#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_২৩
[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]
দিগন্ত বিকেল,
বেলা ঢলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে দিনের শেষ প্রহরের আগমন ঘটেছে। পশ্চিম আকাশের বিস্তীর্ণ নীলাভ প্রান্তরজুড়ে ঝাঁক বেঁধে পাখিরা আপন নীড়ে প্রত্যাবর্তনের আয়োজন করছে। সময় সত্যিই কত দ্রুতগতিতে ফুরিয়ে যায়! দেখতে দেখতে কতগুলো প্রহর, কতগুলো দিন, কতগুলো মাস পেরিয়ে মানুষ তার জীবনের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। দেখতে দেখতে বড়ো হতে শুরু করেছে ইয়াশও। সামান্য একটা প্রাণ, যাকে একদিন দুহাতের মুঠোয় ধরতেও ভয় হতো, আজ সে নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে ব্যস্ত। ঘরের একপাশে বসে আয়াশ ছেলেকে কোলে নিয়ে খেলছে। কিছুক্ষণ আগেই নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে ইয়াশের। ঘুম থেকে উঠেই বাবার মুখটা নিজের সম্মুখে দেখতে পেয়ে ক্ষুদ্র প্রাণটার আনন্দ যেনো আর ধরে রাখার জায়গা পাচ্ছে না। জ্বলজ্বল করে উঠেছে তার নেত্রদ্বয়। আনন্দের আতিশয্যে ছোট্ট দুটো হাত, দুটো পা অনবরত নেচে উঠছে। যেনো পৃথিবীর সমস্ত সুখ বুঝি এই মুহূর্তে তার ক্ষুদ্র দেহাবয়বটাকে ঘিরেই অবস্থান করছে।
কিছুটা দূরে বসে নিজের কাজে মগ্ন ইনায়া। মাঝেমধ্যে দৃষ্টি তুলে তাকাচ্ছে বাবা ছেলের দিকে। অথচ চোখের পলকে তার অধরে যে মৃদু হাসির রেখাটা খেলা করে যাচ্ছে, সেটাই বলে দিচ্ছে দৃশ্যটা তাকে কতটা তৃপ্ত করছে। আয়াশ বাইরে থেকে আজও কিছু ফুল নিয়ে এসেছে। বেলিফুলের মালার সঙ্গে রয়েছে আরও দুপ্রকার ফুল। একটা লাল গোলাপ, অপরটা সাদা লিলি। গোলাপ আর লিলি, দুটো ফুলই যেনো ভালোবাসার ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। একটা গভীরতার প্রতীক, অপরটা পবিত্রতার। সাদা লিলির মিষ্টি সুগন্ধে মেতে উঠেছে সমগ্র কক্ষ। নিশ্বাসের সঙ্গে নাসারন্ধ্রে এসে বারবার আছড়ে পড়ছে কোমল, মাদকতাময় সেই সুবাস। তবে ঘরের সবচেয়ে মায়াময় দৃশ্যটা বোধহয় এখনো আয়াশের কোলে। ইয়াশ,ছোট্ট মানুষটা বাবার পানে চেয়ে অনবরত হেসে যাচ্ছে। হাসতে বড্ড পছন্দ করে সে। যখনই কেউ তার দিকে তাকায়, ঠিক তখনই তার নরম অধরকোণে উপস্থিত হয় এক অপার্থিব, মায়াময় হাসির রেখা। যেনো পৃথিবীতে আগত হওয়ার পূর্বেই হাসিটাকে নিজের একান্ত সম্পদ বানিয়ে এনেছে ক্ষুদ্র প্রাণটা। আয়াশ ছেলের সেই হাসির দিকে কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থাকলো। তারপর ভ্রু নাচিয়ে মৃদু কৌতুকে জিজ্ঞেস করে-
“ এতো হাসি কেনো হুম? হাসি দিয়ে কি বাবাকে ঘায়েল করতে চাইছো নাকি?”
বাবার কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই ইয়াশের আনন্দ যেনো আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেলো। ছোট্ট দুটো পা মুহূর্তেই লাফিয়ে ওঠে। ক্ষুদ্র দেহটা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত নড়েচড়ে বাবাকে তার আনন্দের কথা জানাতে জানাতে বলে-
“ অ্যাইই, গুইইই! গুইইই!”
