Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৮

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৮

0
64

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_৮
#Tahmina_Akhter

ভাইয়াকে সব ঘটনা বললাম। সবটা শোনার পর ভাইয়া একবার আমার দিকে তাকিয়ে নির্বাণের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন আমার থেকে কিছুটা দূরে। আমি তাদের নিয়ে ভাবলাম না। ওটির দিকে তাকিয়ে আছি। না জানি ফায়েজ এখন কেমন আছে?

— তোমার সঙ্গে এমনিতেই খেয়ার বিয়ে ফিক্সড হয়েছে। তাহলে এমন উদ্ভট কান্ড করার কি দরকার ছিল নির্বাণ?? অপজিট দল ওত পেতে আছে শুধু একটু করে খবরটা কানাকানি হলে সব শেষ হয়ে যাবে। আর কিছুদিন পর নির্বাচন। এমন সময়ে এসে তুমি আমাকে নিরাশ করবে আমি ভাবতেও পারছি না নির্বাণ!!

—- এখন আমি যদি বলি,, আপনি আমাকে নিরাশ করেছেন নিজাম ভাই।

— কি বলতে চাইছো তুমি??

নিজাম রাগান্বিত হয়ে প্রশ্ন করলো নির্বাণকে। নির্বাণ যথাসম্ভব চেষ্টা করছে নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে কিন্তু পারছে না। তবুও,, ভদ্রতার খাতিরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সঙ্গে বেয়াদবি করা যাবে না। তার বোনকে যে বিয়ে করতে যাচ্ছে নির্বাণ।

—আপনার বোন ফায়েজ চৌধুরীকে ভালোবাসে এটা জানা সত্বেও আপনারা আমার সঙ্গে কেন খেয়ার বিয়ে ঠিক করলেন?

নিজাম হতভম্ব হয়ে যায়। নির্বাণ কি করে জানলো এই ব্যাপারে??

— তোমার তো এই ব্যাপারে জানার কথা না। নিশ্চয়ই ফায়েজ বলেছে ?

নির্বাণ হেসে ফেললো। নির্বাণের হাসি দেখে নিজাম ভ্রু কুটি করে ফেললো।

—আপনার বোন আজ দুপুরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে,, ও ফায়েজকে ভালোবাসে। ফায়েজের জন্য এই পৃথিবীর বাইরে যেতেও রাজি আছে।

নিজাম চুপ হয়ে গেছে। নির্বাণ তখনো বলেই যাচ্ছে।

— আপনার বোন আমাকে বিয়ে করতে চায় না। কিন্তু,, আমি তো ওকে ছাড়া থাকতে পারব না। তাই কিছুটা বাঁকা পথ অবলম্বন করলাম যাতে খেয়া নিজ থেকেই আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে যায়।

— আমাদের ব্যাপারটা জানাতে আমরা হ্যান্ডেল করতাম। তুমি কেন ঝামেলায় জড়ালে? খেয়া তো এখন তোমাকে বিয়ে করতে চাইবে না। ও অন্যায়কে সর্মথন করে না।

— সেটা নিয়ে আপনাকে না ভাবলেও চলবে। আমি জানি কাকে কিভাবে সামলাতে হয়?

— ভুলে যেও না নির্বাণ খেয়া আমার বোন হয়। যদি আমার বোন তোমাকে বিয়ে করতে না চায় তবে তুমি ওকে জোড় করতে পারবে না ।

— বাহ্ এখন বোনের জন্য দরদ উথলায় পরছে! কিছুদিন আগেও কে যেন ক্ষমতার জন্য আমার কাছে বোনকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল? এখন সেই বোনকে গিয়ে যদি বিয়ে ঠিক হবার পেছনের আসল সত্যটা বলি তখন দেখা যাবে ভাইয়ের স্নেহ কোথায় থাকে?

নিজামকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলে নির্বাণ সেখান থেকে চলে এলো। নিজাম মনে মনে কি যেন ভাবে? তারপর,, সরফরাজকে কল দেয়।

অপারেশন থিয়েটার থেকে ফায়েজকে বের করে আনা হলো। কেবিনে শিফট করা হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। খেয়া ফায়েজের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে ডক্টররা ওকে সাফ বারণ করে দেয়। অথচ,, খেয়া তৃষ্ণার্ত অবস্থায় আছে কখন ফায়েজের মুখটা দেখবে। কেবিনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় আছে খেয়া কখন একটুখানির জন্য হলেও চোখের দেখা দেখবে।

— এখানে কি করছো তুমি?? আমি তোমাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বুঝতে পারছো তুমি তোমাকে না পেয়ে তখন আমার মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল?

নির্বাণ খেয়ার বাহু চেপে ধরে কথাগুলো দাঁত দাঁত চেপে বললো। খেয়া শতগুণ ঘৃণা নিয়ে নির্বাণের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। এই দৃশ্যটুকু হজম হলো না নির্বাণের। আর শক্ত করে চেপে ধরলো খেয়ার বাহু। ব্যথার কারণে
খেয়ার মুখ দিয়ে আহ শব্দ বেরিয়ে আসে।

— শরীরের ব্যথা সহ্য করতে পারছো না আর আমার হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করতে হাত কাঁপছে না তোমার। আমাকে কি তোমার মানুষ মনে হয় না?

— আপনি মানুষ হলে তবেই না আপনাকে মানুষ মনে করব?

খেয়ার জবাব শুনে নির্বাণ ওর বাহু ছেড়ে দেয়। নিজের চুলগুলো মুঠ করে ধরে তারপর ছেড়ে দিয়ে পাগলের ন্যায় কেবিনের দরজার সামনে পায়চারি করতে থাকে। হুট করে এসে খেয়ার হাত ধরে টেনে একদম নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বললো,,

— তুমি আমাকে দিয়ে চাইছো এই খেলার ইতি টানতে। কিন্তু,, আফসোস তুমি কখনোই পারবে না। কারণ,, নির্বাণ কাঁচা খেলোয়াড় না। আমাকে রাগিয়ে তুমি পাব্লিকের সামনে কিছুই প্রুব করতে পারবে না। ফায়েজের জ্ঞান কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে৷ কথা যা বলার বলে নেবে । মনে রেখো ফার্স্ট এন্ড লাস্ট আমি তোমাকে ফায়েজের সঙ্গে কথা এবং দেখা করার সুযোগ দিচ্ছি। কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে৷ কথা যা বলার বলে নেবে । মনে রেখো ফার্স্ট এন্ড লাস্ট আমি তোমাকে ফায়েজের সঙ্গে কথা এবং দেখা করার সুযোগ দিচ্ছি।

খেয়াকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চলে যায় নির্বাণ। খেয়া তাচ্ছিল্যের সুরে বলে উঠলো,,

— আমি জানতাম নিজাম ভাই কিছু করতে পারবে না। কারণ,, ওপর ওয়ালা হয়তো চায় না আমি ফায়েজের হাতে হাত রেখে জীবনের বাকি দিনগুলো হেসে কেঁদে কাটিয়ে দেই।

খুব যত্ন করে চোখের জল মুছে ফেললো খেয়া। কারণ,, এটাই ওর শেষ কান্না। খেয়াকে যে ভীষণ শক্ত হতে হবে। ফায়েজের সামনে কাঁদা যাবে না। ফায়েজ নয়তো কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে।

ওয়েটিংরুমে বসে অপেক্ষার প্রহর গুনছে খেয়া। রাত তখন দুটোর কাছাকাছি। খেয়ার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ডাক এলো ফায়েজের কাছে যাবার জন্য। খেয়া স্মিত হেসে মন্টুকে বললো,,

— নির্বাণ আশেপাশে আছে তাই না?? আমি পালিয়ে যাব কিনা এই ভেবে হয়তো হসপিটালের চারপাশে লোক লাগিয়ে রেখেছে?

মন্টু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে খেয়ার দিকে। কারণ,, খেয়া যা বলেছে সবগুলো সত্য। কিন্তু,, খেয়া জানলো কি করে? সে তো আর হসপিটাল থেকে বের হয়নি। মন্টু কিছু জিজ্ঞেস আগেই খেয়া উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে কেবিনের দিকে। মন্টু সেখানে বসে অপেক্ষা করছে খেয়ার জন্য।

চোখ খুলে যখন তাকালাম তখন ভেবেছিলাম হয়তো অন্ধকার কবরের মাঝে শুয়ে আছি। কিন্তু,, অন্ধকার কবরে কি আর সাদা বেডশিট,, জানালার সাদা পর্দা,, এসি থাকে? শরীরের আড়মোড়া ভাঙতে যেয়ে ব্যথায় কুকিয়ে উঠলাম। শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম,, কিছু জায়গায় ব্যান্ডেজ লাগানো। বাম পা নাড়াতে পারলেও,, ডান পা নাড়তে অসুবিধা হচ্ছে। আকাশপাতাল যখন ভাবছিলাম ঠিক তখনি কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে কেউ প্রবেশ করলো। ডার্ক ব্লু কালারের গাউন পরনে,, এলো চুলে খোপায় বাঁধা,, খেয়া এসেছে। খুব ভালো করে খেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম,, ওর মুখটা মলিন হয়ে আছে। হুট করে বিকেলের সব ঘটনা একে একে আমার মনের দৃশ্যপটে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমি খেয়ার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম কিন্তু খেয়ার পক্ষ থেকে সাড়া না পেয়ে চুপ করে তাকিয়ে আছি ওর দিকে।খেয়া আমার দিক ঠিক একইভাবে তাকিয়ে আছে।

হয়তো,, চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেছে। আমি হাতের আঙুলের ইশারায় ওকে কাছে ডাকতেই ও আমার বেডের পাশে রাখা চেয়ারটায় বসলো। হয়তো,, আমার অনুমতির অপেক্ষায় ছিল।

আমি খেয়াকে চতূর্থবারের মতো এতকাছ থেকে দেখলাম,, প্রথমবার যেদিন দেখলাম সেদিন তো মনে হয়েছিল,, একে না পেলে জীবন চলবে না। সাতদিনের জ্বরে কাবু হয়ে হসপিটালে ভর্তি হলাম। হসপিটালের বেডে শুয়ে অসংখ্যবার খেয়াকে কল্পনায় বৌ বানাতাম। কল্পনার জগতে খেয়া আমার রাগী বৌ হিসেবে রোল করতো। বাবাহ্ সে কি রাগ! ভালোবেসে কাছে টানলেও রাগ। দূরে সরে এলে রাগ! আমি তো দিশেহারা হয়ে একদিন কাঁদতে শুরু করলাম। বাস্তবেও যদি খেয়া এমন রাগী বৌ হয় তখন কি হবে এই ভেবে।

— ফায়েজ???

