Home "ধারাবাহিক গল্প হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৯

হৃদয় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্ব-০৯

0
83

#হৃদয়_হারানো_বিজ্ঞপ্তি
#পর্ব_৯
#Tahmina_Akhter

জনশীর্ণ পথ,, পথের দুই ধারে সাড়ি সাড়ি গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ফায়েজের গাড়ি। কুমিল্লা অব্দি দু’জন এই কথা সেই কথা বলতে বলতে পাড়ি দিয়েছে। গাড়ি যখন ক্যান্টনমেন্টে ঠিক তখনই খেয়া ঘুমিয়ে পরে। এরপর থেকে পুরো নির্জনতা জেঁকে বসেছে গাড়িতে । কিছুক্ষণ পরপর ফায়েজ ডাইভিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে খেয়ার দিকে তাকাচ্ছে।

খেয়াকে দেখলে ফায়েজের মাঝে মাঝে মনে হয় সে খুব সাধারণ একটি মেয়ে। কিন্তু,, মাঝে মাঝে যখন খেয়া ছাঁদে বসে আনমনে কিছু ভাবে তারপর বেখেয়ালি হয়ে যায় ঠিক তখনি ফায়েজের মনে হয় খেয়া রহস্যময় একটি নারী চরিত্র যাকে দেখতে সাধারণ মনে হয়। কিন্তু,, অন্তরালে সে কেবলই একজন রহস্যেময়ে ঘেরা একজন নারী চরিত্র।

তীব্র ঝাঁকুনি খেয়ে খেয়ার ঘুম ভাঙলো। চোখ মুখ কুঁচকে তাকালো বাইরের দিকে। দিনের আকাশ আজ ভীষণ পরিচ্ছন্ন। খেয়া ফিরে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। পেছনের সীটে তাকিয়ে দেখলো সেখানেও নেই। ফায়েজ গেলো কোথায়?? খেয়ার দুচোখ ব্যস্ত হয়ে পরলো ফায়েজের সন্ধান পাবার জন্য। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো জায়গাটা নিরিবিলি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি সুন্দর এরিয়া। খেয়া যতটুকু দেখতে পাচ্ছে ততটুকুতে যা বুঝতে পারলো জায়গাটা কোনো রিসোর্টের ভেতরকার দৃশ্য। খেয়ার বুক কেঁপে উঠল ভয়ে। ফায়েজের মনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই তো? পার্স থেকে মোবাইল বের করে সময় দেখে নিলো,, দুপুর বারোটা বাজছে। খেয়া মোবাইল হাতে রেখে স্তব্ধ হয়ে রইলো। ঠিক এই সময়ে ওদের কক্সবাজার থাকার কথা। খেয়া প্রাণপন চেষ্টা করছে গাড়ি থেকে বের হবার জন্য কিন্তু গাড়ি লক করা। খেয়া হাল ছেড়ে দেয়। সীটে গা এলিয়ে দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। গাড়িতে এসি চলছে তবুও দরদরিয়ে ঘেমে জবজব হয়ে যাচ্ছে খেয়া। কেন যেন মানুষটাকে কখনো সহজ ভাবে নিতে পারেনি। বিশেষ মনে হয়নি। তবুও মনের কোনো এক সুক্ষ্ম কোণে তার জন্য শ্রদ্ধা ছিল। যার কারণে তার সাথে কোথাও যেতে সংকোচবোধ হত না। কিন্তু,, সেই বিশ্বাস ভেঙেই দিলো আজ।

খেয়া ওর মোবাইল হাতে নিয়ে ওর ফুপির নাম্বারে কল দেয় কিন্তু রিসিভ করছে না। খেয়া কেঁদে উঠলো এতটা অসহায়বোধ বুঝি এর আগে কখনো হয়নি।

এমন সময় পুরো গাড়ি কেঁপে উঠল। খেয়া চমকে উঠে। পাশ ফিরে দেখলো ফায়েজ গাড়ির দরজা খুলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রাগ খেয়ার চেহারায় ফুটে উঠেছে। চোখদুটোতে জল হলেও,, চেহারায় কেমন কঠিনভাব! যেকোনো সময় ফায়েজের ওপর আক্রমন করতে পারে খেয়া।

—- কি হলো বসে আছো কেন??

ফায়েজের কথা শুনে খেয়া চোখমুখ শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,

— কেন আমি এখানে বসে থাকলে কি আপনার অসুবিধা হবে??

— খেয়া!! এতটাও রেগে যাওয়ার মতো কথা বলিনি। গাড়ি থেকে নামতে না চাইলে নেই। বসে থাকো এখানে। আমি চললাম।

ফায়েজ রাগ হচ্ছে। মেয়েটা এমন কেন? ঘাড়ের শিরা কি আসলেই ত্যারা নাকি?? ভাবতে ভাবতে ফের খেয়ার কাছে ফিরে এসে বললো,,

— আমার প্রচন্ড খিদা পেয়েছে। সকালে না খেয়ে বেরিয়েছি আর এখন বাজে দুপুর বারোটা বিশ মিনিট।

— আমাকে বোকা বানানোর সবরকম চেষ্টা চলছে ; তাই না? আমি গাড়ি থেকে বের হই আর আপনি আপনার স্বার্থ হাসিল করবেন।

খেয়া চিৎকার দিয়ে কথাগুলো বললো। ফায়েজের বিস্মিত হয়ে গিয়েছে খেয়ার কথা শুনে। কিসব বলছে?? আশেপাশের অনেকেই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। ফায়েজ সেইসব লোকের দৃষ্টি উপেক্ষা করে খেয়াকে বললো,,

— খেয়া প্লিজ সিনক্রিয়েট করো না। আমার ওপর রহম করো। শুধু ভাত খাব। তারপর রওনা হবো আমরা।

— ভাত খাবেন ভালো কথা। তাই বলে রির্সোটে আসতে হবে??

খেয়ার কথার আগামাথা বুঝতে পারছে না ফায়েজ। খেয়াকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগে কে যেন খেয়াকে ডাক দিলো,,

খেয়া গাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখলো,, ওর ফুপি রুমানা দাঁড়িয়ে আছে। খেয়া ভীষণ অবাক হলো ওর ফুপিকে দেখে। অবাকের রেশ কাটতে না কাটতে একটি বাস গেইট দিয়ে ঢুকলো। পিকনিকে যাওয়ার জন্য দুটো বাসের মধ্যে একটি বাস। খেয়া ডানদিকে তাকিয়ে দেখলো অন্য বাসটি দাঁড়িয়ে আছে। খেয়া মাথা চুলকিয়ে ভাবছে আসলে সে কি না কি ভেবে ফেলেছিল!! এত লজ্জা! এত লজ্জা! ছিহ্,, এসব মনে এলো কি করে??

কথাগুলো ভাবতো ভাবতে খেয়া ওর ফুপির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পেছনে পেছনে ফায়েজ আসছে।
রুমানার সঙ্গে কথা বলতে বলতে খেয়া জানতে পারলো যে পথে একটি বাসের টায়ার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল,, যেটা ঠিক করতে করতে প্রায় একঘন্টার মতো সময় লেগেছে।ততক্ষণে ফায়েজ গাড়ি নিয়ে বাস অব্দি চলে এসেছিল। এদিকে দুপুর হয়ে গেছে তাই বাধ্য হয়ে এই রির্সোটে আসা যাতে সবাই খাওয়াদাওয়া সারতে পারে।

খেয়া নিজের কর্মকান্ডে ভীষণ অনুতপ্ত হলো। আড়চোখে ফায়েজের দিকে তাকালো। দেখলো ফায়েজ সুমনের সঙ্গে কি নিয়ে কথা বলছে। খেয়া চোখ ফিরিয়ে নিলো। রুমানার সঙ্গে রিসোর্টের ভেতরে ঢুকতে যাবে ঠিক এমন সময় খেয়ার কিছ একটাতে দৃষ্টি আঁটকে যায়। ভীষণ পুরনো,, চিরচেনা,, পছন্দের একটি নেইম-প্লেট।
“কানন ফুল ”

“কানন ফুল” রির্সোটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক একটি দৃশ্য খেয়ার মানসপটে হানা দেয়। একের পর এক দৃশ্য রিপিট হচ্ছে। মস্তিষ্ক চাপ নিতে পারছে না খেয়ার। দু-হাতে কান চেপে ধরে বিকট এক চিৎকার দিয়ে খেয়া অচেতন হয়ে যায়। রির্সোটের বাইরে -ভেতরে থাকা মানুষগুলো খেয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। এরমধ্যে কেউ কেউ এগিয়ে আসছে।

রুমানা অচেতন খেয়ার গালে চাপড়ে ডাকছেন কিন্তু সাড়া দিচ্ছে না। রুমানা এবার ভয় পাচ্ছেন কারণ খেয়ার প্যানিক এ্যাটাক হয় খুব বেশি দুশ্চিন্তা করলে। খেয়া কি কোনো কারণে দুশ্চিন্তা করছিল? নয়তো,, সুস্থ সবল মেয়েটা হুট করে এতটা অসুস্থ হয়ে পরবে কেন?

খেয়ার চিৎকার শুনে ফায়েজ দৌঁড়ে যায়। খেয়ার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো। খেয়ার মুখের হাত বাড়াতে গিয়েও হাত গুটিয়ে নেয়। কোন অধিকারে স্পর্শ করবে? খেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রুমানাকে উদ্দেশ্য করে ফয়েজ বললো,,

— আন্টি,, খেয়াকে ডক্টর দেখাতে হবে।

এমন সময় একটি মেয়ে এগিয়ে এসে খেয়ার বা হাতের কব্জি চেপে ধরে নাড়ি চেক করলো।। চোখের পাতা নীচের দিকে টেনে দেখলো।

— আমি ডা. জিনিয়া। আসলে উনাকে কিছু সময়ের জন্য রেস্ট করতে দিলে ভালো হতো। সিরিয়াস কিছু না হয়তো কোনো কিছু নিয়ে টেনশন করেছেন কিংবা খাওয়াদাওয়া নিয়ে উদাসী। তাই প্রেসার ফল করেছে।

কথাগুলো ডা. জিনিয়া চলে যায়। তবে যাওয়ার আগে ফায়েজ এবং রুমানা উনাকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললো না। এদিকে সুমন হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে একটি রুম ম্যানেজ করে। এবং সেই রুমে খেয়াকে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। এখন সমস্যা একটাই খেয়াকে কোলে করে নিয়ে যেতে হবে। রুমানা তো পারবে না । ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছিল রুমানার। আসলে কাকে বলবে খেয়াকে রুমে দিয়ে আসার জন্য? সুমনকে বলবে নাকি ফায়েজকে?

