Out Of Bounds পর্ব-০৯

0
4

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_9

ক্যাম্পাসটা সকালের হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। ওল্ড ক্লক টাওয়ারের লাল ইটগুলো শীতে কেমন যেন ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। ক্লারা বেনেট যখন টাওয়ারের নিচ দিয়ে হাঁটছে। তার কাছে আজকে নিজের ব্যাগটা কেমন যেন ভারী মনে হচ্ছে। আসলে ব্যাগ ভারী নয় হয়তো তার মন ভারী। কাল রাতের সেই চুক্তির কাগজটার কথা মনে পড়লেই তার ফর্সা গাল দুটো অপমানে লাল হয়ে উঠছে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সে মাঝেমধ্যে নিজের অজান্তেই অন্যের সম্পত্তি হয়ে যায়। ক্লারার এখন সেই অবস্থা। চোখের নিচের কালচে ছায়াটা রাতের অনিদ্রার কথা জানান দিচ্ছিল। সে করিডোরে প্রবেশ করল।

“ক্লারা! এই যে ক্লারা, শোনো।” পেছন থেকে চেনা কণ্ঠস্বর শুনে ক্লারা থমকে দাঁড়াল। সে ঘুরে তাকাতেই দেখল মার্কাস দৌড়ে আসছে। বাস্কেটবল টিমের জার্সি পরা, কপালে হালকা ঘাম। তার হাতে দুটো কাগজের কাপ। কফির চমৎকার সুবাস চারপাশের ঠান্ডা বাতাসটাকে একটু ওম দিল। মার্কাস সামনে এসে একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “সকাল থেকে তোমাকে খুঁজছি, জানো? ডর্মে গেলাম, লিলি বলল তুমি নাকি ভোরেই লাইব্রেরির দিকে এসেছ। শরীর কেমন এখন? জ্বরটা কমেছে?”

ক্লারা কফির কাপটা হাতে নিয়ে একটু হাসল। বলল, “জ্বরটা নেই মার্কাস। শুধু মাথাটা একটু জট পাকিয়ে আছে।”

“মাথার জট ছাড়ানোর জন্যই তো এই ব্ল্যাক কফি। উইদাউট সুগার। ঠিক যেমনটা তুমি ভালোবাসো।”

“ধন্যবাদ মার্কাস। তুমি ছাড়া এই বোস্টন শহরে আমার কফির খবর কেউ রাখে না।”

মার্কাস করিডোরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কফিতে চুমুক দিল। তার মুখটা একটু গম্ভীর দেখাল। সে বলল, “ক্লারা, একটা কথা বলব? কিছু মনে করবে না তো?”

“তুমি আবার কবে থেকে কথা বলার আগে অনুমতি নেওয়া শুরু করলে? বলো।”

“বলছিলাম, ওই ইনফার্নো ক্লাবের চাকরিটা তুমি ছেড়ে দাও। ওখানকার পরিবেশ ভালো না। আর ওই ক্লাবে জ্যাকের বাবার পার্টনারশিপ আছে। ওর সবসময় আড্ডাবাজি চলে সেখানে। ওই ছেলেটা বড্ড বিপজ্জনক, ক্লারা। ও যা চায়, তা ধ্বংস করে হলেও হাসিল করে।” ক্লারা কফির কাপটা দুই হাতের তালু দিয়ে চেপে ধরে রইল। তার মনে হলো, সে তো অলরেডি সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। তবে সেই গোপন কথা মার্কাসকে বলার কোনো মানে হয় না। সে একটু মলিন হেসে বলল, “চাকরিটা আমি আর করছি না মার্কাস। কাল রাতেই ওখান থেকে চলে এসেছি।”

“সত্যি বলছ?” মার্কাসের চোখ দুটো এক মুহূর্তে আনন্দে চকচক করে উঠল।

“হ্যাঁ, সত্যি।” মার্কাস খুশিতে এত জোরে হেসে উঠল যে করিডোরের দু চারজন স্টুডেন্ট ফিরে তাকাল। সে ক্লারার খুব কাছাকাছি এসে তার কাঁধের ওপর একটা হাত রাখল। বেশ ভরসা দেওয়ার মতো হাত। সে বলল, “উফ! বাঁচালে! এটা আমার জীবনের সেরা নিউজ। চলো, এই খুশিতে আজ দুপুরে ডর্মের পেছনের ওই সস্তা আইরিশ ক্যাফেতে তোমাকে আমি লাঞ্চ করাব। কোনো ‘না’ শুনছি না!”