খেয়ার ডাক শুনে কল্পনার জগত থেকে বেরিয়ে এলাম। খেয়া আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি খেয়ার চোখের দিকে তাকাতেই খেয়া ওর হাত দিয়ে আমার দুটো চোখে হাত রেখে বললো,,

— এভাবে তাকাবেন না প্লিজ। নয়তো, আমি কথাগুলো বলতে পারব না।

আমি ভীষন অবাক হলাম। কি এমন কথা আছে খেয়ার যার কারণে ওর চোখের দিক তাকাতে আমাকে বারণ করে দিলো!! আমি কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে খেয়াকে বললাম,,

— খেয়া তোমার চোখে তাকালেই শান্তি খুঁজে পাই। তুমি কি আমার শান্তি চাও না?

খেয়া আমার কথা শুনে ঝরঝরিয়ে কেঁদে উঠে। হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি।

— আমি কখনোই আপনার হবো না। আমি অন্যকারো আমানত। আমি শেষ অব্দি চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি সফল হতে। আপনি হয়তো আমার ভাগ্যেই নেই নয়তো এত ভালোবাসার পরও কেন আপনাকে পেলাম না আমি!!

খেয়ার মুখ থেকে এই কথাগুলো শুনে আমার যে কি হলো বুঝতে পারছি না। মানে এক অন্যরকম অনূভুতি! যার মুখ থেকে সবসময় “ভালবাসি” কথাটি শুনতে চাইতাম সে আজ আমাকে “ভালোবাসি” কথাটি বললো। কিন্তু,, আমি কেন তার ভাগ্যে নেই! “কেন ” এর উত্তর কি কারো কাছে আছে?

— আমি তোমাকে চাই। তুমি আমাকে চাও। পুরো দুনিয়া যদি আমাদের বিরুদ্ধে থাকে তবুও আমার সমস্যা নেই। কারণ,, তোমার ভালোবাসা আছে আমার কাছে। এটাই আমার শক্তি সবার সঙ্গে লড়াই করার জন্য। নির্বাণ আমাদের কিছুই করতে পারবে না। খেয়া ট্রাস্ট মি। তুমি শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছো।

খেয়া ফায়েজের দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে,, আপনি দেয়ালের এপাড় দেখছেন ওপাড় দেখেননি। তাই হয়তো নির্বাণকে ভয় পাচ্ছেন না। কিন্তু,, আমি ভয় পাচ্ছি নির্বাণকে। কারণ,, আপনি। আপনার কিছু হয়ে গেলে আমি বেঁচে থাকতেও মরে যাবে। জীবন্ত দেহ দেখবে সবাই কিন্তু রুহের মৃত্যুর খবর কেবল আমি জানব।

— আপনি আমাকে কতটুকু ভালোবাসেন ফায়েজ???

খেয়ার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েও জবান দেয় না ফায়েজ। ভালোবাসা কি পরিমাপ করা যায়? যদি পরিমাপ করা যেতে তাহলে হয়তো বলা যেত,, যে খেয়া ফায়েজের জন্য কি?

— আমার হৃদয়ের যতটুকু ওজন ঠিক ততটুকুই ভালোবাসি তোমাকে। হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছি তোমায়। তাই ভালোবাসার পরিমাপ তো কেবল হৃদয় দিয়ে করব।

ফায়েজের জবাবে খেয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বামহাতটা বুকের বা পাশে রেখে খেয়া উঠে দাঁড়ায়। ফায়েজের শিউরের কাছে গিয়ে ডানহাতটা ফায়েজের কপালে রেখে বললো,,

— আপনি একটা কথা দিন তো আমায়???

— একটা কেন হাজারটা কথা নাও??

— একটা কথা দিলেই চলবে।

— বলো তাহলে??

— আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আমি আমার ভালোবাসাকে কুরবানি করেছি।আপনি যতদিন এই পৃথিবীতে আছেন ঠিক ততদিন আপনার বুকে আমার নামের ভালোবাসা থাকবে। আমার অবর্তমানে কখনো আপনার ক্ষতি করার চেষ্টা করবেন না।

কথাগুলো শেষ করে খেয়া ফায়েজের কপালে একটি দীর্ঘ চুমু খেয়ে বেরিয়ে যায় কেবিন থেকে। ফায়েজ বিস্মিত হয়ে কপালের ভেজা অংশে হাত রেখে খেয়ার বলা প্রতিটা শব্দ ভাবছে। কথাগুলোর আড়ালে কোনো কঠিন সত্যি লুকিয়ে নেই তো???

হসপিটাল থেকে বের হয়ে আসে খেয়া। কান্নারত খেয়াকে দ্রুত ছুটে আসতে দেখে নির্বাণ দৌঁড়ে যায় ওর পেছনে পেছনে। খেয়া কারো তোয়াক্কা না করেই মেইনরোডের দিকে দৌঁড়ে যাচ্ছে। এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো। মেইনরোডের কাছাকাছি এসে গেছে খেয়া। দ্রুতগামী একটি কার্গো ভ্যান এগিয়ে আসছে। খেয়া অপেক্ষায় আছে খুব দ্রুতই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছে। চোখের মানসপটে একে একে বাবা-মা,, ভাইদের এবং ফায়েজের সঙ্গে কাটানো মধুর স্মৃতিগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। খেয়া চোখ বন্ধ করে কার্গো ভ্যানটির সামনে ঝাঁপ দেয়।

গালে হাত দিয়ে,, চোখ ভর্তি জল নিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে খেয়া। আশেপাশে বেশ মানুষজন উপস্থিত হয়েছে। হবারই কথা বড়ো ধরণের দূর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে খেয়া। ভীড় ঠেলে সেখানে নির্বাণ উপস্থিত হয়। খেয়াকে অক্ষত অবস্থায় দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। কিন্তু,, একটা মেয়ে খেয়াকে ইচ্ছেমতো বকে যাচ্ছে। কারণে,, মেয়েটা সময়মত এসে খেয়াকে দূর্ঘটনা থেকে বাঁচিয়েছে।

— মরতে যাচ্ছিলে কেন?? জানো না আত্মহত্যা মহাপাপ। দুনিয়াবি যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যা করলে কিন্তু পরকালে গিয়েও শান্তি পাবে না। শুধু ইহকাল পরকাল নষ্ট করার মানে আছে। আজ সময়মতো এসেছিলাম বলে। নয়তো কি যে হতো ভাবতেই গা শিউরে উঠছে আমার।

কথাগুলো বলতে বলতেই মেয়েটা নির্বাণের দিকে ফিরতেই ছোটখাটো চিৎকার দিয়ে নির্বাণকে একপাশে জড়িয়ে ধরলো। খেয়া মেয়েটির চিৎকার শুনে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখলো,, মেয়েটি নির্বাণকে একপাশে জড়িয়ে ধরেছে। আর নির্বাণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে।

— ওয়াট এ্য প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ! তুই এখানে! কখন এলি??

— ভাইয়া তোদের সারপ্রাইজ দিতে কাউকে না জানিয়ে এসেছি। মনটা আকুপাকু করছিলো তোদের দেখতে।

কথাটি বলে মেয়েটা নির্বাণের কাছ থেকে সরে আসে। নির্বাণ মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে খেয়ার সামনে এসে ওর ডানহাত শক্ত করে ধরলো। তারপর,, এগিয়ে যেতে যেতে সেই মেয়েটাকে উদ্দেশ্য করে বললো,,

— তুই জানিস না খুশবু তুই কি করেছিস? তোর ভাইয়ের জান বাঁচিয়েছিস তুই।

খেয়ার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললো নির্বাণ। খেয়া হাত ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যস্ত নির্বাণের কোনো কথায় ওর ধ্যান নেই।

— মানে? ও মানে সরি ; উনি কি আমার ভাবি??

খুশবুর প্রশ্নের প্রতিউত্তরে নির্বাণ হাসিমুখে মাথা নাড়ায়। খুশবু গিয়ে খেয়াকে জড়িয়ে ধরলো৷ খেয়া জড়বস্তুর ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো।এদের এত আনন্দ দেখে সহ্য হচ্ছে না খেয়ার। সব ছেড়ে কোথাও যেতে পারলে শান্তি হতো বোধহয়!

—- মা ছবি দিয়েছিল তোমার। দেখেছিলাম কিন্তু মোবাইলের ছবিতে আর বাস্তবের তুমিতে বড্ড ফারাক আছে। বাস্তবে তো তোমায় নির্বাণের রানীর মতো দেখয়। তাই না রে ভাইয়া?

নির্বাণ খুশবুকে জবাব দেয় না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নির্বাণ শুধু জানে খেয়া কার মনের রানী! মনের মাঝে কেবল একটু আগের ঘটনা হানা দিচ্ছে। আরেকটু হলে খেয়াকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলতো। নির্বাণের বুক কাঁপছে খেয়াকে হারানোর ভয়ে।

— বাসায় চল গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। পরেও কথা বলতে পারবি খেয়ার সঙ্গে। তুই গাড়ি নিয়ে আয়। আমি চললাম।

খুশবুকে কথাটি বলে খেয়াকে নিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। গাড়ির সামনে এসে দরজা খুলে খেয়াকে বসিয়ে নিজেও বসে পরলো ড্রাইভিং সিটে।

অন্ধকার রাতে শহরের হরেক রকম আলোর হিড়িক পরেছে। বড়ো দালানগুলো আলোকিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে খেয়ার মুখে পরছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে গেছে। নির্বাণ তাকিয়ে আছে খেয়ার দিকে৷ গাড়ির চালানোর সাহস পাচ্ছে না। খেয়ার যদি আজ কিছু হয়ে যেত তবে নির্বাণের কি হতো! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই খেয়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো নির্বাণ। আচমকা এভাবে জড়িয়ে ধরাতে খেয়া ভয় পেয়ে যায়।

— আই লাভ ইউ সুইটহার্ট। তোমার কিছু হলে আমি স্রেফ মরে যাব।

— আপনি মরে গেলে আমি ভীষণ খুশি হব এটা তো আমার মনের শেষ ইচ্ছা। আপনাকে মারতে যদি মৃত্যুকে আপন করতে হয় তবে মৃত্যুই সই।

খেয়া নির্বাণের বুকে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় জবাব দেয়৷ নির্বাণ কিছুসময়ের জন্য হতবাক হয়ে যায়। পরক্ষণেই স্মিত হেসে খেয়াকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরলো। খেয়ার কানের কাছে গিয়ে বললো,,

— তোমার ইচ্ছে তবেই পূরণ হোক কিন্তু তোমার এই ইচ্ছে আমি পূরণ করব আমাদের বিয়ের পর। অন্তত আমি মরে গেলেও যেন তুমি আমার নামের বিধবা হও।

খেয়া ছুটতে চায় নির্বাণের বাঁধন থেকে কিন্তু পারে না। নির্বাণ খেয়াকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলো সীটে। কপালের ওপর দুই আঙুল দিয়ে স্লাইড করছে। খেয়া সোজা হয়ে বসলো। শরীরটা এখানে থাকলেও মনটা পরে আছে ফায়েজের কাছে। ফায়েজ কি অবস্থায় আছে কে জানে? খেয়া যখন ফায়েজের কথা ভাবতে ব্যস্ত ঠিক তখনি নির্বাণ খেয়াকে ডাক। খেয়া সাড়া দেয় না দেখে নির্বাণ অনবরত খেয়ার নাম ধরে ডাকতে থাকে। একসময় বিরক্ত হয়ে খেয়া নির্বাণের দিকে তাকায়৷ নির্বাণ খেয়ার একটু তাকানোর অপেক্ষায় ছিল। সেই সুযোগটা পাওয়া মাত্রই লুফে নিতেই খেয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেই ফেললো,,

