Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৭

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৭

0
12

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১৭

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

সকালটা প্রতিদিনের মতোই নিজস্ব নিয়মের ছন্দে সূচিত হয়েছে। নগরের ঘুমন্ত প্রহর পেরিয়ে পক্ষীরাজেরা ততক্ষণে নীড় ছেড়ে আকাশের বুকে বিচরণ শুরু করেছে। চারপাশের কোলাহলও ধীরে ধীরে তার পূর্ণ অবয়ব ধারণ করছে। সেই কোলাহলপূর্ণ পথের একধার ঘেঁষে কোলে ইয়াশকে আগলে হেঁটে চলেছে ইনায়া। আজকের আকাশটা বেশ মেঘলা। শীতের আগমনী বার্তা প্রকৃতির প্রতিটা প্রান্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাতাসে নেই তেমন কোনো তেজ, রোদের তীব্রতাও মেঘের আড়ালে বন্দী। চারপাশে কেমন এক মৃদু শীতলতা ছড়িয়ে রয়েছে। মায়ের কোলের নিরাপদ আশ্রয়ে বসে ইয়াশ তার বড়ো বড়ো নেত্রদ্বয় মেলে পৃথিবীটাকে দেখছে। অপরিচিত এই ব্যস্ত নগরজীবনের প্রতিটি দৃশ্য যেনো তার ক্ষুদ্র চেতনাকে বিস্ময়ে ভরিয়ে দিচ্ছে। একবার ডানে, একবার বাঁয়ে তাকাচ্ছে সে। ছোট্ট চোখ দুটোয় কৌতূহলের যেনো কোনো অন্ত নেই।

ইনায়া আজ একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।সম্পর্কের কোনো নাম নেই তাদের। কেবল পরিচিত, তাও বহু পুরোনো পরিচয়ের সূত্রে। সেই আশ্রমের দিনগুলো থেকেই পরিচয়। ইনায়া বরাবরই নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখতে পছন্দ করে। কারো সঙ্গে সহজে মিশে না, কারো সঙ্গও কামনা করেনি। নিজের নিঃসঙ্গতাকেই বরং আপন করে নিয়েছে সে। তাই আশ্রমে থেকেও পরিচিত মানুষের সংখ্যা ছিলো নিতান্তই নগণ্য।
একটা ক্যাফের সম্মুখে এসে থেমে যায় ইনায়ার পদযুগল। পরমুহূর্তেই ভেতরে প্রবেশ করে সে। অন্দরমহলের উষ্ণ আবহে প্রবেশ করতেই কিছুটা দূরে কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে চোখে পড়ে তার। মানুষটাও যেনো তার অপেক্ষাতেই ছিলো। ইনায়াকে দেখামাত্র সামনের আসনে বসে থাকা ব্যক্তিটার অধরকোণে ধীরে ধীরে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। ছেলেটার নাম রাকিব। ইনায়ার মতোই অনাথ আশ্রমের বেড়ে ওঠা একজন মানুষ। বয়সে তার থেকে কয়েক বছরের বড়ো। ছোটবেলা থেকেই রাকিবের ইনায়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার প্রবল আগ্রহ ছিলো। অথচ ইনায়া তখনও ছিলো নিজের জগতের মাঝে আবদ্ধ। রাকিব নিজে থেকে কথা বললে টুকটাক উত্তর দিতো, এর বেশি কিছু নয়। এরপর সময় নিজের গতিতে বহুদূর এগিয়ে গেছে।

হঠাৎ একদিন রাস্তায় দেখা হয়েছিলো দুজনের। ইনায়া তাকে চিনতে পারেনি, অথচ রাকিব অদ্ভুতভাবে চিনে ফেলেছিলো তাকে। বিয়ের পর আর কখনো রাকিবের সঙ্গে দেখা হয়নি ইনায়ার। অথচ তার আগের সময়গুলোতে রাকিব মাঝেমধ্যেই তাদের ভার্সিটির আশেপাশে আসতো। ইনায়ার খোঁজ নিতো, দু চারটা কথা বলতো। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে সেই যোগাযোগও আর হয়নি। সময়ের নির্দয় প্রবাহে ইনায়ার স্মৃতির পাতা থেকেও ধীরে ধীরে মুছে গিয়েছিলো সেই মানুষটা। আজ আবার সেই পুরোনো পরিচয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। রাকিবের দৃষ্টি এবার স্থির হয় ইনায়ার কোলের ক্ষুদ্র শিশুটার ওপর। মুখে হাসি রেখেই বলে ওঠে-

“ মাশাল্লাহ! নাম কি রেখেছো ওর?”

