Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৬

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৬

0
9

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১৬ প্রথমাংশ

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

সময় গড়িয়ে গেছে। রাত্রির অবসান পেরিয়ে নতুন দিবাকরের সূচনা হয়েছে বহুক্ষণ আগেই। মধ্যগগনে উঠে আসা সূর্যটা এতক্ষণে নিজের প্রখর দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছে চারিধারে। অথচ হাসপাতালের কেবিনের ভেতরটা এখনো যেনো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় আবদ্ধ। ইনায়ার বুকের সঙ্গে ক্ষুদ্র,নরম প্রাণটা মিশে আছে। চোখ মুখ ফুলে রয়েছে, ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে সমগ্র অবয়বে। এই সময়টাতে প্রসবের পর শরীরে পানি নেমে এসে চেহারা, হাত, পা সবকিছুতেই এক ধরনের ভারী অবসন্নতা এনে দেয়। তাই চোখ-মুখ অনেকটা ফুলে যায়। নরমাল ডেলিভারি হওয়ায় শারীরিক জটিলতাও তেমন কিছু হয়নি। মা আর বাচ্চা দুজনই সুস্থসবল আছে, এটাই আপাতত স্বস্তির বিষয়। তারপরও আয়াশ বারবার ডাক্তারের কাছে জানতে চেয়েছে, পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা আছে কি না। ডাক্তার আশ্বস্ত করেছেন, তেমন কোনো জটিলতা নেই। কিন্তু ইনায়া? সে একটা বারের জন্যও আয়াশের সঙ্গে কথা বলেনি।

আয়াশের কণ্ঠনালিতে এতক্ষণে হাজারখানেক শব্দ এসে ভিড় করেছে। কত কথা বলতে চেয়েছে সে। কত প্রশ্ন, কত অনুনয়, কতদিনের জমে থাকা অভিমান ভাঙার আকুলতা, সবকিছুই যেনো কণ্ঠনালির কাছে এসে থমকে গেছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিটা শব্দই গিলে নিয়েছে সে। নাওমি কিছুক্ষণ আগেই নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে। রুমাইসা আর মেহরিন এখনো ইনায়ার সঙ্গেই রয়েছে। মেহরিন একবার ইনায়ার দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বলে-

“ আপু তুমি বরং ফ্রেশ হয়ে নাও। মেসে ফিরতে হবে তো।”

ইনায়া কোনো উত্তর দিলো না। ধীর হাতে ছোট্ট কাপড়ে মোড়ানো মানবশিশুটাকে শুইয়ে দিলো। ক্ষুদ্র দেহটা নিদ্রামগ্ন। মুখটা নিষ্পাপ প্রশান্তিতে আবৃত। আয়াশ নীরবে সবটা দেখছে।তার বুকটা যেনো খা খা করা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এই সময়টাতে সম্পূর্ণ ইনায়ার পাশে থাকা প্রয়োজন। এই দুর্বল শরীরটাকে আগলে রাখা প্রয়োজন। সন্তানের প্রতিটা প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। অথচ তাদের মাঝখানের দূরত্বটা আজ যেনো কোনো অদৃশ্য সীমারেখা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত কাছে থেকেও ইনায়াকে স্পর্শ করার অধিকার নেই তার। কথা বলার অধিকার নেই। কেবল চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু দেখার অনুমতিটুকুই যেনো অবশিষ্ট রয়েছে। হঠাৎই নিদ্রামগ্ন ক্ষুদ্র মানবপ্রাণটা মুখ কুঁচকে কেঁদে উঠলো।

“ ওয়া ওয়া ওয়া!”

ক্ষুদ্র কান্নার শব্দে কেবিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিতেই আয়াশ যেনো মুহূর্তেই নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো। কোনো বিলম্ব না করে দ্রুত এগিয়ে গেলো ক্ষুদ্র প্রাণটার কাছে।অতি সাবধানে নরম শরীরটাকে নিজের বক্ষস্থলে আগলে নিলো।এই মুহূর্তে তার মস্তিষ্কে আর কোনো চিন্তা নেই। নেই ইনায়াকে নিয়ে কোনো অভিমান, নেই নিজের কষ্টের হিসাব। কেবল বুকে মিশে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটার কান্না থামানোর ব্যাকুলতা। আয়াশ আলতো হাতে শিশুটার পিঠে হাত রাখলো। ধীরে ধীরে সেখানে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। তার প্রতিটা স্পর্শে সতর্কতা, যেনো সামান্য অসাবধানতাতেও এই ক্ষুদ্র প্রাণটার কোনো অসুবিধা হয়ে যেতে পারে।

“ কি হয়েছে তোমার? বাবা আছি তো, লুক কিছু হয়নি বাডি। বাবা আছি তো!”

কণ্ঠে মিশে থাকা মমতাটা যেনো বহুদিনের কোনো অপূর্ণতার দরজা খুলে দিলো।মানবশিশুটি কি আদৌ বুঝলো বাবার এই আদরমাখা বাক্যগুলো? হয়তো বুঝলো। হয়তো বাবার কণ্ঠের ভাঙনটুকু অনুভব করতে পারলো। এতক্ষণ কাঁদতে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটা এমন মমতামাখা স্পর্শ পেতেই ধীরে ধীরে মিইয়ে গেলো। কান্নার তীব্রতা কমে এলো। ছোট্ট মুখখানি আবারও নিদ্রার আবেশে ঢেকে যেতে লাগলো।হয়তো এই উষ্ণ বক্ষের আশ্রয়টুকুই তার প্রয়োজন ছিল আয়াশ ছেলেকে বুকে আগলে নিয়েই পুরো কেবিনে ধীর পায়ে পায়চারি করতে লাগলো।

বুঝতে পারছে, এই ক্ষুদ্র প্রাণটা এখন কেবল উষ্ণতা চাইছে। একটু পরেই হয়তো সেই উষ্ণতা থেকে তাকে সরে যেতে হবে। তাই আরও একটু শক্ত করে নয়, বরং আরও যত্নে নিজের বক্ষের সঙ্গে মিশিয়ে রাখলো ছেলেকে। ক্ষুদ্র মাথাটা নিজের বুকের কাছে ঠেকিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো মানুষটা।কিছুক্ষণ পর ইনায়া বের হলো। বের হতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো সেই দৃশ্যের ওপর। বাবার বক্ষে মিশে থাকা তার সদ্যোজাত সন্তান।আয়াশের বড় দুটো হাত ক্ষুদ্র প্রাণটাকে এমনভাবে আগলে রেখেছে, যেনো পৃথিবীর কোনো অশুভ স্পর্শও তার সন্তানের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। আর সেই বিশাল বক্ষের মাঝখানে ইনায়ার শরীরের অংশ, তার রক্তের অংশ, তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফল, নিঃশব্দে ঘুমিয়ে আছে। ইনায়ার নেত্রজোড়া কেমন ঝাপসা হয়ে এলো। সামনের দৃশ্যটা দেখে যেকোনো মায়েরই হয়তো এমন হতো। আজ যদি তাদের মাঝখানের সবকিছু ঠিক থাকতো, আজ যদি অভিমান, অভিযোগ আর দূরত্ব বলে কিছু না থাকতো, তবে হয়তো এই মুহূর্তে তার চেয়ে সুখী মানুষ আর কেউ থাকতো না। আয়াশ তার সন্তানকে বুকে আগলে রাখতো, আর ইনায়া পাশে বসে সেই দৃশ্য দেখে হাসতো।কিন্তু বাস্তবতা এতটা নির্মম কেনো? ইনায়া বেশ কিছুক্ষণ সেই দিকেই তাকিয়ে রইলো। তারপর নিজের হুঁশ ফিরে পেতেই দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। হাঁটতে তার বেশ খানিকটা কষ্ট হচ্ছে। প্রসবের পর শরীর এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। প্রতিটা পদক্ষেপেই ক্লান্তির ভার টের পাচ্ছে।ইনায়া এগিয়ে আসতেই আয়াশ তাকালো তার দিকে।

