Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-২৬+২৭

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-২৬+২৭

0
404

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব—২৬
মৌমো তিতলী

ছাদের ওপর চারদিকে সাদা ফেয়ারি লাইটের মৃদু আলো। গোলাপ আর লিলির মিষ্টি সুবাসে ভরে আছে পুরো পরিবেশ। হালকা বাতাসে দুলছে পাতলা সাদা পর্দাগুলো। নিচে আলোকিত ঢাকা শহর যেন অসংখ্য তারার প্রতিচ্ছবি হয়ে ঝলমল করছে।
আদিত্য আর মৌমিতা নিচে নেমে যেতেই চারপাশ আরও নিরব হয়ে উঠলো।
আয়াত আর নোরা দুজনেই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
নোরা যেন এখনও বিশ্বাসই করতে পারছে না এই সবকিছুর আয়োজন শুধুমাত্র তার জন্য।

আয়াত তৃপ্ত হেসে বলল,,

— কী হলো? এমন চুপ করে আছো কেন?

নোরা ধীরে ধীরে চারপাশে তাকিয়ে বলল,,

— বিশ্বাস হচ্ছে না… কেউ আমার জন্য এত সুন্দর কিছু করতে পারে। ছোটবেলা থেকে আমি কখনো এতো আন্তরিকতা, ভালোবাসা, যত্ন, ভালোবাসা পাইনি জানেন!

আয়াত এক পা এগিয়ে এলো নোরার পানে। নোরার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললো,,,

— সবকিছু পেছনে ফেলে একটা নতুন জীবনের শুরু করো নোরা।

নোরা বেশ অবাক হয়ে গেল,,,

— নতুন শুরু?

— হ্যাঁ। আমি চাই তোমার জীবনের প্রতিটা বিশেষ মুহূর্ত এমনই সুন্দর হোক। এতদিন যা পাওনি, সামনে যেন তার চেয়েও অনেক বেশি পাও।
নোরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠলো জল। এতো ভালোবাসা পেয়েও কেনো তার মনের ভার কমে না! কেনো ভয় হচ্ছে নোরার, সবকিছু হারিয়ে ফেলার।
মনের ভয়টা মনেই চেপে রাখে। এসব বলে আয়াতের চিন্তা বাড়াতে চাইলো না সে। অতঃপর বললো,,

— জানেন… ছোটবেলায় যখন অন্যদের বাবা-মাকে দেখতাম, তখন মনে হতো আমার জীবনটা হয়তো এমনই থাকবে। কেউ কখনো আমার জন্য অপেক্ষা করবে না, আমার পছন্দ-অপছন্দ জানবে না…। চাচা চাচির সংসারে সর্বদা একটা বাড়তি বোঝার মতো ছিলাম। আমার বাবার সম্পত্তি ভোগ করেও ওরা আমার প্রতি বিন্দুমাত্র কোমল হয়নি। বরং আমাকে বিয়ের নামে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিতে চেয়েছে। আমি যদি নিজের জেদ নিয়ে সাহস করে বাড়ি ছেড়ে না আসতাম, তাহলে হয়তো এতো দিন বেঁচেই…..

নোরার কথা শেষ করতে দিলো না আয়াত। নিজের আঙ্গুল দ্বারা চেপে ধরলো নোরার কোমল ঠোঁটজোড়া।
আয়াত দু পা এগিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো।
নরম গলায় বলল,,,

— এখন থেকে আর কখনো এমনটা বলবে না।
এক মুহূর্ত থেমে খুব ধীর স্বরে যোগ করলো,,,

— কারণ এখন থেকে তোমার অপেক্ষায় একজন মানুষ সবসময় থাকবে। একজন যে তোমার সব স্বপ্ন,সব ইচ্ছেকে নতুন করে প্রাণ দিবে, তোমার সবকিছু সবকিছুর সাথে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিবে।

নোরা চোখ তুলে তাকালো আয়াতের চোখের দিকে।
সেই চোখে ছিল বিশ্বাস,ভরসা,ভালোবাসা আর অদ্ভুত এক নিরাপত্তার অঙ্গিকার ।

আয়াত আর কথা না বাড়িয়ে আলতো করে চেয়ার টেনে দিল।

— ম্যাডাম, আজকের এই নির্মল সুন্দর ডিনারের মধ্যেমণি আপনি। প্লিজ হ্যাভ এ সিট!

নোরা ফিক করে হেসে উঠলো। আয়াতের ইশারায় বসে পড়লো চেয়ারে।
আয়াত টেবিলে সাজানো খাবারের ওপর থেকে পাতলা মখমলে সাদা কাপড়টা সরিয়ে নিতেই দৃশ্যমান হলো
গরম গরম গ্রিলড স্যামন, হার্ব রাইস, পাস্তা, স্যুপ, নানা রকম সালাদ, ডেজার্ট আর দু’গ্লাস ফ্রেশ জুস।

নোরা অবাক হয়ে বলল,
— এত কিছু!

আয়াত কাঁধ ঝাঁকালো। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,,

— তোমার জন্য কম হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

— আয়াত! আপনি কি ইনডাইরেক্টলি আমাকে মোটা বললেন?

শব্দ করে হেসে উঠলো আয়াত। টেবিলের ওপর ঝুঁকে এলো প্রেয়সীর মুখের কাছাকাছি। ফিসফিস করে বলল,,

—Do you know how much your Chubby figure fascinates me?

নোরা লাজে চোখ নামিয়ে নিলো আয়াতের কথায় ভঙ্গিতে। নোরার সেই লাজে রাঙা মুখের দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে রইলো আয়াত। মেয়েটা এতো আকর্ষন করে তাকে!

টুকটাক খাওয়ার দাওয়ার মাঝে হুট করেই একসময় আয়াত বলল,,,

— একটা প্রশ্ন করবো?

নোরা আয়াতের দিকে তাকালো প্রশ্ন শুনে। জুসের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললো,,,,

— করুন।

— বিয়ের আগে কোথায় যেতে চাও? আই মিন মিঙ্গেল হয়ে যাওয়ার আগে প্রেমিকের সাথে শেষবারের মতো কোথাও যাওয়া বা এমন কোন ইচ্ছে থাকলে বলতে পারো নির্দ্বিধায়।

নোরা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,,,,

— একটা ইচ্ছে আছে।

আয়াত ভ্রু তুললো।
— কি সেটা?

— আপনার সঙ্গে একটা সাধারণ সন্ধ্যা কাটাতে চাই।

— সাধারণ সন্ধ্যা বলতে!