ইনায়া একবার নিজের বুকের কাছে নিশ্চিন্তে থাকা ছেলেটার মুখের দিকে তাকায়। মাতৃত্বের মায়ামাখা কোমলতা তার চোখে মুহূর্তেই ফুটে ওঠলো। তারপর হাসিমুখে বলে-

“ ইয়াশ ফারিস চৌধুরী।”

রাকিব শিশুটার দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ স্বরে বলে-

“ নামটাও ওর মতোই সুন্দর৷ হেই আঙ্কেলের কাছে আসবে?”

বলেই হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দেয় সে। ক্ষুদ্র ইয়াশ এতসব কথার অর্থ বোঝার বয়সে পৌঁছায়নি। ইনায়া খুব সাবধানে শিশুটাকে রাকিবের দিকে এগিয়ে দিলো। তবে তার নিজের মনেও একরাশ সংশয়। ইয়াশ কি আদৌ অপরিচিত কারো কোলে থাকবে? বাহিরের পৃথিবীর সঙ্গে এখনো তো তার খুব বেশি পরিচয় গড়ে ওঠেনি। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের কোল ছাড়া অন্য কারো আশ্রয়ে সে খুব একটা অভ্যস্ত নয়।
রাকিবও ইয়াশকে অত্যন্ত সাবধানে কোলে তুলে নিলো।
ইয়াশ বড়ো বড়ো চোখ মেলে সামনের মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। যেনো সেই অপরিচিত মুখের রেখাগুলো স্মৃতির কোথাও খুঁজে দেখছে, মানুষটাকে চেনে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে। কয়েক মুহূর্ত সেই অনুসন্ধান চলার পর যখন ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, এই মানুষটা তার পরিচিত নয়, তখনই বদলে গেলো তার মুখাবয়ব। আদুরে মুখখানায় যেনো হঠাৎ মেঘের ছায়া নেমে আসলো। ইনায়া ছেলের সেই পরিবর্তন অনায়াসেই বুঝে ফেলে। মায়ের চোখ সন্তানের ভাষা পড়তে কোনো শব্দের প্রয়োজন বোধ করে না।

“ ওকে আমার কাছে দিন, নাহলে কান্না করে দিবে।”

রাকিব আর কোনো আপত্তি করলো না। অকারণে একটা শিশুকে কাঁদিয়ে কষ্ট দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াশকে ইনায়ার কোলে ফিরিয়ে দেয় সে। মায়ের বুকের নিরাপদ আশ্রয়টুকু ফিরে পেতেই ইয়াশ কেমন ছটফট করতে করতে মায়ের সঙ্গে সেঁটে যায়। ইনায়া ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহসিক্ত কণ্ঠে বলে ওঠে-

” কি হয়েছে আব্বু? এই তো মা, আঙ্কেল হয় এটা বাবা। কাঁদতে হয় না।”

রাকিব কিছুক্ষণ সেই দৃশ্যের দিকেই তাকিয়ে থাকলো। তারপর মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলে-

” তুমি তো ঢাকায় থাকো, তাহলে এখানে কিভাবে?”

ইনায়া ভ্রু সামান্য কুঁচকে তার দিকে তাকায়।

“ কেনো এখানে কি থাকতে পারি না আমি?”

রাকিব দ্রুতই নিজের কথাটা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে বলে-

“ তা নয়, তোমার হাসবেন্ড সহ পুরো ফ্যামিলি ঢাকায় থাকতে। তাই আরকি!”

ইনায়া আর সেই প্রসঙ্গের গভীরে গেলো না। সত্যিটা বললে একটার পর একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। কোথায় থাকে, কেনো থাকে, স্বামী কোথায়, সংসারে কী হয়েছে, এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তাকে। অথচ নিজের ব্যক্তিগত জীবন অপরিচিত মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দেওয়ার অভ্যাস ইনায়ার কোনোদিনই ছিলো না। তাই খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বলে+

“ এমনি তেমন কিছুই না। আপাতত এখানে থাকছি আরকি।”

রাকিবের পরবর্তী প্রশ্নটা আসে আরও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে-

“ আর তোমার হাসবেন্ড?”

ইনায়া কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দেয়-

“ এখানেই।”

“ ওহহ আচ্ছা।

” তো বলুন, কিসের জন্য ডেকেছেন।”

রাকিব কিছুটা হেসে বলে-

“ এমনি কি ডাকতে পারি না?”

ইনায়া সংক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দেয়-

“ তেমনটা নয়, বলুন।”

রাকিব এবার কথার মূল প্রসঙ্গে আসে।

“ তুমি তো ফিল্যান্সিয়ের কাজ করো। আমার একটা ওয়েবসাইট বানানো লাগবে, তুমি কি পারবে করে দিতে? আর সঙ্গে কোডিং এর কাজও আছে।”

কথাটা শুনে ইনায়ার মুখে অতি সূক্ষ্ম এক আনন্দের রেখা ফুটে ওঠলো। আপাতত তার হাতে কোনো কাজই নেই। এই মুহূর্তে একটা কাজ তার কতটা প্রয়োজন, সেটা হয়তো সে ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই হঠাৎ কাজের প্রস্তাবটা পেতেই মনটা অদ্ভুত এক স্বস্তিতে ভরে ওঠলো।

” পারবো, কি ধরনের ওয়েবসাইট?”

