কম মানুষের এই সৌভাগ্য হয় এভাবে হেদায়েত পাওয়ার। তুমি সেই সৌভাগ্যবান, তাই তোমার নাম আজ থেকে “আরিয়ান জারিয়াত”।
—————
বন্ধ চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে জানালাবিহীন অন্ধকার একটি কক্ষে আবিষ্কার করলো ইশাত। মাথাটা তার কেমন যেন ভারভার লাগছে। চারিপাশে সে তাকিয়ে দেখলো রুমটা কেমন অদ্ভুত। রুমের মধ্যে শুধু মাত্র একটা বিছানা রয়েছে যেখানে আপাতত সে শুয়ে আছে। পড়নে তার আরামদায়ক পোশাক। মাথায় নেই কোনো হিজাব। নিজের দিকে লক্ষ্য হতেই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। একা একা একাধারে বলতে লাগলো।
— আমি এখানে কিভাবে এলাম? আমাকে কে এনেছে? আমার জামা কাপড় কোথায়? হিজাব কোথায়? কে বদলেছে?
তার চেঁচামেচির আওয়াজে পাশের রুম থেকে একটা বয়স্ক মহিলা দৌড়ে এসে বললেন।
— তুমি উঠে গেছ? আসিফের কথায় তিনদিন আগে তোমাকে ট্রেন স্টেশন থেকে অজ্ঞান অবস্থায় এখানে নিয়ে এসেছি আমি। আসিফ তোমাকে এই বাড়িতে রাখতে বলে আমাকেও তোমার সাথে থেকে তোমার দেখাশোনা করতে বলে। কিন্তু সে নিজে এখনও পর্যন্ত আসে নি, শুধু ফোনে তোমার খোঁজ নিয়েছে। আমিই তোমাকে এখানে এনে তোমার জামা কাপড় বদলে দিয়েছি।
ইশাত অন্য কোনো প্রশ্ন না করে আগে বলল।
— আমার হিজাব কোথায়? হিজাবটা দিন।
মহিলাটা ইশাতের হিজাব এনে দিল। হিজাব মাথায় দেওয়ার পর ইশাতের দ্বিতীয় প্রশ্নটা ছিল।
— এখন কোন নামাজের ওয়াক্ত চলছে? আমাকে নামাজ পড়তে হবে।
মহিলাটা এমন প্রশ্নে হতভাগ হলো। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল।
— আসরের ওয়াক্ত চলছে।
ইশাত অনুনয় করে বলল।
— দয়া করে আমাকে ওযু করার ব্যবস্থা করে দিন।
মহিলাটা ইশাতকে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিল। ইশাত দ্রুত উঠে ওযু করে নামাজ পড়ে নিল। নামাজ শেষে সে স্থির হয়ে প্রশ্ন করলো।
— আমাকে এখানে কখন আনা হলো? আমি তো ট্রেনে ছিলাম। আমার কিছু মনে নেই কেন?
মহিলাটা পাল্টা উত্তরে বলল
— আমি কোনো কিছুর উত্তর দিতে পারব না। আসিফ এলে ওকে জিজ্ঞাসা করো। এখন কিছু খেয়ে নাও।
— না আমি খাবো না। আপনি উনাকে আসতে বলুন। আমার প্রশ্নের উত্তর চাই।
মহিলাটা ফোন হাতে নিয়ে আসিফকে কল করলো। ফোনে আসিফ ইশাতের চেতনা ফেরার খবর পেতেই খুশি হয়ে জানালো সে এখনই আসছে। ইশাত অপেক্ষা করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে আসিফ চলে এলো। ইশাত তাকে দেখা মাত্র প্রশ্ন করলো।
— আমি এখানে কিভাবে এলাম? আমার কেন কিছু মনে নেই?
আসিফ তাকে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে বলল।
— আমরা যে ট্রেনে ছিলাম সেই ট্রেনে আ’গুন লেগে যায়। ভয় পেয়ে তুমি জ্ঞান হারাও। তখন তোমাকে এখানে নিয়ে আসি।
ইশাত সন্ত্রস্ত হয়ে বলল।
— কি বলছেন? আম্মু নিশ্চই শুনেছে খবরটা? সে নিশ্চই চিন্তা করছে আমার জন্য? এমনিতেই ভাইয়ার দুঃসংবাদ তার উপর আমার চিন্তা, আল্লাহ না করুক আম্মুর চিন্তায় যদি কিছু হয় যায়? না না আমি আম্মুর সাথে কথা বলবো, আম্মুকে ফোন দিন।
আসিফ তখন পুরো ঘটনাকে মিথ্যে বানিয়ে বলল।
— ইশাত তুমি পুরো ঘটনাটা ভুলে গেছ। সেদিন পরে আমাদের প্লেন চেঞ্জ হয়। তোমার পরিবারেরও আমাদের সাথে যাওয়ার কথা ছিল। তারাও আমাদের সাথে ট্রেনে উঠেছিল। আমরা দুজন যখন পানি আর কিছু খাবার আনতে ট্রেন থেকে নামি সেই সময় এভিয়ান সেখানে উপস্থিত হয় তোমাকে নিয়ে যেতে। ট্রেনের ভেতর সে আমাদের খুঁজে না পেয়ে রাগে ট্রেনে আ’গুন লাগিয়ে দেয়। তোমার আম্মু, ভাবি আর আহনাফ সেই আগুনে দ’গ্ধ হয়ে মা’রা যায়। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু পারি নি তাদের শেষ রক্ষা করতে। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তুমি জ্ঞান হারাও। তিনদিন যাবত তুমি অচেতন ছিলে।
ইশাত বড়সড় একটা ঝটকা খায়। কাপা কাপা কন্ঠে সে বলে।
— এসব আপনি কি বলছেন? বলুন এসব সত্য না।
— সবই সত্য ইশাত। আমি তোমাকে এখানে কোনো ভাবে পাঠিয়ে দিয়ে তাদের দাফন কাফন করে এসেছি।
কথাটা শোনা মাত্র ইশাত ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো। সে অঝোরে কাদতে কাদতে বলল।
— আমাকে নিয়ে যান তাদের কাছে। আমি কেন শেষবারের মতো তাদের দেখতে পারলাম না? কেন অজ্ঞান ছিলাম?
আসিফ তাকে ঠেকাতে বলল।
— তুমি এখন তাদের ক’বর দেখতে যেতে পারবে না। তোমার আম্মুর শেষ ইচ্ছা ছিল যেন আমি তোমাকে বিয়ে করে দূরে কোথাও নিয়ে যাই। এভিয়ান তোমাকে বাহিরে পাগলের মতো খুঁজছে। তোমার ভাইয়ের গু’মের পেছনেও তারই হাত রয়েছে। ওর ক্ষ’মতা অনেক, আমরা পারবো না ওর সাথে।
আসিফের কথায় ইশাতের মনে এভিয়ানের প্রতি ঘৃ’ণা জন্মালো। সে ক্রোধে ফেটে পড়ে বলল।
— আমি ওই জা’নোয়ারটাকে ছাড়ব না। ওর জন্য আমি আমার পরিবার হারিয়েছি নিজের প্রিয় মানুষগুলোকে হারিয়েছি। ওকে এর ফল ভোগ করতেই হবে। আমি আমার পরিবারের খু’নিকে ছাড়ব না। আমি তাকে ঘৃ’ণা করি। ভয়ানক রকমের ঘৃ’ণা।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………….