— একটু পর তোমার আমার বিয়ে। বাড়িতে সব আয়োজন করা আছে।

খেয়া নির্বাণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিল এটা স্বপ্ন কিন্তু না এটা স্বপ্ন নয়। কারণ,, নির্বাণের সঙ্গে ওর কথা দেয়া ছিল । ফায়েজ সুস্থ হলে খেয়া নির্বাণের বিয়ে হবে। সেই সময়টা এসে গেছে। কিন্তু,, এত দ্রুত যে চলে আসবে এটা একবারও ভাবেনি।

খেয়ার চোখের পানি আবারও পরছে। নির্বাণ সব দেখছে বাধা দেয় না। কত কাঁদতে পারে কাঁদুক। একবার খালি নির্বাণের হয়ে যাকে তারপর খেয়ার চোখে জল আসতে দিবে না কখনো।

গাড়ি এসে মির্জা ভিলার সামনে এলো। দারোয়ান গেট খুলতেই নির্বাণ ড্রাইভ করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো।

গার্ডেনের পাশের রাস্তায় গাড়ির থামিয়ে নেমে পরে নির্বাণ৷ এদিকে খেয়া নামবে না বলে শক্ত হয়ে বসে আছে। অনেকবার অনুরোধ করার পরও যখন খেয়া নামছে ঠিক তখনি নির্বাণ গিয়ে খেয়ার হাত ধরে টেনে নামায় গাড়ি থেকে। খেয়া কিছু বলতে চাইলে নির্বাণ রাগান্বিত হয়ে বললো,,

— ওয়াদা বদ্ধ হয়েছো আমার সঙ্গে। ওয়াদা ভঙ্গ করো না নয়তো পরিণাম ভালো হবে না। ফায়েজের
আশেপাশে এখনও আমার লোকেরা ঘোরাঘুরি করছে।

ব্যস,, এতটুকু ছিল কনভারসেশন। খেয়া কাঠপুতুলের ন্যায় নির্বাণের হাতের ইশারায় চলতে লাগলো।

বাড়ির ভেতরে যখন ওরা প্রবেশ করলো তখন রাত দশটার কাছাকাছি। নির্বাণের মা হাসিমুখে এগিয়ে এসে নির্বাণের হাত থেকে খেয়ার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন,,

— পাগলটা নাকি আজই বিয়ে করবে তোমাকে। একমাত্র ছেলে কই ধুমধাম করে বিয়ে করাবো তা না চুপিসারে বিয়ে সারছে। তাড়াহুড়ো করে কি করা যায়? তবুও ত্রুটি রাখিনি৷ এসো তোমাকে সাজিয়ে দেই।

খেয়াকে নিয়ে চলে গেলেন। সরফরাজ,, নিজাম,, খেয়ার বাবা ততক্ষণে উপস্থিত হলো মির্জা ভিলায়৷ নির্বাণের চাচা মাহমুদ মির্জা কাজি নিয়ে এলেন৷ খুশবু এসেছে প্রায় মিনিট পাঁচেক। ও এসেই খেয়ার কাছে চলে গেছে। কারণ,, ওর ভাবিকে যে খুব দ্রুতই তৈরি করতে হবে৷

বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। বাড়ির ভেতরের ঘরে বসে থাকা খেয়ার কবুল নিয়ে ড্রইংরুমে এসে নির্বাণের কাছ থেকে কবুল শুনতে এলেন কাজি এবং হুজুর। নির্বাণ কবুল বলে উঠলো তিনবার। উপস্থিত সকলেই সঙ্গে সঙ্গে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো।

দোয়া পাঠ করে কাজি এবং হুজুর চলে গেলেন। খেয়ার বাবা,, নির্বাণের চাচার সঙ্গে কোলাকুলি করলেন। নির্বাণের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলো সরফরাজ ও নিজাম। নির্বাণের সঙ্গে কথা বলার সময় সরফরাজ শুধু একবার জানতে চেয়েছিল কেন আজ রাতেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? প্রতিউত্তরে নির্বাণ বললো,,

— জাঁকজমকপূর্ণ বিয়েতে আমি ইন্টারেস্টেড নই। সাধাসিধে ভাবে বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল তাই ইচ্ছে পূরণ করলাম৷ আপনারা শুধু আপনার বোনকে দোয়া দিয়ে যান। বিয়েটা কোনো না কোনো একদিন তো হতো তবে আজ হয়েছে বলে সমস্যা কি?

সরফরাজ কিংবা নিজাম কেউই আর কিছু জানতে চাইলো না। খাওয়াদাওয়া শেষ করে খেয়ার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল ওর বাবা ভাইয়েরা কিন্তু খেয়া সাফ বারণ করে দেয়। যার কারণে মনে কস্ট পায় তারা। খেয়ার সঙ্গে দেখা না করেই চলে যান উনারা।

নির্বাণ তখনও ড্রইংরুমে বসেছিল। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। রেগুলার পাঞ্জাবি পরে জীবনের শ্রেষ্ঠ কার্যসম্পন্ন করলো নির্বাণ৷ এত এত টাকা যার তাকে কিনা চুপিসারে বিয়ে সারতে হলো। নির্বাণ যখন আকাশপাতাল ভাবতে ব্যস্ত ঠিক তখনি খুশবু আসে ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে। নির্বাণ খুশবুর দিকে তাকিয়ে বারণ করে দিলো। কারণ ওর খিদে নেই৷

— ভাইয়া,, ভাবি কিন্তু না খেয়ে আছে।

— তুই খাইয়ে দে।

— গিয়েছিলাম কিন্তু খাবে না বলে দিয়েছে। তুই নিয়ে যা তো দেখ খায় কিনা? এখনো এখানে বসে আছিস! ঘরে যা ভাবি একা একা বসে আছে।।

কথাগুলো বলে খুশবু ট্রে টি-টেবিলের ওপরে রেখে চলেই যাচ্ছিলো। এমন সময় নির্বাণ খুশবুকে ডাক দিয়ে বললো,,,

— ফায়েজ অসুস্থ। এক্সিডেন্ট করেছে। পারলে সকালে গিয়ে দেখা করে আসিস।

খুশবু থমকে যায়। ওর ভাইয়া মজা করছে না তো ওর সঙ্গে?

— মিথ্যা বলছি না। যেখানে তোর সঙ্গে আমাদের দেখা হলো সেই রাস্তার পাশেই তো মেট্রো হসপিটাল। ওই হসপিটালে এডমিট আছে ফায়েজ।

— তুই এত পাষাণ ভাইয়া!! আমাকে সেখানেই বলতি আমি ফায়েজকে দেখে আসতাম। আমার এখন কেমন লাগছে তুই জানিস না?

কথাগুলো বলে উদ্ভান্ত্রের ন্যায় নিজের ঘরের দিকে ছুটে
যায় খুশবু। ঘর থেকে পার্সটা নিয়ে বের হয়ে যায় উদ্দেশ্য মেট্রো হসপিটাল।

নির্বাণ কল করে মজির চাচাকে বলে দিলো, খুশবুকে হসপিটালে নিয়ে যেতে৷ পকেটে মোবাইল রেখে ট্রে নিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নির্বাণ।

রুমের দরজা খুলতেই মিষ্টি একটা গন্ধ এসে নাক লাগে নির্বাণের। পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে আছে। এক হাতে ট্রে শক্ত করে ধরে অন্যহাত দিয়ে হাতড়িয়ে লাইট অন করতেই নির্বাণ দেখতে পেলো। অজস্র গোলাপের মাঝে সূর্যের রানী হয়ে বসে আছে খেয়া। হাতের ট্রে টেবিলের ওপর রেখে খেয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো৷ এতটা সুন্দর কি কারো বৌকে লেগেছিল হলদে রঙা শাড়িতে! পৃথিবীতে নির্বাণের বৌ হয়তো প্রথম যে কিনা লাল শাড়ী পরে লাল টুকটুকে বৌ না হয় হলদে বৌ সেজেছে। নির্বাণ যখন খেয়াতে ব্যস্ত ঠিক তখনি খেয়া বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে দাঁড়িয়ে বললো,,,

— বিয়ে করেছেন বলেই ভেবে নিবেন না যে আপনাকে আমি স্বামীর হক আদায় করতে দেব। ভুলেও আমার কাছে আসার চেষ্টা করবেন না। নয়তো???

— নয়তো, কি???

নির্বাণ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে খেয়ার দিকে। খেয়া নড়ছে না। আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে।

— আমি আপনাকে মেরে ফেলব।

কথাটি বলে একটি ধারালো ছুরি বের করলো খেয়া। নির্বাণ এই কাহিনি দেখে মুচকি হেসে খেয়ার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। খেয়া নির্বাণকে মারার জন্য উদ্ধৃত হলে নির্বাণ কৌশলে খেয়ার হাত ছুরি নিয়ে ফেলে দিলো জানালা দিয়ে। খেয়া ক্ষোভে ফেটে পড়লো। নির্বাণের পাঞ্জাবির কলার ধরে বললো,,,

— আমি আপনাকে ছাড়ব না। আজ না হোক কাল আপনি আমার হাতেই মরবেন।

— আমাকে ছাড়ার দরকার নেই সুইটহার্ট এভাবে আগলে রেখো।

নির্বাণ কথাটি দুষ্টমির ছলে বলতেই খেয়া ওকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু,, নির্বাণ এবার খেয়াকে এবার কোলে তুলে নেয়। খেয়া নির্বাণের কোল থেকে নামতে চায় কিন্তু পারছে না। খেয়াকে নিয়ে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পরলো নির্বাণ। খেয়া ছুটাছুটি করছে,, নির্বাণের বুকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুসি মারছে। নির্বাণ কিছু বলে না৷ কিছুসময় পর খেয়া ক্ষান্ত হলে নির্বাণ খেয়াকে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরলো। তারপর,, কপালে দীর্ঘসময় নিয়ে চুমু খেয়ে নিজের বাঁধণ থেকে মুক্ত করে দিয়ে ওর দিকে একনজর তাকিয়ে পাশ ফিরে বললো,,,

–্- মারামরি করার সময় অনেক আছে। এখন থেকে একই ছাঁদের নীচে থাকতে হবে আমাদের৷ বেশি লাফালাফি করতে এসো না নয়তো মেইন আদর সারতে দেরি করব না। আমি যা বলি তাই করি। মাইন্ড ইট।

কথাগুলো বলে নির্বাণ ঘুমিয়ে পরে৷ শান্তির ঘুম। বহুবছর ধরে ঘুমায় না। আজ সেই ঘুমের অভাব টুকু পুষিয়ে নেয়া যাকে। কিন্তু,, কে জানত এই ঘুমই নির্বাণের কাল হয়ে দাঁড়াবে৷

নতুন বরকনের ঘরে সাধারণত ভোরবেলায় ডাক পরে না। কিন্তু,, খেয়া আর নির্বাণের বেলায় হলো উল্টো। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই দরজায় কে যেন করাঘাত করছে? নির্বাণের ঘুম ভেঙে যায়। আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলতে যায়। দরজা খুলতেই নির্বাণের মা কান্নারত সুরে বলে উঠলেন,,

— খুশবুকে পাওয়া যাচ্ছে না। খুশবু ওর ঘরে নেই।।।

নির্বাণের এবার মনে পরলো যে গতকাল রাতেই খুশবু ফায়েজের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। একটা মিসটেক হয়ে গেছে। খুশবুর ব্যাপারে ওর মা’কে রাতেই বলে দেয়া উচিত ছিল। নির্বাণ ছোট নিশ্বাস ছেড়ে বললো,,

— মা খুশবু ফায়েজকে দেখতে হসপিটালে গিয়েছে। গতকাল রাতেই গিয়েছিল। আমি তোমাকে বলতে চেয়েছিলাম বাট মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে!