“ ই-কমার্স।”

এরপর কাজের প্রসঙ্গ ঘিরে দুজনের মাঝে শুরু হয় নানা কথোপকথন। প্রয়োজন, সময়, কাজের ধরন, কোডিং, ওয়েবসাইটের কাঠামো, সবকিছু নিয়েই আলোচনা চলতে থাকে। ইনায়ার অন্তর তখন নিঃশব্দে আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করছে। এই মুহূর্তে সত্যিই তার কাজের ভীষণ প্রয়োজন ছিলো।কিছুক্ষণ পর ইনায়া হিসাব করে বলে-

“ কোডিং এর কাজটা করতে সময় লাগবে, ওয়েবসাইটটা ১০-১৫ দিন লাগবে। আশা করছি আপনার সমস্যা হবে না।”

রাকিব স্বাভাবিক হাসি দিয়ে উত্তর দেয়-

” আরে না, তুমি সুবিধা মতো দিও। সমস্যা নেই।”

ইনায়া এবার ছেলের দিকে তাকায়। ইয়াশ ততক্ষণে ঘুমের রাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে।

“ আজ তাহলে উঠি, ইয়াশও ঘুমিয়ে পরেছে।”

রাকিব সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে-

“ আচ্ছা চল তোমাদের দিয়ে আসি।”

ইনায়া মাথা নাড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে;

“ধন্যবাদ, এতো কষ্ট করতে হবে না। বাসা বেশি দূরে নয়, আমি যেতে পারবো।”

রাকিব নিশ্চিত হতে আবারও জিজ্ঞেস করে-

“ আর ইউ সিউর?”

ইনায়ার অধরকোণে ক্ষীণ হাসি ফুটে ওঠে।

” হ্যাঁ বাবা, আসতে যখন পেরেছি তখন যেতেও পারবো নিশ্চয়ই।”

রাকিবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইনায়া ইয়াশকে বুকে আগলে বাসার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। তার পদচারণা ধীরে ধীরে ক্যাফের দৃষ্টিসীমার বাইরে মিলিয়ে যায়।রাকিব কিছুক্ষণ সেদিকেই তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের আসনে ফিরে এসে বসে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কিছু কাজ গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সময়টা খুব বেশি গড়ায় না।
কোথা থেকে যেনো হঠাৎ করেই একজন এসে ঠিক তার সম্মুখে বসে পড়ে। অপ্রত্যাশিত উপস্থিতিতে রাকিব ভ্রু কুঁচকে তাকায়। সামনের মানুষটাকে চিনতে তার খুব একটা সময় লাগে না। আয়াশ,মানুষটা এমন এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেনো চোখের সামান্য ভুলেই তাকে গিলে ফেলবে। মুখের প্রতিটিা রেখায় গাম্ভীর্য, চোখের গভীরে অদ্ভুত এক কঠোরতা। রাকিব নিজের সন্দেহ থেকেই প্রশ্ন করে বসে-

“ আপনি ইনায়ার হাসবেন্ড রাইট?”

সামনে থাকা আয়াশ গুরুগম্ভীর স্বরে বলে ওঠে-

“ ইউ আর ১০০% রাইট।”

রাকিব স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে দেয়। কিন্তু তার সেই হাসিটাই যেনো আয়াশের অন্তর্গত কোথাও আগুন ধরিয়ে দিলো। মানুষের হাসি এতটা বিরক্তিকর হতে পারে, আজ বোধহয় তারই প্রমাণ মিলছে।রাকিব স্বাভাবিকভাবেই বলে-

“ আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালো লাগলো।”

আয়াশের মুখের গাম্ভীর্যে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসে না।

“ কিন্তু আমার তো লাগেনি।”

রাকিবের হাসিটা থেমে যায়। কথাটার অর্থ তার বোধগম্য হলো না। তাই কিছুটা দ্বিধা নিয়ে আবার প্রশ্ন করে-

“ মানে? বুঝলাম না ঠিক।”

আয়াশ এবার সামান্য সামনে ঝুঁকে আসলো। কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে।

“ কাজ অব্দি থাকবেন, এতো বছরেও আমার বউয়ের পিছে কি হ্যাঁ? বিয়ে করেছেন?”

