Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৯

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-১৯

0
16

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_১৯

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

দিবাকরের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ধরণীর বুকে রাত্রি নেমে এসেছে। ব্যস্ত ঢাকা শহর এখনো নিজস্ব গতিতে ছুটে চলেছে। আলোকিত রাজপথ, যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন আনাগোনা আর শহুরে কোলাহল মিলেমিশে তৈরি করেছে চিরচেনা এক ব্যস্ততা। ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় রাতই হয়ে গেছে। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তি শরীরজুড়ে স্পষ্ট, তবুও কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে এসে পৌঁছানোর পর কারো মুখেই সেই ক্লান্তির ছাপ যেনো আর টিকে রইলো না। তাদের অপেক্ষায় বাড়ির প্রায় সবাই এখন বাইরে। গাড়ির দরজা খুলে ইনায়া নামতেই আয়শা বেগম আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করলেন না। ছুটে এসে ইনায়াকে বুকের মাঝে আবদ্ধ করে নিলেন। দীর্ঘদিন পর আপন মানুষকে কাছে পাওয়ার আবেগে তার চোখেমুখে যেনো প্রশান্তির ছায়া।

ইনায়া নীরব। শুধু ঠোঁটের কোণে মৃদু এক হাসি ফুটে উঠলো। অপরদিকে আইরিন কোলে তুলে নিয়েছে ইয়াশকে। নতুন পরিবেশ, নতুন কিছু মুখ, চারপাশের এত আলোড়ন, সবকিছুই বড়ো বড়ো চোখ মেলে দেখছে ছোট্ট মানুষটা। জন্মের পর এই প্রথম এমন এক পরিবেশের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। এতদিন যে পৃথিবী কেবল ইনায়ার চারপাশে সীমাবদ্ধ ছিলো, আজ সেই পৃথিবীর পরিধি যেনো হঠাৎ করেই খানিকটা বিস্তৃত হয়েছে। সারা পথেই একটু পর পর কান্নায় ভেঙে পড়েছে ইয়াশ। কখনো আয়াশ তাকে কোলে নিয়ে গাড়ি চালিয়েছে, কখনো আবার গাড়ি থামিয়ে ছেলেকে শান্ত করেছে। বাবার বুকের কাছেও যেনো আজ তার অস্থিরতা পুরোপুরি থামেনি।আয়শা বেগম ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে আবেগমাখা কণ্ঠে বললেন-

“ অবশেষে তোদের দেখতে পেলাম।”

ইনায়া কোনো উত্তর দিলো না। শুধু মৃদু হাসলো। আইরি ইয়াশকে কোলে নিয়ে তার ছোট্ট মুখখানি আদরে ভরিয়ে দিচ্ছে। ইয়াশ জন্মের পর আপনজনদের কাউকেই কাছে পায়নি। আবার ইয়াশ পৃথিবীতে আসার আগেও, কিংবা জন্মের পরেও, এই মানুষগুলোর কেউই তাকে আপন করে কাছে পাওয়ার সুযোগ পায়নি।আইরিন শিশুটার গালে হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বললো-

“ আন্টিকে চিনতে পারেছো সোনা? সমস্যা নেই, এখন থেকে ইয়াশ সোনা আন্টির কাছে কাছে থাকবে।”

জুয়েল সাহেব ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। স্নেহভরা হাতে ইনায়ার মাথায় হাত রাখলেন। আঙুলের কোমল স্পর্শে যেনো কতদিনের জমে থাকা পিতৃস্নেহ প্রকাশের পথ খুঁজে পেলো।মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে নরম স্বরে বললেন-

“ এইভাবে কেউ না বলে যায়? ও অন্যায় করেছে, তাই বলে সেই শাস্তি আমাদেরও দিবি?”

