Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০১

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০১

0
1

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_১
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

পাত্র হিসেবে নিজের ভার্সিটির লেকচারার শাফায়াত কিবরিয়ার নামটা শুনতেই চমকাল মৃত্তিকা। ব্যাপারটা ঠিকভাবে বোঝারও সুযোগ পেল না সে। তার আগেই একটা শক্তপোক্ত হাতের চড় পড়ল মৃত্তিকার গালে। হুরমুড়িয়ে গিয়ে পড়ল পাশে দাঁড়ানো ওর চাচাতো ভাই মৃদুল এর উপর।

মৃদুল শুধু মৃত্তিকাকে ধরে এতটুকু নিশ্চিত করল যেন ঘাসের উপরে গিয়ে না পড়ে সে। এর বেশি আর কোন রকমের কোন সাহায্য করার ইচ্ছে নেই তার।

মৃত্তিকা নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ভেসে এলো সমীরণের হুংকার। ছেলেটার রাগান্বিত চেহারা দেখে যে কেউ তাকে এখন পাগলা ষাড় বলবে। দারুণ খেঁপেছে। মৃত্তিকার দিকে তেড়ে গিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,

“হাজার বার করে তোকে বলেছিলাম ওই লেকচারারের আশেপাশে যাবি না। আমার থেকে তুই মানুষ বেশি চিনিস? এত বড় একটা কথা কোন সাহসে আমার থেকে লুকিয়েছিস? নাকি ওকে বিয়ে করার ইচ্ছে তোরও আছে?”

ভয়ে মৃত্তিকার হাত-পা কাঁপছে ঠকঠক করে। দাঁতগুলোও কাঁপছে। আবহাওয়া আজ খুব একটা বেশি উষ্ণ না। তবুও দরদর করে ঘামছে। মৃদুল এর দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকাল একটু সাহায্যের প্রত্যাশায়। অথচ মৃদুল নিরুদ্দেগ।

পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ঠোঁটের ভাজে রেখেছে। মৃত্তিকার আর বুঝতে বাকি রইল না যে মৃদুল এর থেকে ও কোন সাহায্য পাবে না।

মৃত্তিকা ভয়ে ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সমীরণের দিকে তাকাতেই দেখল ছেলেটা রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মৃত্তিকার অন্তরাত্না কেঁপে উঠলো ভয়ে। দু হাতে আগে নিজের দুই গাল ঢাকল। বলা যায় না যখন তখন আবার চড় মে রে দিতে পারে।

এদিকে এতটা সময় অতিবাহিত হবার পরেও মৃত্তিকার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সমীরণের রাগ আরো বাড়ল। গর্জে উঠে বলল,

“কিবরিয়ার সাথে দেখা হলে তো মুখ দিয়ে খই ফোটে। জিজ্ঞেস না করতেই গড়গড় করে সব বলে দেস। আর আমি প্রশ্ন করছি তার উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করছিস না! এত সাহস এলো কোত্থেকে তোর? ঠাটিয়ে লাগাবো কানের নিচে একটা। উত্তর দে বেয়াদব।”

মৃত্তিকা কম্পিত গলায় বলল,

“কি উত্তর দেব?”

সমীরণ দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,

“ও তোর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল কেন?”

মৃত্তিকা মিনমিনে স্বরে জবাব দিল।

“ওনার ইচ্ছে হয়েছে তাই।”

“ইচ্ছে কেন হলো? ইচ্ছে জাগল কি করে? তুই জাগিয়েছিস? ও তোর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর সাহস পেল কোত্থেকে? সত্যি করে বল আমার সন্দেহ কি ঠিক? ও যে তোকে পছন্দ করে এটা তুই কবে থেকে জানতি?”

