#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_8
বোস্টনের সকালগুলো কখনো ঝকঝকে রোদে শুরু হয় না। বিশেষ করে তুষারঝড়ের পরের সকালটা ভিজে থাকা বিষণ্ণতা নিয়ে আসে। প্রকৃতি যেন নিজেই একটা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। জানালার কাঁচের ওপাশে কুয়াশাগুলো জমে বরফ হয়ে আছে। ঘরের ফায়ারপ্লেসের কাঠ পুড়তে পুড়তে শেষ ছাই টুকুতে এসে ঠেকেছে। বেডের সিল্কের চাদরের ওপর যখন ক্লারা চোখ খুলল, প্রথম কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতেই পারল না সে কোথায় আছে। মানুষের মস্তিষ্কের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, বিপদের সময় সে পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ক্লারার মাথার ভেতরটা তখনো কেমন জট পাকিয়ে ছিল জ্বরের ঘোরে। শরীরটা বড্ড ভারী। চামড়ার ওপর চাদরের মসৃণ ছোঁয়াটা লাগতেই তার পুরো চেতনা এক ঝটকায় ফিরে এল। সে ধড়মড় করে উঠে বসতে গেল, আর তখনই টের পেল তার কোমরের ওপর একটা ভারী, শক্ত বাঁধন। জ্যাক্সন মিলার তার উপুড় হয়ে শোয়া শরীরের পুরো ভরটা ক্লারার দিকে দিয়ে, এক চওড়া বাহু দিয়ে ক্লারাকে নিজের বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। জ্যাকের শার্টের ওপরের বোতামগুলো খোলা, সেখান থেকে আসা শরীরের তীব্র উষ্ণতা ক্লারার পিঠে এসে লাগছে। চশমা ছাড়া ক্লারার ঝাপসা চোখেও স্পষ্ট ধরা পড়ল। সে কাল রাতে এই শহরের সবচেয়ে বিগড়ে যাওয়া, গোল্ডেন বয়ের বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়েছে! ক্লারার বুকের ভেতরটা তীব্র অনুতাপে মোচড় দিয়ে উঠল। মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সে তার মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না। সে নিজেকে নিজে মনে মনে চাবুক মারতে লাগল, ‘ক্লারা, তুমি এত দুর্বল কী করে হলে? যে ছেলেটা তোমাকে অপমান করেছে, যে তোমাকে একটা খেলনা ভাবে, তার বুকের ওম পেয়ে তুমি নিজের সব প্রতিরোধ ভুলে গেলে?’ সে খুব সাবধানে, নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ করে জ্যাকের হাতটা নিজের কোমর থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু আঙুল ছোঁয়া মাত্রই জ্যাক ঘুমের ঘোরেই হাতটা আরও বেশি শক্ত করে নিজের দিকে টেনে নিল। তার মুখটা এখন ক্লারার ঘাড়ের এত কাছে যে জ্যাকের তপ্ত নিঃশ্বাস ক্লারার চামড়ায় কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিল।
ক্লারা দাঁতে দাঁত চেপে খুব নিচু কিন্তু শক্ত গলায় বলল, “ছাড়ুন আমাকে, মিস্টার মিলার। সকাল হয়ে গেছে।” জ্যাক তার ধূসর চোখ দুটো পুরোপুরি খুলল না। স্রেফ এক চিলতে চোখের আলো দিয়ে ক্লারার ফ্যাকাশে, রাগী মুখটা দেখে নিল। তার ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠল। সে তার ঘুমজড়ানো গলায় ফিসফিস করে বলল, “বোস্টন শহরে সকাল কখন হবে, সেটা ঠিক করে এই জ্যাক্সন মিলার। মিস ক্যালকুলেটর, আমার পারমিশন ছাড়া এই বিছানা থেকে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। চুপচাপ শুয়ে থাকো, তোমার শরীর এখনো কাঁপছে।”
“আমার শরীর আপনার জন্য কাঁপছে না, ঘৃণায় কাঁপছে,” ক্লারা সমস্ত শক্তি দিয়ে জ্যাকের বুকটা ঠেলে দিয়ে এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল।
