#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_৬ [ গল্পে’র নীচে দেয়া নোট অবশ্যই পড়বেন]
#Tahmina_Akhter
–বয়স তো কম হলো না এবার বিয়ে করে ফেল।আমি আর কতদিন বেচে থাকব?? আমি মরে গেলে তোকে কে দেখবে?? কেউ নেই তোকে দেখবার জন্য।
কথাটি বলতে বলতে খেয়ার ফুপি কেঁদে ফেললেন। খেয়া মার্কেট থেকে আনা হাতে রাখা শাড়িটা সোফার এককোনে রেখে তাকিয়ে আছে ওর ফুপির দিকে। এই কান্না আজ নতুন নয়। গত পাঁচবছর ধরেই চলছে। কিন্তু, এবারের কান্না ভিন্ন। মনে হচ্ছে সত্যি ওর ফুপি কোথাও চলে যাবে। যেখানে গেলে কেউ ফিরে আসে না। ওর মা যেদিন মারা যায় ঠিক তার আগেরদিন রাতেও বলেছিল,,
— আমি যদি মরে যাই তোর খেয়াল কে রাখবে?? তোর বাবা তো বিয়ে করে অন্য নারীতে আসক্ত হয়ে আমাদের মা – মেয়েকে ভুলে গেলো।
কথাগুলো বলার ঠিক পরদিন দুপুরে আকস্মিকভাবে মাথার অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে কাতরাতে থাকে। হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলো কিন্তু মা বাঁচলো না। ডক্টর আন্দাজ করে বলেছিলেন মায়ের হয়তো ব্রেইন টিউমার ছিল। মায়ের মৃত্যুর পর আমার বিধবা এবং নিঃসন্তান ফুপি ঝিনাইদহ থেকে ঢাকায় এলেন। আমার মাথার ওপর হাত রাখলেন। যে হাত কেবল পরম মমতায় বুকে আশ্রয় দিতে পারে,, নিঃসঙ্গ বিকেলে এসে সুখের সঙ্গী হয়। সেই ফুপি যদি মৃত্যুর কথা বলে তখন কেমন অনুভূত হয় মনে? আমি ভাবিনি কখনো যে,, সবাই আমাকে ছেড়ে গেলেও ফুপি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।
খেয়া একটুখানি সরে এসে ওর ফুপির শরীর ঘেসে বসলো,, কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে রইলো। রুমানা কিছুসময় পর নিজের কাঁধে ভেজা ভাব টের পেলেন। খেয়া কাঁদছে। রুমানা একহাতে খেয়াকে শক্ত করে চেপে ধরে আস্বস্ত করতে বললেন,,
— মারে কাঁদিস না। একদিন সবাই চলে যাবে। তোর মা চলে গেছে,, যাকে আঁকড়ে ধরে নতুন করে বাঁচতে চেয়েছিলি সেও চলে গেছে। আমিও চলে যাব। কেউ এই পৃথিবীতে চিরদিন থাকতে আসেনি। দুইদিনের মেহমান আমরা। বেড়ানো শেষ হলে চলে যাব আমরা যেখানেই হবে আমাদের চিরস্থায়ী বসবাস।
— ফুপি???
