#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_১২
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার
সমীরণের বাড়ি ফিরতে আজ অনেকটা দেরি হলো। কোন বিশেষ কারণ নেই দেরি হওয়ার। মনটা বেশ খারাপ। সাদ্দাম হোসেনকে বুঝতে দিতে চাইছেনা মন খারাপ। মূলত সেই কারণেই এতক্ষণ বাইরে থেকে চেষ্টা করছিল মনটাকে ভালো করার। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছে। এখানে ওখানে ঘুরেছে, কখনো বা একাকি নির্জন একটা জায়গায় বসে গলা ছেড়ে গান গেয়েছে কিন্তু তবুও মন খারাপ দূর হয়নি।
ভার্সিটির মাঠে মৃত্তিকা কে ওভাবে কথাগুলো বলার পর মেয়েটা বেরিয়ে গিয়েছিল ভার্সিটি থেকে। আজ আর একবারের জন্যও সমীরণ কে ওকে ভালোবাসার জন্য জোর করেনি। আর একবারের জন্যও মৃত্তিকা নিজের ভালোবাসার কথা বলেনি। সমীরণ দেখেছিল মৃত্তিকার চোখ, মেয়েটা যেন হার মেনে নিয়েছিল। বুঝে গেছে মৃত্তিকার ভালোবাসা এই নিষ্ঠুর মানবের হৃদয় গলাতে পারবে না। অথচ মেয়েটা এটা বুঝলো না যে ভালোবাসা ছিল। শুধু সেটা প্রকাশ করার সময় কিংবা পরিস্থিতি হলো না সমীরণের।
মৃদুলের সাথেও ঝামেলা হয়েছে। মৃত্তিকা বোধহয় কেঁদে কেটে মৃদুল এর কাছে গিয়েছিল অভিযোগ জানাতে। সেইসব শুনে মৃদুল আচ্ছা মত ঝাড়ি দিয়েছে। অনেক কথা শুনিয়েছে মৃদুল। তবে সমীরণ একটা কথারও জবাব দেয়নি। চুপচাপ শুধু শুনে গেছে। মন খুলে মৃদুল কে কথা শোনাতে দিয়েছে। যা ইচ্ছে হয়েছে সে সব বলতে দিয়েছে। তারপর থেকে মৃদুলের সাথেও আর সারাদিন কথা হয়নি। দেখাও হয়নি। এই সবকিছু মিলিয়ে মন মেজাজটা ভীষণ খারাপ।
বাড়ির দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সমীরণ। কলিং বেল বাজাতে ইচ্ছে করছে না। সাদ্দাম হোসেন মুখটা দেখলেই বুঝে যাবেন যে সমীরণের মন মেজাজ ঠিক কতটা খারাপ। যেটা সমীরণ চায় না। ওর মন খারাপ দেখলে সাদ্দাম হোসেন চিন্তা করে। চিন্তা করতে করতে যদি আবার ওনার শরীর খারাপ করে, প্রেসার বেড়ে যায়!
তবে এভাবে দাঁড়িয়ে থেকেও তো লাভ নেই। ভিতরে যেতেই হবে। সমীরণ কলিং বেলটা বাজাতে যাবে অমনি ওর ফোনটা বেজে উঠল। কলিংবেল না বাজিয়ে আগে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। দেখল মৃদুলের নাম্বার থেকে কল এসেছে।
বলা যায় সমীরণ খানিকটা বিরক্ত হলো। মৃদুল কথা শোনাক সেটা সমস্যা না। তবে একটু পরেই কল করতো। এখন কথা শোনালে সমীরণের মন মেজাজ আবারো খারাপ হয়ে যাবে। আর কষ্ট করে যতটুকু নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে সেই সমস্ত কষ্ট বিফলে যাবে। কলটা কেটে দেবে ভাবল সমীরণ। তবে আবার কি ভেবে যেন রিসিভ করল। ফোনটা কানে ধরে কিছু বলার আগেই অপর পাশ থেকে মৃদুল এর হুমকি ভেসে এল,
“যদি আমার বোনের কিছু হয়েছে সমীরণ তোকে কিন্তু আমি ছাড়বো না। তোর জন্য যদি ও নিজের কোন ক্ষতি করে বসে আমি তোকে কোনদিন ক্ষমা করব না।”
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়ার মত কোন কথা খুঁজে পেল না সমীরণ। আসলে ব্যাপারটা ওর বুঝতেই অনেকটা সময় লাগল। হঠাৎ করে এমন কথা বলছে কেন মৃদুল? মৃত্তিকার কি কিছু হয়েছে? ঠিক আছে তো? উদ্বিগ্ন গলায় আগে মৃদুলকে সেটাই জিজ্ঞেস করল,
“মৃত্তিকা ঠিক আছে?”
