#তিমিরবসান(১৪)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী
নিজের ঘরে বসে আছে স্নিগ্ধা। সবকিছু অসহ্য লাগছে তার। বিয়ের কথা সে চিন্তাও করে নি অথচ সবাই ওর সাথে কথা না বলেই ওয়াজেদ এর সাথে এই বিষয়ে কথা বলে নিয়েছে!! লোকটা কি ভাবলো? আচ্ছা সে কি অববাহিত? নাহয় কেন সে বিয়ের কথায় রাজি হবে! পরক্ষণেই নিজেকে ধমকে বললো,
– এসব বাদ। আমার মেয়েকে ছেড়ে আমি অন্য কিছু করবো না। কোনো বিয়ে টিয়ে হবে না।
একবার আয়াতের দিকে যে তখন আরাম করে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। ঘুমে তলিয়ে থাকা আয়াতের নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধার বুকের ভেতরের ঝড়টা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠল। মেয়েটার ছোট্ট হাত দুটো কেমন আলতো করে বালিশটা আঁকড়ে আছে। জীবনের এতগুলো ঝড়ঝাপটা পার হয়ে এসে এই একটা মানুষকেই তো সে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে। তবে কেন নতুন করে আবার এসব ঝামেলা? একটা বাচ্চা রেখে বিয়েতে মত দেওয়া মানে হল মেয়েটার অনিশ্চিত ভবিষ্যত! এটা ভাবতেই বুকের ভেতর ধক করে উঠলো তার। পরক্ষণেই মনটা রাগে, ক্ষোভে আর এক অদ্ভুত অস্থিরতায় বি’ষিয়ে উঠল তার। ভাইদের ওপর অভিমান হলো খুব। তারা কীভাবে স্নিগ্ধাকে না জানিয়ে, ওর মতামত না নিয়ে সরাসরি ওয়াজেদ স্যারের মতো একজন মানুষের সাথে এই প্রসঙ্গের অবতারণা করতে পারল? ওয়াজেদ স্যারই বা এখন ওর সম্পর্কে কী ভাবছেন? ভাবছেন না তো যে, পরিবারের বোঝা হালকা করার জন্য স্নিগ্ধার পরিবার একজন প্রতিষ্ঠিত একটা ছেলে খুঁজছে? ভাবতেই স্নিগ্ধার নিজের আত্মসম্মানে প্রচণ্ড চোট লাগল। নিজের অজান্তেই দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল সে। বিড়বিড় করে আওড়ালো,
– আমি আজই স্যারকে মানা করে দেবো। আমি চাকরি করি, নিজের আর মেয়ের খরচ চালাই। কাউকে দয়া দেখিয়ে আমাকে বা আমার মেয়েকে আপন করতে হবে না। আমাকে এত অবলা ভাবার কোনো কারণ নেই।
.
বিকেলে আয়াতকে মায়ের কাছে রেখে বের হলো সে। প্রথমে ভেবেছিল কলে মানা করে দিবে কিন্তু মায়ের জোরাজড়ি সহ্য করা যাচ্ছিল না আর শেষমেশ ওয়াজেদের একটা মেসেজ এলো। একটা লোকেশন পাঠিয়ে বিকেলে সেখানে আসার কথা লেখা ছিলো। স্নিগ্ধা সীন করেছে ঠিকই কিন্তু হ্যাঁ বা না কোনো উত্তর দেয়নি। ওই লোকেশনে গিয়ে ও আশপাশ তাকাল। এখানে অনেক রেস্তরাঁ আছে আবার পার্কও আছে তাহলে কোথায় যাবে সে? এসব ভাবতে ভাবতে ওর ফোনে মেসেজ আসলো। স্নিগ্ধা ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল ওয়াজেদের আরেকটা মেসেজ,
– বামে যে ছোট ওপেন-এয়ার ক্যাফেটা আছে সেটায় চলে আসুন!
স্নিগ্ধা একটা গভীর শ্বাস ফেলল। নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে নিয়ে ধীরে ধীরে ধীরস্থির পায়ে ক্যাফের ভেতরে পা বাড়াল। ক্যাফেতে যেতেই দেখলো কর্নারের টেবিলে ওয়াজেদ বসে আছে। স্নিগ্ধাকে আসতে দেখে সে সৌজন্যসূচক মৃদু হাসলো। স্নিগ্ধা ধীরে গিয়ে ওর সামনের চেয়ারে বসলো। সালাম আর কুশলবিনিময় হয়ে গেলে ওয়াজেদ হাসিমুখে বললো,
– চা খাবেন, নাকি কফি?
