#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১১ (একাংশ)
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
স্রোতের কথাগুলো অন্বয়ের বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করলো। স্থির দৃষ্টিতে স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। স্রোত আবারও বলতে লাগলো,
-“আপনি আমার সাথে যা যা করেছেন, আমি কিছুই ভুলিনি অন্বয় ভাই। সেই ছোট থেকেই আপনি আমায় দেখতে পারেন না, সহ্য করতে পারেন না। সবসময় আমায় অপমান করার সুযোগ খুঁজতেন। আপনি ভাবতেও পারবেন না, বাসর রাতে আপনার ব্যবহার আমায় ঠিক কতোটা কষ্ট দিয়েছিল। তাহলে এখন কীসের জন্য এতো দরদ? কেন আমার কাছে আসেন? সেদিন কেন নিজের ওষুধ লাগানোর দোহাই দিয়ে আমায় স্পর্শ করেছিলেন? বলুন! বুঝেছি, আপনিও ওই বাকি পাঁচটা পুরুষের মতো, যারা নিজেদের স্ত্রীকে ভালোবাসতে পারে না ঠিকই কিন্তু স্ত্রীর দেহটাকে খুব ভালোবাসে!”
-“স্রোত!”
চিৎকার করে উঠে অন্বয়। ঠাস করে এক থা’প্প’ড় বসায় স্রোতের গালে। স্রোত গালে একহাত রেখে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অন্বয়ের দিকে। অন্বয় গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় যেন চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ বাইরে না যায়। তারপর চেঁচিয়ে বলে,
-“তুই বুঝতে পারছিস, তুই কী বলছিস!”
স্রোত দুচোখ টলমল করছে। ছোট হতে এ পর্যন্ত কেউ তার গায়ে হাত তুলেনি। সবার খুব আদরের ছিল সে। বাবা-মায়ের চোখের মণি ছিল। আর আজ কিনা নিজের স্বামী তার গায়ে হাত তুলল? স্রোত ছলছল চোখে বলল,
-“সত্যি বলায় খুব গায়ে লাগছে?”
অন্বয় রাগে স্রোতের দুবাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,
-“তুই সত্যির জানিসটা কী যে বলবি? তুই জানিস কিছু? তুই আমার সম্পর্কে কতটুকু জানিস যে আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলছিস? বল ইডিয়ট!
স্রোত চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সে জেদি কণ্ঠে বলল,
-“আপনি আমার চরিত্র সম্পর্কে কতটুকু জানেন যে আমার বন্ধুকে নিয়ে সন্দেহ করে আমার ফোন ভেঙে ফেলেছিলেন? আমি নাকি পরকীয়া করছিলাম? তখন আমার খারাপ লাগেনি? অন্যের বেলায় তো খুব সুন্দর আঙুল তুলতে পারেন কিন্তু একটা বিষয় জানেন কী? অন্যের দিকে এক আঙুল তুললে বাকি চার আঙুল নিজের দিকেই থাকে।”
অন্বয় স্রোতকে ধাক্কা মারার মতো ছেড়ে দিল। স্রোতের থেকে একটু পিছিয়ে গিয়ে তালি দিতে দিতে বলল,
-“বাহ, স্রোত, বাহ! নিজের বন্ধুকে যতোটা বিশ্বাস করিস, ততোটা বিশ্বাস তো নিজের স্বামীকেও করিস না! স্বামীর থেকে বন্ধু এতো আপন হয়ে গেল? তাহলে ওকেই বিয়ে করতি! আমায় করলি কেন?”