অপর পাশ থেকে মৃদুল হুংকার ছেড়ে উঠল,
“ও ঠিক থাকলো নাকি থাকলো না তাতে তোর কিছু যায় আসে? তোকে ভালোবাসার দায়ে যদি মেয়েটা ম রে ও যায় তাও তো তোর কিছু যায় আসবে না। তুই তো একটা পাষাণ, পাথর।”
“কি হয়েছে আমাকে স্পষ্ট করে বল মৃদুল? আমার কিন্তু চিন্তা হচ্ছে। মৃত্তিকা কোথায়?”
“সেটাই তো বুঝতে পারছি না ও কোথায়। সকাল থেকে কল করে যাচ্ছি ফোন বন্ধ দেখাচ্ছে। মেসে ফেরেনি, শশীর সাথে নেই। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কিন্তু কোথাও নেই। কোন খোঁজ পাচ্ছিনা। এখনো মেসে ফেরেনি। তুইই উত্তর দে আমার বোন কোথায় গেছে।”
এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস আটকে গেল সমীরণের। দম ফেলার চেষ্টা করল তবে পারছে না। বুকটা কেমন যেন ভার ভার লাগছে। মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবীটা থমকে গেল। সমীরণের জীবনের সবথেকে দামি, প্রিয় জিনিসটা যেন হারিয়ে যেতে বসেছে এমন অনুভব হলো সমীরণের। ওর ধ্যান ভাঙল আবার মৃদুলের কন্ঠে,
“আমি ভেবেছিলাম তুই যতই আপত্তি করিস না কেন এক না একসময় ঠিক ওর ভালোবাসা বুঝবি। কারণ আমার মনে হয়েছিল তুইও ওকে ভালোবাসিস। শুধু তোর নিজের প্রতি বিশ্বাস নেই জন্য ওর সাথে তোর জীবনটা জোড়া লাগাতে চাস না। তবে ভুল ছিলাম আমি সমীরণ। তুই আমার বোনটাকে না কখনো ভালোবাসতে পেরেছিস, না কখনো ওর ভালোবাসা বুঝতে পেরেছিস। তুই তো কখনো ওর ভালোবাসার মর্যাদাই বুঝিস নি রে।”
“তুই ঠিক করে সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছিস তো? বাড়ি চলে যায়নি তো?”