রাকিবের মনে হয়, কথাগুলো যেনো তার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেলো। এই মানুষটা ঠিক কী বোঝাতে চাইছে, তার বিন্দুমাত্র ধারণা হচ্ছে না। এতদিন পর দেখা হওয়া একজন
পুরনো পরিচিতের সঙ্গে কথা বলতে এসে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে, সেটা বোধহয় তার কল্পনাতেও ছিলো না।
রাকিব অবশেষে বলে-

“ আপনার কথা বুঝতে পারলাম না। আর আমার বিয়ে হয়নি।”

আয়াশ যেনো এই উত্তরটাও খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না। বরং আরও অদ্ভুত এক স্বরে বলে ওঠে-

” তো করেননি কেনো? চলুন আপনার বিয়ে দিয়ে দেই।”

রাকিব এবার সত্যিই হতবুদ্ধি হয়ে যায়। সামনে বসা মানুষটার কথাবার্তা, হাবভাব, দৃষ্টি, সবকিছুই তার কাছে কেমন অদ্ভুত ঠেকছে। এমন আজব কিসিমের মানুষ সে জীবনে খুব বেশি দেখেনি। নিজেকে সামলে নিয়ে রাকিব কিছুটা বিরক্ত স্বরে বলে-

“ আমি কখন বিয়ে করবো সেটা আমার ব্যাপার। আপনি এতো হাইপার হচ্ছেন কেনো?”

কথাটা শুনে আয়াশের চোখের দৃষ্টি আরও স্থির হয়ে আসে।
তারপর খুব ধীর, অথচ ভয়ংকর রকমের শান্ত স্বরে বলে ওঠে-

“ হাইপার মানে, দেখছেন না আমার অন্তর-আত্মা জ্বলছয়ে কবে করছেন বলুন।”

রাকিব এবার বোধহয় সত্যিই মহা বিরক্ত হলো। অপরিচিত কোনো মানুষের সঙ্গে এভাবে কথা বলারও তো একটা সীমা থাকে! বললেও বা এমন ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে আনার দুঃসাহস কে করে? অথচ মানুষটা নির্বিকার ভঙ্গিতে এমনসব প্রশ্ন করে চলেছে, যেনো তাদের পরিচয়ের বয়স যুগ পেরিয়েছে। রাকিবের কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হয়ে উঠলো। বিরক্তি এবার স্পষ্টতই কণ্ঠস্বরের ধারালো প্রান্তে এসে ঠেকলো।

“ আপনার কি মাথায় সমস্যা? কি ধরনের কথাবার্তা এইসব!”

আয়াশের মুখে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলো না। বরং তার দৃষ্টিতে এমন এক স্বাভাবিকতা, যেনো পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্নটাই সে করেছে।

“ বাংলা বুঝেন না নাকি? দেখছেন তো বাংলায় বলছি, বিয়ে করতে।”

রাকিব এবার এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। তারপর বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো-

“ আমার বিয়ে হলে আপনার কি?”

আয়াশের অন্তর্গত বিরক্তি যেনো এতক্ষণে একটু একটু করে ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপ হয়ে ফুটে উঠলো।

“ অনেক কিছু। ছেঁচড়া ছেলে, দেখেন নাই আমার বউ আগেও পাত্তা দেয় নাই। এখনো দেয় না, তাও এতো সখ কেনো আমার বউকে বাসায় দিয়ে আসার হ্যাঁ?”

শেষ কথাটা বলার সময় আয়াশের চোখের দৃষ্টি অদ্ভুত রকম কঠিন হয়ে উঠলো। যেনো কথাগুলো কেবল ঠাট্টা নয়, কোথাও গিয়ে নিজের অদৃশ্য অধিকারটুকুও ঘোষণা করে গেলো মানুষটাকে। রাকিব এবার সত্যিই আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। বিরক্তি আর রাগ একসঙ্গে এসে মুখাবয়বকে কঠিন করে তুললো। হঠাৎ করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। ল্যাপটপটা দ্রুত ব্যাগের ভেতর ঢুকাতে ঢুকাতে একবার আয়াশের পানে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে অবিশ্বাস, বিরক্তি আর একরাশ হতবুদ্ধিতা পাশাপাশি মিশে আছে।তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো-

“ গড সিক! ইনায়া থাকে কিভাবে আপনার সঙ্গে?”