— আন্টি,, আপনি যদি কিছু না করেন আমি খেয়া…

সুমন কথাটি সম্পূর্ণ করার আগেই দেখলো ফায়েজ খেয়াকে কোলে তুলে হলরুম ত্যাগ করছে। রুমানা সুমনের কাছ থেকে সরে এসে ফায়েজের পেছনে পেছনে যাচ্ছে।

রুম নাম্বার ২৫,,

রুমবয় এসে দরজা খুলে দেয়। ফায়েজ খেয়াকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলো পেছন থেকে রুমানা বললো,,

— বিছানায় শুয়ে দাও। তুমি তো ঘেমে গিয়েছো।

ফায়েজের একবার মনে হলো রুমানাকে বলতে যে,, আন্টি আপনার ভাতিজির জন্য আমি আরও কিছু করতে পারি। সেখানে ঘেমে নিয়ে একাকার হওয়া ব্যাপারটা তো তুচ্ছ। খেয়াকে প্রচন্ড ভালোবাসি। যে ভালোবাসায় বুকে প্রচন্ড ব্যাথা হয়। চোখে কেবল তার চোহারা ভাসে। মস্তিষ্কে কেবল একটি নাম ঘুরে। হৃদয়ের প্রতিটি কম্পনে কেবল তাকে পাওয়ার গুঞ্জন ভেসে আসে। আন্টি,, আমি তীব্র যন্ত্রণায় আছি। আপনি আমাকে যতটা গোছানো দেখেন,, পরিপাটি দেখেন না আমি কিন্তু ঠিক তেমন নই। ভেতরে ভেতরে আমি ভীষণ অগোছালো হয়ে আছি। খেয়া এসে আমাকে গুছিয়ে দেবে এটাই আমার আকাঙ্খা।

খেয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। তারপর সরে এলো ফায়েজ। রুমানা গিয়ে খেয়ার মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ফায়েজ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়াকে দেখছে। হুট করে খেয়া ওমন অদ্ভুত ব্যবহার করলো কেন গাড়িতে?? তারপর,, আবার চিৎকার করে অচেতন হয়ে যাওয়া। পুরো বিষয়টা কেমন যেন!!

ফায়েজ যখন এসব ভাবতে ব্যস্ত ঠিক তখনি ফায়েজের মোবাইলে কল এলো। শারমিন কল করেছে। ফায়েজ রুম থেকে বের হয়ে করিডরে দাঁড়িয়ে কল রিসিভ করলো।

— হ্যালো,, ফায়েজ??

— হ্যা বলুন??

— বলুন বলছিস ক্যান?? আমি তোর থেকে তিনমাস তিনদিনের ছোট। প্লাস আমি তোর বন্ধু। এসব আপনি সম্বোধন কি মানায় বল??

— সেই দিন অনেকদিন আগে পেরিয়ে গেছে।

ওপাশ থেকে দীর্ঘশ্বাসের সুর ভেসে এলো। তাতে কি ফায়েজের কিছু যায় আসে না। বন্ধু মানে হলো অনেকগুলো ইমোশনের একটা বড়ো প্যাকেজ। ভাই-বোন,, সুখ-দুঃখ জমা রাখার ঝুলি,, খুনসুটি,, মারামারি,, একে অপরের অনুপস্থিতিতে মনে দাগ কাটা সবটার নামই বন্ধু। সেই বন্ধুরা যদি দিনশেষে হাত ছেড়ে চলে যায় তখন বন্ধুত্বের নাম শুনলে কেবল ঘৃনা হয়।

শারমিন জানে ফায়েজের মনে অভিমানের পাহাড় জমেছে। সেই অভিমানের পাহাড় ভাঙতে বড্ড বেগ পোহাতে হবে।

—- তোর বন্ধুত্ব রাখতে হলে রাখবি না হলে বাদ দে। আমি তোকে এই ব্যাপারে ফোর্স করব না। আমি তোকে খেয়ার ব্যাপারে কিছু বলতে করেছি।

— খেয়ার ব্যাপারে??

ফায়েজ বিস্মিত হলো শারমিনের কথায়। বিস্ময়ের রেশ কাটতে না কাটতে শারমিন বলে উঠলো,,

— খেয়া সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত৷

ফায়েজ মোবাইল কানের কাছে ধরে রেখেছে,, শারমিনের কথা শুনতে পাচ্ছে কিন্তু জবাব দেবার ভাষা নেই। আসলেই কি খেয়া মানসিক অবস্থা শোচনীয়!! কিন্তু,, ওকে দেখলে কে বলবে?? সম্পূর্ণ সুস্থ একটা মানুষ। যার কাজ নিয়ে মানুষের অনুভূতিকে শব্দের আকার দিয়ে গল্প তৈরি করা।

— তুই ঢাকায় এসে আমার সঙ্গে দেখা করিস। খেয়ার ব্যাপারে অনেককিছুই তোকে বলার আছে।

— খেয়ার ব্যাপারে এতকিছু আমি জেনে কি করব??

কঠিনভাবে কথাটি বলে চোখ বুজলো ফায়েজ। কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যে। খেয়ার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সবকিছুই ফায়েজ জানতে চায়। মোবাইলের ওপাশে থাকা শারমিন হাসছে। ফায়েজ বিরক্তি নিয়ে কল কেটে দিলো। শারমিন আবারও কল করলো। ফায়েজ বিরক্তিকর শ্বাস ত্যাগ করে কল রিসিভ করে।

— আমাদের সবার জীবনে একটা স্পেশাল একজন মানুষ থাকে। সেই স্পেশাল মানুষটা আমাদের কাছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী বস্তুর চেয়েও মূল্যবান। এখন আমি যদি বলি তোর জীবনের সবচেয়ে দামী বস্তু হলো খেয়া।

— মেইন টপিক নিয়ে কথা বললে খুশি হবো।

ফায়েজ খেয়ার প্রসঙ্গকে এড়িয়ে যেতে চাইছে। মনটা ছটফট করছে খেয়ার কাছে যাওয়ার জন্য। মানসিক রোগের মতো একটা ব্যাপারকে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখে কতটা সাবলীল ভাবে চলাফেরা করত যে বোঝার উপায় ছিল না।

—আমার কাছ থেকে যা কিছু লুকিয়ে রাখছিস তা কি নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতে পারবি? ভালোবাসা হলো একটা ম্যাজিক। ম্যাজিকের মতো একটা ব্যাপারকে লুকিয়ে লুকিয়ে ইনজয় করাটা বোকামি ছাড়া কিছুই না। খেয়াকে বলতে পারিস তার জন্য তোর হৃদয়ে স্পেশাল ফিলিংস আছে। আদারওয়াইজ সি উইল নেভার বি ইউ।

শারমিন আরও কিছু বলছিল কিন্তু ফায়েজ সেগুলো না শুনে কল কেটে দেয়। প্যান্টের পকেটে মোবাইল রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে উঠলো,,

—- খেয়া কখনোই আমার হবে না। খেয়াকে চাওয়ার মতো যোগ্যতা আছে নাকি আমার?? বাড়ি-গাড়ি,, টাকা-পয়সা দিয়ে লোভী মানুষকে আকৃষ্ট করা যায়। কিন্তু,, ভালোবাসা। ওপর ওয়ালা যদি এই হৃদয় থেকে সেই হৃদয় পর্যন্ত ভালোবাসার মত একটা দমবন্ধ করা অনূভুতিকে পৌঁছে দিতে না পারেন। তবে আমাদের মতো মানুষ কি করে ভালোবাসা পাবে?? জোড়া তো আল্লাহ বানিয়েছেন। কিন্তু,, মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ তার জোড়ার সঙ্গী থেকেও কেন অন্য কাউকে বেশি ভালোবেসে ফেলে?? তার তো তার জোড়ার সঙ্গীকে বেশি ভালোবাসার কথা!!

— ফায়েজ এদিকে এসো।

রুমানা বারান্দায় এসে ফায়েজকে খুব স্বাভাবিক ভাবে ডাক দিলো। উনার এমন স্বাভাবিক ব্যবহার দেখে ফায়েজ কিছু সময়ের জন্য স্তম্ভিত হয়ে যায়। মানে মাঝে মাঝে ভাবতে অবাক লাগে এরা ফুপি ভাইঝি এক ক্যাটাগরির মানুষ৷ খুব বাজে পরিস্থিতিতে এরা হাসিমুখে কথা বলতে পারে। এমন ভাবে কথা বলবে যে বুঝার উপায় থাকবে না যে তাদের ভেতরে ভেতরে কতটা তান্ডব বয়ে যাচ্ছে!

ফায়েজ এলো সেই রুমে যেখানে খেয়া আছে। রুমের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পরলো খেয়া বসে আছে। হাতে একটা মগ। মগ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। হয়তো চা কিংবা কফি! ফায়েজকে দেখে খেয়া মগটা বেডসাইড টেবিলের ওপর রেখে বললো,,

— আপনি কিছুক্ষণ বসবেন?? কিছু কথা বলার ছিল??

খেয়া এত চমৎকার করে কথাটি বললো যে ফায়েজ মুগ্ধ হলো খেয়ার নতুন রুপে। এতটা গুছিয়ে,, চমৎকার ভাবে কখনো কি ফায়েজের সঙ্গে কথা বলেছে খেয়া। একেবারেই না। সবসময় এই কথা, সেই কথায় খোঁচা দিয়ে কথা বলত। আর আজ কি না অফার করছে ওর পাশে বসে কথা শোনার জন্য!!

ফায়েজ এসে বসলো খাটের কিনারায়। রুমানা ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন দেখে ফায়েজ রুমানাকে ডাক দিতে গেলে খেয়া ফায়েজকে বারণ করলো। ফায়েজ খেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কি এমন কথা বলবে খেয়া যার কারণে শূন্য ঘরে তারা দুজনই কেবল উপস্থিত থাকবে।

খেয়া বালিশে হেলান দিয়ে ফায়েজের দিকে তাকালো। ফায়েজ এতক্ষণ খেয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু,, যখনি দেখলো খেয়া ওর দিকে তাকিয়েছে ঠিক সেই মূহুর্তে দৃষ্টি নত করে ফেললো। খেয়া স্মিত হেসে ফায়েজকে উদ্দেশ্য করে বললো,,

— ভালোবাসা বড্ড খারাপ জিনিস জানেন?

