#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_6
সকালবেলা বোস্টনের আকাশটা পরিষ্কার থাকে না। কেমন একটা ছাই রঙা মেঘ জমে থাকে। মিলার ম্যানশনের ডাইনিং টেবিলটা এত বড় যে এক মাথায় বসে অন্য মাথার মানুষের সাথে কথা বলতে গেলে গলার আওয়াজ উঁচুতে তুলতে হয়। আর্থার মিলার অবশ্য কখনো গলার আওয়াজ উঁচুতে তোলেন না। তিনি যখন কথা বলেন, ঘরের বাতাস এমনিতেই ভারী হয়ে যায়। টেবিলের ওপর রাখা বেলজিয়ান ক্রিস্টালের বাটি থেকে চামচ দিয়ে কর্নফ্লেক্স তুলতে তুলতে আর্থার মিলার বললেন, “জ্যাক্সন, লরেঞ্জো পরিবারের মেয়ে ভ্যালেরিয়া কাল রাতে আমাকে ফোন করেছিল। সে বেশ আপসেট।”
জ্যাক কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে। সকালেই বাবার ফোনে এই বাসায় হাজির হতে হয়েছিল তাকে। জানত এমনই লেকচার শুনতে হবে। সো বোরিং! জ্যাকের পরনে একটা ডার্ক চারকোল কালারের লুজ হুডি। চুলগুলো ঠিকমতো আঁচড়ানো হয়নি, কপালে এসে পড়েছে। সে বাবার কথার কোনো উত্তর দেয় না। যেন কথাটা সে শুনতেই পায়নি।
“আমি তোমার সাথে কথা বলছি, জ্যাক্সন।” আর্থার মিলারের গলা এবার সামান্য নামল। মিলার বংশে গলা নামার মানে হলো বিপদের সংকেত। “স্পেন আর আমেরিকার এই বিজনেস ডিলটা আমাদের জন্য খুব জরুরি। ভ্যালেরিয়ার সাথে তোমার এনগেজমেন্টটা এই মাসের শেষেই হবে। আমি কোনো অজুহাত শুনতে চাই না।”
জ্যাক কফির কাপটা টেবিলের ওপর রেখে অলস ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বলে, “তোমাদের বিজনেসের জন্য যদি কাউকে এনগেজমেন্ট করতে হয় বাবা, তবে তুমি নিজেই করে নাও। আমার বাস্কেটবল কোর্টের বাইরে অন্য কোনো ডিল নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই।”
“জ্যাক্সন!” আর্থার মিলার এবার পত্রিকাটা ভাজ করে টেবিলের ওপর রাখেন। “তুমি ভুলে যাচ্ছো, তোমার এই ছন্নছাড়া জীবন, তোমার ওই পেন্টহাউস, এমনকি তোমার ইউনিভার্সিটির টিম সবকিছুর পেছনে আমার সই লাগে। আমি চাইলে এক সেকেন্ডে তোমাকে ওই রাজপ্রাসাদ থেকে নামিয়ে দিতে পারি।”
“তাহলে নামিয়ে দাও না।” জ্যাকের গলায় বিন্দুমাত্র উত্তেজনা নেই। সে বাবার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলে, “তবে মনে রেখো, যে রাজপ্রাসাদ তুনি বানিয়েছ, তার চাবিকাঠি কিন্তু তোমার হাতে নেই। আমাকে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করবে না।”
টেবিলের অন্য মাথায় বসে থাকা লেডি এলিনর এতক্ষণ চুপচাপ নিজের গ্রিন টি খাচ্ছিল। পাশেই জ্যাকের মা। তিনি চুপ করে আছেন। এলিনর এবার রূপার চামচটা বাটির পাশে রেখে খুব মৃদু হাসেন। তিনি বলেন, “আর্থার, ছেলেকে এত চাপ দিও না। জ্যাক তো সাধারণ ছেলেদের মতো নয়। ও জানে কাকে কখন নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়।”
তারপর তিনি জ্যাকের দিকে তাকান। চোখ দুটো সরু করে বলেন, “তবে জ্যাক, কাল রাতের বাস্কেটবল ম্যাচে তোমার ওই ভিআইপি গ্যালারির সাত নম্বর সিটের দিকে তাকানোর ভঙ্গিটা কিন্তু আমার ভালো লাগেনি। মিলার পরিবারের ছেলেরা কখনো কোনো সস্তা জিনিসে চোখ আটকায় না। কে সেই মেয়ে?”
