Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০৭

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০৭

0
6

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_৭
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

দুদিন পর ভার্সিটিতে আসায় দলীয় কাজ নিয়ে তুমুল ব্যস্ত মৃদুল। মৃদুলের সেই চরম ব্যস্ততার মাঝে শশী এলো ওকে ডাকতে। মৃত্তিকা নাকি ডেকেছে মৃদুল কে। শশীকে কারণ জিজ্ঞেস করলে শশী কারণটা বলল না। মৃত্তিকা নিষেধ করে দিয়েছে কারণ বলতে। ফলস্বরূপ বাধ্য হয়ে মৃদুল কে আসতেই হলো ওর সাথে।

ভার্সিটির পিছন দিকটায় পুকুর পাড়ে মৃত্তিকা তার সেই প্রিয় জায়গাটায় বসে আছে। দ্রুত-পায়ে সেখানে এল মৃদুল। ওর পিছন পিছন শশীও এসেছে। বেঞ্চের উপর মৃত্তিকার পাশে বসে মৃদুল নরম গলায় ডাকল ওর নাম ধরে,

“মৃত্তিকা!”

মৃদুলের কন্ঠটা চিনতে পেরে মৃত্তিকা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। এ কি অবস্থা করেছে মেয়েটা নিজের! চোখ মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। কেঁদে কেটে অবস্থা একেবারে খারাপ করে ছেড়েছে। কান্নার তোপে এখনো নাকের পাটা ফুলে উঠছে। ঠোঁট দুটো তিরতির করে কাঁপছে। দুচোখ বেয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে। মৃদুল কিছুই বুঝতে পারল না মৃত্তিকার এই কান্নার কারণ সম্বন্ধে।

“কি হয়েছে? কাঁদছিস কেন এভাবে? কে কি বলল আবার?”

প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করে মৃদুল সযত্নে বোনের চোখের জল মুছে দিল। সামান্য একটু আহ্লাদ পেতেই মৃত্তিকার কান্না বাড়লো। শব্দ করে কেঁদে উঠল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মৃদুল। একহাতে বোনকে আগলে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে আমায় বল? কে কি বলেছে? আমার বোনকে কাঁদানোর দুঃসাহস কে দেখিয়েছে বল আমায়?”

“তুমি..তুমি সমীরণ কে বলবে ও যেন আর আমার সামনে না আসে। তুমি ওকে স্পষ্ট করে বলে দেবে আমি ওর সাথে আর কথা বলবো না। ওকে বলে দেবে ওর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।”

“কিন্তু কেন? কি হয়েছে আবার? কি করেছ ও?”

“কিছু করেনি। কেউ কিছু করেনি। সব দোষ আমার। নিজের ভুল শুধরে নিচ্ছি আমি। তুমি ওকে বলে দেবে ও যেন আমার চোখের সামনে না আসে। আমি ওকে দেখতে চাই না। যা ইচ্ছে তাই করুক। যাকে ইচ্ছে তাকে উপহার দিক। আমি নেব না ওর উপহার। এতদিন যা কিছু নিয়েছি সেই সবকিছু ফেরত দিয়ে দেব ওকে। বলে দেবে ওকে আর যেন কখনো আমাকে চ ড়
মা র তে না আসে, ধমকা ধমকি করতে না আসে। তুমি বলে দিও যেন আর তুমি বলেও না ডাকে কখনো আমায়। আমি আর কথা বলব না সমীরণের সাথে। স্পষ্ট করে বলে দেবে ওকে, আমার উপরে ওর কোন অধিকার নেই।”

“তোর কথা আমি শুনব ভাবলি কি করে? সমীরণ কারো বাপের কথা শোনে না জানিস না?”