খেয়ার মুখে ওমন কথা শুনে ফায়েজ বিস্মিত হয়ে গিয়েছে। ফায়েজকে আরও একধাপ অবাক করে খেয়া বলল,,

— আপনি কে? আপনি আমার কি হোন? আমি কিন্তু সব জানতাম। বলতে ইচ্ছে করত না। আপনিও কিন্তু খুব সন্তপর্ণে বিষয়টা চাপিয়ে যেতেন। যদিও এতে আমারই লাভ ছিল। অস্বস্তি হত না আপনার উপস্থিতিতে।

ফায়েজ খেয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কার কাছ থেকে এতদিন নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিল?? খেয়া তো সব জানে? কি যেন হলো ফায়েজের? রুম থেকে বের হয়ে চলে আসছিল এমন সময় খেয়া পিছু ডাকলো। ফায়েজ থামল কিন্তু পেছনে ফিরে তাকালো না।

— আজকে কিছু মূহুর্তের জন্য আমাকে সঙ্গ দিবেন?? অনেক কথা বলার আছে আপনাকে??

— তুমি আমাকে যা বলতে চাও আমি কিন্তু তার সবটাই জানি। নতুন করে পুরনো কথা শুনতে চাইছি না।

— শুনুন না হয় আজ পুরনো কথাগুলো। মনের ভেতরে থাকা কথাগুলো জমাট বেঁধে বুকে ব্যথা হচ্ছে। যদি মরে যাই মনের মাঝে জমাট বেঁধে থাকা দুঃখগুলো নিয়ে মরতে চাই না আমি।

খেয়া কেমন করে যেন কথাটি বললো। ফায়েজ পেছনে ফিরে খেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। খেয়াকে অনেক অনেক ভালোবাসে। জীবনের বিশেষ একটা অংশজুড়ে যার অস্তিত্ব আছে তার মৃত্যুর কথা শুনে এভাবে শরীর কাঁপছে কেন?? অথচ,, পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ একদিন চলে যাবে। অপ্রিয় সত্য কথা। তবুও এই অপ্রিয় সত্য কথা খানি কেউই স্মরণে রাখে না। রাখতে চায় না। হয়তো প্রিয় মানুষের প্রস্থানে হৃদয় রক্তক্ষরণ হয় বলে!

ফায়েজ সেই আগের জায়গায় গিয়ে বসলো। খেয়া একটা বালিশ কোলে ওপর নিয়ে তাতে দুহাত রেখে সোজা হয়ে বসলো। খোলা জানালা দিয়ে তখন শীতল বাতাস বইছে। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে সন্ধ্যা নামছে। জানালার দিকে তাকিয়ে খেয়ার বলতে লাগল তার জীবনের অতীত হওয়া দিনগুলোর কথা। যেই দিনগুলোতে কেবল একজন ছিল যাকে খেয়া ভালোবাসত।

সালটা ছিল ২০০৯,,

ক্লাস টেইনে পড়াকালীন সময় মায়ের ট্রান্সফার হলো ঢাকায়৷ জন্মস্থান ঝিনাইদহ ছেড়ে ঢাকায় চলে আসতে হলো। নতুন পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। চেষ্টা চলছে। ঠিক সেসময় ক্লাসেমেট একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হলো আমার। ছেলেটা ভীষন হাসিখুশি থাকত৷ যত বাজে পরিস্থিতি হোক না কেন সবসময় হাসিখুশি থাকত। চমৎকার ভাবে কথা গুছিয়ে বলার ম্যাজিক ছিল তার কাছে। এমনিতেই সূদর্শন ছিল তারওপর ভীষন হাসিখুশি,, চমৎকারভাবে গুছিয়ে কথা বলতে পারে তাহলে এমন ছেলের জন্য মেয়েরা পাগল হবেই। ছেলেটাকে ঘিরে মেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকত৷ দেখলে মনে হতো মৌচাকে মৌমাছিরা বসে আছে। প্রথম প্রথম বিরক্ত হতাম ব্যাপারটায়। ধীরে ধীরে ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবে নিলাম। আমি কিন্তু তখনও তার সাথে সেরকম আলাপে জড়ায়নি। আমি যে তার ক্লাসমেট সেটা হয়তো সে খেয়ালই করেনি। না করারই কথা ।

এভাবে দিন যাচ্ছিল। তারপর,, একদিন আমাদের দেখা হলো অন্যরকম মূহুর্তে। যেই মূহুর্ত থেকে আমাদের ভিন্ন পথ একই পথে রুপান্তরিত হয়। কুকুরকে নাকি ভীষন ভয় পায় সে। কোচিং-এ যাওয়ার পথে একদিন কুকুর ওর সামনে চলে এসেছিল। বেচারা ভয়ে কাঁপছিল ।আমিও সেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। ওকে দেখেও না দেখার ভান এড়িয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। ঠিক তখনি সে ডাক দিলো আমায় প্রথমবারের মতো। আমার নামটা তার মুখ থেকে শুনে সেদিন আমার দেহে কাঁপন ধরে গিয়েছিল। কেন কাঁপছিল বুঝতেই পারিনি।

— দাঁড়িয়ে আছো কেন? এদিকে এসো।

আমি যেতেই চাচ্ছিলাম না বাট ও যে আমাকে ধমক দিয়ে ডাকছিল না যেয়েও উপায় ছিল না। গিয়েছিলাম তার কাছে। কুকুরটা কি যেন বুঝলো আমাকে দেখে দৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়। কুকুরটা যেতেই হাফ ছেড়ে বাঁচল সে। কুকুরটা চলে যেতেই ও আমার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে বললো,,

— প্রতিদিন আমার জন্য অপেক্ষা করবে। তোমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকব৷

— আমি একাই স্কুলে যেতেই পারি। আমি কোনো কুত্তা সরি কুকুরকে ভয় পাই না।

কথাটি বলেই চলে আসছিলাম। এমনসময় আহ্ শব্দ বেরিয়ে এলো আমার মুখ থেকে। চুল ধরে টেনেছে আমার৷ আমার খুব সামনে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বললো,,

— অপেক্ষা করবে কি না বলো?? নয়তো,, আজ এভাবে চুল ধরে দাঁড়িয়ে থাকব। রাস্তায় হয়তো মানুষ নেই এখন কিন্তু সাতটা বাজতেই মানুষের আনাগোনা বেড়ে যাবে।

ওর কথা শুনে ভয় পেলাম। লোকে দেখলে কেলেংকারী হয়ে যাবে। মাকে বলে দেবে এই ভয়ে রাজি হয়ে গেলাম। সে তো মহাখুশি। সেদিনের পর থেকে রোজ একসঙ্গে স্কুল কিংবা কোচিং সব জায়গায় একসঙ্গে যাওয়া হত আমাদের। মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে যেতে চাইতাম না। তখন সে ভয়ংকার ভাবে ব্ল্যাকমেল করত। আমার মায়ের সঙ্গে দেখা হলেই নাকি বলে দিবে যে আমরা রিলেশনশিপে আছি। একবার তো কেঁদেই ফেললাম তবুও পাষাণটা রাজি হলো না। উল্টো কেঁদেকেটে তার সঙ্গেই স্কুলে যেতে হত। ভয়ংকর জেদ ছিল ওর। সেই জেদের স্বীকার হয়তো একমাত্র ভিকটিম বোধহয় আমি ছিলাম।

এভাবে দিন যাচ্ছিল। এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। এসএসসি পরীক্ষার পর মা আমাকে ঝিনাইদহে রেখে এলেন ফুপির কাছে। ঢাকায় বন্দি না থেকে গ্রামে গিয়ে লম্বা ছুটি কাটালাম। রেজাল্ট বের হলো। এ+ পেয়েছি। মা খুশি হয়ে সেদিন বিকেলে এসে আমাকে আবারও ঢাকায় নিয়ে গেলেন।

ততদিনে আমার মন থেকে তার সব স্মৃতি আবছা হয়ে গিয়েছিল। মনেই ছিল না তার কথা। কলেজের ভর্তি পরীক্ষার জন্য মা কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। একদিন বিকেলে কোচিং-এ যাওয়ার সময় রিকশায় উঠছিলাম। ঠিক সেসময় কেউ আমার নাম ধরে ডাকলো। প্রথমে মনের ভুল ভেবে তাকাইনি৷ কিন্তু,, দ্বিতীয়বার যখন আবারও ডাক শুনলাম তখন পেছনে তাকিয়ে দেখি,, লম্বা ফর্সা গায়ের একটি সূদর্শন ছেলে রিকশার দিকে একপ্রকার দৌঁড়ে আসছে।

ছেলেটাকে পরিচিত মনে হচ্ছিল। ধীরে ধীরে সে যখন রিকশার সামনে এসে দাঁড়ালো আমি বিস্ময়ে অবাক হয়ে বললাম,,

— নির্বাণ তুমি!!!

— এই মেয়ে হুট করে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিলে?? সরে বসো। এই মামা আপনি রিক্সা ছাড়েন।

নির্বাণ আমাকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বসলো। ততক্ষণে রিকশা চলতে শুরুকরেছে। আমি পারছিলাম না গলা ফাটিয়ে কাঁদতে শুরু করি। এতদিন নির্বাণের কথা মনে ছিল না তাই তো রিল্যাক্স মুডে ছিলাম। কিন্তু,, আজকের পর থেকে আমার শান্তি শেষ। এই যে এখন ও আমার পাশে বসে আছে এখন মা যদি আমাকে দেখে রিকশায় একটা ছেলের পাশাপাশি,, গা ছুঁইছুই অবস্থায় আছি তখন কি হবে?? মেরে মেরে আমার পিঠের ছাল তুলে দেবে৷

— কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি উত্তর দাও না কেন??

— বেড়াতে গিয়েছিলাম।

— কোথায়??

— ঝিনাইদহে।

— কার বাসায়?