খেয়া ওর ফুপিকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। প্রিয় মানুষদের প্রস্থান খেয়ার হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে তাই তো নতুন করে সেই ক্ষতকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করতে চাইছে না।
খেয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে রুমানা। রাত তখন প্রায় এগারোটা। রুমানা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেছেন। সময় যে কোনদিকে গড়িয়ে গেছে টের পাননি। খেয়া মার্কেট থেকে এসেই কাপড়চোপড় না ছেড়ে ওর ফুপিকে শাড়ি দেখাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরে। তারপর,, কথার ফাঁকে নানান কথার আলাপ হলো। বেচারি কাঁদতে কাঁদতে ওর ফুপির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।
রুমানা খেয়াকে ডাক দিলেন পরপর দুবার। খেয়া ঘুমরত কন্ঠে হু বলতেই রুমানা ওকে খাওয়ার জন্য ডাক দিলো। খেয়া বারণ করে দেয়। কারণ,, ওর খেতে ইচ্ছে করছে না। রুমানা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। খেয়ার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছেন। অপেক্ষা করছেন তিনি কখন খেয়ার ঘুম ভাঙবে আর কখন খেয়াকে খাইয়ে দিবেন।
ভোর সাড়ে পাঁচটা। মসজিদ থেকে নামাজ আদায় করে বাসায় ফিরলো ফায়েজ৷ টুপি খুলে ডেসিং টেবিলের ওপরে রেখে পাঞ্জাবি খুলে টিশার্ট পরে নিলো। আজ কেন যেন এই সময়ে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না। আচ্ছা,, বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কেমন হয়?? ফায়েজ মোবাইল হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।
ব্যস্ততম নগরী ঢাকা কখনো কোলাহলমুক্ত থাকে না। হোক সেটা রাত কিংবা দিন। মানুষের আনাগোনা আছে শহরের অলিগলিতে। বারান্দা থেকেই রাস্তা দেখা যায়। যার কারণে সবটাই দেখছে ফায়েজ। ভালো লাগছে দেখতে। ফায়েজ আনমনা হয়ে গুনগুনিয়ে গান ধরলো,,
Teri Nazar Ne Yeh Kya Kar Diya,
Mujhse Hi Mujhko Juda Kar Diya,
Main Rehta Hoon Tere Pas Kahin,
Ab Mujhko Mera Ehsas Nahi, Dil Kehta Hai Bas Mujhe,
Ke Thoda Thoda Pyar Hua Tumse,
Ke Thoda Ikrar Hua Tumse,
Ke Thoda Thoda Pyar Hua Tumse,
Ke Zyada Bhi Hoga Tumhi Se,
Ke Thoda Ikrar Hua Tumse,
Meri Ankhon Ki Dua Hai, Yeh Chehra Tera,
Ab Dekhe Bin Tujhe, Na Guzara Ho Mera,
Main Sans Bhi Loon, Tujhe Chahe Bina,
Ab Hoga Na Yeh Humse,
Ke Thoda Thoda Pyar Hua Tumse,
Ke Thoda Ikrar Hua Tumse,
Ke Thoda Thoda Pyar Hua Tumse,
Ke Zyad
a Bhi Hoga Tumhi Se,
Ke Thoda Thoda Pyar Hua Tumse,
— বাহ্, চমৎকার গেয়েছেন। আপনি গানের গলা ভালো কখনো বলেননি যে??
ফাঁকা বারান্দায় নারী কন্ঠ শুনে ফায়েজ অবাক হয়ে এদিক সেদিক তাকায়। নারীকন্ঠের মালিককে খুঁজে বেড়ায়৷ হুট করে মনে হলো ওপর তলার ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে কেউ কথা বলছে না তো আবার??ফায়েজ উঁকি দিয়ে উপরে তাকিয়ে দেখলো,, খেয়া ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ফায়েজ মাথা নীচু করে মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠলো,,
— বাহ্ মেঘ না চাইতে জল!! আজকের সকাল অন্যরকম হবে দেখেই বুঝি ঘুম নামছিল না চোখে।
ফায়েজ আবারও ওপরের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়,,
— এতটা ভালো না যতটা ভালো বলছো। তা এত সকালে কি করছো বারান্দায়??
— আপনি যে কারণে বারান্দায় এসেছেন। আমিও ঠিক সে কারণেই এসেছি।
ফায়েজ খেয়ার মুখ দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পারলো না। মনটা কেমন বিষাদে ভরে আসে!! খেয়ার মুখটা দেখতে না পারলে আজ সারাটাদিন খারাপ যাবে। আচ্ছা,, খেয়াকে যদি অনুরোধ করে নীচে আসার জন্য খেয়া কি আসবে?? না ; খেয়া কেন আসবে?? আচ্ছা,, একবার জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়??
— হাঁটতে যাবে খেয়া?? বেশি দূরে না ওই যে সামনে যে পার্কটা আছে সেখানেই একটা চায়ের টংয়ের দোকান আছে। তুমি তো আবার চা পছন্দ করো। তোমার মনের মতো চা বানায় সেখানে। যাবে??.