কন্ঠ কাঁপল সমীরণের। দুটো লাইন বলতেই বেশ অনেকটা সময় লাগল। কেননা একনাগারে স্বাচ্ছন্দে কথাগুলো বলতে পারল না। থেমে থেমে বলতে হলো। কথা আটকে আসছে। মৃদুল বলল,
“যায়নি বাড়ি। শশী কে নাকি বলেছিল যে বাড়ি যাবে কিন্তু যায়নি। যেসব জায়গায় ওর যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। শশী ছাড়া তো ওর কোন বন্ধুও নেই। আলাদা করে ও তো বেশি মানুষকে নিজের জীবনের সাথে জড়াইনি সমীরণ। হাতেগোনা কয়েকজনকে জড়িয়েছিল। যার মাঝে সবথেকে দামি ছিলি তুই। ও তোকে খুব ভালোবাসত সমীরণ। সকালে আমাকে ধরে পাগলের মতন কেঁদেছিল মেয়েটা। বলেছিল আর কখনো তোকে বিরক্ত করবে না। আমি তখন বুঝিনি ওর কথার মানে। তবে এখন আমার ভয় হচ্ছে এই কথার মানেটা বুঝতে গিয়ে। তুই শেষ করে দিলি ওর জীবনটা, সমীরণ। আমার বোনটাকে তুই শেষ করে দিলি।”
সমীরণ তড়িঘড়ি করে বলে উঠল,
“না না আমি এমন কিছু চাইনি। তুই…..তুই জানিস মৃত্তিকা আমার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি ওর ক্ষতি চাইব! আমি ওকে শেষ করতে পারি না।”
মৃদুল জোর করে বলল,
“হ্যাঁ তুই ওকে শেষ করেছিস। তোর জন্য শেষ হয়ে গেছে। ও ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে। এখন পারলে শুধু এতোটুকু দোয়া করিস যেন ওকে ঠিকমত পেয়ে যাই।”
ফোনটা কেটে দিল মৃদুল। সমীরণ হ্যালো হ্যালো করে নাম ধরে ডাকল। তবে যখন সাড়া পেল না তখন বুঝল কল কেটে দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্তিকার নাম্বারে কল লাগাল। ফোন বন্ধ পেল। বেশ কয়েকবার কল করল তবে ফোন বন্ধই দেখাল। কলিংবেল আর বাজানো হলো না। বাইক নিয়ে আবারও বেরিয়ে পড়ল। সমীরণ জানে না কোথায় যাবে। শুধু এতোটুকু জানে মৃত্তিকা যেখানেই থাক না কেন ওকে খুঁজে বের করতেই হবে।
সমীরণ সবার আগে মেসে গেল ওর খোঁজ নিতে। এখনো আসেনি মেয়েটা। সেই সকালে নাকি বেরিয়েছিল সারাদিন আর ফেরেইনি মেসে। এত রাতে ভার্সিটিতেও খুঁজল। তাও পেল না। শশী কে কল করল। ও কিছু জানে না। মৃদুল যতটুকু বলেছিল ততটুকুই বলতে পারল যে, একবার নাকি বলেছিল যে থাকবেনা এখানে। বাড়ি চলে যাবে।
সমীরণ সবশেষে কোন উপায় না পেয়ে মৃত্তিকার বাড়িতে কল করল। সরাসরি জিজ্ঞেস করল না মৃত্তিকার কথা। তবে যখন অপর পাশ থেকে মৃত্তিকার বাবা জিজ্ঞেস করলেন যে মৃত্তিকা ঠিকঠাক আছে কিনা, ওদিকের খবর ঠিক আছে কিনা তখন সমীরণের বুঝতে বাকি রইল না যে মৃত্তিকা বাড়িতে যায়নি।
আরো বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর নেয়ার পর বাসস্ট্যান্ডে এল। ভাবল হয়ত এতক্ষণেও বাড়িতে যায়নি। হয়ত এখনো বাসস্ট্যান্ডে বসে আছে। পরবর্তী বাসে যাবে। মূলত সেই আশাতেই এল সমীরণ । তবে বাসস্ট্যান্ডেও কোথাও পেল না। অনেক যাত্রী বসে আছে সেখানে। তবে নেই শুধু মৃত্তিকা।