হঠাৎ করে কন্ঠটা কানে যেতেই মুহূর্তের মাঝে মৃত্তিকার কান্না থেমে গেল। মাথা তুলে তাকাতেই দেখল ওদের ঠিক সামনে সমীরণ দাঁড়িয়ে আছে। লাল টকটকে চোখ দুটো দেখতেই মৃত্তিকার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। সকালে তো বেশ গোছালো দেখেছিল মানুষটাকে। এখন কেমন যেন অগোছালো লাগছে দেখতে। কি ধারালো তার চোয়াল। এমন ভাবে তাকিয়ে আছে দেখে মনে হচ্ছে মৃত্তিকাকে খেয়ে ফেলবে।

তবে মৃত্তিকার মনে তো এখন অভিমান জমেছে। এখন না ভয় পাবে, না ভালোবাসা দেখাবে। সোজা হয়ে বসে দু হাতে চোখের জল মুছে নিয়ে মৃদুল কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ভাইয়া, তোমার বন্ধুকে বলে দাও আমি ওর সাথে কোন কথা বলব না।”

মৃদুল কিছু বলে ওঠার আগেই গম্ভীর গলায় সমীরণ মৃদুল কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মৃদুল, যা এখান থেকে।”

মৃদুল পড়ল ঝামেলায়। বোনের কথা শুনবে না বন্ধুর কথা শুনবে এই নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগল। কার কথা যে এখন শোনা উচিত, কার কথা শুনলে পরিবেশ ঠান্ডা হবে সেটা বুঝে উঠতে পারছে না। এসব ভাবনার মাঝে আবারো ওর কানে সমীরণের রাশভারি কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

“যেতে বললাম তো তোকে। তোর কানেও কি আমার কথা যাচ্ছে না আজকাল? তোর বোনকে মে রে ফেলবো না আমি একা পেয়ে। পাচারও করে দেব না। যা গিয়ে নিজের কাজ কর।”

মৃত্তিকা ভয় পেয়ে গেল সমীরণের এমন কণ্ঠস্বরে। মৃদুলের হাত টেনে ধরে বলল,

“ভাইয়া, তুমি যাবে না এখান থেকে। তুমি আমার ভাই। আমার কথা শুনবে। ওই গুন্ডার কথা শুনবে না।”

মৃদুল এবারে সত্যি মহাবিপদের মাঝে পড়ল। একদিকে মৃত্তিকার আকুতি, অন্যদিকে সমীরণের আদেশ। কোন দিকে যে যাবে! সব সময় এই দুটাের মাঝখানে মৃদুল ফেঁসে যায়। ওদের থেকে একটু দূরে শশী দাঁড়িয়ে ছিল। শশীর মনে হলো এখন মৃত্তিকা আর সমীরণ কে একা ছেড়ে দেওয়াই ভালো হবে। এগিয়ে এসে মৃদুল কে উদ্দেশ্য করে বলল,

“মৃদুল ভাইয়া, চলুন আমরা যাই এখান থেকে। ওরা দুজনে কথা বলুক। আমরা এখানে থেকে কি করব। চলুন তো।”

সবশেষে মৃদুল সমীরণের কথাই মানল। মৃত্তিকার অনুরোধ শুনল না। মৃদুল আর শশী সেখান থেকে উঠে চলে যাওয়ার পর ওদের পিছন পিছন মৃত্তিকাও যেতে ধরলে সমীরণ ওর হাত টেনে ধরল। এত শক্ত করে কব্জি চেপে ধরল যে মৃত্তিকা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে বলল,

“ব্যথা লাগছে তো আমার। ছাড়ো।”

“আমাকে ব্যথা দেওয়ার সময় হুঁশ থাকে না? তোর ব্যথা তো সেরে যাবে। আমার কলিজায় যে আঘাত করেছিস সেই ব্যথা সারবে কি করে?”

মৃত্তিকা শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সমীরণের দিকে। এই ছেলেটার কথার মানেই বোঝে না মৃত্তিকা। কখন আবার কলিজায় গিয়ে আঘাত করল? মানুষটাকে তো নিজের কাছেই পায় না।

সমীরণ জোর করে মৃত্তিকাকে আবার বেঞ্চের ওপর বসিয়ে দিল। হাতে থাকা শপিং ব্যাগটা উপুড় করতেই বেঞ্চের উপরে শপিং ব্যাগের ভেতর থেকে সেদিনকার মেলা থেকে কেনা জিনিসপত্র গুলো বেরিয়ে এল। সমীরণ সেগুলো মৃত্তিকার দিকে ঠেলে দিয়ে বলল,

“ধর নে। এগুলোর জন্যই তো এত সমস্যা।”

