Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৯+১০

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-৯+১০

0
779

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,৯

মৌমিতা আজ একটু জলদিই অফিসে এলো। কালকের পেন্ডিং ফাইলটা আদিত্য অফিসে আসার আগে আগে কমপ্লিট করে রাখবে ঠিক করলো।

অফিসে ঢুকে তেমন কাউকে দেখতে পেলো না সে। কয়েকজন মাত্র স্টাফ নিজেদের কাজ করছে।
মৌমিতা নিজের ডেস্কে বসে ল্যাপটপ টা অপেন করলো। ফাইল টা খুলে রাখলো পাশে।
কিবোর্ডে আঙ্গুল চালালো দ্রুত!

প্রায় পনের মিনিট পার হতেই সামনে কাউকে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ রাখতে দেখে চোখ তুলে তাকালো মৌমিতা।
হাসিমুখে আবির দাঁড়িয়ে! তার হাতেও কফির কাপ।
মৌমিতা সৌজন্য হেসে কফির কাপ টা হাতে নিয়ে ছিপ নিলো! বললো,,,

:- থ্যাঙ্ক ইউ! বাট এটার দরকার ছিলো না!

আবির হেসে ফেললো। কফির কাপ টা মৌমিতার টেবিলের ওপর রেখে পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে বসলো। বললো,,,

:-সবকিছু কি দরকার মোতাবেক করতে হবে মিস মিতা!

আজও আবিরের মুখে মিতা ডাক শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মৌমিতা।

:–এক্সকিউজ মি! আমার নাম মিতা নয়, মৌমিতা!

আবারো হাসলো আবির! কপাল গুটালো মৌমিতা। ছেলেটা কি সবসময় এমন হাসতে থাকে নাকি!

:–হ্যা জানি তো আপনার নাম মৌমিতা। কিন্তু আমার আপনাকে শুধু মিতা বলতে ভালো লাগে। কেনো? আমি মিতা বললে কি আপনার কোন আপত্তি আছে? থাকলে বলুন! আর বলবো না।

:-সামান্য ডাকে আর আমার কি সমস্যা হতে পারে! শুধু একটু আনকম্ফরটেবল লাগলো তাই! আগে কখনো কেউ এভাবে ডাকেনি তো! হয়তো সেই কারণে একটু অন্যরকম লাগলো!

মৌমিতার কথায় মনে মনে বেশ খুশিই হলো আবির। যাক! মৌমিতা কে ভালোবেসে একটা নাম যে সেই প্রথম দিয়েছে, তা জেনে মনের ভেতর প্রজাপতি উড়াউড়ি করে আবিরের।

মৌমিতা নির্বিকার ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে। আর তা আড়চোখে মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছে আবির!

এদিকে অফিসের ঢুকতেই এই দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়েছে আদিত্যর। আবিরের মৌমিতা কে মিতা বলে ডাকা, মুগ্ধ চোখে তাকানো দেখে গায়ে আগুন ধরে গেলো যেন তার। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে দরজার সামনেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে আদিত্য!

অফিসের একজন ফিমেল স্টাফ সোহেলী কাজের ফাঁকে হুট করে দরজায় নজর পড়তেই হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালো!
আদিত্য কে কেমন রাগান্বিত হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভাবলো হয়তো তাদের কোন ভুল হয়েছে। সোহেলী উঠে দাঁড়িয়ে একটু জোরেই বললো,,,

:-গুড মর্নিং স্যার!

সোহেলীর কথায় সকলের দৃষ্টি গিয়ে থামলো আদিত্যর
ওপরে। সবাই হুড়মুড় করে উঠে দাড়ালো। মৌমিতা এবং আবিরও বাদ গেলো না।
সবার অ্যাটেনশন পেতেই হনহন করে নিজের কেবিনের দিকে পা বাড়ালো আদিত্য! যাওয়ার আগে গমগমে স্বরে বলে গেলো,,,

:-Miss Moumita! Come to my cabin quickly. !