নোরা মুচকি হাসলো।

— আমার সাথে এমন একটা সন্ধ্যা কাটাবেন প্লিজ,যে সন্ধ্যায় আপনার সাথে কোন গার্ড থাকবে না,কোন ক্যামেরার ফ্ল্যাশ থাকবে না, একদম সাধারণ এক আয়াত কে চাই আমি। একজন সাধারণ মানুষের মতো আমার সাথে সন্ধ্যাটা কাটাবেন‌। দিবেন এমন একটা সন্ধ্যা আমাকে?

আয়াত কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর মুগ্ধ হয়ে বলল,,
— এত ছোট্ট একটা স্বপ্নও এত সুন্দর করে কেউ সাজতে পারে!

নোরা আস্তে করে বলল,,,

— আমার স্বপ্নগুলো সবসময়ই ছোট ছিল। অলিক কল্পনা করতে কখনো সাহস করিনি আমি। কিন্তু আপনি নামক অলিক স্বপ্নটা কিভাবে যে পেয়ে গেলাম আমি, জানিনা।

আয়াত উঠে এলো নোরার কাছে। হাত বাড়িয়ে নোরার হাতটা ধরে এগিয়ে গেলো ছাদের রেলিংয়ের দিকে। ঝলমলে রাতের শহরের দিকে তাকিয়ে বলল,,,

—আজ থেকে তোমার স্বপ্নগুলো আর ছোট থাকবে না।

নোরা প্রশ্নবোধক চোখে তাকাতেই আয়াত নরম স্বরে বলল,,,

— তোমার যত স্বপ্ন আছে, সেগুলো পূরণ করার দায়িত্ব আজ থেকে আমার।

কথাটা শুনে নোরা কিছু বলতে পারলো না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
হঠাৎই ছাদের ওপর দিয়ে একঝলক ঠান্ডা বাতাস বয়ে গেলো,তাতে নোরার কপালের সামনে নেমে আসা চুলগুলো উড়ে মুখের ওপর এসে পড়লো।
আয়াত খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে আলতো করে চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিলো।
মুহূর্তটুকুতে দুজনের চোখ আটকে রইলো দুজনার দিকে। চারপাশের পৃথিবী যেন থেমে আছে।
দূর হতে ভেসে আসছে রবীন্দ্র সংগীত।

আমি তোমারও সঙ্গে বেঁধেছি আমারও প্রাণ….
সুরের ও বাঁধনে… তুমি জানো না…

নোরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো।

আয়াত মৃদু হেসে বলল,,,

— একটা কথা বলবো?

— বলুন।

— আজকে তোমাকে সুন্দর লাগছে।

নোরা লাজুক হেসে উত্তর দিল,,,

— শুধু আজ?

— উমম না… প্রতিদিনই সুন্দর লাগে। তবে আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে।

নোরা ঠোঁট কামড়ে হাসি চাপলো।

— আপনি কি আপনার সব ফিমেল ফ্যানদের সাথেও এত সুন্দর করে কথা বলেন?

— না।

— তাহলে?

আয়াত একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে বলল,,,

— শুধু আমার হবু স্ত্রীর সঙ্গে বলি।

নোরার গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠলো।
সে খুব আস্তে বলল,,,

— আপনি না…

আয়াত ঝুঁকে এলো প্রেয়সীর পানে। কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,,

— কী আমি?

কেঁপে উঠলো নোরা। কাঁপা গলায় ভাঙ্গা স্বরে বলল

— দিন দিন খুব…

আয়াত হেসে বলল,,,,
— দিন দিন খুব কি? রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছি?

নোরা কোনো উত্তর দিতে পারলো না। লজ্জায় কন্ঠ বুজে এলো ওর।
আয়াত নোরাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না। হুট করেই বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে।খুব আলতো করে নোরার হাতটা ধরে বলল,,,

— আজ থেকে এই হাতটা আর কখনো একা থাকবে না।

এদিকে এই প্রথমবারের মতো আয়াতের এতোটা নিবিড় সংস্পর্শে এসে থমকে আছে নোরার। অদ্ভুত এক অনুভূতিরতে চোখ আবারও ভিজে উঠলো তার। সে কিছু না বলে বুকের সাথে লেপ্টে থেকেই শুধু মাথা নাড়লো।
মাথার উপর উপরে অসংখ্য তারা। নিচে আলোকিত শহর। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষ,যারা ধীরে ধীরে ভালোবাসার নতুন অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করতে করতে তারা ছাদের রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে শহরের আলো দেখতে দেখতে
কখন যে সময় পেরিয়ে গেছে, কেউই বুঝতে পারেনি।
অবশেষে রাত প্রায় আড়াইটা ছুঁইছুঁই তখন দুজন নিচে নেমে এলো।

__________

পরদিন ভোর থেকেই আশাকুঞ্জ যেন নতুন এক রূপ ধারণ করলো।
আজ আয়াত মাহমুদ ও নোরার বাগদানের দিন।
সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে শুরু হয়ে গেল ব্যস্ততা।
ডেকোরেটর, ফ্লোরিস্ট, লাইটিং টিম, ক্যাটারিং সার্ভিস, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার এক এক করে সবাই এসে পৌঁছাতে লাগলো আশাকুঞ্জে।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠতে শুরু করলো…

বাড়ির মূল ফটক থেকে শুরু করে পুরো ড্রাইভওয়ে জুড়ে বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল কার্পেট। দু’পাশে সাদা, গোলাপি আর অফ-হোয়াইট গোলাপের বিশাল বিশাল ফ্লোরাল আর্চ। তার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে ঝাড়বাতির আদলে তৈরি ক্রিস্টাল লাইট, যার ঝিকিমিকি আলো দিনের বেলাতেও চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
আশাকুঞ্জের পেছনের লনের বিশাল বাগানটিকে পরিণত করা হয়েছে একটি অভিজাত ওপেন-এয়ার এনগেজমেন্ট ভেন্যুতে। মঞ্চটি তৈরি করা হয়েছে সাদা ও সোনালি থিমে।
মঞ্চের পেছনে বিশাল এলইডি স্ক্রিনে ফুটে উঠছে

Ayat Mahmud & Nora Afrin Forever Begins Today…”

