#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_৯
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার
মৃদুলকে আজ অনেকদিন পর একটু ফাঁকা পাওয়া গেছে। ব্যস্ততা নেই তেমন একটা। চারজনে মিলে মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল। একটু আগে সমীরণ উঠে গিয়েছিল সেই আড্ডা থেকে। কেন উঠে গিয়েছিল বলেনি। কিছুক্ষণ পর চারটা আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এল সেখানে। মৃদুল আর শশীর হাতে একটা করে আইসক্রিম দিয়ে বাকি দুটো পলিথিন সমেত মৃত্তিকার দিকে ছুঁড়ে মে রে বলল,
“গিলে নে।”
মৃত্তিকা পলিথিনের ভেতর থেকে একটা আইসক্রিম বের করে সমীরণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“একটা তুমি নাও।”
“এসব বা ল ছা ল খাই না আমি।”
মৃত্তিকা চোখ ছোট ছোট করে সমীরণের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“সিগারেট খেতে পারো, আইসক্রিম খাও না। আইসক্রিমের বেলায় বা ল ছা ল?”
সমীরণ বেশ গর্বের সাথে বলল,
“পুরুষ মানুষ হয়ে যদি সিগারেটে দু-একটা টানই না বসাতে পারলাম তাহলে সেই পুরুষত্ব দিয়ে লাভ কি। আইসক্রিম খায় নেকু বাচ্চারা। চেটে চেটে আইসক্রিম খাওয়ার বয়স আছে নাকি আমার। তোকে গিলতে দিয়েছি চুপচাপ গিলে নে। তোর তো ন্যাকামো ফুরোয় না।”
মৃদুল সবেমাত্র আইসক্রিমটা খেতে শুরু করেছিল। তবে সমীরণের মুখে এমন পুরুষত্বের কথা শুনে থেমে গেল। বুঝে উঠতে পারল না খাওয়া ঠিক হবে কি হবে না। এখন যদি চেটে চেটে আইসক্রিম খায় তবে কি ওর পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাবে?
উত্তরটা জানার জন্য ভীষণ কৌতুহল হলো মৃদুলের। যেই না সমীরণ কে জিজ্ঞেস করতে যাবে অমনি কোত্থেকে যেন একটা মেয়ে হুড়মুড়িয়ে এসে ওর পায়ের কাছে পড়ল। মৃদুল চমকে পিছিয়ে গেল। বুকটা এখনো ধক ধক করছে।
প্রথমে ভেবেছিল বোধহয় পায়ের কাছে কোন বোম এসে পড়ল। পরে তাকিয়ে দেখল এ তো কোন বোম না। এটা তো মৃদুলের প্রাক্তন প্রেমিকা লরিন। যে বছর দেড়েক আগে এক বড় নেতা কে পেয়ে মৃদুল কে ছেড়ে দিয়েছিল। এই মাল আবার এতদিন পর কেন এল? তাও সরাসরি এসে পায়ে পড়ছে।
মৃদুল কিছু জিজ্ঞেস করারও সুযোগ পেল না। তার আগেই লরিন হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“প্লিজ আমায় ক্ষমা করে দাও মৃদুল। আমি যা করেছি খুব বড় ভুল করেছি। এখন আমি বুঝতে পারি তোমার মতন করে আমায় কেউ ভালোবাসতে পারবেনা। পুরনো কথা ভুলে গিয়ে আবার নতুন করে শুরু করি চলো না।”
শশী আর মৃত্তিকা বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে ওদের দুজনকে। মৃত্তিকার পাশে বসা সমীরণের মাঝে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না। এইসব ব্যাপারে বিন্দুমাত্র কোন আগ্রহ নেই ওর। তাই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে একটা সিগারেট নিয়ে তাতে আ গু ন ধরিয়ে ঠোঁটের ভাঁজে রাখল।
সিগারেটের উটকো গন্ধ মৃত্তিকার নাকে যেতেই পাশ ফিরে তাকাল। দেখল সমীরণ মনের সুখে সিগারেট টানছে। ব্যাপারটা একদমই পছন্দ হলো না মৃত্তিকার। সিগারেটের গন্ধটা সে সহ্য করতে পারে না। অথচ এই ছেলেটার পুরো শরীর থেকে সারাদিন সিগারেটের গন্ধই আসে। সমীরণের ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সিগারেটটা টেনে বের করে দুরে ছুঁড়ে ফেলল।
প্রথম দফায় সমীরণ ভরকাল। হা করে কিছুক্ষণ মৃত্তিকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বিস্মিত গলায় বলল,
“এটা কি করলি তুই?”