প্রশ্নটা শুনে আয়াশের মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠলো। চোখেমুখে ফুটে উঠলো এমন এক রাশভারী আত্মবিশ্বাস, যেনো নিজের ব্যাপারে এর চেয়ে বড় কোনো প্রমাণ তার প্রয়োজনই নেই। অত্যন্ত গুরুগম্ভীর স্বরে জবাব দিলো-

“ শুধু থাকে না, আমার বাচ্চার মাও হয়েছে। তাহলে বুঝুন কি ভালোবাসে আমায়।”

কথাটা বলেই আয়াশ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। রাকিব আর কোনো উত্তর খুঁজে পেলো না।ইনায়ার প্রতি তার অনুভূতি আছে। নিঃশব্দ, সংযত, বহুদিনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অনুভূতি। সেটা সে কোনোদিন ইনায়াকে স্পষ্ট করে জানায়নি। তবুও মেয়েটা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলো। মেয়েরা বোধহয় এমনই হয়। তাদের কাছে না বলা অনুভূতিগুলোও কখনো কখনো শব্দের চেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারো দৃষ্টির সামান্য পরিবর্তন, কথার ভেতর লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত মমতা কিংবা অকারণ খেয়াল রাখার অভ্যাস, এসবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো তারা সহজেই পড়ে নিতে পারে। হয়তো সেই কারণেই ইনায়া তাকে আরও বেশি এড়িয়ে চলতো। তবে একটা বিষয় রাকিব কখনো বুঝতে পারেনি, ইনায়ার স্বামীও যে তার এই অনুভূতির অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত, সেটা তার ধারণারও বাইরে ছিল।আয়াশের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ নিজের অবস্থানটাকেই বড্ড অস্বস্তিকর মনে হলো রাকিবের। সে আর কোনো বিতর্কে যেতে চাইলো না। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস ফেলে কিছুটা নরম হয়ে বললো-

“ মাফ চাই ভাই, আমার ভুল হয়েছে আপনার সামনে পরে।”

বলেই আয়াশকে আর একটি শব্দ বলার সুযোগ না দিয়েই দ্রুত বাহিরের দিকে চলে গেলো রাকিব। আয়াশ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার দিকে। কয়েকটা মুহূর্ত এভাবেই নিঃশব্দে অতিবাহিত হলো। তারপর হঠাৎ করেই নিজের করা কর্মকাণ্ডের কথা মনে পড়তেই আয়াশ নিজেই যেনো থমকে গেলো। সে কী করছিলো? একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে এমন অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলো কেনো? অবশ্য রাকিব তার কাছে অপরিচিত নয়। অন্তত ইনায়ার প্রসঙ্গে নয়। ইনায়ার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর সম্পর্কে জানতে আয়াশের বিন্দুমাত্র অনীহা নেই। বরং ইনায়াকে ঘিরে থাকা প্রতিটা নাম, প্রতিটা সম্পর্ক, প্রতিটা গল্পই তার অজানা কোনো কৌতূহলের অংশ হয়ে আছে।রাকিবকেও চিনতে তার এক মুহূর্ত সময় লাগেনি।

ইনায়া আর ইয়াশকে রাস্তায় দেখার পর তাদের পিছু পিছুই এসেছিলো সে। শুরুতে সবকিছুই স্বাভাবিক ছিলো। কোথাও কোনো অস্বস্তি ছিলো না। অথচ রাকিবের দৃষ্টি যখন ইনায়ার ওপর গিয়ে স্থির হলো, তখনই আয়াশের ভেতরের কোথাও যেনো অদৃশ্য এক অস্বস্তি জন্ম নিলো। সে দৃষ্টি আয়াশের সহ্য হচ্ছিলো না। ইনায়ার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা সেই চোখ দুটো বারবার তার নিজের অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছিলো। তার ওপর সামনে থাকা মানুষটা যদি কোনো এক সময় তার বউকে পছন্দ করে থাকে, তাহলে বিষয়টা আরও অসহ্য। কিছু জায়গায় এসে মানুষ বোধহয় যুক্তির হিসাব ভুলে যায়। যে নারীকে নিয়ে এতদিন অভিমান করেছে, যার কাছ থেকে দূরত্ব পেয়েছে, যে নারী এখনো তার প্রতি জমিয়ে রেখেছে কত অপ্রকাশিত অভিযোগ, সেই নারীর দিকে অন্য কারো সামান্য মুগ্ধ দৃষ্টিও কেনো যেনো আয়াশের বুকের ভেতর আগুন জ্বেলে দিচ্ছে। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠলো তার। সে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেই ফেললো, ইনায়াকে নিয়ে তার ঈর্ষা আছে। অথচ এই ঈর্ষাটুকুই হয়তো প্রমাণ করে, অভিমান যত গভীরই হোক, ইনায়ার প্রতি তার অধিকারবোধটুকু এখনো বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।

তবে সে এই অধিকার তখনই ফেলাবে, যখন ইনায়া চাইবে। এর আগে নয়, ইনায়ার নিকট এইসব অধিকার এখনো ফিঁকে হয়ে আছে। তবুও আয়াশ বিশ্বাস রাখে, একদিন সে তার অধিকার ফিরে পাবে। যদি না পায়, তবে অপেক্ষা করবে। যতদিন নিশ্বাস রয়েছে ততোদিন।

