#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২৮
-“এতো দাম দিয়ে চুড়ি কিনে লাভ নাই
যেই জিদ রাগ উঠলেই আসার মারবে।কম দামের মধ্যে কী আছে?”
-“কাচের চুড়ি আছে এক রঙের, মুঠো চল্লিশ টাকা করে।”
-“ওই দেন।”
-“সিরিয়াসলি আপনি কিপ্টামি করছেন!আমি তো কথায় কথায় বলতাম আর আপনি প্রমান করে দিলেন।আপনি তো কিপটুস না কিপটেদের সরদার।”
-“তোর ট্রেনিং লাগলে নিতে পারিস।”
-“ওমন ট্রেনিং আমার লাগে না।কিপটাদের খাতায় আমার নাম বসাতে চাই না।তিন হাজার টাকার চুড়ি পাঁচশ টাকায় বলছেন চৌধুরী বাড়ির নাক কান তো ডুবাবেন।”
-“নাক কান তো তুই আগেই ডুবিয়ে দিয়েছিস।”
-“শুরু করে দিলেন আয়ে বিয়ে পাস করে খোঁচা দিতে।”
ওদের ঝগড়া দেখে দোকানদার সহ সেখানে উপস্থিত কাস্টমাররাও হো হো করে হেঁসে দেয়।এক ভদ্র মহিলা মেহেকের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
-“মা রাগছো কেনো?তোমাকে তো রাগাতেই তোমার উনি এমন করছে।স্বামীর ভালোবাসার কমতি থাকে না তাহলে টাকার কেনো কমতি হবে?”
উৎসকে ভদ্র মহিলা স্বামী বানিয়ে ফেলায় মেহেক ভরকে উৎসর দিকে তাকায়।উৎস মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে দোকানদারকে দিলো।
-“কাশ্মিরি চুড়িগুলোই দেন।”
-“দিবেন যখন তাহলে এতো ড্রামার কি ছিলো?”
-“আমার প্রতি তোর ধারণা দেখলাম।পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করা তোর রক্তে মিশে গেছে।”
-“এক বংশের তো তাই আপনার গুনই পেয়েছি।”
কাশ্মিরি চুড়ি নিয়ে তারা দোকান থেকে বের হয়।
-“আমাদের তো বিয়ে হয়নি আন্টিকে বললেন না কেনো?”
-“ভালোবাসি স্ত্রী মতোই। এখন বিয়েটা করে নে সব হিসাব বুঝিয়ে দিবো।”
মেহেক আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে,
-“কিসের হিসাব?”
-” অনেক ছোটো তুই, বড়ো হো বুঝে যাবি।”
-“এই ছোট মেয়েকে আবার বিয়ে করতে চাইছেন!”
-“বিয়ে করলে বড়ো হয়ে যাবি।”
এই মানুষটাকে মেহেক কখনো বুঝতেই পারে না।যখনি বুজার চেষ্টা করে উৎস কখনো কাছে টেনে নেয় নয়তো বকা ঝকা করে তখন কিশোরী মনে অভিমানে ভরে উঠে।তবে আর যাই হোক উৎস মেহেককে কখনো ছারবে না।ওর অদেখা কাজগুলোতেই ভালোবাসা গভীরতা উপলব্ধি করা যায় যদি তা অনুভব করা হয়।
তপ্ত রোদের তাপে চারপাশের আকাশটা ঝাপসা হয়ে উঠেছে, কাঁপছে বাতাসের স্তর।রাস্তার দুপাশের ফুটপাত থেকে ভ্যাপসা গরম আর ধুলোবালির গন্ধ উড়ছে।পিচঢালা রাস্তায় সারি সারি বাস, প্রাইভেট কার আর অটোরিকশার জটলা। গাড়ির ইঞ্জিনের অবিরাম গর্জন আর হর্নের কর্কশ আওয়াজে বাতাসে যেন কান পাতা দায়।যাত্রীদের অধৈর্য দীর্ঘশ্বাস যেন যানজটের এই স্থবিরতাকে আরও দীর্ঘ করে তুলছে। ট্রাফিক পুলিশরা লাল ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লান্ত শরীর থেকে ঘাম ঝরছে অনবরত।ব্যস্ত রাস্তায় কেউ সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারছে না গন্তব্যে।
রাস্তার এই থমকে যাওয়া অবস্থায় সময় যেন এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।হ্যালমেটের ভেতরে কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গলা বেয়ে পড়ছে।শুকনো শার্ট আধশোয়া ভেজা হয়ে গেছে ততক্ষণে।যানজট পেরিয়ে কখন বাসায় পৌঁছাবে তার কোনো হদিস নেই।দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে যাওয়া অসম্ভব।পিছনে বসা কিশোরী মেয়েটাও রোদের মধ্যে বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে।কয়েকজন বলছে এক্সিডেন্ট হয়েছে তাই রাস্তা ঘন্টা খানেকের আগে কিলিয়ার হবে না।উৎস একা হলে কথা ছিলো,এখন মেহেক তার সাথে তাই ওকে এই গরমে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না।উৎস সাইড কেটে পিছনের দিকে বাইক নিয়ে যে পথ ধরে এসেছিলো সেদিকেই যেতে লাগলো।মেহেক হকচকিয়ে উঠে।কিছু রেখে এসেছে? না,তাহলে আবার কি লাগবে?সবই তো নেওয়া হয়েছে।মেহেক বিচলিত হয়ে বলে,
-“বাসায় যাবেন না।দুপুর হয়ে যাচ্ছে তো।”
-“খেয়ে তারপর যাবো।”
-“বাহিরে খাবো?বড় আম্মু বকবে।”
-“সব সময় বড় আব্বু আম্মুর মন মতো কাজ করিস কই আমার মন মতো তো করিস না!”