অল্প একটু সময় ছোটাছুটি করেই সমীরণের এখন ক্লান্ত লাগছে। মাথায় যে কতশত আজেবাজে ভাবনা আসছে সেগুলোর ভার আর বইতে পারছে না। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস আটকে আসছে। এসব যেন সহ্য করতে পারছে না সমীরণ। ফাঁকা একটা চেয়ার দেখে ধপ করে বসে পড়ল সেখানে। দু হাতে মাথার চুল খামচে ধরে মনে করার চেষ্টা করল যে আর এমন কোন জায়গা আছে যেখানে মৃত্তিকা যেতে পারে।
মৃত্তিকা তো খুব বেশি জায়গা চেনেও না। এতগুলো মাস হলো এই শহরে এসেছে বেশিরভাগ সময় হয় মৃদুলের সাথে ঘুরেছে নয়ত সমীরণের সাথে কিংবা শশীর সাথে। এর বাইরে তো আর কেউ নেই মৃত্তিকার জীবনে। তাহলে গেল কোথায় মেয়েটা।
সমীরণের পাশের চেয়ারে বসে এক ভদ্রলোক ফোনে খবর দেখছেন। একটা বাস দুর্ঘটনার খবর দেখছেন আপাতত। পাঁচজন যাত্রী নাকি ঘটনাস্থলেই মা রা গেছে, আরো দুজন হাসপাতালে গিয়ে মা রা গেছে। এছাড়া অনেকে আহত, অনেকের অবস্থা গুরুতর। না চাইতেও সমীরণের মনোযোগ সেই খবরের দিকে গেল। প্রথমে যদিও শুধু কৌতুহল বসত শুনল। কিন্তু যখন কোন জায়গায় দুর্ঘটনাটা ঘটেছে সেই জায়গার নামটা কানে এল অমনি হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেল সমীরণের। ঘাড় কাত করে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ভাই, অ্যাক্সিডেন্টটা কোথায় আর কখন হয়েছে?”
ভদ্রলোক জায়গার নামটা জানালেন আর বললেন বিকেল তিনটে চারটে নাগাদ অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ না। বেশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা। বাসে করে তো এই পথ দিয়েই মৃত্তিকার বাড়ি যেতে হয়। আচ্ছা, তার মানে এমনটা নয় তো ওই বাসে মৃত্তিকাও ছিল? সেই কারণেই কি এখনো বাড়ি যেতে পারেনি? সেই কারণেই কি ফোনটা বন্ধ? সেই কারণেই কি ওরা কেউ খোঁজ পাচ্ছে না মৃত্তিকার?
এর বেশি আর একটা লাইনও ভাবতে পারল না সমীরণ। যাত্রীদের কোন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে সেই তথ্যটা জেনে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বাসস্ট্যান্ড থেকে হাসপাতালে বাইক নিয়ে যেতে প্রায় এক ঘন্টার মতন লাগবে। অবশ্য সমীরণ যে স্পিডে বাইক চালাচ্ছে আধাঘন্টার বেশি লাগার কথা না। রাতের রাস্তা হওয়ায় যানজট নেই। তবে বাইক চালাতে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে সমীরণের। কেননা ক্ষনে ক্ষণে চোখ দুটো ভিজে উঠছে। সেগুলো মুখতে হচ্ছে। নাহলে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেনা সামনেটা। অলক্ষ্যে আবার সমীরণের এক্সিডেন্ট না হয়ে যায়!