ক্লারা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে যাবে, ঠিক তখনই চারপাশের পরিবেশটা কেমন যেন বদলে গেল। চারপাশের স্টুডেন্টদের ফিসফিসানি আর হাসির শব্দগুলো এক সেকেন্ডে থমকে গেল। পুরো করিডোরে নীরবতা নেমে এল। লকার রুমের চওড়া দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। আর সেখান থেকে বের হয়ে এল জ্যাক্সন মিলার। তার পরনে আজ অফিশিয়াল জার্সি। হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো। ডান হাতে একটা বাস্কেটবল, যা সে অলস ভঙ্গিতে আঙুলের ডগায় ঘোরাচ্ছে। তার চুলগুলো ভেজা, কপাল বেয়ে দু এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু তার সেই ধূসর চোখ দুটো এখন আর অলস নেই। সে দুটো যেন দুটো জীবন্ত জ্বলন্ত কয়লা। জ্যাকের দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে স্থির হলো মার্কাসের সেই হাতের ওপর, যা এখনো ক্লারার কাঁধের ওপর রাখা আছে। জ্যাকের হাঁটার গতিটা ধীর হয়ে এল। করিডোরের অন্য প্লেয়াররা তার এই চাউনি দেখে এক পাশে সরে দাঁড়াল। সে বাস্কেটবলটা এক হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে সরাসরি ক্লারা আর মার্কাসের সামনে এসে দাঁড়াল। তার বিশাল শরীরের ছায়া এক সেকেন্ডে ক্লারা আর মার্কাস দুজনকেই গ্রাস করে নিল। জ্যাক এক মুহূর্ত দুজনের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই তীব্র শীতলতা দেখে মার্কাসের হাতটা ক্লারার কাঁধ থেকে আপনাআপনি নেমে গেল। জ্যাক মার্কাসের দিকে তাকাল না। তার চোখ স্থির রইল ক্লারার ফ্যাকাশে মুখের ওপর। সে খুব নিচু ধারালো গলায় বলল, “লাঞ্চের খুব শখ হয়েছে, মিস ক্যালকুলেটর? কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আজকের দুপুরের মেন্যুটা আমি আগেই ঠিক করে রেখেছি।”

ক্লারা চোখ সোজা রেখে বলল, “আপনার মেন্যু দিয়ে আমার কোনো কাজ নেই, মিস্টার মিলার। আমি মার্কাসের সাথে যাচ্ছি।”

জ্যাক এবার মার্কাসের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে একটা কুৎসিত হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “তুমি কি বাস্কেটবল টিমের সেকেন্ড লাইনে খেলো, তাই না মার্কাস? টিমে টিকে থাকার খুব ইচ্ছা তোমার?”

মার্কাস একটু ঘাবড়ে গেলেও গলা শক্ত করে বলল, “তার সাথে ক্লারার লাঞ্চের কী সম্পর্ক, জ্যাক?”

“সম্পর্ক আছে।” জ্যাক বাস্কেটবলটা মার্কাসের বুকের ওপর আলতো করে ঠেসে ধরল। “সম্পর্কটা হলো, আমি যা পছন্দ করি, সেটার দিকে অন্য কেউ হাত বাড়ালে আমার বড্ড রাগ হয়। আর আমার রাগ ভালো জিনিস না। তুমি এখন আসতে পারো।”

ক্লারা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “মার্কাস, তুমি কোথাও যাবে না। চলো আমরা যাই।”

জ্যাক ক্লারার দিকে ঝুঁকে এল। তার গলার স্বর আরও নিচে নেমে গেল, “ক্লারা, কাল রাতের চুক্তির তিন নম্বর ধারাটা কি তোমার মনে আছে? আমি কিন্তু চাইলে আজ বিকেলেই মিউনিখে একটা ফোন করতে পারি। তোমার সেই অনাথ আশ্রমের বাচ্চারা তখন দুপুরের খাবারটা কোথায় খাবে, আমি জানি না।”

ক্লারা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে কফির কাপটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। মার্কাস কিছু একটা আঁচ করতে পেরে বলল, “ক্লারা, কীসের চুক্তি? ও কীসের কথা বলছে?”