যবে থেকে মৌমিতা অফিসে জয়েন করেছে তবে থেকে কখনো আদিত্য কে এমন রাগী গলায় কথা বলতে শোনেনি। হঠাৎ আদিত্যর কি হলো বুঝতে পারছে না কেউ! মৌমিতার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো!
বিড়বিড় করে বললো,,,

:- এই লোকটার আবার কি হলো!

ল্যাপটপ টা হাতে নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে আদিত্যর কেবিনের দিকে দৌড় দিলো মৌমিতা।
আবির এখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মৌমিতা চলে যেতেই নিজেও ধীর পায়ে নিজের কেবিনে চলে গেলো। আর কে বিউটি এন্ড ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির মার্কেটিং ডিরেক্টর সে।

মৌমিতা কেবিনের বাইরে থেকে নক করলে একই স্বরে ভেতরে ঢুকতে অনুমতি দিলো আদিত্য! ঢোক গিলে আস্তে আস্তে প্রবেশ করলো মৌমিতা। ঠিক বুঝতে পারলো কোন কারণে আজ আদিত্যর মেজাজ খারাপ। তাই সাবধানে এগিয়ে গেলো ডেস্কের দিকে।
ল্যাপটপ টা টেবিলের ওপর রেখে ধীর কন্ঠে বললো,,

:-স্যার গতকালের যে কাজটা বাকি ছিলো ,আমি কমপ্লিট করে দিয়েছি। আপনি একটু দেখে নিন।

মৌমিতার কথায় কোন হেলদোল দেখালো না আদিত্য। একই ভাবে থমথমে মুখে তাকিয়ে রইল মৌমিতার দিকে। একটু অপ্রস্তুত হলো মৌমিতা। আদিত্য এভাবে কেনো তাকিয়ে আছে!

মৌমিতা ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বললো,,,

:-স্যা…স্যার আর ইউ ওকে!

টেবিলের ওপর দুহাতে জোরে থাবা দিয়ে উঠে দাঁড়ালো আদিত্য। টেবিলের ওপর ঝুঁকে মৌমিতার চোখে চোখ রাঙিয়ে,দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,

:-আবিরের সাথে এতো কিসের গল্প তোমার? What else was he saying? হা? মিতা? ওয়াও! ফ্যান্টাস্টিক! এটা কি অফিস! নাকি কোন ক্যাফেটেরিয়া!

আদিত্যর কথায় থ বনে গেলো মৌমিতা! সে আবিরের সাথে গল্প করছিলো তাতে আদিত্যর কিসে সমস্যা! আবির তাকে কি নামে ডাকলো তাতেই বা এতো রিয়্যাক্ট করার কি আছে!

:–জ্বী স্যার? কি বলছেন আপনি এসব!

আদিত্য বুঝলো সে বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছে। তাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে টাই টা ঢিলে করে গলা ঝেড়ে বললো,,,

:-আআমম, নাথিং! ফরগেট ইট! আমার জন্য একটা স্ট্রং কফি নিয়ে এসো।

মৌমিতা হঠাৎ খেয়াল করলো আদিত্য তাকে আজ আপনি ছেড়ে তুমি বলে সম্বোধন করছে! ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো সে। আদিত্য
মৌমিতা কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বললো,,,

:-হোয়াটট! দাঁড়িয়ে আছো কেনো? Go and get some coffee!

:-স্যার আমার যতটুকু মনে আছে,আপনি তো গতকাল অব্দি আমাকে “আপনি” সম্বোধন করতেন! আজ হঠাৎ তুমি বলছেন যে!

মৌমিতার কথায় আড়চোখে তাকালো আদিত্য। ঠোঁটে বাঁকা হাসি টেনে বলবো,,,

:-একচুয়ালি কি বলোতো, আমি ভেবে দেখলাম বুঝলে!
তুমি তো আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট,তা ছাড়াও আমার থেকে বয়সে অনেকটা ছোট! তো তোমাকে আমার আপনি নয়, তুমি বলা উচিত!
কেনো? আমার তুমি বলাতে কি তোমার আপত্তি আছে মিস?

:–জ্বী,,ন..না আমার কিসের আপত্তি থাকবে!