ভয়ে মৃত্তিকার গলা শুকিয়ে গেল। কয়েক সপ্তাহ আগে লেকচারার কিবরিয়া জানিয়েছিল ওকে নিজের মনের কথা। যদিও মৃত্তিকা তখন সরাসরি ওনাকে না করে দিয়েছিল। খুব ভালোভাবেই বুঝিয়েছিল যে ওর মনে শাফায়াত কিবরিয়ার জন্য বিন্দুমাত্র কোন অনুভূতি নেই। তারপরও যে লোকটা সোজা বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দেবে এটা আশা করেনি। কিন্তু এই কথাটা যদি এখন সমীরণ জানে তাহলে তো ওকে আস্ত রাখবে না। নির্ঘাত ভার্সিটির মাঠে পুঁ তে ফেলবে। আবার উত্তর না দিয়েও উপায় নেই। মানে এখন পরিস্থিতি এমন যে উত্তর দিলেও চড় খাবে, উত্তর না দিলেও চড় খাবে। তাই ভাবল উত্তরটা দিয়ে দেওয়াই ভালো। অন্তত চড় খাওয়ার একটা কারণ আছে বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবে।

“দু সপ্তাহ হচ্ছে।”

ছোট্ট করে উত্তর দিল মৃত্তিকা। সমীরণ আগেই কোন পদক্ষেপ না নিয়ে গম্ভীর গলায় ফের জিজ্ঞেস করল,

“কোথায় বলেছিল? কোথায় দেখা হয়েছিল তোদের? আর কি বলেছিল?”

“শশীর সাথে একটা ক্যাফেতে গিয়েছিলাম। ওখানেই কোত্থেকে যেন উনি এসে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন আমায় পছন্দ করেন এই বিষয়ে আমার মতামত কি।”

“কি মতামত জানিয়েছিলি?”

“বলেছিলাম আমি পছন্দ করি না ওনাকে।”

“আমাকে জানাসনি কেন?”

“তুমি রাগারাগি করতে। অযথা ঝামেলা করতে সেজন্য বলিনি। আর তাছাড়া আমি ভেবেছিলাম উনি হয়তো থেমে যাবেন। কিন্তু বাড়িতে যে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবেন সেটা আশা করিনি। আমি কি করব বলো! উনি কি এসব আমায় বলে করেছেন নাকি। তুমি শুধু শুধু রাগ করছো। আবার মা র লেও আমাকে। গালটা জ্বলছে আমার। আমি তো একবারও বলিনি যে আমি ওনাকে পছন্দ করি। উনি পছন্দ করেন তো আমি কি করব? যার যাকে ইচ্ছে তাকে পছন্দ করে, যার যা ইচ্ছে তাই করে। অথচ আমি কিছু না করেই দোষী।”

সমীরণ শুধু কটমটে দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মৃত্তিকার দিকে। আপাতত আর কিছু বলার ইচ্ছে হলো না। গম্ভীর গলায় শুধু মৃত্তিকাকে সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য বলল। মৃত্তিকা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। চলে গেল। মনে মনে খুব কষ্ট পেল। এত জোরে একটা চড় মারলো সমীরণ অথচ একবার সরিও বলল না। একটু ওর গালে হাত দিয়ে দেখল না যে কতটা কি ব্যথা পেয়েছে। মানুষটা আসলেই নিষ্ঠুর!

এদিকে মৃদুল তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চিন্ত মনে সিগারেট ফুঁকে যাচ্ছে। মৃদুলের এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গি দেখে সমীরণের রাগ আরো বাড়ল। ওর ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে বলল,

“এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছিস যেন কিছুই হয়নি। ওই শালা লেকচারারের কি করবি সেটা বল? তুমি কি বা লে র ছাত্র নেতা এবার তার প্রমাণ মিলবে। যদি ওর একটা ঠ্যাং না ভেঙেছিস তবে তোর রাজনীতি করা আমি বের করব।”

মৃদুল কে মোটেও বিভ্রান্ত হতে দেখা গেল না। দুহাত বুকে গুঁজে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ওভার রিয়েক্ট করছিস কেন? মেয়ে বড় হয়েছে বিয়ের প্রস্তাব আসবেই। আর তাছাড়া শাফায়াত কিবরিয়া পাত্র হিসেবে যথেষ্ট ভালো। আমি তো ভাবছি চাচা-চাচিকে বলব মৃত্তিকার জন্য সম্বন্ধটার কথা যেন ভাবে।”

“জানে মে রে দেব কিন্তু তোকে। শাফায়াত এর আগে তোকে মা র ব। ওর সাথে বিয়ে হবে না মৃত্তিকার।”

“তো কার সাথে হবে?”

