Out Of Bounds পর্ব-০৫

0
2

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_5

বোস্টনের ডাউনটাউনের সবচেয়ে দামি আর স্কাইস্ক্র্যাপারের পঁচিশ তলার লিফটের দরজাটা যখন এক মৃদু শব্দে খুলে গেল, ক্লারার মনে হলো সে কোনো আধুনিক পিশাচের প্রাসাদে এসে দাঁড়িয়েছে। পুরো ফ্লোর জুড়ে শুধু একটাই পেন্টহাউস। জ্যাক্সন মিলারের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য বুঝি এটাই? শুনেছে এই বড়লোকের বখাটে ছেলেটা নাকি বাবা-মায়ের সাথে থাকে না। থাকবে কেমন করে? তার ঘরে সারাদিন মেয়েদের আনাগোনা লেগেই থাকে। এসব করতে তো প্রাইবেসি লাগে?

লিফট থেকে বের হতেই মেঝেতে বিছানো ডার্ক গ্রে রঙের নরম ইতালিয়ান কার্পেট ক্লারার জুতোজোড়াকে যেন গ্রাস করে নিল। পুরো পেন্টহাউসের দেয়ালগুলো নিরেট কাঁচের, যেখান থেকে বাইরের তুষারঝরা বোস্টন শহরটাকে একটা জীবন্ত থ্রি-ডি মানচিত্রের মতো দেখাচ্ছে। ঘরের ভেতরের আলো বলতে শুধু সিলিং থেকে ঝুলে থাকা কিছু মিনিমালিস্টিক ডার্ক মেটালিক ল্যাম্পের হালকা হলদেটে আভা। বাতাসে ভাসছে সেই ব্ল্যাক ওডের সুগন্ধি। জ্যাক লকার রুমের ওই জার্সি বদলে এখন একটা ডার্ক চারকোল কালারের সিল্কের আলগা ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর কালো রঙের হুডি পরে আছে। তার চুলগুলো এখনো কিছুটা ভেজা, যা তার কপালে এলোমেলোভাবে লেপ্টে আছে। সে পকেটে হাত গুঁজে খুব অলস ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়ে লিভিং রুমের বিশাল এল-শেপড সোফাটায় বসল। সে ক্লারার দিকে তাকিয়ে কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় বলল, “দাঁড়িয়ে থেকো না, মিস ক্যালকুলেটর। তোমার কাঁধের ওই ব্যাগটা নামিয়ে রাখো। আর হ্যাঁ, চশমাটা খুলে ভালো করে মুছে নাও, কারণ আজ রাতে তোমাকে অনেক হিসেব মেলাতে হবে।”

ক্লারা নিজের ল্যাপটপ ব্যাগটা বুকের কাছে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দরজার কাছেই কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার নীল চোখ দুটোতে তখন তীব্র অপমানের আগুনে পুড়ছে। সে কাঁপানো গলায় বলল, “আমি এখানে আপনার রাজপ্রাসাদ দেখতে আসিনি, মিস্টার ডাম্পস্টার। আপনি বলেছিলেন প্রজেক্টের কাজ করবেন। দয়া করে ডেটা শিটটা দিন, আমি এখনই আমার ল্যাপটপে হিসেবগুলো করে ডর্মে ফিরে যাব। আমার এই দমবন্ধ করা জায়গায় এক মুহূর্ত থাকার ইচ্ছে নেই।” জ্যাকের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার অবয়বটা যখন ক্লারার দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছিল ক্লারার মনে হলো একটা ব্ল্যাক প্যান্থার তার শিকারের দিকে এগোচ্ছে। জ্যাক ক্লারার একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে নির্গত সুবাস ক্লারার সমস্ত ইন্দ্রিয়কে আবার অবশ করতে শুরু করল। জ্যাক খুব নিচু স্বরে, ক্লারার কানের খুব কাছে ঝুঁকে এসে বলল, “ফিরে যাবে? কার কাছে? ওই মার্কাসের কাছে? আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি প্রজেক্টের বাহানায়, সেটা তুমিও জানো আর আমিও জানি, ক্লারা। আমার হুকুম ছাড়া এই পেন্টহাউসের একটা দরজাও খুলবে না। আজ পুরো রাত তুমি আমার এই খাঁচায় বন্দি।”

ক্লারা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার পিঠ ততক্ষণে দেয়ালের সাথে ঠেকে গেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আপনি জোর করে কাউকে আটকে রাখতে পারেন না, জ্যাক। এটা বেআইনি।”

“আইন?” জ্যাক একটু হাসল। “আইন তো আমার মতো মানুষদের পকেটেই থাকে, ক্লারা। আর জোর করার কথা বলছ? আমি তো জোর করছি না। তুমি নিজেই তোমার সাধের অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য এখানে স্বেচ্ছায় এসেছ। এটাকে বলে সমঝোতা।”

“আপনি একটা নিচু মনের নোংরা ব্ল্যাকমেইলার!”