সকাল সকাল ফায়েজের কাছ থেকে এমন উদ্ভট আবদার শুনে খেয়া বিস্মিত হলো। লোকটা কেমন যেন!
— আপনাকে আমার সঙ্গে দেখলে পুরো বিল্ডিংয়ের মানুষ অন্য কথা রটাতে পারে। সামান্য এক কাপ চায়ের জন্য তো আর নিজের ইমেজ খারাপ করতে পারব না।
ফায়েজ আর কিছুই বললো না। মন খারাপ করে বারান্দা থেকে রুমে চলে এলো। বিছানায় শুয়ে চোখ বুজে রইলো। আজ অফিসে যাবে না বলে মন স্থীর করলো ফায়েজ।
দুপুর পেরিয়ে বিকাল হলো ফায়েজ সেই আগের মতো পরে রইলো। না সকালের খাবার খেলো আর না দুপুরের। কাজের বুয়া বেশ কয়েকবার ফায়েজকে খাবার খাওয়ার জন্য ডেকেছে। কিন্তু,, ফায়েজ পাত্তা না দিয়ে শুয়ে আছে।
ফায়েজের কেন যেন এই একাকীত্বের জীবন ভালো লাগে না। ফায়েজের পুরো পরিবার একটি গাড়ি দূর্ঘটনায় গত হয়েছে পাঁচ বছর হলো। সেই থেকে ফায়েজ সম্পূর্ণ একা। ফায়েজ পরে মরে থাকলেও জিজ্ঞাসা করার মতো লোক নেই। মাঝে মাঝে ভালোবাসা,, আপন মানুষের জন্য হৃদয় হাহাকার করে।
ফায়েজ উঠে বসলো। তখন আনুমানিক বিকেল চারটা বাজে। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে গোসল সেড়ে রুমে এসে কালো টিশার্ট এবং ব্লু জিন্স পরে ফ্ল্যাট তালা লাগিয়ে বের হয়ে এলো। একটা হোটেল গিয়ে কিছু খেতে হবে৷ খুদার কারণে শরীর কাঁপছে কখন জানি মাথা ঘুরে পরে যায়!
ফায়েজ বাইক নিয়ে চলে গেলো। হোটেলে গিয়ে গরু মাংস দিয়ে ভাত খেলো। তারপর,, এক কাপ রঙ চা খেয়ে রওনা হলো অজানা গন্তব্যে। ফায়েজ তখন নয়া পল্টনের কাছাকাছি। সেই সময় ওর মোবাইলে কল আসে৷ রাস্তার একপাশে বাইক থামিয়ে ফায়েজ পকেট থেকে মোবাইল বের করলো,, সুমন কল করেছে। ফায়েজ কল রিসিভ করলো।
— হ্যালো,, ফায়েজ ভাই??
— হ্যা বলো সুমন??.
— বাস দুটো ওকে ভাই। কাল ভোরে চলে আসবে। প্লাস খাবার-দাবারের ব্যাপারটা নীল হ্যান্ডেল করেছে। ইনশাল্লাহ আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন এবার।
ফায়েজ বিস্ময় নিয়ে “আচ্ছা ঠিক আছে” বাক্যটি বলে কল কেটে দিলো৷ কারণ,, ওর ট্যুরের ব্যাপারে কিছুই মনে ছিল না যদি না সুমন কল দিয়ে কথাটি না বলতো।
মোবাইল পকেটে রেখে বাইক নিয়ে রওনা হচ্ছিল এমন সময় দূর থেকে কেউ ডাকছে এমন মনে হলো ফায়েজের…
সামনে তাকিয়ে দেখলো খেয়া ডাকছে ওকে৷ ফায়েজ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। পরক্ষণেই সকালের ব্যাপারটা মনে পরতেই ফায়েজের রাগ হলো নিজের ওপর। খেয়া ওকে ইগনোর করছে তাহলে কেন সে বারবার বেহায়ার মতো খেয়ার কাছে যায়? কেন? ফায়েজ খেয়াকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিল কিন্তু খেয়া খুব দ্রুত এসে ফায়েজের বাইকের সামনে এসে দাঁড়ালো। বেচারী হাঁপিয়ে ওঠেছে। কপালে বিন্দু ঘাম জমেছে। সেই ঘাম জড়ানো কপালে লেপ্টে আছে ছোট চুলগুলো। ফায়েজের ইচ্ছে করলো খেয়ার কয়েকটা ছবি তুলতে যদিও খেয়া কখনোই ওকে ছবি তোলার পারমিশন দেবে না।
— আধঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি বাসের জন্য কিন্তু কোনো বাসেই সীট খালি নেই। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড আমাকে বাসার সামনে ড্রপ করে দিয়ে আসবেন।
—অফকোর্স ওয়াই নট। প্লীজ সীট। কিন্তু,, তুমি তো আমার বাইকে বসবে না।
শেষের কথাটি কিছুটা খোঁচা মেরে বললো ফায়েজ৷ খেয়া ভাবলো আসলেই তো সে তো ফায়েজের বাইকে বসবে না। কিছু সময় ভাববার পর অবশেষে খেয়া ফায়েজকে বললো,,
— আজ যেতেই হবে। নয়তো আমার দেরি হয়ে যাবে। বাসায় আমার কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস রেখে এসেছি। বাসায় গিয়ে সেগুলো এনে প্রকাশনীর কাছে হ্যান্ডওভার করতে হবে।
— ওকে এজ ইউ উইশ।
ফায়েজের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই সে ভেতরে ভেতরে কতটা সুখানুভূতিতে পাচ্ছে। খেয়া বাইকে উঠার আগে খুব ভালো করে ওর চুলগুলো পাঞ্চ ক্লীপ দিয়ে আঁটকে নিলো। তারপর, ওড়না আরও ভালো করে মাথায় পেঁচিয়ে বাইকে উঠে বসলো। যদিও খেয়ার থেকে ফায়েজের দূরত্ব ছিল অনেকখানি। পারলে খেয়া বাইক থেকে পরে যাবে। ফায়েজ খেয়ার এহেন কান্ড দেখে কিছু বলতেই যাবে ঠিক সেইসময় একজন নারী এসে খেয়াকে বললো,,
— তুমি এখনো যাওনি??
— এই তো যাচ্ছি ম্যাডাম। যাব আর আসব।।
— ঢাকা শহরে যাব আর আসব বলে কোনো বাক্য প্রয়োগ করতে নেই। পাঁচ মিনিটের রাস্তা অতিক্রম করতে আধঘন্টা অব্দি সময় লেগে যায় । উনি কে??
ফায়েজের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন শারমিন ম্যাম। খেয়া ইতস্ততভাবে উত্তর দিলো,,
— উনি ফায়েজ চৌধুরী। আমাদের বিল্ডিংয়ের মালিক। আমি আসছি ম্যাম। আপনি অফিস অপেক্ষা করুন আমার জন্য ।।।।
ফায়েজ -খেয়া চলে যাচ্ছে। এদিকে শারমিন ম্যাম ফায়েজ চৌধুরী নামটি শুনে অবাক এবং বিস্মিত হলেন। কারণ,, খেয়ার অসম্পূর্ণ উপন্যাসে ফায়েজ চৌধুরী নামক একটা চরিত্র ছিল যে কিনা খেয়াকে বিনাশর্তে ভালোবাসত। আচ্ছা,, উপন্যাসের ফায়েজ চৌধুরীর সঙ্গে কি বাস্তব ফায়েজ চৌধুরীর কোনো কানেকশন আছে?? আমরা কি
বাস্তবে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনাকে উপন্যাসের পাতায় পড়েছি। যদিও উপন্যাসটি অসম্পূর্ণ!!
শারমিন ম্যাম অস্থির হয়ে যায়। ফায়েজ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করা খুবই জরুরি। এতদিন নিছক মনগড়া গল্প মনে হলেও এখন সেই গল্পকে বাস্তব মনে হচ্ছে। যদি বাস্তবই না হবে তাহলে খেয়া কেন সম্পূর্ণ করতে চাইছে না গল্পটা?