মৃত্তিকা সেগুলো আবার সমীরণের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল,

“লাগবে না। বলেছিলাম তো যা অন্যের তার দিকে আমি চোখ তুলেও তাকাই না। যেটা আমার সেটা শুধুই আমার। যাও এগুলো দিয়ে এসো তোমার বিশেষ মানুষকে।”

সমীরণ রাগে চিৎকার করে উঠে বলল,

“আরে কেউ নেই আমার তুই ছাড়া। তোর জন্যই কিনেছিলাম। কেনার পরে মনে হয়েছিল তোকে এত কিছু দেওয়া উচিত হবে না। প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে যাবে। দূরে সরাতে চেয়েছিলাম তোকে সেই জন্য বলেছিলাম ঐ কথাগুলো। আর তুই এই সামান্য চুড়ি আর নুপূরের জন্য তোর উপর থেকে অধিকারই তুলে নিলি! এই দুঃসাহস হলো কি করে তোর? সামান্য কটা জিনিসের জন্য আমার সাথে তোর সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল! বাহ্। খুব ভালো।”

কথাটা বলে বেঞ্চের ওপর থেকে জিনিসপত্রগুলো সব ছুঁড়ে ফেলল মাটির উপরে। তারপরে নিজে ধপ করে বসে পড়লো ওর পাশে। সমীরণের মাথায় যে এখন
আ গু ন জ্বলছে সেটা মৃত্তিকা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে। শরীরের র ক্ত শুধু টগবগিয়ে ফুটছে।

মৃত্তিকার এখন একটু ভয় হচ্ছে সমীরণকে দেখে। অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে বলল,

“এগুলো আমাকে দাও নি সেজন্য ওই কথাগুলো বলিনি। তোমার জীবনে বিশেষ কেউ আছে সেই জন্য বলেছি।”

কোন উত্তর দিল না সমীরণ। চুপচাপ বসে রইল। আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। বেশ অনেকক্ষণ আগে সাদা আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। টিপটিপ করে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে পড়তে হঠাৎ করেই তুমুল বেগে বৃষ্টি এল। মৃত্তিকা তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“চলো চলো। বৃষ্টি এসেছে।”

মৃত্তিকা চলে যেতে ধরলে সমীরণ ওর হাত টেনে ধরল। বেশ নির্জীব দেখাচ্ছে সমীরণ কে। ভিজে যাচ্ছে তাতেও কিছু যায় আসে না। মৃত্তিকার হাত ধরে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে বলল,

“আমার পাশে দু দন্ড বস।”

সমীরণ সচরাচর এমন আবদার করে না। আজ করল। মৃত্তিকা কি ফেলতে পারে নাকি! একদিন না হয় একটু ভিজল বৃষ্টিতে। এই অনিয়মের ফলে না হয় একটু গা কাঁপিয়ে জ্বর এল। দু’চারটে নাহয় হাঁচি ফেলবে। হয়ত কয়েকদিন খাবারের প্রতি অরুচি হবে। হোক না সেসব। তবুও মানুষটার আবদার পূরণ হোক।

বেশ অনেকটা সময় এভাবে দুজন চুপচাপ বসে রইল। দুজনেই ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। সমীরণ এখনো ওঠার নাম নিচ্ছে না। মৃত্তিকা যে উঠবে তারও কোন উপায় নেই। হাতটা টেনে ধরে এখনো বসিয়ে রেখেছে। অনেকটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর উপায় না পেয়ে মৃত্তিকা নিজেই আবারো বলে উঠল,

“ভিজে যাচ্ছি তো। চলো এখান থেকে।”

“ভিজতে দে মৃত্তিকা। দুটো মিনিট একটু বস আমার পাশে। একবার আমার বুকে হাত রেখে দেখ কতটা অশান্ত হয়ে আছে সেই জায়গাটা। আমার র ক্তা ক্ত হৃদয়কে একটু ভিজতে দে। নিজেকে সামলাতে না পারার অস্থিরতা, তোকে হারিয়ে ফেলার ভয়, নিজেকে তোর মাঝে বিলীন করে দেওয়ার রাগ সব মিলিয়ে আমার অন্তরটা জ্ব ল ছে। আমার অন্তরটাকে একটু শান্ত হতে দে।”