— আমার ফুপির বাসায়।

নির্বাণ আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল কিন্তু রিকশা কোচিং সেন্টারের সামনে এসে থামার কারণে বেচারা কিছু জিজ্ঞেস করার সময় পায়নি। আমিও সুযোগ বুঝে রিকশা থেকে নেমে সোজা সেন্টারের ভেতরে চলে গিয়েছি।

এরপর,, প্রায় দুদিন পর নির্বাণকে পেলাম কোচিং সেন্টারে তাও আবার পাশের সীটে। রাগে-দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। আমার চেহারার এক্সপ্রেশন দেখে হয়তো নির্বাণ আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিল। তার সে কি হু হু করা হাসি। যেই হাসির অর্থ ছিল,, এখন আরও বেশি করে তোমাকে জ্বালাতে এসেছি।

দিনগুলো যাচ্ছিল কোনোমতে। নিবার্ণ এবং আমার একসাথে,, একই রিকশায় কোচিংয়ে যাওয়ার কথা মা জেনে গেলেন। মায়ের সে কি রাগ আমার ওপর!! মাকে কনভিন্স করতে পারলাম না যে,, আমার নির্বাণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। সে শুধু আমার ক্লাসমেট ছিল। আমরা একই কোচিং সেন্টারে পড়ি৷

মা এলাকা ছেড়েছেন। শাজাহানপুরের দিকে বাসা নিলেন। কোচিং সেন্টারের যাওয়া বন্ধ। বলা যায় নির্বাণের সঙ্গে আমার সবরকম যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এক দিক দিয়ে ভালোই হলো। আপদ থেকে মুক্তি যে পেয়েছি। চারটা কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিলাম। আল্লাহ চাইলে যেকোনো একটাতে অবশ্যই টিকে যাাব।

এত ব্যস্ততার মাঝে নির্বাণের কথা মনে পরত৷ কিশোরী মন ছিল হয়তো তাই। নির্বাণের আমার ওপর জোড় খাটানো,, আমার সঙ্গে তার আসা যাওয়া। ওর কথা সবটাই যেন মিস করছিলাম। তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমার প্রহর কাটত।

ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজে চান্স পেয়েছি। অথচ,, আমি চেয়েছিলাম ঢাকাতেই যেন চান্স পাই। ভাগ্য খারাপ। কিন্তু, মা খুশি হলেন। রোজ কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে নারায়ণগঞ্জ আসা-যাওয়া করতাম। বান্ধবী হয়েছে একজন। নাম খুশবু। ভীষণ চমৎকার একটি মেয়ে। উঠতে বসতে পৃথিবীর সবকিছুতেই সে হাসে৷ মাঝে মাঝে আমার মনে হয় মেয়েটার মন কখনো বোধহয় দুঃখকে স্পর্শ করেনি৷ নয়তো একটা মানুষ এভাবে সবসময় হাসিখুশি থাকে কি করে??

একদিন কলেজ থেকে বের হবার সময় গেটের কাছে খগব পরিচিত একটি মুখ দেখলাম। যেই মুখ আমি রোজ দেখি আমার স্বপ্নে। ভাবলাম মনের ভুল হয়তো। কিন্তু,, আমার ভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নির্বাণ এসে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। এতটা শক্তভাবে জাপটে ধরলো যে,, আমার মনে হয়েছিল আমি বোধহয় আজ দমবন্ধ হয়ে মরে যাব।

কোত্থেকে খুশবু এসে আমাকে নির্বাণের শক্ত দুহাতের বাঁধন থেকে মুক্ত করিয়েছিল। লজ্জায় আমি নির্বাণের দিকে তাকাতে পারিনি। কারণ,, আশেপাশের কিছু মানুষ ছিল যাদের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ছিলাম আমরা দুজন।

— কিরে দোস্ত তলে তলে টেম্পু চালাস আর আমি করলে হরতাল।

খুশবুর কথাটা শুনে নির্বাণ খুশবুর মাথায় হালকা থাপ্পড় মেরে বললো,,

— গুনে গুনে আমি তোর থেকে চারবছরের বড়ো। ইজ্জত দিয়ে কথা বলবি। কোত্থেকে শিখছিস এসব ফাতরামি? আর তুমি আমাকে কত নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবা?? ফাজিল মেয়ে I am in love with you। সেই ক্লাস টেন থেকে তোমার পেছনে ঘুরছি। এতটুকু তো কমনসেন্স থাকার কথা যে একটা ছেলে কেন একটা মেয়ের পিছে হুদাই ঘুরবে!!

এই ছেলে যে তখন কি বলছিল আমার মাথায় ঢুকছিল না। কারণ,, চোখের সামনে আমি আমার জগতকে অন্ধকারে ডুবে যেতে দেখছি। হয়তো,, মরেই যাচ্ছি।

চোখ কে যেন পানি ছুঁড়ে দিলো? চোখ খুলে তাকাতেই দেখলাম খুশবু এবং নির্বাণের ভর্য়াত মুখখানা। আমার সেন্স ফেরার পর নির্বাঙ কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু খুশবু বাঁধা দিয়ে আমার হাত ধরে টেনে তুললো। ওর ওড়নার কোণা দিয়ে আমার মুখটা মুছে দিয়ে বললো,,

— বাড়িতে যা। আন্টি অপেক্ষা করছে। এই পাগলের উত্তর পরে দিস। দেখছিস তোর প্রোপজাল শুনে খেয়া সেন্স হারিয়ে ফেলেছে। তার মানে তুই বুঝ তুই কি জিনিস যে মেয়েরা তোর ভালোবাসার কথা শুনে ভয় পায়?

নির্বাণ খুশবুর চুল টান দিয়ে আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরলো,, আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আজ কেন যেন ওকে দেখতে ভীষণ ভালো লাগছিল!! মনের কোণে একটু একটু যে ভালোলাগা জমেছিল। সেই জমানো ভালোলাগা যে ভালোবাসায় রুপান্তর হয়েছিল কে জানত?? আজ নির্বাণের মুখ থেকে ভালোবাসার কথা শুনে হৃদয় তার জবাব পেয়ে গেছে। তাই তো মন চাইছে তাকিয়ে থাকতে। একটুখানি ভালোবাসি বলতে।

— দেখো তোমাকে আমি চাই এট এনি কোস্ট। তোমার মা যদি তোমাকে আমার হাতে তুলে না দেয় তবে আমি তোমাকে তুলে এনে বিয়ে করব।

— এমন গুন্ডামার্কা কথা বললে কে রাজি হবে ??

খুশবুর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালো নির্বাণ। খুশবু দমে যাবার মতো পাত্রী না। সে আর একধাপ এগিয়ে এসে নির্বাণের হাতের মুঠো থেকে আমার হাত ছাড়িয়ে এনে আমাকে বললো,,

— আজ আমি তোদের বাসায় যাব। নয়তো দেখা যাবে এই পাগল তোকে সত্যি সত্যি তুলে নিয়ে যাবে।

নির্বাণ খুশবুকে কিছু বলতে গিয়েও বলল না কারণ খুশবু যে ওর কথা শুনবে না সেটা খুব ভালো করেই জানে। খুশবু খেয়ার হাত ধরে একটি রিকশায় উঠে বসলো। স্টেশনে যাওয়ার দরকার। কে জানে ট্রেন মিস করে ফেললো কিনা?? খুশবু কিংবা খেয়া কেউই জানলা না সেদিন নির্বাণ লুকিয়ে লুকিয়ে তাদের পিছু নিয়েছিল। খেয়ার বাসা অব্দি গিয়েছিল। আজ বহুদিন পর নির্বাণের মনে শান্তি লাগছে।

সেদিনের পর থেকে নির্বাণ রোজ খেয়ার কলেজের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রখর রোদ কিংবা মুষলধারে বৃষ্টি,, কনকনে শীত কোনটাই নির্বাণকে বেধে রাখতে পারেনি। মাঝেমধ্যে খেয়ার ভীষণ কষ্ট হত। কিন্তু,, নির্বাণকে কিছু বলার সাহস হতো না। এক সমুদ্র ভালোবাসা বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে সেটাও প্রকাশ করতে পারছে না।
মায়ের অবাধ্য সন্তান কখনোই হতে পারবে না। বাবা থেকেও নেই। মা তাকে আগলে রেখেছে। সেই মাকে কষ্ট দিতে পারবে না খেয়া। কিন্তু,, নির্বাণের ভালোবাসার দাম দিতে না পারলে যে খেয়া নিজের হৃদয়ের সঙ্গে বেইমানি করবে।

দেখতে দেখতে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ। ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করছে খেয়া। এদিকে নির্বাণ ওর বাবার সঙ্গে ব্যবসায় সময় দিচ্ছে পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করছে দিনরাত এক করে। মাঝেমধ্যে নির্বাণের কাঁদতে ইচ্ছে করে। একটা মেয়েকে ভালোবেসে তার আত্মসম্মান,, তার ম্যাচুরিটি সব কি হাওয়া ভেসে গেছে। যদি তা না হয় তবে কেন খেয়াকে ছাড়া নিজেকে ভাবতে পারে না। কেন মনে হয় খেয়াকে ছাড়া তার জীবন অসম্পূর্ণ। অথচ,, খেয়া তো তাকে চাইছে না ।

ভর্তি পরীক্ষায় রেজাল্ট ভালো করলো নির্বাণ৷ পাবলিকে চান্স পেয়েছে। খেয়া পাবলিকে চান্স পায়নি। তবুও ভীষন খুশি আজ। কারণ,, ওর মা ওর সঙ্গে ওয়াদা বদ্ধ হয়েছিল যে,, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলে সে যা চাইবে তাইই দেবে।

খেয়ার নাম্বারে একরাতে কল এলো নির্বাণের নাম্বার থেকে। খেয়া কল রিসিভ করলো।

— বিয়ে করবে না বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে সেদিকে খেয়াল আছে তোমার?

— আপনারও বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে বিয়ে আপনি করুন।

— একটা গান গাইতে ইচ্ছে করছে শুনবে??