আয়াশের অধরে হাসি ফুটে ওঠে। ছেলে কি বলছে, তার কতটুকুই বা বোঝার উপায় আছে! তবুও বাবা তো সন্তানের প্রতিটা অস্পষ্ট শব্দের মাঝেও অর্থ খুঁজে নেয়। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে চেয়ে বলে-
“ ও আচ্ছা তাই নাকি?”
“ গ…গুইই! অ্যাইইই!”
ইয়াশের অস্পষ্ট উচ্চারণ যেনো আরও একবার হাসিয়ে তোলে আয়াশকে। কোনো বিলম্ব না করে ছেলেকে নিজের প্রশস্ত বক্ষমাঝে জড়িয়ে নেয় সে। ইয়াশও আনন্দের সঙ্গে নিজের ছোট্ট মাথাটা বাবার প্রস্তরসম বুকে ঘষতে থাকে। সেই ক্ষুদ্র মাথাটার স্পর্শে আয়াশের বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত এক প্রশান্তি জমা হয়।তার রক্তের অস্তিত্ব। একসময় যে ছোট্ট প্রাণটাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় তার বুকের ভেতর কতটা অস্থিরতা বাসা বেঁধেছিল, আজ সেই প্রাণটাই তার বুকে মাথা ঘষে আপন ভাষায় ভালোবাসা প্রকাশ করছে। আয়াশ ধীরে ধীরে ছেলের মাথায় কয়েকটা কোমল চুম্বন এঁকে দিলো।তারপর অত্যন্ত সাবধানে তাকে নিজের পেটের ওপর বসিয়ে দেয়। ইয়াশও বেশ আয়েশ করেই বসে থাকলো। পেছনের দিকে ছোট্ট হাত দুটো রেখে নিজেকে সামলে রাখে, যেনো হঠাৎ করে পড়ে না যায়। কিছুক্ষণ শান্তভাবে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর আচমকাই যেনো কোনো দুর্ধর্ষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষুদ্র মানবটা।
এক ঝটকায় সামনে ঝুঁকে পড়ে। টাস করে আয়াশের বাম পাশের গালে হামলা চালায়।ছোট্ট মুখখানা দিয়ে সম্পূর্ণ নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয় বাবার গালটা। আয়াশ মুহূর্তের জন্য হকচকিয়ে যায়। তারপর ছেলের কাণ্ড দেখে তার হাসি আর আটকে রাখা সম্ভব হলো না।ইয়াশ এখন নিজে নিজেই নিজের পা মুখে তুলে দেয়। কখনো ছোট্ট হাত মুখে দিয়ে সেটাই চুষতে শুরু করে। নিজের ক্ষুদ্র জগতে তার হাত-পায়ের এমন দখলদারিত্ব বেশ পুরোনো।তবে আজ বুঝি সেই জায়গাটা দখল করে বসেছে তার বাবা।নিজের হাত কিংবা পায়ের বদলে এখন আয়াশের গালটাই যেনো ইয়াশের সবচেয়ে পছন্দের বস্তু! বাবার গাল সম্পূর্ণ নিজের অধিকারে নিয়ে ক্ষুদ্র মানবটা নির্বিকার হয়ে থাকলো। যেনো এই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজটাই সে করছে। আর তার নিচে শুয়ে থাকা আয়াশ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে নিজের বুকের ওপর গড়ে ওঠা সেই ছোট্ট পৃথিবীটার দিকে।
“ এই দুষ্টু বাবাকে কামড়ানো হচ্ছে।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই ক্ষুদ্র শরীরটা আনন্দের আতিশয্যে নড়ে উঠলো। আয়াশের গালজুড়ে ততক্ষণে শিশুর লালায় ভিজে একাকার, অথচ মুখে মিছে মিছে বিরক্তির আবরণ টেনে রাখলেও অন্তরে সে যেনো মুহূর্তটুকুকে দুহাত ভরে উপভোগ করছে। সময়ের স্রোতে তার ক্ষুদ্র প্রাণটা ধীরে ধীরে বড়ো হচ্ছে। প্রতিদিনই যেনো তার ছোট্ট অস্তিত্বে নতুন কোনো বিস্ময়ের সংযোজন ঘটছে।
ইয়াশ এবার আয়াশের গাল থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। গোল গোল বড়ো বড়ো আঁখি মেলে স্থির দৃষ্টিতে বাবার মুখপানে তাকিয়ে রইলো। ক্ষুদ্র নরম অধরজোড়া জুড়ে তখনও ঝুলে আছে নিষ্পাপ হাসির রেখা। হাসতে যে ভীষণ পছন্দ করে ইয়াশ। তার অধর কোণে প্রায় সর্বক্ষণই লেগে থাকে এক অমায়িক, নিষ্পাপ হাসি। সেই হাসির দিকে তাকিয়ে আয়াশের বুকের অন্তঃস্থলে কেমন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। আয়াশ ছেলের হাসিমাখা আদুরে মুখখানির দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-
“ দেখেছেন কেমন করে হাসছে আমাকে কামড়িয়ে। নিশ্চয়ই আপনার উপর গিয়েছে।”
ইনায়া তখন ল্যাপটপে কাজের ফাঁকে নীরবে বাবা-ছেলের এই ছোট্ট কাণ্ডকারখানা অবলোকন করছিলো। আয়াশের অভিযোগ শুনে মুখ না তুলেই বলে ওঠে-
“ আমি আপনাকে কবে কামড়িয়েছি, যে আমার মতো হবে?”