ইনায়া চোখ নামিয়ে নিলো। তারপর ক্ষীণ স্বরে বললো-

“ ছিঃ বাবা! তেমন কিছু না। ”

জুয়েল সাহেব আর কিছু বললেন না। শুধু মমতায় ভরা কণ্ঠে বললেন-

“ ভিতর চল মা।”

ইনায়া এবার থমকে গেলো।৷ বাড়িটার দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তির ঢেউ উঠলো। একবার যে স্থান থেকে সমস্ত মায়া, সমস্ত সম্পর্ক, সমস্ত স্মৃতি পেছনে ফেলে চলে এসেছে, সেখানে আবার ফিরে গিয়ে নতুন করে মায়ার জালে জড়িয়ে পড়ার কোনো অর্থ সে খুঁজে পায় না।মাথা নিচু করে ধীর কণ্ঠে বললো-

“ মাফ করুন বাবা, এটা পরাবো না। মা আমাকে ঢাকায় আসতে বলেছে সেটা মেনেছি, তার বদলে এই বাড়িতে আসার জন্য আমাকে জোর করা হলে আমি আবারও অন্য কোথাও চলে যাবো।”

জুয়েল সাহেব মেয়েটার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। বুঝলেন, এই মেয়েকে জোর করে কোনো কিছু করানো সম্ভব নয়।অবশেষে নরম স্বরে বললেন-

“ আচ্ছা থাকতে হবে না, ভিতর চল। এতো লগ জার্নি করে এসেছিস, বিশ্রাম নিয়ে তুই তারপর যাস।”

ইনায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।

“ না বাবা সেটার প্রয়োজন হবে না। মা যে বাসা ঠিক করে দিয়েছে সেটায় গিয়ে উঠবো। আর হ্যাঁ, ভাড়াটা আমিই দিবো। আমার কোনো খরচ তোমাদের থেকে নিতে বলবে না প্লিজ।”

আইরিন এতক্ষণ ইয়াশকে কোলে নিয়ে সব শুনছিলো। এবার শিশুটাকে বুকের কাছে আগলে ইনায়ার দিকে তাকালো। চোখে অভিমানের ক্ষীণ ছায়া।

“ এতোটা পর করে দিয়েছো? আমরা কি কেউ নই তোমার?”

ইনায়ার মুখে এবার বিষণ্ণ এক হাসি ফুটে উঠলো।

“ পর কেনো হবে তোমরা? এই শহরে আপন বলতে তোমরাই আছো। তোমরা সবাই আমার আপন মানুষ হলেও, তোমাদের পাওয়ার মানুষটাও কিন্তু একজনই।”

আইরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।তারপর অভিমানমাখা কণ্ঠে প্রশ্ন করলো-

“ এতো হিসাব করতে হয় বুঝি?”

ইনায়ার চোখের দৃষ্টি কোথাও গিয়ে স্থির হলো। ঠোঁট নড়লো ধীর অথচ দৃঢ়তায়।

“ হিসাব ছাড়া জীবন চলে না আপু।”

আয়াশ এতক্ষণ নীরবে সবটা দেখছে। একটাও কথা বললো না। বললেও হয়তো কোনো লাভ হতো না। ইনায়ার সিদ্ধান্তের সামনে নিজের কোনো কথাই যে তার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, সেটা আয়াশ বেশ ভালো করেই জানে। তাই নীরবতাকেই আশ্রয় করে রইলো সে। শেষমেশ সবাই ইনায়ার জেদের কাছে বাধ্য হয়ে নত হলো। ইনায়াকে নিয়ে তার নতুন বাসায় পৌঁছে গেলো সবাই। কয়েকদিন আগেই ফ্ল্যাটটা কিনেছে আয়াশ। বাসাটা যেহেতু আয়াশের নিজের, তাই ভাড়াটাও তার নির্ধারণ করা। ইনায়া এমন মেয়ে নয় যে আয়াশের বাসায় বিনামূল্যে থাকবে। আত্মসম্মানের জায়গাটুকুতে সে এখনো কারো কাছে ঋণী হতে রাজি নয়।
দশ হাজার টাকার ভাড়ায় এখানে থাকবে ইনায়া।প্রথমে একেবারেই রাজি ছিলো না সে। কিন্তু সবার একান্ত জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত সম্মতি দিয়েছে। এমনিতেও নিজের উপার্জনের টাকা দিয়েই এখানে থাকবে, তাই আপাতদৃষ্টিতে তার বিশেষ কোনো আপত্তির কারণও রইলো না।নিজের মতোই নির্লিপ্ত রইলো সে। তবে বাসার ভেতরে পা রাখতেই ইনায়ার পা যেনো থমকে গেলো।