মেহরিন আর রুমাইসা একে অপরের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো।তাদের একা কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। কেবিনে এখন কেবল তিনজন। ইনায়া,আয়াশ আর তাদের মাঝখানে ঘুমিয়ে থাকা ক্ষুদ্র মানবপ্রাণ।
শিশুটার মুখ এখনো আয়াশের বক্ষের সঙ্গে মিশে আছে। এমনভাবে আশ্রয় নিয়েছে, যেনো এই বুকটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান।ইনায়া গায়ে কালো বোরখাটা জড়িয়ে নিলো। আয়াশ আর চুপ থাকতে পারলো না।

“ ইনায়া!”

ওপাশ থেকে এবারও কোনো উত্তর এলো না। আয়াশ আর উত্তরের আশা করলো না। নিজের বক্ষে মিশে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তারপর কাতর কণ্ঠে বলে উঠলো-

“ইনায়া প্লিজ আমাকে আপনার সঙ্গে থাকার সুযোগ দিন। আমি আপনাদের সঙ্গে বাঁচতে চাই। আমাকে এইভাবে একা করবেন না। প্লিজ বাবা হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন না।”

ইনায়া এবার আয়াশের পানে তাকালো। চোখে কোনো কোমলতা নেই। আবার সম্পূর্ণ কঠোরতাও নেই। বরং বহুদিনের ক্লান্তি, জমে থাকা অভিমান আর ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের এক অদ্ভুত মিশ্রণ তার দৃষ্টিজোড়া জুড়ে। নির্লিপ্ততার দেয়ালটা ভেঙে অবশেষে বলে ওঠে-

“ কোথায় বঞ্চিত করেছি? আপনি ওর বাবাই থাকবেন, আর আমার কোনো অধিকার নেই আপনাকে বঞ্চিত করার। যখন ইচ্ছে হবে দেখবেন, তবে সঙ্গে থাকার কথা বলবেন না!”

আয়াশের চোখ দুটো মুহূর্তেই বিষণ্ণ হয়ে এলো।নিজের সন্তানকে আরও একটু কাছে টেনে নিলো সে। তারপর অসহায় কণ্ঠে বলে উঠলো-

“ আমি তো এক ওকে চাইনা, আমি আপনাকে, আমার ছেলেকে একসঙ্গে চাই। প্লিজ আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই থাকবেন, আমি কোনো বাঁধা দিবো না। তবুও আমাকে আপনাদের থেকে দূরে সরাবেন না!”

ইনায়ার বুকের ভেতরটা যেনো কথাগুলোর প্রতিটা শব্দে কেঁপে উঠলো। তবুও মুখে সেই একই নির্লিপ্ততা। যে নির্লিপ্ততার আড়ালে কতটা ভাঙাচোরা মন লুকিয়ে আছে, তা হয়তো আয়াশকে দেখাতে চায় না।
ইনায়া ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে বলে-

“ আমি যা চাইছি, তাই করছি আয়াশ। তবে একসঙ্গে থাকার অনুরোধ করবেন না, অনেকটা সময় থেকেছি তো।”

কথাটা শেষ হতেই কেবিনের বাতাসটুকুও যেনো ভারী হয়ে এলো।আয়াশ আর কোনো কথা বললো না।শুধু বুকের সঙ্গে মিশে থাকা নিজের ক্ষুদ্র মানবটার দিকে তাকিয়ে রইলো।একজন বাবা তার সন্তানকে পেয়েছে।কিন্তু সেই সন্তানের মাকে এখনো হারিয়ে বসে আছে।

“ আর একবার চেষ্টা করা যায় না?”

“ আমি কতবার চেষ্টা করেছি বলুন তো?”

ইনায়ার প্রশ্ন আয়াশ থমকে গেলো। না চাইতেও তার এখানে কিছু বলার থাকলো না, তবুও সে হার মানলো না। এখন কোনো কিছু নিয়ে চাপ দিতে চায় না সে ইনায়াকে।

“ আমি আবার আপনাকে হাসিল করে নিবো ইনায়া। শুধু আপনি আমার উপর একটু দয়া করিয়েন।”

—-

সময় পেরিয়ে আরও দুটো দিন গড়িয়ে গেছে। ব্যস্ত নগরী নিজের চিরচেনা ব্যস্ততার স্রোতে প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছে। অথচ সেই ছুটে চলা পৃথিবীর এক কোণে আয়াশের সমস্ত ব্যস্ততা এসে থেমেছে ক্ষুদ্র এক প্রাণকে ঘিরে। বাহিরের পানির কল থেকে হাত পরিষ্কার করছে আয়াশ। ছেলের সঙ্গে দেখা করার আগে প্রতিবারই নিজের হাত ভালোভাবে ধুয়ে নেয় সে। নবজাতক শিশুরা ভীষণ নাজুক হয়। এই পৃথিবীর অদৃশ্য রোগজীবাণুর সামান্য সংস্পর্শও তাদের কোমল শরীরের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এই সময়টাতে নিজের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অসাবধান হতে চায় না আয়াশ। যতক্ষণ তার ছেলেটার কাছে থাকবে, ততক্ষণ যেনো তার কারণে ক্ষুদ্র মানবটার কোনো অস্বস্তি না হয়, সেই ব্যাপারেই সর্বক্ষণ সচেতন থাকে।

তিনটা দিন।মাত্র তিনটা দিন এই পৃথিবীর আলো দেখেছে ক্ষুদ্র মানবটা। অথচ এই অল্প সময়েই যেনো নতুন জগতটার সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে সে। তার দিন-রাত্রির অধিকাংশ সময়ই কেটে যায় ঘুমের নিস্তব্ধতায়। ক্ষুদ্র বুকটা নিয়মিত ওঠানামা করে, মুঠোবদ্ধ হাত দুটো কখনো অল্প নড়ে ওঠে, আবার পরমুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে যায়। পিতৃত্বের অনুভূতি যে এতটা অদ্ভুত হতে পারে, আগে কখনো জানা ছিল না তার। ঠিক তখনই ইনায়া নেমে এলো।আয়াশ উসকো-খুসকো দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো সেই ছোট্ট ঘুমন্ত অবয়বটার দিকে। মুখোমুখি হতেই দুজনের মাঝের পুরোনো দূরত্বটুকু যেনো আবারও নিঃশব্দে মাথা তুলে দাঁড়ায়। ইনায়া চাইলেও তার সন্তানকে বাবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না। তাদের মধ্যকার সম্পর্কের হিসাব আলাদা, অভিমান আলাদা, অতীতের সমস্ত তিক্ততাও তাদের নিজেদের। কিন্তু সন্তানের ক্ষেত্রে সেই হিসাবের কোনো স্থান নেই।

