Home "ধারাবাহিক গল্প তিমিরবসান তিমিরবসান পর্ব-১৫

তিমিরবসান পর্ব-১৫

0
249

#তিমিরবসান(১৫)
#তাবাসসুম_তাজ্বওয়ারী

স্নিগ্ধা ঘরে বসে আছে। বাসায় তোড়জোড় চলছে তার বিয়ের। এই সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। ড্রয়িংরুমে মায়ের বিড়বিড় করে জিনিসপত্রের হিসাব মেলানো, ভাবীর মুখে মেকি হাসির পেছনে লুকানো স্বস্তির ছাপ আর ভাইদের তাড়া সব মিলিয়ে এক উৎসব মুখর পরিবেশ। অথচ এই সব আয়োজনের মূল কেন্দ্রে যে মানুষটা বসে আছে তার বুকের ভেতরটা যেন পাথর হয়ে জমে আছে। সে রাজি হয়েছে ঠিকই কিন্তু মনের খচখচ ভাবটা কাটাতে পারছে না!

স্নিগ্ধার চোখ গেল বিছানার ওপর। তার ছোট্ট আয়াত উপুড় হয়ে শুয়ে নিজের দুই হাত দিয়ে একটা রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা আঁকড়ে ধরে মুখে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সে এগিয়ে এসে খেলনা সরিয়ে ওকে কোলে তুলে নিলো।

– পচা মেয়ে! প্লাস্টিকের খেলনা মুখে দেয় কেউ? পেট ব্যথা করবে তো আম্মু!

আয়াত কোল পেয়েই খেলনা ভুলে স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে নিজের হাত মুখে দিলো। তারপর আবোল-তাবোল কিছু শব্দ করে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস ফেলতে লাগল। স্নিগ্ধা মেয়ের বুকে মুখ গুঁজে দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ছাড়ল। আয়াতের শরীর থেকে আসা বাচ্চার গন্ধটা যেন ওর ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা হলেও কমিয়ে দিল।

বিয়ের আর মাত্র দুটো দিন বাকি। অথচ স্নিগ্ধার মনের ভেতর একের পর এক প্রশ্ন আর ভয়ের পাহাড়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ওয়াজেদের মতো একজন সুপ্রতিষ্ঠিত, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অবিবাহিত পুরুষ তাকে এবং তার মেয়েকে নিয়ে নতুন সংসার শুরু করতে চাইছে ভাবতেই ওর অবিশ্বাস্য লাগে। মানুষটা ক্যাফেতে বসে কতটা সহজ ভঙ্গিতে নিজের ভালোবাসার দায়ভার নেওয়ার কথা বলে গেল! কিন্তু সমাজ? সমাজ কি এত সহজে মেনে নেবে? ওয়াজেদের আত্নীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব যখন জানবে যে সে এক সন্তানের জননী এক ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করেছে তখন কি ওয়াজেদ সত্যি স্নিগ্ধা আর আয়াতকে আগলে রাখতে পারবে? নাকি একসময় লোকটার ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে আর তার মাশুল গুণতে হবে নিষ্পাপ আয়াতকে? ভাবতেই গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল স্নিগ্ধার। মেয়েকে সে কখনোই অবহেলা করতে পারবে না! এই মেয়ের জন্যই তিমিরবসান হয়েছে! এই মেয়ে না থাকলে সে কখনোই অত্যাচার থেকে বের হতে পারতো না!

তখনই দরজায় নক করলো কেউ। স্নিগ্ধা নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

– ভেতরে আসো।

ভেতরে আসলো তার মা আর ভাবী। দুজনের চোখে মুখে উপচে পড়া আনন্দ। ওদের হাসি হাসি মুখ দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো স্নিগ্ধা। যে মেয়েটাকে নিয়ে এতদিন পরিবারের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না তাকে একজনের ঘাড়ের ওপর সোপর্দ করতে পারার তৃপ্তি স্পষ্ট ওদের চোখে-মুখে। ওর ভাবি এসেই একটা শাড়ি দিয়ে প্রফুল্ল গলায় বললো,

– দেখো তো স্নিগ্ধা, ওয়াজেদ সাহেব কী পাঠিয়েছেন! একদম নিজের পছন্দের শাড়ি পাঠিয়েছেন তোমার আকদের জন্য। শাড়িটা দেখে আমারই চোখ জুড়িয়ে গেল!