-“আমি অর্ককে ছোট থেকে চিনি। তো তাকে বিশ্বাস করব না? সে খুবই কেয়ারিং একজন ফ্রেন্ড। কিন্তু আপনার মতো কিছু মানুষ এই কেয়ারটাকেই অন্য দৃষ্টিতে দেখে। আর বিয়ের কথা বলছেন? আমি তো আপনাকে বিয়ে করতে চাইনি। আমাকে বাধ্য করা হয়েছে এই বিয়ে করতে। কিন্তু আপনি কেন আমায় বিয়ে করলেন? এখন অন্তত এটা বলবেন না যে আপনাকেও বাধ্য করা হয়েছে।”
অন্বয় রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে। তার সাথে স্রোত কিনা ওই অর্ককে নিয়ে তর্ক করছে? তার চেয়ে অর্ককে বিশ্বাস করছে বেশি? সে তো এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবে না৷ তার স্রোত শুধু তাকে নিয়েই ভাববে, শুধু তাকেই বিশ্বাস করবে বেশি। সে চিৎকার করে বলল,
-“আমি তোকে বিয়ে করেছি কারণ আমি তোকে ভালোবাসি ইডিয়ট! যখন আমি ভালোবাসার মানে বুঝতাম না তখনও তোকেই ভালোবেসেছি, যখন থেকে ভালোবাসা বুঝতে শিখেছি তখনও তোকেই ভালোবেসেছি। আই লাভ ইউ! আই লাভ ইউ! আই লাভ ইউ!”
চলবে…..
#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১১ (শেষাংশ)
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
স্রোত স্তব্ধ, অভিভূত। মুগ্ধতার তোড়ে বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো তার। হৃদয় জুড়ে বইছে অনুভূতির ঢেউ। কানে এখনো বাজছে অন্বয়ের চিৎকার করে বলা, ‘আমি তোকে ভালোবাসি, আই লাভ ইউ!”
অন্বয় ভাই নিজ মুখে ভালোবাসার কথা বললো? সে কি ভুল শুনেছে? নিশ্চয়ই সে স্বপ্ন দেখছে? বাস্তবতা তো এতো রঙিন, এতো মধুর হয় না! তবে, সে যে স্বপ্ন দেখছে না তার প্রমাণ পেল অন্বয়ের পরবর্তী কথায়,
-“আমি যদি তোর দেহটাকেই ভালোবাসতাম, তাহলে রোজ রাতে ওই সোফায় ঘুমাতাম না। তোর সাথে এক বিছানায় থেকে জোর করে হলেও নিজের অধিকার আদায় করে ছাড়তাম। আর সেদিনের কাছে আসার কথা বলছিস! ইডিয়ট, ওটা আমার ভালোবাসার স্পর্শ ছিল, কোনো মোহ ছিল না। আমি তোকে ভালোবেসে কাছে এসেছিলাম। আমার আকর্ষণ তোর প্রতি, তোর দেহের প্রতি নয়। আমি তোকে ভালোবাসি, তোর দেহকে নয়। কিন্তু ভাগ্য মন্দ, তুই এইজীবনে বোধহয় আমার ভালোবাসা বুঝবি না!”
শেষোক্ত কথা বলার সময় অন্বয়ের গলা ভারী হয়ে আসছিল। চোখদুটো কেমন লাল হয়ে গেছে। যাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে সে, তার কাছেই কিনা শুনতে হলো এমন কথা? এর চেয়ে কষ্টের বোধহয় কিছু হয় না! সে আর এক মুহূর্তও স্রোতের সামনে দাঁড়ালো না। দরজা খুলে চলে গেল নিচে৷
স্রোত ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো। একদিকে আনন্দ হচ্ছে এই ভেবে যে তার প্ল্যান সাকসেসফুল হয়েছে। সে ইচ্ছে করেই এসব কথা বলে অন্বয়ের রাগ তুলেছে। কারণ, এতোদিনে অন্বয়কে সে খুব ভালো করেই চিনেছে। লোকটা সহজে ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে না। তাই আজ থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কীভাবে এ কথা স্বীকার করানো যায়। কিন্তু প্রথম ধাপেই যে সফল হয়ে যাবে সে ভাবতে পারেনি। মাঝে অবশ্য অন্বয় গায়ে হাত তুলায় খুব কষ্ট পেয়েছে সে। কিন্তু এখন এসব কষ্ট কোনো কষ্টই না। বরং সে তার অন্বয় ভাইকেই বেশি কষ্ট দিয়েছে। আহারে! এভাবে না বললেও তো পারতো! একটু বেশিই বলে ফেলেছে সে! না জানি, অন্বয় ভাইয়ের মনে ঠিক কতোটা আঘাত লেগেছে!