প্রায় বিশ মিনিট পর রাস্তায় ধারেই একটা জায়গার দিকে নজর গেল সমীরণের। কি ভেবে যেন হুট করেই ব্রেক কষল।
জায়গাটাকে পার্ক বলা চলে কিনা সমীরণ জানে না। একটা লেকের ধারে কয়েকটা বেঞ্চ রাখা বসার জন্য। দিনের বেলা দু একটা খাবারের স্টলও দেখা যায়। তবে এখন রাত হওয়ায় না সেই খাবারের স্টল আছে, না মানুষজন আছে।
মৃত্তিকা কে নিয়ে এই জায়গাটায় সমীরণ এসেছে অনেকবার। আর মৃত্তিকার এই জায়গাটা ভীষণ পছন্দের। শেষবার এসেছিল গত বছর মৃত্তিকার জন্মদিনের দিন। যদিও সমীরণ এই কথাটা সেদিন স্বীকার করেনি মৃত্তিকার কাছে যে জন্মদিন বলে ঘুরতে নিয়ে এসেছে। বলেছিল এমনি এসেছে। এই জায়গাটা এখনো দেখা হয়নি। সমীরণ এখন এই কথাটা বিশ্বাস করতে চাইছে না যে, যে বাসের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে সেই বাসে মৃত্তিকা ছিল। সেই জন্য সমীরণ আগেই গেল না আর হাসপাতালের দিকে। ভাবল একবার এই জায়গাটাতেই দেখা যাক। থাকতেও পারে মৃত্তিকা।
বাইকটা এক সাইডে দাঁড় করিয়ে ভয়ে ভয়ে সমীরণ এগলো। খুব করে চাইছে যেন মৃত্তিকাকে এখানে পেয়ে যায়। পর পর বেশ অনেকগুলো বেঞ্চ রাখা। একটা ব্রেঞ্চেও মানুষজন নেই। সমীরণ এখন বুঝতে পারছে হয়ত মৃত্তিকা নেই এখানে। তবুও কিসের আশায় যেন ভাবল একদম শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাবে।
যেতে যেতে এক জায়গায় থেমে গেল সমীরণ। সামনে আর চারপাঁচটা বেঞ্চ আছে। তারপরেই এই জায়গাটার সীমানা শেষ। শেষের বেঞ্চটায় মনে হচ্ছে কেউ একজন দুই পা তুলে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। সমীরণ যদি ভুল না হয়ে থাকে তবে ওটা একটা মেয়ে।
সমীরণ আরো কয়েক কম এগিয়ে গেল সেদিকে। আজ সকালে মৃত্তিকা একটা হালকা আকাশি রং এর সালোয়ার কামিজ পরে এসেছিল। দূর থেকে দেখতে মনে হচ্ছে মেয়েটার পরনে যেন সেই কামিজটাই। আরেকটু কাছে যেতেই সমীরণ নিশ্চিত হলো যে ওটা মৃত্তিকা যখন মেয়েটার হাতের ঘড়ির দিকে নজর গেল। এই ঘড়িটা কি করে ভুলতে পারে সমীরণ। নিজে এই ঘড়িটা পছন্দ করে উপহার দিয়েছিল মৃত্তিকাকে। এই ঘড়িটা দিয়েছিল আজ থেকে তাও ৪-৫ বছর আগে। মাঝে যে ঘড়িটা কতবার নষ্ট হয়েছে তার হিসেব নেই। তবুও মেয়েটা ঘড়িটা ফেলে দেয় না। বারবার ঠিক করে পরেছে।
একবার অস্পষ্ট গলায় ডাকল সমীরণ,
“মৃত্তিকা!”