“আমি জানি।” জ্যাকের আঙুলগুলো আবার ক্লারার চশমার ফ্রেমটা ছুঁয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আর তুমি হলে আমার সেই শিকার, যে খাঁচায় ঢোকার পরও ডানা ঝাপটানোর ভুল চেষ্টা করছে। ডানা ঝাপটানো বন্ধ করো, ক্লারা। তাতে শুধু নিজেরই চোট লাগবে।”

ক্লারা জ্বলন্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

রাত তখন প্রায় একটা। বাইরের তুষারপাত আরও ঘন হচ্ছে। জানালার ওপাশে বোস্টন শহরটা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। লিভিং রুমের কাঁচের টেবিলের ওপর দুটো ল্যাপটপ খোলা। ক্লারা সোফার এক কোণায় বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে স্প্রেডশিটের ফর্মুলাগুলো টাইপ করছে। সে পুরো মনোযোগ কাজে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পারছে না। তার পাশে বসা মানুষটা কাজের দিকে বিন্দুমাত্র তাকাচ্ছে না। জ্যাক সোফায় হেলান দিয়ে এক হাত ক্লারার সিটের পেছনে ছড়িয়ে রেখে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। তার ধূসর চোখ দুটো ল্যাপটপের স্ক্রিনের চেয়েও উজ্জ্বল। সে স্থির দৃষ্টিতে ক্লারার দিকে তাকিয়ে আছে। এই একমুখী চাহনিতে ক্লারার অস্বস্তি বাড়ছে। টাইপ করা বন্ধ করে সে চট করে জ্যাকের দিকে ঘুরে তাকায়। চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বেশ কড়া গলায় বলে, “আপনার প্রজেক্টের রিস্ক অ্যানালিসিসটা আমি শেষ করেছি। এবার অন্তত নিজের ল্যাপটপটা খুলুন আর বাকি কাজটা চেক করুন। এভাবে তাকিয়ে থাকলে কাজ শেষ হবে না।”

জ্যাক তার বসার ভঙ্গি বদলায় না। খুব নিস্পৃহ গলায় বলে, “হিসেব মেলানোর দায়িত্বটা তোমার, ক্লারা। আমার কাজ স্রেফ ফলাফল ভোগ করা।”

“তার মানে পুরো কাজটা আমাকে একাই করতে হবে?”

“হ্যাঁ। এই জটিল স্প্রেডশিটের চেয়ে তোমার এই রাগী মুখটা দেখতে আমার অনেক বেশি ভালো লাগছে। সময়টা অন্তত অপচয় হচ্ছে না।”

ক্লারা ল্যাপটপের স্ক্রিনটা ধপ করে বন্ধ করতে চায়। কিন্তু সে স্ক্রিনটা ছোঁয়ার আগেই জ্যাকের শক্ত হাতটা এসে তার হাতের ওপর পড়ে। জ্যাকের গরম হাতের তালুটা ক্লারার ঠাণ্ডা আঙুলগুলোকে পুরোপুরি চেপে ধরে।

ক্লারা চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু জ্যাকের হাত নড়ে না। সে ক্লারার হাতটা টেনে নিজের বুকের ওপর রাখে। ক্লারা প্রায় ফিসফিস করে বলল, “হাত ছাড়ুন, জ্যাক।”

জ্যাক হাত ছাড়ে না। উল্টো ক্লারাকে সোফা থেকে টেনে দাঁড় করায়। তারপর খুব সহজ ভঙ্গিতে তাকে নিয়ে যায় ঘরের কোণায় জ্বলতে থাকা ফায়ারপ্লেসটার সামনে। ফায়ারপ্লেসের লালচে আলো এসে পড়ছে তাদের দুজনের মুখে। জ্যাক ক্লারাকে দেয়ালের সাথে আলতো করে দাঁড় করিয়ে তার চশমাটা এক ঝটকায় খুলে পাশের টেবিলে রেখে দেয়। চশমা ছাড়া ক্লারার নীল চোখ দুটো ফায়ারপ্লেসের আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে। জ্যাক তার বুড়ো আঙুল দিয়ে ক্লারার চোখের কোণটা আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমার সামনে এই চোখের জল ফেলা বন্ধ করো, ক্লারা। আমি আমার এলাকায় কোনো দুর্বলতা পছন্দ করি না। তুমি যতবার আমার নিয়ম ভাঙবে, যতবার ওই মার্কাসের মতো ছেলেদের দিকে তাকাবে, আমি ততবার তোমাকে ঠিক এভাবেই নিজের কাছে টেনে আনব।”