তখনই চোখ গেল পাশে টেবিলে রাখা লাল গোলাপের উপর। অন্বয় ভাই কতোটা আগ্রহ নিয়ে তার জন্য ফুল এনেছিল, নিশ্চয়ই নিজ হাতেই তাকে ফুলগুলো দিত। আর সে কিনা কথার দ্বারা এমন আঘাত করলো? ভীষণ অনুতাপ, অনুশোচনায় মেয়েটা মাথা নুইয়ে বসে রইলো কিছুক্ষণ। ফুলগুলোকে ছুঁতে গিয়েও ধরলো না। না, অন্বয় ভাইয়ের হাত থেকেই সে ফুল নিবে। এর আগে সে ফুল ধরবে না। কিন্তু অন্বয় ভাই তো এখন ভীষণ রেগে আছেন! যে করেই হোক, উনার রাগ ভাঙাতে হবে!
স্রোত দ্রুত কদমে নিচে নেমে এলো। এসে দেখলো, অন্বয় নেই এখানে। উপরেও খুঁজলো, সেখানেও নেই। তাহলে উনি গেলেন কোথায়? ফারজানা বেগম সোফায় বসে একটা মোটা গল্পের বই পড়ছিলেন। স্রোত ফুফুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-“ফুফু, অন্বয় ভাই কোথায়?”
ফারজানা বেগম বই থেকে চোখ তুলে বললেন,
-“ছেলেটাকে একটু আগে দেখলাম ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেল। আমি কতবার জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছিস, অফিস থেকে এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি যে। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দিলে তো! এমন এক ছেলে জন্ম দিয়েছি যে নিজের মায়ের সাথে কথা বলার সময় পর্যন্ত তার নেই! এতোই ব্যস্ততা তার!”
স্রোত চিন্তায় পড়লো৷ অন্বয় ভাই রাগ করে কোথায় চলে গেলেন? এখন কী করবে সে? এদিকে ফারজানা বেগম বলেই যাচ্ছেন ছেলেকে নিয়ে। ছেলে উনার এই করে, সেই করে, কোনো কথা খোলাসা করে বলে না, আরও কতো কী! মাঝে মাঝে ছেলের স্বভাবের জন্য স্বামীকেও দোষারোপ করছেন, স্বামীও যে উনার এমনই। এসবে স্রোতের মন নেই। এতো এতো কথা স্রোতের কানে গিয়েছে কিনা সন্দেহ! তার ভিতরটা অস্থিরতায় চৌচির হয়ে যাচ্ছে। সে জিজ্ঞেস করলো সেভাবেই,
-“আচ্ছা ফুফু, তোমার কাছে কি অন্বয় ভাইয়ের অফিসের কারো নাম্বার আছে? তাহলে ফোন করে দেখতাম, উনি অফিসে গেলেন কিনা!”
-“এই ফা’জি’লটাকে নিয়ে এতো চিন্তা করিস না তো! সে অফিসে ছাড়া আর কোথায় যাবে? নিশ্চয়ই আবার কিছু বাসায় রেখে গেছিলো, যার জন্য বাসায় এসে নিয়ে গেছে। আজ যে ওর কী হয়েছে কে জানে। এমন মনভুলো হতে তো ওকে কখনো দেখিনি!”
স্রোত কী করে বোঝাবে, অন্বয় ভাই বাসায় কিছু রেখে যায়নি বরং ওর জন্যই এতো তাড়াতাড়ি চলে এসেছে। তার মন বলছে, তার অন্বয় ভাই অফিসে যায়নি। কিন্তু তারপরও তো একটু নিশ্চিত হওয়া ভালো। সে না পারতে বলেই ফেলল,
-“ফুফু, উনি আজ অফিস শেষ করে তাড়াতাড়ি চলে এসেছেন। উনার একটা মিটিং ছিল, সেটাও ক্যান্সেল করে দিয়েছে। তাহলে এখন তো উনার অফিসে যাওয়ার কথা না!”
