#চিরদিনই_তুমি_যে_আমার
#নূরা_ফাতেহা
||১৫|| (শেষ পর্ব)
শ্রাবণ মাসের আকাশটার যেন কোনো কুলকিনারা নেই। সকাল থেকেই সে একপশলা অঝোরধারায় কান্নার চরম আয়োজন করে বসেছে। ঢাকা শহরের রুক্ষ পিচঢালা রাস্তাগুলো এখন ঘোলাটে পানির ছোট্ট ছোট নদীতে রূপ নিয়েছে। ধানমন্ডি লেকের পাশের বুড়ো মেহগনি আর ডালপালা ছড়ানো তেঁতুল গাছগুলো ভেজা বাতাসে এলোমেলো মাথা এলিয়ে দিয়ে ঝুম বৃষ্টির এক করুণ গান শুনছে। সেই সুবিশাল তেঁতুল গাছের ঘন ছায়াতলে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো রঙের প্রাইভেট কার। চারপাশের তুমুল বর্ষণের রূপালী ঝালর গাড়িটাকে বাইরের পুরো জগৎ থেকে এক রহস্যময় প্রচ্ছদে ঢেকে ফেলেছে। গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন থেমে গেছে বহু আগেই। ভেতরের এসি বন্ধ থাকায় কাঁচের গায়ে জমে উঠেছে ধোঁয়াটে এক পরত বাষ্প। সেই ধোঁয়াটে কাঁচের ওপর বাইরের পৃথিবীর আলো-আঁধারি ছায়া ফেলে চলে যাচ্ছে, কিন্তু ভেতরের পরিবেশটা স্তব্ধ, গভীর এবং এক আশ্চর্য আদিম উষ্ণতায় মোড়ানো।
আযরাফ চৌধুরী গাড়ির ড্রাইভের সিটটা খানিকটা পেছনে হেলিয়ে দিয়ে বসে ছিল। চোখ থেকে ভারী চশমাটা খুলে সযত্নে ড্যাশবোর্ডের ওপর রেখে দিতেই তার চোখের সেই চিরচেনা কাঠখোট্টা রূপটা এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেল। ফুটে উঠল এক সুগভীর, গাঢ় আর প্রচ্ছন্ন ব্যাকুলতা। প্রফেসরের আজ আর কোনো ব্যাকরণের নিয়ম নেই, নেই ইংরেজি সাহিত্যের কোনো নিরস ব্যাখ্যা। আজ সে শুধুই এক প্রেমিক, যে বহু কঠিন লড়াই আর একগুঁয়ে বল প্রয়োগের পথ পেরিয়ে নিজের শ্রাবণকন্যাকে সম্পূর্ণ নিজের করে পাওয়ার শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে।
— “তারীন।”— আযরাফ খুব নিচু, গম্ভীর অথচ বুঁদ করা সুগভীর কণ্ঠে ডেকে উঠল।
সেই ডাকের ভেতরে এমন এক রহস্যময় সম্মোহন ছিল যা যেকোনো অবাধ্য হৃদয়কে এক মুহূর্তে নরম করে দিতে বাধ্য। তারীন তার ওড়নার আঁচলটা কাঁপানো আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে চোখ তুলে চাইল। তার সেই চোখের আয়নায় আজ আর কোনো রাগ নেই, কোনো কৃত্রিম অভিমানের আগ্নেয়গিরি নেই। সেখানে থিকথিক করছে নিজেকে নিঃশেষে সঁপে দেওয়ার এক অনাবিল আকুলতা।
আযরাফ আর এক মুহূর্তের বিলম্ব সইল না। প্রফেসরের সুউচ্চ বলিষ্ঠ হাত দুটো আধিপত্যে প্রসারিত হলো। কোনো দ্বিধা ছাড়াই সে তারীনকে স্রেফ নিজের বুকের ওপর, কোল ঘেঁষে টেনে বসিয়ে নিল। কলেজ ইউনিফর্মের নীল কলারের পাশে জমে থাকা ভিজে যাওয়া অবাধ্য চুলগুলো আযরাফ কানে গুঁজে দিল। তারপর তার সুগভীর ঠোঁট দুটো ধীর গতিতে নেমে এলো তারীনের ললাটে, গালে আর কাঁপতে থাকা চিবুকে। প্রতিটি স্পর্শে জড়িয়ে রইল এক তীব্র অধিকারবোধ, যা রূপকথার কোনো উপন্যাসের ব্যাকরণ দিয়ে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