“আর যার সাথেই হোক ওর সাথে হবে না।”

“যৌক্তিক কারণ বল।”

সমীরণ যৌক্তিক কারণ খুঁজতে বসল। সত্যি বলতে মাথায় কোন যৌক্তিক কারণই আসছে না। আবার চুপ থাকলেও তো হবে না। শেষে মনে যা এলো তাই বলল,

“আমি বলেছি হবে না তাই হবে না। কথা শেষ। লেকচারার হয়ে স্টুডেন্টের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় এটা কেমন চরিত্র। কে জানে এর আগেও কত স্টুডেন্টের বাড়িতে পাঠিয়েছে। ওর কাজ পড়ানো, ও পড়াবে। ও কেন বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবে? তাহলে ভেবে দেখ ক্লাসে বাকি মেয়েদের দিকে কতই না কুদৃষ্টিতে তাকায়। এমন ছেলের সাথে তুই তোর বোনের বিয়ে দিবি? তুই না বলতি মৃত্তিকা তোর চাচাতো বোন হলেও তুই ওকে নিজের বোনের নজরে দেখিস। এই তার নমুনা? ওর ভবিষ্যতের কথা একবারও ভাববি না তুই? ঠিক আছে তুই না ভাবলি। কিন্তু আমি অবশ্যই ভাবব।”

মৃদুল এগিয়ে এসে একহাতে সমীরণের কাঁধ পেঁচিয়ে ধরে বলল,

“এত কিসের দায় তোর? ওর ভবিষ্যৎ ভাবার জন্য চাচা-চাচি আছে, আমার বাবা-মা আছে, আমি আছি। তুই আমার বন্ধু। বিষয়টা আমার হলে তাও না হয় বুঝতাম যে তোর অধিকার আছে আমাকে নিয়ে ভাবার। আমার চাচাতো বোনকে নিয়ে এত কেন ভাবছিস?”

একটু থতমত খেল সমীরণ। আমতা আমতা করে বলল,

“তোর পরিবারকে আমি আমার পরিবারের চোখে দেখি। তো তাদেরকে নিয়ে ভাবব না? তুই আমার ভাই, তোর বাবা-মা আমার মা বাবা, তোর চাচা চাচা আমার চাচা চাচি, তোর ভাইয়েরা আমার ভাই।”

“তাহলে আমার বোন তোরও বোন, তাইতো?”

মৃদুল কথাটা বলতেই সমীরণ ওর থেকে ছিটকে দূরে সরে গিয়ে বলল,

“কক্ষনো না। এই পৃথিবীতে আমার কোন বোন নেই। তুই জানিস আমি মেয়েদের সহ্য করতে পারি না। এসব মা-বোনের সম্পর্কে আমি জড়াই না। আর ওই ন্যাকা হবে আমার বোন! অসম্ভব। আমার বোন হতে গেলেও মিনিমাম যোগ্যতা লাগে।”

মৃদুল এবারে হো হো করে হেসে উঠল। মৃদুলের সেই হাসিতে সমীরণ খানিকটা বিভ্রান্ত হলো। আবার যেন একটু লজ্জাও পেল। মুখটা হয়ে উঠল ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতন। নিজেই নিজেকে বোঝাল যে মৃদুল কিছু বোঝেনি। এমনি হাসছে। ছেলেটা তো অকারণেই হাসে। পাগল হয়ত। আবার এটাও ভাবল, মৃদুলের কি বুঝে যাওয়ার ভয় পাচ্ছে সমীরণ? আদৌও কি বোঝার মতন কিছু আছে?

