#তিমিরবসান(১১)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী
– আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে আমি শেষবারের মতো জানতে চাই তুমি কি তোমার সিদ্ধান্তে একদম নিশ্চিত?
অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের চেম্বারে বসে আছে স্নিগ্ধা। আজই সে ফাহাদের সাথে সকল সম্পর্কের ইতি টানার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে চায়। তাই নিজের পরিচিত অ্যাডভোকেট দিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে চাইছে সে। কোলে ঘুমন্ত আয়াতের দিকে একবার তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে স্নিগ্ধা বললো,
– হ্যাঁ আঙ্কেল আমি একদম নিশ্চিত!
অ্যাডভোকেট আনিসুল হক ওনার চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে টেবিলের ওপর রাখলেন। ওনার মুখে একটা আশ্বস্ত হওয়ার হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন,
– ভেরি গুড। একটা আত্মসম্মানহীন সম্পর্কের বোঝা টেনে বেড়ানোর চেয়ে সম্মানের সাথে একা লড়াই করা অনেক ভালো। শোনো মা, মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী আমরা আজই নোটিশটা ড্রাফট করছি। এর তিনটা কপি যাবে। একটা ফাহাদের বর্তমান ঠিকানায়, একটা সেই কাজী অফিসে যাবে যেখানকার কাজী তোমাদের বিয়ে পরিয়েছিল আর একটা যাবে সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে। আইন অনুযায়ী নোটিশ পাওয়ার পর ৯০ দিন সময় থাকে সমঝোতার জন্য। যদি এই ৯০ দিনের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে বিয়েটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভেঙে যাবে।
– সমঝোতার কোনো প্রশ্নই আসে না আঙ্কেল। ওনার কোনো দাবিদাওয়াও আমার চাই না, শুধু আমার মেয়ের পূর্ণ কাস্টডি যেন আমি পাই।
– সেটা তুমি পাবে মা। বাচ্চা এখন খুব ছোট, আইনত মায়ের কোলেই থাকবে।
নিজের মনের খচখচানি থেকে স্নিগ্ধা প্রশ্ন করেই ফেললো,
– কিন্তু ভবিষ্যতে?
অ্যাডভোকেট আনিসুল হক স্নিগ্ধার ভেতরের আশঙ্কাটা বুঝতে পারলেন। একজন মায়ের জন্য তার সন্তানের নিরাপত্তা আর অধিকারের চেয়ে বড় কোনো চিন্তা হতে পারে না।
– ভবিষ্যতের কথা ভেবে এখনই ভয় পেও না মা। আইন এতটা অন্ধ নয়। বর্তমানে আইন কোনোভাবেই তোমার মেয়েকে ফাহাদের কাছে রাখার সুযোগ দিবে না। তবে ফাহাদ যদি ভবিষ্যতে বড় হয়ে মেয়েকে নিজের কাছে নেওয়ার জন্য ফ্যামিলি কোর্টে মামলাও করে, আদালত সবার আগে দেখবে বাচ্চার ভবিষ্যৎ কার কাছে বেশি নিরাপদ। তবে জানো তো? ফাহাদের কোম্পানির টাকা চু’রি আর জালিয়াতির যে রেকর্ড আছে ওগুলো এখন প্রচার হচ্ছে?
– হুম।
– ভবিষ্যতে যে এমন করে আবারও কালার হবে না এটার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই ভবিষ্যতের চিন্তা করো না। তাছাড়া রিফাতের(স্নিগ্ধার বড় ভাই) কাছে আমি শুনেছি ফাহাদের সাথে তোমার সম্পর্কের অবস্থার কথা। যেই ছেলে মেয়ে হওয়ার জন্য এত কিছু করতে পারে সে ভবিষ্যতে মেয়েকে নিজের কাছে চাইবে এটা আশা করা বোকামি। তাই এইসব চিন্তা এখন করো না। তুমি শুধু এখানে একটা সই করে দাও মা। বাকিটা আমি দেখছি।
‘সেহরিশ জাহান স্নিগ্ধা’ নামটা লেখার সময় স্নিগ্ধার হাত একটুও কাঁপল না। সে জানে এই সইটা শুধু একটা কাগজের টুকরোয় নয় এটা ফাহাদের দেওয়া সমস্ত অবহেলা আর শৃঙ্খল ভেঙে নিজের আর আয়াতের স্বাধীন জীবনে ডানা মেলার এক অকাট্য দলিল।
.