খেয়া জবাব দিলো না। খেয়া যদি না বলে তবুও সে গান গাইবে। নির্বাণ গান গাইছে,,

তোমারও জামাই নাই,
আমারও বউ নাই,
চলো দুইজন,
একসাথে পালাই।

গান শেষ হতেই খেয়ার হাসির গুঞ্জন ভেসে এলো নির্বাণের কানে। নির্বাণ মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শুনতে লাগলো সেই হাসি। একটা সময় পর নির্বাণকে অবাক করে দিয়ে বললো,,

— পালানোর প্রয়োজন নেই জনাব। আমাদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দিন। যদি আমার মায়ের পছন্দ হয় তবে বৌ সেজে আপনার বাড়িতে যাব আপনার হাতে হাত রেখে।

নির্বাণ কিছু বলতে পারলো না। মানুষ যখন খুব খুশি হয় তখন কেঁদে ফেলে। নির্বাণের বেলায় তার ব্যতিক্রম হলো না। বেচারা সেদিন খুব কাদলো। কেউ জানলো না পৃথিবীর সবচেয়ে অপেক্ষাধারী প্রেমিক আজ সফল হয়েছে বলে কতটা সুখের কান্না করছে! তার ভালোবাসার চড়া দাম দিতে প্রস্তুত হয়েছে। তার নামে বউ সাজবে বলে কথা দিয়েছে খেয়া।

বাড়িতে প্রস্তাব পাঠানো হলো। মা রাজি হলেন। আমার মা খুুব ধুমধাম করে একমাত্র মেয়ে কন্যা সম্প্রদান করলেন। পরিবারের সবাই মাকে বলতে লাগলো ওমন সোনার টুকরো ছেলে কোথায় খুঁজে পেয়েছে। আমার মা হেসে জবাব দেয় ওপর ওয়ালা দিয়েছে,, খুঁজতে হয়নি। ঘোমটার আড়ালে থাকা আমি মনে মনে বলি,,

— আসলেই মা আল্লাহ চেয়েছেন বলেই পেয়েছি। তুমি তো জানো না এই পাগলটা আমাকে কতটা চায়!! দিনরাত কেবল আমাকেই চেয়েছে। কত বছর অপেক্ষা করলো। একবারের জন্য বিরক্ত হয়নি বরং দিন দিন তার ভালোবাসা যেন বেড়েই চলছিল।

বৌ হয়ে সেদিন নির্বাণের হাত ধরে প্রবেশ করেছিলাম। সেদিন থেকে মানুষটা যে আমাকে কিভাবে আগলে রেখেছিল ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না!! রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ বুজেই বলত,, খেয়া এদিকে এসো তোমার মুখখানা দেখে আজ আমার ভোরের শুরু হোক। অথচ,, রোজই তার একই বায়না ছিল। ব্যবসার চাপে দুপুরে একসঙ্গে কখনো খাওয়া হত না। কিন্তু রাতের খাবারটা একসাথেই খেতাম। সবসময় ও আমাকে খাইয়ে দিত আর বলত

” আমি তোমাকে কত আদর করে খাইয়ে দেই। আর তুমি কি করো? মাঝেমধ্যে আমাকে খাইয়ে তো দিতে পারো! ”

আমি হেসে জবাব দিতাম,,

“আপনি যেদিন আমাকে না খাইয়ে দিবেন সেদিন আপনাকে আমি নিজ হাতে খাইয়ে দিব৷ ”

নির্বাণকে নিজ হাতে খাইয়ে দেয়ার সৌভাগ্য আমার কখনোই হয়নি। কারণ,, ও কখনোই আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি। সবসময় আমাকে খাইয়ে দিয়েছে। খাওয়া শেষ হলে আমার মুখটা মুছিয়ে দিয়ে নিজের মুখটা মুছতে মুছতে বলত,,

— ইয়া আল্লাহ,, আমার হৃদয়ে আমার খেয়ার জন্য ভালোবাসা বাড়িয়ে দিন। আমি ওকে আরও ভালোবাসতে চাই। এত চমৎকার বউ আমাকে দিয়েছেন না সারাদিন ওকে খালি ভালোবাসি বলতে ইচ্ছে করে।

আমি হাসতাম। মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতাম। নির্বাণের মতো সঙ্গী পেয়েছি আমি এটাই তো আমার সাত জনমের ভাগ্য৷ মানুষ সাধন করেও এমন মানুষ পায় না। আর আমি বিনা সাধনে এমন চমৎকার মানুষ পেয়ে গেলাম!!!

কথায় আছে বেশি সুখ মানুষের কপালে সয় না। আমার বেলায় ঠিক তাই হলো। বেশি সুখ সইলো না আমার কপালে। হুট করে পাওয়া সকল সুখ দুঃখের সাগরে পরিণত হলো।

বেশ কিছুদিন ধরেই নির্বাণ কেমন যেন অদ্ভুত বিহেভ করছিল!! আমার মনে হচ্ছিল সে কিছু লুকাচ্ছে আমার থেকে। আমি একবার সন্দিহান হলে পরেরবার ভাবতাম হয়তো আমার মনের ভুল।

দিন যাচ্ছে নির্বাণ কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। আগের মতো খাওয়াদাওয়া করে না। রাগ নেই,, জেদ নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে সবার দিকে। অথচ, অন্য সময়গুলোতে সে রাগ দেখাতো। আমার শ্বাশুড়ি রাগ দেখিয়ে কিছু বললেই,, হাসিমুখে জড়িয়ে ধরে বলতো,,

— মা আমি না থাকলে দেখবে তুমি একেবারে শান্ত হয়ে যাবে কাউকে বকবে না। কারণ,, তোমার এই বদমেজাজি স্বভাবটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাব।

আমি শ্বাশুড়ি ছেলের কথা হেসে উড়িয়ে দিতেন। আমি ওর কথাগুলো হেসে উড়িয়ে দিতে পারতাম না। মনের ভেতর কেমন যেন করত? আমার ভেতর থেকে হুট করে বলে উঠত,, তোর আপন মানুষ চলে যাচ্ছে বিদায় জানাবি না?

প্রায় মধ্যরাতে এমন হতো। একদিন আমি ঘুমের ঘোরে কাঁদছিলাম হয়তো। নির্বাণ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেই আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বলছিলাম,,

— নির্বাণ,, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব কি করে?? তোমার গায়ের গন্ধ,, দুষ্ট চাহনি,, আমায় ভালোবেসে আঁটকে রাখা এই প্রশ্বস্ত বুক কোথায় পাব আমি??

নির্বাণ কিছুই বলেনি কেবল আমার মাথাটা তার বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরেছিল। আমি তার হৃদয়ের অস্বাভাবিক কাঁপন শুনতে পাচ্ছিলাম।

ঘটনার সাতদিন পর হুট করে হসপিটাল থেকে কল এলো। আমার শ্বাশুড়ি রিসিভ করতেই নির্বাণ বললো,,

— আম্মু খেয়াকে নিয়ে একটু ম্যাক্স হসপিটালে আসবে??

— তোর কি হয়েছে নির্বাণ?? ঠিক আছিস তো তুই??

— আমি একদম ঠিক আছি। জলদি চলে এসো। দেরি করো না যেন নয়তো বড্ড কষ্ট পেয়ে বিদায় নিতে হবে।

আমার শ্বাশুড়ি তার ছেলের কথার মানে বুঝতে পেরেছিলেন হয়তো। আমাকে সঙ্গে নিয়ে হসপিটালে গেলেন। রিসিপশনের সামনে যেতেই একজন ডক্টর এগিয়ে এসে আমার শ্বাশুড়িকে বললেন,,

— আপনি কি নির্বাণ চৌধুরীর আম্মু?

— জি ; জি ; আমি। আমার ছেলে কোথায়?

— উনার ওয়াইফকে সঙ্গে এনেছেন??

— এই যে ওর বৌ। আমার ছেলে কোথায়?

— আসুন আমার সঙ্গে।

ডক্টরের পেছনে পেছনে যাচ্ছিলাম। একটা কেবিনের সামনে এসে ডক্টর বললেন,,

— নির্বাণ সাহেব ভেতরেই আছেন।

আমি আর মা ভেতরে যেতেই দেখলাম,, নির্বাণ বসে আছে বেডের ওপর। হয়তো আমাদের অপেক্ষায় ছিল।

— এসেছো তোমরা! আমি তো ভেবেছি আর বুঝি দেখা হবে না তোমাদের সঙ্গে।

— তোর কি হয়েছে??

— আমাকে ওপর ওয়ালা ডাক দিয়েছে মা। তার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকব কিভাবে??

নির্বাণের কথায় আমি আর মা আঁতকে উঠি। আমি রেগে গিয়ে বলেছিলাম,,

— সব জায়গায় দুষ্টুমি চলে না আপনি জানেন? কি হয়েছে আপনার বাড়িতে চলেন।

— আমার আর বাড়িতে ফেরা হবে না। তুমি আমি আজ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব তবে শারিরীকভাবে। মানসিক অর্থে তোমার অন্তরে আমি,, আর আমার অন্তরে তুমি আছো। সবসময় থাকবে।

আমার শ্বাশুড়ি ছেলের কথার মর্মাথ বুঝতে পেরেছেন। পাথর হয়ে বসে রইলেন৷ আমি কি বলব বুঝতেই পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল সবটা দুঃস্বপ্ন। চোখ খুলে তাকালে দুঃস্বপ্ন কেটে যাবে। কিন্তু,, না দুঃস্বপ্ন কাটেনি বরং আমার জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে।

নির্বাণ আমাকে কাছ ডাকলো। আমি নির্বাণের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম৷ নির্বাণ মুচকি হেসে আমার দুহাত ধরে শক্ত করে চেপে ধরলো। দু’হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বললো,,

— তোমাকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসা খেয়া। পরজন্ম বলতে যদি কিছু থাকে তবে আমি তোমাকে সেই জনমেও ভালোবাসতে চাই। যতটা এই জনমে অপূর্ণ রয়ে গেছে ততটা পরের জনমে পুষিয়ে নিতে চাই।

—- তুমি কোথাও যাবেন না। মজা করা বন্ধ করো। আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি এবার।

নির্বাণ হেসে আমার কপালের ছোট চুলগুলো সরিয়ল দিয়ে বললো,,

— সাময়িক কষ্ট হবে তোমার আমাকে ছাড়া। একদিন দেখবে তোমার জীবনে এমন কেউ আসবে যে তোমাকে আমার চেয়েও বেশি ভালোবাসবে

“আমি বলতে চাইছিলাম যে আমার তোমাকেই প্রয়োজন।। তোমার ভালোবাসা ছাড়া আমি মরে যাব।”

কিন্তু বলা হলো না। তারআগেই আমার হাতের ওপর মাথা রাখে নির্বাণ । আমি নির্বাণের চুলে হাত দেবার আগে নির্বাণ গড়িয়ে বিছানায় পরে গেলো। আমি চিৎকার করে নির্বাণকে ডাকলাম কিন্তু আমার নি্র্বাণ আমার ডাকে সাড়া দেয়নি। চোখের সামনে আমার নির্বাণ আমাকে ফেলে চলে গেছে।

নির্বাণের হটাৎ চলে যাওয়াটা আমি মেনে নিতে পারিনি। আজও মানতে পারিনা যে নির্বাণ নেই। মনে হয় হুট করে একদিন নির্বাণ এসে আমাকে সারপ্রাইজ দিয়ে বলবে,,

— খেয়া দেখো আমি ফিরে এসেছি।

পুরনো স্মৃতিগুলো বলতে বলতে খেয়া কাঁদছে জানালার দিকে তাকিয়ে আর ফায়েজ অশ্রুজড়ানো চোখে,, ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বললো,,