আপাতত আর এই নিয়ে কোন কথা তুলল না মৃদুল। সমীরণের মাথা গরম আছে। তাই ভাবল ওকে নিয়ে একটু চা খেতে যাবে। চা খোর ছেলে। মন-মেজাজ ভালো হোক কিংবা খারাপ হোক চা পেলে এমনিতেই শান্ত হয়ে যায়। তাই সরাসরি ওকে নিয়ে ভার্সিটির সামনের ছোট্ট স্টলটাতেই গেল।

____________

ভার্সিটির পিছন দিকটায় একটা পুকুর আছে। সেই পুকুরের ধারে অনেকগুলো বেঞ্চও রাখা বসার জন্য। তারই মধ্যে একটা বেঞ্চের উপর বসে আছে মৃত্তিকা। সমীরণ যে গালে চড় মেরেছিল সেই গালটা এখনো লাল হয়ে আছে। ওটা চামড়ার হাত নাকি লোহা দিয়ে তৈরি হাত বুঝে উঠতে পারে না মৃত্তিকা। আজ অব্দি যে কতবার চড় খেয়েছে তার কোন হিসেব নেই। একবার তো চড় খেয়ে একটা দাঁতও নড়ে গিয়েছিল। সে কি ব্যথা!

সেইবার ডাক্তারের কাছেও অবশ্য সমীরণই নিয়ে গিয়েছিল। ওষুধপত্রও সব ওই কিনে দিয়েছিল। অতিরিক্ত ব্যথায় যখন মেয়েটা কাঁদছিল তখন আবার ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য অনেকগুলো চকলেটও কিনে পাঠিয়েছিল। সেইসবের জন্য মৃত্তিকা অবশ্য ব্যথার কথা ভুলে গিয়েছিল।

তারপর থেকে বহু বছর চড় খায়নি।

তবে আবার এই ভার্সিটিতে আসার পর থেকে শুরু হয়েছে চড় খাওয়া। ছয় মাসে এই নিয়ে তিনবার চড় খেয়েছে। আর তিনবারই চড় খেয়েছে কোন পুরুষকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনায়। তবে প্রথম দুবারের চড়টা এতটা জোরে ছিল না। এতোটা কষ্টও হয়নি। আজ আবার সমীরণ একটু এলোও না ওর সাথে দেখা করতে। এই নিয়ে মনটা ভীষণ খারাপ মৃত্তিকার।

এমন নির্জন একাকী মুহূর্তে মৃত্তিকাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সেখানে এলো শশী। দুজনে ব্যাচমেট। বেশ ভালো বন্ধুত্ব। ধপ করে এসে পাশে বসে পড়ল। একটু ভয় পেল মৃত্তিকা। তবে পাশ ফিরে তাকাতেই যখন শশীর মুখটা দেখল আবার নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল।

“এখানে একা বসে আছিস কেন? আমাকে ডাকলেই পারতি।”

কোন উত্তর দিল না মৃত্তিকা। শশী হাসল। কেন মেয়েটা এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছে সেটা জানে। হাতে থাকা কোল্ড ড্রিংসের বোতলটা মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“এটা নে। তোর প্রিয় কোল্ড ড্রিংকস।”

“দরকার নেই। নিয়ে যা।”

“সমীরণ ভাইয়া পাঠাল। বলল রাতে ঘুমের ঘোরে মশা তাড়াতে গিয়ে নাকি নিজেই নিজের গালে একটা চড় লাগিয়েছিস। আগে ঠান্ডা বোতলটা কিছুক্ষণ তোর গালে ঘষতে বলেছে। তারপর ঢকঢক করে পুরোটা শেষ করতে বলেছে। আর অবশ্যই বোতলটা যেখানে সেখানে না ফেলে ডাস্টবিনে ফেলতে বলেছে।”

চমকে তাকাল মৃত্তিকা শশীর দিকে। অবিশ্বাস্য গলায় পড়ল,

“সমীরন পাঠিয়েছে? সত্যি বলছিস! মিথ্যে না তো?”