“যা করা উচিত তাই করেছি। কোন ভদ্রতা নেই তাই না? পাশে মেয়ে বসে আছে অথচ নিজের শালীনতা বজায় রাখতে পারে না। সেই তুমি আবার পুরুষত্ব নিয়ে কথা বলছো। বা লে র পুরুষ তুমি।”
“ঠাটিয়ে লাগাবো কানের নিচে একটা। সেই তখন থেকে কিসব ভাষা বলছিস। আর একবার যদি তোর মুখে এসব আজেবাজে কথা শুনেছি মে রে দাঁত ভেঙে রেখে দেবো।”
আজও সমীরণ শুধু চ ড় মা রা র জন্য হাতটা ওঠালো। তবে চ ড় আর মা র লো না। সমীরণের দুর্বলতা গুলো দিন দিন মৃত্তিকার সাহস ভীষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাহস না বাড়লে কি মৃত্তিকা পারত সমীরণের ঠোঁটের ভাঁজ থেকে সিগারেট কেড়ে নিতে! এ তো একেবারে সিংহের গুহায় গিয়ে তার শিকার কেড়ে নিয়ে আসার মতন ব্যাপার। তবে ওরা দুজনে আর কোনো তর্ক বিতর্কে জড়াতে পারল না। তার আগেই আবারো লরিনের ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বর ভেসে এল ওদের কানে। আকুতির স্বরে মৃদুল কে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মৃদুল প্লিজ ক্ষমা করে দাও না আমায়। আমি লয়াল হয়ে যাবে এবারে। চলো বিয়ে করে নেই আমরা।”
কথাটা বলে লরিন এগিয়ে গেল মৃদুলের হাত ধরার জন্য। মৃদুল এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল,
“কি শুরু করেছ। বললেই হলো নাকি। তোমাকে ভুলে গিয়েছে আমি। আর কোন ভালো টালো বাসিনি আমি তোমায়। বিরক্ত করো না আমায়।”
লরিন মানলো না। উঠে দাঁড়িয়ে মৃদুলের দিকে এগিয়ে যেতে ধরলে মৃদুল ছিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো। সাবধানী গলায় বলল,
“ভুলেও আমার কাছে ঘেষবেনা। দেখো তুমি যা চাইছো সেটা সম্ভব হবে না। গেট আউট।”
লরিন সমানে আকুতি মিনতি করেই যাচ্ছে। বারবার নিজের ভুল স্বীকার করছে। সেই সাথে এও বলছে যে আর কখনো এমন হবে না। খুব ভালো বউ হয়ে দেখাবে। কিন্তু মৃদুল মানতে পারছে না।
সমীরণ শুরু থেকে একটা ব্যাপার খেয়াল করছে লরিন আসার পর থেকে মৃদুল যেন ভয়ে কাঁপছে। স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে পারছে না। তোতলাচ্ছে। এইতো সমীরণ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মৃদুলের হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। যদিও আজ গরম পড়েছে ঘামাটা স্বাভাবিক। তবে মৃদুল অস্বাভাবিক রকম ঘামছে। চোখে মুখে কি আতঙ্ক ফুটে উঠেছে।
কিন্তু লরিনের উপস্থিতিতে এমনটা তো হওয়ার কথা না। বরং এতক্ষণে মৃদুলের চেঁচামেচি করা উচিত ছিল। লরিনকে আচ্ছামত কথা শোনানোর কথা ছিল। কিন্তু ছেলেটা সেসব না করে কাঁপছে কেন?
