Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-১৩

তিমিরবসান পর্ব-১৩

0
279

#তিমিরবসান(১৩)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

স্নিগ্ধার ভাইয়ের বিয়ে কেটে আরো কয়েক মাস কেটে গিয়েছে। স্নিগ্ধা ওর মেয়েকে নিয়ে আলাদা বাসায় থাকবে বলেছিল কিন্তু বাসার সবার কারণে আলাদা হতে পারে নি স্পেশালি সিফাতের জন্য। এরপর সব ঠিকই ছিলো কিন্তু মাস কয়েক যেতেই তার জীবনে আবার টানাপোড়েন নেমে আসলো। শুরুটা হয়েছিল স্নিগ্ধার ভাবীকে নিয়ে। আস্তে আস্তে স্নিগ্ধার ভাইয়ের বউ আফরোজা কেমন যেন হয়ে গেছে। ফাহাদ প্রথমে ডিভোর্স দিতে নারাজ ছিলো কিন্তু পরবর্তীতে তার বাবার কোনো সাহায্য না পেয়ে সে বাধ্য হয়ে ডিভোর্স দিয়েছে। ফাহাদ অনেক কাহিনী করে ওরে ডিভোর্স দিয়েছে ঠিকই কিন্তু এরপর শুরু হয়েছে আরেক কাহিনি। এখন সবাই উঠতে বসতে ডিভোর্সি বলে আর নাহয় সংসার করতে পারে নি এই নিয়ে খোঁচায় কিংবা আফসোস দেখায়। স্নিগ্ধা বিরক্ত হয়ে গিয়েছে এই কারণে।
বিশেষ করে ভাবীর আচরণটা দিন দিন বি’ষিয়ে তুলছে ঘরের পরিবেশ। আফরোজা বিয়ের শুরুতে যেমন হাসিখুশি ছিল ইদানীং কেমন যেন সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে থাকে। স্নিগ্ধার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় এমনভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন দুনিয়ার সব বোঝা ওনার ঘাড়ে এসে পড়েছে।

সেদিন বিকেলে স্নিগ্ধা আয়াতকে খাওয়াচ্ছিল বসার ঘরে। আফরোজা এসে সোফায় ধপ করে বসে ফোন কাকে যেন স্নিগ্ধাকে শুনিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলল,

– ঠিকই বলেছো! আজকালকার মেয়েদের ধৈর্য বলে কিছু নেই। একটুতেই ডিভোর্স ডিভোর্স বলে লাফায়। সংসার করা কি এতই সোজা? আমরা কি কাঠখড় পুড়িয়ে সংসার করছি না? স্বামী একটু আধটু রাগ দেখাতেই পারে, তাই বলে ঘর ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে?

স্নিগ্ধা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারলো কথাটা ওকেই বলেছে। সে ধীরস্থির ভাবে আয়াতকে শেষ চামচের টুকু খাইয়ে ভাবির দিকে তাকাল। তার ততক্ষণে কথা বলা শেষ। স্নিগ্ধা হেসে বললো,

– তুমি কথাটা আমাকে বলেছ তাই তো?

স্নিগ্ধার ভাবি মেকি হেসে বললো,

– আমি কেন তোমাকে বলবো ছি ছি!

স্নিগ্ধা শান্ত স্বরে বলল,

– ভাবী, সবার পরিস্থিতি এক হয় না। আর আমি কি পরিস্থিতিতে ছিলাম বা বিয়েটা কিভাবে হয়েছে এরপর কিভাবে থেকেছি এসব আমি জানি তুমি না! যেইটুক শুনেছো তার থেকেও বেশি সাফার করেছি আমি। তাই প্লিজ আমার ব্যাপারে কথা বলো না। বারবার এইসব ভালো লাগে না!

– আহা স্নিগ্ধা, এত চটছো কেন?

আফরোজা হাতের ফোনটা সোফার ওপর ছুড়ে দিয়ে বেশ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তারপর বলল,

– আমি তো একটা সাধারণ কথা বললাম। তুমি যদি নিজের গায়ে মেখে নাও তবে আমার কী করার আছে বলো? আর যাই বলো না কেন, হাজার সাফার করলেও একটা মেয়ে যদি চায়, সে কিন্তু সংসার টিকিয়ে রাখতে পারে। মানিয়ে নেওয়ার মনমানসিকতা থাকা চাই। এখনকার মেয়েদের মধ্যে সেই জিনিসটাই নেই। একটুতেই রাগ, একটুতেই নিজের আলাদা অহংকার!