—–

ঘণ্টাখানেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। ইনায়া সবে মাত্র গোসল সেরে ঘরে ফিরেছে। সদ্যস্নাত শরীরটায় এখনো পানির শীতলতার রেশ, মাথার চুলগুলো গামছায় আবদ্ধ করে রেখেছে। ইয়াশ এখনো গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন। জেগে থাকা অবস্থায় তাকে এক মুহূর্তের জন্যও একা ফেলে রাখা সম্ভব নয়, তাই যত কাজই থাকুক, সন্তানটার ঘুম ভাঙার আগেই তার কাছে ফিরে আসতে হয় ইনায়াকে।ঘরে প্রবেশ করেই ইনায়ার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো ইয়াশের ওপর। কোনো অস্থিরতা নেই ছোট্ট মুখটায়। নিঃশ্বাসের মৃদু ওঠানামায় বোঝা যাচ্ছে, নিদ্রার গভীর কোনো রাজ্যে হারিয়ে আছে সে। ইনায়া ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছেলের পাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো। মাথার গামছাটা ঠিক করে নিলো। তারপর সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইলো নিজের পৃথিবীটার দিকে।

ঘুমের ঘোরে ইয়াশের ঠোঁট দুটো বারবার নড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে যেনো মায়ের বুকের দুধ পান করছে। সন্তানের এই নিষ্পাপ কাণ্ড দেখে ইনায়ার ওষ্ঠকোণে অতি মৃদু এক হাসির রেখা ফুটে উঠলো।সেভাবেই ছেলের পানে তাকিয়ে রইলো সে। কতটা সময় পেরিয়ে গেলো, তার হিসাব নেই। মায়ের কাছে সন্তানের প্রতিটা অঙ্গভঙ্গিই যেনো আলাদা এক বিস্ময়। ইয়াশ ঘুমের মধ্যেই কখনো ঠোঁট বাঁকাচ্ছে, কখনো ভ্রু কুঁচকে ফেলছে, আবার কখনো অকারণেই মুখে ফুটে উঠছে ক্ষীণ হাসি। ইনায়ার চোখ দুটো যেনো প্রতিটা পরিবর্তন নিজের মধ্যে সযত্নে জমিয়ে রাখছে।হঠাৎ ইয়াশ আবারও হাসলো।ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো।এই হাসিটা! অবিকল আয়াশের মতো। সেই মানুষটার হাসি খুব বেশি দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। অভিমানের দীর্ঘ দেয়াল, দূরত্ব আর না বলা কত কথার আড়ালে হারিয়ে গেছে কত পরিচিত মুহূর্ত। তবুও সন্তানের মুখে সেই পরিচিত হাসির ছায়া দেখলেই কোথাও যেনো পুরোনো কোনো অনুভূতি নিঃশব্দে নড়ে ওঠে।ইনায়া ধীরে ধীরে ঝুঁকে এসে ছেলের কপালে অতি যত্নে একটা চুমু এঁকে দিলো।অবিকল তার বাবার মতো দেখতে। চোখ, মুখের গড়ন, হাসির ভঙ্গি, কোথাও যেনো আয়াশ নিজের অস্তিত্বটুকু রেখে গেছে এই ক্ষুদ্র মানবটার মাঝে।ইনায়া ছেলের হাসিমাখা মুখের পানে তাকিয়ে আনমনে বলে ওঠে-

“ তুমি জানো তোমার হাসিটা একদম তোমার বাবার মতো,যদিও সেটা দেখার ভাগ্য আমার খুব কমই হয়েছে। তবুও তুমি তোমার বাবার মতো দেখতে একদম। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার তুমি।”

কথাগুলো বলেই ছেলের ক্ষুদ্র, নরম হাতটা নিজের আঙুলের মাঝে তুলে নেয় ইনায়া। এত ছোট্ট হাত, অথচ এই হাতের মুঠোর মাঝেই যেনো তার সমস্ত পৃথিবী বন্দী। পরম মমতায় সেই হাতটায় চুমু এঁকে দেয় সে। ইয়াশের ঘুমে কোনো ব্যাঘাত ঘটলো না। সে এখনো গভীর নিদ্রায় তলিয়ে আছে। ক্ষুধা তাকে স্পর্শ করলেই হয়তো এই শান্ত মুখটা মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়বে। আর সেই কান্নাই হবে ইনায়ার জন্য সন্তানের প্রয়োজনের সবচেয়ে স্পষ্ট আহ্বান। ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে বসে নিজের ল্যাপটপটা হাতে তুলে নেয়। ইয়াশের পাশে বসেই কাজ শুরু করতে হবে। হাতে পাওয়া কাজগুলো শেষ করা জরুরি। কাজের বিনিময়েই টাকা পাবে সে। তাই জীবনের প্রতিটা প্রয়োজনের মতো এই কাজের ক্ষেত্রেও কোনো প্রকার অবহেলার অবকাশ নেই।
একদিকে সন্তান, অন্যদিকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। এই দুইয়ের মাঝেই ইনায়ার প্রতিটা দিন অতিবাহিত হচ্ছে। ঠিক তখনই দরজায় মৃদু শব্দ তুলে টোকা পড়লো।
খুব ক্ষীণ শব্দ, যেনো দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাও চায় না তার আগমনে কোনো প্রকার শব্দ হোক।
ইনায়া সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গেলো কে এসেছে।