চোখের সামনে ছড়িয়ে থাকা পরিপাটি সৌন্দর্য দেখে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। খুব বেশি আড়ম্বর নেই, অথচ একটা ঘরকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে যা যা প্রয়োজন, তার প্রায় সবকিছুই রয়েছে। প্রতিটা জিনিস যেনো ভেবেচিন্তে সাজানো। কোথাও অপ্রয়োজনীয় কিছু নেই, আবার প্রয়োজনের কোনো কমতিও নেই।এমন কিছু ইনায়া আশা করেনি,চায়ওনি।মুখ তুলে আয়শা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো-

“ মা! তোমাকে বলেছিলাম, একটা ভাড়াটিয়া বাসা যেভাবে পায় সেভাবেই যাতে আমি পাই। তাহলে এইসবের কি মানে?”

ইনায়ার কথা শুনে জুয়েল সাহেব এগিয়ে এলেন। স্নেহভরা হাতে আবারও মেয়েটার মাথায় হাত রাখলেন।নরম স্বরে বললেন-

“ আমি করেছি এইসব। আমায় বাবা মানিস তো?”

ইনায়া অপ্রস্তুত হয়ে তাকালো।

“মানি বাবা, তাই বলে এইসব!”

জুয়েল সাহেব মৃদু হাসলেন। মেয়েটার আপত্তির কারণটা যেনো তিনি আগেই বুঝে রেখেছেন।

“ এইসব বলছিস কেনো, তুই তো আমার আর এক মেয়ে। আইরিন যদি তোর জায়গায় থাকতো, তাহলে আমি কি বাবা হিসেবে ওর পাশে থাকতাম না? ওর সুবিধা-অসুবিধা সেটা দেখতাম না? আর বাবা হিসেবে তোকে এইসব দিয়েছি। তাই তুই বাবার উপহার হিসেবে নে, শ্বশুড় হিসেবে নয়।”

ইনায়ার বুকের কোথাও যেনো নরম কিছু এসে আঘাত করলো। তবুও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরলো না সে।

“ তারপরও বাবা এইসব আমি নিতে পারবো না, এইসব অনেক হয়ে যায়!”

জুয়েল সাহেবের চোখে এবার ক্ষীণ অভিমান জমলো।

“ তাহলে বলছিস আমায় বাবা মানিস না? শ্বশুড় হিসেবেই দেখিস।”

ইনায়া দ্রুত মাথা নাড়লো।

“ ভুল ভাবছেন বাবা, এমনটা নয়। আমি এতো সব নিতে পারবো না, একেই এই বাসার ভাড়ার অর্ধেকেরও অর্ধেক দিচ্ছি। তোমরা চেয়েছো বলেই এই বাসায় এতো কম টাকায় উঠেছি। তাই বলে আবারও এইসব!”

জুয়েল সাহেব এবারও নরম রইলেন।

“ বাবা বলছিস, অথচ বাবার দেওয়া সামান্য উপহার নিতে পারছিস না। আমি তোর শ্বশুড় হিসেবে নয়, বাবা হিসেবে এইসব দিচ্ছি।”

ইনায়া আর কিছু বলার আগেই পেছন থেকে আয়শা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো-

“ কোনো কিন্তু নয়। একা তুই নেই, আরও একজন আছে তোর সঙ্গে।”

কথাটা যেনো ইনায়ার সমস্ত আপত্তির পথ বন্ধ করে দিলো।
আয়শা বেগম এগিয়ে এসে মেয়েটাকে ভিতরের দিকে টেনে নিয়ে গেলেন। ইনায়া আর কোনো কথা বলার সুযোগই পেলো না।অথচ এই কারণেই তো সে ঢাকায় ফিরতে চায়নি।

*

রাত আরও গভীর হয়েছে। নিস্তব্ধতা ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিয়েছে সমগ্র কক্ষ। চারপাশের ব্যস্ততা থেমে গেছে অনেক আগেই। ইয়াশের গায়ে কম্বলটা যত্ন করে টেনে দিয়ে ইনায়া ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালো। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। রাত হয়েছে।কিছুক্ষণ আগেই সবাই বাড়িতে ফিরে গেছে। এতক্ষণ এই বাসাতেই ছিলো তারা।
দরজা খুলতেই ইনায়ার দৃষ্টি থেমে গেলো। সামনে আয়াশ দাঁড়িয়ে আছে। এই লোকটা এখনো এখানে কেনো?কণ্ঠে কোনো আবেগ না এনে ইনায়া জিজ্ঞেস করলো-

“ কিছু বলবেন?”