— আই মিস ইউ নির্বাণ। আই রিয়েলি মিস ইউ ভাই।

খেয়া কথাগুলো বলে শেষ করলো। ফায়েজের চোখের কোণে জল জমে আছে। যেকোনো মূহুর্তে গড়িয়ে পরবে। খেয়া ফায়েজের মুখের দিকে একবার তাকিয়েছিল পরে চোখে নামিয়ে ফেলে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বুকটা ভার হয়ে আছে। নির্বাণকে হারিয়ে ফেলার বোঝাটা এখনও বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে।

ফায়েজ উঠে দাঁড়ালো। চলে যাবে। খেয়ার সামনে বসে থাকতে পারছে না আজ। মুখটা দুহাত দিয়ে মুছে,, চুলগুলো পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে দরজা দিকে এগিয়ে যেতেই খেয়া ডাক দিলো। ফায়েজ থেমে যায়। খেয়ার দিকে তাকায় না। ওই চোখের দিকে তাকানোর সাহস আজ নেই।

— চলে যাচ্ছেন যে? আরও কিছু কথা আপনাকে বলব।

— আমি কোনো কথা শুনতে চাচ্ছি না খেয়া। আমি সবটা জানি।

ফায়েজ চলে যেতে চাইছে যে করেই হোক। খেয়ার সামনাসামনি হবার সাহস আজ নেই। খেয়া ফায়েজের কথা শুনলো কিনা কে জানে? নিজ মনে কথা বলেই চলেছে।

— আমার জানামতে নির্বাণের পরিবারে ওর মা-বাবা এবং নির্বাণ ছিল পরিবারের সদস্য। আমার অন্তরালে একজন ছিল যাকে আমি চিনতাম না,, যার কথা কখনো আমাকে জানানো হয়নি। বিয়ের পর শ্বাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে একবার তার নাম শুনেছিলাম। সে ছিল নির্বাণের বড়ো ভাই ফায়েজ। কানাডায় থাকে। তার সম্পর্কে কথা বলার সময় শ্বাশুড়ি এতটা ইমোশনাল হয়ে পরলেন যে আমার সঙ্গে কথাগুলো সম্পূর্ণ বলতে পারলেন ঝরঝরিয়ে কেদে ফেললেন। আমি গুরুত্ব দেইনি৷ ছেলের জন্য মায়ের মন পুড়ছে স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু,, আমার অজানাতে অনেক বিশাল ব্যাপার ছিল যেটা আমি জানতাম না। নির্বাণের মৃত্যর পর আমার মাথা ঠিক ছিল না। পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। হসপিটাল এডমিট ছিলাম। ঘুমিয়ে থাকার জন্য ডক্টর ইনজেকশন দিয়ে রাখত। নয়তো জেগে থাকলে নির্বাণের কাছে যাওয়ার জন্য এতটাই পাগলামি করতাম যে নার্স বিরক্ত হয়ে যেত।
নির্বাণের মুখটা শেষবারের মতো দেখতে পারিনি,, ওর কপালে দীর্ঘ একটি চুমু খেয়ে শেষ বিদায় জানাতে পারিনি। এই একটা জায়গায় আমার কেন যেন মনে হয় পরিবারের সবাই আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। আমাকে না দেখিয়ে আমার ভালোবাসার মানুষকে কবর দিয়েছে।
সুস্থ হতে পারলাম না। স্বাভাবিক জীবনযাপন চিরতরে হারিয়ে যায় আমার জীবন থেকে। ফুপি আমাকে নিয়ে চলে গেলেন ঝিনাইদহে। সেখানে যাওয়ার পর নির্বাণকে আমি আমার আশপাশেই দেখতে পেতাম। কখনো আমার পাশে বসে থাকত। আমি কথা বলতাম সে জবাব না দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। প্রচুর রাগ হতো কেন সে আমার কথার জবাব দিত না। প্রথম প্রথম ফুপি ভাবতেন আমি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু,, হটাৎ একদিন যখন দেখলেন আমি বাগানের বড়ো আম গাছটার নীচে একা বসে বসে কথা বলছি আর হাসছি ঠিক তখনি ফুপি বুঝতে পারলেন আমি ঠিক নেই। আমাকে ভালো ডাক্তার দেখাবেন। ঢাকায় নিয়ে যাবেন। মায়ের সঙ্গে কথা বলে ফুপি আমায় নিয়ে ঢাকায় এলেন। ডক্টর দেখানো হলো গাদা গাদা ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে থাকতাম। যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকতাম নির্বাণের স্মৃতি মনে থাকত না। জেগে থাকলে দেখতাম নির্বাণ আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। যেই হাসির প্রেমে আমি খুব কঠিন ভাবেই পরেছিলাম।
মাসখানেক পর একটা রোড এক্সিডেন্টে নির্বাণের মা-বাবা দুজনই মারা গেলেন। তাদের শেষবারের মতো তাদের দেখার জন্য মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। উনারা যে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন সেটাও বুঝেছি কিন্তু মনে কষ্ট পাইনি। মনের সকল অনূভুতি ভোঁতা হয়ে গিয়েছে হয়তো!!

একবছর এভাবেই যাচ্ছিল৷ ধীরে ধীরে আমি সুস্থ হলাম কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হতে পেরেছি কিনা জানা নেই। এরইমাঝে একদিন প্রচন্ড মাথা ব্যথায় মা মারা গেলেন। ডক্টর বলেছিলেন মায়ের হয়তো ব্রেইন টিউমার ছিল। স্বামী হারিয়ে যখন মায়ের ছায়াতলে ঠাঁই মিলেছিল ঠিক সে-সময় মা হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। দুঃসময়ে ফুপি আমার মাথায় হাত রাখলেন। মেয়ের মতো আগলে রাখলেন।

প্রায় দুবছর লেগেছে স্বাভাবিক মানুষের মতো সুস্থ হতে। মেডিকেলের ভাষায় আমি সিজোফ্রেনিয়া রোগ থেকে রিকোভার করেছি। কিন্তু,, আমি জানতাম আমি রিকোভার করিনি। ডক্টরের কাছে গেলে মিথ্যা বলতাম যে আমি এখন আর আগের মতো নির্বাণকে দেখি না। মিথ্যা না বলেও উপায় ছিল না। নয়তো দেখা যেত আমাকে এক গাদা ঔষধ খাইয়ে মরার মতো বিছানায় ফেলে রাখত।

এরপর কি হলো বুঝতে পারলাম না! নির্বাণ আমার সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করে দিলো। হাজারবার ডাকলেও সামনে আসত না। অন্ধকার রাতে বিছানায় বসে আমি নির্বাণের অপেক্ষায় থাকতাম। রাতে পেরিয়ে সকাল হত নির্বাণ আসত না। আমি কাঁন্না করতাম।

এভাবেই দিন যাচ্ছিল,, তারপর একদিন আম্মুর এক কলিগের মাধ্যমে ফুপি একটা ভালো ফ্ল্যাটের সন্ধান পেলো। ফুপি সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে নিয়ে সেখানে থাকবেন। আমি কিছু বললাম না৷ নতুন ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকতে শুরু করলাম।

মাসটা ছিল জুনের ২০২০ হয়তো। লকডাউন চলছিল। গৃহবন্দী পুরো দেশের মানুষ। হুট করে একদিন আমাদের ফ্ল্যাটে একজন এলো যে কিনা নিজেকে এই বিল্ডিংয়ের মালিকের ছেলে বলে নিজেকে পরিচয় দেয়। ফুপি মানলেও আমি তাকে এই বিল্ডিংয়ের মালিক বলে মানতে চাইনি। কারণ,, এই বিল্ডিং ছিল নির্বাণের বাবার৷ কলেজে পড়ার সময় নির্বাণ একবার জোর করে এই বিল্ডিংয়ের নিয়ে এসেছিল। তখন মাত্র পাঁচতলা অব্দি কমপ্লিট হয়েছিল। নির্বাণ মারা গেছে। তার বড়ো ভাই ভীনদেশে পরে আছে। তাহলে এই লোকটা কে?

সন্দেহের বশে আমি লোকটার নাম জানতে চাইলাম। নিজের পরিচয় দিলেন। তার নাম ফায়েজ চৌধুরী। নামটা শোনার পর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার। যাক অবশেষে নির্বাণের বড়ো ভাই তাহলে দেশে ফিরে এসেছে। হয়তো তিনি আমাকে চিনতে পারেননি কিংবা পরিচয় জেনেও পরিচিতও দিতে চাননি যে আমি তার ছোট ভাইয়ের বৌ এর বিধবা স্ত্রী। আমিও আগ বাড়িয়ে আজ পর্যন্ত তাকে নিজের পরিচয় দিতে যাইনি। কি দরকার পরিচয় নিয়ে এত মাতামাতি করার।

খেয়া কথাগুলো বলে শেষ করে ফায়েজের দিকে তাকালো। দেখলো ফায়েজ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। খেয়া স্মিত হেসে ফায়েজকে উদ্দেশ্য করে বললো,,

— আজ এত কথা কেন বললাম জানেন??

ফায়েজের জানতে ইচ্ছে করছে কেন খেয়া আজ কথাগুলো বলছে?? কিন্তু,, মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের করতে পারল না। খেয়া ফায়েজের মনোভাব বুঝতে পারল কি না কে জানে? নিজ থেকে বলতে শুরু করলো।

— গত একমাস ধরে নির্বাণ আমাকে আবারও দেখা দিচ্ছে। আমার পাশে বসে থাকে,, আমার চুলে বিলি কেটে দেয়। আমি কিছু বললে মনোযোগ দিয়ে শোনে।

— খেয়া তুমি অসুস্থ। তাই একজন মৃত মানুষকে দেখতে পাও। কই আমি তো নির্বাণকে দেখি না্? খুব ভালোবাসতাম আমার ভাইটাকে। কই একবার দেখা করেছে আমার সঙ্গে?? তুমি নিয়মিত ঔষধ খাও দেখবে নির্বাণকে আর দেখছো না।

ফায়েজের কথা শুনে খেয়া হেসে ফেললো। ফায়েজ বিরক্ত হলো খেয়ার কান্ডে।

— আমি রোজ ঔষধ খাই। আমি এতটাও অসুস্থ নই যে আপনার ভাইকে কেবল অসুস্থ হলেই দেখতে পাব। নির্বাণ এবার একটা জরুরি কাজের জন্য আমার সঙ্গে দেখা করছে। যদি আমি রাজি হই তাহলে নাকি সে এই পৃথিবী থেকে মুক্তি পাবে। মৃত মানুষরা যেখানে থাকে সেখানে চিরতরে চলে যাবে। তার একটা অপূর্ণ ইচ্ছের জন্য নাকি সে মুক্তি পাচ্ছে না এই পৃথিবী থেকে।

ফায়েজ খেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আসলেই কি খেয়া পাগল হয়ে গেল?? নয়ত এত ভুলভাল কেন বকছে?