তার পা দুটো দুর্বলতায় একটু মচকে গেল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। খাটের পাশে রাখা নিজের চশমাটা তুলে চোখে পরতেই চারপাশের পৃথিবীটা আবার স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে নিজের জ্যাকেট আর ব্যাগটা তুলে নিল। জ্যাক বিছানায় অলস ভঙ্গিতে কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে বসল। তার এলোমেলো চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে।
জ্যাক খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি এই পেন্টহাউস থেকে বের হতে পারো ক্লারা। কিন্তু একটা চিরন্তন সত্য কথা মনে রেখো বাইরের দুনিয়াটা তোমার জন্য এই ঘরের চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুর।”
ক্লারা দরজার হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরল। সে পেছনে তাকাল না। পেছনের দিকে তাকালে মানুষের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়ে যায়। সে শান্ত গলায় বলল, ” কিছু জিনিস আছে যা কোনোদিন কেনা যায় না। ক্লারা বেনেট তাদের মধ্যে একজন।”
সে দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে কিচেনের করিডোরের দিকে চলে গেল। বাইরে ঠান্ডা বাতাস, কিন্তু তার ভেতরের হৃৎপিণ্ডের ধকধকানি তখনো থামছে না।
–
পেন্টহাউসের বিশাল ডাইনিং টেবিলটায় যখন ক্লারা এসে বসল, তখন তার যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। পেন্টহাউসের প্রাইভেট লিফটের কোড আজকেও চেঞ্জ করা হয়েছে, আর নিচে নামার ফায়ার এক্সিটের দরজায় দুজন বিশাল দেহের বডিগার্ড দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক্সন মিলার কাউকে বন্দি করতে চাইলে যে কোনো আইনি কাগজের তোয়াক্কা করে না, তা এই পেন্টহাউসের দেয়ালগুলোই বলে দিচ্ছে। শেফ সকালের ব্রেকফাস্ট টেবিলে কিছু টোস্ট, মাশরুম ওমলেট আর ফ্রেশ কমলার জুস সাজিয়ে রেখে গেছে। জ্যাক ইতিমধ্যে নিজের ডার্ক চারকোল কালারের হুডিটা বদলে একটা ক্যাজুয়াল গ্রে টি-শার্ট পরে এসে টেবিলের প্রধান চেয়ারটায় বসেছে। সে খুব মন দিয়ে তার প্যাডে বাস্কেটবল লীগের স্ট্যাটিস্টিকস দেখছে। ক্লারা জুসের গ্লাসে হাত না দিয়ে স্রেফ টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল। জ্যাক আইপ্যাড থেকে চোখ না তুলেই কফির কাপে চুমুক দিল। তারপর খুব শান্ত, প্রায় স্বাভাবিক গলায় বলল, “মাশরুম ওমলেটটা খাও। কাল রাতে তোমার পেটের যে অর্কেস্ট্রা আমি শুনেছি, তারপর আজ না খেয়ে থাকলে তুমি এই টেবিল থেকে ওঠার আগেই অজ্ঞান হয়ে যাবে।”
ক্লারা চোখ তুলে জ্যাকের দিকে তাকাল। তার নীল চোখ দুটোতে এখন আর কান্নার জল নেই, আছে এক ধরনের জমাট বাঁধা পাথর। সে বলল, “আপনি কি ভাবেন মিস্টার মিলার? মানুষকে আটকে রেখে, ভয় দেখিয়ে খুব আনন্দ পাওয়া যায়? এই যে এত বড় বাড়ি, এত টাকা এর ভেতরে কোনো মানুষ থাকে না, একটা পিশাচ থাকে।”
জ্যাক কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। সে খুব অলস ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিয়ে ক্লারার দিকে তার তীক্ষ্ণ ধূসর চোখ দুটো স্থির করল। তার চাউনিতে এক চরম পজিসিভনেসের আলো। সে বলল, “পিশাচ? চমৎকার শব্দ। কিন্তু এই পিশাচের বুকেই কাল রাতে তুমি খুব শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলে, মিস ক্যালকুলেটর। তোমার ওই ঠাণ্ডা শরীরটা যখন আমার উষ্ণতা খুঁজছিল, তখন তো তোমার এই তীব্র নীতিবাক্যগুলো মুখ দিয়ে বের হয়নি?”