ক্লারা দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। চশমা ছাড়া জ্যাকের মুখটা তার কাছে অনেক বেশি স্পষ্ট আর অচেনা লাগছে। সে তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো শক্ত করে বলল, “আপনি আমাকে এভাবে আটকে রাখতে পারেন না। এবার দেখবেন আমি কাল সকালেই ডিন মরিসনকে সব জানাব।”

জ্যাক একটু হাসে। তার সেই হাসিতে কোনো ভয় নেই, বরং এক ধরণের কৌতুক আছে। সে ক্লারার মুখের খুব কাছে নিজের মুখটা এনে বলে, “ডিন? এই পুরো ইউনিভার্সিটির ফান্ডিং যেখানে আমার বাবার কোম্পানি থেকে যায়, সেখানে ডিন আমার একটা টেক্সটের অপেক্ষায় থাকে, ক্লারা। সো, কাল্পনিক চিন্তা বাদ দাও।”

“আপনি একটা আস্ত শয়তান।”

“তা হতে পারি। তবে আমি যা নিজের বলে দাবি করি, তা আমি আদায় করেই ছাড়ি।”

ক্লারা সোজা জ্যাকের চোখের দিকে তাকায়। তার গলার স্বর এবার আর কাঁপছে না, বরং বেশ শান্ত শোনায়, “মানুষকে জোর করে সব পাওয়া যায় না, জ্যাক। আপনি টাকা দিয়ে হয়তো অনেকের সময় কিনতে পারেন, কিন্তু তাদের আনুগত্য নয়।”

জ্যাকের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হয়। সে বলে, “আমি তো আনুগত্য চাইনি, ক্লারা। আমি শুধু যা চাই, তা আমার চোখের সামনে রাখতে চাই। এখন চুপচাপ তোমার কাজে ফিরে যাও।”


রাত তখন প্রায় তিনটে। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপের স্প্রেডশিটের শেষ হিসেবটা মিলিয়েই ক্লারা ল্যাপটপটা দড়াম করে বন্ধ করে দেয়। তার শরীর আর মন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে, কিন্তু আত্মসম্মানবোধ তাকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্ত হতে দিচ্ছে না। সে সোফা থেকে নিজের ব্যাগ আর চশমাটা তুলে নিয়ে শক্ত গলায় বলে, “কাজের সবটুকু শেষ, মিস্টার ডাম্পস্টার। আপনার হিসেব বুঝিয়ে দিয়েছি। আমি এখন ডর্মে ফিরে যাচ্ছি।”

জ্যাক সোফায় হেলান দিয়ে এক হাত ছড়িয়ে বসে আছে। সে তার হাতঘড়ির দিকে এক নজর তাকিয়ে কুটিল হাসে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে ক্লারার যাওয়ার পথ আটকে বলে, “ফিরে যাচ্ছ? এই মাঝরাতে? বোস্টনের ডাউনটাউনের এই এরিয়াটা রাতে কতটা ভয়ংকর, তা তোমার ওই কিতাবি মগজে হয়তো নেই, মিস ক্যালকুলেটর। এই সময়ে বাইরে লোকাল গ্যাং আর ড্রাগ ডিলারদের রাজত্ব চলে। অনাথ আশ্রমের একটা মেয়েকে একা পেলে ওরা কী করতে পারে, সে ধারণা আছে? আর তাছাড়া, এই পেন্টহাউসের প্রাইভেট লিফটের কোড শুধু আমার জানা। আমি কোড না দিলে তুমি এই বিল্ডিংয়ের নিচেও নামতে পারবে না। সো, চুপচাপ নিজের জেদ কমাও।”

ক্লারা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে, “আপনি ইচ্ছা করে আমাকে আটকে রাখছেন! আমি উবার ডেকে নেব।”