ইসলামে একজন বাবার যে অধিকার, কেবল ব্যক্তিগত অভিমান কিংবা দাম্পত্যের টানাপোড়েনের কারণে তাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা জায়েজ নয়। আর আয়াশ তো তার সন্তানের জন্য ক্ষতিকর কোনো মানুষ নয়, যে কারণে ইনায়া তাকে দূরে সরিয়ে রাখবে। তাদের মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তা তাদের দুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সন্তানকে ঘিরে সেখানে কোনো সম্পর্কের হিসাব নেই। আয়াশ যদি কোনোদিন না জানতো এই ক্ষুদ্র প্রাণটার অস্তিত্বের কথা, তাহলে হয়তো ইনায়া নিজেও কখনো তাকে জানাতো না। নিজের সমস্ত কষ্ট, ভয় আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা একাই বহন করে নিতো। কিন্তু এখন যখন মানুষটা জানে, যখন নিজের সন্তানের অস্তিত্ব তার চোখের সামনে, তখন তার পিতৃত্বের অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়ার মতো কঠিন হতে পারে না ইনায়া। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সে।

আয়াশের বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠলো। তবুও সেই অস্থিরতা প্রকাশ করার সাহস হলো না তার। ইনায়ার সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও এখন প্রতিটা শব্দ যেনো মেপে বলতে হয়। তাই দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

“ আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো? সব ঠিক আছে তো?”

ইনায়া কোনো উত্তর দিলো না। শুধু পাতলা কাপড়ে মোড়ানো নরম প্রাণটাকে ধীরে ধীরে তার বাবার দিকে এগিয়ে দিলো। আয়াশের হাত কেঁপে উঠলো। এতটা ক্ষুদ্র একটা অস্তিত্বকে নিজের হাতে নেওয়ার সময় বুকের ভেতর যে অনুভূতিটা জন্ম নেয়, তার কোনো ভাষা হয় না। অত্যন্ত সাবধানে, যেনো নিজের সামান্য অসাবধানতায় শিশুটার কোমল শরীরটায় কোনো আঘাত না লাগে, সেই ভয় নিয়েই ক্ষুদ্র মানবটাকে নিজের কাছে তুলে নিলো সে। শিশুটাও সামান্য কেঁপে উঠলো। আয়াশের বুকটা সঙ্গে সঙ্গে কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো। ইনায়া খুব একটা কথা বলে না তার সঙ্গে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো শব্দও ব্যয় করে না। বাচ্চার বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে যতটুকু প্রয়োজন, ঠিক ততটুকুই উত্তর দেয়। এর বাইরে যেনো তাদের মাঝে কোনো কথার অবকাশই নেই। এই মাসটা থেকে ইনায়া ছোট ছিমছাম একটা বাসা নেবে। দিন যত গড়াবে, শিশুটার কান্নাকাটি, রাত জাগা, নানারকম প্রয়োজন ততই বাড়বে। তখন না চাইতেও আশেপাশের মানুষ বিরক্ত হতে পারে। আর ইনায়া চায় না, তার সন্তানকে ঘিরে অন্য কারো অসুবিধা হোক। নিজের কষ্ট সে সহ্য করে নিতে পারবে, কিন্তু নিজের কারণে অন্য কারো অস্বস্তি হোক, সেটা যেনো কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না মেয়েটা।

দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়ার দিকে একবার তাকালো আয়াশ।
মেয়েটার মুখে ক্লান্তির ছাপ এখনো স্পষ্ট। শরীরটাও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটাই যে তার জন্য কষ্টকর, সেটা আয়াশের চোখ এড়িয়ে গেলো না।
সামনের চেয়ারটা টেনে এনে ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিলো সে।কিছু বললো না।শুধু চোখের ইশারায় বসতে বললো।
ইনায়া নীরবে বসে পড়লো। সত্যিই দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তার। শরীরের দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবুও আয়াশের সামনে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করার কোনো ইচ্ছা নেই তার। আয়াশ পুরো পৃথিবী ভুলে তাকিয়ে আছে নিজের ছেলের দিকে। ক্ষুদ্র মুখখানা ঘুমে আচ্ছন্ন। এতটাই শান্ত যে দেখে মনে হয় পৃথিবীর কোনো দুঃখ, কোনো অশান্তি এখনো তার কাছে পৌঁছাতে পারেনি।
আয়াশের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো।
তারপর শিশুটার মুখের আরও কাছে ঝুঁকে নরম স্বরে বলে উঠলো-

“ হেই বাডি লুক, একটু তাকাও৷ দেখো বাবা এসেছি।”

আয়াশ নিজের আঙুলের ডগা দিয়ে অত্যন্ত আলতো করে ক্ষুদ্র নাকটা ছুঁয়ে দিলো। শিশুটার মুখখানা সঙ্গে সঙ্গে সামান্য কুঁচকে গেলো। দৃশ্যটা দেখে আয়াশের মুখে আবারও মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়লো। যেনো এই সামান্য নড়াচড়াটুকুও তার কাছে বিরাট কোনো প্রাপ্তি।কতদিন ধরে এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছে সে! কখনো দূর থেকে, কখনো কেবল কল্পনায়, কখনো ইনায়ার নীরবতার আড়ালে নিজের সন্তানের অস্তিত্ব অনুভব করে। অথচ আজ সেই সন্তান সত্যিই তার দুই বাহুর মাঝে।আয়াশ শিশুটার মুখের দিকে তাকিয়েই মৃদু স্বরে আবার বলে উঠলো-

“ হেই লুক, তুমি কি জানো তুমি তোমার মায়ের মতো নাক পেয়েছো?”

কথাটা বলেই ক্ষীণ হেসে ফেললো সে।ইনায়া চুপচাপ বসে রইলো। কিন্তু আয়াশের কণ্ঠে নিজের উল্লেখটা শুনে তার স্থির চোখের পাতায় অতি সামান্য কম্পন দেখা গেলো।
মান অভিমান এখনো আছে। দূরত্বও আছে, তবুও এই মানুষটাকে ভালোবাসে। হয়তো এখন আগের মতো বলা হয় না, প্রকাশ করা হয় না। তাই বলে কি সবকিছু শেষ হয়ে গেছে? না সবকিছু আগের মতোই রয়েছে, শুধু তাদের সম্পর্কটা চাপা পরেছে কোনো এক অদৃশ্য মায়াজালে। কিছু অনুভূতি তার ভিতরেই চাপা পরে গেছে। আয়াশ অনেকটা সময় তার ছেলের সঙ্গে কাটালো। অনেক কথা বললো ঘুমন্ত ছেলের সঙ্গেই। এখন বিদায়ের বেলা এসেছে, ইনায়া কোলে তুলে নিলো। আয়াশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে-

“ প্লিজ ইনায়া, আপনার সমস্যা হলে আমায় জানাবেন। স্বামী হিসেবে না হোক, বন্ধু হিসেবে আমাকে বলবেন। কোনো সমস্যা হলে নিজের মধ্যে চেপে রাখবেন না, এখন আপনি একা নন, আপনার সুস্থতার সঙ্গে আরও একজন জড়িয়ে আছে। তাই প্লিজ নিজের সঙ্গে হেরফের করবেন না।”

“ আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আপনার এবার ফিরে যাওয়া উচিত, চাকরি ছেড়ে এখানে পরে আছেন৷ আদৌও চাকরি আছে?”

