#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_৫
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার
মৃদুল এর বাড়িতে পা রাখতে রাখতে রাত বারোটা বাজলো। মৃদুলের ঘরেই থাকতে দেওয়া হয়েছে সমীরণ কে। সবার সাথে কোনরকমে কথাবার্তা বলে মৃদুল সোজা গেল নিজের ঘরে। ঘরে ঢুকে আগে ছিটকিনি বন্ধ করে দিয়ে সোজা এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। সমীরণ উপুড় হয়ে কোলবালিশটা পায়ের নিচে নিয়ে খুব আরামে ঘুমোচ্ছে। তবে ওর আরাম সহ্য হলো না মৃদুলের। একটানে কোলবালিশটা কেড়ে নিল। অমনি ঘুম ভেঙে গেল সমীরণের। বিরক্তিতে নাক মুখ কুঁচকে বলল,
“সমস্যা কি তোর? দেখছিস না আমি ঘুমোচ্ছি?”
“পরে ঘুমোবি। আগে বল কি হয়েছে? কি সমস্যায় পড়েছিস?”
“সমস্যা! কিসের সমস্যা?”
“কিসের সমস্যা মানে? যে সমস্যার জন্য আমাকে ডেকে আনলি। আমি ছাড়া নাকি কাউকে বলতে পারছিস না।”
সমীরণ একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল,
“তাই! আমি বলেছিলাম? কই মনে পড়ছে না তো!”
মৃদুল দাঁত পিষে বলল,
“মজা করার মানসিকতায় কিন্তু আমি নেই সমীরণ। সত্যি করে বল কি হয়েছে? কোথায় কি ঝামেলা বাঁধিয়েছিস?”
“আরে বললাম তো কিছু হয়নি। মনে পড়ছে না আমার কিছু। এমনটাও হতে পারে হয়ত তখন কোন সমস্যা হয়েছিল জন্য তোকে কল করেছিলাম। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এখন আর চাপ নিতে হবে না তোকে। যা হাতমুখ ধুঁয়ে এসে শুয়ে পড়। আর কোলবালিশটা দে। আমি একটু ঘুমোই।”
সমীরণ কথাটা বলতেই মৃদুল কোলবালিশ দিয়ে পর পর বেশ কয়েকবার আঘাত করল ওকে। সমীরণ ব্যথা পেল। থামতেও বলল। তবে ছেলেটা থামল না। ইচ্ছামতো আগে কয়েকবার আঘাত করে অবশেষে কোলবালিশটা সমীরণের মুখে ছুঁড়ে মে রে বলল,
“কত চাপের মাঝে আমি এসেছি জানিস? কালকে দলের সাথে একটা প্রোগ্রাম ছিল। ক্যাম্পেইনে যেতে হতো আমায়। কত কষ্টে আমি ছেলেদেরকে বুঝিয়ে শুনিয়ে এলাম। আর তুই আমার সাথে এখন মশকরা করছিস।”
সমীরণ বুঝল মৃদুল সত্যি খুব রেগে গেছে। তাই ভাবল ওকে একটা যথার্থ কারণ আগে বলা উচিত। যাতে অন্তত রাগটা কমে। উঠে বসে মৃদুল কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
“শোন আমি বোঝাই তোকে, আমার আসলে যেতে ইচ্ছে করছিল না আজ এখান থেকে। আবার একা একা থাকি কি করে। তোর বাড়িতে তোকে ছাড়া থাকব, আমার কাছে ব্যাপারটা খুব অমানবিক লেগেছে। ওখানে তুই মেসের খালার রান্না করা অখাদ্য কুখাদ্য খাবি আর এখানে আমি তোর মা চাচির হাতের রান্না করা সুস্বাদু খাবার খাব এটা হতে পারে? বন্ধুর সাথে এত বড় বেইমানি করতে পারতাম না আমি। সেজন্য তোকে ডাকলাম। আজ রাতটা থাকি। কালকে গ্রামটা ঘুরে পরশু চলে যাব। কি এমন ব্যাপার।”
