#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূর_ফাতেহা
||১০||
গাড়ি চলছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। তারীন জানালায় মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার চোখে ঘুম, আবার এক ধরনের অস্থিরতা।
আযরাফ ড্রাইভ করছে। এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতে মাঝে মাঝে তারীনের দিকে তাকাচ্ছে।
— “ঘুম পাচ্ছে?”
তারীন মাথা না নেড়ে বলল,
— “উঁহুম।”
— “তোমার বাবার বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে তো দেখছি ঘুমই উড়ে গেছে।”
— “আপনি হঠাৎ যেতে দিচ্ছেন কেন? আপনার তো আমাকে কোথাও যেতে দিতে ইচ্ছে করে না।”
— “কারণ খাঁচার দরজা মাঝে মাঝে খুলে দিতে হয়, পাখি। যাতে পাখি বুঝতে পারে বাইরের ঝড়টা কতটা ভয়ংকর, আর খাঁচাটা কতটা নিরাপদ।”
— “মানে?”– তারীন ব্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল
— “মানে কিছু না। তুমি কয়েকদিন থাকবে, মন ভালো হবে। আর আমি একটু শান্তিতে তোমাকে মিস করব।”
গাড়িটা হাইওয়েতে উঠতেই জ্যামে আটকালো। আযরাফ বিরক্ত হয়ে হর্ন দিল না। বরং গাড়ির মিউজিকটা অন করল। বাজছে, ‘চিরদিনই তুমি যে আমার।’
তারীন চমকে উঠে বলল,
— “এই গানটা!”
— “তোমার পছন্দের গান না?
—” আপনি কি করে জানেন?”
—”তোমার A to Z আমি জানি।”
তারীন চোখ বড় বড় করে তাকালো লোকটার পানে। অস্ফুটস্বরে বলল,
—”সব?”
—”এনি ডাউটস, মাই সুইটহার্ট? ইউ ক্যান টেস্ট মি ইফ ইউ ওয়ান্ট।”
—”আমার ফ্রেবারিট কালার?”
—”পার্পেল।”
—”অর ফ্রেবারিট ফ্রুড?”
—”বিরিয়ানি।”
—”আর কিছু।”
—”উঁহুম।”
—”তাহলে চুপটি করে বসো।”
তারীন কোলের উপর দুই হাত খানা রেখে চুপটি করে বসে রইল। নত তার মস্তক। একটা লোক তার সম্পর্কে এতো কিছু জানে অথচ সে লোকটি বিষয়ে কিছুই জানেনা। একটা অপরাধবোধ তাকে গ্রাস করল৷ হাঁসফাঁস করে উঠল মূহুর্তে তার ছোটো হৃদয় খানা। একটু ঢোক গিলল সে।
আযরাফ হাসলো আড় চোখে তার পানে চেয়ে। অতঃপর আবার গাড়ি চালাতে আবার মন দিলো।
———————————
শহরের বুকে এসে গাড়িটি জ্যামে আটকে গেছে। তারীন জানালা পানে চাইলো। রাস্তার পাশে একটা ছোট ছেলে বেলুন বিক্রি করছে। লাল, নীল বেলুন।
আযরাফ বলল,
— “বেলুন কিনবে?”
— “আমি বেলুন কিনে কি করবো বাচ্চা,না কী?”
—”শুধু যে বাচ্চারাই বেলুন কিনে এটা কে বলল তোমায়? বেলুন বড়রাও কিনতে পারে তারীন। কিনবে কি না সেটা বলো?”
—”কিনবো।”
আযরাফ গাড়ির গ্লাস নামিয়ে ছেলেটাকে ডাকল।
— “এই, বেলুন কত?”
— “দশ টাকা স্যার।”
— “সবগুলো দাও।”
ছেলেটা সবগুলো বেলুন দিয়ে দিল। আযরাফ টাকা দিয়ে বেলুনগুলো তারীনের কোলে দিল।
তারীন কোলে লাল-নীল বেলুন নিয়ে বসে আছে। দেখতে অদ্ভুত লাগছে। আযরাফের হঠাৎ মনে হলো, মেয়েটাকে এখন একদম বাচ্চা বাচ্চা লাগছে।
জ্যাম ছাড়ল। গাড়ি চলতে শুরু করল। তারীন একটা বেলুন জানালা দিয়ে ছেড়ে দিল। বেলুনটা উড়ে গেল আকাশে।
— “ছেড়ে দিলে কেন?” আযরাফ বলল।
— “এমনি। উড়তে দিলাম। আমার মতো।”
আযরাফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,
— “তোমাকে আমি কখনো উড়তে বাধা দেব না, পাখি। শুধু ফিরে আসার একটা জায়গা রেখো।”
ওদের গাড়িটা আরেটু এগোতে, আযরাফ হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। নাস্তা করেছে কোন সকালে এখন নিশ্চয়ই মেয়েটার খিদে পেয়েছে। তাই সে নরম কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
—”কিছু খাবে?পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরো দুই ঘন্টা লাগবে।”
—”খাবো।”
—”কী খাবে?”