তারীনের বুকের ভেতরটা এক অবাধ্য পাখির ডানার মতো হাতুড়ি পিটছিল। আযরাফের গায়ের পরিচিত সুবাস আর এই অদ্ভুত স্পর্শের উত্তাপে সে যেন নিজের সুধাবোধ হারিয়ে ফেলছিল। সে প্রফেসরের হালকা নীল শার্টের কলারটা দুহাতে শক্ত করে চেপে ধরে চোখ দুটো বুজে রইল।
আযরাফ তারীনের চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। চশমা ছাড়া তার চোখ দুটো আজ বড্ড অদ্ভুত আর সম্মোহনী লাগছে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই খামখেয়ালি রূপালী হাসি। সে বাইরের মুষলধারে ঝরতে থাকা রূপালী বৃষ্টির দিকে একপলক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— “বৃষ্টিতে ভিজবে আমার সাথে? তোমার আমার একটা অনাবিল বৃষ্টিবিলাস সকাল হোক।”
তারীন চোখ মেলল। প্রফেসরের চোখের অতল গহীনে সে নিজের পুরো অস্তিত্বকে হারিয়ে যেতে দেখল। সে বুঝল, এই মানুষটা তাকে যেভাবে নিজের করে পাওয়ার জন্য অবাধ্য জেদ দেখিয়েছে, তা হয়তো কোনো সাধারণ নিয়ম মেনে হয়নি। কখনো কখনো বল প্রয়োগ করেও যে ভালোবাসা পাওয়া যায়, নিজের সমস্তটা দিয়ে সে আজ তা অনুধাবন করছে। তারীন আযরাফের চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে আবেশ জড়ানো, কাঁপাকাঁপা সুরে বিড়বিড় করে উঠল,
— “ভিজব। শ্রাবণের প্রতিটি চঞ্চল জলবিন্দু যদি আপনার ভালোবাসার স্পর্শ হয়ে আমার সর্বাঙ্গে ঝরে পড়ে, তবে আমি নিঃসঙ্কোচে নিজেকে সেই ধারাপাতে সঁপে দেব।”
আযরাফ মৃদু হাসল। তার চোখের গভীরে ফুটে উঠল এক পরম বিজয়ের আলো। সে তারীনের ঠোঁটের কাছে নিজের ভারী ও তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে ভালোবাসায় নিবিড় কণ্ঠে জবাব দিল,
— “ভিজাব। আমার হৃদয়ের ব্যাকুলতা আর পরম ভালোবাসার অবাধ্য শ্রাবণধারায় তোমায় আজ স্নান করাব; তোমার সব অভিমান ধুইয়ে দেব, কারণ এই ভবঘুরে হৃদয়ের একমাত্র অধিকারিণী তুমি চিরদিনই তুমি যে আমার।”
আযরাফ গাড়ির লকটা এক ঝটকায় খুলে দিল। প্রফেসরের হাত ধরে এক অদ্ভুত আবেশে দুজন একসাথে পা বাড়াল বাইরে, শ্রাবণের অঝোর ধারার নিচে।
একমুহূর্তে পুরো পৃথিবীটা যেন বদলে গেল। আকাশ ভাঙা জলধারা নেমে এলো তাদের দুজনের ওপর। সুতির সাদা-নীল ইউনিফর্মটা এক নিমেষে ভিজে লেপ্টে গেল তারীনের শরীরে, আর আযরাফের হালকা নীল শার্টটা ভিজে শরীরের সাথে মিশে একাকার। চারপাশের ঝুমঝুম শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই এই নিঝুম ধানমন্ডির কোণে।