ক্লারা লজ্জায় আর অপমানে লাল হয়ে গেল। সে বলল, “সেটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। আমি জ্বরের ঘোরে ছিলাম।”
“ভুল মানুষের জীবনে একবারই হয়, ক্লারা। আর আমার সাথে যা ঘটে, তা ভুল নয়, ওটা একটা অলিখিত নিয়ম।” জ্যাক টেবিলের ওপর ঝুঁকে এল, তার গলার স্বর এখন বড্ড বেশি অ্যাডাল্ট আর বোল্ড। “তুমি কাল রাতে আমার শার্টের কলার যেভাবে খামচে ধরেছিলে, আমার এই বুকের চামড়ায় এখনো তোমার নখের দাগ লেগে আছে। তুমি মুখে যতই ঘৃণা দেখাও, তোমার এই শরীরটা কিন্তু খুব ভালো করেই চেনে জ্যাক্সন মিলার কে।”
ক্লারা টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু জ্যাকের এক ইশারায় ডাইনিং হলের দরজাটা বডিগার্ডরা বাইরে থেকে লক করে দিল। জ্যাক খুব শান্ত গলায় বলল, “বসো, ক্লারা। আমাদের কিছু জরুরি হিসেব-নিকেশ বাকি আছে। আজ আমরা কোনো লুকোচুরি খেলব না।”
–
ক্লারা যখন শেষমেষ ডর্ম রুমে ফিরে আসার অনুমতি পেল, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। জ্যাক তাকে নিজের রোলস রয়েসে করে ডর্মের সামনে ড্রপ করে দিয়ে গেছে, আর যাওয়ার আগে বলে গেছে, “বিকেলের মধ্যে তোমার ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকবে, মিস ক্যালকুলেটর।”
নিজের ছোট ডর্ম রুমে ঢুকে ক্লারা খাটের ওপর বসে পড়ল। এই রুমটা কত ছোট, দেয়ালের প্লাস্টারগুলো খসে পড়ছে, কিন্তু এখানে একটা শান্তি আছে। এখানে কোনো জ্যাক্সন মিলারের বিষাক্ত পারফিউমের গন্ধ নেই, কোনো ওয়ান-ওয়ে কাঁচের দেয়াল নেই। সে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই তার রুমমেট আর ইউনিভার্সিটির একমাত্র বান্ধবী লিলি রুমে ঢুকল। লিলির হাতে কিছু নোটস। সে ক্লারার এই ফ্যাকাশে দশা দেখে কপালে হাত দিল, “ক্লারা! তোর শরীর তো এখনো বেশ গরম! কাল রাতে তুই কোথায় ছিলি? ক্লাবের ম্যানেজার বলছিল তুই নাকি মাঝপথে কার সাথে যেন চলে গেছিস?”
ক্লারা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “কিছু না লিলি। শরীরটা বড্ড খারাপ ছিল, তাই একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে এসেছিলাম। ফোনে চার্জ ছিল না।”
লিলি তার দিকে একটু সন্দেহী চোখে তাকাল। সে বলল, “ট্যাক্সি নিয়েছিলে নাকি অন্য কিছু? আজ সকালে ইউনিভার্সিটির করিডোরে বাস্কেটবল টিমের প্লেয়াররা ফিসফিস করছিল। জ্যাক মিলার নাকি কাল রাতে ইনফর্নো ক্লাবে কার ওপর খুব চটেছিল। ক্লারা, তুই ওই গোল্ডেন বয়ের থেকে দূরে থাক। ওরা বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া সন্তান, ওদের ছোঁয়াও বিপজ্জনক।”
ক্লারা জানালার বাইরে বোস্টনের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সে মনে মনে বলল, ‘লিলি, তুমি বড্ড দেরিতে বললে। সেই বিষাক্ত ছোঁয়া তো অলরেডি আমার চামড়া পার করে মনের ভেতর অব্দি পৌঁছে গেছে।’
সে লিলিকে বলল, “আমি জানি লিলি। কিছু পাখি থাকে যাদের ডানা কাটার জন্য শিকারী ওৎ পেতে থাকে। কিন্তু ডানা কাটলেই কি পাখির ওড়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়?”
লিলি অবাক হয়ে বলল, “কী সব রূপক দিয়ে কথা বলছিস! ধুর, তোর জেনেশুনে মাথাটা গেছে। চুপচাপ এই গরম স্যুপটা খা, আমি লাইব্রেরিতে যাচ্ছি।”
লিলি চলে যাওয়ার পর রুমটা আবার নীরব হয়ে গেল। ক্লারা তার টেবিলের ডায়েরিটা খুলল। মিউনিখের সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের একটা ছবি সেখানে রাখা। ছবিটার দিকে তাকিয়ে ক্লারার চোখের কোণটা ভিজে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, “আমি হার মানব না। ওর ওই সোনার খাঁচাটা আমি নিজের পায়ে মাড়িয়ে চলে যাব।”
–
বিকেল চারটে। বোস্টনের কুয়াশাটা এখন আরও ঘন হয়ে নেমেছে। ক্লারার ফোনের স্ক্রিনটা আচমকা জ্বলে উঠল। কোনো নম্বর নেই, স্রেফ একটা প্রাইভেট আইডি থেকে একটা ফাইল পাঠানো হয়েছে। ক্লারা ফাইলটা ওপেন করতেই তার হাতের আঙুলগুলো বরফের মতো জমে গেল। ওটা মিউনিখের সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমের অফিশিয়াল ল্যান্ড লিজের ফাইল। ফাইলের নিচে একটা আইনি রেড নোটিশ যুক্ত করা আছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে যদি বকেয়া তিন লাখ ডলার শোধ করা না হয়, তবে জার্মান সরকারের ডেভলপমেন্ট অথরিটি পুরো আশ্রমটা বাজেয়াপ্ত করে সেখানে একটা নতুন কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স তৈরি করবে। আর সেই নোটিশের একদম নিচে থার্ড-পার্টি ইনভেস্টর হিসেবে যার সই করার জন্য জায়গা রাখা আছে, সেই নামটি হলো, মিলার কর্পোরেশন’। ঠিক পরের মূহুর্তেই ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল জ্যাকের নাম। ক্লারা ফোনটা রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে জ্যাকের সেই চেনা, ভারী আর অলস কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ফাইলটা পেয়েছ, মিস ক্যালকুলেটর? তোমার ওই ম্যাথমেটিক্যাল মগজ কি লিজের হিসেবটা মেলাতে পারছে?”
