#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||০৯||
পরদিন ভোরের আলো সবেমাত্র কাঁচের জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের নরম কার্পেটে এসে পড়েছিল।
ঘুম ভাঙতেই আযরাফের দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল বিছানার ওপর। শ্রাবণকন্যা সেখানে পরম নিশ্চিন্তে এক অপরূপ অগোছালো ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটার অবাধ্য নীল শাড়ির আঁচলটা অসাবধানে সরে গিয়ে উন্মুক্ত করে দিয়েছে তার শুভ্র, মেদহীন পেটের এক চিলতে মসৃণ জমিন। আযরাফ কিছুক্ষণ নিস্পন্দ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্যের পানে। বুকের গভীর থেকে একটি তপ্ত, দীর্ঘশ্বাস নামিয়ে সে আলতো হাতে শাড়ির আঁচলটা টেনে তারীনের গায়ে তুলে দিল। স্পর্শের কোমলতায় যেন এক ফোঁটা দ্বিধাও মিশে ছিল না, ছিল কেবল অগাধ মমতা ও গভীর অধিকারবোধ।
কটেজ ছেড়ে আজই ওদের ফিরে যেতে হবে নিভৃত এই স্বর্গ থেকে। কিন্তু ঘুমে আচ্ছন্ন তারীনকে দেখে মনে হচ্ছে, সারা পৃথিবীর ক্লান্তি কাটিয়ে ওঠার জন্য সে যেন এক অনন্ত নিদ্রায় ডুবে আছে। তাকে ডাকার শক্তি যেন আযরাফের নেই।
আযরাফ ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো ঘুমন্ত মেয়েটির অতি কাছে। তারীনের প্রশান্ত মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে রবীন্দ্রকাব্যের দুটি চরণ শতবর্ষের ব্যবধান পেরিয়ে আযরাফের ঠোঁটের কোণে যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে উঠল,
“তুমি শুধু ছবি, শুধু পটে লিখা,
ওহে সুদূর, ওহে সুন্দর, ওহে অপরূপা।”
আযরাফ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝুঁকে এসে তারীনের কপালে নিঃশব্দে ঠোঁট ছোঁয়াল। মানুষের ভালোবাসা বোধহয় এরকমই কত সহজে একজন কঠোর মানুষকে নরম করে ফেলে। চাদরটা তারীনের গায়ে ভালো করে টেনে দিয়ে সে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে আযরাফ সোজা বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল।
ঘড়িতে সময় সোয়া ছয়টা। ব্যালকনি থেকে দেখা আকাশটা থমথম করছে। কালো মেঘে ছেয়ে আছে চারপাশ, যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। আযরাফ মনে মনে একটা হিসাব কষে ফেলল। এখন রওনা দিলে রাস্তা ফাঁকা পাওয়া যাবে। তিন ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছানো কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু মেঘ ভেঙে বৃষ্টি নামলে আর জ্যামে পড়লে সারা দিন রাস্তায়ই কেটে যাবে।
তারীনের ঘুম ভাঙলে দুজনে এক সাথে নাস্তা করবে, তাই সে একা নাস্তা করার কথা ভাবলও না। চায়ের একটা তীব্র তৃষ্ণা পাচ্ছিল, কিন্তু আযরাফ ব্যালকনির গ্রিল ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
হুমায়ূন আহমেদের লেখায় এক জায়গায় আছে, মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সে যাকে ভালোবাসে, তার সামনে সে নিজের সব কঠোরতা হারিয়ে ফেলে।
আযরাফ জানালার ফাঁক দিয়ে ঘুমন্ত তারীনের দিকে তাকাল। মেয়েটির মুখটা বৃষ্টির দিনের সকালের মতোই বিষণ্ণ এবং শান্ত। এই অবাধ্য মেয়েটাকে কীভাবে নিজের করে নেবে, সেই জটিল অংকের কোনো সহজ সমাধান আযরাফের জানা নেই।
আকাশে মেঘের ডাক শোনা গেল। আযরাফ একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বেলকনির দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইল।
———————–
একটু পর তারীনের ঘুম ভাঙল। চোখ মেলে সে কিছুক্ষণ ঘরের সিলিংয়ের দিকে অলস ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল। ঘুমভাঙা চোখ দুটি বেশ ভারী। বিছানায় উঠে বসে ছোট একটা হাই তুলল সে। জানালার ওপাশে ভোরের ধূসর আলো তখন কটেজের মেঝেতে এসে পড়েছে। সে পিঠে ছড়িয়ে থাকা অগোছালো চুলগুলো হাত দিয়ে টেনে গুছিয়ে নিয়ে মাথার ওপর আলতো একটা এলোমেলো খোঁপা বাঁধল।
ঠিক তখনই ব্যালকনির দরজার কাছ থেকে একটা পরিচিত, গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
— “গুড মর্নিং, শ্রাবণকন্যা।”
তারীন চোখ তুলে তাকাল। আযরাফ ব্যালকনির কাঠের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, ভেজা চুলগুলো এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। তারীন একটু চুপ থেকে শুকনো গলায় জবাব দিলো,