প্রায় দু সপ্তাহ কেটে গেল ব্যস্ততায়। স্নিগ্ধা এখন কাজ অনেকটা ভালোভাবেই আয়ত্ত করে নিয়েছে। তার চিন্তাও কমে গিয়েছে। প্রথম থেকেই যথেষ্ট ভালো কাজ করেছে বলে প্রশংসা পেয়ে সে নিশ্চিন্ত। এর মধ্যে তার বড় ভাই ঢাকায় আসে। তার বড় ভাই রিফাত ঢাকার বাইরে থাকে চাকরির সূত্রে। তার বিয়ে ঠিক হলো। বিয়ের আমেজে পরিবারের বিষণ্ণতা কিছুটা হলেও কেটে গেল।
রিফাত ড্রইং রুমে বসে চা খেতে খেতে বললো,
– বিয়েতে কিন্তু তোকে আর আয়াতকে সবচেয়ে বেশি খাটতে হবে স্নিগ্ধা। সব দায়িত্ব তোকে আর আয়াতকে দিবো। কি আয়াত পারবি তো?
শেষ কথাটা আয়াতের গাল টেনে দিয়ে বলল। স্নিগ্ধা কোলের আয়াতকে একটু দোলা দিয়ে হেসে বলল,
– বাহ্! বিয়ে করবেন আপনি আর খাটব আমরা মা মেয়ে? তা তো হবে না!
আবার আয়াতের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল,
– বলে দাও আম্মু, আমরা শুধু বিয়ে খাবো আর এনজয় করবো, নো খাটাখাটি!
আয়াত মায়ের দেখাদেখি হালকা করে হাত নাড়ল। সেটা দেখে হাসির রোল পরে গেল ড্রইং রুমে।
পরদিন সকালে স্নিগ্ধা আয়াতকে নিয়ে অফিসে ঢুকল। কাজের ব্যস্ততা এখন ওকে বেশ আনন্দ দেয়। সারাদিনটা কাজের পেছনে ব্যয় করে সে শান্তি পায়। এজন্সিতে এখন নতুন একটা প্রজেক্টের কাজ চলছে। স্নিগ্ধা নিজের ডেস্কে বসে মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে একটা ক্যাম্পেইনের ড্রাফট রেডি করছিল। আয়াত তখন পাশেই রুবি আপুর কেবিনে তার দেওয়া একটা খেলনা নিয়ে আপনমনে ব্যস্ত। রুবি আপু প্রায় সময় আয়াতকে নিজের কাছে রেখে বলে তুমি কাজ করো। আজকেও সে ফ্রি আছে বলে নিয়ে গেল আয়াতকে। স্নিগ্ধা সেই সুযোগে নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে।
দুপুর বারোটার দিকে ওয়াজেদ নিজের কেবিন থেকে বেরিয়ে স্নিগ্ধার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল। পরনে যথারীতি নেভি ব্লু শার্ট। স্নিগ্ধা ওকে দেখে নি তাই সে নিজের মতো কাজ করে যাচ্ছে। ওয়াজেদ একটু দাঁড়িয়ে থেকে তারপর “খুক খুক” করে কেঁশে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো। স্নিগ্ধা চমকে ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে মাথা তুলে ওপরে তাকাল। ওয়াজেদকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
– দুঃখিত স্যার আমি আসলে ড্রাফটটার ভেতরে এতটাই ঢুকে গিয়েছিলাম যে খেয়াল করিনি।
ওয়াজেদ চশমার ফ্রেমটা আঙুল দিয়ে একটু ঠিক করে নিলো। তার ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম, প্রায় না বোঝার মতো একটা হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
– ইটস ওকে। কাজের প্রতি এই ডেডিকেশনটাই আমি আপনার কাছ থেকে আশা করেছিলাম। বাই দ্য ওয়ে স্নিগ্ধা, আজ দুপুর একটা থেকে আমাদের একটা আউটডোর মিটিং আছে। ধানমন্ডির একটা রেস্টুরেন্টে ক্লায়েন্ট আমাদের লাঞ্চে ইনভাইট করেছে। এই ক্যাম্পেইনের প্রাইমারি আইডিয়াটা যেহেতু আপনার, তাই আপনি আর রুবি আমার সাথেই যাচ্ছেন।
স্নিগ্ধা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে গিয়েও হুট করে থেমে গেল। সে একটু ইতস্তত করে পাশের রুবি আপুর কেবিনের দিকে তাকাল। কাজের জন্য বাইরে যেতে ওর কোনো আপত্তি নেই কিন্তু আয়াতকে এই ভরদুপুরে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? তাও কি না মিটিং! সে আবার ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে বললো,
– স্যার… আমার কি যেতেই হবে? মানে আপনারা যেহেতু সিনিয়র আপনারা যান… আমি নাহয় রুবি আপুর থেকে…
– ইউ হ্যাভ টু গো!