ল্যাপটপের পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে একবার ছেলের পানে তাকালো। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিলো। দরজার ওপাশে আয়াশ। দুজনের চোখাচোখি হলো।
ইনায়া কিছু বললো না। শুধু নিঃশব্দে সরে দাঁড়ালো।
আয়াশ ঘরে প্রবেশ করেই প্রথমে ঘুমন্ত ইয়াশের দিকে তাকালো। ক্ষুদ্র সন্তানটাকে এক ঝলক দেখার পর তার দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে স্থির হলো ইনায়ার ওপর।তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। আয়াশকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখেই ইনায়া কয়েক কদম পিছিয়ে গেলো। চোখেমুখে স্পষ্ট অনীহা। সেই পুরোনো অভিমান এখনো অটুট। আয়াশের উপস্থিতি এখনো তার ভেতরে শান্তির বদলে অস্বস্তির ঢেউ তুলছে।আয়াশ ক্লান্ত স্বরে বলে ওঠে-

“ চলুন ঢাকায় ফিরি।”

ইনায়া আরও কয়েক কদম পিছিয়ে যেতে চাইলো।কিন্তু তার আগেই আয়াশ তার কোমড় আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো। সদ্য গোসল করে আসা ইনায়ার স্নিগ্ধ শরীরের শীতলতা আয়াশও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছে। অথচ সেই পরিচিত স্পর্শেই ইনায়ার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।আয়াশের পানে না তাকিয়েই কাঠ কাঠ গলায় বলে ওঠে-

“ ছাড়ুন, আর সড়ে দাঁড়ান।”

আয়াশের দৃষ্টি কেমন অসহায় হয়ে উঠলো।

“ প্লিজ ইনায়া ফিরে চলুন, আমি কথা দিচ্ছি আপনি না চাইলে আমি আপনার ধারে কাছেও আসবো না। আপনি আপনার মতো থাকবেন।”

ইনায়ার বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তি আরও তীব্র হলো।

“ এই মুহুর্তে আমার কাছ থেকে দূরে সরুন। দমবন্ধ হয়ে আসচ্ছে আমার!”

আয়াশ যেনো কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো।
কণ্ঠে ক্ষীণ ব্যথা নিয়ে প্রশ্ন করলো-

“ এতোটাই অসহ্য হয়ে উঠেছি আমি?”

ইনায়ার চোখে কোনো কোমলতা নেই।

“ যদি বলি হ্যাঁ! আপনাকে দেখে এই মুহুর্তে আমার অসহ্য লাগছে।”

কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আয়াশ হাত সরিয়ে নিলো।
সরে যেতেই ইনায়া আরও খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। যেনো মাঝখানে কিছুটা দূরত্ব না থাকলে নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে সামলাতে পারবে না।আয়াশ আবারও অনুনয়ের সুরে বলে ওঠে-

“ প্লিজ ফিরে চলুন।”

ইনায়ার কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা।

“ যাবো না, চলে যান। বাড়ি ফিরতে মন চাইলে ফিরে যান। আটকে তো রাখিনি।”

আয়াশ কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে রইলো।

“ আপনিই আমার বাড়ি, সেই বাড়ি ছাড়া কিভাবে ফিরবো?”

ইনায়ার ওষ্ঠে ক্ষীণ, তিক্ত এক হাসি ফুটে উঠলো। এইসব উত্তর এখন শুনলেই তার অসহ্য লাগে। যে মানুষটা তার হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর জায়গায় আঘাত করেছে, তার মুখে ভালোবাসার এমন কথা শুনলে কোথাও যেনো পুরোনো ক্ষতগুলো আবারও জেগে ওঠে।ইনায়া ধীর কণ্ঠে বলে-

“ আমি আপনার বাড়ি? বাড়ি কাকে বলে জানেন? যাকে মানুষ ভালোবাসে, যাকে মানুষ তার হৃদয়ে ধরে৷ কিন্তু আমি আপনার কোনোটাতেও নেই, তাহলে কিভাবে হলাম আপনার বাড়ি?”