স্নিগ্ধার মা পাশ থেকে হাসিমুখে বলে উঠলো,

– হ্যাঁ রে স্নিগ্ধা ওয়াজেদের পছন্দ বেশ উন্নত। ও তোকে নীল রঙের কাঞ্জিভরম পাঠিয়েছে, আর আমাদের পুঁচকে আয়াতের জন্য পাঠিয়েছে এই সুন্দর আকাশী ফ্রকটা!

স্নিগ্ধা এক পলক শাড়ি আর জামার দিকে তাকিয়ে তারপর আবার মা ভাবির দিকে তাকিয়ে বললো,

– তোমরা খুশি তাই না? মাথা থেকে বোঝা নামবে?

এহেন কথায় বিস্ময় দেখা গেল স্নিগ্ধার মায়ের চোখেমুখে। তিনি অবাক কণ্ঠে বললেন,

– এসব কি বলছিস তুই স্নিগ্ধা? আমরা তোকে বোঝা ভাবছি?

– তা নয়তো কি? আমাকে আর আমার মেয়েকে শুধু বাড়িতে ঠাঁই দিয়েছিলে তাও জোর করে! আমি আলাদা হয়ে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু এখন কিভাবে বিয়ে দিয়ে বিদায় করবে সেটা নিয়ে চিন্তায় ছিলে। তাই তো একটা ব্যবস্থা হয়ে গেল।

– তোর জন্মদাত্রী মা হয়ে তোকে আজ আমি ‘বোঝা’ মনে করছি? নিজের মেয়েকে পরের হাতে সঁপে দেওয়ার আনন্দের পেছনে কি শুধুই দায়মুক্তির হিসেব থাকে? বুকে পাথর তোকে আমরা তিল তিল করে অত্যাচার সহ্য করতে দেখেছি স্নিগ্ধা। তোকে ওয়াজেদের কাছে ভালো আছিস দেখলে আমি শান্তি পাবো!

স্নিগ্ধা কিছুই বললো না। সে তার মাকে কষ্ট দিতে চায়নি তবে তার কথা যে ভুল সেটাও তো নয়! এর মধ্যে ওর রুমে আসলো ওর বড় ভাই রিফাত। স্নিগ্ধার মা আর ভাবী বেরিয়ে যেতেই ও আয়াতের দিকে তাকিয়ে বললো,

– কী করছে রে আমার বুড়িটা? মামার কাছে আসবে?

আয়াত মামাকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিল। সিফাত ওকে কোলে তুলে নিতে নিতে স্নিগ্ধার বিষণ্ণ চেহারার দিকে তাকাল।

– স্নিগ্ধা, তুই কি এখনো পুরো মন থেকে রাজি হতে পারিসনি রে? আমাদের ওপর কি তোর খুব রাগ হচ্ছে?

স্নিগ্ধা একটু চুপ থেকে হাসার চেষ্টা করে বলল,

– রাগ করার অধিকার কি আমার আছে ভাইয়া? তোমারা তো আমার ভালোর জন্যই ভাবছ!