বিস্ময়ে মৃদুলের মুখ হা হয়ে গেল। এই সামান্য কারণে সমীরণ ওকে এত দূর থেকে তলব করে পাঠাল! ছেলেটা কি বুঝতে পারছে মৃদুলের কত গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল? যদিও সেই কাজগুলো কেবলমাত্র মৃদুল এর কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। বাকিদের কাছে এসব কাজের কোন গুরুত্ব নেই। তবুও একটা সাধারণ ব্যাপার নিয়ে এতটা ভয় দেখানোর কি দরকার ছিল? সারাটা রাস্তা কি ভয়ে ভয়ে এসেছে মৃদুল। ভেবেছে কি না কি হয়ে গেল। আর এই ছেলে এখন মশকরা করছে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“আজ অব্দি হকিস্টিক দিয়ে কাউকে পে টা নো র সুযোগ পাইনি। বিশ্বাস কর আজ যদি নাগালের মাঝে স্টিকটা থাকত তুই বাঁচতে পারতি না আমার হাত থেকে।”
সমীরণ পাত্তা দিন না মৃদুলের হুমকি কে। কেননা জানে এই হুমকি মৃদুলের বলা অব্দি সীমাবদ্ধ থাকবে। বাস্তবায়ন আর করতে পারবে না। মৃদুল নিজেও সেটা খুব ভালো করেই জানে। সেজন্যই তো সে নিজেও শুয়ে পড়লো হাত-পা ছাড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়ে।
“আমার এক ডাকে ছুটে এসেছিস কেন? কোন বিপদে পড়লে বুঝে নিতাম আমি। ছেড়ে দিতি আমাকে আমার অবস্থায়।”
মৃদুল চোখের উপর থেকে হাতটা নামিয়ে ঘাড় কাত করে সমীরণের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“কখনো তোকে তোর মতন ছেড়ে দিয়ে থাকতে পেরেছি আমি? তুই জানিস তোর এক কথায় আমি ছুটে আসবই। সেজন্যেই ডেকেছিস।”
“কথা তো আমার সেটাই, আমি ডাকলে আসতে হবে কেন তোকে? এড়িয়ে চলবি।”
“সমস্যা তো ওখানেই এড়িয়ে চলতে পারি না। জানি তো আর কাউকে পাবি না। আমি আর স্যার ছাড়া তোর আছে কে?”
“আছে। আরেকজন আছে।”
কপালে গাঢ় ভাঁজ সৃষ্টি হলো মৃদুলের। হাতের ওপরে ভর দিয়ে কাত হয়ে শুয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কে আছে?”
সমীরণ এতক্ষন চোখ বন্ধ করে শুয়েছিল। এবারে চোখ মেলে তাকাল।
“আছে কেউ একজন।”
“সেটাই তো জিজ্ঞেস করছি কে আছে?”
সমীরণ অলস ভঙ্গিতে হাত-পা মেলে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলল,
“তোকে বলা যাবে না।”
মৃদুল বেশ জোরেই সমীরণের গালে একটা চ ড় লাগিয়ে বলল,
“তোর পেটের ভেতর থেকে কথা টেনে বের করব আমি। শিগগিরই বল কে আছে?”
সমীরণ শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“টেনে বের করে দেখা।”
“মৃত্তিকার কথা বলছিস, তাই তো?”
মুহূর্তের মাঝে সমীরণের হাসি থেমে গেল। এতক্ষণ বেশ হাস্যজ্বল চেহারায় সিলিং এর দিকে তাকিয়ে ছিল। তবে এবারে অভিব্যক্তি বদলাল। চোখ বড় বড় করে মৃদুল এর দিকে তাকিয়ে বলল,
“কি যা তা বলছিস? মৃত্তিকার কথা বলিনি আমি।”
মৃদুল টান হয়ে বিছানায় শুয়ে বলল,
“আমার তো মনে হয় তুই মৃত্তিকার কথাই বলছিস। আর আমি নিশ্চিত এ ব্যাপারে।”
সমীরণ নিজেকে খানিকটা গম্ভীর দেখানোর চেষ্টা করে বলল,
“মোটেই না। মৃত্তিকার কথা বলিনি আমি। ওর কথা কেনই বা বলতে যাব? ও কখন আমার জন্য ছিল? না আমি ওকে আমার জন্য চাই।”
“ভেবে বলছিস তো?”