এমন আদেশমূলক বাক্য শুনে স্নিগ্ধা আর কিছু বলতে পারলো না। মন খারাপ করে মাথা নাড়লো। ওয়াজেদ মনে মনে হেসে নিয়ে বললো,
– আয়াতও আমাদের সাথেই যাচ্ছে স্নিগ্ধা। কোনো সমস্যা হবে না আমি অলরেডি রুবিকে বলে দিয়েছি ওর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে। আর আমরা গাড়িতে যাবো সো আই গেস তেমন কোনো সমস্যা হবে না! তাছাড়া এটা তেমন সিরিয়াস মিটিং না এবং আয়াত যথেষ্ট শান্ত তাই চিন্তার কোনো কারণ আমি দেখছি না।
স্নিগ্ধা একটু হাসলো। তারপর বললো,
– আচ্ছা স্যার। আমি ফাইলগুলো গুছিয়ে নিচ্ছি।
– ওকে!
ওয়াজেদ নিজের ক্যাবিনের দিকে চলে গেল।
আধঘণ্টা পর ওয়াজেদের কালো রঙের গাড়িতে রুবি আর স্নিগ্ধা বসে আছে। স্নিগ্ধার কোলে শান্ত হয়ে বসে আছে আয়াত। সে আশপাশ আগ্রহ নিয়ে দেখছে। তার দুচোখ জুড়ে এখন রাজ্যের বিস্ময়। গাড়ি যখন জ্যামে একটু থমকে দাঁড়াচ্ছে সে ওমনি তার পিচ্চি পিচ্চি আঙুলগুলো গাড়ির জানলার কাঁচের ওপর চেপে ধরছে। বাইরে কোনো রঙিন বাস বা রিকশা গেলেই ওর চোখ দুটো গোল গোল হয়ে যাচ্ছে। আয়াত আগ্রহ নিয়ে দেখছে এই কারণে স্নিগ্ধা ওকে কোলের উপর দাঁড় করিয়ে দিলো। স্নিগ্ধা বসেছে একদম ড্রাইভিং সিটের পেছনে অর্থাৎ সামনেই ওয়াজেদ। সিটের ওপারে একজন ব্যক্তিকে দেখে আয়াত হাত বাড়িয়ে ওর কাঁধের শার্ট খামচে ধরার চেষ্টা চালালো। এক হাতে ধরতে না পেরে দুই হাতে ধরার জন্য ঝুঁকে গেল। স্নিগ্ধা ভীষণ লজ্জায় পড়ে গিয়ে দ্রুত টেনে কোলে বসিয়ে দিলো।
– স্যরি স্যার আমি বুঝতে পারিনি।
– ইটস ওকে। এত হেসিটেট করার কিছু নেই আয়াত এখনো ভীষণ ছোট ওর কাজ গুলো এমনই হবে স্বাভাবিক!
স্নিগ্ধা বেশ অপরাধী মুখে কথাটা বললেও ওয়াজেদ একটুও বিরক্তি প্রকাশ করলো না। বরং লুকিং গ্লাস দিয়ে সে কৌতূহলের সাথে দেখলো আয়াত এখনো স্থির হয়ে বসছে না। এখনো সামনের সিট্ নিয়ে গবেষণায় মেতেছে নাহয় ঝুঁকে আসতে চাইছে। সামনে সিগনালে গাড়ির গতি স্লো হয়ে গেলে ওয়াজিদ পিছু ফিরে বললো,
– এক্সকিউজ মি লিটল লেডি? আপনি কি আসবেন এই সিটে?