স্নিগ্ধা এক মুহূর্তের জন্য চুপ থেকে শান্ত কণ্ঠে বলল,
– কিছু লাগবে না স্যার, ধন্যবাদ। আমি আসলে অল্প কিছু কথা বলতে এসেছি।
ওয়াজেদ গম্ভীর মুখে বললো,
– জ্বি বলুন আমি শুনছি।
স্নিগ্ধা একটু চুপ থেকে মাথা নিচু করে বললো,
– আমার পরিবার আপনাকে কী ভেবে বা কীভাবে এই বিষয়ে কথা বলেছে আমি সত্যি জানি না স্যার। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে আমার অমতে আপনাকে এভাবে জড়ানো হয়েছে। আমি জানি না যে…
ওয়াজেদ ওকে থামিয়ে দিলো। শুধালো,
– আমাকে জানানোর বা বলার ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নিয়ে বলার আছে?
স্নিগ্ধা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললো,
– মানে?
– মানে আমাকে এই বিষয় নিয়ে বলার কারণে আমি আপনাকে কিছু বলেছি? আমি কৈফিয়ত দিচ্ছেন কেন?
স্নিগ্ধা একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
– না মানে… ভাইয়ারা আপনাকে হুট করে এই প্রস্তাবটা দিয়েছে, এতে আপনি নিশ্চয়ই বেশ বিব্রত হয়েছেন? আর তাছাড়া… আপনি যে এতে সম্মতি দিয়েছেন, এটাই আমার মাথায় ঢুকছে না! আমার অমতে বা আমার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সব জেনেও আপনি কী ভেবে এই বিয়ের কথায় রাজি হলেন? নিশ্চয়ই আপনি সবাইকে না করতে পারেন নি কিংবা আমাকে বা আমার পরিবারকে করুণা করে…
– স্নিগ্ধা, আপনি কি সত্যি মনে করেন আমাকে কেউ জোর করে কোনো সিদ্ধান্তে রাজি করাতে পারে? কিংবা আমি আপনাকে দয়া করছি?
ওয়াজেদের এই সোজা প্রশ্নে স্নিগ্ধার কথা আটকে গেল। ওয়াজেদ আয়েশ করে বসে বললো,
– দেখুন আপনার পরিবার আমাকে প্রস্তাব দেয় নি আর না আমি দিয়েছি।
– তাহলে? কথা এতদূর এগোলো কিভাবে?
– সিফাতের সাথে আমার কথায় কথায় এই বিষয়টা এসে গিয়েছে। সিফাত নিজেও সংকোচ বোধ করেছিল। আমি নিজের ইচ্ছেতেই মত দিয়েছি। কোনো চাপ বা দয়ার বশবর্তী হয়ে নয় আমি নিজে ভেবেচিন্তেই রাজি হয়েছি।
স্নিগ্ধা তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে রইল। মুখ দিয়ে কোনো কথা এলো না তার। খানেক বাদে ও বললো,
– কিন্তু স্যার, আপনি কেন রাজি হবেন? আমার অতীত, আমার বর্তমান জীবনের জটিলতা সব তো আপনার জানা। আপনি তো অবিবাহিত, চাইলেই একটা নতুন সুন্দর সূচনা করতে পারেন। সেখানে আমার মতো একজন মানুষের সাথে জীবন বাঁধার সিদ্ধান্ত কেন নিচ্ছেন?
ওয়াজেদ খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললো,
– কারণ আপনার অতীত বা বর্তমান নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই স্নিগ্ধা। জীবনে আঘা’ত সবাই পায়, তবে সেই আঘা’ত সামলে আপনি যেভাবে আয়াতকে আগলে মাথা উঁচু করে বাঁচছেন, তা সম্মানের। আর বিবাহিত বা অবিবাহিত হওয়াটা কোনো যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না। আমি একজন পরিণত মানুষ হিসেবে আপনাকে আর আপনার আত্মসম্মানকে বুঝি, তাই এই সিদ্ধান্তে আমার কোনো দ্বিধা নেই।
স্নিগ্ধা এবার একদম চুপ হয়ে গেল। ওয়াজেদের সোজা স্বীকারোক্তি ওকে সন্তুষ্ট করলেও মনের ভেতর চেপে রাখা ভয়কে উপেক্ষা করতে পারলো না। সে নিচু স্বরে বললো,
– আপনার সিদ্ধান্তের কথা বুঝলাম। কিন্তু আমি দ্বিতীয় কোনো বিয়ের কথা চিন্তাও করছি না। আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমার সম্পূর্ণ জীবন এখন শুধুই আমার মেয়ে আয়াতকে ঘিরে। মেয়েকে রেখে অন্য কোনো পুরুষের ওপর নির্ভর করে বা নিজের একটা সংসার হবে এই লোভে আমি নতুন কোনো বাঁধনে জড়াতে চাই না। এই বিষয়টা এখানেই থেমে গেলে ভালো হয়!