“ সেটা কবেই গেছে, ওইসব নিয়ে আমি ভাবছিনা। আর না আপনাদের ছেড়ে যাচ্ছি।”

“ কিসের আশায় আছেন আপনি? ফিরে যান। আমার মন পাথরে পরিণত হয়েছে, আপনাকে দেখলে আমার পুরোনো কথা মনে পরে। যা আমি মনে করতে চাই না।”

আয়াশ বিষণ্নতা ঘেরা কণ্ঠে খানিকটা হেসে বলে-

“ কি করবো বলুন, আপনি ছাড়া আমি ভালো নেই। আর কেউ কারো ভালো থাকা না নিয়ে ফেরে না। তাহলে আমি কি করে ফিরবো বলুন।”

ইনায়া কিছুক্ষণ আয়াশের দিকে তাকিয়ে থেকে উপরে চলে গেলো। আয়াশ অনুতপ্ত, সে উপলব্ধি করতে পারে৷ কিন্তু সেখানে কিভাবে ফিরবে যেখানে তার জন্য ভালোবাসা নেই।
ভালোবাসা ছাড়া সে জীবনে অনেক বছর কাটিয়েছে, তাই হুট করে ভালোবাসা পাওয়ার লোভ তাকে জেঁকে বসেছিলো। কিন্তু সেই জেঁকে বসাই ছিলে তার ভুল, তাদের মতো মানুষদের ভালোবাসা চাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও, পাওয়ার ভাগ্য সবার থাকে না। ভাগ্য সবসময় সবাইকে সবকিছু দিয়ে পাঠায় না। তার ভাগ্যেও সেটা নেই। আয়াশ যেটাকে ভালোবাসার নাম দিচ্ছে, সেটা হয়তো তার অপরাধবোধ থেকে আসা সূক্ষ্ম অনুভূতি।

#চলবে

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১৬ বর্ধিতাংশ

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

চোখের পলকেই সময় যেনো নিজের সমস্ত ব্যস্ততা নিয়ে দ্রুতগামী হয়ে ছুটে চলেছে সম্মুখপানে। তাকে থামিয়ে রাখার মতো কোনো মায়া নেই, নেই একটুখানি অবকাশও। দিন পেরিয়ে রাত, রাত পেরিয়ে আবার নতুন দিনের আগমন ঘটেছে। এভাবেই দেখতে দেখতে কালের গর্ভে বিলীন হয়েছে আরও একটা মাস, নীরবে এসে দাঁড়িয়েছে নতুন মাসের দোরগোড়ায়।

ইনায়া নতুন বাসায় উঠেছে আজ কয়েকদিন হলো। নিজের বলতে তেমন কোনো জিনিসপত্রই নেই তার, তাই তার ঘর গোছানো কিংবা সাজিয়ে তোলার ঝক্কিও খুব একটা পোহাতে হয়নি। ছোট্ট এই বাসাটাতে এখনো সংসারের পূর্ণতার কোনো ছাপ পড়েনি। চারপাশে এক ধরনের নিরাভরণ শূন্যতা, অথচ সেই শূন্যতার মাঝেও কোথাও যেনো নতুন করে বেঁচে থাকার ক্ষীণ প্রত্যয় লুকিয়ে আছে। এখন থেকে ধীরে ধীরে টুকিটাকি সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হবে। তবে ইচ্ছে থাকলেই তো সব ইচ্ছের বাস্তবায়ন করা যায় না। হাতে টাকা নেই তেমন, তাই প্রয়োজন আর সামর্থ্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রতিটা সিদ্ধান্তই তাকে ভেবেচিন্তে নিতে হয়।

এরই মাঝে তার ছোট্ট ছেলেটার নামও রাখা হয়েছে “ ইয়াশ ফারিস চৌধুরী ” নাম ঠিক করার পরপরই আকিকার কথা উঠেছিল। ইনায়া প্রথমে রাজি হয়নি। এখনই আকিকা করার কোনো ইচ্ছেই ছিল না তার। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী একটু একটু করে টাকা জমিয়ে, একদিন নিজের উপার্জনের অর্থেই ছেলের আকিকা করার ইচ্ছে ছিল। মাতৃত্বের সঙ্গে মিশে থাকা সেই ছোট্ট,গভীর আত্মসম্মানটুকু সে নিজের কাছেই রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু আয়াশ হতে দেয়নি।বাবা হিসেবে ছেলের প্রতি তার যে অধিকার, সেই অধিকার থেকেই ইয়াশের আকিকা করিয়েছে সে। ইনায়ার আপত্তিকে সে নিজের দায়িত্বের পথে অন্তরায় হতে দেয়নি। ঢাকা থেকে তার শ্বশুর, শাশুড়ি আর ননাসও এসেছিল। শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে তারা ছুটে এসেছিল ছোট্ট শিশুটার এই বিশেষ দিনে। এখানকারই একটা অনাথ আশ্রমে সম্পন্ন হয়েছিল আকিকার অনুষ্ঠানটা। কেউ ইনায়াকে ফিরে যাওয়ার জন্য জোর করেনি। তার সিদ্ধান্তকে সবাই সম্মান দেখিয়েছে। তবুও তাদের নীরব দৃষ্টির অন্তরালে একটাই মাত্র প্রত্যাশা ছিল। সবাই চায়, কোনো একদিন যেনো ইনায়া আর আয়াশ নিজেদের মধ্যকার সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান আর দূরত্ব পেছনে ফেলে আবারও এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়।কিন্তু ইনায়া সেই ব্যাপারে কাউকেই কোনো আশ্বাস দেয়নি।আশা দেওয়ার মতো অবস্থায়ও সে নেই। নিজের ভেতরের যে অমীমাংসিত অধ্যায়গুলো এখনো নিঃশব্দে রক্তক্ষরণ করে, সেগুলোর কোনো উত্তর তার নিজের কাছেই নেই। অন্য কাউকে উত্তর দেওয়ার মতো অবকাশই বা কোথায়?

ছোট্ট ইয়াশ এখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। নিস্তব্ধ ঘরের একপাশে শুয়ে থাকা শিশুটার ক্ষুদ্র বুকখানা নিয়মিত ওঠানামা করছে। আর তার কাছেই বসে ইনায়া ছেলের শুকনো কাপড়গুলো একে একে গুছিয়ে নিচ্ছে। এই ঘরে তার জিনিস বলতে আপাতত একটা খাটই রয়েছে। খাটটাও আয়াশই কিনে দিয়েছে।ইনায়া যে বারণ করবে, সেটা যেনো আগেই বুঝে নিজের ছেলের অজুহাত দিয়েছে আয়াশ। তাই খাটটা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগই সে পায়নি। ইয়াশের ব্যাপারে কখনোই আয়াশের জীবনে নিজের উপস্থিতি দিয়ে কোনো প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করতে চায় না ইনায়া। ছেলেটার পূর্ণ অধিকার রয়েছে তার বাবার ভালোবাসার ওপর। তার বাবার জিনিসের ওপর। বাবার কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটি ছোট্ট উপহারের ওপর।সেই অধিকার থেকে ইনায়া কোনোদিন ছেলেকে বঞ্চিত করবে না।তবে নিজের জন্য আয়াশের আনা কোনো কিছুই এখনো গ্রহণ করে না সে। তার যতটুকু সামর্থ্য, ঠিক ততটুকুর মধ্যেই নিজের খরচ চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ইনায়া। কারও ওপর নির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা তার স্বভাবের সঙ্গে কোনোদিনই মানিয়ে যায়নি। ছোট থেকে বড় হওয়া অব্দি,নিজেই নিজেকে চালিয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে হাতে কোনো কাজ নেই। সেই কারণেই মনের ভেতরটা বেশ চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে আছেঘরের নীরবতার মাঝেই ইনায়ার ভাবনাগুলো একের পর এক পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।