জ্যাকের মুখের অলস ভাবটা এক মুহূর্তের জন্য উধাও হয়ে যায়। তার ধূসর চোখ দুটো কঠিন দেখায়। সে তার দাদির দিকে তাকিয়ে খুব ধীর গলায় বলে, “ওটা কোনো জিনিস নয়। ওটা স্রেফ একটা অবাধ্য ক্যালকুলেটর। আর সেটার চাবিটা আমার পকেটেই আছে। ওটা নিয়ে আপনাদের না ভাবলেও চলবে।”
“তুমি সীমা পার করছ, জ্যাক্সন।” আর্থার মিলার গম্ভীর গলায় বলেন। “মিলার পরিবারের একটা মর্যাদা আছে।”
“মর্যাদা তোমার কাছে রাখে, বাবা।” জ্যাক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। “আমার খেয়ালই আমার কাছে একমাত্র মর্যাদা।” সে আর এক সেকেন্ডও সেই ডাইনিং টেবিলের দমবন্ধ করা পারিবারিক নাটক সহ্য করতে চায় না। সে হলরুম থেকে বের হয়ে নিজের গাড়ির দিকে হেঁটে যায়।
বোস্টনের ঠান্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগতেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কাল মাঝরাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া ক্লারার সেই জেদী, রাগী আর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটা। মাইনাস চার ডিগ্রি তাপমাত্রায় মেয়েটা কাল একা একা কীভাবে ডর্মে ফিরেছে, সেই চিন্তাটা তার মাথায় খেলা করে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি তার মাথায় কাজ করছে ক্লারার সেই শেষ কথাগুলো, ‘আপনি একটা জানোয়ার!’ জ্যাক নিজের অজান্তেই পকেটের ভেতর হাতটা মুঠো করে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সে মনে মনে বলে, ‘তুমি আমাকে জানোয়ার বলেছ, ক্লারা? তবে তাই হোক। এই জানোয়ারের খাঁচা থেকে বের হওয়ার রাস্তা তুমি কোনোদিন খুঁজে পাবে না। তোমাকে আমি আমার পায়ের নিচে এনে দাঁড় করাব, এটাই আমার জেদ।’
–
ক্লারা বেনেটের সকালটা শুরু হয় এক কাপ কড়া লিকারের চা আর এক গাদা ডার্ক স্প্রেডশিটের হিসেব দিয়ে। কাল রাতের সেই ভয়ংকর ঠাণ্ডায় তার শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে, কিন্তু তার মনের ভেতরের শক্ত ভাবটা বিন্দুমাত্র কমেনি। সে খুব ভালো করেই জানে, জার্মানির মিউনিখের সেই সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের যদি মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তবে তার নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া কোনো গতি নেই। জ্যাক মিলারের মতো অহংকারী, উদ্ধত একটা ছেলের কৃপার ওপর বেঁচে থাকা মানে নিজের আত্মসম্মানকে প্রতিদিন একটু একটু করে খুন করা। তার এই মুহূর্তে একটা পার্ট-টাইম জবের খুব বেশি প্রয়োজন। সকাল সকাল ফোন করে আগের ম্যানেজার জানিয়ে দিয়েছে যার বদলে ক্লারা কাজ করছিল সেই লোক নাকি চলে এসেছে। তাই এই মুহূর্তে ক্লারার কাছে কোনো কাজ নেই। আর কাজ না থাকলে কোনো কিছুই চলবে না। ইউনিভার্সিটির স্কলারশিপের যে কটা ডলার পাওয়া যায়, তা দিয়ে ডর্মের সিট ভাড়া আর নিজের সস্তা খাবারটুকুই জোটে। আশ্রমের ল্যান্ড লিজের যে বিশাল বকেয়া টাকা