-“সে কী বলিস? ও আজ এতো তাড়াতাড়ি চলে আসলো? তাহলে এখন কোথায় গেলো আবার! তোকে কিছু বলেনি?”
-“না, ফুফু। কিছু বলেনি দেখেই তো তোমায় জিজ্ঞেস করলাম।”
স্রোত চেয়েও বলতে পারছে না অন্বয়ের চলে যাওয়ার কারণ। এসব কথা কাউকে বলা যায়? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব বাইরে প্রকাশ করা উচিত নয়, এমনটাই মনে করে সে। সে অনুরোধের ভঙ্গিতে বলল,
-“ফুফু, একটু দেখো না, তোমার ফোনে অন্বয় ভাইয়ের অফিসের কারো নম্বর আছে কিনা!”
ফারজানা বেগমের মুখেও এবার চিন্তার ছাপ ফুটলো। অন্বয়কে তখন তিনি যেভাবে বের হতে দেখেছেন, মনে হয়েছে সিরিয়াস কিছু হয়েছে। এভাবে কোথায় গেল ছেলেটা! আবার সেদিনের মতো কিছু হবে না তো! এটা ভাবতেই ভয়ে উনার বুক কেঁপে উঠলো। তিনি তড়িঘড়ি করে নিজের ফোনে নাম্বার খুঁজতে লাগলেন। ভাগ্যিস, কিছুক্ষণ খোঁজার পরই অন্বয়ের পিএর নাম্বার পেল। সেইভ করা নাম্বার। সেবার ছেলের অফিসে যাওয়ার পর বুদ্ধি করে পিএর নাম্বারটা নিয়েছিলেন তিনি। বিপদে, আপদে কতো দরকারেই তো লাগে! এই যেমন এখন লাগছে। তিনি নাম্বারে ডায়াল করে বললেন,
-“অন্বয়ের পিএর নাম্বার পেয়েছি। তুই কথা বলবি? তুই-ই বল।”
ফোন রিসিভ হয়েছে। স্রোত ফোন কানে নিয়ে কিছু বলার আগেই ওপাশ হতে ভেসে আসলো,
-“হ্যালো! কে বলছেন?”
স্রোত বলল,
-“আমি তাসজিদ শাহরিয়ার অন্বয় এর স্ত্রী বলছি। আপনার স্যার কি অফিসে গিয়েছে?”
ওপাশে থাকা অন্বয়ের পিএ ওসমান থতমত খেল। প্রথমে যেমন দাপটের সাথে জিজ্ঞেস করেছিল, এখন গলার স্বর ততোটাই নমনীয় করে বলল,
-“আ..আসসালামু আলাইকুম, ম্যাডাম। ভালো আছেন?”
-“জি, ভালো আছি। আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন। আপনার স্যার কি অফিসে গিয়েছে?”
-“না তো। স্যারের তো আজকে আর অফিসে আসার কথা না। স্যারের নাকি কী একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, সেজন্য উনি মিটিং ক্যান্সেল করে দিয়ে চলে গেছেন অনেকক্ষণ আগেই।”
-“ওহ! তার মানে আপনার স্যার অফিসে নেই?”
-“না, ম্যাডাম।”
-“ঠিক আছে৷ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।”
স্রোত কল কাটলো। ফারজানা বেগম উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
-“কী বললো রে স্রোত?”
স্রোত চিন্তিত মুখে বলল,
-“অন্বয় ভাই অফিসে যায়নি।”
-“তাহলে কোথায় গেল! আচ্ছা থাক, এতো চিন্তার দরকার নেই। সে তো এখন ছোট বাচ্চা না। আমার অন্বয় বড়ো হয়েছে, বিয়ে করেছে, দুদিন পর বাচ্চার বাপ হবে। এখন কী ও কোথায় গেল, এসব নিয়ে চিন্তা করা সাজে?”