অনেকটা সময় মৃদুলের কাঁপাকাঁপি সহ্য করার পর আর চুপচাপ বসে থাকতে পারল না সমীরণ। ওর বন্ধু কিনা একটা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কাঁপছে। ছিঃ।
উঠে দাঁড়িয়ে সজোরে মৃদুল এর পিঠে একটা কিল বসিয়ে বলল,
“কাঁপছিস কেন? যা ইচ্ছে বল। ভুলে গেছিস কিভাবে তোকে কষ্ট দিয়েছিল, অপমান করেছিল? আজ বদলা নে।”
মৃদুল কম্পিত গলায় বলল,
“আমার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। তুই ওকে যেতে বল এখান থেকে। এক্ষুনি যেতে বল। আর ওকে আমাদের এসব পুরোনো প্রেম কাহিনী শোনাতে নিষেধ কর। সমস্যা হয়ে যাবে কিন্তু।”
সমীরণ দাঁত কিড়মিড়িয়ে কিছু বলে ওঠার আগে লরিনই আবার বলে উঠল,
“মৃদুল প্লিজ এমন করো না। আমি তোমার দেওয়া চিঠিগুলা এখনো রেখে দিয়েছি আমার কাছে। তোমার মনে আছে তুমি রোজ আমায় বলতে ভালোবাসো। আমি জানি সেই ভালোবাসা এত তাড়াতাড়ি মুছে যেতে পারে না। তোমার হৃদয়ে আজও আমার নাম লেখা আছে। আমার শরীর মন আমি সব তোমার নামে করে দিতে চাই।”
লরিন নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করতে না করতেই সমীরণ ধমক দিয়ে বলে উঠল,
“এই মেয়ে চুপ করো তো। তোমার মনই চাইছে না আবার এসেছে শরীর বিলিয়ে দিতে। এসব সস্তা জিনিস সস্তা জায়গায় গিয়ে বিলিয়ে দাও। এখানে এসব এ কাজ হবে না। আপাতত চোখের সামনে থেকে দূর হও।”
লরিন অনেকক্ষণ যাবৎ বিভিন্ন ভাবে অনুরোধ করল। তবে কোন কাজ হলো না। একসময় গিয়ে মৃদুল সমীরণের পিছনে লুকোলো। কে জানে কার থেকে বাঁচতে চাইছে। শেষে অনেক অনুরোধের পরেও যখন কাজ হলো না বাধ্য হয়ে লরিন বিদায় নিল।
___________
সেই যে ভার্সিটির মাঠে লরিন কে নিয়ে একটা ঝামেলা হলো তারপর থেকে মৃদুলের দেখা পায়নি সমীরণ। মৃত্তিকাকে জিজ্ঞেস করেছিল সেই মেয়েটাও জানে না কিছু। মৃত্তিকা তো নিজেই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল ভার্সিটি থেকে। আজ একবারের জন্য সমীরণের সাথে যেতেও চাইল না। ভাব বেড়েছে মেয়েটার। হয়ত সমীরণের ইচ্ছে অনুযায়ী একা একা চলতে শিখছে।
বাইক নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বিকেল হয়ে গেল। মৃদুল কে কয়েকবার কল করেছিল তবে পেল না ফোনে।
সমীরণ একাই নিজের একটা প্রিয় জায়গায় এল। এই জায়গাটা বরাবরই সমীরণের ভীষণ প্রিয়। এখানকার একটা চায়ের স্টলে বসলে একনাগারে কমপক্ষে তিন কাপ চা শেষ না করে ছেলেটা ওঠে না। তারপর চা শেষ করে আশেপাশে একটু হাঁটাহাঁটি করে। অনেক গাছপালা আছে এখানে। পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজে মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে বেশ কিছুটা দূরে একটা ছেলের উপরে নজর পড়ল সমীরণের। ছেলেটা কান ধরে উঠবস করছে। কিন্তু কেন?