__________________
বিল্ডিংয়ের সামনে এসে বাইক থেমে গেছে। খেয়া তড়িঘড়ি করে ফায়েজকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যাচ্ছে ফ্ল্যাটের দিকে। তাড়াতাড়ি যেতে হবে অলরেডি চল্লিশ মিনিট দেরি হয়ে গেছে। ঢাকা শহরের জ্যাম থেকে সময় বাঁচানো বড্ড কঠিন।
কলিংবেল বাজাচ্ছে খেয়া। দুএক মিনিট পর দরজা খুললো রুমানা। অসময়ে খেয়াকে দেখে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন,, এসময় বাড়িতে! কোনো সমস্যা হয়েছে?
খেয়া ওর রুমের দিকে যেতে যেতে উত্তর দেয়,,
— কিছু গুরত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস রেখে গিয়েছি ফুপি। আজই জমা দেয়ার কথা ছিল।
রুমে গিয়ে আলমারি থেকে ডকুমেন্টস নিয়ে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে বের হয়ে ওর ফুপিকে একপাশে জড়িয়ে ধরে বের হয়ে গেলো ফ্ল্যাট থেকে।
রাস্তায় এসে দেখলো ফায়েজ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খেয়াকে দেখে ফায়েজ বললো,,
— চলো নামিয়ে দিয়ে আসি। এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে।
খেয়া মনে মনে আপ্লূত হলো। ফায়েজকে ধন্যবাদ দিতে মন চাইলো। কিন্তু ইগোর জন্য নাকি লজ্জায় খেয়া ফায়েজকে ধন্যবাদ জানাতে পারলো না।
ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বাইকে বসলো। ফায়েজ মিরর দিয়ে খেয়ার মুখখানা দেখছে। হয়তো ইতস্তত করছে ফায়েজের বাইকে দ্বিতীয় বার বসতে হয়েছে বলে।
— কাঁধে হাত রাখো । পরে যাবে।
কথাটি বলে ফায়েজ বাইক স্টার্ট দেয়। খেয়া হাত বাড়িয়ে ফায়েজের পেটের কাছের অংশের টি-শার্টকে চেপে ধরলো। ফায়েজ খেয়ার কান্ড দেখে কিছুই বললো না। কারণ,, আসার পথে খেয়া এভাবেই এসেছে।
যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। প্রকাশনীর অফিসের সামনে খেয়াকে নামিয়ে দিয়ে চলে যায় ফায়েজ। খেয়াকে নিয়ে বাড়িতে ফিরতে চেয়েছিল কিন্তু খেয়া বারণ করেছো বিধায় অগত্যা ফায়েজকে যেতেই হয়েছে।
শারমিন ওর কেবিনের ভেতর পায়চারি করছে। মানুষ যে কোনো কিছুর শেষ অব্দি দেখতে চায়। কারণ,, মানুষ কৌতুহলী প্রানী। যাদের কৌতুহলের শেষ নেই। ফায়েজকে দেখার পর থেকে শারমিনের হাসফাস লাগছে যতক্ষণ না অব্দি পুরো ঘটনা জানতে না পারবে ততক্ষণ অব্দি শারমিনের শান্তি নেই।
— মে আই কাম ইন ম্যাম??
দরজার দিকে ঘুরে দেখলো খেয়া এসেছে। শারমিন খেয়াকে ভেতরে আসতে বললো। খেয়া দরজা বন্ধ করে টেবিলের কাছে গিয়ে ব্যাগ থেকে ডকুমেন্টস রেখে দিলো। শারমিন ডকুমেন্টস হাতে নিয়ে খেয়াকে হাতের ইশারায় বসতে বললো। খেয়া চেয়ার টেনে বসলো। শারমিন কাগজগুলো উলটেপালটে দেখলো। তারপর ড্রয়ার খুলে তাতে রেখে দিলো যত্ন করে।
— খেয়া কফি খাবে? মাথাটা ধরে আছে।
— ম্যাম বাসায় ফিরে যেতে হবে। অলরেডি অনেক রাত হয়ে গেছে।
— এতটাও রাত হয়নি যতটা বলছো। মাত্র সাড়ে সাতটা বাজে। তুমি বসো। একসাথে বসে আজ কফি খাব।
কাউকে কল করে দুটো কফি নিয়ে আসতে। কফি আসতে কিছু সময় তো লাগবেই তাই শারমিনের মনে হলো কথার ফাঁকে আরেকবার ফায়েজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে নেয়া যাক৷
— ফায়েজ সাহেবকে তুমি কত বছর ধরে চেনো??