সমীরণ কে এবারে একটু বিরক্ত হতে দেখা গেল। হালকা একটু যেন রেগেও গেল।
“অদ্ভুত তো! এতে এত ভাবনা চিন্তা করার কি আছে? তুই কিসের ইঙ্গিত দিতে চাইছিস স্পষ্ট করে বল।”
“মৃত্তিকা কে নিয়ে সিরিয়াস তুই? পছন্দ করিস ওকে?”
বেশ গুরুতর শোনাল এবারে মৃদুলের কন্ঠটা। আর কোন ঠাট্টা না, কোন সন্দেহ না। বরং খুব করে জানতে চাইছে। হয়ত মৃদুল অনেকটা নিশ্চিত এই ব্যাপারে। শুধু নিশ্চয়তা চাইছে সমীরণের থেকে।
সমীরণকে থতমত খেতে দেখা গেল। দৃষ্টি লুকোলো মৃদুল এর থেকে। আবারো সিলিং এর দিকে তাকিয়ে বলল,
“পছন্দ কেন করতে যাব? মেয়ে মানুষের প্রতি আমার ইন্টারেস্ট নেই জানিস না তুই? বিয়ে-টিয়ে আমি করব না কখনো এসব কি আজ নতুন জানছিস তুই? আর ওকে নিয়ে সিরিয়াস হওয়ার কি আছে? সর তে। কিসব আজেবাজে কথা বলিস না। ঘুমোতে দে আমায়।”
কথাটা বলে সমীরণ অন্যদিকে ঘুরতে নিলে মৃদুল ওর বাহু টেনে ধরল। সমীরণ এবার সত্যিই রাগী গলায় বলল,
“ছাড়বি তুই। ভালো লাগছে না এসব আলোচনা শুনতে আমার।”
মৃদুল নিজেও পাল্টা রাগী গলায় বলল,
“তুইও এসব আজেবাজে কথা বলা ছাড়। সত্যি করে বল, পছন্দ করিস না তুই মৃত্তিকা কে? আমি কি তবে ভুল ছিলাম এতকাল? আমি জানি তোর বিয়ে টিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না কখনো। তবে ভেবেছিলাম হয়ত মৃত্তিকাকে পাওয়ার পর এখন তোর ধারনাটা বদলেছে। তবে কি আমার সেই ধারণা ভুল ছিল, সমীরণ?”
ছেলেটা যেমন খুব তাড়াতাড়ি রেগে যায় আবার খুব তাড়াতাড়ি শান্তও হয়ে যায়। এখন যেমন হুট করে রেগে গিয়েছিল। আবার হুট করেই শান্ত হয়ে গেল। আবারো চিত হয়ে শুয়ে সিলিং এর দিকে দৃষ্টিপাত করল। আনমনে কিছুক্ষণ নিজের মতন করে কি সব ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আমার দ্বারা সংসার হবে না, মৃদুল। আমাকে সংসারে আটকাতে পারবে না কেউ। আমার বাড়ির প্রতি কোন টান নেই, পরিবারের প্রতি আমার কোন টান নেই। পরিবার বলতে কি বোঝায় আমি সে সব জানি না। সংসারের মর্ম আমি কখনো উপলব্ধি করতে পারিনি। জীবনসঙ্গীর সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয়, কিভাবে তার সাথে সারাটা জীবন কাটাতে হয় এই ব্যাপারে আমার কোন ধারনা নেই, কোন জ্ঞান নেই। যদি আমার বাবা না থাকত দিন শেষে রাতেও হয়ত বাড়ি ফেরার তাড়া থাকতো না আমার। এই কারণে আমি আমার সাথে কারো জীবন জড়াতে চাই না। যদি আমি নিজেকে শেষে সংসারে বাঁধতেই না পারি। তবে তার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে।”
“তুই মৃত্তিকাকে পছন্দ করিস কিনা এই প্রশ্নের উত্তর এটা না। আমি সেই প্রশ্নের উত্তরটা চেয়েছি।”