—”সিঙ্গারা।”
— “সিঙ্গারা? এই বৃষ্টির মধ্যে সিঙ্গারা কোথায় পাব?”
— “আপনি বললেন খাবো কি না। আমি বললাম সিঙ্গারা। এখন আপনি কোথায় পাবেন সেটা আপনার ব্যাপার।”
আযরাফ হেসে ফেলল। এই মেয়েটা মাঝে মাঝে এমন কথা বলে, মনে হয় ক্লাস ফাইভে পড়ে।
সে গাড়ি সাইড করল। সামনেই একটা টং দোকান। টিনের ছাউনি, ভেতরে গরম গরম সিঙ্গারা ভাজা হচ্ছে। বৃষ্টির দিনে সিঙ্গারার ঘ্রাণটা অন্যরকম লাগে।
আযরাফ নেমে গেল। তারীন গাড়িতেই বসে রইল।
পাঁচ মিনিট পর আযরাফ ফিরে এলো। হাতে একটা কাগজের ঠোঙা। ঠোঙার ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে।
— “নাও। গরম সিঙ্গারা।”
তারীন ঠোঙাটা নিল। দুটো সিঙ্গারা। সাথে একটু তেঁতুলের চাটনি।
— “আপনি খাবেন না?”
— “আমি সিঙ্গারা খাই না।”
— “মিথ্যা কথা।”
— “সত্যি। আমার সিঙ্গারা পছন্দ না।”
তারীন একটা সিঙ্গারা ভেঙে অর্ধেকটা আযরাফের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
— “নিন।”
— “বললাম তো খাই না।”
— “একটু খান। আমি একা খাবো নাকি?”
আযরাফ আর না করল না। তারীনের হাত থেকেই অর্ধেকটা সিঙ্গারা নিয়ে মুখে দিল।
তারীন বলল,
— “কেমন?”
— “ভালো।”
— “শুধু ভালো?”
— “অনেক ভালো। কারণ তুমি দিয়েছো।”
তারীন চোখ সরিয়ে নিল। সিঙ্গারা খাচ্ছে, কিন্তু তার গাল দুটো লাল হয়ে গেছে।
আযরাফ গাড়ি স্টার্ট দিল।
— “আস্তে খাও। গলায় আটকাবে।”
তারীন মনে মনে বলল, এই লোকটা এত বেশি কথা বলে কেন? কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
———————————-
দুই ঘন্টা পর তারা এসে পৌঁছালো চৌধুরী ভিটাতে। ওদের গাড়ির শব্দ পেয়ে রোকসানা চৌধুরী বের হয়ে এলেন।
তারীন বের হলো গাড়ি থেকে। রোকসানা চৌধুরী তারীনকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—”কেমন আছো মা?”
—”ভালো আছি, আপনারা?” তারীন একটু ইতস্ততবোধ করতে করতে বলল।
—”এই তো মা ভালো আছি।”
আযরাফ আর গাড়ি থেকে বের হলো না। বরং সে ব্যাগটা তারীনের হাতে দিয়ে বলল,
—”একটু রেস্ট নেও ফুফুর সাথে বসে আড্ডা মারো, ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করো। আমি বের হচ্ছি ভার্সিটিতে দরকার আছে।”
কথাটা শুনে তারীন বলল,
—”এখনি বের হবেন? একটু রেস্ট নিবেন না?”
—”না দরকার আছে আসছি আমি টেককেয়ার।” কথাটা বলেই আযরাফ গাড়ি চালিয়ে চলে গেলো।
তারীন চেয়ে রইলো তার যাওয়ার দিকে। মনের ভিতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে যা এই দুইনে হয়নি। অতঃপর একটা তপ্ত নিঃশ্বাস নিয়ে ঘরের ভিতরে পা দিলো।
চলবে,,