শারমিনের প্রশ্ন শুনে খেয়া কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। কি যেন ভাবছে? হয়তো মনে মনে কথাগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে কি করে শারমিনের সামনে প্রেজেন্ট করবে?
— গত ডিসেম্বর থেকে।
—মানে??
— ফায়েজ কানাডা ছিলেন। গত ডিসেম্বরে উনি দেশে এসেছেন।
— সাধারণত ভাড়াটিয়াদের সাথে মালিক কিংবা মালিক পুত্রদের এতটা সখ্যতা থাকে না। কিন্তু,, ফায়েজ সাহেবকে দেখলে কিন্তু মনে হয় না তিনি সেই রকম মন-মানসিকতার অধিকারী।
খেয়া স্মিত হাসে। শারমিন ম্যাম যে ফায়েজের ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে উঠেছেন তা উনার আচরণে বোঝা যাচ্ছে। খেয়া মেকি হাসি দিয়ে বললো,,।
— ম্যাম আপনি কিন্তু ফায়েজ চৌধুরীর ব্যাপারে জানার জন্য কৌতূহলী হয়ে উঠছেন।
খেয়ার কথা শুনে শারমিন গাঢ় দৃষ্টিতে তাকালো। মেয়েটাকে যতটা সহজ সরল মনে হয় আসলেও অতটা সহজ সরল নয়। মানুষের চোখ দেখে যে মনের খবর জেনে যায় সে আর যাই হোক সহজ সরল হতে পারে না।
— কৌতূহল নয় বরং তোমাদের দুজনের বন্ডিং দেখে সেরকম ভাবনা আসাই স্বাভাবিক। একজন বাড়িওয়ালা আর তার ভাড়াটিয়ার সম্পর্ক কেমন হয় সেটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
শারমিনের কথায় খেয়া হাসলো। সেই হাসির অর্থ বুঝলো না শারমিন। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে খেয়া উঠে দাঁড়ালো। ওর চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। অযথা কফির জন্য বসে থেকে সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না।
— কি ব্যাপার? চলে যাবে??
খেয়া পেছনে ফিরে বললো,,
— ফুপি অপেক্ষা করছে ম্যাম৷ আমাদের মতো ভাড়াটিয়ারা কি বাড়িওয়ালার সাথে বসে কফি পান করে??
কথাটি বলে শারমিনের কেবিন থেকে বের হয়ে যায়। শারমিন “ওহ শিট ” বলে টেবিলে চাপড় দিয়ে টেবিল থেকে মোবাইল এবং পার্স নিয়ে বেরিয়ে আসে। উদ্দেশ্য একটাই খেয়া।
রাস্তায় এসে সিএনজির জন্য অপেক্ষা করছে খেয়া। খালি সিএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। আর বাদ বাকি সিএনজি ভাড়া বেশি চাচ্ছে নয়তো যেতে চাচ্ছে না। খেয়া বিরক্তি নিয়ে হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো। এমন সময় একটি সিএনজি এসে খেয়ার সামনে থেমে যায়। খেয়া ভ্রু কুঞ্চিত করে সিএনজি চালককে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ভেতর থেকে কেউ বলে উঠলো,,
— চলে এসো খেয়া। আজ তোমাদের বাসায় যাব আমি।
শারমিন হেসে হেসে কথাটি বললো। খেয়া অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে। মানে শারমিন ম্যাম তাদের বাসায় যাবে তাও আবার বিনা দাওয়াতে!! আচ্ছা,, ম্যাম কি কোনো কারণে ফায়েজের সঙ্গে দেখা করতে চাইছে?? মনে মনে নানান প্রশ্ন কিন্তু উত্তর মেলে না। বাধ্য হয়ে সিএনজিতে উঠলো খেয়া।