শোধ করতে হবে, তার জন্য চাই অনেক ডলার। সে অনবরত ল্যাপটপের স্ক্রিনে বিভিন্ন জব পোর্টালগুলো স্ক্রোল করছে। লাইব্রেরির বই গোছানোর কাজ কিংবা ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজে যে টাকা দেয়, তা দিয়ে কোনোরকম চলে, কিন্তু নিজের পাশাপাশি চালানো এত সহজ না। তাদের আশ্রমের একটা নিয়ম আছে। বয়স ১৮ হলে আশ্রমে থাকা যাবে না, এবং কাজ করতে হবে। কাজের থেকে নিদিষ্ট একটা অংক আশ্রমে দান করতে হবে প্রতি মাসে। এভাবে সেও বড় হয়েছে তাই এখন তার দায়িত্ব ছোট বাচ্চাগুলোর পাশে দাঁড়ানো। হঠাৎ করেই তার চোখ আটকে যায় একটা অফার লেটারের ওপর।
বোস্টনের ডাউনটাউনের সবচেয়ে নামী এবং রহস্যময় নাইট ক্লাব ‘ইনফর্নো’ তে একজন পার্ট-টাইম ক্যাশিয়ার আর বিলিং অ্যাসিস্ট্যান্টের দরকার। কাজের সময় রাত ৯টা থেকে রাত ২টা। আর সেখানে প্রতি ঘণ্টার পে-স্কেল সাধারণ জবের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি। ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। একটা নাইট ক্লাবের পরিবেশ কেমন হতে পারে, তা নিয়ে তার মতো সাধারণ একটা মেয়ের মনে কিছুটা ভয় থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কাল রাতের পেন্টহাউসের ওই ঘটনার পর তার ভেতরের ভয়টা জেদে রূপ নিয়েছে।
সে নিজেকে খুব শান্ত গলায় বলে, “ক্লারা, তুমি যদি জ্যাক মিলারের মতো একটা সাইকোপ্যাথের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মসম্মান নিয়ে ফিরে আসতে পারো, তবে দুনিয়ার কোনো অন্ধকার জায়গাকেই তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জীবনটা তোমার, কোনো মিলার পরিবারের ছেলের সম্পত্তি নয়।” সে আর এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে নিজের সিভিটা সেখানে সাবমিট করে দেয়। কপাল ভালো ছিল তার। ফিনান্সের স্টুডেন্ট হিসেবে তার ম্যাথমেটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড চমৎকার হওয়ায়, বিকেলের মধ্যেই ক্লাবের ম্যানেজারের কাছ থেকে কনফার্মেশন কল চলে আসে। তাকে আজ রাতেই জয়েন করতে বলা হয়েছে। ম্যানেজার ফোনে বেশ কড়া গলায় বলেন, “ক্লারা বেনেট? তোমার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ভালো। তবে মনে রাখবে, ইনফর্নো সাধারণ কোনো ক্লাব নয়। এখানে বোস্টনের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষেরা আসে। আমাদের এখানে নির্ভুল হিসেব আর গোপনীয়তা সবচেয়ে আগে।”
ক্লারা শান্ত স্বরে উত্তর দেয়, “আমি আমার কাজ নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক, স্যার। আপনি হিসেব নিয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন।”
“বেশ। রাত সাড়ে আটটার মধ্যে চলে এসো।”
–
রাত ঠিক সাড়ে আটটা। ক্লারা একটা ব্ল্যাক ফর্মাল শার্ট আর ঢিলেঢালা ট্রাউজার পরে ‘ইনফর্নো’ ক্লাবের পেছনের স্টাফ ডোর দিয়ে ভেতরে ঢোকে। ক্লাবের ভেতরটা পুরোপুরি আলো-আঁধারের এক অন্য দুনিয়া। চড়া বেসের মিউজিক স্পিকারে কাঁপন ধরাচ্ছে, নিয়ন আলোর নীল-লাল রশ্মিগুলো দেয়ালে নাচানাচি করছে। বোস্টনের হাই-সোসাইটির ধনী তরুণ-তরুণীদের ভিড়ে চারপাশটা গমগম করছে।