আয়াশের অধর কোণে দুষ্টু হাসির রেখা আরও প্রশস্ত হলো।
“ কামড়াননি তো কি হয়েছে, ছোটবেলায় ছিলেন হয়তো।”
ইনায়া এবার ল্যাপটপের পর্দা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মানুষটার দিকে তাকায়। মুখে নির্লিপ্ততার আবরণ থাকলেও চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মৃদু বিরক্তি।
“ জ্বী না, আমি অনেক ভদ্র ছিলাম।”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ইয়াশ আনন্দের আতিশয্যে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো। আয়াশ সঙ্গে সঙ্গে ছেলের দিকে তাকালো। ফোগলা গালে এখনও হাসির রেশ, বাবার মুখের দিকে তাকিয়েই যেনো নিজের আনন্দের সমস্তটুকু প্রকাশ করে চলেছে।আয়াশ ঝুঁকে ছেলের নরম নাকের সঙ্গে নিজের নাকটা আলতো করে মিশিয়ে দিলো। কণ্ঠে মিশে রইলো মৃদু আদর।
” উহুম, খুব খুশি মনে হচ্ছে।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই ইয়াশ আবারও মুখ ডুবিয়ে দিলো আয়াশের গালের মাঝে। এবারের ক্ষুদ্র আক্রমণ যেনো আগের সমস্ত দুষ্টুমিকে ছাড়িয়ে গেলো। আয়াশের গালজুড়ে মুখ রেখে চুষতে চুষতে তার লালা গড়িয়ে পড়ছে। ক্ষুদ্র সেই লালারেখা গড়িয়ে আয়াশের গলা পর্যন্ত পৌঁছে গেলেও মানুষটা ছেলেটাকে একটুও সরালো না। সরাবে কেমন করে? দিনের আলো ফুরিয়ে রাতের আঁধার নেমে এলেই তো এই প্রাণটার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে হয় তাকে। প্রতিদিনের বিচ্ছেদটুকু আয়াশের কাছে কেমন অসহনীয় হয়ে উঠছে। অথচ এই ক্ষুদ্র প্রাণটা জানেই না, তার ছোট্ট একটা হাসি, সামান্য একটা স্পর্শ, কিংবা এই নির্দোষ দুষ্টুমিটুকুও তার বাবার সমস্ত ক্লান্তি নিমিষেই মুছে দিতে পারে।
ছেলের মায়ের মনটাও যেনো আস্ত একখণ্ড শিলায় পরিণত হয়েছে। কতভাবে যে মানুষটাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে আয়াশ, তবুও কোনোভাবেই বরফ গলাতে পারেনি। তার প্রতিটা চেষ্টাই গিয়ে থামে ইনায়ার নীরব অভিমানের দেয়ালে। আয়াশ জোর করে না। কখনোই করবে না। এতে ইনায়া আরও কষ্ট পাবে, রাগ বাড়বে। তবুও চেষ্টা ছাড়েনি সে।কারণ তার বিশ্বাস, একদিন ঠিকই এই দীর্ঘ দূরত্বের অবসান হবে। একদিন সে তার ছেলে আর ছেলের মাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরবে। সেই দিনের অপেক্ষাতেই হয়তো প্রতিটা প্রত্যাখ্যান, প্রতিটা নীরবতা আর প্রতিটা অভিমান নিঃশব্দে সহ্য করে যাচ্ছে সে।
ইয়াশ খানিক বাদে থামলো তারপর বড়ো বড়ো চোখ করে বাবার পানে চাইলো। তার চোখ-মুখে খুশির জোয়ার বইছে, গাল ভর্তি হাসি তার। আয়াশের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে-
“ অ্যাইইই..গগুইইই!”