— ফায়েজ হসপিটালে! কিন্তু ; কেন?

— আমি কি করে জানব? একজনের কাছ থেকে শুনলাম। এতবছর পর খুশবু এলো ভাবলাম ফায়েজের পাশে তো ওর থাকার প্রয়োজন আছে৷ তাই রাতেই ওকে বললাম। খুশবু শুনে চলে গেলো।

— এতটা কেয়ারলেস কেন তোরা ভাই-বোনেরা? খেয়া কোথায়?

কথাটি বলে নির্বাণের দিকে তাকালেন নিলুফা। নির্বাণের চট করে বিছানার দিকে তাকালো। বিছানা ফাঁকা ; কেউ নেই। নির্বাণ শংকিত হয়ে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে বেলকনিতে গিয়ে দেখলো,,ওয়াশরুমের দরজা খুলে দেখলো কেউই নেই । খেয়া কোথাও নেই। কোনোমতে একটা টিশার্ট হাতে নিয়ে হতদন্ত হয়ে রুমে থেকে বের হয়ে যায় নির্বাণ। নিলুফা পেছন থেকে ডাকে নির্বাণকে কিন্তু নির্বাণ পেছনে ফিরে না। নিলুফা এবার দুশ্চিন্তায় পরে যায়। বিয়ের পরদিন নতুন বৌ ঘরে নেই। লোকে জানলে কি বলবে?

গাড়ি নিয়ে সোজা হসপিটালের উদ্দেশ্য রওনা হলো। নির্বাণের মন বলছে খেয়া ওখানেই আছে। হসপিটালের গেটের কাছে এসে গাড়ি থামিয়ে। তড়িঘড়ি করে ফায়েজের কেবিনের দিকে রওনা হলো।

কেবিনের দরজার সামনে এসে নির্বাণ চোখদুটো বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললো,,

— খেয়া যেন এখানে না থাকে। খেয়াকে আজ এখানে পেলে আমি সহ্য করতে পারব না।

নির্বাণ দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই সর্বপ্রথম যার মুখ দেখলো সে হলো খুশবু। কান্না করে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। বেডের দিকে তাকাতেই দেখলো ফায়েজের জ্ঞান ফিরেছে। ফায়েজ জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। ফায়েজের ভাবভঙ্গি দেখলে মনে হয় সে ছাড়া এই কক্ষে কেউ নেই।

দরজা খোলার শব্দ পেয়ে খুশবু কান্না বন্ধ করে তাকালো। যখন দেখলো ওর ভাই এসেছে চট করে চোখের পানি মুছে ফেললো। নির্বাণ ধীরপায়ে এগিয়ে যায় খুশবুর কাছে। খুশবুর মাথায় হাত রাখতে ঝরঝরিয়ে কেঁদে উঠে। বোনকে স্বান্তনা দেয়ার ভাষা নেই নির্বাণের কাছে। তবুও বললো,,,

— মরে তো আর যায়নি এভাবে কাঁদছিস কেন?? সুস্থ আছে এটা কি বড়ো ব্যাপার না???

— মরে গেলে হয়তো ভালো হতো । যার জীবন অপূর্ণতায় ঘেরা তার এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না।

ফায়েজ নির্বাণকে উদ্দেশ্য করে বললো। নির্বাণ এবার ফায়েজের দিকে ঘুরে তাকালো দেখলো ফায়েজ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। আপাতত নির্বাণ ফায়েজের সঙ্গে ঝামেলা করতে চায় না। খেয়াকে খুঁজতে হবে। তাছাড়া,, ফায়েজকে কথা বলার সুযোগ দেয়া মানে খুশবুর সামনে সকল ঘটনার খোলাসা করা।

— ডক্টর এসেছিল?? কি বললো?? বাড়িতে যেতে পারবে কখন??

নির্বাণ খুশবুর কাছ থেকে জানতে চাইলো। যদিও নির্বাণের এইসব জানার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই।

— এসেছিল এবং বলেছে ওর ডান পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে। মাস দুয়েক লাগবে পরিপূর্ণ সুস্থ হতে।

— ওহ আচ্ছা।

— ভাইয়া একটা কথা শোন না??

— জলদি বলে ফেল আমার জরুরি কাজ আছে। বের হতে হবে।

নির্বাণের মনে ততক্ষণে খেয়াকে না পাওয়ার হাহাকার চেপে বসছে। খুঁজতে হবে খেয়াকে। কোথায় গেলে তুমি খেয়া??

— আমি একটু বাড়িতে যাব। রাতে এয়ারপোর্ট থেকে বাড়িতে গেলাম,, তোর বিয়ে, তারপর তো ফায়েজের কথা শুনে হসপিটালে চলে এলাম। শরীরটা কেমন যেন লাগছে গোসল করতে হবে। তুই থাকবি কিছুক্ষণ? বেশি দেরি করব না ট্রাস্ট মি।

খুশবুর অনুরোধ ভরা কন্ঠ শুনে ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে না নির্বাণের কিন্তু খেয়া… তাছাড়া ফায়েজের পাশে বসে থাকার মতো ইচ্ছে নেই।

— আচ্ছা,, তুই যা আমি মন্টুকে কল দিচ্ছি ও ফায়েজের খেয়াল রাখবে তুই না আসা পর্যন্ত। আমার একটা জরুরি কাজ আছে আমার যেতে হবে।

খুশবু ওর ভাইকে থ্যাংকস জানিয়ে চলে গেছে। নির্বাণ মন্টুর জন্য অপেক্ষা করছে আর লাগাতার খেয়ার নাম্বারে কল করছে কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ রিসিভ করছে না। নির্বাণ যখন খেয়াকে কল দিতে ব্যস্ত ঠিক তখনি ফায়েজের কথায় নির্বাণ মোবাইল ফোন পকেটে ঢুকিয়ে ফায়েজের দিকে ঘুরে তাকালো।

—- একটা মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করাকে নিশ্চয়ই সুপুরুষের কাজ বলে না।

নির্বাণ স্মিত হেসে ফায়েজের বেডের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর,, একটুখানি নীচু হয়ে ফিসফিসিয়ে বলছে,,

— বিয়ে করা বৌকে আমেরিকায় ফেলে রেখে দেশে অন্য মেয়েকে ভালোবেসে বিয়ে করার ইচ্ছে রাখা মানুষকে কি বলা যায় বল তো ফায়েজ??

— আমি তো এই বিয়ে মানি না৷

— তুই মানিস না কিন্তু খুশবু এই বিয়েকে হৃদয় দিয়ে আপন করেছে। তাই তো তোর কথায় আজ পাঁচ বছর ধরে আমেরিকায় পরে ছিল। যাতে তোর ক্যারিয়ারে কোনো প্রবলেম ক্রিয়েট না হয়।

—বাল্যকালের বিয়ে যে এভাবে গলায় কাঁটার ন্যায় আটকে যাবে কে জানত? জানলে আমি কখনোই নানুর কথায় রাজি হতাম না।

ফায়েজের কথা শুনে নির্বাণের চোয়াল শক্ত হয়ে যায় । ইচ্ছে করছে ফায়েজের গালে দুটো থাপ্পড় মারতে কিন্তু বোনের দিকে তাকিয়ে মারামারির দিকে যাচ্ছে না আপাতত।

— তোর এই বিয়ের প্রতি এত অনিহা কেন এলো? বিয়ের সময় তো শুনলাম না তুই খুশবুকে বিয়ে করতে রাজি না। এতবছর পর এসে যা শুনছি তার কারণ কি খেয়া?? খেয়ার জন্যই কি…

বাকি কথাগুলো সম্পূর্ণ করার আগেই দরজায় নক হলো। ফায়েজ চুপ হয়ে যায়। মন্টু এসেছে। নির্বাণ চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় কিন্তু ফায়েজ থামায় । নির্বাণ পেছনে ফিরে।

—- তুই শুধুমাত্র তোর বোনের সংসার বাঁচানোর জন্য যে খেয়াকে বিয়ে করেছিস এটা কি আমি বুঝি না ভেবেছিস? শুধু শুধু খেয়ার সামনে ওকে ভালোবাসি ভালোবাসি বলে গলা শুকিয়ে ফেলিস কেন??

নির্বাণ চোখ লাল হয়ে যায়। ফায়েজের সামনে গিয়ে ওর কলার একহাতে চেপে ধরে বললো,,,

— খুশবুর জন্যই খেয়াকে বিয়ে করেছি এই কথা যেমন সত্য।। ঠিক তেমনি খেয়াকে আমি ভালোবাসি এই কথাটিও সত্যি।

— মিথ্যা বলবি না নির্বাণ। তুই খেয়াকে কখনোই ভালোবাসিসনি। তুই আমার আর খেয়ার মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে এন্ট্রি নিয়েছিস। তুই ওকে বিয়ে করে একটা সম্পর্কের মাঝে আঁটকে রাখতে পারবি। কিন্তু, মনকে কি দিয়ে বেঁধে রাখবি? খেয়ার মন তো আমার কাছে।

ফায়েজ হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে। নির্বাণ রেগে গিয়ে ফায়েজের কলার ছেড়ে দেয়। কপালের চুলগুলো আঙুল চালিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে ফায়েজকে উদ্দেশ্য করে বললো,,,

— খেয়াকে খুঁজে পাচ্ছি না। ওকে একবার খুঁজে পাই দ্যান ওকে জিজ্ঞেস করব একটা বিবাহিত পুরুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ওর কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য? কারণ,, খেয়ার জানার অধিকার আছে যে ও কোন পাত্রে ভালোবাসা ঢালছে।

— খেয়া কোথায় আছে??

ফায়েজ মুখ কালো হয়ে গেছে। খেয়া যাবে কোথায়? ওকে না জানিয়ে খেয়া কখনো কোথাও যায়নি। তবে আজ কেন জানালো না? ফায়েজের প্রতি কি খেয়ার অভিমান জমেছে?