ক্লারাকে ক্লাবের ফ্রন্ট কাউন্টারের ভেতরের ক্যাশ ডেস্কে বসিয়ে দেওয়া হয়। এই ডেস্কটার একটা বিশেষত্ব আছে। এর সামনের দেয়ালটা সম্পূর্ণ ওয়ান-ওয়ে কাঁচের। অর্থাৎ, ভেতর থেকে বাইরের পুরো ভিআইপি লাউঞ্জটা স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু বাইরে থেকে কেউ ভেতরের মানুষকে দেখতে পাবে না। ক্লারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কম্পিউটারের স্ক্রিনে মনোযোগ দেয়, যাতে বিলিংয়ের হিসেব করতে একটা সেন্টেরও ভুল না হয়। ঠিক রাত সাড়ে দশটা। ভিআইপি লাউঞ্জের সোফাগুলোতে নতুন কিছু গেস্ট এসে বসতেই ক্লারার হাত কিবোর্ডের ওপর থমকে যায়। কাঁচের ওপাশে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একদল বডিগার্ডের প্রহরায় ভিআইপি লাউঞ্জের মাঝখানের সোফাটায় এসে বসছে জ্যাক্সন মিলার। তার পরনে একটা ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট। সে সোফায় হেলান দিয়ে বসতেই ক্লাবের ম্যানেজার নিজে এসে তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। জ্যাকের পাশে এসে বসেছে এক উগ্র সুন্দরী মেয়ে। নাম ভ্যালেরিয়া লরেঞ্জো। ক্লারা একে ভালো করেই চিনে। এই মেয়েকে সে পত্রিকায় দেখেছিল। এরা তো সব বড়লোকের ছেলে মেয়ে। পত্রিকার পুরো একটা অংশ দখল করে বসে আছে। ক্লারা শেষ নিউজে পড়েছিল, ভ্যালেরিয়ার সাথে জ্যাকের বিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ওদের ২ পরিবার তো অন্তত তাই চায়। আর আজকে নিজের চোখের সামনে দু’জনকে একসাথে দেখা যাচ্ছে। মানে নিউজ ভুয়া নয়। তবে ভ্যালেরিয়ার কপাল আসলেই খারাপ। নইলে তার মতো সুন্দরীর কপালে এমন বড়লোকের লম্পট ছেলে জুটে? দুনিয়ায় ছেলের এতই অভাব পড়েছে?
ভ্যালেরিয়া জ্যাকের খুব কাছাকাছি ঘেঁষে বসে কাঁধ হাত দিয়ে বলে, “জ্যাক, কাল রাতে তুমি আমার ফোন ধরোনি কেন? আমি কতটা আপসেট ছিলাম জানো?”
জ্যাক ভ্যালেরিয়ার দিকে না তাকিয়েই টেবিলের ওপর রাখা ড্রিংকসের গ্লাসে আঙুল বোলায়। খুব নিস্পৃহ গলায় বলে, “ব্যস্ত ছিলাম।”
“ব্যস্ত? নাকি অন্য কোনো ক্লাবের মেয়েদের নিয়ে মেতেছিলে?” ভ্যালেরিয়ার গলায় স্পষ্ট অধিকারবোধ। “তোমার বাবা কিন্তু আমাদের এই মাসের এনগেজমেন্টের কথা ফাইনাল করেছেন।”
জ্যাক এবার তার ধূসর চোখ দুটো ভ্যালেরিয়ার মুখের ওপর স্থির করে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সে খুব ঠান্ডা গলায় বলে, “ভ্যালেরিয়া, আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আমি তোমাকে দিইনি। আর আমার বাবা কী ফাইনাল করেছেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার সীমানা পার করার চেষ্টা কোরো না।”
ভ্যালেরিয়া কিছুটা দমে গিয়ে বলে, “তুমি এমন রুড কেন, জ্যাক?”