রিফাত আক্ষেপের সুরে বললো,

– আমরা যা করছি তা তোর ভাই হিসেবেই করছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, ওয়াজেদের সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে এই লোকটা তোর অতীতের কোনো আঘাতকে তোর গায়ে আঁচ লাগতে দেবে না। ওয়াজেদ অত্যন্ত পরিপক্ব আর স্পষ্টভাষী মানুষ। ও নিজে থেকে তোর দায়িত্ব নিতে চেয়েছে, স্নিগ্ধা। কোনো বাধ্যবাধকতা থেকে নয়।

আরো বেশ কিছু টুকটাক কথা বলে বেরিয়ে গেল রিফাত। স্নিগ্ধা শাড়ি আর মেয়ের ফ্রকের ভাঁজ খুলে দেখলো একটা চিরকুট। হাতে লেখা সুবিন্যস্ত স্পষ্ট অক্ষরে লেখা,

“ছোট্ট রাজকন্যা আর তার মায়ের জন্য এই পোশাকগুলো। আকদের দিন মা আর মেয়েকে একই সাথে এই রঙের কম্বিনেশনে দেখতে বেশ লাগবে আশা করছি! কোনো দ্বিধা না রেখে খুশিমনে গ্রহণ করলে ভালো হয়!”

স্নিগ্ধা চিরকুটটার ওপর আলতো করে আঙুল বুলাল। প্রতিটি সুবিন্যস্ত অক্ষরের খাঁজে খাঁজে যেন ছড়িয়ে আছে প্রগাঢ় গাম্ভীর্য আর নিঃশব্দ এক প্রশ্রয়। না কোনো বাড়তি আবেগের বাহুল্য, না কোনো আধিপত্য জাহিরের চেষ্টা! মৃদু হাসলো স্নিগ্ধা। তারপর শাড়ি আর জামা দেখে আয়াতকে দেখালো।

– দেখি তো আমার বুড়ির জন্য কি এসেছে এটা? হু?

স্নিগ্ধা আকাশী রঙের ফ্রকটা আয়াতের গায়ে ধরে দেখতেই আয়াত খিলখিল করে হেসে উঠল। ছোট ছোট হাত দুটি ছুড়ে যেন আনন্দ প্রকাশ করল সে। স্নিগ্ধাও হাসলো ওর সাথে। বেশ কিছুক্ষণ পরখ করে আলমারিতে রাখার জন্য এগোতে এগোতে ভাবলো, “হু! লোকটার পছন্দ আছে বলতে হয়!”

হঠাৎ করেই স্নিগ্ধার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো রিংটোন বাজল না, কেবল একটা মেসেজের নোটিফিকেশন। ডিসপ্লেতে চোখ পড়তেই স্নিগ্ধা একটু থমকে গেল… ওয়াজেদের মেসেজ।

– পোশাকগুলো কি পৌঁছেছে? আয়াতের পছন্দ হয়েছে তো? নাকি খুদে রাজকন্যাও তার মায়ের মতোই গম্ভীর?

মেসেজটা পরে একটু হাসলো। কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর আঙুলে টাইপ করল,

– সব পৌঁছেছে স্যার। এত কিছু করার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জবাব এলো

– প্রয়োজন শব্দটা বেশ আপেক্ষিক স্নিগ্ধা। আর তাছাড়া, ‘স্যার’ ডাকটার মেয়াদ কিন্তু আকদের দিন পর্যন্ত মনে থাকে যেন?

মেসেজের উত্তরটা পড়ে স্নিগ্ধার গালে অচেনা এক লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। কেমন কেঁপে উঠল, একটা অন্যরকম অনুভূতি হলো যেটা স্নিগ্ধার আগে কখনোই হয়নি! ফাহাদের ক্ষেত্রেও নয়!
স্নিগ্ধা উত্তর দিতে গিয়েও আবার আঙুল থমকে গেল। কী লেখা যায়? ‘জি মনে থাকবে’ নাকি ‘আচ্ছা’? ধুর! কোনো উত্তর না দিয়ে ফোনটা আবার বিছানার ওপর উপুড় করে রেখে দিল সে। মুখে মুচকি হাসি তার। না চাইতেও হাসি হাসি হয়ে গেল তার বদনখানি!

আয়াত তখন বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে দুই পা শূন্যে ছুড়ছিল। স্নিগ্ধা ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মেয়ের পাশে শুয়ে পড়ল। হাত বাড়িয়ে আয়াতকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকের ওপর মুখ রাখল। বিড়বিড় করে বললো,

– তোর কি ওনাকে পছন্দ হচ্ছে আয়াত? নাকি উনি যে হুট করে আমাদের জীবনে চলে এলেন তাতে তোর অপছন্দ হচ্ছে?