ওয়াজেদের আচমকা এমন প্রশ্নে স্নিগ্ধা পুরো অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে হড়বড় করে বলে উঠল,
– না না স্যার! ও সামনে এলে আপনার ড্রাইভ করতে প্রবলেম হবে। ও পেছনেই ঠিক আছে।
কিন্তু আয়াত যেন মায়ের কথার কোনো তোয়াক্কাই করল না। ওয়াজেদ পিছু ফিরে তাকিয়ে দু হাত বাড়াতেই সে ওর দিকে ওর পিচ্চি পিচ্চি হাত দুটো বাড়িয়ে ঝুঁকে পড়লো। ওর ঠোঁটের কোণে একগাল দাঁতহীন হাসি, যেন সে এই অফারটার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল! ওয়াজেদও হেসে ওকে কোলে নিয়ে সামনে নিয়ে গেল। আয়াত ওয়াজেদের কোলে বসামাত্রই ওনার বিশাল স্টিয়ারিং হুইলটার ওপর ওর ছোট্ট দুখানি হাত রাখল। গোল গোল চোখ করে সে স্টিয়ারিংটা কৌতূহল নিয়ে দেখলো।
এদিকে স্নিগ্ধা সম্পূর্ণ হেসিটেট করছে আর ভাবছে আয়াতকে নিয়ে মিটিং এ কি করবে সে। মিনিট খানেক পর আয়াত পেছনে উঁকি দিয়ে মাকে দেখতেই মায়ের কাছে চলে আসতে চাইল। ওয়াজেদ নির্দিধায় ওকে আবার পেছনের সিটে পাঠিয়ে দিল। স্নিগ্ধা ওর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললো,
– এই বুড়ি? শান্ত থাকতে পারিস না? একটা কাজে যাচ্ছি মায়ের মুখ রাখিস কিন্তু।
কথাটা শুনে রুবি শব্দ করে হাসলেও ওয়াজেদ মৃদু হাসলো যেটা কেউই দেখলো না।
ওয়াজেদ গিয়ারের পাশ থেকে একটা ছোট্ট চাবির রিং হাতে নিল। চাবির রিংয়ের সাথে একটা নরম, তুলতুলে ছোট সাদা পুতুল ঝুলছে। সে সেটা হাত বাড়িয়ে পেছনের সিটের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব নরম গলায় বললেন,
– এই নিন লিটল লেডি, এটা দিয়ে খেলুন।
স্নিগ্ধা একটু ইতস্তত করে বলল,
– স্যার, ও কিন্তু এটা মুখে দিয়ে দেবে। ওর সবকিছু মুখে দেওয়ার অভ্যাস।
ওয়াজেদ ওর স্বভাবসুলভ গাম্ভীর্য একপাশে সরিয়ে খুব সহজ সুরে বললেন,
– কোনো সমস্যা নেই স্নিগ্ধা, ওটা একদম পরিষ্কার। ওর কামড়ানোর ইচ্ছা হলে ওটা নিশ্চিন্তে কামড়াতে পারে।
বলার সাথে সাথেই যেন ওনার কথা সত্যি প্রমাণ করতেই আয়াত পুতুলের কানটা মুখের কাছে নিয়ে চিবানোর চেষ্টা শুরু করে দিল। কিন্তু কাপড়ের টেক্সচারটা মুখে লাগতেই ওর ছোট্ট মুখখানা কেমন যেন একটা অদ্ভুত এক্সপ্রেশন দিয়ে কুঁচকে গেল। সে ওটা মুখ থেকে বের করে বড় বড় চোখ করে ওয়াজেদের দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন বলতে চাইছে “এটা একদমই সুস্বাদু নয়!”
আয়াতের ওমন বোকা বনে যাওয়া মুখ আর অভিব্যক্তির চটুলতা দেখে রুবি আপু আর স্নিগ্ধা হেসেই ফেলল।
তারা কিছুক্ষণের মধ্যেই রেস্টুরেন্টে পৌঁছে গেল এবং ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই ক্লায়েন্টের সাথে মিটিংটা খুব চমৎকারভাবে শেষ হলো। এইবার আয়াত কোনোরকম চঞ্চলতা দেখালো না যেন মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে!