“আমি এমনই।” জ্যাক ড্রিংকসের গ্লাসটা এক চুমুকে শেষ করে বলে, “আমি কাউকে খুশি করতে এখানে আসিনি।”
কাঁচের ওপাশে বসে ক্লারার হাত কাঁপছে। সে নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে মানুষটার অত্যাচার থেকে বাঁচতে সে এই নাইট ক্লাবে কাজ নিয়েছে, সেই মানুষটাই এখন তার চোখের সামনে বসে আছে। ক্লারা নিজের হাত দুটো মুঠো করে মনে মনে বলে,, ঈশ্বর, ও যেন কোনোভাবে জানতে না পারে আমি এখানে আছি।’
কিন্তু ভাগ্য বোধহয় ক্লারার ওপর খুব বেশি অসন্তুষ্ট ছিল। টেবিলের বিল দেওয়ার সময় হতেই জ্যাক ক্লাবের ম্যানেজারকে ডেকে ইশারা করে। ম্যানেজার সাথে সাথে বিলিং কাউন্টারের দিকে এগিয়ে আসে।
ম্যানেজার ভেতরের ডেস্কে এসে ক্লারাকে বলে, “ক্লারা, ভিআইপি টেবিল সেভেনের বিলটা চট করে করো। মিস্টার জ্যাক্সন মিলার নিজে পে করবেন।”
ক্লারা কাঁপা হাতে বিলটা প্রিন্ট করে ম্যানেজারের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু ম্যানেজার বিলটা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে, “আরে, সিগনেচার প্যাডটা কোথায়? মিস্টার মিলার কার্ডে সই করবেন। তুমি নিজে গিয়ে ওটা দিয়ে এসো। আমি অন্য একটা জরুরি টেবিলে যাচ্ছি।”
ক্লারা ফ্যাকাশে মুখে বলে, “স্যার, আমি কি এখানে… মানে বাইরে না গিয়ে এখান থেকেই কার্ডটা পাঞ্চ করতে পারি না?”
“না, ভিআইপি গেস্টদের টেবিলে গিয়েই সই নিতে হবে। জলদি করো!” ম্যানেজার ধমকের সুরে বলে চলে যায়। ক্লারা নিরূপায়। সে সিগনেচার প্যাড আর বিলটা হাতে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ডেস্কের দরজা খুলে বাইরে আসে। বোস্টনের তীব্র নিয়ন আলো আর চড়া মিউজিকের মাঝে সে নিজেকে বড্ড অসহায় বোধ করে। সে ধীর পায়ে জ্যাকের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে বিলটা টেবিলের ওপর রেখে বিনীত গলায় বলে, “মিস্টার মিলার, আপনার বিল।”
জ্যাক মদের ডার্ক হাতে নিয়ে ভ্যালেরিয়ার সাথে কথা বলছিল। এখানে সে এই ভ্যালেরিয়াকে এনেছিল, যাতে বিয়ের বিষয়টা মিটমাট করা যাক। হ্যাঁ মেয়েটা সুন্দর তবে দুনিয়ার সব সুন্দর মন ভরে পরিদর্শন করার পর এখন আর এসবে মন বসে না জ্যাকের। এখন তো তার ঝাঁঝালো কিছু একটা চাই। ক্লারার গলার স্বরটা কানে যেতেই সে এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে যায়। তার ধূসর চোখ দুটো চট করে ওপরে ওঠে। চশমা পরা, ব্ল্যাক ফর্মাল শার্টে ক্লারাকে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জ্যাকের চোখ দুটো এক মুহূর্তের জন্য অবিশ্বাসে ছোট হয়ে আসে। তার ঠোঁটের কোণে ধূর্ত একটা হাসি ফুটে উঠল। সে খুব ধীরে, শান্ত গলায় বলে, “আরে! মিস ক্যালকুলেটর। তুমি এখানে? এই অন্ধকার ক্লাবে কার হিসেব মেলাচ্ছো?”