ওয়াজেদ একটু চুপ থেকে মৃদু হাসলো। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুলেই বললো,
– আমি কি একবারও আয়াতকে ছেড়ে আমার জীবনে আপনাকে আসতে বলেছি?
স্নিগ্ধা চমকে গিয়ে আওড়ালো,
– মানে?
– আপনি বলছেন আপনি মেয়েকে রেখে বিয়ে করবেন না। কিন্তু আমি বলছি যদি আমার পাশে আপনার আসতে হয়, তবে আয়াতকে বাদ দিয়ে নয় বরং আয়াতকে সাথে নিয়েই আসতে হবে। কেবল ‘স্ত্রী’র খোঁজে আমার জীবনের সাথে আপনাকে জড়ানোর কথা ভাবিনি। আমি একজন ‘মা’ আর তার সন্তানকে নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ নীড় গড়তে চেয়েছি।
একটু থেমে সোজা হয়ে বসলো ওয়াজেদ। একটা শ্বাস ছেড়ে বললো,
– আমি আপনাকে আয়াতকে ফেলে আসতে বলিনি বরং আমি চাই আয়াতকে নিয়েই আপনি আসুন। কারণ আয়াত আপনার জীবন থেকে আলাদা কোনো অস্তিত্ব নয় ও আপনার হৃদস্পন্দন। যে পুরুষ আপনার সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে বুকে টেনে নিতে পারবে না, সে আপনার হাত ধরারও যোগ্য নয়। আমি আপনাকে শুধু একজন স্ত্রী হিসেবে নয় নিজেকে আয়াতের একজন দায়িত্বশীল বাবা এবং আপনার একজন জীবনসঙ্গী হিসেবেই পাশে থাকতে চাই। এবার বলুন, এই শর্তে কি খুব বেশি অন্যায় কিছু চেয়ে ফেললাম?
স্নিগ্ধা পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। ওয়াজেদের মুখের দিকে তাকিয়ে ওর বাক্শক্তি যেন ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গেছে। এত স্পষ্ট, এত গভীর আর সম্মানজনক প্রস্তাব সে আশা করে নি। যে ভয়গুলো তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করছিল মেয়েকে খোয়ানোর ভয়, সমাজের করুণার পাত্রী হওয়ার ভয় কিংবা আবার কোনো ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ভয় ওয়াজেদ এক নিমেষে নিজের পরিপক্ব কথা দিয়ে সেই সব ভয়ের দেয়াল গুঁড়িয়ে দিল। তবুও নিজেকে শক্ত করে বললো,
– স্যার… আপনি যা বলছেন সেটা মুখে বলা সহজ কিন্তু বাস্তবায়ন করা কতটা কঠিন তা কি আপনি বোঝেন? আমার একটা অতীত আছে, সমাজ হাজারটা কথা বলবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আয়াত এখনো অনেক ছোট। ও কোনো নতুন মানুষকে সহজে মেনে নিতে পারবে কি না বা আপনার পরিবার একজন সন্তানসহ মেয়েকে কীভাবে গ্রহণ করবে এসব তো কেবল আবেগের ওপর ভিত্তি করে হয় না।
ওয়াজেদ স্নিগ্ধার কথার ধরণ দেখে মৃদু হাসল। এই লোকটা আজ শুধু হাসছে! যেকোনো কথায় হাসছে! সে কি হাসার মতো কিছু বলেছে?
– আমি কখনোই আবেগে ভেসে সিদ্ধান্ত নিই না স্নিগ্ধা। সেটা আমার সাথে কাজ করে এতদিনে আপনার জেনে নেওয়ার কথা! তাছাড়া আমার সিদ্ধান্তকে সম্মান করার মতো মানসিকতা আমার পরিবারের আছে। আর সমাজের কথা? সমাজ আপনার যন্ত্রণার দিনে পাশে এসে দাঁড়ায়নি, তাই আপনার ভালো দিনে সমাজ কী ভাবল তা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। রইল বাকি আয়াত, শিশুরা মুখ দেখে ভালোবাসে না, ভালোবাসা চেনে নিঃস্বার্থ স্পর্শ আর যত্ন থেকে। তাকে সময় দেওয়া, তার ভালোবাসার যোগ্য হয়ে ওঠা সেই দায়িত্বটা নাহয় আমার ওপরই ছেড়ে দিন?