আয়াশ কোনো উত্তর না দিয়ে হাতে থাকা একটা প্যাকেট তার দিকে এগিয়ে দিলো। ইনায়া প্যাকেটটার দিকে তাকালো। ভেতরে কী আছে বুঝতে পারলো না। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আয়াশের দিকে তাকাতেই মানুষটা হালকা দম ছেড়ে বললো-

“ স্যানিটারি প্যাড আর পেইন কিলার আছে। বেশি ব্যথা করলে ফ্যাগ থেকে গরম পানি হট ব্যাগে নিয়ে তলপেটে দিবেন। আর বেশি সমস্যা হলে আমায় ফোন করবেন। এইসব বিষয়ে দয়া করে আমাদের ভিতরকার বিষয় টানবেন না। নিজের যত্ন আগে।”

ইনায়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।আয়াশ জানলো কীভাবে? কীভাবে বুঝলো তার পিরিয়ড শুরু হয়েছে?
তার চোখের দৃষ্টি দেখেই হয়তো আয়াশ বুঝে ফেললো, মেয়েটার মাথার ভেতর ঠিক কোন প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। শান্ত কণ্ঠে বললো;

“ তিন বছরে এতোটাও নির্বোধ ছিলাম না আমি। আপনার সব বিষয়ে জানা আমার ইনায়া, হয়তো কিছু বিষয়ে আপনার প্রতি উদাসীন ছিলাম। তাই বলে সম্পূর্ণ নয়।”

ইনায়া এবার সত্যিই দ্বিধায় পড়ে গেলো। বেশিক্ষণ হয়নি তার পিরিয়ড শুরু হয়েছে। রাত হয়ে যাওয়ায় বাইরে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস আনার কোনো উপায়ও ছিলো না। তাই রাতটা কোনোভাবে সামলে নেওয়ার কথাই ভাবছিলো সে।
কিন্তু আয়াশ বিষয়টা এভাবে লক্ষ্য করবে, সেটা ভাবেনি।
ইনায়ার ভাবনার মাঝেই আয়াশ প্যাকেটটা তার হাতে দিয়ে দিলো।

“ এতো ভাবা বন্ধ করুন। ঘুমিয়ে পরুন, সারাদিন অনেক জার্নি করেছেন।”

বলেই আয়াশ আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না।নিঃশব্দ পায়ে চলে গেলো।ইনায়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। মানুষটার চলে যাওয়ার দিকে বেশ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সে। কত কথা জমে আছে তাদের মাঝে, কত অভিমান, কত অস্বীকার, কত দূরত্ব। অথচ সেই মানুষটাই এখনো তার ছোট্ট প্রয়োজনগুলো পর্যন্ত ভুলে যায়নি। দরজা লাগিয়ে ধীরে ধীরে দরজার কাছেই মাথা ঠেকিয়ে বসে পড়লো ইনায়া।

এই সময়টায় ব্যথায় ঠিকমতো নড়তেও পারে না সে।একসময় আয়াশই হট ব্যাগে গরম পানি এনে পেটের ওপর দিয়ে দিতো। প্রয়োজনের প্রতিটা জিনিস নিঃশব্দে এনে সামনে রেখে যেতো। কখনো মুখরোচক কোনো খাবার, কখনো প্রয়োজনীয় ওষুধ, কখনো শুধু এক গ্লাস পানি।
কখনো জানতে চাইতো না, ইনায়া তাকে প্রয়োজন করে কি না। শুধু নিজের মতো করে খেয়াল রাখতো।