-“সে আপনি বুজবেন না ছোট মানুষ তো।”
-“আমাকে তোর কোন দিক দিয়ে ছোট মনে হয়?”
-“চুলের দিক দিয়ে।”
উৎস আশ্চর্য হয়ে বলল,
-“মানে?”
-“আপনার চুল আমার হাতের এক আঙুলের সমান।আর আমার চুল দেখেছেন।আপনার চুল আমার চুল থেকে অনেক ছোটো তাই আপনিও ছোটো।”
-“বাহ!কি সুন্দর যুক্তি!তা মেম কখন বড়ো হবো আমি?”
-“যখন আপনার চুল আমার চুলকে ওভার টেক করবে।”
উৎস ব্রেক দেয়।মেহেক হুর মুড়িয়ে উৎসর উপর পরে।উৎসর যখন তখন অপ্রত্যাশিত কাজে মেহেক আরো রেগে যায়।এই যেমন এখন হুট করে ব্রেক দেওয়ায় মেহেক ক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
-“আপনার জালায় আর বাচি না।”
উৎস মেহেকের মাথা থেকে হ্যালমেট খুলে নেয় তারপর তার তা খুলে।
মেহেক আশপাশ তাকায়।খোলা জায়গা, মৃধু বাতাস বইছে।চারোদিকে গাছপালা থাকায় ছায়া যুক্ত স্থান।ঘামে চিটচিটে হয়ে থাকা পরনের জামাটাও এখন উষ্ণতা দিচ্ছে।অশান্ত দৃষ্টি পরিবেশটাকে সূক্ষ্ণ ভাবে পরখ করছে।হঠাৎ চোখ আটকায় তার।চট করে উৎসর আখিঁ যুগল ঢেকে দেয়।মেহেকের হাতের ছোঁয়া পেতেই উৎসর অবাধ্য মন অবাধ্য হতে চাইলে।কিন্তু অবাধ্যকে হার মানিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-“হাত সরা।”
-“চোখ বুজেন।”
-“কেনো?”
-“আগে বুজেন না।”
উৎস দুচোখের পাতা নুইয়ে ফেলে।মেহেক উৎকন্ঠা হয়ে বলল,
-“আমি যতক্ষণ না খুলতে বলবো ততক্ষণ চোখ বুঁজে থাকবেন।”
-“আচ্ছা কিন্তু দূরে কোথাও যাবি না।”
#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২৯
-“হাত সরা।”
-“চোখ বুজেন।”
-“কেনো?”
-“আগে বুজেন না।”
উৎস দুচোখের পাতা নুইয়ে ফেলে।মেহেক উৎকন্ঠা হয়ে বলল,
-“আমি যতক্ষণ না খুলতে বলবো ততক্ষণ চোখ বুঁজে থাকবেন।”
-“আচ্ছা কিন্তু দূরে কোথাও যাবি না।”
উৎস যেই জায়গায় বাইক দাঁড় করিয়েছিলো সেই জায়গাটা সত্যিই বেশ নিরিবিলি। শহরের কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে, যেন সময় এখানে একটু ধীরে বয়ে যায়। চারপাশে সবুজ ঘাসের বিস্তৃত চাদর, দূরে কয়েকটা বড় গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে মাটির মিষ্টি গন্ধ মিশে আছে, সঙ্গে নাম না জানা বুনো ফুলের হালকা সুবাস। আকাশে সাদা মেঘের দল ভেসে বেড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক গলে এসে ঘাসের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে।
উৎস আর মেহেক সেই ঘাসের মাঠের একপাশে বসেছিল একটা গাছের নিচে। উৎস ঘাসের ওপর বসে মেহেকের কথা মতো চোখ বুজে ছিল। অন্যদিকে মেহেক এদিক-ওদিক হাঁটছিল। কখনো কোনো ফুলের দিকে তাকাচ্ছিল, কখনো প্রজাপতির পেছনে ছুটছিল।মাঝে মাঝে নিশ্চিত হওয়ার জন্য উৎসের দিকে ঘুরে বলছে,
-“খুলবেন না কিন্তু!”
-“খুলবো না।”
মেহেক পুনরায় মৃদু ধমক দিয়ে বলে,
-“একদম না?”