ক্লারা মার্কাসের দিকে তাকাতে পারল না। সে মাটির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু গলায় বলল, “মার্কাস, তুমি আজ যাও। লাঞ্চটা আমরা অন্য কোনোদিন করব।”

“কিন্তু ক্লারা…”

“দয়া করে যাও, মার্কাস।”

মার্কাস জ্যাকের দিকে একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হেনে ল্যাপটপ ব্যাগটা টেনে নিয়ে করিডোর দিয়ে চলে গেল। করিডোরে এখন শুধু ক্লারা আর জ্যাক। জ্যাক বলটা আবার আঙুলের ডগায় ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “গুড গার্ল। খাঁচার পাখি যখন কথা শোনে, তখন দেখতে বেশ লাগে। চলো, আমার গাড়ি বাইরে অপেক্ষা করছে।”

ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে জ্যাকের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আগুন। সে বলল, “আপনি একটা জঘন্য মানুষ, জ্যাক্সন মিলার।”

জ্যাক হাসল। সে বলল, “তুমি চাইলে আমি আরও জঘন্য হতে পারব। এবার হাঁটো।”


বোস্টন শহরের ভেতরের এটি একটি ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ। বাইরে কুয়াশা ভেঙে এখন হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জ্যাক পুরো রেস্তোরাঁটা আজকের দুপুরের জন্য বুক করে নিয়েছে। বিশাল হলরুমে আর কোনো কাস্টমার নেই, শুধু এক কোণার টেবিলটায় তারা দুজন বসে আছে। ক্লারা জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের সামনে মার্কাসের সেই অপমানিত মুখটা বারবার ভেসে উঠছে। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর একটা মৃদু শব্দ হলো। ওয়েটার এসে ধোঁয়া ওঠা টুস্কান চিকেন আর পাস্তার প্লেট সাজিয়ে দিয়ে গেল। খাবারের চমৎকার সুবাস পুরো টেবিলে ছড়িয়ে পড়ল, কিন্তু ক্লারার ক্ষুধার চেয়েও বেশি ঘেন্না লাগছে। জ্যাক তার কোটের হাতাটা সামান্য গুটিয়ে চামচটা হাতে নিল। সে ক্লারার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “খাও। তোমার শরীর কাল রাত থেকে দুর্বল। পুষ্টির প্রয়োজন।”

ক্লারা নড়ল না। সে শক্ত গলায় বলল, “আমি আপনার সাথে বসে খেতে আসিনি, মিস্টার মিলার। আপনার হুমকি আমাকে এখানে আসতে বাধ্য করেছে, কিন্তু খেতে বাধ্য করতে পারবে না।”

জ্যাকের ধূসর চোখ দুটো সামান্য সরু হলো। সে একটু হাসল। সে নিজের হাত বাড়িয়ে ক্লারার প্লেট থেকে এক টুকরো চিকেন চামচে তুলে নিল। তারপর টেবিলের ওপর সামান্য ঝুঁকে এসে চামচটা ক্লারার ঠোঁটের সামনে ধরল।

“হা করো, ক্লারা।”

ক্লারা মুখটা সরিয়ে নিল। তার চোখ দুটো রাগে জ্বলতে লাগল। সে বলল, “তামাশা বন্ধ করুন। আমি আপনার কোনো পোষা প্রাণী নই যে আপনার হাত থেকে দানা খাব।”