— আমি জানি না। যদি জানতাম তবুও বলতাম না তোকে।

কথাটি বলে বেরিয়ে এলো নির্বাণ উদ্দেশ্য খান বাড়ি।

ফায়েজ চিন্তিত হয়ে মন্টুকে অনুরোধের সুরে মোবাইল চাইলো। মন্টু ওর মোবাইল দেয় ফায়েজকে। ফায়েজ মোবাইল হাতে নিয়ে আবদুল জব্বারকে কল দেয়। ওপাশে কল রিসিভ করতেই ফায়েজ বললো,,

— খেয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একটু খোঁজ করবে জব্বার। আমার খেয়া কোথায় আছে??

—— জি স্যার। আমি দেখছি। আপনি টেনশন করবেন না। কিন্তু,, স্যার ম্যাডাম যাবে কোথায়? রাগারাগি হয়েছে স্যার আপনাদের মাঝে??

—- সব বলব । আগে তুমি চিটাগং আসো।

— জি স্যার আমি রওনা হচ্ছি।

খান বাড়িতে…..

—- গতকাল বিয়ে হলো আর আজ সকালে কি শুনছি! আমার বোন তোমাদের বাড়ির সামনে এত হাই-সিকিউরিটির মাঝে বের হলো কি করে?

— আমার স্ত্রী খেয়া তাই ও যেরকম আদেশ করেছে সিকিউরিটি গার্ড সেভাবে পালন করেছে। খেয়া ভোরবেলায় বেরিয়ে এসেছে। যদিও এই ব্যাপারটা আমি এই বাড়িতে আসার পর শুনলাম। একটু আগেই মিজান আমাকে জানিয়েছে। খেয়াকে ডাক দিন। মা অপেক্ষা করছে ওর জন্য। একটু পরেই হয়ত বাড়িতে পুরো ফ্যামিলি চলে আসবে খেয়াকে দেখতে।

— কিন্তু, খেয়া তো এখানে আসেনি?

— মিথ্যা বলবেন না ভাইয়া। খেয়া আপনাদের কাছেই আসবে। ওর তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই।

ফায়েজ এবার ভয় পেতে লাগলো। খেয়া কি তবে সত্যিই কোথাও হারিয়ে গেছে!

— আমি তোমাকে বলেছিলাম,, খেয়া অন্যায় জিনিসটা পছন্দ করে না। হয়তো,, ব্যাপারটা মানতে পারছে না তাই বেরিয়ে গেছে। তাছাড়া ফায়েজকে ভালো…

— ফর গড সেইক ভাইয়া। এসব ননসেন্স কথাবার্তা বন্ধ করুন। ফায়েজ আমার বোনের হাজবেন্ড। খুশবুর স্বামী। পৃথিবীর কোনো ভাই চাইবে না তার বোনের সংসার ভেঙে যাক। আমিও চাইনি। তাই তো আপনার সাথে ডিল হলো আমার। আপনার দরকার ছিল ক্ষমতা আর আমার খেয়াকে। আর আপনি কেমন ভাই একটা বিবাহিত ছেলের কাছ থেকে আপনার বোনের পাওয়া ভালোবাসার গল্প ইনিয়েবিনিয়ে বলছেন তাও আবার কাকে আমাকে!! হেটস অফ ম্যান। প্রশংসা না করে থাকতে পারছি না আপনার! পারলে খেয়াকে খুঁজতে হেল্প করুন নয়তো মুখ বন্ধ রাখুন৷ ফায়েজ-খেয়ার চ্যাপ্টার গতকাল ক্লোজ হয়ে গেছে।

কথাগুলো বলে নির্বাণ বেরিয়ে যাচ্ছে এই বাড়ি থেকে। খেয়াকে খুঁজতে হবে। কে কি বললো তাতে নির্বাণের কিছু যায় আসে না। খেয়া এখন নির্বাণের স্ত্রী এটাই চিরন্তন সত্য

*****************

— হ্যালো…

— খেয়া????

খেয়া চুপ করে রইলো। ফায়েজের কন্ঠস্বর পেয়ে তৃষ্ণার্ত হৃদয় একটুখানি শীতক অনুভব করলো বলে। চোখ বন্ধ করে জানালার কাচে মাথা ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইলো অদূরে।

— রাগ করে বাড়ি ছেড়ে দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান হবে?

— কারো বৌ হয়েছি বলেই যে সেই বাড়ি আমার একমাত্র ঠিকানা এটা আপনাকে কে বললো???

— নিজের বাড়িতেও তো নেই তুমি। আছো কোথায়? আমাকে বলো? আমি নিতে আসব তোমাকে।

— আপনি কেন নিতে আসবেন আমাকে?

— কারণ,, আমি তোমাকে ভালোবাসি খেয়া।

ফায়েজের কন্ঠস্বর কাঁপছে। ভালোবাসা পেয়ে এভাবে হারিয়ে যাবে কোনোদিনও ভাবেনি। খেয়া তার ভাগ্য যদি নাই ছিল তবে ওর জন্য হৃদয়ে এত ভালোবাসা কেন দিয়েছে ওপর ওয়ালা ?? খেয়াকে ছাড়া নিজেকে কল্পনা কেন করতে পারছে না। খেয়াকে ছাড়া ফায়েজ বাকি জীবন কাটাবে কি করে?

—- তুমি চলে এসো আমার কাছে। আমরা দূরে কোথাও চলে যাব৷ যেখানে নির্বাণ নামের কেউ আমাদের ছুঁতে পারবে না। ফিরে এসো খেয়া।

খেয়া কল কেটে দেয়। ফায়েজ মোবাইলটা বালিশের পাশে রাখতেই দেখলো খুশবু ওর দিকে তাকিয়ে আছে। খেয়ার সাথে কথা বলার সময় খুশবু শুনে ফেলেনি তো??? ফায়েজ আজ ভয় পাচ্ছে না। আজই খুশবুকে খেয়ার কথা জানিয়ে দেবে। ভালোবাসাহীন সম্পর্ক রাখার কোনো মানেই হয় না। ফায়েজ কেবল খেয়ার। খুশবুকে কোনোদিন স্ত্রী মর্যাদা দেয়নি আজও দিবে না। কারণ, ফায়েজ খেয়াকে ভালোবাসে। এটাই ফায়েজের মনের কথা এবং চিরন্তন সত্য।

খুশবু তড়িঘড়ি করে বাড়ি থেকে হসপিটালে আসে। আসার সময় টিফিনবক্সে করে ফায়েজের জন্য খাবার নিয়ে আসে। কেবিন ঢুকার পর নির্বাণকে জায়গায় মন্টুকে দেখে খুশবু কিছুই বললো না। টিফিন বক্স এক সাইডে রেখে মন্টুকে ধন্যবাদ জানায় এতক্ষণ অব্দি ফায়েজের সঙ্গে থাকার জন্য। মন্টু ইট’স ওকে বলে খুশবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে যায় হসপিটাল থেকে।

মন্টু চলে যাওয়ার পর খুশবু ওর মাথার কাপড় ফেলে ফায়েজের বেডের পাশে গিয়ে বসলো। ফায়েজ খুশবুর দিকে তাকিয়ে বললো,,

— দেশে আসবি বললি না কেন আমায়??

— সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম সবাইকে। উল্টো আমি দেশে আসার পর সারপ্রাইজ পেয়ে বসে আছি।

খুশবুর কথার প্রতিউত্তরে ফায়েজ চুপ হয়ে আছে। খুশবু ফায়েজের হাতের ওপর হাত রেখে বললো,,,

— খুশি হওনি আমাকে দেখে??

— হুম।

— শুধুই হুম! আর কিছু বলবে না।

ফায়েজ জানে খুশবু আর দশটা স্ত্রীর মতো স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা পেতে চায়,, খুনসুটিতে মেতে থাকতে চায়। কিন্তু,, ফায়েজের তো এসবে মন নেই।

ফায়েজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। খুশবুর হাত সরিয়ে দেয়। খুশবু অবাক হয় না ফায়েজের কান্ডে। বরং ফায়েজ যদি নিজ থেকে ওর হাত ধরত তবেই অবাক হতো। ফায়েজ জানালার ওপর দৃষ্টি রেখে বললো,,,

— আর কত অপেক্ষা করবি???

— অপেক্ষা করছি কোথায়? আশা ছেড়ে দিয়েছি। বাকিটা যা হবার হবে। ওপর ওয়ালার মর্জি।

— তুই আমার থেকে ভালো কাউকে ডির্জাভ করিস খুশবু??

ফায়েজের কথায় খুশবু থমকে যায়। মাথা উঁচু করে তাকায় ফায়েজের মুখের দিকে। ফায়েজের চোখের গভীরে পৌঁছেতে চায়, গভীরে পৌঁছেতে পারে না। ফায়েজ খুশবুর চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বলছে,,,

— পরিবারের সবার চাপিয়ে দেয়া একটা সম্পর্ককে বোকার মতো ক্যারি করছি আমরা। আমাদেরও পছন্দ থাকতে পারে,, আই মিন তোরও তো পছন্দ থাকতে পারে?

— আমার পছন্দ তো কেবল তুমি ছিলে? কিন্তু,, তুমি…

মনে মনে কথাগুলো বলে খুশবু। প্রকাশ করে না। ফায়েজের গা মুছে দেয়ার জন্য রুমাল নিয়ে এগুতেই ফায়েজ বাঁধা দেয়।

— তোর এসব করা লাগবে না।

— আমি না করলে কি নার্স করিয়ে দেবে? আমি তোমার স্ত্রী এই বাক্যটা তোমার মনে থাকবে কবে?

— কারণ,, আমি যে অন্য কাউকে ভালোবাসি। তাকে আমার বৌ বানাতে চাই খুশবু। তোকে আমি কোনোদিন স্ত্রী হিসেবে মানিনি । তুই তো আমার কাছে সেই ছোট্ট খুশবু । যার বায়না ছিল, ফায়েজ ভাইয়ের কাছে জিলাপি চাওয়া।

খুশবু স্তব্ধ হয়ে গেছে। স্বামীর মুখ থেকে অন্যকোনো নারীর কথা শুনতে পারে না সেখানে ভালোবাসে শব্দটা কেমন লাগে শুনতে? খুশবু ঢোক গিলে। কষ্টগুলো বুকের নীচে নামিয়ে রাখার জন্য বহুকষ্টে ঢোক গিলে ফেলে।

— দুই বছর ধরে তাকে ভালোবাসো তুমি। আমি সব জানি। শুধু তোমার সামনে এলে না জানার ভান করতাম। যাতে কোনোদিনও তোমার মুখ থেকে আমাকে শুনতে না হয় তুমি আমাকে নও অন্যকাউকে ভালোবাসো। কিন্তু,, তুমি আজ বলেই দিলে!