উৎস বাধ্য ছেলের মতে সম্মতি দিয়ে বলল,
-“একদম না।যা করার তাড়াতাড়ি কর।”
মেহেক এবার খুশি হয়ে একটু দূরে চলে গেল।উৎস যদিও চোখ বন্ধ করে বসে ছিল, তবুও ওর মুখে হালকা হাসি ছিল। সে জানত মেহেক নিশ্চয়ই কোনো বাচ্চাসুলভ দুষ্টুমি করছে। ছোটবেলা থেকে মেয়েটার স্বভাবই এমন।মেহেক কয়েক কদম দূরে গিয়ে নিচু হয়ে বুনো ঘাসফুল তুলতে শুরু করল।
সাদা, হালকা বেগুনি আর হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল। দেখতে খুব সাধারণ, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে অসম্ভব সুন্দর।সে একেকটা ফুল খুব যত্ন করে তুলছিল।বাতাসে ওর চুল উড়ছিল। সূর্যের আলো মুখে এসে পড়ায় ওকে আরও উজ্জ্বল লাগছিল।ফুলগুলো হাতে নিয়ে সে একটা ছায়াময় জায়গায় বসে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে সেগুলো জোড়া দিয়ে একটা ছোট্ট মুকুট বানাতে শুরু করল।কাজটা সহজ ছিল না।মাঝে মাঝে ফুল ছিঁড়ে যাচ্ছিল।কখনো ডাঁটা খুলে যাচ্ছিল।আবার নতুন করে গাঁথতে হচ্ছিল।কিন্তু মেহেক হাল ছাড়ল না।ওর মুখে তখন শিশুসুলভ একাগ্রতা।কেউ ওকে দেখে বলবেনা সে একজন কিশোরী কারণ কাজটা ও এতটা গুরুত্ব সহকারে করছিল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে।প্রায় দশ মিনিট ধরে চেষ্টা করার পর অবশেষে একটা ছোট্ট ফুলের মুকুট তৈরি হলো।খুব নিখুঁত না হলেও সুন্দর ছিল।আর সবচেয়ে বড় কথা, সেটা নিজের হাতে বানানো।মেহেক মুকুটটার দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি দিল।
তারপর ধীরে ধীরে উৎসের দিকে ফিরে এলো।উৎস তখনো চোখ বন্ধ করে বসে আছে।মেহেক কাছে এসে কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল।মনে হচ্ছিল ছেলেটা সত্যিই নির্দেশ মেনে বসে আছে।তার মুখে একটা শান্ত ভাব ছিল।হালকা বাতাসে ওর চুল নড়ছিল।মেহেক মুচকি হাসল।মনটাও শান্তি পেলো। এই লোকটাকে হাতের ইশারায় ঘুরাতে পেরে মনটাও ভিষণ ফুরফুরে।
তারপর খুব সাবধানে ফুলের মুকুটটা উৎসের মাথায় পরিয়ে দিল।উৎস একটু নড়ল।অনুভব করলো মেহেক মাথায় স্পর্শ করেছে।কিন্তু কেনো তা আন্দাজ করতে পারলো না তবে মেহেক কাছে আসায় বলল,
-“হয়েছে তোর ?”
-“না, এখনো না।”
-“আর কতক্ষণ?”
-“চুপচাপ বসে থাকুন।আর একটু।”
উৎস দীর্ঘশ্বাস ফেলল।মেহেক এবার উৎসর ফোন বের করল।তারপর দ্রুত কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল।একটা সামনে থেকে।একটা পাশ থেকে।আরেকটা একটু দূরে সরে গিয়ে।
প্রতিটা ছবিতেই উৎসের মাথায় ফুলের মুকুট।দৃশ্যটা এতটাই মজার লাগছিল যে মেহেক হাসি চেপে রাখতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত উৎস বিরক্ত হয়ে বলল,
-“এবার খুলতে পারি?”
-“পারেন।”
উৎস চোখ খুলল।প্রথমে মেহেকের মুখের দিকে তাকালো।
তারপর মাথার ওপর কিছু একটা অনুভব করে হাত দিল।
ফুলের মুকুটটা হাতে নিয়ে সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর বলল,
-“মেহেক!!!!”
মেহেক আর নিজেকে সামলাতে পারল না।হো হো করে হেসে উঠল।
-“আপনাকে দারুণ লাগছে উৎস ভাই !”
-“আমাকে ফুলের মুকুট পরিয়ে ছবি তুলেছিস?”
-“হ্যাঁ”
মেহেকের সোজাসাপটা সিকা রক্তি।
-“সব ডিলিট কর এখনই ।”
-“করবো না।”
উৎস রাগী মুখ করার চেষ্টা করল।কিন্তু সেটা খুব একটা সফল হলো না।কারণ মেহেক তখন এমনভাবে হাসছিল যে তাকে দেখে রাগ ধরে রাখা অসম্ভব।ওর চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করছিল।মুখভরা হাসি।সেই পরিচিত প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি।উৎস কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
রাগটা যেন কোথাও মিলিয়ে গেল।মেহেক সেটা বুঝে ফেলল।
-“এই যে! আপনিও হাসছেন !”
-“হাসছি না।”
-“হাসছেন ।”
-“না।”
-“হ্যাঁ।”
-“না।”
-“হ্যাঁ।কিন্তু আপনিও যে হাসতে জানেন তা জানা ছিলো না।”
-“এখন জেনে নিয়েছিস?”
-“দেখেছি।”
এই বলে মেহেক আবার হেসে উঠল।উৎস মাথা নাড়ল।
মেয়েটা একদমই বদলায়নি।ছোটবেলায় যেমন ছিল, এখনো ঠিক তেমনই আছে। ওর শুধু বয়স বেড়েছে।এখনো বাচ্চাই আছে।মেহেক এবার ফোনের স্ক্রিন উৎসর সামনে ধরল।
-“দেখুন তো ছবিগুলো।”
উৎস না দেখার ভান করলো।কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকাল।
ছবিগুলো দেখে ওরও হাসি পেয়ে গেল।ফুলের মুকুট মাথায় ওকে সত্যিই অদ্ভুত লাগছিল।কিন্তু ছবিগুলোতে একটা আন্তরিকতা ছিল।কোনো সাজানো-গোছানো ব্যাপার না।শুধু একটা সুন্দর সময়।একটু বোকাসোকা দুষ্টুমি।মেহেক বলল,
-“আমি এই ছবিগুলো আমার কাছে রেখে দেব।”
-“কেনো?”