“তোর সকল প্রশ্নের উত্তর এই একটাই। এই একটা উত্তরের মাঝে তোর সকল প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে। বুঝে নে ভাই। পছন্দ-অপছন্দ আমি বুঝিনা, বুঝতে চাইও না। তার কারণ আমি জানি নিজেকে আমি সংসারে বাঁধতে পারব না।”
__________
সকাল আটটা নাগাদ ঘুম ভেঙে গেল সমীরণের। চোখ খুলতেই দেখল পাশে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে মৃদুল। বেশ অনেক রাত পর্যন্ত গতকাল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে দুজন। শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েই না। বিভিন্ন আলতু ফালতু বিষয় নিয়েও কথা চলেছে। গল্প করতে করতেই রাত তিনটে বেজে গিয়েছিল। তারপরে ঘুমিয়েছে দুজনে। সমীরণ জানে মৃদুলের ঘুম এখন ভাঙবে না। ওর ঘুম থেকে উঠতে উঠতে আজ বারোটা বেজে যাবে। তাই সমীরণ হাত মুখ ধুঁয়ে ঘর থেকে বেরোলো।
মৃত্তিকাদের যৌথ পরিবার। ওর বাবারা তিন ভাই। বিশাল বড় ডুপ্লেক্স বাড়িতে তিন পরিবার একসঙ্গেই থাকে। তিন ভাইয়ের সন্তানদের মাঝে মৃত্তিকাই একমাত্র কন্যা এবং বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। বাকি ভাইদের পুত্র সন্তানই রয়েছে। বলা যায় বংশের একমাত্র মেয়ে হওয়ায় সবারই ভীষণ আদরের মৃত্তিকা। যার নমুনা সকালে ডাইনিং টেবিলে আরো একবার টের পেল সমীরণ।
টেবিলে হরেক রকমের পদ সাজানো। সমস্ত খাবারই যে মৃত্তিকার পছন্দের সেটা সমীরণ জানে। একে একে বাড়ির সবাই এসে বসছে নাস্তা করার জন্য। মৃত্তিকার পাশে ওর মা আর বড় আম্মু দাঁড়িয়ে আছে। দুজনে সমানে মৃত্তিকার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন। মৃত্তিকার মা আনিসা বেগম কখনো আবার নিজে খাইয়েও দিচ্ছেন। মৃত্তিকা বিরক্ত হচ্ছে ঠিকই তবে তারপরও কিছু করার নেই। এতদিন পরে এসেছে। এতটুকু সহ্য করতেই হবে।
আসার পথে মৃত্তিকার বাবা মনির সাহেব সমীরণ কে দেখতে পেয়ে সাথে করে নিয়ে এসে নিজের পাশের চেয়ারে বসালেন৷ আনিসা বেগম মৃত্তিকা কে রেখে এগিয়ে এলেন সমীরণের কাছে। প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলেন,
“মৃদুল ওঠেনি রে বাবা?”
“না চাচি। আসলে গতকাল ঘুমোতেই অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল।”
“ও আচ্ছা।”
সমীরণ খুব মনোযোগ সহকারে খেয়ে যাচ্ছে।
বুঝতে পারছে মাঝে মাঝে আড়চোখে নিজের খাওয়া থামিয়ে মৃত্তিকা ওর দিকে তাকাচ্ছে। তবে সমীরণ পাত্তা দিচ্ছে না। এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে যেন দিন দুনিয়া ভুলে নিজের সমস্ত মনোযোগ শুধুমাত্র খাবারের উপর নিবদ্ধ করেছে। ওর মনোযোগ আপাতত ক্ষুদ্র মৃত্তিকার উপরে দেওয়ার মতো সময় নেই।
খাওয়া-দাওয়ার এক পর্যায়ে মনির সাহেব জিজ্ঞেস করলেন সমীরণ কে,
“তোমার বাবা কেমন আছেন, সমীরণ? শরীর ভালো আছে তো নাকি?”