এই সময়টায় মেয়েরা একটু বেশি কেয়ার চায়। শরীরের অস্বস্তির চেয়েও কখনো কখনো বেশি প্রয়োজন হয় একজন মানুষের সঙ্গ। এমন একজন, যার উপস্থিতি বুকের ভেতর জমে থাকা অস্বস্তিটুকু খানিকটা হলেও কমিয়ে দেয়। যে কোনো প্রশ্ন না করেও বুঝে নেয় কখন পাশে থাকতে হবে, কখন নীরবে দূরে সরে যেতে হবে।যে মানুষটার সঙ্গ অস্বস্তিকর নয়, বরং অদ্ভুত এক স্বস্তি এনে দেয়।ইনায়া জানে না, আয়াশের প্রতি তার জমে থাকা অভিমান কতটা সত্যি। তবে এটুকু সে অস্বীকার করতে পারে না, মানুষটা যতই দূরে থাকুক, তার যত্নগুলো এখনো ইনায়ার জীবনের ক্ষুদ্রতম প্রয়োজনের মতোই নিঃশব্দে এসে উপস্থিত হয়।
কোনো দাবি ছাড়াই। কোনো প্রতিদানের অপেক্ষা ছাড়াই।
শুধু ইনায়ার ভালো থাকার জন্য।

—-

রাত্রির গভীরতা পেরিয়ে ধরণীর বুকের ওপর ধীরে ধীরে নতুন দিনের আলো ফুটে উঠেছে। পূর্বাকাশের গাঢ় নীল রঙ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে, জানালার পর্দার ফাঁক গলে ম্লান সূর্যালোক নিঃশব্দে কক্ষের মেঝেতে এসে পড়েছে। রাতের দীর্ঘ ক্লান্তি এখনো সমগ্র বাসাটাকে ঘুমের আবেশে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অথচ ইনায়ার ঘুম ভাঙলো খুব ভোরেই। শরীরটা এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। রাতের ব্যথা কিছুটা কমেছে ঠিকই, তবে কোমর থেকে তলপেট অবধি কেমন ভারী এক অস্বস্তি লেগেই আছে। বিছানা থেকে উঠে বসতেই শরীরের ভেতরটা কেমন শূন্য শূন্য লাগলো। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে বসে রইলো ইনায়া।

নতুন বাসা,নতুন সকাল। অথচ পুরোনো এক মানুষকে ঘিরে অদৃশ্য কত প্রশ্ন! গত রাতের কথাগুলো মনে পড়তেই ইনায়ার দৃষ্টি অনিচ্ছাকৃতভাবেই দরজার দিকে চলে গেলো। আয়াশ এসেছিলো। কোনো অধিকার দাবি করতে নয়, কোনো পুরোনো হিসাব চুকাতেও নয়। শুধু তার প্রয়োজনের কিছু জিনিস দিয়ে নিঃশব্দে চলে গিয়েছে। এমন যত্নই তো মানুষকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে দেয়।
যে মানুষটার ওপর অভিমান করে দূরে থাকা যায়, তাকে ঘৃণা করা যায়, তার দেওয়া কষ্টের হিসাব মেলানো যায়, কিন্তু যে মানুষটা দূরত্বের মাঝেও নিঃশব্দে যত্ন করে যায়, তার প্রতি অভিমানটুকু ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে।

ইনায়া দ্রুত নিজের ভাবনাগুলো সরিয়ে নিলো।
তারপর পাশে তাকাতেই বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে এলো। ইয়াশ এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ছোট্ট বুকটা নিয়মিত ওঠানামা করছে। ঘুমের মধ্যেও মুঠো করা হাত দুটো বুকের কাছে রাখা। নিষ্পাপ মুখখানিতে সকালের কোমল আলো এসে পড়েছে। ইনায়া কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইলো। কত অদ্ভুত! এই ছোট্ট প্রাণটাকে নিয়েই তার পৃথিবী এতদিন ধরে অপেক্ষা করেছে। কত রাত পেটের ওপর হাত রেখে তার নড়াচড়া অনুভব করেছে। কতবার মনে হয়েছে, আর কতদিন? আর কতটা অপেক্ষা করলে তাকে নিজের চোখে দেখতে পারবে? এখন সেই অপেক্ষা শেষ হয়েছে। ইনায়া ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ইয়াশের গালে আঙুল ছুঁইয়ে দিলো।
বাচ্চাদের গাল এতটাই কোমল যে স্পর্শ করতেও ভয় লাগে।

“ঘুমাও সোনা।”