:-গুড! এবার যাও আমার জন্য কফি নিয়ে এসো।

মৌমিতা দু কদম এগিয়ে যেতেই আদিত্যর কথায় আবার থেমে গেল।

:-অন মোর থিঙ্ক! আবিরের সাথে কোন রকম কথা বলবে না তুমি!

ভ্রু কুঁচকে তাকালো মৌমিতা।

:-হুয়াই! আবির স্যার আমার সিনিয়র কলিগ! প্রয়োজনে তার সাথে আমার কথা বলার দরকার হতেই পারে। আপনি না করার কে?

আদিত্য বাঁকা হেসে এগিয়ে এলো। মৌমিতার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ঝুঁকে এলো মৌমিতার মুখের কাছে। ফের হাস্কি স্বরে বলল,,,

:-বিকজ আই’ম ইউর বস! ইউ আর মাইন!

চমকে তাকালো মৌমিতা। তা দেখে আদিত্য অধর টেনে হাসলো। বললো,,,

:-আই মিন ইউ আর মাই অ্যাসিস্ট্যান্ট! তাই অফিসের যে কোন প্রয়োজনে তুমি আমার কাছে আসবে। আমার কথা মতো চলবে। আমি যা অর্ডার দেবো তুমি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বাধ্য!

:-আপনি আমার বস বলে কি আমার ব্যক্তিগত বিষয়েও হস্তক্ষেপ করবেন? অফিসে আমি কার সাথে কথা বলবো,কার সাথে কথা বলবো না, এগুলো আপনি ঠিক করার কে?

:- আচ্ছা! আমি তোমার কেউ না? আর ইউ শিওর?

আদিত্য আজ কেমন বাঁকা বাঁকা কথা বলছে বুঝতে পেরে ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেলো মৌমিতা। আদিত্য কি কিছু জেনে গেছে! এভাবে কেনো কথা বলছে!

:-এন্ড বাই দা ওয়ে! আবির কবে থেকে তোমার ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে গেলো?

:-আমি সেটা বলিনি। আপনি আমাকে না করছেন কেনো? এখন কি আপনার কথামত চলতে হবে আমাকে?

:-একজ্যাক্টলি! আমার কথামতই তোমাকে চলতে হবে। আমি যখন বলেছি আবিরের সাথে তুমি কথা বলবে না,তখন বলবে না। আমি আর দ্বিতীয় কোন কথা শুনতে চাই না মৌমিতা। Now go! Bring me another strong black coffee.

লাস্টের কথাটা একটু জোরেই বললো আদিত্য। ধমকে চমকে উঠলো মৌমিতা। বাড়তি তর্ক করার আর সাহস পেলো না। হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।

মৌমিতা বেরিয়ে যেতেই চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো আদিত্য। অধর প্রসারিত করে হাসলো। ল্যাপটপের কিবোর্ডে হাত চালিয়ে অফিসের কিচেন এরিয়ার সিসি টিভি ফুটেজ চালু করলো! আদিত্যর স্থির দৃষ্টি স্ক্রিনে! সেথায় মৌমিতা মনযোগ দিয়ে কফি তৈরিতে ব্যস্ত!

______________

ঢাকা শহরের বিকেলটা হয় অবর্ণনীয় সুন্দর।
রোদ আর ছায়ার মিশেলে ব্যস্ত শহরটাকে একটু বেশিই মনোরম লাগে। রাস্তার মাঝ বরাবর লাগানো ফুলের গাছগুলোর পাতায় বিকেলের আলো পড়ে চিকচিক করছে। ট্রাফিকের হর্ন, মানুষের কোলাহল সবকিছুর মাঝেও একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে থাকে বাতাসে।

শপিং মলের ভেতরের শো-পিসের দোকানটায় নোরা ব্যস্ত হাতে কাজ করছে। কাঁচের শেলফে সাজানো রঙিন ক্রিস্টাল, সিরামিক আর ছোট ছোট আর্ট পিস সবকিছু সারি সারি গুছিয়ে রাখছে সে।