“না রে বাবা মিথ্যে কেন বলতে যাব? আমি তোর খোঁজ করছিলাম। তখন ওদের সাথে দেখা হয়ে গেল। সমীরণ ভাইয়া আমার হাতে এটা দিয়ে বলল যেন তোকে দিয়ে দিই। তাড়াতাড়ি ঠান্ডা বোতলটা গালে লাগা। গালটা লাল হয়ে গেছে।”

কথাটা বলে শশী নিজেই ঠান্ডা বোতলটা মৃত্তিকার গালের ওপরে কিছুক্ষণ ধরে রাখল। কিছুক্ষণ পর বোতলের ঢাকনা খুলে মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিল। মৃত্তিকা বোতলটা কিছুক্ষণ হাতে ধরে বসে থাকল।

সত্যি বলতে খেতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে এভাবে সারা জীবন শোকেসে তুলে রেখে দেবে বোতলটা। মৃত্তিকা বরাবর তাই করেছে। আজ অব্দি সমীরণ ওকে যা কিছু দিয়েছে সেই সবকিছু খুব সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে। এমনকি সমীরণের দেওয়া প্রত্যেকটা চকলেটের প্যাকেট অব্দি গুছিয়ে রেখেছে। নিজের সেসব পাগলামির কথা ভেবে আনমনেই হেসে উঠল মৃত্তিকা। সত্যি পাগল হয়ে গেছে মেয়েটা।

___________

শশীর সাথে টুকটাক গল্প করতে করতে ভার্সিটির গেটের দিকে এলো মৃত্তিকা। গেটের কাছাকাছি আসতেই দেখল সমীরণ বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে তার হালকা ঘিয়ে রঙা শার্ট, যার হাতাটা কনুই অব্দি গোটানো। শার্টের ওপরের দু তিনটে বাটন খোলা। যার ফলে সমীরণের হালকা লোমশ বুকের বেশ খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছে। যা একবার চট করে দেখে নিল মৃত্তিকার লোলুপ দৃষ্টি। ছেলেটা ঘেমে একদম ভিজে গেছে। সমানে হাতে থাকা টিস্যু দিয়ে নিজের ঘাম মুছে নিচ্ছে। তবে খুব তাড়াতাড়ি আবার ভিজে উঠছে।

মৃত্তিকা যদিও জানে যে সমীরণ ওর জন্য এখানে অপেক্ষা করছে। কিন্তু তবুও পাত্তা দিল না। মৃত্তিকা চাইছে যেন সমীরণ ওকে দেখে ডাকে। সেজন্য আবার বেশি দূরত্ব বজায় রেখেও যাওয়া যাবে না। যদি আবার টের না পায়!

সমীরণের একেবারে পাশ ঘেষে চুপচাপ হেঁটে চলে যেতে চাইল। তবে যেতে পারল না। কয়েক কদম এগোতেই ওড়নায় টান অনুভব করল। ভাগ্যিস সেফটিপিন লাগিয়েছিল। নয়তো ভার্সিটির মাঠেই একটা অঘটন ঘটে যেত।

মৃত্তিকা খেয়াল করল ওর বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। কারণটা ভয় নাকি অন্য কিছু সেটা মৃত্তিকা বুঝে উঠতে পারল না। তার আগেই ওর কানে সমীরণের রাশভারি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আমার হাতে চড় খেয়ে এত আনন্দ হয় তোর! আমাকে যে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিস একটুও বুক কাঁপল না?”