ফায়েজ যখন খেয়ার জন্য দুশ্চিন্তা করছিল ঠিক তখনি খেয়া এমন কথা বললো যে,, ফায়েজের পুরো শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে। এটাও কি সম্ভব?? তবে কি নির্বাণ পর মৃত্যুর আগে বলা কথাগুলো বাস্তবে রুপ দেয়ার জন্য খেয়ার সঙ্গে দেখা করছে?? আদৌও কি এগুলো সম্ভব?? সবকিছু বাদ কিন্তু খেয়া এত স্বাভাবিক ভাবে কথাগুলো বলছে কি করে??

*********************

রাতের আকাশে আজ চাঁদ নেই ; তাঁরা মিটমিট করে জ্বলছে। আকাশে যখন চাঁদ থাকে না তখন তাঁরার কোনো সৌন্দর্য পৃথিবীর কাউকে মুগ্ধ করতে পারে না। চাঁদের উপস্থিতিতে তাঁরা কেন,, পুরো পৃথিবী মুগ্ধ হয়,, পুলকিত হয়। অথচ সেই চাঁদ পনেরো দিবস আঁধারে লুকিয়ে থাকে৷

খেয়া আকাশের দিকে চোখ মুছলো। এমনসময় শীতল হাওয়া বইল,, চোখ বন্ধ করে আনমনে বললো,,

— তুমি নেই কিন্তু অস্তিত্ব,, তোমার ভালোবাসা আমার সর্বাঙ্গে লেপ্টে আছে। আমার হৃদয়ের প্রতিটা কম্পনে কেবল তোমার অস্তিত্বের জানান দেয়। আমি যতদিন পৃথিবীতে আছি ততদিন তুমি থাকবে আমার হৃদয়ে নিভৃতে যতনে। একটা কথা জানতে ইচ্ছে করে জানো?? আমাকে ছাড়া তোমার ঘুম আসে? আমি কিন্তু আজ পাঁচটি বছর ধরে তোমায় বিহীন ঘুমোতে পারিনি। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করি কিন্তু ঘুম আসে না। আমার পাশের বালিশে তোমার মুখটাকে আঁকার চেষ্টা করি। আমি এটাই ভাবি যে তুমি আমার পাশে আছো,, আমাকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছো,, মাঝে মাঝে চুলে টান দিয়ে মিষ্টি গলায় বকছো। সবটাই কল্পনায় ভাবি জানো। আচ্ছা,, নির্বাণ, তুমি আমাকে ছাড়া কেমন আছো সেই দুনিয়ায়??

— ফায়েজের সঙ্গে এতক্ষণ কি নিয়ে আলাপ করলি??

ফুপির গলা শুনে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা খেয়া পেছনে ফিরে দেখলো রুমানা দাঁড়িয়ে আছে। খেয়ার চোখে পানি দেখে রুমানা দ্রুত এগিয়ে এসে খেয়ার কাঁধে হাত রেখে ভেজা দুই চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। খেয়া চোখ নামিয়ে ফেললো। রুমানাকে পাশ কাটিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। রুমানা খেয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েটার কান্না সহ্য হচ্ছে না আর। পুরো দুনিয়ার সামনে এমন একটা ভাব নিয়ে থাকে যে দেখলে মনে হবে ওর চেয়ে পাষাণ,, ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে থাকা মানুষ আর একটিও নেই। অথচ,, বদ্ধ ঘরে দেখা যায় অত্যন্ত নরম মনের,, ভালোবাসা হারিয়ে ফেলা এক ব্যর্থ প্রেমিকাকে,, স্বামী হারানোর শোকে কাতর হয়ে যাওয়া স্ত্রীকে।

রুমানা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খেয়ার পাশে গিয়ে বসলেন। আস্তে করে খেয়ার ডান হাতের ওপর হাত রেখে বললেন,,

— তোদের না এ্যারেন্জ ম্যারেজ ছিল? মাত্র দশ মাসের সংসার ছিল তোদের। দশ মাস সংখ্যাটা নিশ্চয়ই একটা সংসারের জীবনের জন্য ছোট সংখ্যা। মানুষ দীর্ঘ কয়েকবছর সংসার করে সেই সংসারের মায়া কাটিয়ে অন্য কোথায় সুখ খুঁজে নেয় আর তুই কিনা কাঁদছিস?? যে চলে যাওয়ার সে তো চলে গিয়েছে এখন কেঁদে কি লাভ?? তুই কাঁদলে কি আর সে ফিরে আসবে? আসবে না বরং তোর মন থেকে তারর স্মৃতি কাটবে না।

খেয়া রুমানার কথাগুলো শুনছিল। কথাগুলো শোনার পর খেয়ার বলতে ইচ্ছে করছিল,, ফুপি আমাদের প্রেম ছিল দীর্ঘ সাত বছরের।
“না বলা প্রেম “। যে প্রেমের নাম ছিল না কিন্তু অদৃশ্য একটা টান ছিল। যেই প্রেম কেবল হৃদয়কে ছুঁয়ে দিয়েছিল সেই প্রেম ছিল আমাদের। এ্যারেন্জ ম্যারেজ ছিল তোমাদের চোখে কিন্তু আমাদের জন্য ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর এক হবার দিন। দশমাসের সংসার সেটা তো কেবল তোমরা দেখলে। অথচ আমরা সাত বছর ধরে একে অপরের মাঝে আঁটকে ছিলাম,, ভালোবাসার মায়াজালে। মাসের সংখ্যাটা গুণে রাখলে কিন্তু আমাদের দীর্ঘ সাত বছরের প্রেমের খবর জানলে না। কতটা নিষ্ঠুরভাবে বলে ফেললে কথাগুলো ভাবলে না একবার আমি কি ভাবব?? আমি সহ্য করতে পারব কিনা??

—- আগামীকাল আমরা ঢাকায় ফিরে যাব। ফায়েজ বলল আমায় তোকে জানিয়ে দিতে।

— আর কিছু বলেনি তোমায়?

খেয়া ওর ফুপির দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। রুমানা ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,,

— আর কি বলবে??

— বলেনি যে আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।

যান্ত্রিক আওয়াজে কথাটি বললো খেয়া। রুমানা বিস্মিত হয়ে খেয়ার কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,,

— কাকে বিয়ে করতে চাস তুই?? তুই না নির্বাণকে “ভালোবাসি ” বলে জগত সংসার ত্যাগ করতে চাস প্রতিনিয়ত। আজ মাথায় বিয়ের ভূত চাপলো কি আমার কথাগুলো শুনে??

— ফুপি আমি ফায়েজকে বিয়ে করতে চাই।

ভাবলেশহীন হয়ে উত্তর দিলো খেয়া। রুমানা ফায়েজের নাম শুনে মুখে হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার মাথা বুঝি এবার সত্যি সত্যি গেছে! নয়তো ফায়েজের মত এমন একজনকে বিয়ে করার কথা বলে কি করে?

হোটেলের লনে দাঁড়িয়ে আছে ফায়েজ। কপালে চিন্তার ভাজ। খেয়া এবং নির্বাণের ভালোবাসার কাহিনি শোনার পর নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হচ্ছে?? অথচ,, এসব কিছুতে ফায়েজের কোনো দোষ নেই। দীর্ঘ সাত বছরের প্রেমের পর যে তারা বিয়ে করছে কেউ ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি। সবাই ভেবেছে পারিবারিকভাবে বিয়ে হচ্ছে।

খেয়ার ছবি দেখে ফায়েজ কত পাগলামি না করেছে মায়ের সঙ্গে,, নির্বাণের সঙ্গে?? খেয়াকে পাওয়ার জন্য কত হাহাকার করেছে নির্বাণের সামনে?? কিন্তু,, কে জানত সেই নির্বাণের মনের একছত্র রানী কেবল খেয়া ছিল?? যাকে চাইলেও ফায়েজের কাছে দিতে পারত না নির্বাণ। ফায়েজ যখন নির্বাণের কাছে খেয়াকে ভিক্ষা চেয়েছিল তখন নির্বাণের কেমন লেগেছিল?? হয়তো,, বুকটা হৃদয় হারানোর ভয়ে বিরতিহীন কাঁপছিল!!

আজ যদি নির্বাণ বেঁচে থাকত তাহলে ফায়েজকে ঠিক আগেরবারের মত বলত,,

” কি আমি বলেছিলাম না যে,,ভাই তোমার সেই ছোটবেলা থেকে অভ্যাস আছে আমার প্রিয় কিংবা পছন্দের জিনিসে হাত বাড়ানো। বড়ো হবার পর ভেবেছিলাম হয়তো বয়সের সাথে সাথে ঠিক হয়ে গেছে তোমার বদঅভ্যেস। কিন্তু,, না কিছুই বদলায়নি। আমি যখন খেয়াকে নিজের করে পেয়েছিলাম তখন তুমি বিয়ে করতে চাইলে কিন্তু আমি খেয়ার হাত ছাড়িনি। আর আজ দেখো আমার অবর্তমানে তুমি খেয়াকে বিয়ে করবে কিনা ভাবছো ??”

ফায়েজের দু-চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। নির্বাণ যে কখনো এভাবে চলে যাবে ভাবেনি? ভাইকে সুখী দেখার জন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল সবার কাছ থেকে। দেশের আসার প্রয়োজনবোধ করেনি। অথচ, সেই ভাই হুট করে চলে গেল না ফেরার দেশে। মাঝে মাঝে ফায়েজের মনে হয় নির্বাণ পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে তাদের ছেড়ে চলে গেছে। কারণ,, মৃত্যুর তিনদিন আগে ফায়েজের মোবাইলে একটি দীর্ঘ মেসেজ পাঠিয়েছিল নির্বাণ।

ফায়েজ আর কিছুই ভাবতে পারল না। চোখদুটো বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে আজ। কেন জীবন আমাদের এমন একটি অংশে এনে দাঁড় করায় যেখানে কেবল একটি অপশন বেছে নিতে হয়?? খেয়া তার ভালোবাসা। এবং, জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম সত্য হচ্ছে খেয়া তার ছোট ভাইয়ের বৌ,, নির্বাণের ভালোবেসে বিয়ে করা বৌ। যেই মেয়েকে পাওয়ার জন্য তার ভাই অনেক অনেক অপেক্ষা করেছে। আজ এতগুলো বছর পর এসে কিনা সেই খেয়া ফায়েজকে বিয়ে করার জন্য অফার করেছে? কারণ,, খেয়ার ভাষ্যমতে মৃত নির্বাণ তাকে বলেছে ফায়েজকে বিয়ে করার জন্য। অথচ এই কথার কোনো ভিত্তি নেই। সম্পূর্ণ বানেয়াট কথা মনে হচ্ছে।
খেয়া কি তবে মিথ্যা বলছে? নাকি ফায়েজ শুধু শুধু বেশি ভেবে ফেলছে??

