#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১০
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
সামনে থাকা ল্যাপটপের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে আছে অন্বয়। দৃষ্টি ল্যাপটপে থাকলেও মন অন্যদিকে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, সে বুঝি ল্যাপটপে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। কিন্তু না। এই মুহূর্তে ল্যাপটপটা তার সামনে থেকে কেউ নিয়ে গেলেও সে টের পাবে না। যেখানে মন, ধ্যানই অন্য দিকে, সেখানে টের পাবেই বা কীভাবে?
অফিসে আসার পর থেকেই তার মনটা অস্থির হয়ে আছে, কেমন অশান্ত লাগছে নিজেকে। অফিসের কোনো কাজেই মন বসাতে পারছে না। সে কেবল একটা বিষয়ই ভেবে যাচ্ছে, সে এখনও স্রোতের পূর্ণ বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। আজ যদি সে সঠিক সময়ে বাড়ি না পৌঁছাতো, তাহলে কী হতো! ওই মেহেরের কথা স্রোত নিশ্চয়ই বিশ্বাস করতো? বিশ্বাস করে তাকে একদম দূরে ঠেলে দিতো? পারলে ডিভোর্স…
না,না! তার স্রোত তাকে কখনো ডিভোর্স দিতে পারে না। স্রোতকে ছাড়া সে বাঁচবে কীভাবে? সে আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল,
-“তুই নিজেকে সারাজীবনের জন্য আমার নামে লিখে দিয়েছিস। বেঁচে থাকতে আমার কাছ থেকে তোর মুক্তি নেই।”
অন্বয় চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথা ঠেকিয়ে চোখদুটো বন্ধ করলো। এতো চিন্তার কী আছে? সে তো পরে হলেও প্রমাণ দিতোই। তার বিরুদ্ধে কেউ মিথ্যাচার করবে, আর সে চুপ করে থাকবে? তার সাথে লাগতে এসেছে তারই অফিসের কর্মচারী! ভাবতেই কেমন অবাক লাগছে না? প্রতিশোধের নেশা এখন অবধি যায়নি মেয়েটার। সে মনে মনে বলল,
-“অন্বয় শাহরিয়ারের সাথে লাগতে আসার পরিমাণ কতোটা ভয়ংকর তা তোমরা হাড়ে হাড়ে টের পাবে।”
তার ভয় শুধু এক জায়গায়–স্রোত। স্রোত যদি কখনো তাকে ভুল বুঝে? তার থেকে দূরে চলে যায়? ভুলটা তার নিজেরই। সে-ই তো আগে থেকে স্রোতের সামনে নিজের কঠোর, গম্ভীর রূপ দেখাতো। কখনো সামনের মুখোশ সরিয়ে নিজের ভেতরকার অনুভূতি বুঝতে দেয়নি৷ কিন্তু আর না! এখন সময় এসেছে স্রোতের সামনে নিজের সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করার, মেয়েটার বিশ্বাস অর্জন করার। সে তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত নিল সে এখন বাড়ি যাবে। কিছুক্ষণ পর একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তার স্রোত, তার হৃদয়হরণী। স্রোতের জন্য মনটা কেমন বেসামাল হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে স্রোতের কাছে না গেলে তার ছটফটানো ভাব কমবে না। সে একজনকে ফোন করে জানিয়ে দিল,
-“আজকের জন্য মিটিং ক্যান্সেল।”
অন্বয় খুব স্পিডে গাড়ি ড্রাইভ করছে। হঠাৎ ফুলের দোকান চোখে পড়তেই সে গাড়ির ব্রেক কষলো। রাস্তার এক সাইডে একটা বড়ো ফুলের দোকান। ছোটবেলা থেকেই স্রোত গোলাপ ফুল খুব পছন্দ করে৷ তাই সে আগে প্রায়ই স্রোতের জন্য গোলাপ নিয়ে যেতো তাদের বাসায়। কিন্তু একটা ঘটনার পর থেকে, সে আর নিজে গিয়ে গোলাপ দেয়না বরং তার মামিকে দিয়ে স্রোতের কাছে পাঠাতো। কারণ, ওই ঘটনা মনে করে যদি সে স্রোতের সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলে? মেয়েটা তখন কষ্ট পাবে না? যাই হয়ে যাক না কেন, স্রোতের কষ্ট মানে তার কষ্ট। আর সেজন্যই সে স্রোতের সামনে যেতো না।
আজ স্রোতের জন্য গোলাপ নিলে কেমন হয়? নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবে?