“বাইরে মাইনাস চার ডিগ্রি টেম্পারেচার আর স্নো-স্টর্ম চলছে। এই রাতে কোনো উবার এখানে আসবে না,” জ্যাক পকেটে হাত গুঁজে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলে। ঠিক তখনই ক্লারার পেট থেকে একটা মৃদু আওয়াজ আসে। সকালের পর থেকে সে কিচ্ছু খায়নি। ক্ষুধার তীব্রতায় তার শরীর দুর্বল লাগছে, কিন্তু জ্যাকের সামনে সে চরম লজ্জায় পড়ে যায় এবং মুখ নিচু করে ফেলে। জ্যাকের তীক্ষ্ণ কান সেই আওয়াজটা মিস করেনি। তার ঠোঁটের কোণে একটা উপহাসের হাসি ফুটে ওঠে। সে বলে, “হুম, মিস ক্যালকুলেটরের মগজে তো অনেক জোর, কিন্তু পেটে দেখছি বড্ড খিদে। চলো কিচেনে।” ক্লারা যেতে চায়, কিন্তু জ্যাক তার কোনো আপত্তি না শুনেই তার হাত ধরে টেনে পেন্টহাউসের কিচেনটার দিকে নিয়ে যায়। এত রাতে বাইরে থেকে খাবার অর্ডার দেওয়া অসম্ভব, আর পেন্টহাউসের শেফও চলে গেছে। জ্যাক রেফ্রিজারেটরটা খুলে দেখে সেখানে শুধু কিছু ওয়াইন, চিজ, আর কাঁচা স্টেক ছাড়া তৈরি কোনো খাবার নেই। সে ফ্রিজের দিকে তাকিয়ে একটা বিরক্তিকর শব্দ করে, “মহা ঝামেলা! এখানে তো রেডিমেড কিচ্ছু নেই।”

ক্লারা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। সে জ্যাককে একপাশে সরিয়ে দিয়ে বলে, “হবে কী করে? শুধু হুকুম করতেই পারেন, একটা ডিম ভাজতেও পারেন না।” ক্লারা নিজেই ফ্রিজ ঘেঁটে কিছু পাস্তা, মাশরুম, আর চিজ বের করে। সে চুলাটা অন করে কড়াই বসিয়ে দেয়। জ্যাক তখন কিচেন কাউন্টারে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে খুব কৌতূহল নিয়ে ক্লারার রান্নার মুভমেন্টগুলো দেখছে। প্যানটা নাড়াচাড়া করার সময় জ্যাক এক হাত বাড়িয়ে ক্লারার কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো আলতো করে কানের পেছনে গুঁজে দেয়। জ্যাকের গরম আঙুলের ছোঁয়ায় ক্লারা এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়, তার হাত থেকে প্রায় চামচটা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। দুজনের চোখাচোখি হয়। কাছাকাছি এসেও যেন এক অদৃশ্য দেয়াল দুজনকে আটকে রাখে। মিনিট দশেকের মধ্যে ক্লারা একটা চমৎকার চিজি মাশরুম পাস্তা তৈরি করে ফেলে। প্লেটে নিয়ে সে নিজে অল্প একটু খায়, আর বাকিটা জ্যাকের দিকে বাড়িয়ে দেয়। জ্যাক প্রথম কামড় দিয়েই স্তব্ধ হয়ে যায়। রান্নাটা সত্যিই চমৎকার হয়েছে।
খাওয়া শেষ হতেই ক্লারা হাত ধুয়ে বলে, “এবার বলুন, আমি কোন গেস্ট রুমে ঘুমাব?”

জ্যাক মুখ মুছে অলস গলায় বলে, “গেস্ট রুম? এই পেন্টহাউসে কোনো গেস্ট রুম নেই। শুধু একটাই মাস্টার বেডরুম।”

ক্লারা অবাক হয়ে প্রায় চিৎকার করে ওঠে, “কী! এত বড় পেন্টহাউস, আর একটা মাত্র বেডরুম? এটা কেমন বাড়ি?” জ্যাক তার দিকে এগিয়ে এসে খুব শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলে, “জ্যাক্সন মিলারের রাজত্বে কোনো গেস্টের এলাউন্স নেই। আমি কাউকে এখানে থাকতে দিই না। সো, একটাই বেডরুম। আর আজ রাতে ওখানেই তোমাকে শুতে হবে।”