**********************
ফায়েজ মোবাইলে খুশবুর সঙ্গে কথা বলছিল। কথার মেইন টপিক হচ্ছে আরমান। ফায়েজ আরমানকে পঁচাচ্ছে। মানে সে কিভাবে অফিসের এত চাপ সামলে খুশবুর ন্যাকামি দেখে। খুশবু রাগ করে না ফায়েজের কথায়। উল্টো হাসছে।
— তুমি যেভাবে খেয়াকে ভালোবেসে বিরক্ত হয়নি ঠিক সেভাবে আরমানের শত ব্যস্ততার মাঝেও আমার ন্যাকামি সামলাতে কষ্ট হয় না। একটা ব্যাপার কি জানো,, আমরা মানুষেরা বড্ড অগোছালো কিন্তু নিজের পছন্দ কিংবা ভালোবাসার মানুষ কিংবা বস্তু দুটোকেই যত্ন করতে ভালোবাসি। আগলে রেখে যত্ন করতে পারি। তুমি খেয়াকে ভালোবাসছো ভীষন যত্ন করে। ঠিক তেমনি আরমান আমাকে ভালোবাসে।
তাই তো হাজার ব্যস্ততা থাকা স্বত্বে আমাকে সময় দিতে ভুলে না।
খুশবুর কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলো ফায়েজ। ভীষণ ভালো লাগলো শুনে। রকিং চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিয়ে ফায়েজ বললো,,।
— দেখলি আমার কথা বাস্তবে রুপান্তরিত হয়েছে বলেছিলাম না আরমান তোকে আমার থেকেও বেশি ভালোবাসবে। আমরা যাকে ভালোবাসি তাকে পেলে হয়তো ভালোবাসায় পূর্ণতা আসে। কিন্তু,, যে আমাদের মনে প্রাণে ভালোবাসে তাকে পেলো জীবনের ষোলোকলা পূর্ণ হয়।
— আসলেই…
কল কেটে দিলো ফায়েজ। আর খুশবু ওপাশে মুখ চেপে কাঁদে। ফায়েজের কাছে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে চায় না কি লাভ প্রকাশ করে? ফায়েজকে পাবে মোটেও না। বরং আরমানে ভালোবাসা হারাবে। মনটাকে শুধু বোঝাতে পারলো না খুশবু। ফায়েজ যেদিন ওর ভালোবাসা প্রত্যাখান করেছিল সেদিন কাঁদতে কাঁদতে সুইসাইড করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু,, ভাগ্য সহায় ছিল বলে বেঁচে ফিরেছে। সেই ইন্সিডেন্টের পর ফায়েজ একদিন ওদের বাড়িতে গিয়ে বোঝালো যে কাজিন লাভ ওর দ্বারা সম্ভব না। কারণ,, খেয়া নামের কাউকে পছন্দ তার। সেদিন ফায়েজ ফিরে আসার সময় যখন খুশবুর মা ফায়েজকে আরমানের ছবি দেখিয়েছিল ঠিক তখনি ফায়েজ খুশবুকে আস্বস্ত করে বলেছিল,, আরমান ইজ বেস্ট ফর খুশবু।
এতগুলো বছর পর খুশবুর মনে হচ্ছে ফায়েজের কথাই ঠিক আয়মান ইজ বেস্ট। যাকে একজনমে ভালোবেসে ভরবে না এ মন।
খুশবুর সঙ্গে কথা শেষ করে রান্নাঘরে যেয়ে কিছু একটা খুঁজছিল ঠিক সেসময় কলিংবেল বেজে উঠল। ফায়েজ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। কারণ, এই সময় ফায়েজের কাছে আসার মতো কেউ নেই। বেসিনে হাত ধুয়ে টাওয়ালে হাত মুছে দরজা খুলতে চলে গেলো ফায়েজ। দরজা খুলতেই দেখলো শারমিন দাঁড়িয়ে আছে। ফায়েজ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। শারমিন মুচকি হাসি দিয়ে বললো,,
— এতগুলো বছরের ফ্রেন্ডশিপকে তুই এত সহজে কি করে ভুলে গেলি দোস্ত???