অনলাইনে কিছু একটা ব্যবসা শুরু করা যায় কি না, সেটাই ভাবছে সে। হাতে টাকা এলে অল্প অল্প করে জমাবে। তারপর সেই জমানো অর্থ দিয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোটখাটো কোনো অনলাইন ব্যবসা শুরু করবে। আল্লাহ চাইলে হয়তো সেখান থেকেই কোনো একটা পথ খুলে যাবে। খুব বড় কিছু না হোক, অন্তত নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো সামান্য একটা অবলম্বন তো তৈরি হবে।
খালি ঘরে বসে সময় কাটানোর চেয়ে কাজের মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখাই ভালো। বিভিন্নভাবে উপার্জনের চেষ্টা করলে হয়তো নিজের প্রয়োজনগুলোও মেটাতে পারবে, পাশাপাশি সন্তানের ভবিষ্যতের জন্যও কিছু জমাতে পারবে। চাকরি করার ইচ্ছা তার এমনিতেও খুব একটা নেই। চাকরি মানে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে দিনের একটি বিশাল অংশ অন্য কারও নিয়মে, অন্য কারও সময়ের অধীনে কাটিয়ে দেওয়া। অথচ ইনায়া একা নয়। তার সঙ্গে তার সন্তানও রয়েছে। এই ছোট্ট প্রাণটার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে অমূল্য। সে কোনোদিনই চায় না, নিজের সন্তানের শৈশবের এই কোমল সময়গুলো চোখের আড়ালে চলে যাক। সে দেখতে চায়, তার সন্তান কীভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হয়ে উঠছে। প্রথম হাসি, প্রথম শব্দ, প্রথম নিজের মতো করে পৃথিবীটাকে চিনে নেওয়া, প্রতিটি ছোট্ট পরিবর্তনের সাক্ষী হতে চায় সে। সন্তানের পাশে থেকে তার বেড়ে ওঠার প্রতিটি ক্ষুদ্র অধ্যায় নিজের চোখে দেখতে চায়। তাই ঘরে বসে কাজ করার পথটাই তার কাছে অধিক স্বস্তির। নিজের কাজও করা যাবে, আবার ছেলেকেও সময় দেওয়া যাবে। হয়তো পথটা সহজ হবে না। হয়তো অনেক রাত জেগে পরিশ্রম করতে হবে, অনেক হিসাব মেলাতে হবে, অনেকবার ব্যর্থতার মুখোমুখিও দাঁড়াতে হবে। তবুও অসম্ভব তো কিছু নয়। মানুষ চাইলে শূন্য হাত থেকেও নিজের জন্য একটা পৃথিবী গড়ে নিতে পারে। শুধু প্রয়োজন একটু সাহস, একটু ধৈর্য আর আল্লাহর ওপর অটুট ভরসা।

ভাবনার সেই দীর্ঘ স্রোতের মাঝেই হঠাৎ নিস্তব্ধ ঘরের বুক চিরে ক্ষীণ এক কান্নার শব্দ ভেসে এলো। ইনায়ার চিন্তার সমস্ত সুতো মুহূর্তেই ছিঁড়ে গেল।
বিছানায় শুয়ে থাকা ইয়াশ নিদ্রার ঘোরেই কোমল, ক্ষুদ্র ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে কেঁদে উঠেছে। ঘুমজড়ানো মুখখানা কুঁচকে গেছে, ক্ষুদ্র হাত দুটো অস্থিরতায় নড়েচড়ে উঠছে।

“ উমম, ওয়..ওয়া!ওয়া!”

মুহূর্ত বিলম্ব না করে ইনায়া ছেলের মাথার কাছে এগিয়ে এলো। মাতৃসান্নিধ্যের আভাস পেতেই যেনো ছোট্ট প্রাণটার কান্নায় আরও তীব্রতা এলো। সেই কান্নার ভেতরেও কী এক অদৃশ্য দাবি, কী এক সহজাত নির্ভরতা। ইনায়া আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। সযত্নে ছেলেকে বুকে টেনে নিলো। মাতৃবক্ষের উষ্ণ আশ্রয় পেতেই কান্নার তীব্রতা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এলো। খিদে পেয়েছে ছোট্ট মানুষটার।খাবার পাওয়ার পর আর কোনো অভিমান রইলো না। ক্ষুদ্র ঠোঁট দুটো আপন মনে খাবার গ্রহণে ব্যস্ত হয়ে পড়তেই ইয়াশ সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে এলো। মায়ের বুকের কাছে নিশ্চিন্ত হয়ে শুয়ে রইলো সে, যেনো এই পৃথিবীতে তার সমস্ত নিরাপত্তা, সমস্ত প্রশান্তি আর সমস্ত ভালোবাসার ঠিকানা এই একটুকরো মাতৃস্নেহেই নিহিত।ইনায়া নীরবে তাকিয়ে রইলো তার সন্তানের মুখের দিকে। এই ছোট্ট প্রাণটাকে ঘিরেই তো এখন তার সমস্ত আগামীকাল।

ইয়াশের খাওয়া শেষ হতেই বুকের কাছ থেকে ক্ষুদ্র মুখখানা ধীরে ধীরে তুলে নিলো সে। বড়ো বড়ো আঁখি মেলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মায়ের মুখপানে। যেনো এই মুখখানার প্রতিটি রেখা, প্রতিটি মায়াবী অভিব্যক্তি নিজের ক্ষুদ্র স্মৃতির পাতায় এঁকে রাখতেই তার এই নিবিড় দৃষ্টি। ইয়াশকে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইনায়ার অধর কোণে আপনাতেই কোমল হাসির রেখা ফুটে উঠলো। মাতৃত্বের এই সামান্য দৃশ্যটুকুতেই যেনো ক্লান্ত শরীরের সমস্ত অবসাদ কোথাও গিয়ে হারিয়ে যায়। সে মৃদু স্বরে বলে-

“ কি হয়েছে হুম? পেট ভরেছে বুঝি? আরও ঘুমাবে নাকি?”

কোনো জবাব এলো না। ইয়াশ কেবল আধো আধো চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। ঘুমের আবেশ এখনো তার ক্ষুদ্র আঁখিজোড়ায় লেপ্টে আছে, অথচ মায়ের মুখ থেকে দৃষ্টি সরানোর কোনো ইচ্ছেই যেনো নেই। শিশুর সেই নির্বাক চাহনিতে এমন এক সরল মায়া লুকিয়ে আছে, যার কাছে পৃথিবীর সমস্ত শব্দই বুঝি অর্থহীন। ইনায়া আরেকটু ঝুঁকে এলো। আঙুলের ডগায় ছেলের গাল ছুঁয়ে দিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার মুখপানে।

“ কি হয়েছে? মা’য়ের দিকে তাকিয়ে হাসচ্ছো কেনো হুম?”