সে গাড়ি থেকে নেমে দোকানের সামনে যেতেই চোখে পড়ে গোলাপ ফুলের বাহার৷ সে স্রোতের জন্য গোলাপ ফুলের তোড়া নিল। স্রোত কতোটা খুশি হবে ভাবতেই তার মনে প্রশান্তির বন্যা বয়ে গেল।
____________________
স্রোত তখন একছুটে ঘরে এসে দরজা লাগিয়ে দেয়। দরজার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার কানে বাজছে অন্বয়ের বলা সেই কথাটা,
-“আমার হৃদয়, মন কেবল একজনের জন্য বরাদ্দ!
সেই একজনটা সে নিশ্চয়ই? নাহলে আর কে হবে? অন্বয় ভাই তো বলেছিল, উনার কোনো মেয়ে বন্ধুও নেই। বিষয়টা ভাবতেই লজ্জায় দুহাতে নিজের মুখ ঢাকলো সে। অন্বয় ভাই তাকে ভালোবাসে ভাবনাটা মনে এতো প্রশান্তি দিচ্ছে কেন? কেন মনে রঙ বেরঙের প্রজাপতি উড়ছে? তখনি তার ভিতরের সত্তা যেন বলে উঠলো,
-“মানুষটা তোর স্বামী তাই। সে এখন আর শুধু তোর ফুফাতো ভাই নয়, স্বামীও বটে।”
হঠাৎ তার মনে পড়লো বাসর রাতের কথা। অন্বয় ভাই তাকে কীভাবে ঘর থেকে বের করে দিতে চাচ্ছিল! সে চট করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আচ্ছা, যদি উনি ভালোবেসেই থাকে, তাহলে ওমন ব্যবহার করার মানে কী? আবার, ফোনটাও ভেঙে ফেলেছিল, যদিও নতুন ফোন এনে দিয়েছে। ফোনটা তো অর্কের সাথে কথা বলার জন্য ভেঙেছে। মানে, অন্বয় ভাই তাকে নিয়ে জেলাস ফিল করে! কিন্তু বাসর রাতে তাকে বের করে দেওয়ার ঘটনাটা সে কেন যেন ভুলতেই পারছে না! কেন করলো এমন! কেন!
স্রোত সারা ঘর জুড়ে পায়চারি করছে আর ভাবছে বিষয়টা। কিন্তু কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না। সে এবার একজায়গায় থেমে বিড়বিড় করে বলল,
-“আমিও কম না, অন্বয় ভাই। আপনি নিজে মুখে যতোদিন পর্যন্ত ভালোবাসি না বলবেন এবং এই ঘর থেকে বের করে দেওয়ার কারণ না বলবেন, ততদিন পর্যন্ত আমিও আপনার কাছে ধরা দিব না।”
আচমকা দরজা ধাক্কানোর আওয়াজ এলো। স্রোত ভাবলো, ফুফু এসেছে বোধহয়। সে গিয়ে দরজা খুলতেই চোখের সামনে কেউ গোলাপ ফুলের তোড়া তুলে ধরলো। গাদা গাদা লাল গোলাপ দেখে স্রোত বিস্মিত হয়ে যায়। চোখদুটো কেমন চিকচিক করে উঠে। গোলাপ ফুল সামনে ধরে রাখায় আগত ব্যক্তির মুখ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু পরনের পোশাক দেখে স্রোত ঠিকই চিনে ফেলে। সে আকাশসম বিস্ময় নিয়ে ডাকে,
-“অন্বয় ভাই!”
অন্বয় মুখের সামনে থেকে ফুল সরালো। তারপর কিছু না বলে স্রোতের পাশ কাটিয়ে ঘরের ভিতর চলে গেল। স্রোত যেন একটা বড়ো ধাক্কা খেল। অন্বয় ভাই তার জন্য ফুল এনেছে? আর কতো চমকাবে সে? অন্বয় ভাইয়ের এসব চমকের ফলে সে মরে না যায়! স্রোত অন্বয়ের পিছু পিছু গিয়ে বলল,
-“আজ আপনি অফিস থেকে এতো তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে?”