কৌতূহল বশত সেদিকে এগিয়ে গেল সমীরণ। একটু এগিয়ে যেতেই নজরে পড়ল একটা মেয়েকে। মেয়েটার হাতে একটা স্কেল। সেই স্কেলের ইশারায় ছেলেটাকে উঠতে বললে উঠছে, বসতে বললে বসছে।
বিরক্তিতে সমীরণের সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল। যে মেয়ে মানুষের বিশ্বাস ই নেই সেই মেয়ে মানুষের জন্য আবার এমন জন সম্মুখে কান ধরে উঠ বস করছে। আসলে এসব ছেলেদের কোন আত্মসম্মান নেই। আচ্ছা আমি সমীরণ না হয় মেনে নিল বেচারা ছেলেটা এসব সস্তা ভালোবাসার জালে ফেঁসে। মেয়েটার সুচতুর কৌশলের কাছে ছেলেটা হার মেনে নিয়েছে। তাই বলে এভাবে কান ধরে উঠবস করতে হবে? কোন আত্মসম্মান নেই? ভালোবাসলে কি নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিতে হয় নাকি? বিশেষ করে নিজের সম্মান, নিজের ব্যক্তিত্ব। এমন ভালোবাসাকে গু লি মা রে সমীরণ।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে সমীরণ উল্টোদিকে ঘুরল। এদের মুখও আর দেখতে ইচ্ছে করছে না। তবে এক পাও বাড়াতে পারল না। হঠাৎ করে আবার পিছন ঘুরে তাকাল। ছেলে মেয়ে দুজনের একজনেরও মুখ দেখা যাচ্ছে না ঠিকমত। তবে ছেলেটার পরনের পোশাকটা সমীরণের চেনা লাগছে। আচ্ছা আজ ভার্সিটিতে মৃদুল এইরকম একটা পোশাকই পরে এসেছিল না! পায়ের জুতোটাও একই। চুল কাটার ধরনও এক। লম্বা চড়া সবটাই তো মৃদুলের সাথে মিলে যাচ্ছে। তার মানে কি ছেলেটা মৃদুল?
প্রায় একশোবারের মতন ওঠবস করা হয়ে গেছে মৃদুলের। এখন আর পা দুটো চলছে না। তবুও শশীর বিন্দুমাত্র কোন মায়া দয়া হচ্ছে না। বরং একটু থামলেই ঝাড়ি দিচ্ছে। অনেকটা সময় ধরে চুপচাপ শশীর নির্যাতন সহ্য করার পর মৃদুল আকুতি ভরা কন্ঠে বলে উঠল,
“এবারে তো ছেড়ে দাও, শশী। আরে ওর সাথে যখন রিলেশনে ছিলাম তখন তো তোমাকে চিনতাম না। তুমি থাকলে কি আর ওর সাথে প্রেম করতাম বল? সত্যি বলছি ওকে ভালো টালো বাসিনি কখনো। ভালো তোমাকেই বেসেছি।”
“তাই নাকি? তা তুমি নাকি রোজ ওকে বলতে ভালোবাসো। কই আমাকে তো বলো না। আমার তো তোমার মুখ থেকে জোর করে করে ভালোবাসার কথা শুনতে হয়। আমাকে তো কখনো চিঠি দাওনি। ও তোমাকে চিট করার পর আবারো তোমার কাছে আসার সাহস পেল কি করে? নিশ্চয় জানে তোমার ওর প্রতি অগাধ ভালোবাসা ছিল। আমার থেকেও বেশি ভালোবাসো ওকে তাই না?”
মৃদুল তড়িঘড়ি করে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না না। তোমার মতন কাউকে ভালোবাসি না। তুমি তো আমার সব। আর লরিনের সাথে যেসব করেছিলাম ওগুলো যৌবনকালের ভুল ছিল। প্লিজ ক্ষমা করে দাও।”
“মৃদুল!”