– তুমি কি এখনকার মেয়ের মধ্যে পড়ো না ভাবি? তোমাকে কি শশুরবাড়ির অত্যাচার সহ্য করতে হয়?

স্নিগ্ধার ধারালো প্রশ্নে আফরোজা থতমত খেয়ে গেল। নিজের সাজানো কথার ঘুঁটি যে এভাবে উল্টে যাবে, তা ও একদমই আশা করেনি। ওর মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে চেহারায় ফুটে উঠল স্পষ্ট বিরক্তি,

– এ কেমন কথা বলছ স্নিগ্ধা? তুমি কি আমার সংসার আর জীবনের সাথে তোমারটার তুলনা করছ? আমার শাশুড়ি-শ্বশুর আর তোমার প্রাক্তন শাশুড়ি-শ্বশুর কি এক? আর রিফাত তো ফাহাদের মতো অমানুষ নয়! নিজের ভাইকে…

স্নিগ্ধা থামিয়ে দিয়ে বললো,

– ঠিক ধরেছ ভাবী, তোমার সংসার আর আমার পার হওয়া দিনগুলো এক নয়। তুমি একজন ভালোবাসার মানুষ আর একটা সম্মানজনক পরিবার পেয়েছ। সেখানে বসে এমন একজন মানুষকে ধৈর্য আর মানিয়ে নেওয়ার জ্ঞান দেওয়া সহজ যে প্রতিদিন মানসিকভাবে খু’ন হতো! অপমান সহ্য করা যদি মানিয়ে নেওয়া হয় তবে আমি কৃতজ্ঞ যে আমি নিজের আত্মসম্মান নিয়ে আছি। তাই নিজের প্রাপ্তি দিয়ে অন্য কারো দুর্ভাগ্যের বিচার করতে এসো না।

আফরোজা রাগে লাল হয়ে বলল,

– তুমি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছ? বাপের বাড়ি এসে নিজের ওপর এত বড় তকমা লাগিয়ে বসে আছ, আবার বড় বড় কথা! ফাহাদ যেমনই হোক দিনশেষে তোমাকেই মানুষ ডিভোর্সি বলবে, ওনার কিছু হবে না। ওনার আবার বিয়ে হবে, নতুন সংসার হবে। আর তুমি? বাপের বাড়ি বসে বসে ভাইয়ের ওপর বোঝা হয়ে থাকবে সারা জীবন।

বোঝা! শব্দটা স্নিগ্ধার বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে তো নিজের খরচ নিজেই চালায়, অফিসের বেতন দিয়ে বাপের বাড়িতেও সাহায্য করে। তাহলে বোঝা কেন? সে থমথমে সুরে বলল,

– তকমাটা সমাজ আর তোমার মতো মানুষজন দিচ্ছে ভাবী, আমি নিজের যোগ্যতায় আয়াতের মা হয়ে বেঁচে আছি। আর এই বাড়িটা যেমন রিফাত আর সিফাত ভাইয়ের, তেমনি আমার বাবারও বাড়ি। আমি কারও দয়ায় এখানে নেই, নিজের আর আয়াতের সম্পূর্ণ খরচ আমি নিজে চালাই।

আফরোজা চুপ করে গেল। স্নিগ্ধা আবার বললো,

– মানিয়ে নেওয়া আর নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে অত্যাচার সহ্য করা দুটো এক জিনিস নয় ভাবী। যে সম্পর্ক মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে নেয়, জীবন বিষিয়ে তোলে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসাটা অহংকার নয়, বেঁচে থাকার অধিকার। তুমি যা বলছ, ওপর ওপর দেখে বলছ। ভেতরের যন্ত্রণাটা আমি সয়েছি, তাই বিচার করতে এসো না।