-“কারণ এগুলো স্পেশাল।”
“এতে স্পেশাল কী আছে?”
মেহেক কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
-“জানি না। কিন্তু আছে।”
মেহেকের কথা শেষ হওয়ার আগেই উৎস তড়িৎ গতিতে ফোনটা নিয়ে ছবিগুলো ডিলিট করে দিলো। কাজটা এত তাড়াতাড়ি হলো জে মেহেক বুঝতেও পারলো না। কিন্তু যখন ছবি ডিলিট করে উৎস ওর হাতে ফোনটা ফেরত দিলো তখন মেহেকের বেশ অভিমান হলো। নিজের হাতে বানানো মুকুট পুড়িয়ে উৎসের ছবি তুলেছিল ও। আর এই পাষান উৎস ভাই ডিলিট করে দিলো।তার কাছে তো নেওয়াই হয় নাই। আর কথাই বলবে না মেহেক উনার সাথে।পড়ন্ত এই দুপুরে কিছুক্ষণ আগেও যে হাসি-ঠাট্টায় চারপাশ মুখর ছিল, এখন সেখানে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছে।তবে সেই শান্তির মাঝেও মেহেকের মুখে হালকা অভিমানের ছাপ স্পষ্ট। ঘটনাটা খুব বড় কিছু ছিল না। আসলে মেহেক এমনই—যাকে বলে “অভিমানী মানুষ”। ছোট ছোট বিষয়েও মন খারাপ করে ফেলে, আবার সামান্য যত্ন পেলে মুহূর্তেই সব ভুলেও যায়।উৎস সেটা খুব ভালো করেই জানত।ছোটবেলা থেকেই মেহেকের প্রায় সব স্বভাবই ওর মুখস্থ।তাই মেহেক যখন ঠোঁট ফুলিয়ে ঘাসের ওপর বসে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল, উৎস বুঝে গেল—অভিমান জমেছে।সে কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করল।
-“এই মেহেক…”
কোনো উত্তর নেই।
– “রাগ করলি?”
মেহেক মুখ ঘুরিয়ে নিল।
– “না রাগ করিনি, আমার এত খুশি লাগতেছে জে একটা লুঙ্গি থাকলে এইখানে লুঙ্গি ডান্স দিতাম।”
উৎস হেসে ফেলল।অন্য দিনের মতো আজ ওতো রাগ করতে বা দেখাতে পারছে না।কিভাবেই বা দেখাবে মেহেককে কষ্ট দিতে তার ওতো ভালো লাগে না।
-“আচ্ছা, এত রাগ কেন তোর?”
-“জানি না।”
-“জানিস না?”
-“না।”
উৎস মাথা নাড়ল।মেহেকের এই “জানি না” মানে হচ্ছে ও নিজেও বুঝতে পারছে না কেন রাগ করেছে।কিন্তু রাগ করেছে, তাই রাগ ধরে রাখতে হবে।কিছুক্ষণ ওর পাশে বসে থেকে উৎস উঠে দাঁড়াল।
– “ঠিক আছে, আমি আসছি।”
মেহেক কোনো উত্তর দিল না।উৎস ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে লাগল।ওর যাওয়ার পানে আঁড়চোখে চেয়ে রইলো মেহেক।মাঠের শেষ মাথার দিকে যেতে যেতে হঠাৎ ওর চোখে পড়ল একটা ছোট্ট ঠেলাগাড়ি।একজন বৃদ্ধ লোক আখের রস বিক্রি করছেন।গাড়ির একপাশে সবুজ আখের গুচ্ছ সাজানো।পাশে বরফ রাখা।পুরোনো ধাঁচের লোহার মেশিনে আখ চেপে রস বের করা হচ্ছে।দৃশ্যটা দেখেই উৎসের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।মেহেক আখের রস খুব পছন্দ করে।সে দ্রুত ঠেলাগাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ দোকানি হাসিমুখে বললেন,
-“বাবা, আখের রস খাবে?”
-“দুই গ্লাস লাগবে।”
দোকানি মাথা নাড়লেন।উৎস কিছুক্ষণ মেশিনটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
-“চাচা, আমি একটু রস বের করতে পারি?”
লোকটা হেসে ফেললেন।
-“পারো বাবা, সাবধানে করো।”
উৎস শার্টের হাতা গুটিয়ে মেশিনের হাতলটা ধরল।তারপর আখ ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে ঘোরাতে শুরু করল।মেশিন ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে আখ চেপে রস বের হতে লাগল।স্বচ্ছ সবুজাভ রস নিচের পাত্রে জমা হচ্ছে।উৎসের হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটবেলায় একবার গ্রামে গিয়ে এমন মেশিন ঘোরানোর জন্য কত উৎসাহ দেখিয়েছিল।আজ অনেক বছর পর আবার সেই কাজ করছে।তাও আবার একই মানুষের জন্য!