চারপাশে তাজা গোলাপ, অর্কিড, লিলি আর বেবি’স ব্রেথ ফুলের অপরূপ সাজ। মঞ্চের মাঝখানে রাজকীয় নকশার দুটি অফ-হোয়াইট ভেলভেট সোফা।তার ওপরেও সূক্ষ্ম সোনালি কারুকাজ। মাথার ওপর ঝুলছে তিন স্তরের বিশাল ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি।
চারপাশে ছোট ছোট ফোয়ারা থেকে বেরিয়ে আসা পানির ধারা সূর্যের আলোয় রংধনুর মতো ঝিলমিল করছে। বাগানের একপাশে সাজানো হয়েছে লাইভ মিউজিক কর্নার। দেশের খ্যাতনামা কয়েকজন বাদ্যযন্ত্রী টিউন করছেন সেথায়।
আরেক পাশে তৈরি করা হয়েছে মিডিয়া জোন।
জাতীয় টেলিভিশন, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিনোদন সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার সবারই আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে এরই মধ্যে।

কারণ আজ সাধারণ কোন বাগদান নয়…
আজ দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আয়াত মাহমুদের জীবনের বাগদানের বিশেষ দিন।
সারাদিনের প্রস্তুতির পর বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই পুরো আশাকুঞ্জ যেন আলোর রাজ্যে পরিণত হলো।
হাজার হাজার ফেয়ারি লাইট একসঙ্গে জ্বলে উঠতেই পুরো বাড়িটা দূর থেকে যেন রাজপ্রাসাদের মতো লাগছে।
প্রবেশদ্বারের সামনে একের পর এক দামি গাড়ি এসে থামছে।
আয়াত আর আদিত্য দু’জনের পক্ষ থেকেই প্রিমিয়াম গেস্ট দের আগমন শুরু হয়েছে। আদিত্যর ইনভাইটেশনে দেশের শিল্পপতি,
রাজনীতিবিদ,ব্যবসায়ীরা এবং আয়াতের ইনভাইটেশনে চলচ্চিত্র তারকা,সংগীতশিল্পী,বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা পরিবার নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হচ্ছেন।
প্রত্যেক অতিথিকেই ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন বাড়ির কর্মীরা।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশে মুহূর্তে মুহূর্তে আলোকিত হয়ে উঠছে পুরো পরিবেশ।

নিজের বরাদ্দকৃত রুমে বড় আয়নার সামনে বসে আছে নোরা। তার চারপাশে ব্যস্ত বিউটিশিয়ানরা। আজ তাকে সাজানো হচ্ছে খুবই শালীন এবং জমকালো সাজে।

সে পরেছে গভীর এমেরাল্ড সবুজ রঙের এমব্রয়ডারি করা সিল্ক শাড়ি। পুরো পোশাকে সূক্ষ্ম জরি, মুক্তো আর সিকুইনের নিখুঁত কাজ। এই শাড়ি টাই সেদিন শপিং মলে পছন্দ করেছিলো আয়াত।
গলায় এমেরাল্ড আর হীরের ভারী নেকলেস,কানে মানানসই ঝুমকা,কপালে ছোট্ট টিকলি।
হাতে সবুজ আর সোনালি চুড়ির সঙ্গে হীরের ব্রেসলেট।
হালকা মেকআপে তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। খোলা চুলের অর্ধেক অংশ নরম কার্ল করে পেছনে সাজানো হয়েছে, বাকিটা কোমর ছুঁয়ে নেমে এসেছে। নিজেকে আয়নায় দেখে নোরার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না…এ কি সত্যিই সে?

ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো মৌমিতা।
নোরাকে দেখেই কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো সে।
তারপর হেসে বলল,,

— মাশাআল্লাহ…আজ তোকে দেখে চোখই সরানো যাচ্ছে না রে।

নোরা হেসে বলল,,,

— সত্যি?

— হুম, একদম সত্যি। আজ তোকে দেখে মনে হচ্ছে আকাশ থেকে কোনো পরী নেমে এসেছে।

নোরা হেসে মৌমিতার হাতটা শক্ত করে ধরলো।

— তুই না থাকলে আজকের দিনটা হয়তো কোনোদিনই আমার জীবনে আসতো না।

মৌমিতা মৃদু হেসে তাকে জড়িয়ে ধরলো।

— এই না,, একদম না,,আজ কিন্তু কাঁদা নিষেধ।
আজ থেকে শুধু হাসবি,প্রাণ খুলে হাসবি ঠিক আছে?

—সে ঠিক আছে কিন্তু তুই এখনো তৈরি হসনি কেনো?

নোরা কে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ালো মৌমিতা। আলতো করে নোরার গাল টিপে দিয়ে বলল,,,

—এক্ষুনি গিয়ে তৈরি হয়ে নিচ্ছি। বলেই হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে এলো মৌমিতা।

অন্যদিকে…

আয়াতের রুমেও চলছে সাজসজ্জার বহর।
সে পরেছে অফ-হোয়াইট রঙের রয়্যাল স্যুট। কলারে সূক্ষ্ম জারদৌসি কাজ। বুকে লক্ষাধিক মূল্যর ব্রোচ।
হাতে ক্লাসিক ঘড়ি। চুল সুন্দরভাবে সেট করা।
হালকা ট্রিম করা দাড়িতে তাকে আরও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লাগছে।
ঠিক তখন দরজায় নক করলো বিপাশা মাহমুদ।
ভেতরে ঢুকেই ছেলেকে তৈরি হতে দেখে মুচকি হেসে বললেন,,,

— আজ তো আমার ছেলেটাকে দেখে মনে হচ্ছে ফিল্ম স্টররাও হিংসে করবে।

আয়াত হেসে বলল,,

— কি বলছো আম্মু ! সুন্দর লাগে নাকি! আমি কিন্তু ভীষণ নার্ভাস।

তিনি আয়াতের কাঁধে হাত রেখে বলল,,,

— ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পাওয়ার আগে একটু নার্ভাস হওয়াটাই স্বাভাবিক। দেখবি, সব ঠিকঠাক হবে।
আয়াত মুচকি হেসে মাথা নাড়লো।

—তাই যেন হয় আম্মু।

অন্যদিকে…

নিজের রুমের বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই ঠিক করছিল আদিত্য।

আজ সে পরেছে ডার্ক নেভি-ব্লু রঙের থ্রি-পিস স্যুট। সাদা শার্টের সঙ্গে সিলভার-গ্রে টাই। কোটের বুক পকেটে সাদা সিল্কের পকেট স্কয়ার। হাতে রয়্যাল ক্লাসিক ঘড়ি, পায়ে কালো অক্সফোর্ড শু। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল আর হালকা ট্রিম করা দাড়িতে তাকে বরাবরের মতোই ব্যক্তিত্বময় লাগছে।
পারফিউমের হালকা সুবাস পুরো ঘরে ছড়িয়ে আছে।

ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেলো। দরজা খোলার আওয়াজে আদিত্য অবচেতন মনেই আয়নার দিকে তাকালো। আর পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল।
ওয়াশরুম থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো মৌমিতা।
আজ সে পরেছে ময়ূরকণ্ঠী রঙের সেই শাড়িটাই যেটা কয়েকদিন আগে শপিং মলে নিজের হাতে পছন্দ করে কিনে দিয়েছিল আদিত্য।

শাড়িজুড়ে সূক্ষ্ম রুপালি জরির কাজ আলো পড়তেই নক্ষত্রের মতো ঝিকমিক করছে।
স্লিভলেস নয়, বরং শালীন ফুল-স্লিভ ব্লাউজে তাকে আরও অভিজাত লাগছে।
কোমর ছুঁয়ে নেমে আসা লম্বা খোলা চুলের একপাশে গুঁজে রাখা ছোট্ট সাদা গোলাপ।
গলায় সাদা পাথরের সেট, কানে দুল, হাতে রুপালি-সাদা কাঁচের চুড়ি।
হালকা মেকআপেও মৌমিতার সৌন্দর্য যেন ঠিকরে পড়ছে।

আদিত্য একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।

মৌমিতা আয়নার দিকে তাকিয়ে আপন মনে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতেই আয়নায় আদিত্যর স্তব্ধ চাহনি দেখে বলল,,,

— কী হলো, এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?

কোনো উত্তর এলো না। সে ঘুরে তাকাতেই দেখলো আদিত্য এখনও একইভাবে তাকিয়ে আছে।

মৌমিতা দ্বিধান্বিত হয়ে বলল,

— এভাবে কী দেখছেন?

আদিত্য ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে এলো।
একদম সামনে এসে থামলো।
কেমন এলোমেলো গলায় বলল,,,

— তুমি আমাকে শেষ করেছো মেয়ে। এই সাজ,এই সৌন্দর্য আমার সহ্য সীমার বাইরে। আমার সহ্য হচ্ছে না মৌমি। এভাবে,,,,এভাবে বাইরে গেলে সবাই তোমাকে দেখবে। মুগ্ধ হবে। I can’t tolerate this at all…

মৌমিতার গাল লাল হয়ে উঠলো। চোখ নামিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বলল,,

— আপনি না… আপনি তো নিজেই পছন্দ করে দিলেন সেদিন!

—আই নো…বাট এই মুহূর্তে আমার ইচ্ছে করছে তোমাকে সবার থেকে লুকিয়ে রাখতে। এতো সুন্দর কেনো তুমি? কেনো ঘায়েল করো আমাকে প্রতিবার! I am dying of your addiction.

— সবসময় এমন কথা বলেন কেন? নির্লজ্জ পুরুষ!

আদিত্য মৃদু হেসে আলতো করে তার কপালের ওপর নেমে আসা একগুচ্ছ চুল কানের পাশে সরিয়ে দিল।

— কারণ সত্যিটা বলতে আমার ভালো লাগে।

মৌমিতা চোখ নামিয়ে ফেললো।

আদিত্য তার দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল,

—প্লিজ আজকে আমরা নিচে না যায়! আজ আমি শুধু আমার বউকে দেখবো।

মৌমিতার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো। আদিত্যর কন্ঠে যেন আজ চুম্বকের মতো টানছে। এতোটা উতলা হয়ে উঠেছে কেনো লোকটা।

মৌমিতা খুব আস্তে বলল,,,

— পাগল হয়ে গেছেন আপনি। চলুন… সবাই অপেক্ষা করছে। বলেই এক পা বাড়াতে নিলেই হাত ধরে আঁটকে দিলো আদিত্য। মৌমিতা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালো তার দিকে।

আদিত্য থমথমে স্বরে বলল,,,

— এক মিনিট।

মৌমিতা ভ্রু কুঁচকালো।

— আবার কী?

আদিত্য মৌমিতার শাড়ির আঁচল নামিয়ে কোমরের কাছে ছোট্ট একটা পিন আঁটকে দিলো।

— নাও ইউ লুকিং পারফেক্ট।

মৌমিতা মুচকি হেসে বলল,,,

— আপনি বিদেশে থাকতে শুধু অফিস চালানোর কাজই করতেন নাকি স্টাইলিস্টের কাজও করতেন সত্যি করে বলুন তো?

আদিত্য মৌমিতার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিলো। কপালে অধর ছুঁইয়ে বললো,,

— তোমার ক্ষেত্রে সব কাজই করতে পারি।

তখনই আচমকা দরজায় টোকা পড়লো।
বাইরে থেকে আশালতা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো,

— আদি… মৌমিতা… সবাই নিচে চলে এসেছে। সবাই তোমাদের খোঁজ করছে আব্বা। নিচে আসবে না?

শাশুড়ির গলা পেতেই ছুটতে চাইলো মৌমিতা। কিন্তু লোকটা তাকে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। মৌমিতাকে নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেই মা’কে জবাব দিলো সে,,

—দু মিনিটে আসছি আম্মু!

কিছুক্ষণে আর আশালতা বেগমের সাড়া পাওয়া গেলো না। আদিত্য আবারও মৌমিতার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। মৌমিতা কিছু বলতে নিলেই অধর আঁকড়ে ধরলো আদিত্য।

__________

কয়েক মিনিট পরই পাশাপাশি রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এলো আদিত্য আর মৌমিতা।
নিচে নেমেই যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করলো তারা।

পুরো অনুষ্ঠানস্থল অতিথিতে পরিপূর্ণ। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একের পর এক জ্বলে উঠছে।
জাতীয় টেলিভিশন, সংবাদমাধ্যম এবং বিনোদন সাংবাদিকেরা অনুষ্ঠানটি কভার করছেন।
স্টেজের সামনে বসে আছেন দেশের বিশিষ্ট অতিথিরা।
সবাই অপেক্ষা করছে আজকের বিশেষ মুহূর্তটির জন্য।
ঠিক সন্ধ্যা সাতটায় আদিত্যর কণ্ঠ ভেসে এলো,,

— Ladies and gentlemen, the most awaited moment of the day is about to begin in the presence of all of you,

করতালিতে মুখর হয়ে উঠলো পুরো আশাকুঞ্জ।
সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো আয়াত আর নোরা।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যেন থামছেই না।

আয়াতের চোখ শুধু নোরাকেই দেখছে।
নোরাও লাজুক হাসি নিয়ে চোখ নামিয়ে নিচ্ছে বারংবার। মঞ্চের মাঝখানে এসে দুজন পাশাপাশি দাঁড়ালো। পরিবারের সদস্যরা তাদের চারপাশে এসে দাঁড়ালেন।

আদিত্য আবারও ঘোষণা দিলো,,

— Now the ceremony of exchanging rings between Ayat Mahmud and Nora Afrin is about to begin.