ফারজানা বেগম নিজের মনকে এসব বলেই সান্ত্বনা দিলেন। হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে গেছে। এসে পড়বে নিশ্চয়ই। তিনি আর এতো চাপ নিলেন না। কিন্তু স্রোতের মনে ঘূর্ণিঝড় বইছে। সে তো জানে আসল কাহিনী। অন্বয় ভাই তার সাথে রাগ করে ভুলভাল কিছু করে ফেলবে না তো? না, না! এ হতে পারে না! অন্বয় ভাই এতোটাও ইমম্যাচিউর নয় যে ভুলভাল কিছু করবে। খামোখা এসব চিন্তা করার কোনো মানে নেই। সে মনে মনে দোয়া করতে লাগলো যেন তার অন্বয় ভাই দ্রুত বাড়ি ফিরে আসে।
স্রোত যোহরের নামাজ আদায় করে অন্বয়ের জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলো। তার অন্বয় ভাই যেন সহিহ সালামতে বাড়ি ফিরে আসে। সারাটাদিন সে খেল না। ফারজানা বেগম কতো জোর করলেন, তারপরও একটা দানা অবধি খাওয়াতে পারেননি। নিজের ছেলের উপর এবার খুব রাগ হচ্ছে উনার। যাবে ভালো কথা, একটু বলে যাবে না কোথায় যাচ্ছে! ঘরে যে বউ আছে, সে চিন্তাও মাথায় নেই। এবার উনার একটু সন্দেহ হলো৷ আচ্ছা, ছেলে আর ছেলের বউয়ের মাঝে কি সব ঠিকঠাক আছে? কোনো ভুল বুঝাবুঝি হচ্ছে না তো? কেন জানি উনার মনে বলছে, সব ঠিক নেই৷ তিনি স্রোতের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-“স্রোত মা, সত্যি করে বলতো, তোদের মাঝে কি সব ঠিকঠাক আছে?”
হঠাৎ এমন প্রশ্নে স্রোত খানিকটা ঘাবড়ে গেল। বুঝতে পারলো, ফুফু বোধহয় কিছু টের পেয়েছে। কিন্তু তাকে যে করেই হোক, বিষয়টা সামলাতে হবে। কিছুতেই বুঝতে দেওয়া যাবে না। সে মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলল,
-“সব ঠিকঠাক আছে, ফুফু। তোমার কেন এমন মনে হচ্ছে যে সব ঠিক নেই?”
-“অন্বয়ের চালচলন দেখে আমার আসলে তাই মনে হচ্ছে। ছেলেটা তোকে কোনো কষ্ট দিচ্ছে না তো?”
-“না, ফুফু। অন্বয় ভাই আমায় খুব ভালোবাসেন। তিনি আমায় কষ্ট দিতেই পারেন না!”
স্রোতের এমন আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলায় তিনি মুখ খসে কিছু বলতে পারলেন না। কথা বলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, সব তো ঠিকই আছে। তিনিই বোধহয় একটু বেশি ভাবছেন। তারপরও তিনি বললেন,
-“তুই কিন্তু কিছু লুকোস না, স্রোত। কিছু হলে আমায় জানাবি। মনে রাখিস, ফুফু সবসময় তোর পাশে আছে।”
স্রোত মুচকি হেসে ফুফুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“জানি তো। তুমি যে আমায় কতোটা ভালোবাসো সেটাও জানি৷ তুমি কোনো চিন্তা করো না। কিছু হলে আমি অবশ্যই তোমাকে জানাবো।”
ফারজানা বেগম স্রোতের মাথায় চুমু খেয়ে বললেন,
-“আমার সোনা মা! আচ্ছা, তুই একটু রেস্ট নে এখন। সেই কখন থেকে দেখছি রুম জুড়ে পায়চারি পারছিস। এতো চিন্তা করতে হবে না। আজ আসুক তোর বর, দেখিস কীভাবে ওর শায়েস্তা করি!”