একটা সময় বৃদ্ধ দোকানিও হেসে বললেন,
-“দেখছি ভালোই পারো।”
-“অনেক দিন আগে শিখেছিলাম।”
কয়েক মিনিট পর পর্যাপ্ত রস জমল।উৎস নিজেই দুটি ডিসপোজেবল গ্লাসে রস ঢালল।সামান্য বরফ দেওয়া হলো।
তারপর টাকা পরিশোধ করে গ্লাস দুটো হাতে নিয়ে ফিরে চলল।দূর থেকেই দেখতে পেল মেহেক এখনো একইভাবে বসে আছে।মুখ গোমড়া করে।যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষ।এই ভাবটার জন্য উৎস রেগে যায়।কিন্তু এখন রাগলো না।সব সময় রাগ দেখানো ঠিক হবে না।উৎস ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।মেহেক তাকাল না।
উৎস কিছু না বলে একটা গ্লাস ওর সামনে ধরল।মেহেক প্রথমে তাকায়নি।তারপর হঠাৎ চোখ পড়তেই বিস্মিত হয়ে গেল।
-“আখের রস?”
উৎস গম্ভীর মুখে বলল,
-“না, এটা ওষুধ।”
মেহেকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
-“মিথ্যা বলছেন কেন?এইটা তো আখের রসই ”
-“দেখতে যখন পাচ্ছিস তাহলে জিজ্ঞাসা করার কি আছে!”
-“আমার জন্য এনেছেন?”
-“না, নিজের জন্য।”
-“তাহলে দুই গ্লাস কেন?”
-“একটায় হবে না তাই দুই গ্লাস।”
মেহেক এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।মুহূর্তের মধ্যেই ওর অভিমান যেন উধাও হয়ে গেল।উৎস মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যা ভেবেছিল ঠিক তাই হয়েছে।
মেহেক গ্লাসটা হাতে নিয়ে বড় একটা চুমুক দিল।সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-“আহা! কত মজা!”
উৎসও রস খেতে শুরু করল।বাতাস বইছে সেই সাথে গরমও বাড়ছে। উৎস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
-“চল, কিছু খেয়ে বাড়ি যাই।”
মেহেক অবাক হয়ে বলল,
-“এখন?”
-“হ্যাঁ।”
-“কোথায়?”
-“সারপ্রাইজ।”
মেহেক চোখ ছোট করল।
-“সারপ্রাইজ?আপনি আমাকে সারপ্রাইজ দিবেন?আপনার কাছ থেকে সারপ্রাইজ!”
-“না আমার শশুরের মেয়েকে দিবো। এবার চল।”
কিছুক্ষণ পর তারা কাছের একটা রেস্টুরেন্টে পৌঁছাল।রেস্টুরেন্টটা খুব বড় না।কিন্তু বেশ পরিচ্ছন্ন।ভেতরে নরম আলো জ্বলছে।কাচের জানালার বাইরে ব্যস্ত শহর দেখা যাচ্ছে।ভেতরে ঢুকতেই মসলার সুগন্ধ নাকে এলো।মেহেক সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলল।
-“কাচ্চি?”
উৎস হাসল।
-“হুম।”
মেহেকের চোখ চকচক করে উঠল।
-“এটা আমার দুর্বলতা।”
-“সেজন্যই তো এনেছি ।”
তারা জানালার পাশে একটা টেবিলে বসল।ওয়েটার এসে অর্ডার নিল।কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া ওঠা কাচ্চি পরিবেশন করা হলো।সুগন্ধে পুরো টেবিল ভরে গেল।সোনালি রঙের ঝরঝরে চাল।বড় নরম মাংসের টুকরো।আলু,সালাত, বোরহানি।সব মিলিয়ে দারুণ এক আয়োজন।মেহেক প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ করল।
-“ওহ! অসাধারণ!”
-“এত নাটক করছিস কেন?”
-“কারণ সত্যিই ভালো।”
#চলবে
#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:২৯
-“হাত সরা।”
-“চোখ বুজেন।”
-“কেনো?”
-“আগে বুজেন না।”
উৎস দুচোখের পাতা নুইয়ে ফেলে।মেহেক উৎকন্ঠা হয়ে বলল,
-“আমি যতক্ষণ না খুলতে বলবো ততক্ষণ চোখ বুঁজে থাকবেন।”
-“আচ্ছা কিন্তু দূরে কোথাও যাবি না।”
উৎস যেই জায়গায় বাইক দাঁড় করিয়েছিলো সেই জায়গাটা সত্যিই বেশ নিরিবিলি। শহরের কোলাহল থেকে অনেকটা দূরে, যেন সময় এখানে একটু ধীরে বয়ে যায়। চারপাশে সবুজ ঘাসের বিস্তৃত চাদর, দূরে কয়েকটা বড় গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে মাটির মিষ্টি গন্ধ মিশে আছে, সঙ্গে নাম না জানা বুনো ফুলের হালকা সুবাস। আকাশে সাদা মেঘের দল ভেসে বেড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক গলে এসে ঘাসের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে।
উৎস আর মেহেক সেই ঘাসের মাঠের একপাশে বসেছিল একটা গাছের নিচে। উৎস ঘাসের ওপর বসে মেহেকের কথা মতো চোখ বুজে ছিল। অন্যদিকে মেহেক এদিক-ওদিক হাঁটছিল। কখনো কোনো ফুলের দিকে তাকাচ্ছিল, কখনো প্রজাপতির পেছনে ছুটছিল।মাঝে মাঝে নিশ্চিত হওয়ার জন্য উৎসের দিকে ঘুরে বলছে,
-“খুলবেন না কিন্তু!”