খুশবু কাদঁতে গিয়েও কাঁদে না। চোখের জল তো কবে শুকিয়ে গেছে যেদিন ও প্রথম ফায়েজের মোবাইলে “My Queen” দিয়ে নাম্বার সেভ করা দেখেছিল। একবারও ফায়েজকে জিজ্ঞেস করেনি কে এই মেয়ে? অপেক্ষা করত কোনো একদিন ফায়েজ ফিরে আসবে তার কাছে। নানুর কাছে শুনেছে বিয়ে নামক সম্পর্ক নাকি ভীষণ পাওয়ারফুল। বিয়ে নামক শক্তির জোড়েই কোনো একদিন ফায়েজ তার কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু,, খুশবু ভুল জানত। বিয়ের সম্পর্কের এতটা শক্তি নেই যে কাউকে বেঁধে রাখবে। বেঁধে রাখার মতো শক্তি থাকলে পুরো বিশ্বে এত ডির্ভোস রোজ কেন হয়?

ফায়েজ বিস্মিত হয়ে গিয়েছে। তারমানে খুশবু সব জানে! কার কাছ থেকে জেনেছে? কই এতদিন কিছু জানতে চাইলো না যে?

******************

—সম্পর্ক থেকে পালিয়ে এসেছিস বলেই কি সম্পর্ক থাকবে না? বরং আরও চেপে বসবে তাও তোর মন – মস্তিষ্কে।

— কি করব আমি? বিয়েটাকে মেনে নেব! যাকে ভালোবাসি না,, যে কিনা একপ্রকার জোর করে আমাকে বিয়ের জন্য বাধ্য করেছে তার সঙ্গে আর যাই হোক বিয়ের মতো একটা সেনসিটিভ রিলেশনশিপ ক্যারি করা সম্ভব না।

— ডির্ভোস দিবি???

— সম্ভব না। আমাদের বিয়েতে তালাক দেয়ার সুযোগ আমার নেই। যদি নির্বাণ কখনো চায় তবেই সম্ভব।

খেয়ার কথা শুনে রাইসা ঠোঁট চেপে কিছু একটা ভাবলো। তারপর,, খেয়ার হাতের ওপর হাত রেখে বললো,,,

— দোস্ত আমার কাছে একটা আইডিয়া আছে। যদি তুই অনুমতি দিস তবেই বলব। এন্ড প্রমিস করতে হবে যদি আইডিয়া তোর পছন্দ না হয় আমাকে বকতে পারবি না।

খেয়া কফির মগে চুমুক দিয়ে মাথা নাড়িয়ে বোঝালো,, বকবে না। রাইসা খুশি হয়ে খেয়ার পাশে গিয়ে বসলো,, তারপর,, আশেপাশে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,,

— যেহেতু নির্বাণের কাছে তালাক দেয়ার পাওয়ার আছে তাহলে খেলাটা ওকে দিয়ে শেষ করলে কেমন হয়??

রাইসা ভ্রু নাচিয়ে কথাটি শেষ করলো। খেয়া বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো,,

— কি বলতে চাইছিস তুই??

— আমি এটাই বলতে চাইছি তুই নির্বাণকে ডির্ভোস দিতে পারবি না বাট নির্বাণ তো তোকে ডির্ভোস দিতে পারবে। তাহলে তোকে এমন কোনো কাজ করতে হবে যার কারণে নির্বাণ তোর ওপর ক্ষেপে গিয়ে তোকে ডির্ভোস দিবে। আইডিয়াটা কেমন??.

— একেবারে থার্ডক্লাস। তোর মাথায় এত লেইম আইডিয়া আসে কোত্থেকে!!

খেয়া বিরক্তিকর সুরে কথাটি বললো। রাইসা মন খারাপ করে ফেললো ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে বললো,,

— তুই কিন্তু বলেছিলি আইডিয়া পছন্দ না হলে বকা দিবি না কিন্তু তুই….

— তুই এতটা জঘন্য আইডিয়া দিবি সেটা তো জানতাম না।

— হোস্টেলে থাকবি??

রাইসা উত্তরের আশায় খেয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। খেয়া আনমনে বলে,,

— এতদিন ভেবে আসা নিজের বাড়িটা কেন যেন ভীষণ পর মনে হয়! মা মরে যাওয়ার পর এতটাও একা লাগেনি যতটা বাবা মরে যাওয়ার পর মনে হয়। বাবা মরে যাওয়ার পর ভাই,,ভাইয়ের বউদের সামনে নিজেকে তুচ্ছ কীট মনে হতো। কারণ,, তাদের কাছে আমি বোঝা ছাড়া আর কিছুই না। বড়ো ভাইয়ের বাসায় গেলে বড়ো ভাবি আগেই প্রশ্ন কতদিন থাকবি?? মেজ ভাইয়ের বাসায় গেলে মেজো ভাবির মুখের দিকে তাকানো যায় না। বাকিগুলো তো বিদেশ গিয়ে সেটেল্ড। শুধু সরফরাজ ভাই আছে একজন। একটুও বদলায়নি। বাড়িতে দু’জন ভাইবোন মিলে থাকতাম, ভাইয়া বাজার নিয়ে আসতো আমি রান্না করতাম দিনগুলো বেচ কাটছিল। কিন্তু,, নির্বাণ এসে কেমন উলোটপালোট করে দিয়ে গেলো। আমি নেই ভাইয়েরা এখন স্বস্তিতে আছে রে। আমার শূন্যতা কাউকে পুড়াবে না রে।

খেয়ার চোখ ভরে আসে জলে। রাইসা খেয়ার হাতের ওপর হাত রাখে। রাইসার ভাবতে কষ্ট হচ্ছে খেয়ার মত সুখী একটা মেয়ে আজ বাবা-মাকে হারিয়ে নিঃস্ব। ভাই গুলো যার যার মতো আছে।

ক্যান্টিনে বসে আছে দুই বান্ধবী। সময় তখন আনুমানিক দুপুর বারোটা। খেয়ার মনে কেবলই হাহাকার চলছে সেসময় ।

ভোর বেলা যখন বাড়ির মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল ঠিক তখনি খেয়া বের হয়ে যায়। যদিও নির্বাণের বুকের বন্ধন থেকে বের হতে বেগ পোহাতে হয়েছে খেয়াকে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা সিএনজি নিয়ে অক্সিজেন মোড়ের উদ্দেশ্য রওনা হয়। অতঃপর সকাল আটটার দিকে রাইসার বাড়িতে যায় খেয়া । রাইসা এত সকালে খেয়াকে দেখে বিস্মিত হয়ে যায়। তবুও,, জানতে চায়নি। কারণ,, রাইসা জানে সময়মতো খেয়া ওকে সব বলবে। খেয়ার কথা জমা রাখার ব্যাংক হচ্ছে রাইসা। রাইসার কাছ থেকে থ্রী-পিছ নিয়ে রুমে ঢুকে সর্বপ্রথম গোসল করে। খেয়া ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ভেজা চুলগুলো খোপায় আটকে রাখে। তারপর,, রাইসাকে নিয়ে সোজা চলে যায় হোস্টেলে। এতক্ষণ অব্দি একবারও রাইসা কোনো টু শব্দ অব্দি করেনি। এগারোটার দিকে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনের ভেতরে গিয়ে সেই যে বসেছে এখন প্রায় দুপুর বারোটা।নির্বাণের সঙ্গে তার বিয়ে কি করে হলো? সবটাই রাইসাকে বলেছে।

সবটা জানার পর রাইসা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। ফায়েজ-খেয়া যে একে অপরকে কতটা
ভালোবাসত সেটা রাইসা কেবল দেখেছে। হুট করে নির্বাণ নামক ঝড় এসে এভাবে ওদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে গেছে!

— চল রুমে ফিরে যাই। কতক্ষণ ক্যান্টিনে বসে থাকব?

— তুই চলে যা রাইসা। আমি পরে আসব।

— কিন্তু???

— তুই যা রাইসা। আন্টির কাছে কল দিয়ে বল,, তুই ভালোভাবে পৌঁছে গেছিস। আন্টি তোর জন্য টেনশন করছে হয়তো। আমার তো কেউ নেই রে যে টেনশন করবে।

শেষের বাক্যটি বলার সময় খেয়ার কন্ঠস্বর কাঁপছে। রাইসা খেয়ার কাঁধে কিছু সময়ের জন্য হাত রেখে ফিরে যায়।

রাইসা চলে যাওয়ার পর খেয়া ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ভার্সিটি প্রান্তরে এসে মাঠের একপাশে গিয়ে ঘাসের উপর বসলো। মাথার উপর তখন তপ্ত রোদ। মাঝেমধ্যে হাওয়া এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রকৃতিকে। খেয়া নিজের মাঝে নেই। ফায়েজের কাছে মন পরে আছে। মন বলছে একবার কল করে ফায়েজের খবর নিতে কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয় থাক কি দরকার??? খেয়া নিজেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসেছে। নতুন করে সম্পর্ক পাতানোর মতো দুঃসাহস দেখানো মানেই হলো ফায়েজকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা।

মাঠের মধ্যে দুটো ছেলে বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে যায়। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে গিয়ে নীল রঙের টিশার্ট পরা ছেলেটা ধূসর রঙের পাঞ্জাবি পরা ছেলেটাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। ফলাফল হিসেবে পুরো ভার্সিটিতে গন্ডগোল লেগে যায়। কিছু সময়ের মধ্যে জানাজানি হলো কেএন গ্রুপের ছেলেকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। ব্যস,, দাঙ্গা সংঘটিত হলো ভার্সিটিতে। ক্লাস বন্ধ,, হল ছাড়ার নির্দেশ এলো।

খেয়া তখনও জানতো না এতকিছু ঘটে গেছে। খেয়ার ভ্রম কাটলো যখন দেখলো ওর সামনে দুটো গ্রুপের মারামারির দৃশ্য দেখে। আকস্মিক ঘটনায় খেয়া বোধ-চেতনা হারিয়ে দিক-বেদিক শূন্য হয়ে যায়। খেয়া মাথায় ওড়না জড়িয়ে মাঠ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে এবং সফল হয়। কিন্তু,, মাঠের দক্ষিণের দিকে যাওয়ার পর কেউ খেয়াকে দেখিয়ে বললো,,

— আজকে পাইছি শা**লিকে। নির্বাণের প্রাণপাখিকে ধর। আপনাআপনি বাকিসব আমাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।

কথাটি বলে খেয়ার মাথায় কাঠ দিয়ে আঘাত করে। আঘাত পেয়ে খেয়া সেখানে অচেতন হয়ে পরে থাকে।

নির্বাণ তখন রাইসার বাড়ির সামনে। দারোয়ানকে খেয়ার ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো এখানে ওকে দেখেছে কিনা? দারোয়ান একবার ছবিটা দেখেই নির্বাণকে বললো যে,, আজ সকালে দেখেছে। কিন্তু,, রাইসা মামনির সঙ্গে কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে!