স্নিগ্ধা উত্তর দিতে পারল না। কেউ একজন তাকে কিংবা তার মেয়েকে কোনো ‘বোঝা’ বা ‘দয়ার পাত্রী’ হিসেবে দেখছে না বরং পূর্ণ সম্মান আর ভালোবাসায় নিজের জীবনে জায়গা দিতে চাইছে এই অনুভূতিটা ওর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আলোড়ন সৃষ্টি করছে তবে ভয় পুরোপুরি কাটছে না!
ওয়াজেদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
– আমি আপনাকে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত দিতে বলছি না স্নিগ্ধা। সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণ আপনার। কোনো তাড়াহুড়ো নেই, পরিবারের চাপেও কিছু করবেন না। নিজের মনকে সময় দিন, ভাবুন। যদি মনে হয় আমি আপনার আর আয়াতের জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় হতে পারব, তবেই এগোবেন। আমার পক্ষ থেকে কোনো জোর জবরদস্তি নেই।
স্নিগ্ধাকে চুপ থাকতে দেখে ওয়াজেদ উঠে দাঁড়াল। ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
– চলুন, আপনাকে বাসায় ড্রপ করে দিই। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। লিটল লেডি নিশ্চয়ই তার মায়ের জন্য অপেক্ষা করছে।
স্নিগ্ধা আর না করলো না চুপচাপ ওর পেছন পেছন গেল। গাড়িতে উঠে বসতেই স্নিগ্ধা পেছনে যেতে নিলে ওয়াজেদ বললো,
– ম্যাডাম! আমি আপনার ড্রাইভার নই সামনে এসে বসুন।
স্নিগ্ধা নিজের ভুল বুঝতে পেরে মনে মনে ভীষণ লজ্জিত হলো। নিঃশব্দে দাঁত দিয়ে জিভ কেটে সামনে এসে বসতেই ওয়াজেদ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতেই সামনে তাকিয়ে বললো,
– আমি এখনও আপনার ড্রাইভারের চাকরিটা নিইনি ঠিকই তবে হতেও আমার কোনো আপত্তি নেই আর সেই অপশনও আছে আপনার কাছে। যদি আপনি দায়িত্বটা আমাকে দেন তবে খুব আনন্দ নিয়েই সেই দায়িত্বটা পার করে দেব। এখন নির্ভর করছে ড্রাইভারটাকে আপনি নিজের পাশে বসাবেন নাকি কেবল জীবনযাত্রার চালক হিসেবে রাখবেন।
স্নিগ্ধা তড়িৎ তাকালো ওয়াজেদের পানে। ওয়াজেদ মন দিল গাড়ি চালানোতে যেন সব স্বাভাবিক। স্নিগ্ধা চোখ সরিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। গোধূলির আলো-আঁধারিতে কাচের ভেসে ওঠা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ভাবলো, ওয়াজেদের বলা কথাগুলো ওর মনের বরফগুলো ধীরে ধীরে গলিয়ে দিতে শুরু করেছে…?
.
স্নিগ্ধা এসেছে বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে। আয়াতকে এসে যে নিয়েছে আয়াত আর নড়ছে না তার কোল থেকে। আয়াতের সিল্কের মতো খোচাখোচা নরম তুলতুলে চুলে মুখ গুঁজে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল স্নিগ্ধা। পরম মমতায় মেয়েটার নরম কপালে আর ছোট্ট দুটি গালে একের পর এক চুমু এঁকে দিতে লাগল।
– আমার সোনা পাখিটা! আম্মুকে মিস করছিলে? একদম কান্না করোনি তো? ভালো মেয়ে আমার?