ভ্যালেরিয়া লরেঞ্জো জ্যাকের কথা শুনে কৌতূহলী চোখে ক্লারার দিকে তাকায়। ক্লারার সাধারণ পোশাক, মুখের চশমা আর শান্ত অবয়ব দেখে তার চোখে স্পষ্ট অবজ্ঞা ফুটে ওঠে। সে মুখ বাঁকিয়ে বলে, “কে এই মেয়ে, জ্যাক? তোমার চেনা?”
জ্যাক ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকায় না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন ক্লারার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের ওপর। সে হাতের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে অলস ভঙ্গিতে বলে, “চেনা তো বটেই। আমাদের ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রী। যে সংখ্যার জটিল হিসেব খুব ভালো বোঝে, কিন্তু জীবনের হিসেব মেলাতে গেলেই গোলমাল করে ফেলে।”
ক্লারা সিগনেচার প্যাডটা বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে। তার হাত কাঁপছে, কিন্তু সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে চায় না। সে যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলে, “মিস্টার মিলার, অনুগ্রহ করে বিলে সই করুন। আমার আরও কাজ আছে।”
জ্যাক সোফায় আর একটু হেলান দিয়ে বসে। সে খুব নিচু স্বরে বলে, “কাজের বড্ড তাড়া দেখছি। তা, দিনে ইউনিভার্সিটির ল্যাব আর রাতে এই অন্ধকার ক্লাবে ক্যাশিয়ার এত ডলার দিয়ে কী হবে, ক্লারা? কোন নতুন প্রজেক্টের হিসেব মেলাচ্ছ?”
ভ্যালেরিয়া বিরক্ত হয়ে বলে, “জ্যাক, তুমি একজন সাধারণ ক্যাশিয়ারের সাথে এত কথা কেন বলছ? বিলটা পে করো, আমরা এখান থেকে বের হব।”
জ্যাক এবার ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকায়। তার চোখের চাউনি এতই শীতল যে ভ্যালেরিয়া এক মুহূর্তে চুপ হয়ে যায়। জ্যাক ধীর গলায় বলে, “ভ্যালেরিয়া, আমি যখন কথা বলি, তখন মাঝখান থেকে কেউ কথা বললে আমার বড্ড বিরক্ত লাগে। তুমি বরং লেডিস রুমে গিয়ে তোমার মেকআপটা একটু ঠিক করে এসো।”
ভ্যালেরিয়া অপমানে লাল হয়ে ওঠে। সে জ্যাকের মেজাজ খুব ভালো করেই জানে। সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নিজের দামী হ্যান্ডব্যাগটা তুলে নিয়ে উঠে চলে যায়। টেবিলটা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। শুধু জ্যাক আর ক্লারা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। চারপাশের চড়া মিউজিক আর মানুষের চিৎকার যেন এই ছোট্ট অংশটুকুতে এসে থমকে গেছে। জ্যাক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তার দীর্ঘ অবয়বটা ক্লারার সামনে আসতেই ক্লারা এক কদম পিছিয়ে যেতে চায়, কিন্তু জ্যাক চট করে টেবিলটা ঘুরে এসে তার পথ আটকে দাঁড়ায়। সে ক্লারার হাতের সিগনেচার প্যাডটা আলতো করে কেড়ে নিয়ে টেবিলের ওপর ফেলে দেয়।
“তুমি এখানে কী করছ, ক্লারা?” ক্লারা চোখ তুলে সোজা জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকায়। সে বলে, “আমি আমার কাজ করছি, মিস্টার মিলার। নিজের টাকায় অল্প ইনকাম করাও সম্মানের।