নির্বাণ মোবাইলটা পকেটে রেখে থুতনিতে হাত রেখে ভাবছিল কোথায় যেতে পারে ওরা? এমনসময় নির্বাণের মনে এলো ওরা হোস্টেলে ফিরে যায়নি তো? যেই ভাবা সেই কাজ নির্বাণ ওর গাড়িতে বসে রওনা হওয়ার জন্য।

সেসময় দারোয়ান গাড়ির সামনে এগিয়ে এসে নির্বাণকে জিজ্ঞেস করলো,,

— খেয়া মামনি আপনার কি হয়???

দারোয়ানের প্রশ্নের জবাব নির্বাণ স্মিত হেসে দেয়,,

— আমার বাকি জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী। আমার স্ত্রী,, আমার প্রিয়তমা।

নির্বাণের উত্তর শুনে দারোয়ান বোধহয় হজম করতে পারেনি। তাই তো আবারও প্রশ্ন করলো,,

— স্ত্রী হলে খুঁজছেন ক্যান? সে তো এমনিতেই আপনের কাছে ফিরা যাইব।

নির্বাণ জবাব দেয় না “চলি” শব্দটা বলেই গাড়ি চালিয়ে চলে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যে।

দারোয়ান তো জানে না নির্বাণ আর খেয়ার মাঝে আর দশটা স্বামী-স্ত্রীর মতে স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই যে খেয়া ওর কাছে ফিরে আসবে।

তাই নির্বাণ জবাব দেয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি। তাই তে রওনা হয়েছে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে কারণ দেরি করা যাবে না খেয়াকে নিয়ে বাড়িতে ফিরতে হবে। । ভাবতেই নির্বাণের অবাক লাগছে,, কতটা শান্তিতে ঘুমিয়ে ছিল নির্বাণ যে ওর পাশে থাকা আস্ত একটা মানুষ ওকে ঘুমের ঘোরে রেখে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে অথচ ও একবারও টের পায়নি।
তাছাড়া,, খেয়াকে বারো ঘন্টা,, তেরো মিনিট,, আট সেকেন্ড ধরে দেখছে না। সেই যে ঘুমানোর আগে দেখেছে। নির্বাণের স্ত্রী হবার আগেই খেয়াকে একদিন না দেখে থাকতে পারত না। সেই খেয়া তো আজ নির্বাণের স্ত্রী। তাহলে আজ এতগুলো ঘন্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর নির্বাণের কেমন অনুভূত হচ্ছে খেয়াকে না দেখে!

অসমাপ্ত……..

শেষ পাতায় এসে যখন দেখলো কোনো সমাপ্তি নেই ; একটি অসমাপ্ত গল্প ঠিক তখনি ফায়েজ ফাইলটা বন্ধ করলো। ফায়েজের হাসফাস লাগছে। এখানেই এসে কেন গল্পটা থেমে গেছে? মেজাজ খারাপ হচ্ছে। রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ফায়েজ ফাইল খুলে দেখলো,, বড় বড় দুটো শব্দ জ্বলজ্বল করছে। গল্পের নাম হয়তো “তুমি আমি”।

দ্বিতীয় পাতায় উৎসর্গ পত্র…

“কি ভালোবাসা শিখালি আমায়!! এখন তো ভালোবাসা হারাতে ভয় হয়। তোর মতো এত যত্ন নিয়ে কে ভালোবাসবে আমায়?? এই যে আমাকে পৃথিবীর এত সুন্দর একটা অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলি তার জন্য আমার লেখা গল্প তোর নামে উৎসর্গ করলাম। বইপড়ুয়া সকলেই জানুক আমি তোকে কত ভালোবাসি!!”

ফায়েজ ঘামছে। কার লেখা হতে পারে?? ভাবতে ভাবতে ফায়েজ চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। অথচ পানি খাওয়ার দরকার। কিন্তু,, হেঁটে যাওয়ার শক্তি পায়ে নেই।

ফায়েজের ঘরের দক্ষিণের দেয়ালে বিশাল ঘড়ি টানিয়ে রাখা আছে। সেই ঘড়ির ডং ডং শব্দ শুনে ফায়েজ অবাক হয়ে তাকালো ঘড়ির দিকে। রাত তিনটা বাজছে। ফায়েজ যখন ফাইল হাতে নিয়েছিল তখন প্রায় দশটা বাজছিল। কে এবং কখন তাদের নিয়ে গল্প লিখেছিল?? গল্পের কিছু চরিত্র বাস্তবে আছে। বাকিগুলো হয়তো কল্পনা করেই লিখেছে । ঘটনা কাল্পনিক। কার লেখা এটা? ফায়েজদের পরিচিত কেউ? নয়ত নির্বাণ, খেয়া , খুশবু এবং ফায়েজ নিয়ে গল্প লেখার সাহস হবে কার? তাদের নিয়ে কেন গল্প লিখবে?

এই “কেন” শব্দের উত্তর কার কাছে মিলবে? শারমিন দিতে পারবে ? নাকি খেয়া গল্প লিখেছে? কারণ খেয়া গল্প লিখে। যদি খেয়া লিখে থাকে কেন লিখবে? খুশবু যে ফায়েজকে পছন্দ করত খেয়া জানার কথা না। তাছাড়া নির্বাণের সঙ্গে ফায়েজের কি সম্পর্ক তা খেয়ার জানার কথা না। ফায়েজ অস্থিরতা অনুভব করছে। শান্তি লাগছে না এখন যদি গভীর রাত না হয়ে সকাল হতো তাহলে ফায়েজ এখনি শারমিনের সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে যেত।

অবশিষ্ট রাতে ঘুম হলো না ফায়েজের। অস্থিরতা কমাতে পায়চারি করছিল নিজের ঘরেই। না শান্তি লাগছে না তাই ফায়েজ বারান্দায় চলে যায়। হয়তো প্রকৃতির মাঝে থাকলে অস্থিরতা কিছুটা হলেও কমবে। তখন ভোর পাঁচটা। ফায়েজ বারান্দায় যেতেই সর্বপ্রথম চোখ গেলো রাস্তার দিকে যেখানে বড়ো বড়ো দুটো বাস দাঁড়িয়ে আছে। দুটো বাসে কিছু কিছু মানুষ বাসে উঠছে। ফায়েজ ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইলো। হুট করে মনে পরলো আজ বুধবার। আজ ওদের বিল্ডিংয়ের প্রত্যেকটি মানুষ কক্সবাজার যাবে। কক্সবাজার যাওয়ার প্ল্যানিং ছিল তার নিজের করা।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ফায়েজ “ওহ শিট” বলে নিজের ঘরের ভেতরে চলে যায়। ঘরে ঢুকে সর্বপ্রথম গোসল সাড়ে। তারপর,, ছাইরঙা কালো চেক শার্ট,, কালো রঙের জিন্স,, কড়া পারফিউম লাগিয়ে। চোখে সানগ্লাস,, হাতে ওয়াচ পরে নিলো। মোবাইল এবং হাজারখানেক ক্যাশ পকেটে ঢুকিয়ে ফ্ল্যাটে তালা ঝুলিয়ে বের হয়ে এলো ফায়েজ।

লিফটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা। হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো সকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। লিফটের দরজা খুলতেই ফায়েজ ভেতরে ঢুকে তিন নাম্বার সুইচে প্রেস করলো। এমন সময় সাততলায় থাকায় মি.হাসানের পরিবারের চারজন মেম্বার এসে ঢুকলো লিফটে। ফায়েজ পেছনের দিকে সরে দাঁড়িয়ে আছে। ফায়েজ নীচের দিকে তাকিয়ে ছিল ঠিক সে-সময় একজন মেয়েলি সুরে ফায়েজকে সালাম দিলো। সালাম শুনে ফায়েজ ওপরে তাকিয়ে দেখলো মি. হাসানের মেয়ে সায়মা ওর দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। সায়মার দিকে একবার তাকিয়ে আবারও চোখ নামিয়ে ফেললো। তিনতলায় এসে লিফটের দরজা খুলতেই ফায়েজ বের হয়ে এলো।

সায়মা মন খারাপ হয়ে যায়। মানুষটা এত পাষাণ কেন?? এই যে সায়মা আজ নীল রঙের শাড়িতে তাকে দেখতে কত সুন্দর লাগছে সেটাও কি উনার চোখে পরছে না? ভার্সিটির কত ছেলের ক্রাশ সায়মা কিনা একজনের ওপর ক্রাশ খেয়ে থমকে গিয়েছে। না সামনে এগোতে পারছে না পেছনে ফিরে যেতে পারছে। কিছু অনূভুতি কেন মানুষকে এতটা অসহায়,, বেহায়া বানিয়ে দেয়!!

খেয়া সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। ব্রাশ করা হয়নি। ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে রুম থেকে বের হয়ে ড্রইংরুমে এসে আবারও সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে৷ এদিকে নিউমার্কেট থেকে আনা শাড়ি পরে রুমানা ড্রইংরুমে এসে দেখলো,, খেয়া ঘুমিয়ে আছে৷ রুমানা রেগে গিয়ে খেয়ার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলছেন,,

— এই মেয়ে আর কতক্ষণ ঘুমাবি?? ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন কে রাত বানিয়ে ফেলছিস। ওঠ রেডি হ।

খেয়া নিভু নিভু চোখে ওর ফুপির দিকে তাকিয়ে আছে,, ফুপি সকাল সকাল পাগল হয়ে গেলো নাকি। এত ভোর বেলায় কোথায় যাবে?? খেয়া সোফার কুশন একটা বুকের মাঝে চেপে ধরে ডানকাত হয়ে ওর ফুপিকে বললো,,,

— যেখানে যেতে মন চায় যাও। আমাকে নিয়ে একদমই টানাটানি করবে না। রাতে ঘুমাতে পারিনি এখন যদি ঘুমাতে না পারি শরীর চলবে না।

রুমানা পাল্টা কিছু বলতে যাবে ঠিক সে-সময় কলিংবেল বেজে উঠল। রুমানা দরজা খুলতে চলে গেলেন। দরজা খুলতেই ফায়েজকে দেখে রুমানা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলো,,

— কেমন আছো??

— এই তো আন্টি ভালো আছি। আপনারা সবাই রেডি তো??

ফায়েজ আড়চোখে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো খেয়াকে দেখা যায় কিনা? কিন্তু,, মহারানী যে সোফায় ঘুমিয়ে আছে সে সোফার পেছন দিক দেখা যায় দরজা থেকে।

— আমি তো তৈরি হয়ে বসে আছি কিন্তু খেয়া এখনো ঘুমিয়ে আছে।

— ঘুমিয়ে আছে মানে? আপনি ওকে পিকনিকে যাওয়ার কথা বলেননি??