এই বলে স্রোতের মাথায় হাত বুলিয়ে চলে গেলেন তিনি। স্রোতের মাথা ভীষণ ব্যথা করছে। ভাবলো, এই বিকেলে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক। বালিশে মাথা রাখতেই রাজ্যের ঘুম এসে ধরা দিলো তার চোখে। মুহূর্তের মাঝেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো সে।
সূর্য অস্ত গিয়ে প্রকৃতিতে বিরাজ করছে রাতের আঁধার। আকাশে জ্বলজ্বল করছে অজস্র তারার মেলা। সেই তারাগুলোর দিকে একধ্যানে তাকিয়ে আছে স্রোত। মনে মনে বলছে,
-“আপনি ফিরে আসুন, অন্বয় ভাই। আমি আপনাকে কোনোদিন কষ্ট দিয়ে কথা বলব না। শুধু একটা বিষয় জানার বাকি, সেটা জানা হয়ে গেলেই আপনার প্রতি আমার আর কোনো অভিযোগ থাকবে না। আপনি ফিরে আসুন, প্লিজ।”
তখনি নিচ থেকে কারো কড়া কণ্ঠের আওয়াজ শোনা গেল। স্রোত দ্রুত রুমের বাইরে গিয়ে নিচে তাকাতেই দেখলো, অন্বয় ভাই ফিরে এসেছে। ফুফু অন্বয় ভাইকে প্রচণ্ড বকছেন নিজের খামখেয়ালিপনার জন্য। কিন্তু অন্বয় ভাই কথাগুলো গায়ে মাখছে বলে মনে হচ্ছে না। সে যথাসাধ্য মাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। অন্বয়কে দেখে স্রোত স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। বুকের উপর থেকে একটা ভারী পাথর সরে গেল তার। মনে মনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো।
অন্বয়কে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে দেখে স্রোত ফের নিজের রুমে চলে যায়। অন্বয় রুমে প্রবেশ করতেই প্রথমে তার নজরে পড়ে স্রোতকে। সে সম্পূর্ণ না দেখার ভান করে স্রোতকে এড়িয়ে গেল। বিষয়টা স্রোত বুঝতে পারলেও তেমন মাথা ঘামালো না। অন্বয়ের কাছে গিয়ে বলল,
-“আপনি কোথায় গেছিলেন, অন্বয় ভাই? এতো দেরি করে ফিরলেন কেন?”
স্রোত খেয়াল করলো, অন্বয়ের চোয়াল শক্ত, চোখদুটো লাল হয়ে আছে। অন্বয় স্রোতের কথার কোনো জবাব না দিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে লাগলো ফ্রেশ হওয়ার জন্য। স্রোতও পিছু পিছু যেতে যেতে বলতে লাগলো,
-“বলুন না, কোথায় গেছিলেন? আপনি কিছু বলছেন না কেন?”
অন্বয় ওয়াশরুমে ঢুকে স্রোতের মুখের উপর ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিল। লোকটা যে তার উপর জমে থাকা রাগ দরজার উপর দেখিয়েছে, তা দরজা লাগানোর আওয়াজ শুনেই স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। স্রোতও হাল ছাড়বে না। যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্বয় ভাই তার সাথে কথা বলবে, সে পিছু পিছু লেগেই থাকবে। সে ও দেখতে চায়, অন্বয় ভাই তার সাথে কথা না বলে কতক্ষণ থাকতে পারে।
অন্বয় ফ্রেশ হয়ে দেখলো স্রোত বিছানায় বসে আছে। তাকে দেখতেই উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা। কাছে আসার আগেই সে চলে গেল ব্যালকনিতে। অন্বয় ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি আঁধারিয়া প্রকৃতিতে। স্রোত ব্যালকনিতে উঁকি দিল। তারপর পা টিপে টিপে এসে দাঁড়ালো অন্বয়ের ঠিক পিছনে। এই প্রথম কোনো প্রকার সংকোচ, সংশয়, দ্বিধা না করে পিছন হতে সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল অন্বয়কে। মাথা ঠেকালো অন্বয়ের পিঠে। অন্বয় বিস্মিত হয়, আশ্চর্য হয় কিন্তু বলে না কিছুই।
অন্বয়ের এই ভারী অভিমানে স্রোতের চোখে অশ্রু জমে। সে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“সরি, অন্বয় ভাই। আমার ভুল হয়ে গেছে, আমায় মাফ করে দিন।”
অন্বয় স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল,
-“এখান থেকে যা, স্রোত।”
-“না, আমি যাব না। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত না আমায় মাফ করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব। বিশ্বাস করুন, আমি কথাটা ওভাবে বলতে চাইনি৷ আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাইনি, অন্বয় ভাই।”
-“কষ্ট দিতে চাসনি, কিন্তু দিয়েছিস।”
স্রোতের কান্নার বেগ বাড়লো। অন্বয় রাগী স্বরে বলল,
-“এই একদম কাঁদবি না!”