“আমি আপনার বিছানায় কখনো শোব না!” ক্লারা সাফ জানিয়ে দেয়। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হয়। ক্লারা সোফায় শোয়ার জেদ ধরে, আর জ্যাক তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় বাইরের মাইনাস চার ডিগ্রি তাপমাত্রার কথা। দীর্ঘক্ষণ তর্কের পর একটা সমঝোতা হয়। জ্যাক বলে বিছানাটা অনেক বড়, মাঝখানে বালিশের দেয়াল থাকবে এবং কেউ কারও সীমানা পার করবে না। ক্লারা বাধ্য হয়ে বিছানার এক কোণায় নিজের শরীরটাকে গুটিয়ে শুয়ে পড়ে। জ্যাক বিছানার অন্য পাশে গিয়ে শুয়ে একটা রিমোট চেপে ঘরের সব আলো নিভিয়ে দেয়। পুরো ঘরটা এখন ফায়ারপ্লেসের সেই শেষ হয়ে আসা লালচে আলোয় ডুবে যায়। কিন্তু বাতি নিভতেই কেবিনের ভেতরের অন্ধকার যেন এক ভিন্ন রূপ নেয়। জ্যাক বিছানায় শুয়েও শান্ত হতে পারছে না। তার পিঠের দিকে মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে শুয়ে থাকা ক্লারার শরীরের ওম আর তার নিঃশ্বাসের শব্দ জ্যাকের ভেতরের জেদকে জাগিয়ে তোলে। কতক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পরও কোনো লাভ হয় না।
জ্যাক অন্ধকারের মধ্যেই নিঃশব্দে ঘুরে যায়। সে এক ঝটকায় মাঝখানের বালিশগুলো সরিয়ে দিয়ে ক্লারার ওপর ঝুঁকে আসে। ক্লারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্যাকের চওড়া, শক্ত দুই বাহু তাকে বিছানার সাথে চেপে ধরে। জ্যাকের গায়ের তীব্র সুবাস ক্লারার পুরো চেতনাকে গ্রাস করে নেয়। তার গরম হাতটা ক্লারার হুডির নিচ দিয়ে তার কোমরে স্পর্শ করে। সেই আচমকা ছোঁয়ায় ক্লারার পুরো শরীরে তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে যায়। সে হাত দিয়ে জ্যাকের বুকটা ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু জ্যাকের শক্ত শরীরটা এক ইঞ্চিও নড়ে না। জ্যাকের মুখটা ক্লারার মুখের এত কাছে চলে আসে যে দুজনের ঠোঁটের উষ্ণতা একে অপরকে স্পর্শ করতে চায়। জ্যাকের চোখের সেই মরিয়া চাহনি দেখে ক্লারার নিজের ভেতরের নিয়ন্ত্রণও এক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে যায়। তার নিজের হাত দুটো অজান্তেই জ্যাকের কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। ঠিক তখনই, তাদের ঠোঁট দুটো মিলিত হওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে, জানালার কাচের বাইরে একটা তীব্র সাইরেনের শব্দে ক্লারার হুঁশ ফিরে আসে! এক ঝটকায় তার মনের ভেতরের সব মোহ কেটে যায়। সে নিজেকে আবিষ্কার করে এই অহংকারী লোকটার নিচে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায়। নিজের এই দুর্বলতার কথা ভেবে নিজের প্রতিই তার তীব্র ঘৃণা আর রাগ দলা পাকিয়ে ওঠে। সে সমস্ত শক্তি দিয়ে জ্যাকের বুকে এক মারাত্মক ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দেয় এবং বিছানা থেকে ছিটকে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ দিয়ে তখন রাগের পানি পড়ছে। সে চশমাটা চোখে পরে নিজের ব্যাগটা তুলে নিয়ে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণায় কাঁপানো গলায় বলে, “আপনি একটা জানোয়ার, জ্যাক্সন মিলার! আর আমি তার চেয়েও বড় বোকা যে এক মুহূর্তের জন্য আপনার এই সস্তা ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছিলাম। আপনি ভেবেছেন আপনার টাকা আর ক্ষমতা দিয়ে আমার শরীর আর মন দুটোই কিনে নেবেন? অনাথ আশ্রমের ভয় দেখিয়ে আমাকে আপনার পায়ের দাসী বানাবেন? মনে রাখবেন, ক্লারা বেনেট মরে যাবে, তাও আপনার মতো একটা সাইকোপ্যাথের কাছে নিজের আত্মসম্মান বিক্রি করবে না!”

জ্যাক বিছানায় উঠে বসে অন্ধকারেই তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু ক্লারার এই রুদ্র রূপ দেখে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। ক্লারা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। সে নিজের ল্যাপটপ ব্যাগ আর ডায়েরিটা শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে সোজা প্রধান দরজার দিকে দৌড়ে যায়। লিফটের পাসওয়ার্ডের তোয়াক্কা না করে সে ইমার্জেন্সি এক্সিটের ফায়ার ডোরটা এক ধাক্কায় খুলে ফেলে। মাইনাস চার ডিগ্রি তাপমাত্রার সেই ভয়ংকর ঠান্ডা আর তুষারঝড়ের মধ্যেই সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকে। বোস্টনের অন্ধকার রাতের বুকে সে একাই হেঁটে চলে যায়, পেছনে কেবল পাথর হয়ে পড়ে থাকে জ্যাক্সন মিলার।

চলবে?..