সমীরণের কন্ঠটা খুব শান্ত শোনাল। নির্জন রাত্রির অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের মতন শান্ত। তবে কথার গভীরতা যে অনেক তা একটু হলেও মৃত্তিকা অনুধাবন করতে পারল।

“আমার মাঝে আবার নিজেকে বিলিয়ে দিলে কবে? আমি তো কখনো তোমাকে নিজের সত্তার মাঝে খুঁজেই পেলাম না।”

“তুই কখনো খুঁজে পেতে চাসনি আমাকে। অথচ নিজের এই ভুলের জন্য আমি রোজ পস্তাই। রোজ নিজেকে গালাগাল করি। নিজেকে সামলানো উচিত ছিল আমার।”

“বেসামাল তো কখনো হতে দেখিনি আমি তোমায়।”

এতক্ষণে সমীরণ তাকাল মৃত্তিকার দিকে। ছেলেটার চোখদুটো এখনো লাল হয়ে রয়েছে। নাক মুখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। মৃত্তিকার মনে একটা সন্দেহ জাগল। আচ্ছা, এই বৃষ্টির পানির সঙ্গে কি সমীরণের চোখ দিয়েও কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে?

মৃত্তিকার তাকিয়ে থাকার মাঝেই সমীরণ আবারো পূর্বের মতন শান্ত গলায় বলল,

“তুই যেন বেসামাল হয়ে না পড়িস তাই নিজের সমস্ত বেসামাল অনুভূতি কে তোর থেকে আড়াল করে রেখেছি। বুঝতে পেরেছিস? অনেক কিছুই তোর আড়ালে হয়েছে যা টের পাওয়ার সাধ্য তোর কখনোই ছিল না। আমি না চাইলে তুই টের পাবিও না কখনো।”

বলার মতন মৃত্তিকা কিছু খুঁজে পেল না। সমীরণের থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে উঠে গিয়ে সেই কানের দুল, নুপূর, চুড়ি সবকিছু আবার তুলে আনলো। কাঁদা মাটিতে খানিকটা মেখে গেছে সেগুলো। মৃত্তিকা নিজের ভেজা ওড়না দিয়ে সেগুলো মুছে মুছে পরিষ্কার করে নিল।

“আমি ক্লাস টেনে পড়াকালীন আমাকে একটা টিপের পাতা এনে দিয়েছিলে, মনে আছে? জানো আমি সেই টিপের পাতা থেকে একটা টিপও কখনো ব্যবহার করিনি। মনে হয়েছে ব্যবহার করলেই তো শেষ হয়ে যাবে। তার থেকে বরং যত্ন করে রেখে দেব। আমার কাছে আজও সেটা আমার আলমারির বাম পাশের ড্রয়ারে রাখা আছে। সেই বাম পাশের ড্রয়ার তোমার দেওয়া জিনিসে ভরা, জানো কি তুমি? তোমার দেয়া প্রত্যেকটা কলম, ডায়েরী, টিস্যু পেপার এমনকি চকলেটের কাগজগুলোও রেখে দিয়েছি। তুমি যে রঙিন কাগজে মুড়িয়ে আমাকে উপহার দিতে সেই রঙিন কাগজগুলোও আমি রেখে দিয়েছি।”

কথাগুলো বলে মৃত্তিকা হাসল। সমীরণ অবাক হলো না। ও জানে এই বিষয়গুলো। মৃত্তিকা কখনো না বললেও জেনেছে। একটু বিরতি নিয়ে মৃত্তিকা আবারো বলল,

“মনে আছে, একবার অংক পারছিলাম না জন্য তুমি আমাকে স্কেল দিয়ে মে রে ছি লে রাগের মাথায়। যদিও খুব জোরে মা রো নি। পরে যখন অপরাধবোধ হলো তখন নিজের হাতে নিজেই সেই স্কেল দিয়ে মা র তে
মা র তে স্কেলটা ভেঙে ফেলেছিল। সেই ভাঙা স্কেলটাও আমি রেখে দিয়েছে। কেন জানো? কারণ সেদিন প্রথম অনুধাবন করতে পেরেছিলাম তুমি আমায় কষ্ট দিতে পারো না। আমার কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারো না।”