ক্লারা রাগে আর কান্নায় কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল, “আপনি জঘন্য, জ্যাক্সন মিলার! আপনি বাচ্চাদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু নিয়ে খেলা করছেন? আপনার এত টাকা, তাও আপনার লোভ কমে না?”
জ্যাক ওপাশ থেকে একটু নিচু স্বরে হাসল। সে বলল, “লোভ আমার টাকার ওপর নেই ক্লারা, লোভ আমার ওই নীল চোখ দুটোর ওপর আছে। আমি তোমাকে আগেই বলেছি জ্যাক্সন মিলার যা চায়, তা সে কেড়ে নেয়। আমি চাইলে এক সেকেন্ডে ওই আশ্রমের পুরো লিজের টাকা শোধ করে দিতে পারি, আবার এক সেকেন্ডে ওই বাচ্চাদের রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারি। পুরো ব্যাপারটা এখন নির্ভর করছে তোমার ওপর।”
“আপনি কী চান আমার কাছে?” ক্লারা চোখ বন্ধ করে বলল, তার গলা দিয়ে তখন একটা অসহায় আর্জি বের হচ্ছিল।
“খুব বেশি কিছু না।” জ্যাকের গলার স্বর এবার বড্ড বেশি নিচু আর পজিসিভ শোনাল, “আজ রাত আটটায় আমি আমার গাড়ি পাঠাচ্ছি। পেন্টহাউসে এসে আমার তৈরি একটা নতুন চুক্তিতে সই করবে। মনে রেখো ক্লারা, ঘড়ির কাঁটা কিন্তু টিকটিক করে চলছে। তোমার ওই অনাথ বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ এখন তোমার এই জেদের চেয়ে বড় কি না, তা আজ রাতেই প্রমাণ হয়ে যাবে।” ফোনটা কেটে গেল। ক্লারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ছেলেকে সে বুঝে না। দুনিয়ায় এত মেয়ে থাকতে তার পিছনে কেন পড়েছে? তবে এসব ছেলেকে ভালো করেই চেনে সে। প্রথমে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নোংরা নোংরা কাজকর্ম করবে, তারপর কাজ শেষ হয়ে গেলে রাস্তা বদলে ফেলবে। আর জ্যাক তো তাদের উর্ধ্বে। যে আজ পর্যন্ত কত মেয়ের সাথে হুকআপ করেছে তার কোনো খবর নেই, সে আবার কত বড় কথা বলে? এসব মানুষ আসলেই বিপদজনক। নিজের প্রয়োজন মিটলে সবাইরে ছুড়ে ফেলতে পারে। তাই যতটা সম্ভব এর থেকে দূরে থাকাই ভালো। বলা তো যায় না, মন বলে কথা, এই অবাধ্য মন যদি মায়ার ফাঁদে আঁটকে পড়ে?