কান্নায় তোপে এতক্ষণ কেঁপে কেঁপে উঠছিল মৃত্তিকা। খুব ধীর গলায় ডাকল সমীরণ। তবু মৃত্তিকা টের পেল। সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল। দেখল ওর থেকে খানিকটা দূরে সমীরণ দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য মৃত্তিকার কান্না থেমে গেল। বেঞ্চ থেকে নেমে উঠে দাঁড়াল। এখনো ফোঁপাচ্ছে। মৃত্তিকা জানে সমীরণ এখন অনেক রাগারাগি করবে। আজকে আবার একটা চ ড় খেতেও পারে। মৃত্তিকা যা করেছে তা তো ঠিক করেনি। জানতো সমীরণ আজকে ওকে পেলে বকা খাবে, মা রও খাবে। তবে তাও যায় আসে না। যা ইচ্ছে করুক। মৃত্তিকা তো এমনিতেও বেঁচে নেই। মা র লেও আর কষ্ট হবে না।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে সমীরণ মৃত্তিকার দিকে পা বাড়াল। সমীরণ বুঝতে পারছে ধীরে ধীরে বল শক্তি হারিয়ে ফেলছে। পা দুটো অসার হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি হাঁটু ভেঙে পড়ে যাবে। সমীরণ যা ভেবেছিল ঠিক তাই হলো। মৃত্তিকার কাছাকাছি যেতেই ঠিক ওর পায়ের সামনে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ল সমীরণ।
মৃত্তিকা একটু চমকাল। বুঝতে পারল না সমীরণের হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ার মানে। আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও পারছে না কেন যেন। সমীরণ নিজের কাপা কাঁপা হাত দুটো তুলে দু হাতে মৃত্তিকার হাত দুটো শক্ত করে ধরল। খুব শক্ত করে ধরল মৃত্তিকার হাত দুটো। হয়ত বা আজ প্রথম এতটা শক্ত করে সমীরণ ধরল মৃত্তিকার হাত।
“হাত ছাড়ো আমার।”
অভিমান মিশ্রিত গলায় মৃত্তিকা কথাটা বলল। শুধু মুখেই বলল। তবে হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার কোন চেষ্টা করল না। সমীরণ একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। মৃত্তিকার দুহাতেরই উল্টো পিঠে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। সমীরণ ওর হাত দুটো ধরে কতক্ষণ যে ওভাবে হাঁটু ভেঙে বসে রইল তা কেউই জানে না। একটু পর মৃত্তিকা খেয়াল করল ওর হাত দুটো ধীরে ধীরে ভিজে উঠছে। কিন্তু কেন ভিজে উঠছে? আচ্ছা সমীরণ কি কাঁদছে?
“সমীরণ, কাঁদছো তুমি?”
সমীরণ আর নিজেকে আটকাতে পারল না। মৃত্তিকার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল মৃত্তিকা। উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“সমীরণ, কি হয়েছে কাঁদছো কেন? এই সমীরণ বল আমায় কাঁদছো কেন?”
সমীরণ হয়ত কিছু বলার চেষ্টা করল। তবে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। কিংবা হয়ত কিছু বলল যা মৃত্তিকা বুঝতে পারল না।
“কেঁদোনা প্লিজ। কি হয়েছে আমায় বল? আচ্ছা আগে ওঠো তো। এখান থেকে ওঠো। ময়লা লেগে যাচ্ছে তো।”
মৃত্তিকা জোর করে টেনে সমীরণ কে তুলল। সোজা হয়ে দাঁড় করানোর সঙ্গে সঙ্গে সমীরণ দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মৃত্তিকা কে। হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল,
“আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে অপরাধী বানিয়ে চলে গেলি মৃত্তিকা। আমার মনে হচ্ছিল আমার অপরাধের শাস্তি বোধ হয় তুই পেলি। আমি…..আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না তোকে ছাড়া। আমার বাঁচতে ইচ্ছে করছিল না তোকে ছাড়া।আমার…. আমার গোটা দুনিয়াটা এলোমেলো হয়ে গেছিল। এক মুহুর্ত তুই ছিলিনা আর আমার সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। যখন শুনলাম বাস অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে বিশ্বাস কর মনে হচ্ছিল আমিই ম রে গেছি। আমি তোকে সেই অনুভূতিটা কি করে বোঝাবো বলতো যে তুই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিস এটা ভাবতে আমার ঠিক কতটা কষ্ট হচ্ছিল!”