শশী আর কিছু বলার আগেই ওদের দুজনের কানে ভেসে এল সমীরণের কন্ঠস্বর। কণ্ঠস্বরটা কানে যেতেই মৃদুল চমকে উঠে দাঁড়াল। তাড়াহুড়ো করে কান ছেড়ে দিয়ে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখল সমীরণ দাঁড়িয়ে আছে। এমন অদ্ভুত কোন কিছু এর আগে কখনো দেখেনি সমীরণ। শুধু ও কেন পৃথিবীর কেউ কখনো দেখেনি, কোথাও ঘটেইনি এমন অদ্ভুত ঘটনা।
মৃদুলের তো এখন নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে। আজ ভাগ্য সব দিক দিয়ে ওকে বাঁশ দিচ্ছে। সমীরণের কাছে আজকেই ধরা খেতে হলো। এই ছেলেটা কি ওকে বাঁচতে দেবে। আদৌ সম্পর্কটা রাখতে দেবে।
মৃদুলের এসব ভাবনার মাঝেই সমীরণ ওর দিকে এগিয়ে এসে বিস্মিত গলায় বলল,
“তুই আমার বন্ধু হয়ে প্রেম করছিস! তুই আমার বন্ধু হয়ে কান ধরে ওঠবস করছিস! তুই আবার এসব ফেঁসে গেলি! তুই আবার নিজে নিজে মা রা খেতে চলে এলি! তুই আমাকে জানতেও দিলি না! এভাবে ধোকা দিলি! এইজন্য সকালে লরিনের সামনে কাঁপছিলি। শালা বেইমান। বন্ধুত্বে তোর মতন বড় বেইমান জগতে নেই রে। তোর বেইমানির জন্য তোকে মৃ ত্যু দ ণ্ড দিলেও তো কম হয়ে যাবে। শা লা হা রা মি কোথাকার।”
__________
অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ বেশ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল সমীরণ। সময় তখন সন্ধ্যে সাতটা। কলিং বেল বাজাতেই সাদ্দাম হোসেন দরজাটা খুলে দিলেন। তিনি ফোনে কারো সাথে কথা বলছেন। তাই দরজাটা খুলে দিয়ে ফোন কানে নিয়ে আবার নিজের ঘরে চলে গেলেন। স্যান্ডেলটা খুলে এক পাশে গুছিয়ে রেখে সমীরণ নিজের ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল। হঠাৎ করে ওর কানে রান্নাঘর থেকে থালা বাসনের আওয়াজ এল। অমনি থেমে গেল সমীরণ। ওর আব্বু তো ঘরে চলে গেল। ওরা দুজন ব্যতীত বাড়িতে আর কেউ থাকে না। তবে রান্না ঘরে কিসের শব্দ হচ্ছে?
কৌতূহলবশত সেদিকে গেল সমীরণ। কাছাকাছি যেতেই গুণগুনিয়ে গান গাওয়ার আওয়াজ ভেসে এল সমীরণের কানে। সমীরণের এবারে ভয় হচ্ছে। ভূত না তো!
চুপি চুপি গিয়ে রান্না ঘরে উঁকি দিতেই একজনকে টের পেল। ভূত নয়। এ তো স্বয়ং মৃত্তিকা। কিন্তু এই মেয়ে এখানে কি করছে?
“এই তুই আমার বাড়িতে কেন এসেছিস? তাও আবার রান্না ঘরে ঢুকেছিস কেন?”
সমীরণের কন্ঠটা কানে যেতেই মৃত্তিকা পিছন ঘুরে তাকাল। কি সুন্দর স্বচ্ছ, নির্ভেজাল একটা হাসি ফুটে উঠল মৃত্তিকার ঠোঁটে।
“তুমি এসে গেছো? আমি তো তোমার অপেক্ষাই করছিলাম।”
সমীরণ গম্ভীর গলায় বলল,
“কোন দুঃখে?”
“আহা দুঃখে কেন হতে যাবে। তোমার বিরিয়ানি পছন্দ। আমি সেজন্য বিরিয়ানি রান্না করছি।”
“কেন এসেছিস মৃত্তিকা? তোর এত আনাগোনা আমার পছন্দ হচ্ছে না। ভার্সিটিতে যা করিস ছোট মানুষ ভেবে ক্ষমা করে দেই। কিন্তু বাড়িতে আব্বুর সামনে এসব করার একদম চেষ্টা করবি না। আমার পছন্দ না এসব। বাড়ি চলে যা।”
কথাটা বলে সমীরণ সেখান থেকে চলে যেতে ধরলে পিছন থেকে মৃত্তিকা বেশ মিষ্টি করে একবার ডেকে উঠল ওকে।
“সমীরণ!”
মৃত্তিকা একদম ঠিক বলেছে এই ডাক উপেক্ষা করে যাওয়ার ক্ষমতা সমীরণের নেই। পিছন ঘুরে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“কি হয়েছে?”