শারমিনের কথায় ফায়েজের মুখ কঠিন হয়ে যায়। মুখ কালো করে জবাব দেয়।
— ফ্রেন্ডশিপ আমি ধরে রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুই হয়তো চাসনি। তাই ফ্রেন্ডশিপটা নেই।
শারমিনের মন খারাপ হলো। অথচ ওর কোনো দোষ নেই। তবুও ফায়েজের চোখে সে দোষী। শারমিন তবুও ফায়েজের প্রতি রাগ জমেনি। উল্টো আরও হাসিমুখে ফায়েজের দিকে তাকিয়ে বললো,,,
— পানি খাব। একটু পানি হবে??
ফায়েজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা খোলা রেখেই ভেতরে চলে গেছে পানির গ্লাস আনতে। ফায়েজ জানে শারমিন ভেতরে আসবে। ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসবে। হাইস্কুল লাইফ থেকে ফ্রেন্ডশিপ। শারমিনের সবটাই জানা আছে ফায়েজের। এক গ্লাস পানি এনে টি-টেবিলের ওপরো রেখে দিলো। শারমিন সোফায় বসে ফায়েজকে অনুরোধ করলো সে ও যেন বসে। কিছু কথা আছে সেগুলো জানা হলে চলে যাবে।
— এত নাটক না করে তখন সোজাসাপ্টা বলে দিলেই হতো যে আমার সঙ্গে কথা আছে।
— যদি বলতাম ফায়েজ আমার তোর সঙ্গে কথা আছে তবে কি তুই আমার সঙ্গে কথা বলতি? জীবনেও বলতি না। তাই একটু মিথ্যে বললাম৷ শোন তোর সাথে আমার সেই মারামারি করার মতো সম্পর্ক কিংবা বয়স দুটোই নেই। তাই যা বলছি সেগুলোর উত্তর দিবি আমি চলে যাব।
— যদি না দেই??
ফায়েজ পায়ের ওপর পা তুলে জবাব দিলো। পকেট থেকে সিগারেট লাইটার বের করলো। সিগারেটে আগুন ধরিয়ে লাইটার ছুরে ফেললো,, সেই লাইটার গিয়ে দূরে ছিটকে ফেললো,, সাথে সাথে “বুমম”
শব্দে কেঁপে উঠল পুরো ফ্ল্যাট।
— ফায়েজ???
— ডোন্ট শাউট শারমিন। আমার নীরবতা ভালো লাগে চিৎকার চেচামেচি ভালো লাগে না। যা বলার বলে চলে যা এখান থেকে।
শারমিন রেগে তাকালো ফায়েজের দিকে। এতটা বাজে স্বভাবের অধিকারী হলো কবে থেকে? যাতে শারমিন চলে যেতে বাধ্য ঠিক সেই কারণে লাইটার ব্লাস্ট করে ফেললো!! শারমিন ওর ব্যাগ থেকে ফাইল বের করে ফায়েজের দিকে বাড়িয়ে ধরলো। ফায়েজের ফাইলের দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে নেয়নি এখনও।
— আমি সন্দেহ করছি এই ফাইলে যা কিছু লেখা আছে তাতে তুই এবং তোর পরিবার ইনভলভ আছিস। তাই অনুরোধ করব তুই প্লিজ পড়ে দেখিস। পড়ার পর যদি তোর মনে হয় আমার সঙ্গে দেখা করা জরুরি তাহলে আমার এই নাম্বারে কল দিস। আমি দেখা করব তোর সঙ্গে।
ফায়েজ অবাক হয়ে শারমিনের কথা শুনলো। মানে কি?? সামান্য কাগজের পাতায় ও এবং ওর পরিবার ইনভলভ থাকতে পারে!! কিন্তু, কেন??
শারমিন ফাইলসহ ওর ভিজিটিং কার্ড টেবিলের ওপর রেখে চলে যাচ্ছে। শারমিন চলে যাওয়ার পর ফায়েজ ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে দিলো। তারপর,, টি-টেবিলের ওপর থেকে ফাইল নিয়ে চলে এলো ওর বেডরুমে। আসলে কি লেখা আছে এই ফাইলে???
চলমান…..