আয়াত অমনি খিলখিল করে হেসে উঠল। যেন মায়ের কথা বুঝতে পেরে নিজের জবাব দিলো। স্নিগ্ধা ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ওর চোখে মুখে চুমু খেলো।

.

চোখের পলকে কেটে গেছে দুদিন। আজ স্নিগ্ধা আর ওয়াজেদের বিয়ে। ছোটখাটো অনুষ্ঠান করে ওয়াজেদ স্নিগ্ধাকে নিয়ে যাবে। সে নিজেই মতামত দিয়েছে কারণ বড় করে বিয়ে করার ইচ্ছে আগ্রহ কোনোটাই নেই তার।

স্নিগ্ধা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। বুকের ভেতরে সেই পুরোনো ভয় আর অজানা ধুকপুকানিটা একদম উবে যায়নি তবে আজ সেখানে এক অদ্ভুত প্রশান্তিও কাজ করছে। জীবনের একটা বিশৃঙ্খল, আঁধার অধ্যায় পেছনে ফেলে এসে আজ সে এমন এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে যেখানে পথটা অনিশ্চিত হলেও অন্ধকারের ভীতি নেই। সে নিজেকে সম্পূর্ণ শান্ত রাখার চেষ্টা করলো।

চলে আসলো সেই মুহূর্ত! পর্দার এপাশে স্নিগ্ধা আর অন্যপাশে ওয়াজেদ। দুজন দুজনকে দেখতে পাচ্ছে না। বিয়ে শুরু করার আগে স্নিগ্ধা ওর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

– আয়াতকে আমার কোলে দাও।

স্নিগ্ধার মা বললো,

– আয়াত রিফাতের কাছে থাক। তুই এদিকে মনোযোগ দে।

স্নিগ্ধা বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকালো। এখন থেকেই মেয়েকে দূরে করার পায়তারা চলছে নাকি? সে স্থান কাল ভুলে জেদ করে বললো,

– আমার মেয়েকে আমার কোলে দিতে বলেছি। ওকে ছাড়া একটা কাজও শুরু হবে না!

ওর কড়া কণ্ঠ শুনে আর কেউ কিছু বলল না আয়াতকে ওর কোলে বসিয়ে দিলো। স্নিগ্ধা আয়াতকে নিজের শক্ত বাঁধনে জড়িয়ে ধরল। মেয়ের নরম ছোঁয়াটুকুই যেন এই মুহূর্তে ওর সবচেয়ে বড় মানসিক শক্তি। আয়াত মায়ের উষ্ণতা পেয়ে স্নিগ্ধার শাড়ির আঁচলটা ছোট ছোট আঙুলে আঁকড়ে ধরে অলস ভঙ্গিতে বসে রইল। কাজী সাহেব বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করলেন। স্নিগ্ধার বুকের ভেতরটা যেন ঝড়ের বেগে কাঁপছে। এতগুলো দিন ধরে গড়ে তোলা সমস্ত আত্মরক্ষার দেয়াল যেন এই একটা মুহূর্তের সামনে এসে থমকে গেছে। অতীত যন্ত্রণার বি’ষাক্ত স্মৃতিগুলো হঠাৎ করেই মনটাকে অবশ করে দিতে চাইছে।

কাজী সাহেব খাতাটা সামনে এগিয়ে দিয়ে কি জানি বললো কিন্তু স্নিগ্ধা শুধু শুনলো,
– ওয়াজেদ সরওয়ারের সাথে তিন লাখ টাকা দেনমোহরে, শেহরিশ জাহান স্নিগ্ধা বিবাহে আপনার সম্মতি আছে তো?