খুব নিচু স্বরে বললো সে।

“মা এখানেই আছি।”

কথাটা বলতেই নিজের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করলো ইনায়া। হয়তো মাতৃত্ব এমনই। নিজের ক্লান্তি, নিজের ব্যথা, নিজের না পাওয়া সবকিছুকে পেছনে সরিয়ে একজন মা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই বেঁচে থাকার নতুন কারণ খুঁজে নেয়।ইনায়া ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলো। পা মেঝেতে রাখতেই শরীরটা খানিকটা দুলে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বিছানার কিনারা ধরে নিজেকে সামলে নিলো সে। শরীর এখনো তাকে পুরোপুরি সহযোগিতা করছে না। তবুও থামলো না।সন্তানের জন্য মায়ের ক্লান্তি কখনোই যেনো সম্পূর্ণ ক্লান্তি হয়ে ওঠে না।

রান্নাঘরের দিকে যাওয়ার আগে আবার একবার ইয়াশের দিকে তাকালো ইনায়া। তারপর খুব সাবধানে দরজাটা ভেজিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই সকালের বাতাস মুখে এসে লাগলো। ঢাকার ব্যস্ততা এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কোথাও দূরে গাড়ির শব্দ, কোনো গলির ভেতর থেকে ভেসে আসা মানুষের কণ্ঠ, পাখির ক্ষীণ ডাক, সবকিছু মিলিয়ে নতুন দিনের এক অদ্ভুত সুর। ইনায়া রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলো। এই শহরটা তার জন্য নতুন নয়।তবুও আজ যেনো সবকিছু নতুন মনে হচ্ছে।কারণ এবার সে একা নয়।তার সঙ্গে আছে ইয়াশ।
তার সন্তান। হঠাৎ পেছন থেকে দরজায় শব্দ হলো। ইনায়ার ভ্রু কুঁচকিয়ে এলো, এতো সকালে কে আসবে? ইনায়া দরজায় এগিয়ে গেলো। ভিতর থেকে ওপাশে দেখতেই, আয়াশকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলো।
ইনায়া দরজা খুলে দিলো। আয়াশে মুখ-চোখ কেমন লাল হয়ে আছে, যা রাত জাগার স্পষ্ট ছাপ। অথচ ইনায়াকে দেখেই আয়াশের প্রথম দৃষ্টি গিয়ে থামলো মেয়েটার মুখে। তারপর পায়ের দিকে।ইনায়ার মুখে প্রশ্ন ফুটে উঠলো।

“আপনি এখানে?”

আয়াশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো-

“নিচে ছিলাম।”

ইনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

“এত সকালে?”

আয়াশ উত্তর দিলো না। হাতে থাকা ব্যাগটা এগিয়ে দিলো।

“কিছু ফল আর প্রয়োজনীয় জিনিস আছে। আপনার শরীর এখনো দুর্বল। ঠিকমতো খেতে হবে।”

ইনায়া ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে রইলো।

“এসব আনার দরকার ছিল না।”

আয়াশের মুখে ক্ষীণ এক হাসি ফুটলো।

“দরকার ছিল কি না সেটা নিয়ে তর্ক করতে আসিনি।”

ইনায়া আর কিছু বললো না। আয়াশও না।
দুজনের মাঝখানে আবারও সেই পুরোনো নীরবতা এসে বসলো।একসময় আয়াশ নিচু স্বরে বললো-

“রাতে ব্যথা বেশি হয়েছিল?”

ইনায়া উত্তর দেওয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত থেমে রইলো।

“সহনীয় ছিল।”

আয়াশের দৃষ্টি এবারও তার মুখেই।

“সহনীয় মানেই কম নয়।”

ইনায়া চোখ সরিয়ে নিলো।এই মানুষটা কেনো এখনো এমন?কেনো তার শরীরের সামান্য অস্বস্তিটুকুও তার চোখ এড়িয়ে যায় না?অথচ তাদের সম্পর্কের মাঝখানে এখনো কত অমীমাংসিত প্রশ্ন!আয়াশ আর কিছু বললো না। শুধু পাশ কাটিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেলো। ইয়াশের ঘরের দরজার কাছে গিয়ে থামলো। ভেতরে উঁকি দিতেই ঘুমন্ত শিশুটাকে দেখা গেলো।আয়াশের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেলো.কেমন স্থির হয়ে গেলো মানুষটা।
তার সন্তান।এতদিন যে সন্তানকে কেবল কল্পনায় ছুঁয়েছে, আজ সেই সন্তান মাত্র কয়েক হাত দূরে ঘুমিয়ে আছে।আয়াশ দরজার কাছে দাঁড়িয়েই দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ইনায়া পেছন থেকে সবটা দেখলো।