স্নিগ্ধা আয়াতকে নিয়ে উঠে চলে গেল। প্রতিনিয়ত এসব সহ্য করার ক্ষমতা ওর আর নেই। রুমে এসে সে একটা লম্বা শ্বাস নিল। নিজের ভেতরের এই পরিবর্তনটা ও নিজেই অনুভব করতে পারছে। ফাহাদের থেকে মুক্ত হওয়ার পর ও আর সেই আগের ভিতু স্নিগ্ধা নেই যে অন্যায্য খোঁচা খেয়ে নীরবে কাঁদবে। ও অন্যমনষ্ক হয়ে বসে ছিলো ঠিক তখনই ওর ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। অফিশিয়াল মেল নোটিফিকেশন। ওয়াজেদ সরওয়ার পাঠিয়েছেন নতুন ক্লায়েন্টের যে প্রেজেন্টেশনটা আগামী সপ্তাহে জমা দেওয়ার কথা ছিল, সেটার ড্রাফট ফাইলে একটু রিভিশন দরকার।
স্নিগ্ধা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিল। ওর মনে পড়ে গেল এই কাজটা, এই ক্যারিয়ারটাই এখন ওর পরিচয়। সমাজ বা ভাবীর মতো মানুষ যা-ই বলুক না কেন, ওর যে এক নিজস্ব জগত আছে যেখানে ওর মেধার মূল্যায়ন হয়, সেখানে ওকে কোনো দয়ার পাত্রী হয়ে থাকতে হয় না কিংবা কেউ বোঝা বলে না!

.

বর্তমানে সে সম্পূর্ণ মনোযোগ নিজের কাজে আর আয়াতের দিকে দিচ্ছে। বাকিসব কিছু চেষ্টা করছে এড়িয়ে চলার।

নিজের ডেস্কে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল তখন ওয়াজেদের ইন্টারকমের বেলটা বেজে উঠল।

– স্নিগ্ধা, ফাইলটা নিয়ে আমার কেবিনে আসুন।

একটু পর স্নিগ্ধা গেল। কেবিনের দরজায় হালকা নক করে ভেতরে ঢুকতেই ওয়াজেদ ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকাল। ওর চোখ দুটো সবসময়ই কেমন যেন মানুষের মনের ভেতরের অস্থিরতা ধরতে পারে।
স্নিগ্ধা ফাইলটা এগিয়ে দিতেই ওয়াজেদ চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখলে। গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

– ফাইলটা দেখছি। তবে তার আগে বলুন, আপনার মন কোথায়? কাল রাতের পাঠানো ড্রাফটের তিন নম্বর স্লাইডে একটা বেশ বড় ভুল থেকে গেছে, যা আপনার কাজের ক্ষেত্রে হওয়ার কথা নয়। আমার ধারণাতে তো একদমই নয়!

স্নিগ্ধা চমকে উঠল। ওর কাজের ক্ষেত্রে এমন ভুল সাধারণত হয় না। থতমত খেয়ে নিচু গলায় বলল,

– আই… আই অ্যাম রিয়ালি স্যরি স্যার। আমি এখনই ঠিক করে দিচ্ছি। আসলে গতকাল রাতে একটু…

– পারসোনাল স্ট্রেস?

ওয়াজেদ ওর কথাটা থামিয়ে বলল। চেয়ারটার হেলান দিয়ে বসে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা বজায় রেখে অত্যন্ত স্বাভাবিভাবে বলল,

– স্নিগ্ধা, কাজের জায়গায় প্রফেশনালিজম থাকা ভালো কিন্তু আপনি রোবট নন। তাই নিজেকে স্ট্রেস ফ্রি করে কাজ করবেন। প্রবলেম থাকলে অবশ্যই কনসিডার করবো আমি!

স্নিগ্ধা চুপ করে আছে। পরিবারের উথালপাথাল সে বাইরে জানাতে চায় না। ওয়াজেদ ওর দিকে তাকিয়ে আবার বললো,

– স্নিগ্ধা, বস হিসেবে না হলেও একজন ওয়েল উইশার হিসেবে বলছি যে ঝামেলাগুলো মনের ভেতর রেখে কাজ নষ্ট করছেন, সেগুলো সমাধান করা শিখুন। সমাধান না হলে অন্তত ওগুলোকে ইগনোর করা শিখুন। সবচেয়ে সহজ কাজ কি জানেন?

স্নিগ্ধা চোখ তুলে তাকাল। কৌতূহল নিয়ে বললো,

– কি?

– মানুষকে বিচার করা আর কটু কথা বলা। আর সবচেয়ে কঠিন কাজ কি জানেন?

স্নিগ্ধা মাথা নাড়ল অর্থাৎ জানে না। ওয়াজেদ হেসে বললো,

– নিজের আত্মসম্মান ধরে রেখে মাথা উঁচু করে চলা। আপনি সেই কঠিন কাজটা করছেন, তাই পথের কাঁটাগুলো একটু বেশিই ফুটবে। এগুলো পথ থেকে সরিয়েই চলতে হবে।

ওয়াজেদ তার সমস্যা না জেনেও কি সুন্দর সমাধান দিল। লোকটার আচরণই এমন!