“আছে চাচা। ভালো আছে।”
“তা বিয়ে শাদী করবেনা নাকি? সারা জীবন কি বাবাকে দিয়েই রান্না করাবে। এবারে ঘরে কাউকে আনো। তোমার বাবা এবার একটু বিশ্রাম নেক তোমার দায়িত্ব অন্য কারোর হাতে অর্পণ করে।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য মৃত্তিকার খাওয়া থেমে গেল। মুখে অবশিষ্ট খাবারটুকু খুব কষ্টে গিলে নিল। সমীরণের দিকে তাকাল ওর অভিব্যক্তি বোঝার জন্য। বিয়ের কথা শুনে কি ছেলেটা খুশি হলো নাকি! তবে কিছুই বুঝতে পারল না। সমীরণ শব্দ করে একটু হাসল। অতঃপর মনির সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বিয়ে আমি করব না, চাচা।”
“ও মা! সে আবার কেমন কথা? বিয়ে কেন করবে না?”
“এমনিতেই। মেয়েদের ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনা। আর আমি হয়ত কখনো ঘরমুখো হতে পারব না। সংসারের প্রতি টান আসে না।”
পাশ থেকে মনির সাহেবের বড় ভাই মোহন সাহেব বলে উঠলেন,
“আগে সংসারে জড়াতে তো হবে। নয়ত সংসারের টান কি করে বুঝবে। আমরা কি আগে বুঝতাম নাকি সংসারের টান। তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নাও। তারপরে মৃদুলের বিয়েরও একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর আমাদের মৃত্তিকাও তো আছে।”
নিজের বিয়ের কথা শুনতেই মৃত্তিকার কাশি উঠে গেল। তাড়াহুড়ো করে আনিসা মেয়ের দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন। মৃত্তিকা কোনোমতে পানিটুকু পান করা শেষে মোহন সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“না না বড় আব্বু। আমি এখনই বিয়ে করছি না। আমার বিয়ের সময় আছে। এখনই আমার বিয়ে নিয়ে কেউ কিছু বলবে না। তোমরা মৃদুল ভাইয়ার বিয়ে দিয়ে দাও।”
সমীরন বলে উঠল,
“একদমই না। বড় আব্বু শুনুন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৃত্তিকার বিয়ের ব্যবস্থা করুন। যতদিন অবিবাহিত থাকবে ততদিন এমন আজেবাজে সম্বন্ধ আসতেই থাকবে। দিনকাল ভালো না। বলা যায় না কখন কাকে নিষেধ করলে তার আবার ইগোতে গিয়ে লেগে যায়। অশান্তিও তৈরি করতে পারে। যত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেবেন তত তাড়াতাড়ি ঝামেলা শেষ।”
মৃত্তিকা কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সমীরণের দিকে। ইচ্ছে করল গিয়ে দুহাতে ওর মাথার সবগুলো চুল টেনে টেনে ছিঁড়তে। জগে থাকা পানিগুলো সব সমীরণের মাথায় ঢেলে দিতে ইচ্ছে করল। সেই সাথে দু চারটে কিল লাগাতে পারলে শান্তি পেত।
সমীরণের কথায় আনিসা বেগমও সায় জানিয়ে বললেন,
“ঠিক বলেছিস সমীরণ। আমিও সবাইকে কত বলি যে মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দাও, বিয়ে দিয়ে দাও। কেউ শোনে না আমার কথা। বয়স তো কম হলো না। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে।”