একজন কর্মচারী রুপালি ট্রেতে করে দুটি হীরার আংটি নিয়ে এগিয়ে এলো। প্রথমে আয়াত আংটিটি হাতে নিল।
কিছুক্ষণ নোরার দিকে তাকিয়ে থেকে খুব যত্ন সহকারে তার অনামিকায় আংটিটি পরিয়ে দিল।

মুহূর্তেই চারদিক করতালিতে মুখর হয়ে উঠলো।
ফুলের পাপড়ি উড়ে এলো ওপর থেকে।
নোরা লাজুক হেসে অন্য আংটিটি তুলে নিল।
ধীরে ধীরে আয়াতের হাত ধরে তার অনামিকায় পরিয়ে দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই আশাকুঞ্জের আকাশ আলোকিত করে ফুটে উঠলো আতশবাজির ঝলক।
চারপাশে করতালি, শুভেচ্ছা আর হাসির রোল।
ক্যামেরার ফ্ল্যাশে বন্দি হয়ে রইলো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটি।
বিপাশা মাহমুদ আবেগে চোখ মুছলেন।
সাদমান চৌধুরী এগিয়ে এসে আয়াতকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন অভিভাবকের ন্যায়।

এরপর নোরার মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে বললেন,

— আজ থেকে তুমি আর অতিথি নও…তুমি এই পরিবারের মেয়ে। আমাদের বাড়ির আরেকটা বউ।

বাবার মতো মানুষটার কথায় নোরার চোখ ভিজে উঠলো। সে সম্মানের সঙ্গে সালাম করলো সাদমান চৌধুরীকে।

পরিবারের সবাই একে একে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানাতে এগিয়ে এলেন।
একপাশে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল আদিত্য আর মৌমিতা।

মৌমিতা মৃদু স্বরে বলল,

— দেখুন না… কী সুন্দর লাগছে ওদের দুজনকে।

আদিত্য হাসিমুখে উত্তর দিল,

— হ্যাঁ।

আজ সত্যিই মনে হচ্ছে আমি ভীষণ সুখী আর ভাগ্যবতী। যে এমন একটা পরিবার পেয়েছি। নোরার মতো একজন বন্ধু পেয়েছি।

মৌমিতা নিঃশব্দে আয়াত আর নোরার দিকে তাকিয়ে রইলো। অজান্তেই আদিত্যর হাতটা আলতো করে আঁকড়ে ধরে রইলো।

আজকের দিনটা চারটি হৃদয়ের সুখ, দুটি পরিবারের বন্ধন আর নতুন সম্পর্কের এক অনন্য উৎসব হয়ে স্মরণীয় হয়ে রইলো।

চলবে…

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব—২৭
মৌমো তিতলী

আয়াত নোরার বাগদানের পর দেখতে দেখতেই কেটে গেছে দুটো দিন।
আশাকুঞ্জ এখন প্রতিদিনই নতুন নতুন ব্যস্ততায় মুখর। বিয়ের আর খুব বেশি দেরি নেই। ডিজাইনার, ইভেন্ট প্ল্যানার, আত্মীয়-স্বজন,কেনাকাটা সব মিলিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুরো বাড়িটা যেন উৎসবের প্রস্তুতিতে ডুবে আছে।

সাথে আয়াতেরও ব্যাস্ততার শেষ নেই। পরপর দুটো গানের অ্যালবাম রেকর্ডিং করতে হচ্ছে তার। তবে এই সমস্ত ব্যস্ততার মাঝেও আয়াত একটা কথা ভুলতে পারেনি।

ছাদের সেই সারপ্রাইজ ডিনারের রাতে নোরা বলেছিল,,

“আপনার সঙ্গে একটা সাধারণ সন্ধ্যা কাটাতে চাই। কোনো গার্ড থাকবে না, কোনো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ থাকবে না… শুধু একজন সাধারণ আয়াতকে চাই।”

সেদিনই মনে মনে কথা দিয়েছিল সে। সেই ইচ্ছেটা পূরণ করবেই।
বিকেলের দিকে নিজের স্টুডিওর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ফোন হাতে নিয়ে মুচকি হাসলো আয়াত। কয়েক সেকেন্ড পরই কাঙ্খিত নাম্বারে ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো নোরার মিষ্টি কণ্ঠ,,,

— হ্যালো… আসসালামুয়ালাইকুম!

— ওয়ালাইকুম আসসালাম। কী করছেন ম্যাডাম?

— করার মতো তেমন কিছু তো করতেই দেয় না কেউ‌। ফ্রি আছি। কিন্তু কেনো বলুন তো!

— সত্যি ফ্রী আছো?

— মিথ্যে বলার কী আছে?

আয়াতের ঠোঁটে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো। নোরাকে বিব্রত করে শান্তি পাই সে।

— তাহলে আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে বের হবে?

নোরা অবাক হয়ে বলল,

— কোথায়?

— কোথাও না…তবে তুমি সেখানে বলবে সেখানেই। আজ তোমার ছোট্ট একটা স্বপ্নটা পূরণ করতে চাই নোরা! আজ একজন সাধারণ মানুষের মতো শুধুমাত্র তোমার প্রেমিক হয়ে আয়াত একটা সন্ধ্যা কাটাতে চাই! যাবে আয়াতের সাথে?

কথাটা শেষ হতেই কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে রইলো নোরা। স্তব্ধতায় কন্ঠ বুজে এলো তার। তারপর মুহূর্তেই ছোট্ট শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠলো,,

— সত্যি বলছেন?

— হুম, একদম সত্যি।

নোরার চোখদুটো আনন্দে চিকচিক করে উঠলো।

— আমি যাবো… অবশ্যই যাবো।

তবে যেন কিছু মনে পড়তেই সে বলল,,,

— কিন্তু…একটা শর্ত আছে।

আয়াত নোরার বাচ্চামি ভরা কন্ঠে হেসে ফেললো।

— আচ্ছা বলো, কী শর্ত?