আকাশপাতাল চিন্তা মাথায় নিয়ে রুমে এসে লাইট অফ করে বিছানায় বসে বসে নিকোটিনের ধোঁয়া উড়াতে ব্যস্ত হয়ে পরে ফায়েজ।

********************

— খেয়া তোর মাথাটা এবার সত্যি গেছে। ঔষধ খাচ্ছিস তো ঠিক মতো?

রুমানা মাথায় হাত দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে কথাগুলো বললেন। খেয়া যারপরনাই বিরক্ত হলো। খাটের ওপর পরে থাকা ওড়না নিয়ে গায়ে জড়ালো। রুমানার কানের সামনে মুখ বাড়িয়ে ফিসফিস করে বললো,,

— মাথাটা সম্পূর্ণ ঠিক আছে। ইতিমধ্যে ফায়েজ সাহেবের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে আলাপ হয়েছে আমার। তিনি আমাকে কিছুই বলেননি। কিন্তু, অতিশিঘ্রই যে তিনি তার সিদ্ধান্ত আমাকে জানাবেন সেটা আমি জানি। তুমি শুধু রিল্যাক্সে থাকো,, ফুপি।

— রিল্যাক্সে থাকতে বলছিস!! তুই যে কি না পাঁচ বছর ধরে নির্বাণের ট্রমা থেকে বের হতে পারছিস না সে তুই বিয়ে করবি কাকে নির্বাণের বড়ো ভাইকে?? কিন্তু,, কেন?? না তুই তাকে পছন্দ করিস আর না ফায়েজ তোকে পছন্দ করে?? যখন যা মনে যা আসে তাই বলিস। বিয়েটা কোনো ছেলেখেলা নয়। বিয়ে একটা পবিত্র বন্ধন। যেখানে কেবল শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা দিয়ে একটি বন্ধন তৈরি হতে পারে। নিছক মজার ছলে নেয়া সিদ্ধান্ত কখনোই বিয়ের মতো একটা ব্যাপারের সঙ্গে যায় না।

— ভালোবাসা পাবে বলে কয়জনে বিয়ে করে ফুপি?? ভালোবাসা তো হলো লটারির মতো। ভাগ্য থাকলে একটি টিকিটে অসীম ভালোবাসা পাওয়া যায়। আর ভাগ্য না থাকলে হাজারও টিকিট হাতে থাকলেও অসীম ভালেবাসার পাওয়ার লটারি পাওয়া হয়ে ওঠে না।

— তোর এত কঠিন কথা আমি বুঝি না। তুই অসুস্থ। কি বলছিস? কি ভাবছিস? কিছুই তো বোধগম্য নয় তোর। ঢাকায় ফিরে চল। আমি নিজেই ফায়েজের সঙ্গে আলাপ করে বিষয়টা সর্ট আউট করব।

— তুমি এরকম কিছুই করবে না। আমি যা বলেছি এবং ফায়েজ সাহেব যা সিদ্ধান্ত নেবেন আমি তাই মেনে নেব।

— কিন্তু??

—-কোনো কিন্তু না ফুপি. তুমি কি চাও না আমার বিয়ে হোক? একটা সুখের সংসার হোক?

রুমানা খেয়ার কথায় বিস্মিত হলেন। হুট করে এত পরিবর্তন কিন্তু কেন?? ফায়েজ এবং খেয়াকে দেখলে কখনো মনে হয়নি তারা বিশেষ কোনো সম্পর্কে আছে। কিন্তু,, আজকের ঘটনা দেখে যা মনে হচ্ছে খেয়ার সঙ্গে ফায়েজের একটা মজবুত সর্ম্পক তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল রুমানা। খেয়ার জন্য বরাদ্দকৃত হোটেল রুম থেকে বেরিয়ে পাশের রুমে চলে যায়। রুমানা চলে যাওয়ার পর খেয়া দরজা লক করলো। রুমের লাইট অফ করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো। তারপর,, ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করলো।

কাঁধে কারো গাঢ় নিশ্বাস আছড়ে পরছে! চুলের ফাঁকে কেউ আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে! কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে বলছে,,

— আর কটা দিন তারপর আমি আর তোমাকে ছুঁতে পারব না। আমি চলে যাব আমার আপন ঠিকানায় যেখানে আমাকে থাকতে হবে চিরকাল।

খেয়া পাশ ফিরতে চাইল কিন্তু কোনো অদৃশ্য শক্ত বাঁধনে আঁটকে আছে বলে পাশ ফিরতে পারল না। চোখ বন্ধ করে অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইলো তাকে। যার কথা খেয়ার মস্তিষ্কের প্রত্যেকটি স্নায়ুকোষ জানে।

— তোমাকে আগের মতো শক্ত করে বুকে চেপে ধরতে ইচ্ছে করে জানো? কিন্তু পারি না। মৃত্যুর পর হয়তো শরীরের কোনো কাজের থাকে না।

খেয়া কেঁদে ফেলল। আজ পনেরোদিন পর নির্বাণ এসেছে তার সঙ্গে কথা বলছে।

— মোটেও কাঁদবে না। আমি ছিলাম,, আছি, থাকব তোমার হৃদয়ে। সব মুছে ফেলা যায় কিন্তু হৃদয়কে অস্বীকার করা যায় না। তুমিও অস্বীকার করতে পারবে না। আমি চাই তুমি ভালো থাকো। যে তোমাকে চায় তুমি তার কাছে থাকো। সে আমার থেকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসে তোমায় ।

— কিন্তু,, আমি যে তোমার ভালোবাসায় অভ্যস্ত??

জবাব এলো না। খেয়া হাত বাড়িয়ে ছুঁতে যায় কিন্তু পারছে না। হাতটি গুটিয়ে এনে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো,, এমন সময় একটি হিমশীতল হাওয়া খেয়াকে ছুঁয়ে গেলো। খেয়া বন্ধ করে সে হাওয়া টুকু অনুভব করল।

— আমি কিন্তু তোমাকে ভালোবেসে অভ্যস্ত। কিন্তু দেখো আজ কতগুলো বছর ধরে আমি তোমাকে ছাড়া টিকে আছি?? ভালোবাসি বলেই তার সঙ্গে থাকতে হবে এমন কথা নেই। আড়ালে আবডালে ভালোবাসা যায়। আমাকে তেমনিভাবে আড়ালে ভালোবেসো। তুমি নিজের জীবনকে গুছিয়ে ফেলো আমি খুশি হব। আজ চলি।

— আবার কখন আসবে??

— হয়তো আর কখনোই আসা হবে না।

খেয়া কাঁদছে। আজই তার সঙ্গে তবে শেষ দেখা। কিন্তু কেন?? ফায়েজকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে বলে?? হয়তো??

— শেষবারের মত আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবে প্লিজ??

— মৃত্যু মানুষ জড়িয়ে ধরতে পারে না।

— তুমি যদি আমার সঙ্গে দেখা করতে পার,, কথা বলতে পার। তাহলে জড়িয়ে ধরতে পারবে না কেন?

— আমি কিছুই করিনি। সব করেছে তোমার মস্তিষ্ক। তোমার অবচেতন মস্তিষ্ক আমাকে ফিরিয়ে এনেছে সেই জগত থেকে যেখান থেকে কারো ফিরে আসা সম্ভব না। মানুষের কল্পনা শক্তি প্রখর। কল্পনা শক্তি দিয়ে মানুষ অসাধ্য কিছু কল্পনায় এঁকে ফেলে। তুমিও এর ব্যতিক্রম কিছুই করোনি। আমাকে নিয়ে ভেবেছো,, সবসময় চাইতে আমি যেন সেই দুনিয়া থেকে তোমার কাছে ফিরে আসি। অথচ,, বাস্তবে এটা আদৌও সম্ভব না। আমাকে তুমি ফিরিয়ে এনেছো তোমার কল্পনা শক্তির মাধ্যমে।

— তারমানে ফায়েজকে বিয়ে করার ব্যাপারটা কি আমার অবচেতন মস্তিষ্ক কন্ট্রোল করেছে??

নির্বাণ জবাব দিলো না। খেয়া স্পষ্ট দেখতে পেলো নির্বাণ তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে। খেয়া কিছু বলার আগে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। খেয়া অনুভব করতে পারলো নির্বাণের আলিঙ্গনকে। খেয়া দুহাত দিয়ে নির্বাণকে জড়িয়ে ধরলো।

— এই যে আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরলাম এই ব্যাপারটা তুমি কল্পনা শক্তির মাধ্যমে ক্রিয়েট করেছো। আমি কিছুই করিনি। মৃত মানুষের এত শক্তি নেই। তারা শক্তিহীন,, দূর্বল,, রুহ বিহীন নিথর দেহ।

ধীরে ধীরে খেয়াকে আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করল নির্বাণ। খেয়া নির্বাণের মুখটা দেখলো। ঠিক আগের মতোই আছে। স্নিগ্ধ,, মায়াময় একটা চেহারা। খেয়া নির্বাণের মুখটায় স্পর্শ করতে চাইলো তার আগেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে নির্বাণের অস্তিত্ব। খেয়া হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো। দু-হাত দিয়ে লাভ শেইপ বানিয়ে চিৎকার করে বললো,,

— I Love You Nirban. Love you so much. I will never forget you. Because,, you are my first love,, you teach me what is love!! And I really miss you.

নির্বাণ হারিয়ে গেছে খেয়ার চোখের সামনে থেকে। কিছু একটা মনে পড়তেই খেয়া মুচকি হেসে ফিসফিস করে বললো,,

— তোমাকে হারিয়েছি যার কারণে তাকে একটা শিক্ষা দেয়ার জন্য আমার এই কঠিন পদক্ষেপ নেয়া জরুরি ছিল নির্বাণ। আমি প্রতিশোধ নেব তোমার মৃত্যুর। তারপর,, আমিও চলে যাব তোমার কাছে। তারপর,, একসাথে মিলেমিশে দুজনে একেঅপরে মিশে থাকব।

চলমান……