-“সরি, অন্বয় ভাই, সরি! আমি আর কখনো আপনাকে কষ্ট দিয়ে কথা বলব না, কখনো না! আমি তো অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এমন কথা বলিনি, শুধু ওই….
-“শুধু কী?”
স্রোত চুপ হয়ে গেল। অন্বয় স্রোতের হাতের বাঁধন ছাড়ালো। স্রোতের দিকে ফিরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জিজ্ঞেস করল,
-“বল, কী বলতে চেয়েছিলি! থামলি কেন?”
স্রোত মাথা নিচু করে মিনমিন স্বরে বলল,
-“আমি আপনার মুখ থেকে ভালোবাসি শোনার জন্য এমন বলেছিলাম। যাতে করে আপনি প্রচুর রেগে গিয়ে সত্যিটা বলে দেন।”
এই প্রসঙ্গে অন্বয়ের কাছ থেকে কোনো জবাব না আসায় স্রোত মাথা তুলে তাকালো। দেখলো, লোকটা কেমন অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিছুক্ষণ নীরবতা পালনের পর অন্বয় বলল,
-“তুই এখনো গর্দভই রয়ে গেলি স্রোত।”
স্রোত কিছু বলল না। অন্বয় ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“দুনিয়াতে তোর মতো বোকা বোধহয় আমি একটাও দেখিনি। এই কদিনে আমার পরিবর্তন, আমার আচার-আচরণ দেখেও যে কিছু বুঝতে পারে না, তাকে আর কীভাবে বুঝানো যায় যে আমি তাকে ভালোবাসি? সবসময় মুখের কথাই কেন শুনতে হবে, স্রোত? মানুষটাকে দেখে বুঝা যায় না তার মনের কথা? আমি তো কথায় বিশ্বাসী নই, কাজে বিশ্বাসী।”
স্রোত মন খারাপ করে বলল,
-“কিন্তু মাঝে মাঝে প্রিয় মানুষটার মুখ থেকেও তো শুনতে ইচ্ছে করে যে আমি তোমায় ভালোবাসি। এই বলার মাঝেও একটা আলাদা প্রশান্তি কাজ করে।”
-“তাই? আমি বুঝি তোর প্রিয় মানুষ?”
স্রোত ছলছল চোখেই মাথা উপর-নিচ করলো। অন্বয় স্রোতের দুগালে দুহাত রেখে আঙুল দ্বারা চোখের পানি মুছে দিল। বলল,
-“কখনো কাঁদবি না স্রোত। আমি তোর কান্না সহ্য করতে পারি না।”
অন্বয় স্রোতের দুগালে ওভাবে হাত রেখেই কপালে ভালোবাসার উষ্ণ স্পর্শ দিল। সে স্পর্শ দিলো স্রোতের গালে, চোখের পাতায়। স্রোতের কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-“দুটো আত্মা একইসাথে গাঁথা
হৃদয় জানবে না কেন মনের কথা?”
অন্বয়ের এমন ফিসফিস করে বলা কথায় স্রোতের শরীর জুড়ে শিহরণ বয়ে গেল। সে অন্বয়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-“হৃদয় জানে মনের কথা।”
চলবে……..