-“এমনিই। মন চেয়েছে তাই।”
-“আপনার তো অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিল।”
-“মিটিং ক্যান্সেল করে দিয়েছি।”
-“আপনি যা করেন! আপনাকে বোঝা বড়ো দায়।”
-“তোকে এতো চাপ নিয়ে আমায় বুঝতে হবে না, স্রোত! জাস্ট অনুভব কর।”
স্রোত গোলাপ ফুল দেখিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে বলল,
-“ফুলগুলো আমার জন্য?”
অন্বয় থমথমে মুখে বলল,
-“কে বলেছে তোর জন্য? তোর জন্য ফুল আনার মতো আজাইরা সময় আমার নেই।”
স্রোতের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বিরস মুখে বলল,
-“তাহলে কার জন্য এনেছেন?”
-“এনেছি বিশেষ একজনের জন্য। সে আমার জন্য খুবই স্পেশাল।”
অন্বয় ভাইয়ের জীবনে সে বাদেও স্পেশাল কেউ আছে, ভেবে ভেবেই প্রচণ্ড দুঃখ পেল মেয়েটা। একরাশ বেদনা, হতাশা নিয়ে স্রোত বলল,
-“ওহ! আমারই ভুল হয়েছে। আমিই বেশি আশা করে ফেলেছিলাম।”
বলেই উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরল সে। তখনি পিছন থেকে স্রোতের হাত ধরে এক হ্যাচকা টানে নিজের কাছে নিয়ে এলো অন্বয়। স্রোতের কোমড়ে একহাত রেখে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলল সে। অন্বয়ের হাতের স্পর্শে স্রোতের শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলে সে। পরপরই অভিমানী মন নিয়ে মাথা তুলে নিজেকে অন্বয়ের কাছ থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা শুরু করলো।
-“আমাকে ছাড়ুন, অন্বয় ভাই। একদম স্পর্শ করবেন না আমায়।”
-“আমি না করলে কে করবে? কার এতো সাহস আমার বউকে স্পর্শ করবে!”
-“আপনি আপনার ওই বিশেষজনের কাছে যান। এখানে এসেছেন কেন?”
-“বিশেষজনের কাছেই তো আছি।”
স্রোত অাশ্চর্য হয়ে তাকালো অন্বয়ের মুখপানে। অন্বয় হেসে স্রোতের নাকে নাক ঘষে বলল,
-“আমার লাইফে তোর চেয়ে স্পেশাল আর কে থাকতে পারে?”
আনন্দে, খুশিতে, প্রশান্তিতে স্রোতের দুচোখ অশ্রুসজল হলো। ভালোবাসার তোড়ে ভাসতে লাগলো সে। ভিতরটাতে কেমন সুখ সুখ অনুভূত হতে লাগলো। হঠাৎ সে খেয়াল করলো, অন্বয়ের উদ্দেশ্য ভালো নয়। কেমন নেশালো চোখে চেয়ে আছে তার ঠোঁটের দিকে। অন্বয় ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের দিকে এগোচ্ছিল, ঠোঁট দুটো ছুঁইছুঁই অবস্থা, এমন সময় স্রোতের কিছু মনে পড়তেই সে শরীরের সবটুকু বল প্রয়োগ করে অন্বয়কে ধাক্কা দেয়। এতোটুকু ধাক্কায় অন্বয়ের কিছুই হয়নি, তবুও সে সরে দাঁড়ায়। ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“কী হয়েছে?”
স্রোত কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে অন্বয়ের দিকে এক আঙুল তুলে বলল,
-“সেদিনের মতো ভুল আর করবেন না, অন্বয় ভাই। যেদিন থেকে আমায় প্রকৃত অর্থে ভালোবাসতে শিখবেন, আমায় যথাযথ স্ত্রীর মর্যাদা দিতে শিখবেন, সেদিনই আপনি আমায় স্পর্শ করতে পারবেন। এর আগে না।”
চলবে……..