কেউ আর কিছু বলার আগেই মৃত্তিকা চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“বললাম তো আমি বিয়ে করব না এখন। বিয়ে করব না মানে করব না এখন। আমার যখন ইচ্ছে হবে তখন বিয়ে করব। কেউ আর আমার বিয়ে নিয়ে একটা কথা তুললে আমি কিন্তু থাকবোই না এই বাড়িতে। এক্ষুনি চলে যাব।”
কথাটা বলে মৃত্তিকা সেখান থেকে চলে গেল নিজের ঘরে। পিছন থেকে সবাই ডাকল তবে মৃত্তিকা শুনল না। সমীরণ শুধু হাসল। কিভাবে যে এই মেয়েটাকে বোঝাবে সে যেই সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে সেই সময়টা হয়ত কখনো আসবেই না।
__________
সারাদিন আর মৃত্তিকা সমীরণের সাথে কথা বলেনি। সমীরণ বিকেলে মৃদুলের সাথে একটু আশপাশটা ঘুরতে বেরোলো। পাশের গ্রামে নাকি মেলা বসেছে। সেখানেই যাবে। যাওয়ার আগে মৃদুল গিয়ে কতবার করে মৃত্তিকাকে ডাকল। তবে মৃত্তিকা এল না। মৃত্তিকার ইচ্ছে ছিল যদি সমীরণ একবার ডাকে তবে সাড়া দেবে। তবে সমীরণ ডাকেনি। সেই অভিমানে আর মৃত্তিকার আসাও হলো না।
চারিদিকটা তখন অন্ধকার হয়ে পড়েছে। মেলার আমেজ বেশ জমজমাট। বিভিন্ন ধরনের স্টল বসেছে। ছেলে মেয়ে সবার ভিড়ে হাঁটাও যাচ্ছে না ঠিকমতো। মেলায় যেহেতু এসেছে কিছু খাবার দাবার তো নেবেই। মৃদুল গেল জিলিপি আর পাপড় কিনতে। সমীরণ গেল না ওর সাথে। ও গেল অন্যদিকে। হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানের কিছু চুড়ির দিকে নজর গিয়েছিল সমীরণের। মেয়েরা সেখানে দাঁড়িয়ে ভিড় করে কিনছে। সমীরণ ভাবল মৃত্তিকার জন্য চুড়ি কিনবে। অনেক বার করে নিজেকে আটকানোর চেষ্টাও করেছে। ভেবেছে কিনবে না। ও কেনই বা মৃত্তিকার জন্য চুড়ি কিনবে।
তবে শেষ পর্যন্ত নিজেকে আটকাতে পারেনি। মৃত্তিকা অভিমান করে আছে। ভাবল একটু না হয় অভিমান ভাঙাবে। খুব বড় তো কোন ক্ষতি হয়ে যাবে না তাই না?
এক ডজন চুড়ি পছন্দ করল সমীরণ। দোকানী চুড়ির সাইজ জিজ্ঞেস করতেই থতমত খেল সে। চুড়িরও আবার সাইজ হয় এই ব্যাপারে জানত না সমীরণ। দোকানী কে বর্ণনা দিল যে মেয়েটার হাত খুব বেশি মোটা না আবার চিকনও না। দোকানী বিরক্ত হলো। একেই তো ভিড় তার উপরে আবার এই ছেলে মশকরা করছে নাকি। এভাবে কখনো আন্দাজ পাওয়া যায়!
সমীরণ শেষে বাধ্য হয়ে মৃত্তিকার নাম্বারে কল লাগাল। এই মুহূর্তে সমীরণের নাম্বার থেকে কল আসা মৃত্তিকার জন্য কোন অলৌকিক ঘটনার থেকে কম নয়। হা করে তাকিয়ে রইল নাম্বারটার দিকে। কলটা কেটে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়ো করে রিসিভও করল। কানে ধরে গম্ভীর গলায় কিছু বলতেও পারল না। তার আগেই ভেতরটা নরম হয়ে এল সমীরণের প্রশ্নে।
“তোর চুড়ির সাইজ কত, মৃত্তিকা?”
“তুমি জেনে কি করবে?”
“তোর জন্য চুড়ি কিনব। দোকানদার সাইজ জানতে চাইছে। আমি তো এইসব জানি না।”
বিস্ময়ে মৃত্তিকার চোয়াল ঝুলে এল। মৃদু তুঁতলে বলল,
“তততুমি আমার জন্য চুরি ককিনবে?”