জ্যাকের মুখের সেই মৃদু হাসিটা এক সেকেন্ডে মিলিয়ে গেল। সে চামচটা প্লেটে নামিয়ে রাখল না, বরং তার বাম হাতটা বাড়িয়ে ক্লারার থুতনিটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার আঙুলের চাপ এতটাই তীব্র যে ক্লারার ফর্সা চামড়ায় লাল দাগ বসে যাওয়ার উপক্রম হলো। জ্যাকের চাউনিতে অন্ধকার নেমে এল। সে ফিসফিসানি গলায় বলল, “আমি কোনো কথা দ্বিতীয়বার বলি না, ক্লারা বেনেট। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। তুমি যদি এই খাবারটা ভালোয় ভালোয় না খাও, তবে আজ বিকেলের মধ্যেই মিউনিখের সেই অনাথ আশ্রমের লিজ বাতিল করার আইনি নোটিশ জারি হবে। তোমার ওই বাচ্চাদের তখন এই বোস্টনের কুয়াশায় এসে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। এবার বলো, হা করবে, নাকি আমি ফোনটা করব?”

ক্লারা জ্যাকের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো দয়া নেই, কোনো অনুশোচনা নেই। এ কেমন মানুষ? উঠতে বসতে ভয় দেখায় খালি। ক্লারার চোখ ফেটে জল আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। এই লোকের সামনে সে কাঁদবে না। সে বাধ্য হয়ে, প্রচণ্ড অপমানে চোখ বন্ধ করে আলতো করে হা করল। জ্যাকের আঙুলের চাপটা একটু শিথিল হলো, তবে সে থুতনিটা ছাড়ল না। সে খুব ধীরলয়ে চামচটা ক্লারার মুখে তুলে দিল। ক্লারা খাবারটা গিলল, যেন সে কোনো বিষ খাচ্ছে। খাবারটা মুখে দেওয়ার পর জ্যাক তার বুড়ো আঙুল দিয়ে ক্লারার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সামান্য সস মুছে দিয়ে সে সোজা হয়ে বসল। সে ক্লারার প্লেটটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এবার নিজে খাও। আর হ্যাঁ, তোমার প্লেট থেকেও এক টুকরো পাস্তা আমাকে খাইয়ে দাও। আমি দেখতে চাই আমার বাধ্য সম্পত্তি কতখানি অনুগত হতে পেরেছে।”

ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করল। তার ভেতরের অপমানটা এখন জিদে রূপ নিয়েছে। সে ভাবল, “তুমি আমাকে ভাঙতে চাও তো? আমি সহজে ভাঙব না।” সে নিজের কাঁপা হাতটা সামলে নিয়ে জ্যাকের প্লেট থেকে কাঁটাচামচ দিয়ে কিছুটা পাস্তা তুলল। তারপর সরাসরি জ্যাকের মুখের সামনে ধরল। তার চোখে তখনো জমানো রাগ। জ্যাক একটু অবাক হলো। সে হয়তো ভেবেছিল ক্লারা কাঁদবে বা অনুনয় করবে, কিন্তু ক্লারার এই অবাধ্য চাউনি তার ভেতরের পুরুষালী অহংকারকে আরও বেশি উস্কে দিল। জ্যাক এক মুহূর্ত ক্লারার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে হাসল, তারপর মাথা নিচু করে ক্লারার হাতের চামচ থেকে খাবারটা মুখে নিল। খাবারটা নেওয়ার সময় জ্যাকের ঠোঁট ক্লারার আঙুলের ডগায় খুব আলতো করে ছুঁয়ে গেল। ইচ্ছাকৃতভাবেই সে এই কাজটা করল। ক্লারা এক ঝটকায় হাতটা টেনে নিল, তার বুকটা ধক করে উঠল। জ্যাক চিবোতে চিবোতে সোজা হয়ে বসে বলল, “স্বাদটা চমৎকার। বিশেষ করে তোমার হাত থেকে খাওয়ার পর এটার টেস্ট আরও বেড়ে গেছে, মিস ক্যালকুলেটর।”

ক্লারা টেবিলের নিচে নিজের দুই হাত শক্ত করে মুঠো করে রইল। সে খুব শান্ত কিন্তু চাবুকের মতো গলায় বলল, “জ্যাক্সন মিলার, আপনি আমাকে শরীর দিয়ে বন্দি করতে পেরেছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, খাঁচা যতই শক্ত হোক, ভেতরের পাখিটা যদি খাঁচাকে ঘৃণা করে, তবে সেই খাঁচা এক সময় অভিশপ্ত হয়ে যায়। আপনি একটা অভিশাপ কুড়াচ্ছেন।”