— আসলে হয়েছে কি গতকাল খেয়ার সঙ্গে একজন এসেছিল তাকে নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে,, রাতে উনি চলে যাওয়ার পর খেয়াকে বলতে মনে ছিল না।

ফায়েজ কিছু না ভেবেই ঘরের ভেতরে যাওয়ার জন্য রুমানার কাছে পারমিশন চাইল। রুমানা দরজা ছেড়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইলো। এমন সময় সামনের ফ্ল্যাটে থাকা মিসেস, নিতা রুমানাকে ডাক দিলেন। রুমানা আপাতত সেদিকেই গেলেন।

ফায়েজ ড্রইংরুমে এসে দেখলো খেয়া শুয়ে আছে তাও অঘোরে। ফায়েজ থমকে যায়। ঘুমন্ত খেয়াকে কখনো দেখার সুযোগ হয়নি। ধীরে ধীরে খেয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর হাঁটু গেড়ে বসলো মেঝেতে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে খেয়া। একজন তৃষ্ণার্ত প্রেমিক তার চোখের তৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত। সাদা রঙের কূর্তি পরা ঘুমন্ত খেয়াকে দেখে হৃদয় আবারও প্রেমে পরলো। খেয়াকে দেখলে রোজ রোজ নতুন করে প্রেমে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। কপাল জুড়ে লেপ্টে থাকা চুলগুলো ভীষণ বিরক্ত করছে খেয়াকে। ফায়েজ সেই দৃশ্য দেখছিল মন ভরে। খেয়ার বিরক্তিমাখা মুখ দেখলেও প্রশান্তি পায় সে।

খেয়া ঘুমের ঘোরে কপালের চুলগুলো সরাতে গিয়ে মিটমিট করে তাকিয়ে ছিল। সেই এক পলকের চাহনিতে ফায়েজের আদলটাই চোখে দেখেছে। ব্যস,, অমনি তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বসলো খেয়া।

হুট করে খেয়াকে ঘুম থেকে উঠতে দেখে ফায়েজ চট করে দাঁড়িয়ে যায়। এমন একটা ভাব করলো যেন সে এইমাত্র এসেছে।

খেয়া সোফা থেকে নেমে ফায়েজের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে যাবে তারআগে ফায়েজ ওকে থামিয়ে দেয়।

— বাকি কথা পরেও বলা যাবে। কাইন্ডলি,, তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি আছি যতক্ষণ ইচ্ছে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে।

খেয়া ভাবলো আসলেই তো এভাবে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ না হয়ে কারো সাথে কথা বলা সমীচীন নয়। খেয়া ওয়াশরুমে চলে যায়। ফায়েজ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে কখন খেয়া আসবে??

মিনিট দশেক পর খেয়া ফিরে এলো। এসেই ফায়েজকে সর্বপ্রথম যা বললো,,

— সকাল সকাল আমাদের বাসায় কি করছেন আপনি??

— তুমি শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলে এদিকে আমার শান্তি লাগছিল না তাই তোমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে এসেছিলাম। কিন্তু,, আমার কষ্ট করতে হয়নি উল্টো তুমি উঠে গেছো। এখন শোনো জলদি তৈরি হয়ে নাও অলরেডি আধঘন্টা লেইট করেছি।

খেয়া কিছু বুঝেনি তাই ফায়েজকে বললো,, মানে??

— মানে হলো তুমি,, আমি,, মানে আমরা সবাই কক্সবাজার যাচ্ছি।

— কিহ্….

খেয়ার মৃদু চিৎকার শুনে ফায়েজ কানে হাত দিয়ে বিরক্তিকর সুরে বললো,,

— এই তোমাকে কি আমি ডাকাতি করার জন্য অফার করেছি?? এভাবে চিৎকার করছো কেন??

— ডাকাতি করার জন্য অফার করলেও এতটা প্যানিক হতো না যতটা কক্সবাজার যেতে হবে শুনে হচ্ছে। আমি যাব না কতবার বলব আপনাকে? ফুপি যাবে না তারমানে আমিও যাব না। আমার ফুপি কোথাও যায় না। আর আমি কিনা ফুপিকে রেখে কক্সবাজার যাব! নো ওয়ে। আপনি যান আপনার ভাড়াটিয়াদের নিয়ে।

কথাগুলো বলে নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল খেয়া। ফায়েজের কথা শুনে খেয়া থমকে দাঁড়ালো। তারপর,, আবারও ফিরে এসে ফায়েজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললো,,,

— যদি তোমার ফুপি যেতে রাজি হয়?

— তাহলে আমিও যাব।

— দ্যান তুমি রেডি হয়ে নীচে এসো। কারণ,, তোমার ফুপি অলরেডি শাড়ি পরে তৈরি হয়ে নীচে চলে গেছেন।

হাত ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে কথাটি বলে ফায়েজ। এদিকে ফায়েজের কথা শুনে খেয়ার মুখ হা হয়ে গেছে। মানে?? ওর ঘরকুনো স্বভাবের ফুপি আজ বাইরের জগত দেখার জন্য ঘর ছেড়ে বের হয়েছে!! এই জন্যই কি ভোরবেলা থেকে খেয়াকে বারবার ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল??

— কি হলো যাও?? নাকি কোনো অন্য কোনো ফন্দি আঁটছো না যাওয়ার জন্য??

— আমি এক কথার মানুষ। যেহেতু বলেছিলাম ফুপি গেলে আমিও যাব তারমানে আমি যাব।

কথাগুলো বলে নিজের ঘরে চলে যায় খেয়া। ফায়েজ মুচকি হেসে আনমনে বলে উঠলো,,

— ফায়েজ আজকের দিনটা শুধুমাত্র তোর। কথার প্যাঁচে ফেলে কি করে খেয়াকে রাজি করিয়ে ফেললি?? বাহ্ নিজের ওপর নিজের প্রাউড ফিল হচ্ছে আমার।

ফায়েজ সোফায় বসে অপেক্ষা করছে। এমনসময় ফায়েজের মোবাইলে কল এলো। সুমন কল করেছে। ফায়েজ কল রিসিভ করলো।

— হ্যালো,, হ্যা সুমন বল?

— হ্যালো ভাই। পুরো বাস ফুল কিন্তু লিস্ট অনুযায়ী আরও দুজন মানুষ বাকি আছে। মানে হলো একজন আপনি। আর অন্যজন হলো তিনতলায় যে থাকে খেয়া নামের মেয়েটা । এখন কি করব আমি??

— তোরা রওনা দে। আমরা দুজন ম্যানেজ করে চলে আসব।

— সত্যি বলছেন তো ভাই??

— হ্যা ; হ্যা ; সত্যি বলছি। তুই জাস্ট লোকেশন পাঠিয়ে দে। আমরা আসছি।

— ঠিক আছে ভাই।

ফায়েজ কল কেটে মোবাইল প্যান্টের পকেটে রেখে ওঠে দাঁড়ায় ঠিক সেসময় একজন এলো যাকে দেখলে পুরো পৃথিবী থমকে যায় ফায়েজের চোখে।

কালো রঙের কূর্তি,, মাথায় সাদা রঙের হিজাবে বাঁধা ইরানি এক কন্যা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ফায়েজের সামনে এসে বিরক্তিকর সুরে বললো,,

— চলুন।।

— হুম??

— কানে শুনেন না? বলছি চলুন এবার.

ফায়েজ লজ্জিত ভঙ্গিতে মুখ নামিয়ে ঠোঁট একপেশে কামড় দিয়ে হেসে ফেললো৷ এই হাসি দেখলে বোধহয় খেয়া আরও তুলকালাম করতো । কেন ফায়েজ ওভাবে হাসলো? এসব বলে।

খেয়া ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে চাবি পার্সে রেখে হাঁটতে হাঁটতে লিফটের দিকে যাচ্ছে। খেয়ার পেছনে পেছনে ফায়েজ আসছে। লিফটের ভেতরে ঢুকলো দু’জনে । লিফটের দরজা বন্ধ হলো।

দেখলে মনে হবে দুজনের গন্তব্য আলাদা,, কেউ কাউকে চিনে না। কিন্তু,, ফায়েজের মনটা যদি কেউ পড়তে পারত তাহলে বুঝতে পারত ফায়েজের হৃদয় হারিয়ে যাচ্ছে খেয়াকে পাওয়ার আশায়। হারিয়ে যাওয়া হৃদয়ের বিজ্ঞপ্তি যে এবার করতেই হবে খেয়ার মনের অলিগলিতে। নয়তো,, হৃদয়কে সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিতে এবার বড্ড দেরি হয়ে যাবে।

লিফট থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে খেয়া রাস্তায় এসে দেখলো কোনো বাস নেই। বিস্মিত হয়ে খেয়া আনমনে বললো,,ওমা বাস কই?? বাস ছাড়া কক্সবাজার যাব কেমনে??

ঠিক সেসময় ফায়েজ ওর কার নিয়ে খেয়ার সামনে দাঁড় করিয়ে দরজা খুলে বের হয়ে বললো,,

— কক্সবাজার যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম হলো এই গাড়ি। বাস আমাদের রেখেই চলে গেছে।

— মানে …..

— আহ্ খেয়া এত জোরে চিৎকার করছো কোন?

— তো কি মনে মনে চিৎকার করব নাকি??

— না মনে মনে চিৎকার করবা ক্যান?? মাইক ভাড়া করে এনে দেই। পুরো ঢাকাবাসীকে সাক্ষী রেখে চিৎকার করো। বাসের সীট খালি ছিল না তাই বাস চলে গেছে। গাড়ি তো আছে নাকি!! গাড়ি দিয়ে কক্সবাজার যেতে পারব আমরা।

ফায়েজের কথা খেয়া শুনলো কিনা কে জানে! খেয়া আপনমনে বলেই যাচ্ছে,,

—দুই দুইটা বাস আমাদের না নিয়ে চলে গেলো!! দাঁড়ান ; দাঁড়ান ; একমিনিট আপনার কোনো প্ল্যান নেই তো আবার? নয়তো,, এমন কেয়ারলেস হবে না পিকনিক ম্যানেজমেন্টের লোকেরা। আর আমার ফুপি কি করলো আমাকে রেখে কক্সবাজার চলে যাচ্ছে!!

— তুমি যাবে কিনা সেটা আগে বলো?? নয়ত আমি একাই চলে যাব।

কথাটি বলে ফায়েজ ড্রাইভিং সীটে বসে পরলো। খেয়া কিছু একটা ভেবে কারে বসে দরজা বন্ধ করে সিটবেল্ট বেঁধে ফেললো। ফায়েজ খেয়ার দিকে তাকিয়ে আছে,, খেয়া সেই দৃষ্টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বললো,,

— আমি নিতান্ত ভালো মানুষ দেখে আপনার সঙ্গে যেতে রাজি হয়েছি। নয়তো আপনি যেই মানুষ না!! কখন কাকে ডাকাতের কাছে বেঁচে দেন আল্লাহ মালুম।

— স্টপ ইউর মাউথ খেয়া। অনেক উল্টাপাল্টা কথা বলছো তুমি।

— আরে রেগে যাচ্ছেন না কেন?? রেগে গেলে কার এক্সিডেন্ট হবে। সামনের দিকে তাকিয়ে কার ড্রাইভ করুন।

ফায়েজ আকাশসমান বিরক্তি নিয়ে কার ড্রাইভ করছে। পুরো পথ জুড়ে খেয়া ফায়েজকে বিরক্ত করতে করতে যাচ্ছে। দেখা যাক ফায়েজ কতক্ষণ অব্দি সহ্য করতে পারে??

চলমান……