স্নিগ্ধার তৈরি করা ড্রাফট আর ওনার কথা বলার পরিপক্বতা দেখে ক্লায়েন্টরা বেশ ইমপ্রেসড। মিটিং শেষে ক্লায়েন্টরা বিদায় নেওয়ার পর ওয়াজেদ ওয়েটারকে ডেকে ওনাদের লাঞ্চের অর্ডার দিলেন। তারপর স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– স্নিগ্ধা, আপনি আগে আয়াতকে খাইয়ে নিন। তারপর আমরা একসাথেই খাবো। ওর তো আবার টাইমলি লাঞ্চ হওয়া উচিত তাই না?
স্নিগ্ধা হেসে বললো,
– আপনারা শুরু করুন। ওকে খাওয়াতে খাওয়াতে আমি ফাঁকে ফাঁকে খেয়ে নেবো।
রুবি বললো,
– না তুমি আগে আয়াতকে খাইয়ে দাও আমাদের তো এখন ফেরার তাড়া নেই। সব কাজ কমপ্লিট করেই এসেছি।
স্নিগ্ধা মৃদু হেসে আয়াতকে খিচুড়ি খাইয়ে দিতে শুরু করলো। আয়াতও লক্ষ্মী মেয়ের মতো চুপচাপ খাচ্ছে। ওয়াজেদ আর রুবি তখন অফিসের পরবর্তী পিআর ক্যাম্পেইনের ডেটলাইন নিয়ে নিচু স্বরে আলোচনা করছেন। এর মধ্যে রুবি বললো,
– আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি আপনারা বসুন।
রুবি চলে যেতেই স্নিগ্ধা আয়াত আর ওয়াজেদ রইলো টেবিলে। ওয়াজেদ মাত্রই আয়াতকে কোনো কারণে কোলে তুলেছিল আর তখনই স্নিগ্ধার জীবনের কালো ছায়া যেন আবার উঁকি দিলো।
আজ রেস্টুরেন্টে এসেছিল ফাহাদ। হুট করেই ফাহাদের নজর গেল কর্নারের সেই শান্ত টেবিলটার দিকে। আর সেখানে স্নিগ্ধাকে এক অত্যন্ত রুচিশীল, ব্যক্তিত্ববান আর সুপুরুষের সাথে হাসিমুখে বসে থাকতে দেখেই ওর ভেতরের হিংস্রতা সীমারেখা ছাড়িয়ে গেল। ওর মনে হলো ওকে ডিভোর্স দিয়ে স্নিগ্ধা বাপের বাড়ি বসে কাঁদেনি বরং ওর চেয়েও অনেক ভালো জায়গায় নিজের জীবন গুছিয়ে নিচ্ছে! এই অপ্রিয় সত্যটা ওর মনে বি’ষাক্ত তীরের মতো বিঁ’ধল। তার সম্মানে লেগে গেল!
পায়ের জুতো খটখট শব্দ করে ফাহাদ ঝড়ের বেগে এগিয়ে এলো ওদের টেবিলের দিকে। ওর মুখের অবয়ব তখন রাগে বিকৃত। ও এসেই কিছু না বলে টেবিলে একটা থাবা বসালো। টেবিল ঝন ঝন করে উঠলো। আকস্মিক এহেন ঘটনায় স্নিগ্ধা চমকে উঠলো। আয়াত প্রচণ্ড ভয় পেয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে তীব্র স্বরে কেঁদে উঠল।
ফাহাদ ওর স্বভাবসুলভ নোংরা আর ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে টেবিলের ওপর দুহাত দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াল। সেভাবেই বললো,
– বাহ্ স্নিগ্ধা! বাপের বাড়ি গিয়ে খুব তো সতী সেজে উকিল দিয়ে ডিভোর্সের কাগজ পাঠিয়েছ! আর এখানে এসে দেখছি অলরেডি নতুন শিকার ধরে বসে আছ? এই পরপুরুষের টাকায় রেস্টুরেন্টে বসে বিলাসিতা করা হচ্ছে? নিজের মেয়েটাকে বি’ক্রি করে এই লাইফস্টাইল কিনেছ বুঝি?
#চলবে…?