সমীরণ ততক্ষণে মৃত্তিকার ওড়নার অনেকখানি অংশ হাতে পেঁচিয়ে ফেলেছে। মৃত্তিকা যখন বুঝল পিছিয়ে না গিয়ে কোন উপায় নেই তখন গুটি গুটি পায়ে আবার পিছিয়ে এলো। তবে চোখ তুলে সমীরণের দিকে তাকানোর সাহস হলো না। মিনমিনে গলায় বলল,

“ওড়না ছাড়ো।”

মৃত্তিকা কথাটা বলতেই সমীরণের হুশ হলো যে এতক্ষণ বাইকের উপর বসে থেকে মৃত্তিকার ওড়না পেঁচাচ্ছিল হাতে। সঙ্গে সঙ্গে ওর ওড়নাটা ছেড়ে দিয়ে বলল,

“ছেড়েছি। তোর ওড়না ধরে থাকার কোন শখ নেই আমার।”

“তাহলে ধরেছিলে কেন?”

“সাহসে বেড়ে গেছে যে তোর। তোর ভুল ধরিয়ে দিতে হবে তো। আজকাল আমাকে দেখেও না দেখার ভান করছিস। শোন, যে চোখ আমাকে দেখেনা সেই চোখ রাখারই কোন প্রয়োজন নেই। একদম উপড়ে ফেলে দেব। আজ একের পর এক সমানে ভুল করেই যাচ্ছিস মৃত্তিকা। আর আমার রাগও বেড়েই যাচ্ছে। আজ দয়া করলাম। কোন শাস্তি দিলাম না। তবে সাবধান হয়ে যা। আর এখন চুপচাপ পিছনে বস।”

মৃত্তিকার মনে আবারো অভিমান জমলো। সবসময় ওর সাথে এত রাগ নিয়ে কথা বলার কি আছে। সব সময় এত শাস্তি দেওয়ার কথাই বা বলে কেন এই মানুষটা। একটু ভালোবাসার কথা বলতে পারেনা। সব সময় এত ধমকা ধমকি কেন করে। একটু ভালোভাবে বললেই তো বসে যেত।

মৃত্তিকা ভাবল যাবেই না এই ছেলের সাথে।

“যাব না আমি তোমার সাথে। মৃদুল ভাইয়া কোথায়? ভাইয়াই তে আমাকে মেসে রেখে আসে। আমি ভাইয়ার সাথেই যাব।”

“তোর ভাইয়ার তোকে রেখে আসার সময় নেই, বুঝতে পেরেছিস? দলবলের সাথে কাকে যেন পে টা তে গেছে। বোধহয় মানুষটা শাফায়াত কিবরিয়া।”

নামটা শুনতেই মৃত্তিকা আঁৎকে উঠে বলল,

“কাকে পে টা তে গেছে? শাফায়াত স্যারকে?”

শাফায়াতকে মা র তে গেছে এই কথাটা শোনার পর মৃত্তিকার চোখে মুখে যে আতঙ্কটা ফুটে উঠেছিল সেটা মোটেই পছন্দ হলো না সমীরণের। শাফায়াতের যা ইচ্ছে হয়ে যাক। কিন্তু তার জন্য মৃত্তিকা কেন এত চিন্তিত হবে, ও কেন ভয় পাবে? তাও আবার সমীরণের সামনে।

বাইকের উপর বসা অবস্থাতেই মৃত্তিকার দিকে একটু ঝুঁকে এসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,

“কেন? চিন্তা হচ্ছে নাকি?”

মৃত্তিকা খানিকটা ভয় পেয়ে দু’কদম পিছিয়ে গিয়ে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না তেমনটা না। কিন্তু ওনাকে মা রা র কি আছে? মৃদুল ভাইয়া মা রা মা রি করে এসব যদি বড় আব্বু জানতে পারে খুব রাগারাগি করবে। আর তাছাড়া স্যারের গায়ে হাত তোলে নাকি কেউ! স্টুডেন্ট হিসেবে তো নিজেদের লিমিট জানা উচিত। ওনাকে সম্মান করা উচিত।”