– ধন্যবাদ স্যার। আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আমি নিজের সেরাটা দিয়েই সব সামলানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু কখনো কখনো পরিস্থিতি একটু ভারী হয়ে যায়। আমি এক্ষুনি আপনাকে ড্রাফট এর ভুল শুধরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।

– দ্যাটস লাইক আ ট্রু প্রফেশনাল! যান, নিজের কাজে মন দিন।

স্নিগ্ধা উঠতে নিলে ওয়াজেদ বললো,

– লিটল লেডি কোথায়?

স্নিগ্ধা এক মুহূর্তের জন্য চোখ বড় বড় করে তাকাল। পরক্ষণেই মনে পড়লো আয়াতকে ওয়াজেদ লিটল লেডি বলে। মনে পড়তেই হেসে বললো,

– রুবি আপুর কাছে। মেয়েটা এখন রুবি আপুর সাথে ভালোই জমেছে। অফিসে আসলে আমার কাছে থাকেই না!

– মেয়েদের রুচির প্রশংসা করতেই হয়।

ওয়াজেদ আবার বেশ রসিকতার সুরেই বলল,

– রুবি অন্তত আপনার চেয়ে বেশি এন্টারটেইনিং! তা না হলে লিটল লেডি আপনার মতো গম্ভীর মায়ের কাছে সারাদিন বোর হতো!

স্নিগ্ধা বেশ অবাক হলো ওয়াজেদের মুখে এমন রসিকতা শুনে। লোকটাকে কাজেই ডুবে থাকতে বেশি দেখা যায়!

– আমি মোটেও গম্ভীর নই স্যার! আয়াত তো আমার সাথেই সারাদিন দুষ্টামি করে।

ওয়াজেদ হাসলো শুধু। স্নিগ্ধা কেবিন থেকে বেরিয়ে একবার রুবির কেবিনের দিকে গেল।

রুবি তখন নিজের টেবিলে বসে আয়াতকে কোলে নিয়ে একটা রঙিন চাবির রিং ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে খেলাচ্ছিল। আয়াত ওর ছোট্ট দু-হাত দিয়ে রিংটা ধরার জন্য বারবার ফিলফিল করে হেসে উঠছিল। স্নিগ্ধা আসতেই আয়াত খেলা ছেড়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে “আও ই উম” এরকম শব্দ করলো। স্নিগ্ধা হেসে হাত বাড়াতেই কোলে আসার জন্য ছটফট শুরু করলো। স্নিগ্ধা হেসে কোলে তুলে ওর পুরো মুখে আদর দিল। আয়াত ওর বুকে শান্ত হয়ে পরে রইল। রুবি হেসে বলল,

– দেখেছ স্নিগ্ধা? এতক্ষণ আমার সাথে কত খেলা করছিল, আর তোমাকে দেখলেই একেবারে লেপটে যাবে!

স্নিগ্ধা হাসলো। আরো টুকিটাকি কাজ নিয়ে আলাপ করে নিজের ডেস্কে ফিরে আসল। এভাবে সপ্তাহ খানেক চলে গেল। একদিন বন্ধের দিনে স্নিগ্ধা মেয়েকে নিয়ে বসে ছিলো তখন ওর মা আসলো ওর রুমে। স্নিগ্ধা হেসে বললো,

– কিছু বলবে মা?

স্মিগ্ধার মা ওর পাশে এসে বসলেন। ওনার মুখে এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও ভাবনার ছায়া। তিনি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে স্নিগ্ধার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,

– হ্যাঁ, একটা কথা বলার ছিল তোর সাথে।

স্নিগ্ধা মায়ের বিষণ্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে আয়াতকে কোলে একটু ভালো করে জড়িয়ে ধরে চেপে বসে বলল,

– কী কথা মা? কোনো সমস্যা হয়েছে?

– রাগ করবি না তো মা?

– বলো মা!

স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে বললেন,

– আমরা… আসলে তোর নতুন একটা জীবনের কথা ভাবছিলাম।

স্নিগ্ধা অবাক হলো না। সকলে অনেকবার অনেকভাবে এসব বলছে তাকে।

– মা প্লিজ এক কথা কেন বারবার বলছো!

স্নিগ্ধার মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

– তুই তো জানিস, তোকে আর আয়াতকে নিয়ে তোর সিফাত ভাই বা রিফাত ভাই কখনো কিছু মনে করে না। কিন্তু সংসার তো শুধু ভাইদের নিয়ে না রে মা, ওদেরও তো আলাদা পরিবার হয়েছে। তোর ভাবী আফরোজার আচরণ দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। সে রিফাতকে ইদানীং খুব চাপ দিচ্ছে তোকে আর আয়াতকে নাকি এই বাসায় বেশি দিন রাখা ঠিক হচ্ছে না। সমাজ নাকি কী বলবে। জানিসই তো!