-“খুলবো না।”
মেহেক পুনরায় মৃদু ধমক দিয়ে বলে,
-“একদম না?”
উৎস বাধ্য ছেলের মতে সম্মতি দিয়ে বলল,
-“একদম না।যা করার তাড়াতাড়ি কর।”
মেহেক এবার খুশি হয়ে একটু দূরে চলে গেল।উৎস যদিও চোখ বন্ধ করে বসে ছিল, তবুও ওর মুখে হালকা হাসি ছিল। সে জানত মেহেক নিশ্চয়ই কোনো বাচ্চাসুলভ দুষ্টুমি করছে। ছোটবেলা থেকে মেয়েটার স্বভাবই এমন।মেহেক কয়েক কদম দূরে গিয়ে নিচু হয়ে বুনো ঘাসফুল তুলতে শুরু করল।
সাদা, হালকা বেগুনি আর হলুদ রঙের ছোট ছোট ফুল। দেখতে খুব সাধারণ, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে অসম্ভব সুন্দর।সে একেকটা ফুল খুব যত্ন করে তুলছিল।বাতাসে ওর চুল উড়ছিল। সূর্যের আলো মুখে এসে পড়ায় ওকে আরও উজ্জ্বল লাগছিল।ফুলগুলো হাতে নিয়ে সে একটা ছায়াময় জায়গায় বসে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে সেগুলো জোড়া দিয়ে একটা ছোট্ট মুকুট বানাতে শুরু করল।কাজটা সহজ ছিল না।মাঝে মাঝে ফুল ছিঁড়ে যাচ্ছিল।কখনো ডাঁটা খুলে যাচ্ছিল।আবার নতুন করে গাঁথতে হচ্ছিল।কিন্তু মেহেক হাল ছাড়ল না।ওর মুখে তখন শিশুসুলভ একাগ্রতা।কেউ ওকে দেখে বলবেনা সে একজন কিশোরী কারণ কাজটা ও এতটা গুরুত্ব সহকারে করছিল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে।প্রায় দশ মিনিট ধরে চেষ্টা করার পর অবশেষে একটা ছোট্ট ফুলের মুকুট তৈরি হলো।খুব নিখুঁত না হলেও সুন্দর ছিল।আর সবচেয়ে বড় কথা, সেটা নিজের হাতে বানানো।মেহেক মুকুটটার দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি দিল।
তারপর ধীরে ধীরে উৎসের দিকে ফিরে এলো।উৎস তখনো চোখ বন্ধ করে বসে আছে।মেহেক কাছে এসে কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল।মনে হচ্ছিল ছেলেটা সত্যিই নির্দেশ মেনে বসে আছে।তার মুখে একটা শান্ত ভাব ছিল।হালকা বাতাসে ওর চুল নড়ছিল।মেহেক মুচকি হাসল।মনটাও শান্তি পেলো। এই লোকটাকে হাতের ইশারায় ঘুরাতে পেরে মনটাও ভিষণ ফুরফুরে।
তারপর খুব সাবধানে ফুলের মুকুটটা উৎসের মাথায় পরিয়ে দিল।উৎস একটু নড়ল।অনুভব করলো মেহেক মাথায় স্পর্শ করেছে।কিন্তু কেনো তা আন্দাজ করতে পারলো না তবে মেহেক কাছে আসায় বলল,
-“হয়েছে তোর ?”
-“না, এখনো না।”
-“আর কতক্ষণ?”
-“চুপচাপ বসে থাকুন।আর একটু।”
উৎস দীর্ঘশ্বাস ফেলল।মেহেক এবার উৎসর ফোন বের করল।তারপর দ্রুত কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল।একটা সামনে থেকে।একটা পাশ থেকে।আরেকটা একটু দূরে সরে গিয়ে।
প্রতিটা ছবিতেই উৎসের মাথায় ফুলের মুকুট।দৃশ্যটা এতটাই মজার লাগছিল যে মেহেক হাসি চেপে রাখতে পারছিল না।
শেষ পর্যন্ত উৎস বিরক্ত হয়ে বলল,
-“এবার খুলতে পারি?”
-“পারেন।”
উৎস চোখ খুলল।প্রথমে মেহেকের মুখের দিকে তাকালো।
তারপর মাথার ওপর কিছু একটা অনুভব করে হাত দিল।
ফুলের মুকুটটা হাতে নিয়ে সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তারপর বলল,
-“মেহেক!!!!”
মেহেক আর নিজেকে সামলাতে পারল না।হো হো করে হেসে উঠল।
-“আপনাকে দারুণ লাগছে উৎস ভাই !”
-“আমাকে ফুলের মুকুট পরিয়ে ছবি তুলেছিস?”
-“হ্যাঁ”
মেহেকের সোজাসাপটা সিকা রক্তি।
-“সব ডিলিট কর এখনই ।”
-“করবো না।”
উৎস রাগী মুখ করার চেষ্টা করল।কিন্তু সেটা খুব একটা সফল হলো না।কারণ মেহেক তখন এমনভাবে হাসছিল যে তাকে দেখে রাগ ধরে রাখা অসম্ভব।ওর চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করছিল।মুখভরা হাসি।সেই পরিচিত প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি।উৎস কয়েক মুহূর্ত ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
রাগটা যেন কোথাও মিলিয়ে গেল।মেহেক সেটা বুঝে ফেলল।
-“এই যে! আপনিও হাসছেন !”