“তবুও দিয়েছিলাম তো তোকে কষ্ট। রাগের মাথায় বারবার কষ্ট দিয়েছি আমি তোকে, ভুলে যাস না মৃত্তিকা।”

“ভুলিনি তো। সেই মানুষটা যে আমাকে আগলে রেখেছে সেটাও আমি ভুলিনি। যে ভালোবাসে তার শাসন করার অধিকার থাকে।”

অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস ছাড়ল সমীরণ। নিজের হৃদয়টাকে শান্ত করার একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। অতঃপর মৃত্তিকার দিকে ঘুরে বসে বলল,

“শোন মৃত্তিকা, আমি একটা জঘন্য ছেলে। রাগ উঠলে আমি নিজের মাঝে থাকি না। আমার নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মেয়েদের প্রতি নম্রতা আসেনা আমার। আমার মাঝে কোমলতা, দয়া, মায়া, ভালোবাসার ছিটে ফোঁটাও নেই। আমার জীবনের কোন নিয়ম নেই। আমার জীবনের কোন পিছুটান নেই। আমার বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে নেই। আমি দায়সারা ভাবে থাকতে পছন্দ করি। দায়িত্ব নিয়ে পালন করতে না পারার ভয়ে আমি দায়িত্ব নিতেই পছন্দ করি না। আজও আমি রাগারাগি করছি তোকে ভালোবাসি বলে নয়। বরং তোর ওপর আমার অধিকার নেই এর জন্য। ভালো-টালো বাসিনা আমি। সর্বোপরি একটাই কথা বলব, আমি মানুষটা খুবই খারাপ, বুঝতে পেরেছিস?”

“আর এই খারাপ মানুষটাকেই আমি ভীষণ ভালোবাসি।”

থমকাল সমীরণ। মৃত্তিকার অনুভূতির কোন কিছুই লুকোনো ছিল না সমীরণের কাছে। মেয়েটা ভীষণ বোকা। সবকিছু প্রকাশ করে ফেলত। তবে কখনো সরাসরি এই কথাটা বলেনি যে সমীরণ কে ভালোবাসে। আজ বলে ফেলল। কিন্তু এই কথাটা বলে যে মেয়েটা অনেক বড় অপরাধ করল।

সমীরণ নিজেকে চটজলদি সামলে নিয়ে বলল,

“ঠিক করিসনি ভালোবেসে। শোন, আমি তোর ভালো চাই। আমি চাই তুই খুব ভালো থাক। যে ভালোটা তুই আমার সাথে থেকে পাবি না। আমার কষ্ট হলে হোক। তবুও তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি। দ্বিতীয় দিন আর কখনো এই কথাটা বলবি না যে আমাকে ভালোবাসিস, বুঝতে পেরেছিস? আমি কারণে অকারণে যখন তখন তোকে কষ্ট দিয়ে ফেলতে পারি। এই কষ্টটাকে সারা জীবনের জন্য স্থায়ী করিস না। আজ ভালো লাগছে কারণ এই কষ্টটা তোর কাছে ক্ষণস্থায়ী মনে হচ্ছে। কিন্তু যখন সারা জীবনের মতন তোর সাথে জড়িয়ে যাব তখন আর ভালো লাগবে না। আমার কষ্ট হোক তবুও তুই নিজের সুখ অন্যের মাঝে খুঁজে নে। আমার মাঝে না। যার নিজের জীবনের প্রতি কোন টান নেই সেই মানুষটা অন্যের জীবন তার সাথে জড়াতে চায় না মৃত্তিকা, এতোটুকু বুঝে রাখ।”

কথাগুলো বলে সমীরণ সেখানে এক মুহূর্ত বসল না। মৃত্তিকা কে অমনি ফেলে রেখে চলে গেল সেখান থেকে।

মৃত্তিকা ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সমীরণের যাওয়ার পথে। হাসলও আবার। মানুষটা আজ আবারো প্রমাণ করে দিয়ে গেল সে ঠিক কতটা নিষ্ঠুর। সমীরণ একদমই ঠিক বলেছে ওর মাঝে মায়া, দয়া, স্নেহ, ভালোবাসা কিচ্ছু নেই। তবে সমীরণ যেটা করতে বলে গেল সেটা কি করে করবে মৃত্তিকা? এতদিনেও কি সমীরণ বোঝেনি মৃত্তিকার সমস্ত ভালোবাসা শুধু সমীরণের জন্য?