জ্যাকের ধূসর চোখ দুটো আবার জ্বলজ্বল করে উঠল। সে টেবিলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে এসে ক্লারার মুখের খুব কাছাকাছি নিজের মুখটা নিয়ে এল। তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের গায়ে লাগছিল। জ্যাক ফিসফিস করে বলল, “আমি অভিশাপকে ভয় পাই না, ক্লারা। আর বন্দিত্ব? তুমি এখনো বন্দিত্বের আসল রূপটাই দেখোনি। এই লাঞ্চ তো কেবল শুরু। আজ রাতে আমার পেন্টহাউসে তোমার জন্য আরও বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তৈরি থেকো।” ক্লারা জানালার বাইরে তাকাল। বোস্টনের বৃষ্টিটা এখন আরও তীব্র হয়েছে, ঠিক যেমন তীব্র আর অন্ধকার ঝাপটা এসে লেগেছে তার জীবনে।


ডর্মের ছোট্ট ঘরটা রাতে বোস্টনের বরফজমা ঠান্ডায় আরও বেশি নিঝুম হয়ে যায়। হিটারটা পুরোনো, ঘড়ঘড় শব্দ করে সামান্য গরম বাতাস ছড়ায়, যা ঘরের ভেতরের একাকীত্বকে দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়। ক্লারা বিছানায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে। দিনের বেলার সমস্ত অপমান, সবকিছু তার মাথার ভেতর তীরের মতো বিঁধছে। মানুষ যখন খুব অসহায় বোধ করে, তখন সে তার অতীতে আশ্রয় খোঁজে। ক্লারা তার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা পুরোনো, কোনা ভেঙে যাওয়া কাঠের ফ্রেম বের করল। মিউনিখের সেই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের একটা গ্রুপ ছবি। ছবিতে তার দুপাশে দুটো ছোট শিশু জড়িয়ে ধরে হাসছে। ক্লারা আলতো করে ফ্রেমটার ওপর হাত বুলাল। তার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ল। সে মনে মনে নিজেকে বলল, “ওদের জন্য আমাকে শক্ত থাকতে হবে। ক্লারা বেনেট, তুমি ভেঙে পড়তে পারো না।”

শরীরটা জ্বরের ঘোরে এখনো একটু কাঁপছে, কিন্তু মনের ভেতরের জেদটা তাকে আর বসে থাকতে দিল না। সে ল্যাপটপটা টেনে নিল। চোখের জল মুছে সে ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি পোর্টাল লগইন করে করপোরেট ফাইন্যান্স আর মিলার ডাইনেস্টির পাবলিক ব্যালেন্স শিটগুলো ডাউনলোড করতে শুরু করল। যেহেতু সে ফিন্যান্সের স্টুডেন্ট, সে ভালো করেই জানে দুনিয়ার যতই বড় সাম্রাজ্য হোক না কেন, কোথাও না কোথাও একটা গাণিতিক ভুল থাকেই। সে এমন কিছু একটা খুঁজবে, যা দিয়ে এই অদৃশ্য শিকলটা কেটে ফেলা যায়।