“আমি জানি নিজের জন্মদিনের কথা তোমার নিজেরই মনে নেই। তুমি তো পছন্দ করো না এসব। তবে তোমাকে যারা ভালোবাসে তারা মনে রেখেছে। আমরা কেউই কিন্তু তোমার জন্মদিনের কথা ভুলে যাইনি। রাতে সবাই মিলে তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।সেজন্য সকাল থেকে তোমায় উইশও করতে পারিনি। হ্যাপি বার্থডে সমীরণ।”
সমীরণের মাঝে বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না। আসলে এই বিষয়গুলো নিয়ে সমীরণের কোন আগ্রহ নেই। সে নিজের জন্মদিন হোক কিংবা অন্যের। বুঝে উঠতে পারে না এগুলো নিয়ে এত লাফালাফি করার কি আছে। তাই খুব একটা খুশি হতে দেখা গেল না। বরং এই নিয়ে আর কোন প্রকারের কোনো কথা না তুলে গম্ভীর গলায় বলল,
“প্রয়োজন ছিল না এত কিছুর। আর তোকে রান্না করে কে ঢুকতে বলেছে? রান্নার ‘র’ তো জানিস না। শেষে দেখব সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। তুই বেরো তো রান্না ঘর থেকে। মেসে চলে যা। আমার বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করলে আমি বাইরে থেকে কিনে খেয়ে নিতে পারব ভাই। তুই যা। আর শোন, আমি রেখে আসতে পারব না তোকে। তোর ভাইকে কল কর। প্রেম করার সময় হলে বোনকে মেসে রাখতে যাওয়ার সময়ও ঠিক হবে। আমি আর এসব ডিউটি পালন করতে পারব না।”
কথাটা বলে ছেলেটা গটগট করে হেঁটে নিজের ঘরে চলে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মৃত্তিকা। মৃদুল কে আলাদা করে ডাকবে কি। মৃদুল আর শশী দুজনেই তো এসেছে সমীরণের জন্মদিন পালন করার জন্য। মৃদুল আর শশী মিলে ড্রয়িং রুমটা একটু হালকা করে সাজাচ্ছে। নিজের ঘরে যেতে ধরলে সমীরণ টের পাবে সেসব। কে জানে কি করবে।
একটু পর মৃত্তিকার কানে চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে এল। সমীরণ চেঁচাচ্ছে যে কেন বাচ্চাদের মতন ওর জন্মদিন পালন করা হচ্ছে। কেন বেলুন, ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে বুঝে উঠতে পারছে না।
রাত নটার দিকে মৃত্তিকা সমীরণ কে টেনে ঘর থেকে বের করল। কেক আনা হয়েছে। সে কেক কাটার আয়োজন দেখে সমীরণ আরেক দফা ধমক দিয়ে বলে উঠল,
“আমাকে বাচ্চা মনে হয় তোদের যে আমি এখন মোমবাতিতে ফুঁ দিয়ে কেক কাটবো। নাকি এখন আমাকে হ্যাপি বার্থডে গানের তালে নাচতে হবে?”