__________

মেসে ফেরার পথে আজ আচমকা মৃত্তিকার দেখা হয়ে গেল শাফায়েতের সাথে। শাফায়াতই মৃত্তিকাকে দেখে গাড়িটা থামিয়েছিল। শাফায়াতের ব্যবহার চমৎকার। যেকোনো মেয়ে অনায়াসে গলে যাবে তার ভদ্রতা আর শিষ্টাচারে। তবে মৃত্তিকার অস্বস্তি হয়। আগে ভালো লাগত। তবে যবে থেকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছে তবে থেকে দেখলেই অস্বস্তি হয়।

সেই মানুষটাই আজ আবার মৃত্তিকাকে জোর করছে একটা ক্যাফেতে যাওয়ার জন্য। ওর সাথে নাকি জরুরী কথা আছে।

মৃত্তিকা প্রথম দিকে রাজি হয়নি। তবে শাফায়াতের অধিক জোড়াজুড়িতে শেষে রাজি হতে বাধ্য হয়েছে। অবশ্য ক্যাফেতে আসতে রাজি হয়েছে সঙ্গে শশী থাকার কারণে। একা থাকলে কখনোই আসতো না।

“চা, কফি কি অর্ডার করব মৃত্তিকা?”

মৃত্তিকা কোন গভীর ভাবনায় ছিল। শাফায়াতের কন্ঠে ধ্যান ভাঙল। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কিছু লাগবে না, স্যার। আমি কিছু খাব না।”

“ইউ ক্যান কল মি শাফায়াত।”

মৃত্তিকার অস্বস্তি তড়তড় করে বাড়ল। তবুও খুব কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,

“না না। আপনাকে কিভাবে নাম ধরে ডাকব। স্যারই ঠিক আছে।”

শাফায়েত জোর করল না। ছেলেটা নিতান্তই ভদ্র। কারো যেন ওর জন্য অস্বস্তি না হয় সেই বিষয়ে ভীষণ সতর্ক।

“ঠিক আছে। আচ্ছা আমি তিন জনের জন্য কোল্ড কফি বলছি।”

শশী আর মৃত্তিকা দুজনেই আপত্তি জানাল। তবে এই ব্যাপারে শাফায়াত শুনল না। অর্ডার দেওয়া শেষে মৃত্তিকা আগে জিজ্ঞেস করল,

“কেন এখানে আনলেন? কি কথা আছে?”

“তুমি জানো মৃত্তিকা কেন ডেকেছি।”

মৃত্তিকা যদিও আন্দাজ করতে পেরেছে তবু অস্বীকার করে বলল,

“না স্যার। বুঝতে পারছি না। একটু তাড়াতাড়ি বললে ভালো হয়।”

“আমাকে অপছন্দের কারণ জানতে পারি? আমার ব্যাপারে তোমার কি পছন্দ নয় বলতে পারো। আমি নিজের সেই অভ্যাসটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করব।”

মৃত্তিকা সঙ্গে সঙ্গে নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। টেবিলের নিচ দিয়ে শশীর হাতটা খামচে ধরল। এই ছেলের দৃষ্টি ভয়াবহ। সেই যে আসার পর থেকে এক নজরে তাকিয়ে আছে না আছে অন্য কোন দিকে চোখই যায় না তার। মৃত্তিকা বাদেও তো আশেপাশে অনেক কিছু আছে। সেদিকে তার চোখ যায় না।

মৃত্তিকার থেকে কাঙ্খিত উত্তর না পেয়ে শাফায়াত আবারো জিজ্ঞেস করল,

“কি হলো বল কেন অপছন্দ আমাকে তোমার?”

“অপছন্দ যে তেমন কোন ব্যাপার না।”

“তাহলে পছন্দ?”

“স্যার হিসেবে।”

“জীবন সঙ্গী হিসেবে কেন নয়?”