–
রাত ঠিক আটটা। ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েস গাড়িটা যখন ডর্মের নিচে এসে দাঁড়াল, ক্লারা তখন নিজের চোখের জল মুছে একদম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে একটা সাধারণ ব্ল্যাক ওল্ড কোট পরে গাড়ির পেছনের সিটে বসল। সে খুব ভালো করেই জানে, সে আজ নিজের স্বাধীনতাহীনতার এক নতুন নরকে পা দিতে যাচ্ছে, কিন্তু মিউনিখের ওই নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোর মুখের চেয়ে তার নিজের আত্মসম্মান বড় হতে পারে না। পেন্টহাউসের লাইব্রেরি রুমটা আজ অদ্ভুত সুন্দর করে সাজানো। চারদিকে মেহগনি কাঠের সেলফে হাজারটা বই, আর ঘরের মাঝখানের টেবিলের ওপর একটা সিঙ্গেল পেজের আইনি কাগজ রাখা। জ্যাক সোফায় এক পা তুলে বসে ছিল। তার হাতে একটা দামি কলম। সে ক্লারাকে ভেতরেু ঢুকতে দেখে টেবিলের দিকে ইশারা করল, “এসো, মিস ক্যালকুলেটর। তোমার জন্য স্পেশাল চুক্তির খসড়া তৈরি।”
ক্লারা টেবিলের সামনে এসে কাগজটা হাতে নিল। কাগজের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘অফিশিয়াল ফিনান্সিয়াল অ্যান্ড পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ ডিল’। কিন্তু তার ভেতরে যে শর্তগুলো লেখা আছে, তা কোনো চাকরির শর্ত নয়, ওটা একটা বন্দিত্বের পরোয়ানা।
১. ক্লারা বেনেট আগামী এক বছর জ্যাক্সন মিলারের ব্যক্তিগত অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করবে।
২. সে জ্যাকের অনুমতি ছাড়া বোস্টন শহরের বাইরে যেতে পারবে না, কোনো পার্ট-টাইম জব করতে পারবে না।
৩. জ্যাকের পেন্টহাউসের কাজের সময় বা ব্যক্তিগত হুকুমের ক্ষেত্রে সে কোনো ‘না’ বলতে পারবে না।
৪. বিনিময়ে, মিলার কর্পোরেশন মিউনিখের অনাথ আশ্রমের লিজের পুরো টাকা আজ রাতেই ক্লিয়ার করে দেবে।
ক্লারা কাগজটা পড়ে জ্যাকের দিকে তাকাল। তার চোখে চরম ঘৃণা। সে বলল, “এটা কোনো চুক্তি নয়। এটা একটা খাঁচা। আপনি আমাকে আপনার কেনা দাসী বানাতে চান?”
জ্যাক উঠে দাঁড়াল। সে খুব ধীর পায়ে ক্লারার সামনে এসে দাঁড়াল এবং তার হাতের কলমটা ক্লারার আঙুলের ফাঁকে গুঁজে দিল। সে ক্লারার কানের কাছে মুখ এনে খুব নিচু গলায় বলল, “দাসী বড্ড সস্তা শব্দ, ক্লারা। আমি তোমাকে আমার ‘একমাত্র অধিকার’ বানাতে চাই। এই কাগজে সই করার পর থেকে তোমার এই শরীর, তোমার এই নীল চোখ, তোমার এই রাগ, তোমার মন সবকিছুর ওপর শুধু জ্যাক্সন মিলারের সিলমোহর থাকবে। সই করো।”
“ আপনি কি আমাকে পছন্দ করেন?” এহেন প্রশ্ন জ্যাক কিছুটা স্তব্ধ হয়ে রইল। পরক্ষণেই বলল, “আমার রুচি এতটাও খারাপ নয়। আমি আসলে..আসলে রিভেঞ্জ বুঝো? আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কারো কথা বলার কোনোদিন সাহস হয়নি। তুমি সাহস দেখিয়েছো…বদলে তোমাকে পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। আমি তোমাকে বন্দি করতে চাইনি, তুমি নিজেই নিজের জালে জড়িয়েছো। গড প্রমিস, প্রতিটা কথার জবাব সুদেআসলে নিব .. আর আমার তরিকায় নিব। তুমি কেবল দেখতে থাকো।”
ক্লারা এক মূহুর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল। মিউনিখের বাচ্চাদের হাসিমুখগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে কাঁপতে থাকা হাতে কাগজের নিচে নিজের সইটা করে দিল। জ্যাক কাগজটা এক ঝটকায় নিজের হাতে নিয়ে নিল এবং ক্লারার হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। সে ফিসফিস করে বলল, “খেলাটা মাত্র শুরু হলো, মিস ক্যালকুলেটর। আজ থেকে তুমি এই খাঁচার ভেতরেই থাকবে, আর এই খাঁচার দেয়ালগুলো কত শক্ত, তা তুমি খুব শীঘ্রই টের পাবে।” লাইব্রেরি রুমের ভারী দরজাটা বডিগার্ডরা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। বোস্টনের এই কনকনে অন্ধকার রাতের বুকে ক্লারা বেনেটের স্বাধীন আকাশের ডানা দুটো চিরতরে কাটা পড়ে গেল।
চলবে?