— আমাদের সঙ্গে আদিত্য ভাইয়া আর মৌমিতাও যাবে।

আয়াত বিস্মিত হয়ে বলল,

— কেনো?

নোরা ধীর নরম গলায় বলল,,,

— আমি চাই আজকের সন্ধ্যাটা আমরা চারজন একসঙ্গে কাটাই।
একটু থেমে আবার বলল,,,

— জানেন… আমার আজকের এই সুখের পেছনে যদি একজন মানুষের সবচেয়ে বড় অবদান থাকে, তাহলে সে মৌমিতা। ও শুধু আমার বন্ধু নয়… আল্লাহর দেওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নেয়ামত । ও না থাকলে আমি আজ এখানে থাকতাম না,না আপনাকে পেতাম আর না এত সুখী হতাম জীবনে।
শেষ কথাটা সম্পন্ন করতে গলাটা হালকা কেঁপে উঠলো নোরার।

— তাই আমি চাই… আমার এই আনন্দে মৌমিতাও সমান ভাগীদার হোক।

আয়াত চুপ করে শুনছিলো নোরার কথাগুলো।
মেয়েটা প্রতিবারই তাকে নতুন করে মুগ্ধ করে।
নিজের সুখের মুহূর্তেও যে মানুষটা অন্যের আনন্দের কথা আগে ভাবে, সে মানুষটা সত্যিই অসাধারণ। আয়াত সত্যি ভাগ্যবান যে নোরার মতো একজন মেয়ে তার জীবনে এসেছে।
আয়াত মৃদু হেসে বলল,,,

— ঠিক আছে ম্যাডাম। আজকের সন্ধ্যাটা তাহলে আমাদের চারজনের নামে।

স্টুডিওর কাজ শেষ করে কিছুক্ষণ পরই আদিত্যকে ফোন করে সন্ধ্যার প্ল্যান জানিয়ে অফিস থেকে জলদি ফেরার তাগাদা দিলো আয়াত‌।

আদিত্যও মৌমিতা কে ফোন করে জানতে চায় সে যেতে চায় কিনা!
মৌমিতা তো শুনেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,,

— যেতে চাই মানে! আলবাত যেতে চাই। দারুণ হবে! অনেকদিন পর চারজন একসাথে একটু নিরিবিলি সময় কাটানো যাবে।

আদিত্যও সম্মতি জানিয়ে বলল,,,

— তাহলে ঠিক আছে। রেডি হয়ে থেকো,সন্ধ্যা সাতটার দিকে বের হবো।

*****সন্ধ্যা নামতেই আশাকুঞ্জের ড্রয়িংরুমে সবাই গল্পে মেতে উঠেছে। টিভিতে পুরনো দিনের একটি সংগীতানুষ্ঠান চলছে। আশালতা বেগম, বিপাশা মাহমুদ, শাহেদা খানম,সবাই বসে আছেন। সাদমান চৌধুরী বর্তমান বাড়িতে নেই‌। নিজের ব্যবসায়ীক কাজে শহরের বাইরে আছেন তিনি।

ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে পাশাপাশি নিচে নেমে এলো চারজন।
আদিত্য আর আয়াত দুজনেই ক্যাজুয়াল পোশাকে।

মৌমিতা পরেছে হালকা আকাশি রঙের সুতি শাড়ি।

আর নোরা পরে আছে অফ-হোয়াইট কালারের সুতি শাড়ি। দুজনের মুখেই একফোঁটা মেকআপের আস্তরণ নেই। খোলা চুলে শুধু ছোট্ট একটা করে জুঁই ফুল গুঁজে রেখেছে।
তাদেরকে একসাথে সাজগোজ করে রেডি হয়ে নামতে দেখে আশালতা বেগম মুচকি হেসে বললেন,,,

— কোথাও যাচ্ছিস নাকি আদি?

আদিত্য হাসিমুখে উত্তর দিল,

— হ্যাঁ আম্মু। একটু বাইরেটা ঘুরে আসবো। বেশি রাত করবো না।

ঠিক তখনই পান চিবাতে চিবাতে আদিত্য-আয়াতের নানি শাহেদা খানম বললেন,,,

— বলি ও কী কথা! এই মেয়ে এখন ভয় সন্ধ্যায় বেরোবে?

আচমকা এহেন কথায় সবাই তাঁর দিকে তাকালো।
তিনি নোরার দিকে তাকিয়ে বললেন,,

— আর কদিন পরে তোমাগো বিয়া। এই সাতসন্ধ্যাবেলা বাইরে বের হইতে হয় নাকি? গায়ে এখন বিয়ার সরভ। এই সময় বেশি বাইরে ঘুরাফেরা ভালা না।

এরপর নিজের মেয়ে বিপাশার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,

— এই বিপা… তুই কিছু ক তোর পোলার হবু বউরে। এই ভর সন্ধ্যায় গায়ে হাওয়া লাগানো ঠিক না কিন্তু কইলাম।

বিপাশা মাহমুদ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। এসব কুসংস্কারে তাঁর বিশ্বাস নেই। তবু মুরব্বি মায়ের কথা সরাসরি উড়িয়েও দিতে পারলেন না।

নোরা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেললো। আস্তে আস্তে বললো,,,

— যদি আপনি না চান… তাহলে আমি যাবো না নানি।

মুখে কথাটা বললেও বুকের ভেতরটা হালকা চাপা কষ্টে ভরে উঠলো। এতদিন পর নিজের সেই ছোট্ট স্বপ্নটা কেউ যত্ন করে পূরণ করার দায়িত্ব নিয়েছিলো…

আয়াত নোরার মুখের দিকে তাকিয়েই তার ভেতরের অবস্থাটা বুঝে গেল সবটা।

আয়াত কিছু না বলে আদিত্যর দিকে তাকালো। ইশারা করলো কিছু,,,
আদিত্য মৃদু হেসে এগিয়ে গিয়ে শাহেদা খানমের পাশে বসলো। খুব শান্ত গলায় বলল,

— নানি…!

— ক।

— তুমি তো জানো, আমি,আয়াত কেউ তোমার কথা কখনো ফেলি না।

— হ।

— কিন্তু এসব কুসংস্কার সত্যি না। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন। সন্ধ্যার বাতাসে কোনো অমঙ্গল থাকে না।

শাহেদা খানম চুপ করে রইলেন।
আদিত্য আবার বলল,,,

— আমরা চারজন একসঙ্গে যাচ্ছি। আমি আছি, আয়াত আছে। নোরার কোনো ক্ষতি হবে না।

— কিন্তু…!