কথাটা শেষ হতেই ইয়াশ তার ক্ষুদ্র, কোমল হাতখানা ধীরে ধীরে উঠিয়ে মায়ের মুখের দিকে বাড়িয়ে দিলো। যেনো নিজের অজান্তেই ছুঁয়ে দেখতে চাইছে তার সবচেয়ে পরিচিত আশ্রয়টাকে।ইনায়ার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে উঠলো। এত ক্ষুদ্র একটা হাত! অথচ এই হাতের স্পর্শেই যেনো তার গোটা পৃথিবীটা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে পরম যত্নে ছেলের নরম হাতখানা নিজের মুঠোয় তুলে নিলো। ক্ষুদ্র আঙুলগুলো একে একে নিজের অধরের স্পর্শে ভরিয়ে দিতে লাগলো। প্রতিটা চুমুর সঙ্গে যেনো জমে থাকা সমস্ত মমতা সন্তানের শরীরে বিলিয়ে দিতে চাইছে সে।

ছেলের মুখপানে তাকিয়ে হঠাৎ করেই ইনায়ার চোখজোড়া কেমন সিক্ত হয়ে উঠলো। কত প্রতীক্ষার পর এই মুখটা দেখছে সে! কত রাত, কত প্রহর, কত দোয়া আর কত অগণিত আকাঙ্ক্ষা পেরিয়ে আজ তার বুকের কাছে শুয়ে আছে এই ক্ষুদ্র প্রাণটা।নিজের সন্তান। তার সন্তান। মাতৃত্বের এই পরিচয়টুকু এখনো যেনো ইনায়ার কাছে সম্পূর্ণ বাস্তব হয়ে ওঠেনি। মাঝে মাঝেই মনে হয়, এ বুঝি কোনো স্বপ্ন। একটু পরেই ঘুম ভাঙবে, আর উদরের ভেতর সেই পরিচিত নড়াচড়া অনুভব করবে। অথচ না, আজ সেই প্রাণটা তার বুকের ওপর। এখন তাকে ছুঁয়ে দেখা যায়, তার ছোট্ট হাত মুঠোয় নেওয়া যায়, তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করা যায়। ইনায়া আবেগপ্রবণ স্বরে বলে-

“কি নামে ডাকবো তোমায় হুম? আমার তো আব্বু ডাকতে ইচ্ছে করছে। আমার বাবা হয়ে এসেছো বুঝি মায়ের কাছে? জানো আমার কোনো বাবা নেই। এখন থেকে তুমিই আমার বাবা। ইয়াশ মায়ে আব্বু হয়। আমার আব্বাটা! আমার বাবাটা!”

শেষের কথাগুলো উচ্চারণ করতেই ইনায়ার কণ্ঠ যেনো নিজের অজান্তেই ভারী হয়ে আসলো। ক্ষুদ্র প্রাণটা কিছুই বুঝলো না বোঝার বয়সও হয়নি তার। তবুও মায়ের কণ্ঠের কম্পনটুকু যেনো অনুভব করতে পারে। আধো ঘুমন্ত আঁখিজোড়া মেলে আবারও তাকায় ইনায়ার দিকে। ক্ষুদ্র অধরদ্বয়ের কোণে ফুটে ওঠে অস্পষ্ট এক হাসি। ইনায়া থমকে যায়। এই হাসিটুকুই কি তবে তার পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি? যে মেয়েটা এতদিন নিজের জীবনের শূন্যতাকে বুকের ভেতর চাপা দিয়ে বেঁচে এসেছে, আজ সেই শূন্যতার মাঝেই তার সন্তান এসে এক অদ্ভুত পূর্ণতা এঁকে দিয়েছে। যার কাছে নিজের জন্য কোনো আশ্রয় ছিল না, আজ সেই মেয়েটাই একটা ক্ষুদ্র প্রাণের সম্পূর্ণ পৃথিবী। ইনায়া ছেলেকে বুকের সঙ্গে আরেকটু নিবিড় করে জড়িয়ে নেয়। মুখটা নামিয়ে ক্ষুদ্র কপালে আবারও চুমু এঁকে দেয়। মনের অন্তঃস্থল থেকে অজান্তেই একটি প্রার্থনা উঠে আসে। এই ছোট্ট প্রাণটা যেনো তার জীবনের সমস্ত অন্ধকারের ঊর্ধ্বে থাকে। কোনো অভাব যেনো তাকে স্পর্শ না করে। কোনো কষ্ট যেনো তার নিষ্পাপ পৃথিবীর দরজায় এসে দাঁড়াতে না পারে।

——–

বিকেলটা ধীরে ধীরে দিনের বুক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। কাকপক্ষীরা আপন আপন নীড়ে ফেরার ব্যস্ততায় আকাশের বুকে ডানা মেলছে। দিনের কোলাহল পেছনে ফেলে সন্ধ্যার নরম অন্ধকার যেনো চারপাশকে ধীরে ধীরে নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে উদ্যত। এই নীরব বিকেলেই বিছানার একপ্রান্তে বসে ইনায়া অত্যন্ত সাবধানে ইয়াশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নখ কেটে দিচ্ছে। মাতৃত্বের নতুন পাওয়া দায়িত্বে তার প্রতিটা স্পর্শে মিশে আছে অদৃশ্য এক ভয়। সামান্য ভুল হলেই তো ছোট্ট আঙুলটায় লেগে যেতে পারে। তার এতটুকু কষ্টও যে ইনায়ার অন্তঃস্থল বিদীর্ণ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ইয়াশ বড়ো বড়ো নিষ্পাপ আঁখি মেলে মায়ের মুখপানে তাকিয়ে আছে। মাঝে মাঝে ক্ষুদ্র দেহটা নাড়া দিয়ে উঠছে। তখনই ইনায়ার হাত আরও স্থির হয়ে আসে। নিঃশ্বাসটাও যেনো আটকে রাখে সে। একটুখানি অসাবধানতা, আর তার ছোট্ট প্রাণটাকে কষ্ট পেতে হবে, এই ভাবনাটুকুই যেনো মায়ের সমস্ত সতর্কতাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর মাঝেই দরজায় মৃদু টোকা পড়লো। শব্দটা কানে যেতেই ইনায়া বুঝে গেলো মানুষটা কে। ইয়াশকে ধীরে বিছানার ওপর শুইয়ে দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে খুলে দিতেই সম্মুখে ভেসে উঠলো আয়াশের ক্লান্ত মুখশ্রী। মানুষটার দুই হাত ভর্তি ব্যাগ। আয়াশ আজ আসবে, সেটা ইনায়া জানতো। প্রতিদিনের মতো আজও এসেছে, শুধু অন্যদিনের তুলনায় খানিকটা দেরি হয়েছে। কেনো দেরি হয়েছে, সেটা জানতে চাওয়ার কোনো আগ্রহ ইনায়ার মাঝে জন্ম নিলো না। অভিমান যখন হৃদয়ের গভীরে শেকড় গেড়ে বসে, তখন অনেক প্রশ্নই অকারণে ঠোঁটের কাছে এসে থেমে যায়।
ইনায়া নিঃশব্দে একপাশে সরে দাঁড়ালো। আয়াশ ঘরে প্রবেশ করলো।ক্লান্ত স্বরে ব্যাগগুলো ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো-