সমীরণ সোজা হয়ে বসে গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“সেটা স্যারেরও ছাত্রী কে পাত্রী বানাতে চাওয়ার সময় নিজের লিমিট ভাবা উচিত ছিল। স্যার নিজের লিমিট না জানলে স্টুডেন্টরাও নিজেরদের লিমিট ভুলতেই পারে। আর তখন তাকে সম্মান করবে নাকি অসম্মান করবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তুই চুপচাপ বস। এমনিতেও আমার বাইকের পেছনে বসানোর জন্য ম রে যাচ্ছি না আমি। নেহাৎ আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর বোন, ও বলে গিয়েছিল তোকে যেন মেস অব্দি ছেড়ে দেই তাই যাচ্ছি। একা একা তো রাস্তা পার হওয়ারও আক্কেল নেই। এখন চুপচাপ বস তো। তোর পিছনে ঘোরা ছাড়াও আমার আরো হাজারটা কাজ আছে।”

অগত্যা মৃত্তিকাকে যেতে রাজি হতে হলো। শশীর থেকে বিদায় নিয়ে উঠে পরল বাইকে। ভার্সিটি থেকে মৃত্তিকার মেসটা বেশ ভালোই দূরে। অন্তত আধাঘন্টা তো লেগে যায়ই। কিন্তু সমীরণ এত জোরে বাইক ছেড়েছিল যে আধা ঘন্টার রাস্তা দশ মিনিটের মাঝে এসে পৌঁছে গেছে। পুরোটা রাস্তা মৃত্তিকা যেন নিজের জানটা হাতে ধরে এসেছে। বাইকের স্পিড কমাতে বলার সাহসও ছিল না। কেননা জানে ও যত কমাতে বলত ছেলেটা তত জোরে চালাতো। সেজন্য অগত্যা চুপচাপ দুহাতে সমীরণের পিঠের শার্ট খামচে ধরে এসেছে।

মেসের সামনে এসে বাইক থেকে নামার পর মৃত্তিকা খেয়াল করল ওর মাথাটা এখনো ভনভন করে ঘুরছে। এতক্ষণ তো নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। চুপচাপ ভেতরে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে সমীরণ ডেকে উঠল ওকে।

থামল মৃত্তিকা। আবারো নিজের পূর্বের জায়গায় এসে দাঁড়াল। হা করে শুধু সমীরণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল শোনার জন্য যে ও কি বলতে ডেকেছে। সমীরণ এখনো বাইক থেকে নামেনি। বাইকের ওপরে বসে আছে। মৃত্তিকার যে গালে চড় মেরেছিল সেই গালটা একবার দেখে নিয়ে বলল,

“খুব বেশি লেগেছিল?”

প্রথম দফায় মৃত্তিকা বুঝতে পারল না যে সমীরণ কিসের কথা বলছে। পরক্ষণে যখন বুঝতে পারল অমনি অভিমান জড়ানো গলায় বলল,

“খুব লেগেছে। এখনো ব্যথায় টনটন করছে গালটা।”

“ভালো। এই ব্যথাটা হওয়া দরকার ছিল। এরপর থেকে যখনই ঐ শাফায়াতের সামনে পড়বি, ও কথা বলতে চাইলে তোর এই ব্যথাটা মনে পড়ে যাবে। এই চড়টার কথা মনে করে হলেও ওর সাথে আর কথা বলতে যাওয়ার তোর সাহসই হবে না। এখন ভিতরে যা। কোন কারণ ছাড়া মেস থেকে বের হবি না। কোন কিছু লাগলে কল করিস।”

কথাটা বলে ছেলেটা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। চলে গেল বাইক নিয়ে। মৃত্তিকা হা করে ওর যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইল। মৃত্তিকা তো ভেবেছিল একটু সহানুভূতি দেখাবে। হয়ত গালে হাত বুলিয়ে দেবে। কিংবা যখন মৃত্তিকা বলবে গালটা ব্যথায় এখনো টনটন করছে একটু আদর করবে। ব্যস্ত হয়ে পড়বে মৃত্তিকাকে নিয়ে। তবে তেমন কিছুই হলো না। ছেলেটা এত নিষ্ঠুর কেন! আর এই নিষ্ঠুর ছেলেটাকেই মৃত্তিকা কেন ভালোবেসে ফেলল!

চলবে?