— তুমি কি তোমার এই বড় নাতিটার ওপর ভরসা করো না?

বৃদ্ধা মহিলার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো।

— তোর উপর ভরসা নাই এমন কথা কইলাম কবে?

— তাহলে বাহিরে যেতে না করছো কেনো ,যেতে দাও।

কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— আচ্ছা… যা। কিন্তু বেশি রাত করবি না।

নানির কথায় মৌমিতা খুশিতে নোরার হাতটা চেপে ধরলো।
কিছুক্ষণ পরই গাড়ি ছুটে চললো আলোকিত ঢাকা শহরের রাস্তায়।

আজ কোনো বডিগার্ডের বহর নেই। কোনো বিশেষ পরিচয়ের চাকচিক্য নেই। চারজন যেন একদম সাধারণ চারজন বন্ধু।
রাস্তার পাশের ছোট্ট চায়ের দোকান, ফুটপাথের বইয়ের স্টল, পার্ক সবকিছুই আজ মৌমিতা আর নোরার কাছে নতুন লাগছে।

নোরা ভীষণ এক্সাইটেড। সে বারবার জানালার বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ চোখে সব দেখছে।

আয়াত নোরার সেই উৎফুল্ল মুখটাই দেখছে আড়চোখে। মেয়েটার হাসির চেয়ে সুন্দর দৃশ্য তার কাছে আর কিছু নেই।

এরপর চারজন অনেকক্ষণ লেকের ধারে হাঁটলো।

কখনো ফানি গল্প শেয়ার করে,কখনো পুরনো স্মৃতিচারণ করে খিলখিল করে হাসছে মৌমিতা আর নোরা।

আদিত্য আর আয়াত দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্যই নিজেদের মুঠোফোনে ক্যাপচার করছিলো।

কিন্তু ছবি তুলতে তুলতেই আয়াতের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো। সে আদিত্য আর মৌমিতার একসঙ্গে ছবি তুলতে চাইলে নোরাও জোর করে দুজনকে একজায়গায় টেনে দাঁড় করিয়ে দিলো। স্বাভাবিক ভাবে দুজন পাশাপাশি দাঁড়ালে আয়াত ক্যামেরা থেকে চোখ সরিয়ে বলল,,,

— আরে না… এভাবে হবে না। একটু কাছাকাছি দাঁড়া।

কথাটা শুনে মৌমিতা লজ্জায় একপা এগিয়ে দাঁড়াতেই আদিত্য মৌমিতার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল,,,

— ক্যামেরা ডিরেক্টরের নির্দেশ মানতেই হবে।

ওপাশে দাঁড়িয়ে নোরা খিলখিল করে হেসে উঠলো।
এরপর দুই বান্ধবী রাস্তার ধারের ফুড কার্ড থেকে ফুচকা খেলো। মৌমিতা আর নোরা ঝাল খেয়ে চোখে পানি এনে ফেললো। তাও নাকি এগুলো ভীষণ মজা।

আদিত্য আর আয়াত এলিয়েন দেখছে এমনভাবে তাকিয়ে আছে তাদের দুজনের দিকে।

তারপর মাটির কাপে ধোঁয়া ওঠা চা খেলো চারজন।
কখনো ফুটপাথের ছোট দোকানে দাঁড়িয়ে রঙিন চুড়ি দেখা। সাধারণ এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই যেন চারজনের হৃদয়ে আলাদা করে জায়গা করে নিলো।
রাত একটু গভীর হতেই ফেরার পথে রাস্তার পাশের একটি আইসক্রিমের দোকানে গাড়ি থামালো আদিত্য।

চারজনের জন্য চার রকমের আইসক্রিম কিনলো সে।

নোরা নিজের চকলেট আইসক্রিম নিয়ে বেশ খুশি।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই মৌমিতার ভ্যানিলা আইসক্রিম দেখে তার লোভ হয়ে গেল।

— এই… মৌমিতা তোর টা একবার খেতে দে আমাকে।

— না। একদম না। তুই সবসময় এরকমই করিস। এরপর যেই তোকে দেবো,তুই একটু বলে সব খেয়ে ফেলিস। ছোচা মাইয়া কোনহানকার!

নোরা দাঁত বের করে হেসে বললো,,,

— প্লিজ! তুই আমার সন্টু মন্টু নাআআ!

— না মানে না।

পরের মুহূর্তেই নোরা হুট করে মৌমিতার আইসক্রিমে বড় একটা কামড় বসিয়ে দিলো।

— আরে! দেখলি দেখলি। যা বললাম তাই! দাঁড়া তুই…

মৌমিতা চিৎকার করে দৌড়ানি দিতেই নোরা হো হো করে হেসে দৌড় দিলো।

— নোরা! দাঁড়া বলছি। আজ তোর একদিন কি আমার যতদিন লাগে!

— হিহিহি ধরতে পারলে ধর!

দুজনকে ছোট ছোট বাচ্চাদের মতো দৌড়াদৌড়ি করতে দেখে আদিত্য আর আয়াত হেসে কুটিকুটি।

শেষ পর্যন্ত মৌমিতা নোরার আইসক্রিমটাও কেড়ে নিয়ে প্রতিশোধ নিলো। বিজয়ী হাসলো মৌমিতা।
সেই প্রাণখোলা হাসির মাঝেই…

হঠাৎ…

নোরা হাসতে হাসতে পাশ ফিরে মৌমিতার দিকে তাকাতেই আচমকা এক তেজস্ক্রিয় তরল পদার্থ তার কানের নিচ থেকে গলা বেয়ে বুকের ওপর ছিটকে এসে আঁছড়ে পড়লো।

এক মুহূর্ত থমকে গেলো নোরা। পরমুহূর্তেই

— আল্লাহ….আহহহ…!

নোরার গগণবিদারী চিৎকারে কেঁপে উঠলো চারপাশ।
মুহূর্তের মধ্যেই পাশ দিয়ে শোঁ করে একটি মোটরবাইক ছুটে গেলো।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটলো যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন সময়ই থেমে গেল।

— নোরা!