আয়াত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বড় বড় ডাগর চোখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল, তারপর আবার খিলখিল করে হেসে উঠে নিজের ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে মুঠো করে ধরার চেষ্টা করল। মুখে সেই দাঁতহীন মিষ্টি হাসি।
স্নিগ্ধা আয়াতকে কোলে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে চলে এলো। বিছানায় বসে আয়াতকে কোলে শুইয়ে ওর নরম হাত-পায়ের দিকে তাকাল। আয়াতের ছোট্ট আঙুলগুলো স্নিগ্ধার একটা আঙুল শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে রাখল, যেন কোনোভাবেই ছাড়বে না। স্নিগ্ধা অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিজের এই ছোট্ট পৃথিবীটার দিকে। ক্যাফেতে বসে ওয়াজেদের বলা প্রতিটি কথা যেন আবার ওর কানে বাজতে শুরু করল…”যদি আমার পাশে আপনার আসতে হয়, তবে আয়াতকে বাদ দিয়ে নয় বরং আয়াতকে সাথে নিয়েই আসতে হবে।”
স্নিগ্ধা যেন দোটানায় ভুগছে! একটা মেয়ে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করলে যদি মেয়েটাকে পরে… না মেয়েকে কোনোরকম অবহেলার কথা সে ভাবতেও পারে না! তার উচ্চবিলাসী জীবন নেই কিন্তু মেয়েকে সামর্থ্যের মধ্যে সে খুব যত্ন করে বড় করছে! সেই মেয়েকে কেউ অবহেলা করবে না সহ্য করবে না এটা সে মানতে পারবে না! পরে নিজে চেঞ্জ হয়ে গেলে? এসব মাথায় ঘুরতেই সে মাথা ঝেড়ে আয়াতকে কোলে তুলে নিলো।
আয়াত তখন নিজের একটা আঙুল মুখে দিয়ে ডাগর চোখে মায়ের চোখের দিকে তাকাল। স্নিগ্ধা আলতো করে মেয়ের কপালে নিজের গাল ঘষে মৃদু হেসে বলল,
– আম্মুর কলিজার টুকরো… তোকে কখনো আম্মুর কোল থেকে কেউ আলাদা করতে পারবে না। কখনো না। তোর প্রতি আমার কখনো অবহেলা আসার আগেই আমার জীবনের শেষ ধাপ অতিক্রম হয়ে যাক!
কেটে গেল আরো তিনদিন। এই তিনদিনে স্নিগ্ধা অফিসে গিয়েছে খুব ইতস্তত করে তবে ওয়াজেদ ছিলো একদম স্বাভাবিক যেন কিছুই হয়নি। এই বিষয়ে একটা কথাও বলে স্নিগ্ধাকে বিব্রত করে নি। কিন্তু বাড়িতে প্রতিনিয়ত এই নিয়ে কথা শুনেছে সে। যে যেভাবে পারছে যেন স্নিগ্ধা নামক বোঝা ঘাড় থেকে নামিয়ে দিতে চাইছে! স্নিগ্ধা বুঝে পায় না সমস্যাটা আসলে কোথায়! সে তো অন্য কারও খাচ্ছে না তার মেয়েকেও সে নিজের ইনকামে বড় করছে তবুও… সে বুঝতে পারলো ডিভোর্স হলে সে যত যাই করুক দিনশেষে সে নিজের গায়ের তকমা দিয়েই পরিচিত হয়! আত্মসম্মান আর যোগ্যতার কোনো মূল্যই সেখানে অবশিষ্ট থাকে না।
ওয়াজেদ নিজের ঘরে বসে কাজ করছিলো। হঠাৎ ফোনের রিং বাজতেই সে পাশ থেকে ফোন হাতে তুলে নিলো। স্ক্রিনে বেশে উঠা নাম দেখতেই ঠোঁটের কোণে হাসির ঝিলিক দেখা গেল যেন সে জানতো এই ফোন আসবেই! ফোন রিসিভ করে গম্ভীর মুখে বললো,
– হ্যাঁ স্নিগ্ধা বলুন।
মুখে হাসি থাকলেও সে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছে। ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ শোনা গেল না, একটা ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া! ওয়াজেদ আবার বললো,
– স্নিগ্ধা হেসিটেট ফীল করবেন না আপনি কি বলতে ফোন করেছেন বলে ফেলুন।
একটা বড় শ্বাস টেনে স্নিগ্ধা চোখ মুখ বন্ধ করে বললো,
– এই বিয়েতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছি।
ওয়াজেদের মুখের হাসি প্রসারিত হল। বুকের ভেতর একটা নতুন অনুভূতির তোলপাড় হলো। মনে মনে ওয়াজেদ নিজেকেই নিঃশব্দে এক প্রতিশ্রুতি দিল, “স্নিগ্ধা, আপনি যে বিশ্বাস আর ভরসা রেখে আপনার আর আয়াতের জীবনের সাথে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে দিয়ে সাহায্য করছেন, সেও বিশ্বাস আস্থা আমি কোনোদিন ভাঙতে দেব না। সমাজ বা অতীতের কোনো কালো ছায়া আর কখনো আপনাদের স্পর্শও করতে পারবে না!
#চলবে…?