আয়াশের চোখে অসহায়ত্ব আরও গাঢ় হলো।

“ জানি না, কিছুই জানি না। শুধু এটাই আপনাকে আমার প্রয়োজন,ভীষণ প্রয়োজন! এই প্রয়োজন ফুরানোর নয়।”

ইনায়া চোখ নামিয়ে নিলো। এই কথাগুলোর উত্তর দেওয়ার মতো কোনো শব্দই যেনো তার কাছে নেই।তবুও নিজের সিদ্ধান্তে সে অটল।

“ আমি কথা বাড়াতে চাই না, আমি ওই বাড়িতে ফিরবো না। আর না ফিরবো আপনার সঙ্গে।”

আয়াশ অসহায় হয়ে পড়লো।কী করবে সে?কোন পথে এই মানুষটাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনবে?হঠাৎ যেনো মাথার ভেতর কোনো একটা ভাবনা এসে স্থির হলো। আয়াশ ধীরে ধীরে বলে ওঠে-

“ ওই বাড়িতে যেতে হবে, আপনি বাড়ির সামনের বাসায় উঠুন।”

ইনায়া কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর শান্ত গলায় বললো-

“ আপনি হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, সেই বাসার ভাড়া মাসে চল্লিশ হাজার। আর আমার এতো টাকা নেই, যে আমি সেই বাসায় থাকবো। তাছাড়াও আমি একা মানুষের এতো বড় বাসার প্রয়োজন নেই।”

আয়াশ বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলো না।

“ ভাড়া আমি দিবো, তবুও চলুন।”

ইনায়ার চোখে এবার স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠলো।

“ আপনার ভাড়া দেওয়া বাসায় আমি কেনো থাকবো? আমি যেখানে আছি সেখানেই ঠিক আছি।”

আয়াশ আবারও ভাবনায় পড়ে গেলো। কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে যেনো নিজের সমস্ত যুক্তি একত্র করলো। তারপর বললো-

“ ভাড়া কম হলে থাকবেন?”

ইনায়া বুঝতে পারছে, মানুষটা কোনো না কোনোভাবে তাকে ঢাকায় ফেরানোর চেষ্টা করছেই।সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে-

“ আপনি এখানে যতো ভাড়া দিচ্ছে,ওখানেও ততোই দিবেন। কোনো সমস্যা হবে না।”

আয়াশ এবার একটু থেমে উত্তর দিলো-

“ বাকি টাকা গুলো কি আপনি দিবেন? আপনাকে কি বললাম বুঝতে পারেননি?”

ইনায়ার ভ্রু কুঁচকে গেলো।আয়াশ এবার নিজের পরিকল্পনাটা স্পষ্ট করে বললো-

” না,আমি দিবো না, তবে পার্থক্য এটাই হবে আমি সেই বাসার মালিক হবো। আর আপনি ভাড়াটিয়া।”

ইনায়া কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।এই মানুষটার জেদ যে কখনো কখনো কতটা অদ্ভুত হয়ে ওঠে!

“ আর আমি আপনার বাসায় কেনো ভাড়া নিবো? সেই এক তো হলো, আপনি আমায় দয়া করে ভাড়া কম নিবেন।”

আয়াশ শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলে,

” বাসাটা তো আমার হবে, তাহলে সেখানকার ভাড়া আমি যাই দেই না কেনো, আপনি সেই পরিমাণ অর্থ দিতে পারলেই হলো।”

ইনায়া আর কথা বাড়ালো না।ক্লান্ত স্বরে শুধু বলে উঠলো-

“ আপাতত আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না।”

কথাটা শুনে আয়াশ আবারও থেমে গেলো।এত কাছে থেকেও মানুষটা যেনো তার নাগালের বাইরে।এত কথা বলেও যেনো ইনায়ার হৃদয়ের দরজায় পৌঁছাতে পারছে না সে।আয়াশের চোখে এবার কাতরতা জমে উঠলো। দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত ইনায়ার পানে তাকিয়ে থেকে খুব ধীর কণ্ঠে বলে ওঠে-

” আপনি কি কখনো আমার নিকট ফিরবেন না? আমি আপনায় ভালোবাসি!”

ইনায়া অদ্ভুত দৃষ্টিতে আয়াশের পানে চাইলো।এই কথাটা কতবার শুনেছে সে?কিন্তু কথার সঙ্গে অনুভূতির মিল খুঁজে পায়নি কখনো।তাই এবারও বিশ্বাস করার আগে সে যেনো মানুষটার চোখের গভীরে কোনো সত্য খুঁজে নিতে চাইলো।
আয়াশের পানে দৃষ্টি রেখেই ধীর কণ্ঠে বলে-

“ যেদিন মনে হবে “ভালোবাসি” শব্দটা সত্যিই আমার জন্য। সত্যি সেই “ভালোবাসি” শব্দটা অনুভূতি অনুভব করতে পারি, সেদিন নাহয় আবারও ভাববো আপনার কাছে ফিরবো কিনা।”

চলবে।