ঠিক তখনই দোকানের কাঁচের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলো আয়াত।
কালো প্যান্ট, নীল শার্ট, মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক। তার ওপর আজ আবার চোখে কালো সানগ্লাস পরেছে। নিজেকে পুরোপুরি প্যাকেট করা যাকে বলে।
আয়াত শপে ঢুকেই চারপাশে তাকালো। তার দৃষ্টিতেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কাউকে খুঁজছে।
আয়াত একটু এগিয়ে এসে তাকালো,তখনই নোরার দিকে চোখ পড়তেই পা বাড়ালো সেদিকে।
এদিকে কাউন্টারের পাশ থেকে সবট লক্ষ্য করলো সোহেল।
কালকের সেই ছেলেটাআজও এসেছে! আবার নোরার দিকেই যাচ্ছে।
সোহেলের চোখে রাগ আর ঈর্ষার আগুন জ্বলে উঠলো।
ভাবতে লাগলো,,,,

“কে এই ছোকড়া! প্রতিদিন কোত্থেকে টপকে পড়ে!
হাতের কাজ জোরে জোরে করতে লাগলো সে।

আয়াত এসে নোরার সামনে দাঁড়িয়ে হালকা গলায় বললো,,,

:-হাই!

নোরা চোখ তুলে তাকালো। আয়াত নোরার দিকে তাকিয়ে বললো,,,

:- আমাকে চিনতে পেরেছেন? কাল যে এসেছিলাম ‌। আমার পার্স হারিয়ে গেলো!

নোরা ঠোঁট টিপে মাথা নেড়ে বললো,,,

:- জ্বী মনে আছে! আমার স্মৃতি শক্তি এতোটাও কমজোর নয় মিস্টার! যে একদিনেই ভুলে যাবো।

নোরার কটাক্ষ শুনে হাসলো আয়াত।

:-কালকের সেই শো পিসটা নিতে এসেছি মিস…..

নোরা ভ্রু কুঁচকে একটু গম্ভীর মুখে বললো,,,

:- নোরা ! নোরা আফরিন।

মাস্কের আড়ালে আবারো হেসে ফেললো আয়াত। গমগমে স্বরে বললো,,,

:-আচ্ছা… মিস নোরা! Can I have the show piece?

নোরা আর কিছু না বলে মাথা নাড়লো।

:- শিওর!
সে ঘুরে শেলফের দিকে গেল। খুব যত্ন করে সেই ক্রিস্টাল বার্ডের শো-পিসটা নামালো। গোধূলির রক্তিম সূর্যের আলো পড়তেই পাখিটার ডানায় রঙিন আলো ঝলকে উঠলো।

কাউন্টারে এসে শো-পিসটা আয়াতের সামনে রাখলো নোরা। তারপর হঠাৎ পাশে রাখা তার ছোট্ট হ্যান্ড ব্যাগ থেকে ছোট একটা খাম বার করে এগিয়ে দিলো আয়াতের দিকে

:-এটা… আপনার জন্য।

আয়াত চমকে গেল।

:-আমার জন্য?

নোরা শুধু হালকা হাসলো। কিছু বললো না।
আয়াত আর প্রশ্ন করলো না। বিল পে করে শো-পিস আর খাম হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে।
নোরা আয়াতের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। ঠোঁটের কোণে ছোট্ট এক মুচকি হাসি ফুটে উঠলো তার।
কাল আয়াতকে ঠিকভাবে চিনতে না পারলেও পরে ঠিকই চিনেছিল সে।
আর সেটা বুঝে ভীষণ লজ্জাও পেয়েছিলো।
কারণ না চিনেই কাল তার সামনে বলে ফেলেছিল সে আয়াতকে ভালোবাসে।

আজ সকালে তাই একটা ছোট কাগজে সরি চেয়েছিলো নোরা।

আয়াত যে পাবলিক প্লেসে নিজেকে আড়াল করতে বাইরে এসেছে আজ সেটা বুঝতে পারলো নোরা।
বিকেলের সোনালী আলো জানালা দিয়ে দোকানের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আর সেই আলোতে নোরার বুকের ভেতরে, অজান্তেই,ছলকে উঠলো অচেনা আনন্দের রোদের ঝিলিক।