ওর মা একটু থেমে স্নিগ্ধার চোখের দিকে তাকালেন।

– আর আমরা আরেকটা ব্যাপার….

– কী ব্যাপার?

ওর মা ইতস্তত করে বললেন,

– ওয়াজেদ ছেলেটা ভীষণ ভালো। সে…

স্নিগ্ধা যেন আকাশ থেকে পড়লো। সে কী ঠিক শুনলো? মাথা ঝিমঝিম করে উঠলো। তার মা কী বলতে চাইছে!

– এসব কী বলছো তুমি মা!

– ঠিকই বলছি শোন স্নিগ্ধা! ওয়াজেদের সাথে কথা হয়েছে এই নিয়ে

স্নিগ্ধা এবার অবাকের চরম পর্যায়ে পৌছে গেলো। ও লাফিয়ে উঠে বলল,

– এসব কী বলছো মা তুমি! কী করেছো তোমরা মিলে।

– আর কত দিন এভাবে থাকবি তুই?

স্নিগ্ধা রেগে বলল,

– আমি খুব ভালো আছি তোমাদের কিছু করতে হবে না। নাকি বোঝা লাগছে আমাকে?

– তুই বোঝা না হলেও লোকে তো বলতে ছাড়ছে না! তাছাড়াও নতুন একটা জীবন শুরু করলে কী ক্ষতি হবে? আমরা তো চাইছি তুই ভালো থাক তাই…

– আমি কোনো বিয়ে টিয়ে করবো না! এই বিষয় নিয়ে আর একটা কথাও বলবে না।

– কেন করবি না স্নিগ্ধা? সমাজ তোকে বাঁচতে দেবে না রে! কতদিন আর আমাদের ছায়ায় থাকবি?

স্নিগ্ধা র’ক্তচক্ষু নিয়ে বললো,

– আমি তো আমার মেয়েকে নিয়ে আগেই চলে যেতে চেয়েছিলাম তখন তোমরাই আটকেছো! এখন কেন তোমাদের সমস্যা হচ্ছে?

– সমস্যা নয় রে মা! আজ আমরা আছি, কাল থাকব না। তখন এই বাচ্চাটাকে নিয়ে কোথায় যাবি?

– আমি নিজের আর নিজের মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারবো কারো ছায়া লাগবে না আমার! সকলের কটু কথা তোমাদের গায়ে লাগছে তাই তোমরা এসব বলছো আমি বুঝতে পারি!

স্নিগ্ধার মা ওকে বোঝানোর সুরে বললো,

– বোঝার চেষ্টা কর মা! ওয়াজেদ যখন তোকে আর আয়াতকে গ্রহণ করতে রাজি তখন তোর আপত্তিটা কোথায়?

স্নিগ্ধার ভেতরে যেন ধপ করে আ’গুন জ্বলে উঠলো। সে বলে উঠলো,

– গ্রহণ করতে রাজি মানে কী মা? আমি কি কোনো দয়ার পাত্রী? নাকি কোনো রিজেক্টেড বস্তু যে কেউ এসে দয়া করে আমাকে আশ্রয় দেবে? নাকি আমার মেয়ে সেরকম কেউ?

– আমি তেমনটা বলছি না! শোন আমি…

– মা প্লিজ! আর বলো না এসব আমার ভালো লাগছে না। আমি কিন্তু বাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হবো!

স্নিগ্ধার মা রাগ দেখিয়ে বললেন,

– কী করবি কর কিন্তু আমি যা বলছি তাই হবে। ওয়াজেদ কাল তোকে দেখা করতে বলেছে তুই যাবি এটাই শেষ কথা।

স্নিগ্ধাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। স্নিগ্ধা হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলো। ওয়াজেদ দেখা করতে বলেছে? কথা এতোদূর গড়ালো কীভাবে? আর ওয়াজেদই বা কী বলবে? তার পরিবারের এমন কাজে কী তাকে অপমান করবে? কথা শুনাবে? সে একবার মেয়ের দিকে তাকালো। এই মেয়ের দিকে তাকাতেই বুক ফেটে কান্না পেয়ে গেলো তার। শক্ত হওয়া স্নিগ্ধা যে মেয়ের কাছে কোমল,নরম একটা মা!

#চলবে…?