“এত ঢং না করে চুপচাপ চুড়ির সাইজ বল। খুব বেশিক্ষণ ধৈর্য কুলাবে না আমার। শেষে বিরক্ত হয়ে কিছুই নেব না।”
মৃত্তিকা তাড়াহুড়ো করে চুড়ির সাইজ বলতেই সমীরণ কলটা কেটে দিল। কেন যেন এই ছেলেটা বেশিক্ষণ মৃত্তিকা কে একটু হাসি খুশি থাকতেই দেয় না। নিজেই যেমন মৃত্তিকার মনটা ফুরফুরে করে দেয়। নিজেই আবার তেমনই বিষাদ ভরে দেয় মৃত্তিকার জীবনে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৃত্তিকা।
মিনিট পাঁচেক বাদে আবারো ওর ফোনটা বেজে উঠল। এবারে ভিডিও কল করেছে সমীরণ। হঠাৎ করে ভিডিও কল আবার কেন করল বুঝে উঠতে পারল না মৃত্তিকা। রিসিভ করার আগে নিজেকে একটু ঠিকঠাক করে নিল। ফোনটা রিসিভ করে সমীরণের মুখটা দেখা গেল না। স্ক্রিনে দুটো কানের দুলের ছবি ভেসে উঠেছে। সেইসাথে ভেসে এল সমীরণের কণ্ঠস্বর।
“কোনটা পছন্দ হয়?”
মেলায় এত ভিড়ভাট্টার মাঝে কথা শুনতে পাওয়াও বেশ কঠিন। সমীরণ বেশ জোরে বলায় হালকা পাতলা শুনতে পেল মৃত্তিকা। আজ ওর বিস্ময় যেন কমতেই চাইছে না। সমীরণের হলো কি আজ? চুড়ি কিনল, এখন আবার কানের দুলও কিনবে নাকি!
মৃত্তিকার থেকে কোন উত্তর না পেয়ে সমীরণ ভাবল বোধহয় শুনতে পায়নি। আবার জিজ্ঞেস করল,
“বললাম কোনটা পছন্দ হয়?”
মৃত্তিকা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে বলল,
“দুটোই তো ভালো লাগছে। তোমার যেটা ভালো লাগে সেটাই নাও।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। এবার এগুলো দেখ তো। কোন নুপূর ভালো লাগছে?”
বেছে বেছে সমীরণ তিন জোড়া নুপূর দেখাল মৃত্তিকা কে। ভিডিও কলে যদিও খুব একটা বেশি বোঝা যাচ্ছে না। তার উপরে আবার রাত হয়ে গেছে। তার উপরে আবার মৃত্তিকা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এত তাড়াতাড়ি পছন্দ করা যায় নাকি! আবার বেশি দেরি করলেও সমীরণ না রেগে যায়। সেজন্য ভয়ে ভয়ে বলল,
“আমি বুঝতে পারছি না। তোমার যেটা ভালো লাগে নিয়ে নাও।”
অপর পাশ থেকে সমীরণ বিরক্তি ভরা গলায় বলল,
“তাহলে তোকে আমি কল করে দেখালাম কি কারণে? আমার পছন্দ করে নেওয়ার হলে আমিই কিনে নিতাম। কি সমস্যা আমায় নিজের পছন্দ জানাতে?”
“সমস্যা কেন হবে। আসলে সবই সুন্দর। কোনটা রেখে কোনটার কথা বলব বুঝতে পারছিনা।”
কিছুক্ষণ নীরবতা চলল। ফোনের অপর পাশ থেকে অনেকটা সময় পর আবারো সমীরণের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“আচ্ছা ঠিক আছে। রাখছি।”
কথাটা বলে সমীরণ ফোনটা কেটে দিল। মৃত্তিকার বিষাদে ছেয়ে যাওয়া মন মেজাজ ফুরফুরে হয়ে উঠল। আজ প্রথম সমীরণ ওর জন্য চুড়ি, কানের দুল, নুপূর এসব কিনল। এর আগে অনেক কিছুই দিয়েছে। তবে এই ধরনের কোন কিছু কখনো কিনে দেয়নি। অন্তত নিজে পছন্দ করে তো কখনোই কিনে দেয়নি।
আচ্ছা এগুলো তো প্রেমিকরাই করে, তাই না? প্রেমিকাদের মন রক্ষার্থে, তাদের অভিমান ভাঙ্গাতে কিংবা নিজের ভালোবাসার প্রমাণ দিতে। তবে কি সমীরণ মৃত্তিকার প্রেমিক হয়ে উঠতে চাইছে! প্রেমিকের মতন করে ভালোবাসতে চাইছে!
চলমান।