#চলবে

#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,১০

চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। শিবাজি স্টুডিও থেকে ধীরে পায়ে বের হলো আয়াত। সামনেই গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে তার সফেদ রঙের টয়োটা। তার পেছনে আরেকটা কার, গার্ডদের জন্য। দুজন গার্ড তার পাশে পাশে হেঁটে আসছে। সে এসেছিলো একটা অ্যালবামের কন্ট্রাক্ট সাইন করতে।

গাড়ির কাছে আসতেই একজন গার্ড ডোর খুলে দিলো। ভেতরে নরম আলো জ্বলছে। আদিত্য গাড়িতে বসে গার্ড কে উদ্দেশ্য করে বললো আজকে তাদেরকে আর তার সাথে যেতে হবে না। গাড়ি নিয়ে যেন বাড়িতে চলে যায় তারা।

ঢাকার রাস্তায় সন্ধ্যার ট্রাফিক ধীরে ধীরে বাড়ছে। ড্রাইভার স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে সামনের দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে,কখন জ্যাম ছুটবে।

আয়াত সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ছিলো। হুট করেই তার নোরার দেয়া খামটার কথা মনে পড়লো‌।
প্যান্টের বাম পকেটে হাত গলিয়ে খামটা বের করলো আয়াত। আলতো হাতে খামটা খুললো।
খাম থেকে ভাঁজ করা একটা চিঠি বের করতেই চোখ পড়লো পরিচিত নামের ওপর,,

ফ্রম নোরা আফরিন।

চিঠির প্রত্যেকটা লাইন ধরে ধরে পড়লো সে।

জনাব আয়াত মাহমুদ,

জানি, এইভাবে হঠাৎ করে চিঠি দেয়াটা হয়তো আপনার কাছে অপ্রত্যাশিত।
কিন্তু কিছু কথা না বললে আমার ভেতরটা খুব অস্বস্তিতে ভরে থাকতো।
কাল শপে আপনাকে প্রথম দেখায় আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। কিন্তু আপনি যাওয়ার পর আমি আপনাকে চিনতে পেরেছিলাম।
আমি আপনার গানের ভীষণ বড় ভক্ত।
আপনার কণ্ঠে একটা অদ্ভুত টান আছে… যা অজান্তেই দর্শক, শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
সেদিন না চিনেই আপনার সামনে আপনাকেই বলে ফেলেছিলাম “I love him.”
বিশ্বাস করুন, কথাটা বলার পর কিছু মনে না হলেও যখন থেকে আপনাকে চিনতে পেরেছি তখন থেকেই আমি ভীষণ লজ্জায় ছিলাম।
সেই কারণেই আমার পক্ষ থেকে আজ এই ছোট্ট চিঠি।
যদি আমার কথায় আপনি কষ্ট পেয়ে থাকেন, দয়া করে কিছু মনে করবেন না। এটা ছিল একদম অনিচ্ছাকৃত।
প্লিজ আই’ম সরি!
ইতি
নোরা আফরিন

চিঠিটা পড়তে পড়তে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো আয়াতের।
চিঠি শেষ হতেই আয়াত মাথা হেলিয়ে সিটে ঠেস দিয়ে মনে মনে বললো,,

:-“মিস নোরা…এখন সরি চাইলেই তো হবে না!
কারণ আপনি ইতোমধ্যেই এই আয়াত মাহমুদের বক্ষপিঞ্জরে বন্দী হয়ে গেছেন। এখন দেখুন সামনে সামনে কী হয়!”
হালকা একটা হাসি দিয়ে চোখ বন্ধ করলো আয়াত। কিছুক্ষণ পরেই গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্টের আওয়াজ এলো কানে। গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠলো। জ্যাম ছুটে গাড়িটা আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলো নিজ গন্তব্যের দিকে।

🌆

বসুন্ধরা সিটির আলোকিত রাস্তাগুলো বিদ্যুতিক নিয়ন আলোয় ঝলমল করছে। বিলবোর্ড, আর কাচে ঘেরা আধুনিক রেস্টুরেন্টগুলো শহরটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। চারদিকে মানুষের ভীড়। কেউ ছুটছে নিজের গন্তব্যে তো কেউ প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটছে ‌ আসেপাশের ক্যাফে, রেস্টুরেন্ট গুলোতে অগুনিত মানুষের ভীড়‌।