“ আর না চ্যাম্প, এইসব চুষতে হয় না। পঁচা পঁচা!”
বলেই ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলো। ইনায়ার অধর কোণে আবারও হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো বাবা-ছেলের এমন মুহুর্ত দেখে। সে কিছুই বললো না, শুধু কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই দুইজনকে দেখে নিলো।
*
রাত্রি নেমেছে ঘণ্টাখানিক পূর্বেই। নিস্তব্ধতার নরম চাদরে ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। ক্ষীণ আলোকচ্ছটায় আলোকিত কক্ষের বিছানাজুড়ে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় মগ্ন ক্ষুদ্র ইয়াশ। সারাদিনের চঞ্চলতায় অবসন্ন ক্ষুদ্র দেহটা খানিকক্ষণ পূর্বেই মায়ের স্নেহমাখা স্পর্শের উষ্ণতায় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছে। খেতে খেতেই কখন যে দুটা ক্ষুদ্র আঁখিপল্লব ভারী হয়ে এসেছিল, তা যেন বুঝতেই পারেনি কেউ। ছেলেকে সযত্নে খাইয়ে, তার ক্ষুদ্র দেহাবয়বের উপর চাদর টেনে দিয়ে কক্ষের বাইরে পা রাখতেই ইনায়ার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার উপর। ধোঁয়া ওঠা একটা বাটি দুহাতে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে আয়াশ। তাকে দেখামাত্রই খানিকটা বিস্মিত হলো ইনায়া। সে তো ভেবেছিল, মানুষটা হয়তো এতক্ষণে চলে গিয়েছে। অথচ না, নিজের ব্যস্ততাকে কোথাও রেখে সে এখনো এখানেই রয়েছে।আয়াশ কোনো কথা না বলে বাটিটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখলো। অতঃপর শান্ত দৃষ্টিতে ইনায়ার মুখপানে তাকিয়ে বললো-
“ এই দিকে আসুন, তাড়াতাড়ি এটা শেষ করুন।”
কৌতূহলী দৃষ্টিতে বাটিটির দিকে তাকিয়ে ইনায়া প্রশ্ন করলো-
“ এটা কি?”
“ ভেজিটেবল সুপ।”
“ এইটা আবার কেনো?”
“ দুপুর থেকে তো কিছুই খাচ্ছেন না৷ তাই এটা খান ভালো লাগবে।”
ইনায়ার ভ্রুযুগল সামান্য কুঁচকে এলো। এত আয়োজনের প্রয়োজন ছিল কি? মৃদু স্বরে বললো-
“ এটার দরকার ছিলো না।”
আয়াশ যেন তার কথার কোনো গুরুত্বই দিলো না। স্বভাবসুলভ দৃঢ়তায় পুনরায় বললো-
“ কথা না বলে খেয়ে নিন আসুন।”
মানুষটার প্রতি কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ইনায়া ধীর স্বরে প্রশ্ন করলো-
“ আপনার কি আর কোনো কাজ নেই?”
আয়াশের অধরে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো। অনায়াস ভঙ্গিতে উত্তর দিলো-
“ আছে তো, আর আমার কাজই তো করছি।”
এরপর আর কোনো কথা বাড়ালো না ইনায়া। আয়াশের রান্নার হাত সম্পর্কে তার অজানা নয়। টুকটাক যতটুকুই পারে, সেই সামান্য আয়োজনেও অদ্ভুত এক তৃপ্তির স্বাদ লুকিয়ে থাকে। মানুষটার হাতের রান্না বরাবরই ভালো। হয়তো রান্নার উপকরণের চেয়েও সেখানে বেশি মিশে থাকে একান্ত যত্নের অনুভূতি।নীরবে চামচ তুলে ধোঁয়া ওঠা স্যুপের স্বাদ নিতে লাগলো ইনায়া। অপরদিকে তার পাশেই বসে নিজের হাতে বানানো কফির কাপে ধীরেসুস্থে চুমুক দিচ্ছে আয়াশ। খানিকক্ষণ নীরবতার পর মানুষটা কৌতূহলী দৃষ্টিতে ইনায়ার মুখপানে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-
“ সব ঠিকঠাক আছে? কেমন হয়েছে বলছেন না তো।”
ইনায়া সামান্য মুখ তুলে তার দিকে তাকালো। অতঃপর ক্ষীণ স্বরে বললো-
” ভালো হয়েছে।”
ইনায়ার সেই সংক্ষিপ্ত উত্তরের পর মুহূর্তেই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক এক বাক্য উচ্চারণ করলো আয়াশ-
“ চলুন প্রেম করি।”
হঠাৎ এমন অকল্পনীয় প্রস্তাবে খাওয়ার মাঝেই কেশে উঠলো ইনায়া। বিস্ময়ে তার চোখদুটি বিস্তৃত হয়ে গেলো। যেন কিছুক্ষণ পূর্বে শোনা কথাগুলো এখনো মস্তিষ্ক গ্রহণ করতে পারেনি। হতবাক দৃষ্টিতে আয়াশের পানে তাকিয়ে বললো-
“ আপনি কি মজা করছেন?”