“ ইয়াশের পায়ে জুতা, মোজা, আর জামাগুলো হয় নাকি দেখুন একটু। আর এটা আপনার জন্য।”

প্রতিদিনের মতোই এরপর বেলিফুলের মালাটা এগিয়ে দিলো সে। ইনায়া ব্যাগগুলো গ্রহণ করলো। কিন্তু আয়াশের হাতের বেলিফুলের মালাটা নিলো না। সামান্য সময়ের জন্য আয়াশের চোখ স্থির হয়ে রইলো ইনায়ার মুখপানে। সেই দৃষ্টিতে অভিমান নেই, অভিযোগও নেই, আছে কেবল নিঃশব্দ এক আহত অনুভূতি। ইনায়ার এই নির্লিপ্ততা মানুষটার সহ্য হয় না সইতেও পারে না, আবার বলতে গেলেও কেমন এক অদৃশ্য সংকোচ তাকে থামিয়ে দেয়।বেলিফুলের মালাটা ধরা হাত ধীরে ধীরে নেমে এলো আয়াশের পাশে। সে আর কিছু বললো না। বিছানায় একমনে খেলতে থাকা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর হাত ধোয়ার জন্য নিঃশব্দে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলো। হাত, মুখ, পা পরিষ্কার করে ফিরে এসে আর কোথাও না থেমে সোজা ছেলের কাছে গিয়ে বসলো।
ইনায়া ব্যাগগুলোর ভেতর থেকে একের পর এক জিনিস বের করতে লাগলো। যতই বের করছে, ততই তার বিরক্তি বাড়ছে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছুই তার ভালো লাগে না। বাচ্চার প্রয়োজন আছে, তাই প্রয়োজনমতো কিনবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়ে এতটা বেশি কেনাকাটার কোনো অর্থ সে খুঁজে পায় না। জামা,জুতা,মোজা,খেলনা,ছোট ছোট টেডিবিয়ার,আরও কত কী!ইনায়ার ভ্রু কুঁচকে এলো।

“ আপনার কি মাথা খারাপ? এতো জিনিস কেউ এক সঙ্গে কেনে? এতো অপচয় করার কোনো মানে দেখছি না।”

আয়াশ জানে, সত্যিই হয়তো অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তার কী-ই বা করার আছে? রাস্তায় বের হলেই কোনো মার্কেটের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় যখন চোখে পড়ে ছোট্ট ছোট্ট জামা, ক্ষুদ্র জুতা,নরম খেলনা,টেডিবিয়ার। তখন আর নিজেকে থামাতে পারে না সে নিজেকে। মনে হয়, এটা ইয়াশের জন্য ভালো হবে। ওটা ইয়াশের প্রয়োজন হবে। আর পরমুহূর্তেই হাত চলে যায় দোকানির দিকে।একটা থেকে দুটো হয়।দুটো থেকে আরও কয়েকটা।শেষমেশ ব্যাগ ভর্তি করে সবকিছু নিয়েই ফিরে আসে আয়াশ।ইনায়া বিরক্ত চোখে একের পর এক জিনিস দেখতে দেখতে হঠাৎ আরেকটা ব্যাগের দিকে তাকালো।ব্যাগটা খুলতেই তার দৃষ্টি থমকে গেলো। ভেতরে বেশ কয়েকটা শাড়ি।ইনায়া বুঝতে পারলো, সেগুলো তার জন্যই আনা।হাত বাড়িয়ে আর ধরলো না। একসময় তো শাড়িই ছিলো তার সবচেয়ে প্রিয় পোশাক। সেই বাড়িতে থাকতে নিজেকে সবসময় পরিপাটি করে রাখতে ভালোবাসতো ইনায়া। আয়াশের পছন্দের রঙ, পছন্দের শাড়ি, পছন্দের অলংকার, যতটা পারতো নিজের সঙ্গে জড়িয়ে রাখতো। কপালে টিপ থাকতো। হাতের কব্জিতে চুড়ির মৃদু রিনিঝিনি শব্দ শোনা যেতো। শাড়ির আঁচল জড়িয়ে থাকতো শরীরজুড়ে। অথচ এখন?

কতদিন কপালে টিপ ওঠে না। কতদিন কব্জিতে চুড়ি শোভা পায় না। কতদিন শরীরে শাড়ির আঁচল জড়ানো হয় না।সবকিছু যেনো কোথায় হারিয়ে গেছে। অথবা ইনায়াই ইচ্ছে করে সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।ব্যাগের জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখতে রাখতে হঠাৎ বলে উঠলো-

“ দয়া করে শুধু শুধু অপচয় করবেন না। দরকার হলেই কিনবেন, টাকা আছে মানেই প্রয়োজন ব্যতীত কিনতে হবে এটা কোথাও লিখা নেই।”

কথাটা শুনে আয়াশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।তারপর দৃষ্টি গিয়ে থামলো সেই ব্যাগটার দিকে।

“ ওই প্যাকেটটা খুলছেন না কেনো?”

ইনায়া একবার তাকালো।

“ ওই প্যাকেটটা আপনার ছেলের জন্য কিছুই নেই যে খুলবো। যাওয়ার সময় ওটা নিয়ে যাবেন।”

“ নেওয়া কি যায় না?”

“ অবশ্যই না, নেওয়ার হলে অবশ্যই নিতাম। আপনার সংসার করছি না এখন, তাই আপনার টাকার উপর কোনো অধিকার নেই।”

কথাটা খুব সাধারণ স্বরে বললেও আয়াশের বুকের ভেতর কোথাও যেনো ভারী কিছু এসে পড়লো।সে কিছুক্ষণ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বললো-

“ বন্ধু হিসেবেও নেওয়া যায় না?”

ইনায়ার চোখে কোনো কোমলতা এলো না।

“ কোনো বন্ধু, এইসব তার বন্ধুকে দেয় না রোজ রোজ। তাছাড়াও আপনি, এইগুলো বন্ধু বলে কিনে আনেন নি। তাই নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।”

আয়াশের মুখটা আরও বিষণ্ণ হয়ে এলো।হতাশ কণ্ঠে বললো-

“পরতে হবে না। আপনার কাছে রাখুন।”

“ না, রাখতে পারবো না।”

আর কিছু বললো না আয়াশ।কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ প্রশ্ন করলো-

“ খাওয়ার কি রয়েছে?”