চারদিকের ভীড়, কোলাহল সবকিছু ছাড়িয়ে একটা অভিজাত রুফটপ রেস্টুরেন্টের সাজানো গোছানো টেবিলে বসে আছে আদিত্য। তার পাশেই দাঁড়িয়ে মৌমিতা।

এই রেস্টুরেন্টেই আদিত্য আর মৌমিতা এসেছে।
একজন ক্লায়েন্টের সাথে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাশন ডিজাইনের ডিল ডিসকাস করতে।
অপর পাশে বসেছে ZARINA Group এর প্রতিনিধিরা।
গ্রুপের বস রায়হান কবির, সাথে তার বিজনেস পার্টনার নাফিস আহমেদ।

আদিত্য ফাইল সামনে রেখে প্রেজেন্টেশন বুঝিয়ে দিচ্ছে তাদের কে।
নতুন ফ্যাশন লাইন, কাপড়ের কোয়ালিটি, ব্র্যান্ড ভ্যালু, মার্কেট স্ট্র্যাটেজি সবকিছু ডিটেইলসে বিবরণ দিয়ে চলেছে আদিত্য।
মৌমিতা চুপচাপ আদিত্যর পাশে দাঁড়িয়ে।
কাজের জায়গায় প্রফেশনাল থাকলেও ভেতরে ভেতরে ভীষণ বোর লাগছে মৌমিতার। তবুও সে কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

অনেকক্ষণ ধরে মৌমিতা কে দেখছে রায়হান। ছেলেটা তরুণ । পঁয়ত্রিশ, ছত্রিশ বছর বয়সী হবে। ২৫ বছর বয়সী মনোমুগ্ধকর মেয়েটির লাবণ্যময় রুপ তার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। তার মনে ধরলো মেয়েটাকে।

হঠাৎ রায়হান হেসে মৌমিতার দিকে তাকিয়ে বললো,,,

:-“আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? বসুন না।

মৌমিতা একটু অপ্রস্তুত হয়ে আদিত্যর দিকে তাকালো।
আদিত্য কিছু বললো না। তাই ধীরে একটা চেয়ারে বসল সে।
কথা চলতে থাকলো আগের মত।

কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তখনই যখন আদিত্য হঠাৎ খেয়াল করলো মিস্টার নাফিস তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেও রায়হানের মন সেখানে নেই।
তার দৃষ্টি বারংবার মৌমিতার দিকে যাচ্ছে।
সেই দৃষ্টিতে শুধু মুগ্ধতা নয়, সাথে স্পষ্ট ইন্টারেস্ট দেখতে পাচ্ছে আদিত্য।

রায়হান কে মৌমিতার দিকে এভাবে তাকাতে দেখে আদিত্যর চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। হাত দুটো অজান্তেই মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো।

হঠাৎ জোরে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো আদিত্য।
হিংস্র কন্ঠে হুঙ্কার দিয়ে উঠলো,,,

:- Mr. Rayan! What the hell is going on?

হঠাৎ এই হুঙ্কারে সবাই চমকে উঠলো। স্তব্ধ হলো রুফটফ। মৌমিতা তো ভয়ে কাঠ হয়ে গেলো মুহুর্তেই।
তবে কিছুই বুঝতে পারলো না হঠাৎ আদিত্যর কী হলো!

রায়হান বিস্মিত গলায় বললো,,

:- Mr. Aditya, what are you saying?

আদিত্য দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,,

:- Your company will not get any deal from us! Now get out!

আদিত্যর কথায় মিস্টার নাফিস, রায়হান দু’জনেই হাঃ করে তাকিয়ে রইলো।
রায়হান উদগ্রীব হয়ে বললো,,,

:-এত বড় অংকের একটা ডিল আপনি ক্যান্সেল করছেন? কিন্তু কেন?
আমাদের কন্ট্রাক্ট পেপারে কি কোনো সমস্যা আছে?