-“হাসছি না।”
-“হাসছেন ।”
-“না।”
-“হ্যাঁ।”
-“না।”
-“হ্যাঁ।কিন্তু আপনিও যে হাসতে জানেন তা জানা ছিলো না।”
-“এখন জেনে নিয়েছিস?”
-“দেখেছি।”
এই বলে মেহেক আবার হেসে উঠল।উৎস মাথা নাড়ল।
মেয়েটা একদমই বদলায়নি।ছোটবেলায় যেমন ছিল, এখনো ঠিক তেমনই আছে। ওর শুধু বয়স বেড়েছে।এখনো বাচ্চাই আছে।মেহেক এবার ফোনের স্ক্রিন উৎসর সামনে ধরল।
-“দেখুন তো ছবিগুলো।”
উৎস না দেখার ভান করলো।কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকাল।
ছবিগুলো দেখে ওরও হাসি পেয়ে গেল।ফুলের মুকুট মাথায় ওকে সত্যিই অদ্ভুত লাগছিল।কিন্তু ছবিগুলোতে একটা আন্তরিকতা ছিল।কোনো সাজানো-গোছানো ব্যাপার না।শুধু একটা সুন্দর সময়।একটু বোকাসোকা দুষ্টুমি।মেহেক বলল,
-“আমি এই ছবিগুলো আমার কাছে রেখে দেব।”
-“কেনো?”
-“কারণ এগুলো স্পেশাল।”
“এতে স্পেশাল কী আছে?”
মেহেক কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
-“জানি না। কিন্তু আছে।”
মেহেকের কথা শেষ হওয়ার আগেই উৎস তড়িৎ গতিতে ফোনটা নিয়ে ছবিগুলো ডিলিট করে দিলো। কাজটা এত তাড়াতাড়ি হলো জে মেহেক বুঝতেও পারলো না। কিন্তু যখন ছবি ডিলিট করে উৎস ওর হাতে ফোনটা ফেরত দিলো তখন মেহেকের বেশ অভিমান হলো। নিজের হাতে বানানো মুকুট পুড়িয়ে উৎসের ছবি তুলেছিল ও। আর এই পাষান উৎস ভাই ডিলিট করে দিলো।তার কাছে তো নেওয়াই হয় নাই। আর কথাই বলবে না মেহেক উনার সাথে।পড়ন্ত এই দুপুরে কিছুক্ষণ আগেও যে হাসি-ঠাট্টায় চারপাশ মুখর ছিল, এখন সেখানে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছে।তবে সেই শান্তির মাঝেও মেহেকের মুখে হালকা অভিমানের ছাপ স্পষ্ট। ঘটনাটা খুব বড় কিছু ছিল না। আসলে মেহেক এমনই—যাকে বলে “অভিমানী মানুষ”। ছোট ছোট বিষয়েও মন খারাপ করে ফেলে, আবার সামান্য যত্ন পেলে মুহূর্তেই সব ভুলেও যায়।উৎস সেটা খুব ভালো করেই জানত।ছোটবেলা থেকেই মেহেকের প্রায় সব স্বভাবই ওর মুখস্থ।তাই মেহেক যখন ঠোঁট ফুলিয়ে ঘাসের ওপর বসে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল, উৎস বুঝে গেল—অভিমান জমেছে।সে কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করল।
-“এই মেহেক…”
কোনো উত্তর নেই।
– “রাগ করলি?”
মেহেক মুখ ঘুরিয়ে নিল।
– “না রাগ করিনি, আমার এত খুশি লাগতেছে জে একটা লুঙ্গি থাকলে এইখানে লুঙ্গি ডান্স দিতাম।”
উৎস হেসে ফেলল।অন্য দিনের মতো আজ ওতো রাগ করতে বা দেখাতে পারছে না।কিভাবেই বা দেখাবে মেহেককে কষ্ট দিতে তার ওতো ভালো লাগে না।
-“আচ্ছা, এত রাগ কেন তোর?”
-“জানি না।”
-“জানিস না?”
-“না।”
উৎস মাথা নাড়ল।মেহেকের এই “জানি না” মানে হচ্ছে ও নিজেও বুঝতে পারছে না কেন রাগ করেছে।কিন্তু রাগ করেছে, তাই রাগ ধরে রাখতে হবে।কিছুক্ষণ ওর পাশে বসে থেকে উৎস উঠে দাঁড়াল।
– “ঠিক আছে, আমি আসছি।”
মেহেক কোনো উত্তর দিল না।উৎস ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে লাগল।ওর যাওয়ার পানে আঁড়চোখে চেয়ে রইলো মেহেক।মাঠের শেষ মাথার দিকে যেতে যেতে হঠাৎ ওর চোখে পড়ল একটা ছোট্ট ঠেলাগাড়ি।একজন বৃদ্ধ লোক আখের রস বিক্রি করছেন।গাড়ির একপাশে সবুজ আখের গুচ্ছ সাজানো।পাশে বরফ রাখা।পুরোনো ধাঁচের লোহার মেশিনে আখ চেপে রস বের করা হচ্ছে।দৃশ্যটা দেখেই উৎসের মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।মেহেক আখের রস খুব পছন্দ করে।সে দ্রুত ঠেলাগাড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
বৃদ্ধ দোকানি হাসিমুখে বললেন,
-“বাবা, আখের রস খাবে?”