মানুষটার চোখে যে অনুভূতিটা ফুটে উঠেছে, সেটা কোনো ভাষায় প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। সেখানে বিস্ময় আছে, মায়া আছে, দীর্ঘ অপেক্ষার ক্লান্তি আছে, আর আছে এমন এক পিতৃত্ব, যেটা প্রকাশের সুযোগ সে এতদিন পায়নি।ইনায়ার বুকের ভেতরটায় হঠাৎ কেমন একটা চাপ অনুভূত হলো। তবুও সে কিছু বললো না। আয়াশ ইয়াশের কাছে গিয়ে বসে পড়লো। খুব সাবধানে ইয়াশের ছোট্ট হাতটার দিকে তাকালো। ছুঁতে গিয়ে আবার হাত সরিয়ে নিলো। যদি ঘুম ভেঙে যায়! তার চেয়ে বড় কথা, ইয়াশের উপর ইনায়ার অধিকার বেশি।চাইলেই সে তার পিতৃত্বের অধিকার প্রকাশ করতে পারবে না। এই দৃশ্যটাই ইনায়ার চোখে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়লো।মানুষটা চাইলে সন্তানকে নিজের বলে দাবি করতে পারতো। কিন্তু করছে না,কারণ সে জানে, ইনায়ার অনুমতি ছাড়া কোনো সম্পর্ককে জোর করে নিজের করে নেওয়ার অধিকার তার নেই।
আয়াশ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো।দরজার কাছে এসে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললো-

“ ইয়াশ তো ঘুমাচ্ছে, আপনি আরে একটু বিশ্রাম করে নিন।”

ইনায়া এবার খুব ধীরে বললো-

“আপনি কখন যাবেন?”

প্রশ্নটা শুনে আয়াশের চোখে ক্ষীণ এক বিষণ্ণতা নেমে এলো।

“যখন মনে হবে আমার থাকা আপনার জন্য অস্বস্তির কারণ হচ্ছে।”

ইনায়া কিছু বললো না।আয়াশও আর অপেক্ষা করলো না।দরজার দিকে এগিয়ে গেলো।কিন্তু বের হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ইনায়া পেছন থেকে খুব আস্তে বললো-

“নাশতা করে যাবেন।”

আয়াশ থেমে গেলো। কয়েক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় নেমে এলো।তারপর ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো।ইনায়া তখন জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। যেনো কথাটা সে বলেনি।আয়াশের ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠলো।

“আচ্ছা।”

শুধু এইটুকুই বললো সে। অথচ এই সামান্য সম্মতিটুকুর মাঝেও আয়াশ যেনো বহুদিন পর হারিয়ে যাওয়া কোনো আশার ক্ষীণ আলো দেখতে পেলো।ইনায়া তা দেখলো না।
অথবা দেখেও না দেখার ভান করলো।নতুন দিনের সূচনা হলো এমনই এক নীরব সমঝোতায়। আয়াশ ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-

“আস্তে আস্তে আপনাকে আবারও আমার করে নিবো। তবুও আপনাকে আমি,আবার আমার করেই ছাড়বো।”

ইনায়া এবার আয়াশের দিকে ঘুরে তাকালো। মৃদু হাসলো, তারপর নির্লিপ্ত স্বরে বলে ওঠে-

“আমাকে হারানো যতটা সহজ ছিলো।কিন্তু পাওয়াটা এতো সহজ নয় আয়াশ। মানুষ একবার ভাঙে, বার বার নয়!”

বলেই ইনায়া চলে গেলো, আয়াশ ঠাঁই দাড়িয়ে রইলো। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ একজনের মন গলাতে পারছে না সে। প্রতিটা মুহূর্ত আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

চলবে।