স্নিগ্ধা চুপ করে থাকায় কাজী আবার বললেন,

– আপনি কি এই বিবাহে সম্মতি দিচ্ছেন? বলুন, ‘কবুল’।

স্নিগ্ধার যেন কথা আটকে এসেছে। সে মাথা নিচু করে আয়াতের দিকে তাকিয়ে আছে! এদিকে কাজী বারবার তাড়া দিচ্ছে দেখে ওয়াজেদ বললো,

– কাজী সাহেব, উনাকে তাড়াহুড়ো করাবেন না। ওনাকে একটু সময় দিন। আমাদের তো তাড়াহুড় নেই!

স্নিগ্ধা চোখ নামিয়ে আয়াতের দিকে তাকিয়েই আছে। যে তার দিকেই ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে, মা এভাবে বসে আছে কেন?
স্নিগ্ধা চোখের কোণে জমা হওয়া একফোঁটা জল মুছে নিল। লোকটা পর্দার ওপারে থেকেও কীভাবে ওর ভেতরের এই অনভ্যস্ততা আর ভয়টা টের পেল? সে একটা শ্বাস ছেড়ে আয়াতের ক্ষুদ্র হাতটা নিজের এক আঙুলে জড়িয়ে ধরে ক্ষুদ্র স্বরে আওড়ালো,

– কবুল!

একবার… দুবার… তিনবার।

কথাটা উচ্চারণ করার পর পরই ওপাশ থেকেও একই গম্ভীর, সুদৃঢ় আর স্পষ্ট স্বরে ভেসে এলো,

– কবুল।

স্নিগ্ধার বুকের ভেতরের ধুকপুকানিটা মুহূর্তেই থেমে এক গভীর প্রশান্তিতে বদলে গেল। তিনবার ‘কবুল’ বলার মাধ্যমে দুটি জীবনের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটে গেল। কাজী সাহেব মোনাজাতের জন্য হাত তুলতেই চারপাশের সবাই হাত উঠাল। দোয়ার সুবাসিত পরিবেশে পর্দার ওপাশের মানুষটা নিঃশব্দে কোনো শপথ করে নিল। মোনাজাত শেষ হতেই শুভাকাঙ্ক্ষীদের ফিসফিসানি আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের গুঞ্জন শুরু হলো। কিন্তু আশেপাশের বিভিন্ন ফিসফিস আওয়াজ এর সাথে কিছু জ’খম করা বাক্যও শোনা যাচ্ছে! একেকজনের একেক মন্তব্য! তার এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয় বললো,

– বড় ঘর ভেঙ্গে এসেছে এখন নিজেই আবার নিজের বসকে বিয়ে করছে! কি জানি বাবা কি কি হয়!

ওয়াজেদের পরিবারের একজন তাল মিলিয়ে বললো,

– ওয়াজেদকে তো আমরা কত বুঝালাম! ভালো কোনো ঘরের কুমারী মেয়ে কি দেশে কম পড়েছিল? একটা সন্তানের জননী, ডিভোর্সি মেয়েকে এভাবে ঘরে বউ করে আনার কি কোনো দরকার ছিল? কি কারণে ডিভোর্স হয় এসব কি বাইরে রটে নাকি?

– আরে রাখো তো! পুরুষ মানুষের দয়ার শরীর তো! একটু কান্নাকাটি বা অসহায়ত্ব দেখলেই গলে জল হয়ে যায়। এখন তো এক বাচ্চার দায়িত্ব নিলো, কাল যখন নিজের সন্তান হবে, তখন এই কুড়িয়ে আনা বাচ্চার জন্য ঘরে অশান্তি বাঁধবে না তো?