প্রশ্নটা যেনো সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। সকাল থেকে খালি পেটে আছে সে। ইনায়া আসার পর শেষ কবে আয়াশ পেট ভরে খাবার খেয়েছে, সেটা হয়তো আয়াশ নিজেও ঠিকমতো মনে করতে পারে না। তবুও নিজের ক্ষুধার কথা বলার অভ্যাস তার নেই। আজও কথাটা বেরিয়ে গেলো কেমন অন্যমনস্কতায়। ইনায়া আর কিছু বললো না। নিঃশব্দে খাবার আনার জন্য চলে গেলো। আর আয়াশ সেই অবকাশে ছেলেটাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নিলো। বাবার সান্নিধ্য পাওয়া মাত্রই ছোট্ট ইয়াশ কেমন মিইয়ে গেলো তার প্রশস্ত বক্ষপটে। ক্ষুদ্র দেহটা বাবার বুকের সঙ্গে এমনভাবে মিশে রইলো, যেনো এই উষ্ণ আশ্রয়টুকুই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান।আয়াশ ছেলের মাথায় ছোট ছোট চুমু এঁকে দিতে দিতে মৃদু স্বরে বললো-

“ বাবাকে মিস করেছো বাডি? বাবা তোমায় খুব মিস করেছি৷”

ইয়াশ যেনো কথাগুলোর অর্থ না বুঝেও বাবার কণ্ঠের মমতাটুকু বুঝে গেলো। আরও একটু মিশে গেলো বাবার বুকে। ক্ষুদ্র কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো অদ্ভুত আনন্দময় কিছু শব্দ। আয়াশের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। সে ছেলের সমগ্র মুখজুড়ে আলতো করে চুমু আঁকতে লাগলো। ইয়াশের শরীর থেকে ভেসে আসছে দুধের স্নিগ্ধ এক গন্ধ। সেই গন্ধে আয়াশের ক্লান্ত বুকটা কেমন প্রশান্ত হয়ে আসে। ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে আয়াশ বের করলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক জোড়া জুতা। ইয়াশের পা এখনো কতটা ছোট! তবুও আজ হঠাৎ করেই আয়াশের ইচ্ছে হয়েছে, নিজের ছেলের ক্ষুদ্র পায়ে সেই জুতা জোড়া শোভা পেতে দেখবে। অতি যত্নে জুতা পরিয়ে দিলো সে। ছোট্ট পায়ের তুলনায় এখনো বেশ বড়ো। তবুও আয়াশের চোখে যেনো এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কিছু নেই। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো-

“ ইসস কি মিষ্টি লাগছে বাডি তোমায়৷ একদম রসগোল্লা! বাবার ছোট্ট রসগোল্লা!”

বাবার আদুরে কথার অর্থ ইয়াশ কতটুকু বুঝলো, সেটা কেবল সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তবে হাত দুটো নাড়িয়ে নিজের আনন্দের জানান দিতে লাগলো সে।আয়াশের বুকটা আনন্দে ভরে উঠলো।ঠিক তখনই ইনায়া প্লেটে করে ভাত নিয়ে এলো।সঙ্গে ডাল আর ডিম ভুনা। দুপুরে রান্না করা খাবারই আবার গরম করে এনেছে সে। ভাতের সঙ্গে পানিও এনে আয়াশের সামনে রাখলো ইনায়া।তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো-

“ মায়ের কাছে আসো আব্বু, বাবাকে খেতে দাও৷”

বলেই আয়াশের কাছ থেকে ইয়াশকে নিতে হাত বাড়ালো।
আয়াশ ছেলেকে দিলো না। বরং একহাতের ওপর ইয়াশকে এমনভাবে হেলান দিয়ে বসিয়ে নিলো, যাতে একদিকে ছেলে তার বুকের আশ্রয়ে থাকে, অন্যদিকে সে আরাম করে খাবারটাও খেতে পারে।

“ থাক, ওকে নিয়েই খাই।”

আয়াশ খাবার মুখে তুললো।সাধারণ ভাত, ডাল আর ডিম ভুনা। আহামরি কোনো আয়োজন নয়। তবুও প্রথম গ্রাস মুখে যেতেই মানুষটার সমগ্র আত্মা যেনো তৃপ্তির কোমলতায় ভরে উঠলো। বিশেষত্ব খাবারে নয়। বিশেষত্ব সেই হাতের রান্নায়, যে হাতের স্পর্শের সঙ্গে তার জীবনের কত শত স্মৃতি মিশে আছে। এ ইনায়ার হাতের রান্না। যে রান্না আর পাঁচটা মানুষের রান্নার মতোই সাধারণ। তবুও আয়াশের কাছে এ যেনো অমৃত। কতদিন পর সে নিজের ঘরের স্বাদ পাচ্ছে! কতদিন পর এমনভাবে বসে ইনায়ার হাতের রান্না খাচ্ছে! প্রতিটা গ্রাসের সঙ্গে যেনো হারিয়ে যাওয়া এক সময়কে ফিরে পাচ্ছে সে। অত্যন্ত তৃপ্তি নিয়ে পুরোটা শেষ করলো আয়াশ।খালি প্লেটের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃদু স্বরে বললো-

” কতদিন পর আমার ঘরের খাবার খেলাম জানেন?”

ইনায়া কোনো উত্তর দিলো না।নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো আয়াশের মুখপানে। কথা বাড়ার আগেই খালি প্লেটটা হাতে তুলে নিলো। তারপর দ্রুত পায়ে সরে গেলো সেখান থেকে। জানে, আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলেই হয়তো কথা বাড়বে। আর কথা বাড়লে হয়তো এমন কিছু অনুভূতি সামনে চলে আসবে, যেগুলোকে এতদিন ধরে প্রাণপণে আড়াল করে রেখেছে সে। আয়াশ ইনায়াকে এভাবে সরে যেতে দেখলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো বিষাদময় এক হাসি। মানুষটা যেনো অভিমানকেও এখন নিজের নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে শিখেছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললো-

“ তোমার মায়ের অভিমানের পাহাড় বড্ড উঁচু বুঝলে। আমাকে চূড়ায় পৌঁছাতেই দিতে চায় না। আমায় পৌঁছাতে না দিলে, কিভাবে পাহাড় চূড়ায় পৌছাবো বলো?”

অবুঝ শিশুটি বাবার কথার কিছুই বুঝলো না।শুধু বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে বাবার মুখপানে।আয়াশ হেসে উঠলো।তারপর ইয়াশকে নিজের বুকের ওপর শুইয়ে নিয়ে নিজেও ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়লো। ছোট্ট মাথাটা ঠিক তার বুকের ওপর। ক্ষুদ্র বুকটা ধীরে ধীরে ওঠানামা করছে, সেই সামান্য স্পন্দনও আয়াশ নিজের বক্ষপটে স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছে। এক হাত দিয়ে ছেলের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো সে।
বাইরে ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।দিনের শেষ আলোটুকু নিভে গিয়ে চারপাশে জমেছে কোমল অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের ভেতর নিজের বুকে জড়িয়ে রাখা দুই প্রিয় অস্তিত্বের কথা ভেবে আয়াশের ক্লান্ত চোখ দুটো ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। তার জীবনে হয়তো অনেক অভাব আছে।
অনেক অপূর্ণতা আছে। ইনায়ার অভিমান এখনো অটুট।
তবুও এই মুহূর্তে বুকের ওপর নিশ্চিন্তে শুয়ে থাকা সন্তানটাকে অনুভব করতে করতে তার মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তির বিনিময়েও এই সামান্য সুখটুকু সে হারাতে রাজি নয়।ছেলের মাথায় আরেকবার মৃদু চুমু এঁকে আয়াশ ফিসফিসিয়ে বলে-

“ বাবা তোমরা নামক নীড়ে ফিরলেই সকল কান্তি ভুলে যাই। তোমরা আমার সকল শান্তির নীড়! আমার জীবনের নীল সুখ তোমরা!”

#চলবে