— “মর্নিং।”
আযরাফ নিজের হাতঘড়ির দিকে একবার তাকাল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
— “ঘুম ভাঙল তাহলে? আর এক মিনিটও দেরি করা যাবে না, দ্রুত গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমরা এখনি বের হব। আমি নিচে নাস্তার অর্ডার দিয়ে আসছি।”
তারীন হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে বসে রইল। তার চোখ-মুখে স্পষ্ট অনিচ্ছা। সে ধীরকণ্ঠে বলল,
— “এত সকালে বের হতে হবে? আমার কেমন যেন ক্লান্ত লাগছে।”
আযরাফ এগিয়ে এসে বিছানার একপাশে বসল। তারীনের কপালে হাত দিয়ে হালকা জ্বর পরীক্ষা করে বলল,
— “জ্বরটা নেমে গেছে। আকাশটা দেখেছ? মেঘের যা অবস্থা, কিছুক্ষণ পর ঝুম বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টি শুরু হলে আর এই গ্রামের কাদা রাস্তা পার হয়ে হাইওয়েতে উঠতে পারবে না। আর বেলা বাড়লে ঢাকার জ্যামে আটকে থাকতে হবে পুরো দিন। তাই লক্ষ্মী মেয়ের মতো ওঠো।”
তারীন কিছু বলল না। শুধু আযরাফের দিকে একপলক তাকাল। তারীন ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। আযরাফ রুমের ল্যান্ডফোনটা তুলে রিসেপশনে ফোন দিলো,
— “হ্যালো, কটেজ ফোর থেকে বলছি। দুজন মানুষের জন্য হালকা নাস্তা আর কফি পাঠিয়ে দিন। আর বিলটা রেডি রাখুন, আমরা দশ মিনিটের মধ্যে নামছি।”
ফোন রেখে আযরাফ জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরের ঝাউগাছগুলোর পাতা হাওয়ায় দুলছে। পুকুরের স্থির পানিতে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টির আগাম দাগ কাটতে শুরু করেছে। দশ মিনিট পর তারীন ওয়াশরুম থেকে বের হলো। সুতি একটা হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার-কামিজ পরনে, মুখটা ধোয়াতে বেশ তাজা লাগছে, যদিও চোখের কোলজুড়ে বিষাদের ছাপটা এখনো স্পষ্ট।
ঠিক তখনই কটেজের বয় নাস্তার ট্রে নিয়ে হাজির হলো। গরম পরোটা, ডিম ভাজি আর ধোঁয়া ওঠা দু-কাপ কফি।
আযরাফ টেবিলের চেয়ার টেনে দিয়ে বলল,
— “বসো। কফিটা গরম থাকতে থাকতেই শেষ করো। গরম কফি খেলে শরীরের আলসেমি ভাবটা কেটে যাবে।”
তারীন চুপচাপ চেয়ারে গিয়ে বসল। কফির কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে জানালার বাইরের বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে রইল। আযরাফ ওর মুখোমুখি বসে ধীরেসুস্থে পরোটা মুখে দিল। বাইরে ততক্ষণে ছোট ছোট বৃষ্টির ফোঁটা টিনের চালে শব্দ তুলতে শুরু করেছে।
আযরাফ কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলল,
— “তোমাকে একটা কথা বলা হয়নি, তারীন।”
তারীন চোখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কী কথা?”
— “আজ বাড়ি ফেরার পর তোমার বাবার বাড়িতে খবর পাঠানো হবে। কাল বা পরশু তুমি কয়েক দিনের জন্য তোমার মার কাছে গিয়ে থাকবে।”
তারীন চমকে তাকাল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে আযরাফ এত সহজে তাকে বাপের বাড়ি যেতে দেবে। সে অনিশ্চিত গলায় শুধাল,
— “সত্যি বলছেন?”
আযরাফ ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর কফির কাপটা টেবিলে রেখে খুব শান্ত গলায় বলল,
— “হুমায়ূন আহমেদ তার কোনো এক বইয়ে লিখেছিলেন, ‘মানুষ যা সবচেয়ে বেশি চায়, তা পেলেও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না।’ তোমার অবস্থাও এখন তাই। হ্যাঁ, সত্যি বলছি। তবে শর্ত একটা।”
— “কী শর্ত?”
— “সেখানে গিয়ে কোনো বোকামি করবে না। নিজের খেয়াল রাখবে, আর সময়মতো ওষুধ খাবে। ড্রাইভার তোমাকে নিয়ে যাবে, আবার সময় হলে নিয়ে আসবে।”
তারীন আর কোনো প্রশ্ন করল না। তার মনে একদিকে বাপের বাড়ি যাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে আযরাফের এই আচমকা নমনীয়তার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা নিয়ে এক অজানা সংশয় দানা বাঁধতে লাগল।
বাইরের বৃষ্টিটা ততক্ষণে বেশ বেগবান হতে শুরু করেছে। আযরাফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে একটা ছোটো ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল,
— “চলো, গাড়ি রেডি।”
অতঃপর তার দুজর রওনা দিলো।
চলবে,,