-“দুই গ্লাস লাগবে।”
দোকানি মাথা নাড়লেন।উৎস কিছুক্ষণ মেশিনটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
-“চাচা, আমি একটু রস বের করতে পারি?”
লোকটা হেসে ফেললেন।
-“পারো বাবা, সাবধানে করো।”
উৎস শার্টের হাতা গুটিয়ে মেশিনের হাতলটা ধরল।তারপর আখ ঢুকিয়ে ধীরে ধীরে ঘোরাতে শুরু করল।মেশিন ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে আখ চেপে রস বের হতে লাগল।স্বচ্ছ সবুজাভ রস নিচের পাত্রে জমা হচ্ছে।উৎসের হঠাৎ মনে পড়ল, ছোটবেলায় একবার গ্রামে গিয়ে এমন মেশিন ঘোরানোর জন্য কত উৎসাহ দেখিয়েছিল।আজ অনেক বছর পর আবার সেই কাজ করছে।তাও আবার একই মানুষের জন্য!
একটা সময় বৃদ্ধ দোকানিও হেসে বললেন,
-“দেখছি ভালোই পারো।”
-“অনেক দিন আগে শিখেছিলাম।”
কয়েক মিনিট পর পর্যাপ্ত রস জমল।উৎস নিজেই দুটি ডিসপোজেবল গ্লাসে রস ঢালল।সামান্য বরফ দেওয়া হলো।
তারপর টাকা পরিশোধ করে গ্লাস দুটো হাতে নিয়ে ফিরে চলল।দূর থেকেই দেখতে পেল মেহেক এখনো একইভাবে বসে আছে।মুখ গোমড়া করে।যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মানুষ।এই ভাবটার জন্য উৎস রেগে যায়।কিন্তু এখন রাগলো না।সব সময় রাগ দেখানো ঠিক হবে না।উৎস ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।মেহেক তাকাল না।
উৎস কিছু না বলে একটা গ্লাস ওর সামনে ধরল।মেহেক প্রথমে তাকায়নি।তারপর হঠাৎ চোখ পড়তেই বিস্মিত হয়ে গেল।
-“আখের রস?”
উৎস গম্ভীর মুখে বলল,
-“না, এটা ওষুধ।”
মেহেকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
-“মিথ্যা বলছেন কেন?এইটা তো আখের রসই ”
-“দেখতে যখন পাচ্ছিস তাহলে জিজ্ঞাসা করার কি আছে!”
-“আমার জন্য এনেছেন?”
-“না, নিজের জন্য।”
-“তাহলে দুই গ্লাস কেন?”
-“একটায় হবে না তাই দুই গ্লাস।”
মেহেক এবার আর হাসি আটকাতে পারল না।মুহূর্তের মধ্যেই ওর অভিমান যেন উধাও হয়ে গেল।উৎস মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যা ভেবেছিল ঠিক তাই হয়েছে।
মেহেক গ্লাসটা হাতে নিয়ে বড় একটা চুমুক দিল।সঙ্গে সঙ্গে ওর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-“আহা! কত মজা!”
উৎসও রস খেতে শুরু করল।বাতাস বইছে সেই সাথে গরমও বাড়ছে। উৎস ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
-“চল, কিছু খেয়ে বাড়ি যাই।”
মেহেক অবাক হয়ে বলল,
-“এখন?”
-“হ্যাঁ।”
-“কোথায়?”
-“সারপ্রাইজ।”
মেহেক চোখ ছোট করল।
-“সারপ্রাইজ?আপনি আমাকে সারপ্রাইজ দিবেন?আপনার কাছ থেকে সারপ্রাইজ!”
-“না আমার শশুরের মেয়েকে দিবো। এবার চল।”
কিছুক্ষণ পর তারা কাছের একটা রেস্টুরেন্টে পৌঁছাল।রেস্টুরেন্টটা খুব বড় না।কিন্তু বেশ পরিচ্ছন্ন।ভেতরে নরম আলো জ্বলছে।কাচের জানালার বাইরে ব্যস্ত শহর দেখা যাচ্ছে।ভেতরে ঢুকতেই মসলার সুগন্ধ নাকে এলো।মেহেক সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ফেলল।
-“কাচ্চি?”
উৎস হাসল।
-“হুম।”
মেহেকের চোখ চকচক করে উঠল।
-“এটা আমার দুর্বলতা।”
-“সেজন্যই তো এনেছি ।”
তারা জানালার পাশে একটা টেবিলে বসল।ওয়েটার এসে অর্ডার নিল।কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া ওঠা কাচ্চি পরিবেশন করা হলো।সুগন্ধে পুরো টেবিল ভরে গেল।সোনালি রঙের ঝরঝরে চাল।বড় নরম মাংসের টুকরো।আলু,সালাত, বোরহানি।সব মিলিয়ে দারুণ এক আয়োজন।মেহেক প্রথম লোকমা মুখে দিয়েই চোখ বন্ধ করল।
-“ওহ! অসাধারণ!”
-“এত নাটক করছিস কেন?”
-“কারণ সত্যিই ভালো।”
#চলবে