মৃত্তিকা পাল্টা ধমকে উঠে বলল,
“একটু শান্ত হবে তুমি। তোমাকে কে বলেছে নাচতে হবে? মোমবাতি জ্বালানো আছে শুধু সেটা নিভিয়ে কেক কাটবে। ব্যাস কথা শেষ। এত কেন চেঁচামেচি করছো? এত কেন লাফাচ্ছো? বেশি মেজাজ দেখালে গায়ে পানি ঢেলে দেব।”
সমীরণ খানিকটা লজ্জা পেল। সবার সামনে একটা মেয়ে ওকে এভাবে ধমকাচ্ছে। আবার তার ধমকের উপরে সমীরণ কিছু বলতেও পারল না। দিনদিন সমীরণের মান সম্মান শেষ হয়ে যাচ্ছে।
হাজার চেষ্টা করেও সমীরণ কে দিয়ে মোমবাতি নেভানো গেল না। কেক কাটতেই অনেক কষ্টে রাজি হয়েছে। কিন্তু মোমবাতি নেভাবে না। সেই সাথে সবাইকে স্পষ্ট ভাবে জানিয়েও দিয়েছে যে ও কেক কাটার সময় যেন ভুলেও কারো মুখ দিয়ে হ্যাপি বার্থডের গান না বেরোয়।
শেষে বাধ্য হয়ে মৃত্তিকা নিজেই মোমবাতি নিভিয়ে সেটা কেকের উপর থেকে তুলে ফেলল। সমীরণ কেক কেটে হাতে এক পিস কেক তুলে নিয়ে শুধু সাদ্দাম হোসেনকে খাইয়ে দিল। সাদ্দাম হোসেন চলে গেলেন সেখান থেকে। তার মতে এসব কম বয়সী ছেলে মেয়েদের ব্যাপার। তার এখানে থাকা ঠিক না। থাকতে ভালোও লাগছে না।
সাদ্দাম হোসেনের পিছু পিছু সমীরণও চলে যেতে ধরলে মৃত্তিকা ওর হাত টেনে ধরে বলল,
“আমাকে কেক খাওয়াও।”
“কেন রে আল্লাহ কি তোর হাত দেয়নি? সারা বছর কি আমি তোকে খাইয়ে দেই যে কেক খাইয়া দিতে হবে। খাওয়ার ইচ্ছে হলে নিজে খেয়ে নে।”
মৃত্তিকা কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। হাতটাও ছাড়েনি। সমীরণ শেষে বাধ্য হয়ে এক টুকরো কেক তুলে মৃত্তিকা কে খাওয়ালো। অতঃপর মৃদুল আর শশীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোদেরকেও খাইয়ে দিতে হবে? এসো বাবু এসো। তোমাদের কেও খাইয়ে দেই। ছোট বাচ্চা মানুষ, আমি না খাইয়ে দিলে কি হয়!”
মৃদুল আর শশী শুধু হাসল। তবে এল না ওরা সমীরণের হাত থেকে কেক খাওয়ার জন্য। সমীরণ তাও ছাড়া পেল না মৃত্তিকার কাছ থেকে। কেক থেকে ক্রিম তুলে নিয়ে সমীরণের গালে মাখিয়ে দিল। সমীরণ একটু রেগে উঠল। তা দেখে যেন মৃত্তিকার সাহস বেড়ে গেল। ছেলেটার রাগ দেখলে আজকাল মৃত্তিকার আরো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে, আরো বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে।
সমীরণের পুরো মুখ মাখিয়ে দিল ক্রিম দিয়ে। সমীরণ বিরক্ত হচ্ছে। কিন্তু আটকাচ্ছে না। বকাবকিও আর করছে না।
মৃদুল শুধু দেখে যাচ্ছে ছেলেটাকে। এ নাকি আবার বলে ও ভালোবাসেনা মৃত্তিকা কে। শশীর দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“দেখেছ ও নাকি মৃত্তিকাকে ভালোবাসে না। শালা ভালো ঠিকই বাসে। শুধু স্বীকার করে না।”
শশী সন্দেহী গলায় বলল,
“সত্যি তোমার মনে হয় ভালোবাসে মৃত্তিকাকে?”
মৃদুল জোর গলায় বলল,
“অবশ্যই বাসে। ভালোবাসে বলেই মৃত্তিকার এত বিরক্ত সহ্য করে। দেখছো না পুরো মুখ ক্রিম দিয়ে কিভাবে মাখিয়ে দিল, কিভাবে জোর করে করে সবকিছু করাচ্ছে ওকে দিকে। শুধু একটু ধমকাচ্ছে যেটা ওর স্বভাব। তবে মৃত্তিকা যা বলছে সেই সব কিন্তু ঠিকই করছে। মৃত্তিকার জায়গায় যদি এখন আমিও ওর সাথে এসব করতাম এতক্ষণে আমার দু চারটে চড় খাওয়া হয়ে যেত। কিন্তু ও মৃত্তিকার তালে তাল মেলাচ্ছে। তার কারণ সমীরণ মৃত্তিকা কে ভালোবাসে।”
চলমান।