বৃষ্টির তীব্র পানির ঝাপটায় তারীন চোখ মেলতে পারছিল না। আযরাফ তারীনের দুটো হাত নিজের হাতের শক্ত মুঠোয় শক্ত করে ধরে টান দিল। তারপর একদম কাছে টেনে এনে, শ্রাবণের ধারাপাতের মাঝে দাঁড়িয়ে, গম্ভীর কন্ঠে আবৃত্তির সুর তুলে বলতে শুরু করল,
— ❝ তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না আমি জানি না,
তবে আমি যখন তোমার চোখের দিকে তাকাই,
তখন আমার মনে হয় আমি এক বিশাল সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি,
যে সমুদ্রের কোনো কূল নেই, কোনো সীমানা নেই,
আমি তোমার চোখের ওই অতল গহ্বরেহারিয়ে যেতে চাই বারে বার,
তোমার চোখের একটা পলক,আমার পুরো পৃথিবীকে ওলট-পালট করে দিতে পারে
যদি কোনোদিন আমায় শুধাও,আমি কী চাই তোমার কাছে?
আমি বলবো আমি কিচ্ছু চাই না,
শুধু মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত,তোমার এই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে চাই।❞
কবিতার প্রতিটি শব্দ বৃষ্টির তোড়ের চেয়েও বেশি তীব্র হয়ে আছড়ে পড়ল তারীনের হৃদয়ে। প্রফেসরের গম্ভীর ও উদাস কণ্ঠের এই উচ্চারণ যেন ঝুম বৃষ্টির জলধারাকে এক অলৌকিক সুরে বেঁধে দিল। তারীন আর সামলাতে পারল না নিজেকে। অঝোর বৃষ্টির মাঝেই সে আযরাফের ভেজা বুকে মাথা গুঁজে দিল পরম আশ্রয়ে। আযরাফ তার শক্ত দুটো বাহু দিয়ে তারীনকে জড়িয়ে ধরে একদম নিজের বুকের সাথে পিষে রেখে দিল।
আজ থেকে বহু দিন আগে, ঠিক এমনই এক মুষলধারে নামা শ্রাবণের বৃষ্টিতে আযরাফ চৌধুরী প্রথম দেখেছিল তার এই শ্রাবণকন্যাকে একগুঁয়ে, অবাধ্য আর চঞ্চল এক তরুণী হিসেবে। সেদিন বৃষ্টি তাদের শুধু পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, আর আজ এই বর্ষণে সে তাকে ভিজিয়ে নিচ্ছে তার অর্ধাঙ্গিনী রূপে। কখনো কখনো প্রকৃতি নিজেই দুটো ভিন্ন মেরুর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলার জন্য এমন বৃষ্টিবিলাসের রূপকথা তৈরি করে।
মানুষের জীবনে কিছু অদ্ভুত মুহূর্ত আসে, যখন পুরো পৃথিবী একদিকে আর মনের ভেতরের মানুষটি অন্যদিকে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন বল প্রয়োগ করে হলেও সেই মানুষটিকে আঁকড়ে ধরাই হলো জীবনের আসল সার্থকতা। ঝুম বৃষ্টির অঝোর ধারায় ভিজতে ভিজতে, প্রফেসরের বুকে মাথা গুঁজে রাখা সুতির ইউনিফর্ম পরা অবাধ্য মেয়েটির মনে হলো পৃথিবীর সমস্ত রাগ, অভিমান আর ত্যাড়ামির সমাপ্তি ঘটে এমন এক শ্রাবণসন্ধ্যায়, যেখানে ভালোবাসার বৃষ্টিতে সিক্ত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন মহাকালের খাতায় চিরদিনের জন্য লিখে রাখল তারা একে অপরের, চিরদিনের জন্য।
(সমাপ্ত)