“সম্মান?” জ্যাক একটু হাসে। “এই নোংরা জায়গায়, মাতালদের ভিড়ে বিলিং ডেস্কে বসে তুমি সম্মান খুঁজছ? তুমি সত্যিই একটা বোকা।”
“আমি বোকা নই। আমি অন্তত নিজের উপার্জনে বাঁচতে পারি।”
জ্যাক ক্লারার খুব কাছে এগিয়ে আসে। তার গলার স্বর আরও নিচু হয়ে যায়, যা শুধু ক্লারার কান পর্যন্ত পৌঁছায়। সে বলে, “ দাও সই করে দেই।” সে করে দিতেই যেন ক্লারা প্রাণ ফিরে গেল। এক মুহূর্তে আর দেরি না করে ভেতরে চলে গেল। জ্যাক তার যাওয়ার পথে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ কি যেন একটা ভাবল আর তারপর হঠাৎ বাঁকা হেসে তার বডিগার্ডকে বলল, “তোমার ভ্যালেরিয়া ম্যামকে আসতে বলো তো।”
–
রাত যখন প্রায় বারোটা, তখন ক্লাবের ভেতরের চিৎকারের ভলিউম আরও বেড়ে গেছে। মদের গ্লাসের ঠোকাঠুকির শব্দ আর তীব্র পারফিউমের গন্ধ যেন বাতাসের অক্সিজেন কমিয়ে দিচ্ছে। ক্লারা একের পর এক কাস্টমারের ক্রেডিট কার্ড সোয়াইপ করছে আর মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে, কখন এই রাত দুটো বাজবে আর সে নিজের শান্ত ডর্ম রুমে ফিরে যাবে। হঠাৎ তার চোখ কাঁচের দেওয়াল ভেদ করে জ্যাকের দিকে চলে গেল। ওই সুন্দরী মেয়েটার সাথে কিভাবে লেপ্টে বসে আছে। কতক্ষণ ধরে কি যেন কথা বলেই যাচ্ছে। কাল রাতে যে ছেলেটা তাকে নিজের বিছানায় শোয়ার জন্য হুকুম করছিল, সে আজ রাতে অন্য একটা মেয়ের সাথে এত সহজে লিপ্ত হতে পারছে? ক্লারার নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা হলো। সে কেন এক সেকেন্ডের জন্য কাল রাতে এই ছেলের বুকের ধকধকানি শুনতে গিয়েছিল? এই ছেলেটা একটা সত্যিকারের চরিত্রহীন ডাম্পস্টার ছাড়া আর কিছুই নয়। ক্লারা নিজের চোখ দুটো সরিয়ে নিতে চাইল, কিন্তু ঠিক সেই মূহুর্তেই জ্যাক ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে চট করে কাঁচের দেয়ালের দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। যদিও কাঁচটা ওয়ান-ওয়ে ছিল, কিন্তু জ্যাকের বসার কোণ আর তার তীক্ষ্ণ চোখ ঠিক চিনে নিল যে কাঁচের ওপাশে চশমা পরা, রাগে আর অপমানে নীল হয়ে যাওয়া ক্লারার মুখটা লুকিয়ে আছে। জ্যাকের ধূসর চোখে এক মূহুর্তের জন্য চমক দেখা গেলেও, সে নিজের ভাব একটুও প্রকাশ করল না। বরং তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হয়ে উঠল। সে ভ্যালেরিয়াকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে, অন্য হাতটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর সরাসরি ক্লারার চোখের দিকে তাকিয়ে, অবমাননাকর ভঙ্গিতে নিজের ডান হাতের মিডেল ফিঙ্গার তুলে দেখাল।