আয়াশের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। বরং অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে প্রশ্ন করলো-
“ আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে আমি মজা করছি?”
ইনায়া এবার খানিকটা ভালোভাবে তাকালো মানুষটার দিকে। না, তার চোখেমুখে রসিকতার কোনো চিহ্ন নেই। স্বাভাবিক, স্থির, শান্ত। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কোনো কথাই সে এইমাত্র বলে ফেলেছে।কিছুক্ষণ নির্বাক থেকে ইনায়া পুনরায় প্রশ্ন করলো-
“ হঠাৎ এমন আজগুবি কথা মাথায় আসার কারণ কি?”
আয়াশের ভ্রুযুগল কিঞ্চিৎ কুঁচকে এলো। আপত্তির সুরে বললো-
“ আজগুবি বলবেন না। জীবনে প্রেম করা হয়নি, তাই আবার প্রেম করতে চাচ্ছি।”
কথাটা শুনে ইনায়ার দৃষ্টিতে পুনরায় বিস্ময়ের ছায়া নামলো। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি ফুটিয়ে বললো-
“ আমরা বিবাহিত আয়াশ!”
“ সো হোয়াট? বিবাহিত বলে কি প্রেম করা বারণ?”
ইনায়া এবার যেন মানুষটার যুক্তির বিপরীতে যুক্তি সাজানোর প্রয়াস করলো। শান্ত স্বরে বললো-
“ আচ্ছা, তা বলুন আপনার সঙ্গেই প্রেম করবো কেনো?”
আয়াশ এক মুহূর্ত সময়ও নিলো না উত্তর দিতে-
” কারণ আমি ব্যতীত অন্য কোনো অপশন আপনাকে দেওয়া হচ্ছে না।”
ইনায়ার অধরে এবার স্পষ্ট হাসির রেখা ফুটে উঠলো। মানুষটার এমন স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে মৃদু কৌতুকে বললো-
” যদি আমি অন্য অপশন চাই তখন?”
আয়াশের কণ্ঠে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বললো-
“ চাইতেই পারেন, কিন্তু সেই অন্য অপশনটাও আমিই হবো।”
ইনায়া এবার হালকা হেসে মাথা নাড়লো। এমন অদ্ভুত প্রেম নিবেদন জীবনে কখনো শোনেনি সে। চামচটা বাটির পাশে রেখে বললো-
“ এটা কেমন ধরনের প্রেম প্রস্তাব হলো? মানি না এমন প্রেম প্রস্তাব।”
আয়াশ কফির কাপে শেষবারের মতো চুমুক দিয়ে মৃদু হেসে বললো-
“ প্রস্তাব দিচ্ছি না তো, আরজি জানাচ্ছি।”
“ তাহলে তো আরও আগে নয়।”
ইনায়ার এমন প্রত্যাখ্যানেও বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না আয়াশ। বরং সহজ স্বরে বললো-
” আরে করুন দেখুন একবার। বউ বানিয়ে ঘরে তুলবো না, রাজি না হওয়া অব্দি।”
“ প্রেম করে কি হবে?”
প্রশ্নটা শুনে আয়াশের মুখাবয়বে এক অদ্ভুত কোমলতা ভর করলো। যেন এই প্রশ্নের উত্তর সে বহুদিন পূর্বেই নিজের অন্তরে সাজিয়ে রেখেছিল। ধীর স্বরে বললো-
” একটু একটু ভালোবাসা জন্মাবে।”
ইনায়া নিষ্পলক তার দিকে তাকিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করলো-
” তারপর?”