কথাগুলো বলে সমীরণ আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মৃত্তিকাকে। সেই সাথে কান্নার বেগও বাড়ল। মৃত্তিকা আজ অবধি কখনো সমীরণ কে কাঁদতে দেখেনি। তাও আবার এভাবে অসহায়ের মতন তো কখনোই না। দেখেইনি কখনো কাঁদতে। আর আজ মৃত্তিকা কে হারানোর ভয়ে কাঁদছিল সমীরণ! মৃত্তিকার খোঁজ পাচ্ছিল না বলে কাঁদছিল! মৃত্তিকা খুশি হতে চেয়েও যেন হতে পারল না। ওই যে মনে অনেক অভিমান জমে আছে। সমীরণ কে জড়িয়েও ধরল না। অভিমান জড়ানো গলায় বলল,
“কেন কষ্ট হচ্ছে? যে আমাকে ভালোবাসে না তার আমি থাকলেই কি না থাকলেই কি? কষ্ট তো হওয়ার কথা না। তুমি তো ভালোই বাসো না আমায়। তাহলে আমার খোঁজ করছিলে কেন?”
“বাসি তো ভালো। কতটা ভালোবাসি বোঝাতে পারব না তোকে। তোকে দুরে থাকতে বলেছি তোর ভালোর জন্য। আমার মনে হয়েছে আমি সবসময় শুধু তোকে কষ্টই দেই। আমি তোর যোগ্য না, তোকে ভালো রাখতে পারব না। কিন্তু ভালো তো আমি তোকেই বাসি। শুধু নিজের অক্ষমতার জন্য কখনো বলতে পারিনি। তাই বলে তুই চলে যাবি আমায় ছেড়ে! আমাকে এতটা কষ্ট দিবে!”
“তুমিই তো চলে যেতে বলেছিলে। আমার ভালোবাসাকে দাফন করতে বলেছিলে। তোমার কথাই তো শুনেছি আমি। তারপরেও দোষী আমিই?”
সমীরণ ছেড়ে দিল মৃত্তিকা কে। দু হাতের আজলায় মৃত্তিকার ক্রনৃদনটত মুখটা নিয়ে কপালে গাঁঢ় করে একটা চুমু খেল। মৃত্তিকার ভেজা দুটো গালে, নাকে, থুতনিতে, ঠোঁটের কোণাতেও নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল। মৃত্তিকার কান্নারা এবারে আর বাঁধ মানল না। হুড়মুড়িয়ে দুই গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সমীরণ আকুতির স্বরে বলল,
“আর কখনো যাবি না। আমি যেতেই বলব না আর কখনো তোকে। তোর যোগ্য হয়ে উঠব আমি কেমন? তোর জন্য আমি নিজেকে সংসারে বাঁধব। তারপরেও যদি আমার মাঝে কোন অপূর্ণতা থেকে যায় তুই একটু মানিয়ে নেস মৃত্তিকা। আমার তো মা ছিল না। হয়ত বাবা একা সব শেখাতে পারেনি। মায়ের শাসন আর ভালোবাসা যে শিক্ষাটা দেয় সেটা তো আমি পাইনি। তুই আমাকে যেভাবে চাইবি আমি সেভাবেই নিজেকে গড়ব। শুধু ছেড়ে যাস না। আমি বুঝে গেছি তুই না থাকলে আমি দম আটকে ম রে যাব। যাস না মৃত্তিকা আমায় ছেড়ে।”
অসহায়ের মতন কাঁদল সমীরণ। মৃত্তিকা কখনো আন্দাজও করতে পারেনা যে সমীরণ এমন অবুঝের মতন আচরণ করতে পারে। ছোট বাচ্চাদের মতন আবদার করতে পারে। মৃত্তিকা দু হাতে সমীরণের চোখের জল মুছে দিয়ে ভরসা দিয়ে বলল,
“যাব না। আমি তো যেতে চাইও না। তোমায় ছেড়ে তো আমারও দম বন্ধ হয়ে আসে। আমিও তো তুমি ছাড়া বাঁচার কথা ভাবতে পারিনা। আজ অভিমান করে চলে এসেছিলাম। তবে আর কখনো ছেড়ে যাব না তোমায়। তোমায় যেমন যত্ন করে ভালোবেসেছি আমি, তেমনি যত্ন করে আগলে রাখব।”
চলমান।