এই নোংরা অপমানটা ক্লারার বুকে তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। সবার সামনে, ক্লাবের এই আলো-আঁধারের মাঝে জ্যাক তাকে বুঝিয়ে দিল তুমি স্রেফ আমার পায়ের নিচের একটা ধুলো, যার কোনো মূল্য আমার কাছে নেই। ক্লারার চোখ দুটো রাগে আর অপমানের জলে টলটল করে উঠল। সে কম্পিউটারের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের মুখটা দুই হাতের তালুতে লুকিয়ে ফেলল। হঠাতই জ্যাক থমকে যায়। ঠিক এই মুহূর্তেই ভ্যালেরিয়া লরেঞ্জো জ্যাকের চওড়া কাঁধের ওপর নিজের ফর্সা দু-হাত জড়িয়ে ধরে আরও কাছে ঘেঁষে আসে। জ্যাকের এখন মনে হচ্ছে সে কোনো নিষ্প্রাণ জড়বস্তুর পাশে বসে আছে। ভ্যালেরিয়ার দামি ফরাসি পারফিউমের গন্ধটা তার নাকের কাছে বড্ড বিষাক্ত আর সস্তা ঠেকছে। জ্যাকের ভেতরের অস্থিরতা এক লহমায় হিংস্র রাগে রূপ নেয়। সে ভ্যালেরিয়াকে এক ঝটকায় নিজের শরীর থেকে সরিয়ে দেয়, যেন কোনো নোংরা আবর্জনা স্পর্শ করেছে। ভ্যালেরিয়া প্রচণ্ড চমকে যায়। সে তার বড় বড় চোখ করে বলে, “কী হলো জ্যাক? এনি প্রবলেম? এই আমাকে পাঠিয়ে দাও, এই আমাকে কাছে ডেকে দূরে সরিয়ে দাও কি সমস্যা তোমার?”
জ্যাক কোনো কথা বলে না। সে হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা সামনের কাঁচের টেবিলের ওপর সজোরে আছাড় মারে। ক্রিস্টালের দামী গ্লাসটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। লাউঞ্জের কানফাটানো মিউজিক তখনো বাজছে, কিন্তু জ্যাকের চারপাশের বাতাস যেন জমে বরফ হয়ে গেছে। সে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা, অবমাননাকর গলায় বলে, “তোমার সাথে আমার কথা শেষ ভ্যালেরিয়া। এবার বিদায় হও।”
“জ্যাক্সন! তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারো না!” ভ্যালেরিয়া রেগে দাঁড়িয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করে, “তোমার বাবা আমাদের এনগেজমেন্টের কথা….” জ্যাক তার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে আসে। সে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলে, “আমার বাবা কী বলল, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি তোমাকে আজ এখানে কেন এনেছি জানো? স্রেফ একটা অবাধ্য পাখিকে দেখাতে যে, আমার খাঁচায় বসার জন্য তোমার মতো হাজারটা মেয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। তোমার যোগ্যতা স্রেফ ওইটুকুই। আমার বডিগার্ড তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করে দেবে। গেট আউট।”
ভ্যালেরিয়া অপমানে আর লজ্জায় কেঁদে ফেলে লাউঞ্জ ছেড়ে দ্রুত দৌড়ে বেরিয়ে যায়। জ্যাক সোফায় আবার ধপ করে বসে। তার মাথায় অনবরত ঘুরছে ক্লারার কথা। কেন? কোনো জবাব নেই তার কাছে। ক্লারার সামনে এসব ইচ্ছে করে করেছে যেখানে তার এসব করার দরকারও ছিল না। কিন্তু কেন সে এসব করছে? জ্যাক নিজের চুলগুলো মুঠো করে ধরে বিড়বিড় করে বলে, “জ্যাক্সন মিলার যা শুরু করে, তা শেষ করার এখতিয়ার শুধু তারই থাকে। তুমি আমার খাঁচা থেকে ডানা কেটে হলেও বের হতে পারবে না।”
চলবে?