আয়াত চিৎকার করে উঠলো। দ্রুত ছুটলো নোরার পানে।
নোরা দু’হাত দিয়ে গলা চেপে ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। চোখ-মুখ বিকৃত হয়ে গেছে ব্যথায়। তার আর্তচিৎকার চারপাশের মানুষদেরও আতঙ্কিত করে তুললো।
মৌমিতা যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে ও এখনো।
কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মেয়েটা প্রাণ খুলে হাসছিল, সেই মেয়েটাই এখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।

আদিত্যর চোখ এক ঝলকেই ছুটে গেল দ্রুত সরে যেতে থাকা মোটরবাইকের দিকে।
তার অভিজ্ঞতা মুহূর্তেই বলে দিল,এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা পরিকল্পিত হামলা। ওই বাইক থেকেই কেউ একজন নোরা কে টার্গেট করে এই বিষাক্ত তরল ছুড়েছে। পূর্ব ঘটনার জেরে তার মনে একটাই নাম ভেসে উঠলো… সোহেল।
এক সেকেন্ডও দেরি করলো না আদিত্য। এখনো আয়ত্বের বাইরে যায়নি মোটরবাইকটা।
রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটি বাঁশের লাঠি হাতে তুলে নিয়ে নিখুঁত লক্ষ্য ভেদ করে ছুঁড়ে মারলো পালিয়ে যাওয়া মোটরবাইকের দিকে।

পরের মুহূর্তেই ঠাস! করে লাঠিটা গিয়ে আঘাত করলো পেছনে বসা যুবকের পিঠ বরাবর।
আচমকা আঘাতে ভারসাম্য হারিয়ে সে ছিটকে পড়লো রাস্তার ওপর।
তবে বাইক চালানো আরেকজন কোনোদিকে না তাকিয়েই গতি বাড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

আদিত্য আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলো না।
সে দৌড়ে যেতে যেতে চিৎকার করে উঠলো,,,

— আয়াত! নোরাকে নিয়ে এখনই হাসপাতালে যা! মৌমিতা, তুমি ওর সঙ্গে থাকো! আমি এটাকে দেখছি!
কথা শেষ করেই ছুটে গেল রাস্তায় পড়ে থাকা ছেলেটার দিকে।

এদিকে আয়াত দৌড়ে এসে দু’হাতে নোরাকে জড়িয়ে ধরলো। নোরার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠলো।
কানের নিচ থেকে গলার একপাশ নিয়ে বুকের দিকটা লাল হয়ে উঠেছে। যন্ত্রণায় কাঁপছে পুরো শরীর। অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ ছাড়া কিছুই বের হচ্ছেনা নোরার মুখ থেকে। চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে যন্ত্রণায়। সহ্য করতে পারলো না আয়াত প্রেয়সীর এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দু’হাতে বুকের সাথে লেপ্টে নিলো। পুরুষ মানুষ সে পারেনা চিৎকার করে কাঁদতে! আর না পারছে সইতে।

— নোরা…! আমার দিকে তাকাও… প্লিজ…চোখ বন্ধ করো না জান! দেখো আমার দিকে!

নোরা শুধু ব্যথায় কাতরাচ্ছে।
মৌমিতা এতক্ষণ যেন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসতেই প্রিয় বান্ধবীর অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। ছুটে এসে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো।

— নোরা…! কিছু হবে না তোর… কিছু হবে না…
কাঁপতে কাঁপতে সে নোরার হাত শক্ত করে ধরে রইলো।

আয়াত আর সময় নষ্ট করলো না।

খুব সাবধানে নোরাকে কোলে তুলে গাড়ির দিকে ছুটলো। পেছনের সিটে শুইয়ে দিলো নোরা কে।
মৌমিতাও দ্রুত উঠে বসল অপর পাশে। নোরার মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিলো।

গাড়ি স্টার্ট দিয়েই আয়াত সর্বোচ্চ গতিতে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটে চললো।
তার হাত স্টিয়ারিংয়ে থরথর করে কাঁপছে। স্টেবল থাকার চেষ্টা করলেও চোখ ভিজে উঠেছে অজান্তেই।

বিড়বিড় করে বারবার শুধু একটাই কথা বলছে,,

— কিছু হবে না… কিছুই হবে না…

অন্যদিকে…

আদিত্য ইতিমধ্যেই পড়ে থাকা ছেলেটার কাছে পৌঁছে গেছে।
কলার চেপে তাকে দাঁড় করাতেই রাস্তার আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল তার মুখ। মুহূর্তেই আদিত্যর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ঠিকই ভেবেছে।

সোহেল।

থানায় একাধিকবার এই ছেলেটার ছবি দেখেছে সে।
রাগে তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠলো।
কোনো কথা না বলে সজোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল সোহেলের মুখে।
সোহেল মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই আবার কলার ধরে টেনে তুললো।

— এত বড় সাহস তোর বাস্টার্ড? তোর জন্মের শিক্ষা দিয়ে দিবো এবার!

আরেকটা ঘুষি। তারপর আরেকটা।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সোহেলের নাক-মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেলো। সে কাঁপা গলায় কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু আদিত্যর চোখে তখন শুধু তীব্র ক্ষোভ।

চারপাশে ভিড় জমতে শুরু করেছে।
নিজেকে কোনো রকমে সংযত করে আদিত্য সঙ্গে সঙ্গে পুলিশে ফোন করলো। সংক্ষেপে পুরো ঘটনা জানিয়ে নিজের অবস্থানও জানিয়ে দিল।
প্রায় বিশ মিনিটের মধ্যেই পুলিশের একটি টহল গাড়ি এসে পৌঁছালো ঘটনাস্থলে।

পুলিশ সোহেলকে হেফাজতে নিয়ে নিলো। সোহেলের অবস্থা বেগতিক। থানার ওসি সেটা লক্ষ্য করলেও আদিত্যর দিকে তাকিয়ে কিছু বলার সাহস করলেন না। ইতিমধ্যেই আদিত্যর রেকর্ড তিনি জেনেছেন।

ওসি সাহেবকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আদিত্য আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালো না।

পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত মৌমিতা কে কল করলো।

কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কাঁপা গলায় মৌমিতা ফোন ধরলো।

— কোন হসপিটালে আছো?

ওপাশ থেকে হাসপাতালের নাম শুনেই আদিত্য ফোন কেটে দিল। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে একটি ট্যাক্সি থামিয়ে দ্রুত উঠে বসলো।
অ্যাড্রেস দিতেই ট্যাক্সিটি দ্রুত হাসপাতালের দিকে ছুটে চললো।

চলবে…