আয়াশের দৃষ্টিতে এখন ভবিষ্যতের কোনো অদৃশ্য স্বপ্নের ছায়া। সে মৃদু হেসে বললো-
” তারপর আরও ভালোবাসা হবে। অতঃপর ভালোবাসার নীড় হবে।”
এরপর আর কোনো উত্তর দিলো না ইনায়া। নীরবতায় ঢেকে গেলো তাদের মধ্যবর্তী সামান্য দূরত্বটুকু। আয়াশ বুঝলো, ইনায়া হয়তো কথাগুলো এড়িয়ে যেতে চাইছে। অথবা নিজের অন্তরে সযত্নে গোপন করে রাখা অনুভূতিগুলোর সম্মুখীন হতে এখনো প্রস্তুত নয়। তবুও থামলো না সে। কিছু কিছু কথা মানুষকে বলতেই হয়। কারণ না বলা কথার ভার কখনো কখনো সমগ্র জীবনের চেয়েও ভারী হয়ে ওঠলো।খানিকক্ষণ নীরব থাকার পর আয়াশ পুনরায় বললো-
“আমি যদি সময়টাকে একবার ফিরিয়ে নিতে পারতাম, তাহলে আপনাকে আর এক মুহূর্তও ভালোবাসাহীন রাখতাম না।”
কথাগুলো শুনে ইনায়ার হাত থেমে গেলো। ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকালো আয়াশের পানে। তার চোখের গভীরে যেন বহু বছরের জমে থাকা কোনো স্মৃতিরা একসঙ্গে জেগে উঠলো। অতঃপর মৃদু হেসে, অদ্ভুত এক শান্ত ও শীতল স্বরে বললো-
“সময় ফিরে আসে না। আর যে মানুষটা একসময় ভালোবাসার জন্য কেঁদেছিল, সে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একদিন কাঁদতেও ভুলে যায়।”
আয়াশ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার মুখপানে। অতঃপর গভীর বিশ্বাসে পূর্ণ কণ্ঠে বলল-
“সময় ফিরে আসে না ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা ফিরে আসে। যে কাঁদতে ভুলে যায়, সে আবার হাসতে শেখে, আর সেই হাসিটা নিয়েই সে একদিন ফিরে আসে।”
ইনায়া নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো মানুষটার দিকে। সত্যিই কি তার হাসি ফিরে আসছে? এখন তো সে হাসে। আগের মতো আর পুরোনো দুঃখের অতল গহ্বরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে না। যে পথগুলো একসময় তাকে বারবার বিষণ্ণতার দিকে টেনে নিয়ে যেত, আয়াশ যেন ধীরে ধীরে সেই সমস্ত পথের দুয়ার বন্ধ করে দিচ্ছে। একটুখানি করে, প্রতিদিন, প্রতিটা আচরণে, প্রতিটা যত্নে। আগের আয়াশ আর এখনকার আয়াশের মাঝে বিস্তর ব্যবধান।আগের আয়াশ ছিলো প্রিয়ার আয়াশ। আর এখন? এখনকার আয়াশ যেন সম্পূর্ণ নতুন এক মানুষ। এমন একজন, যার অনুভূতিতে ধীরে ধীরে নিজের জন্য এক টুকরো জায়গার অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে ইনায়া।
তবে ইনায়া কোনোদিনই প্রিয়ার জায়গা সরিয়ে নিজেকে সেই আসনে বসাতে চায়নি। কারণ সে বিশ্বাস করে, যার স্থান তারই থাকবে। মানুষের হৃদয়ের কোনো পুরোনো অধ্যায় মুছে ফেলে সেখানে জোরপূর্বক নতুন কারো নাম লেখা যায় না। সে কখনো কারো জায়গা দখল করতে চায়নি। সে চেয়েছিল নিজের একটা জায়গা তৈরি করতে। নিজের নামে,নিজের অনুভূতিতে,নিজের ভালোবাসায়। হয়তো তিন বছর পূর্বে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। পারেনি সে আয়াশের হৃদয়ে নিজের জন্য একটা নির্ভরতার স্থান গড়ে তুলতে। অথচ আজ, সময়ের অদ্ভুত পরিহাসে সেই মানুষটাই যেন তার জন্য একটা নতুন পৃথিবী নির্মাণ করতে ব্যস্ত।এই অনুভূতিতে কোনো দায়বদ্ধতা নেই,নেই কোনো দয়া,নেই কোনো করুণা।আছে শুধু হারিয়ে ফেলা কিছু মুহূর্তকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।আছে অপূর্ণতার পরিপূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা।আর আছে, নিঃশব্দে জন্ম নিতে থাকা একরাশ ভালোবাসা।
#চলবে