“অন্য কাউকে পছন্দ তাই।”

এই উত্তরটাই আশা করেছিল শাফায়াত। মৃত্তিকা যে কাকে পছন্দ করে সেই বিষয়েও আন্দাজ আছে শাফায়াতের। তবে তার পরিচয় আর তুলল না।

“আমি তার মতন হলে আমাকে পছন্দ করবে?”

এবারে মাথা তুলে তাকাল মৃত্তিকা। আলতো একটু হেসে বলল,

“আপনি চাইলেও কখনো তার মতন হতে পারবেন না। কেউই হতে পারবেনা। ইনফ্যাক্ট কেউই কখনো কারো মতন হতে পারে না, স্যার। প্রত্যেকটা মানুষের স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব রয়েছে। আপনি কেন অযথা আমার জন্য নিজস্ব ব্যক্তিত্ব হারাবেন।”

“কারণ তুমি আমার জন্য ইমপর্টেন্ট।”

“কিন্তু আপনি আমার জন্য ইমপর্টেন্ট নন। দেখুন আমাদের সম্পর্কের মাঝে একটা লিমিট থাকা উচিত। আমরা সেই লিমিট ক্রস করে যাচ্ছি। আপনার সাথে ক্যাফেতে বসে এই ধরনের বিষয়গুলো আলোচনার মত সম্পর্ক আমার নয়, স্যার। আপনি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছেন। আজকে প্রথম দিন জন্য আপনার সাথে এসেছি। তাই আমার অনুরোধ থাকবে আর কখনো এমন কোন প্রস্তাব দেবেন না আমাকে যাতে আমি আপনাকে নিষেধ করতে বাধ্য হই।”

কথাটা বলে মৃত্তিকা উঠে যেতে নিলে শাফায়াত অনুরোধের স্বরে বলল,

“আর দুটো মিনিট বসো মৃত্তিকা। প্লিজ!”

অনিচ্ছা সত্ত্বেও মৃত্তিকা বসল। তাড়া দিয়ে বলল,

“একটু তাড়াতাড়ি বলুন।”

“আচ্ছা আমরা কিছুদিন একসাথে সময় কাটাতে পারি না! আমাকে তুমি একটু সময় তো দিতে পারো যেন আমি তোমাকে বোঝাতে পারি যে আমি তোমাকে সত্যি পছন্দ করি, তাই না? দুজন দুজনকে চিনি। তারপরে না হয় তুমি সিদ্ধান্ত নিও।”

“এই সিদ্ধান্ত অনেক বছর আগেই আমি নিয়ে নিয়েছি যে যদি কখনো বিয়ে করি তবে তাকেই করব। নয়ত আর কাউকে নয়। আর টাইম পাস ব্যাপারটা আমার একদমই পছন্দ না। তাও আবার নিজের স্যারের সাথে। ব্যাপারটা অত্যন্ত নিম্ন মানসিকতার পরিচয় দেয়।”

“তোমার জন্য ইতোমধ্যে আমি নিজের ব্যক্তিত্ব ভুলে অনেকটাই নিচে নেমে এসেছি, মৃত্তিকা। স্টুডেন্টের পিছু ঘুরে তাকে সমানে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে যাওয়া এবং বারবার রিজেক্ট হওয়া আমায় তুমুলভাবে অপমান করছে।”

“তাহলে থেমে যান। আর অপমানিত হতে হবে না। আই এম রিয়েলি সরি স্যার কিন্তু আমি আপনার প্রস্তাবে রাজি হতে পারছি না। আসছি।”

কথাটা বলে শশীকে নিয়ে উঠে চলে গেল সেখান থেকে মৃত্তিকা। শাফায়াত বসে রইল সেখানে।

বারবার তুচ্ছ একটা ছেলের কাছে হেরে যেতে শাফায়াতের একদমই ভালো লাগছে না। মাঝে মাঝে রাগ হচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার হতাশ লাগছে। কি আছে সমীরণের মাঝে যা মৃত্তিকা কে শাফায়াতের হতে দিচ্ছে না? ছেলেটা সবদিক দিয়ে শাফায়াতের থেকে পিছিয়ে আছে। তবুও কেন বারবার জিতে যাচ্ছে সমীরণ!

চলমান।