আদিত্য আবারো দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত গলায় বললো,,,

:-সমস্যা তোর কন্ট্রাক্টে না… সমস্যা তোর চোখে।
যেটা তোর জন্য নিষিদ্ধ, সেদিকেই নজর দেওয়ার ভুল করেছিস তুই। বেঁচে থাকতে চাইলে এখনই এখান থেকে দাফা হয়ে যা!

রায়হানের মুখ লাল হয়ে উঠলো স্পষ্ট অপমানে।

:-“Mr. Aditya, you’re insulting me publicly!
আমার একটা রেপুটেশন…..

রায়হানের কথা সম্পূর্ণ না হতেই ধমকে উঠলো আদিত্য,,,

:- তোর রেপুটেশন আমার বোঝা হয়ে গেছে!
এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যা, নাহলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর অবস্থায়ও থাকবি না! গট ইট?

চারপাশে তাকিয়ে নিজের অপমান টুকু গিলে নিয়ে
রায়হান ধীরে উঠে রেস্টুরেন্ট ছেড়ে চলে গেলো মিস্টার নাফিসও তার পিছু নিলো। লোকটার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে,,এই মুহূর্তে কি ঘটলো সবটা তার মাথার উপর দিয়ে গেছে!

ঘুটঘুটে নীরবতা ছেয়ে আছে রেস্টুরেন্টে।
আদিত্য রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে চেয়ারে বসে পড়লো। দু’হাতে চুল মুঠো করে ধরে আছে রাগ দমনের চেষ্টায়।
এক পাশে মৌমিতা কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে। হুট করে আদিত্যর কি হলো,কেনো রেগে গেলো বুঝতে পারেনি সে। কিন্তু আদিত্যর এতো ভয়ঙ্কর রূপ সে আগে কখনো দেখেনি।
বিয়ের বয়স পাঁচ বছর হলেও আদিত্যকে কাছ থেকে জানার কোন সুযোগই তো সে পায়নি কখনো।

কিছুক্ষণ পর আদিত্য চোখ তুলে তাকালো। আদিত্যর
রক্তিম চোখজোড়া দেখে আঁতকে উঠলো মৌমিতা।
মৌমিতার ভয়ার্ত মুখ দেখে আদিত্য নিজেকে সামলে নিলো দ্রুত।
গভীর শ্বাস টেনে নিলো নিজের মধ্যে।
আদিত্য বেশ অনুভব করতে পারছে কেনো তার এই রাগ।

নিজের ভালোবাসার মানুষের দিকে, নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে অন্য পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি তার সহ্য হয়নি। রায়হানের মৌমিতার প্রতি মুগ্ধ দৃষ্টি গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে আদিত্যর।

মৌমিতা আদিত্য কে শান্ত হতে দেখে সাহস সঞ্চয় করে বললো,,,

:- স্যার… ডিলটা তো আমাদের কোম্পানির জন্য খুব ফায়দামান ছিলো। তাহলে হঠাৎ ক্যান্সেল কেনো করলেন? আর এতো রেগেই বা গেলেন কেনো?

মৌমিতার কথায় আদিত্য ধীরে এগিয়ে এলো। থামলো গিয়ে মৌমিতার একদম কাছে। কিছুটা ঝুঁকে
তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,,,

:-কারণ ওই লোকটার ডিলের থেকে অন্য কিছুর প্রতি ইন্টারেস্ট বেশি ছিলো। যেটা তার জন্য নিষিদ্ধ।
শুধু সে কেন… পৃথিবীর সব পুরুষের জন্যই নিষিদ্ধ।
কারণ ওই জিনিসটা আমার। শুধু মাত্র আমার!

আদিত্যর এত কাছে আসায় মৌমিতার শরীর শিহরণে কেঁপে উঠলো।
দু’হাতে কামিজের কিনারা শক্ত করে চেপে ধরে
চোখ খিচে বন্ধ করে রইলো সে। তার বন্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে আদিত্য বাঁকা হেসে চোখ বরাবর হালকা ফুঁ দিলো। তারপর এক পা পিছিয়ে সরে দাঁড়ালো।

মৌমিতা চোখ খুলে আদিত্য কে তার থেকে দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসতে দেখে অপ্রস্তুত হলো বেশ।

#চলবে