স্নিগ্ধার সামনে বসে এসব আলোচনা করছে এরা! স্নিগ্ধার বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এই তো! এই অপমান, এই তাচ্ছিল্যের কথাগুলোর ভয়ই তো ওকে দিনরাত তাড়া করে বেড়াচ্ছিল! সে তো কারও করুণা চায়নি, কারও ঘাড়ের বোঝা হতে চায়নি। তবে কেন সবাই তাকেই আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে? ওর চোখ দুটো নোনা জলে ভরে ওঠার আগেই ওয়াজেদের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,

– আপনাদের যদি আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা আমার স্ত্রীকে নিয়ে কোনো সংশয় থাকে, তবে অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার নেই এখনই গাড়ি ডেকে দেব? আপনারা ফিরে যেতে পারেন।

মুহূর্তেই পরিবেশ থমথমে হয়ে গেল। যারা এতক্ষণ বি’ষাক্ত কথার বাণ ছুঁড়ছিল তাদের মুখের হাসি আর তাচ্ছিল্যের ভাব এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ওয়াজেদ আবার বললো,

– স্নিগ্ধা আমার কাছে দয়ার পাত্রী নয় ও আমার সম্মানের জায়গা নিয়ে আমার জীবনে এসেছে। আর আয়াত? আয়াত আমার প্রথম সন্তান, এই পরিবারের বড় রাজকন্যা। আজ থেকে শুরু করে ভবিষ্যতে ওর আত্মসম্মানে বা পরিচয়ে যদি কেউ আঁচ দেওয়ার চেষ্টা করে সে আত্মীয় হোক বা বাইরের লোক, তার সাথে আমার সম্পর্ক সেদিনই শেষ হবে। আশা করি কথাটা সবার খুব পরিষ্কারভাবে মনে থাকবে।

স্নিগ্ধা বেশ অবাক হলো! লোকটা এত সহজে, সবার সামনে এত বড় একটা অবস্থান নিয়ে নিল?
ওয়াজেদ এসে স্নিগ্ধার সামনে দাঁড়াল। কিছু না বলে হুট করে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লো। স্নিগ্ধার সামনে ওয়াজেকে এভাবে হাঁটু গেড়ে বসা দেখে উপস্থিত অনেকেই চমকে উঠলেও ওয়াজেদের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে হাত বাড়িয়ে আয়াতের ছোট্ট গাল আর মাথায় হাত রাখল। আয়াত ওর গোল গোল ডাগর চোখে ওয়াজেদের দিকে তাকিয়ে রইল। ওয়াজেদ হেসে বলল,

– হেই লিটল লেডি তোমাকে কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর লাগছে!

আয়াতও হেসে উঠলো ওর কথা শুনে। ওয়াজেদ ওকে নিয়ে কোলে নিয়ে বললো,

– তোমার মায়ের কোলটা তো শুধুই তোমার রাজকন্যা, তবে তোমার আমাকে কি একটু তোমাদের জীবনে জায়গা দেওয়া যায় না? খুব বেশি ক্ষতি হবে না বলো?

আয়াত ওয়াজেদের কোলেই ডানা ঝাপটানোর মতো করে দুই হাত ছুড়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর ব্যস্ত হলো ওয়াজেদের শেরওয়ানির চকচক করা বোতাম নিয়ে খেলতে। ওয়াজেদ হেসে ওর গালে ঠোঁট দাবালো। এত আদুরে মেয়েটা এখন থেকে ওর কাছে, ওর সাথে থাকবে ভাবতেই ওয়াজেদের খুশি লাগছে! স্নিগ্ধা এতক্ষণ ওদের দিকেই চেয়েছিলো ওয়াজেদ আয়াতের থেকে চোখ সরিয়ে ওর দিকে তাকাতেই ও চোখ নামিয়ে নিলো। ওয়াজেদ মৃদু হেসে স্নিগ্ধার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল,

– আমায় ‘স্যার’ বলে ডাকার মেয়াদ কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে এখানেই শেষ হলো, স্নিগ্ধা।

স্নিগ্ধা এক পলক তাকিয়ে ওয়াজেদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতে হাত রেখে আকড়ে ধরলো। এতদিনের অশান্ত, বিপর্যস্ত মনটায় শেষমেশ নেমে এলো এক নাম না জানা নিঃশব্দ প্রশান্তি। আঁধার কেটে গিয়ে সত্যিই আজ তাদের জীবনে এক নতুন প্রভাতের সূচনা হলো! সত্যিই বোধহয় ঘটল তিমিরবসান!

#চলবে…?