শহরের সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত এই বিলাসবহুল পেন্টহাউস। বাইরে বোস্টনের বৃষ্টি এখন রূপ নিয়েছে তুষারপাতে। বিশাল কাঁচের জানালার ওপাশে পুরো শহরটাকে এক অন্ধকার খাঁচার মতো দেখাচ্ছে। হলরুমের আলো নেভানো। কেবল একটা বিশাল মনিটরের নীলচে আলো জ্যাকের মুখের ওপর এসে পড়েছে। জ্যাক একটা কালো সিল্কের ট্রাউজার আর লুজ শার্ট পরে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। তার এক হাতে দামি কাঁচের গ্লাসে তরল অ্যাম্বার রঙের হুইস্কি আর অন্য হাতে ক্লারার সেদিন রাতে ফেলে যাওয়া চুলের ক্লিপটা, যা সে অলস ভঙ্গিতে আঙুলের ডগায় ঘোরাচ্ছে। মনিটরের স্ক্রিনে তখন লাইভ ফিড চলছে। ক্লারার ডর্ম রুমের গোপন ক্যামেরার ভিউ। এটা সেদিনই লাগিয়েছে লোক দিয়ে। এখন দেখে মজা পাওয়া যাবে। জ্যাক পুরো ক্যাম্পাস আর ক্লারার ঘরের প্রতিটা কোণ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখছে, এটা ক্লারা নিজেও জানে না। স্ক্রিনে দেখা গেল, ক্লারা নিজের ফোন থেকে সাউন্ডবক্সে একটা চড়া সুরের মেলানকোলিক গান ছেড়ে দিল। গানের আওয়াজ বাড়তেই ক্লারা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখনো জল, কিন্তু সে অদ্ভুত এক মুক্তিতে হাত দুটো ওপরে তুলে নাচতে শুরু করল। তার এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। সে কাঁদছে, গান গাইছে আর নিজের মনেই নাচছে। যেন এই নাচের মাধ্যমেই সে জ্যাকের দেওয়া সমস্ত অপমানকে শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে চায়। সোফায় বসে জ্যাকের ঠোঁটের কোণে একটা খুব সূক্ষ্ম, বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। ক্লারার এই অবাধ্যতা, তার এই পাগলামি দেখতে জ্যাকের বড্ড ভালো লাগছে। সাধারণ মেয়েরা তার সামনে ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, আর এই মেয়েটা একা একা নিজের ঘরে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে। হঠাৎ করেই ক্লারা দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাল। গানটা বন্ধ করে সে ক্লান্ত গলায় বিড়বিড় করল, “যাই, জামা বদলে ঘুমাতে যাই।” স্ক্রিনে দেখা গেল ক্লারা তার ওভারকোটটা গা থেকে খুলে ফেলল। তারপর যখন সে তার ভেজা শার্টের বোতামে হাত দিল, ঠিক সেই মুহূর্তে জ্যাকের বসার ভঙ্গিটা বদলে গেল। তার ঠোঁটের কোণের সেই হাসিটা এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। জ্যাক সোফায় একদম সোজা হয়ে বসল। তার হাতের হুইস্কির গ্লাসটা টেবিলের ওপর স্থির হয়ে রইল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার ধূসর চোখ দুটো গভীর আর অন্ধকার হয়ে উঠল। শার্টের ওপরের বোতামে ক্লারার আঙুলগুলোর নড়াচড়া দেখে জ্যাকের নিজের বুকের ভেতর একটা তীব্র মোচড় দিয়ে উঠল, তার শ্বাস-প্রশ্বাস আচমকা ঘন আর ভারী হয়ে এল। একটা অবাধ্য আর তীব্র পুরুষালী উত্তেজনা তার শিরায় শিরায় আছাড় খেতে লাগল। ক্লারা প্রথম বোতামটা খুলতেই জ্যাক এক ঝটকায় রিমোটটা তুলে নিল। তার হাতটা সামান্য কাঁপছে। ক্লারা নিজের শরীরকে পুরোপুরি উন্মুক্ত করার ঠিক আগের মুহূর্তে জ্যাক সজোরে বোতাম চেপে স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিল। পুরো ঘরটা এক সেকেন্ডে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। জ্যাক সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। তার কপালে হালকা ঘামের বিন্দু দেখা দিয়েছে, বুকের হাপরটা তখনো থামেনি। সে অন্ধকারে নিজের হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করল। ক্লারার ওই ফর্সা ঘাড় আর অবিন্যস্ত রূপের স্মৃতিটা তার চোখের সামনে ভাসছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গ্লাসের পুরো হুইস্কিটা এক ঢোকে গিলে নিল। সে অন্ধকারে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “তুমি অন্য কারও চোখের সামনে নিজেকে এভাবে দেখাতে পারো না, ক্লারা। এমনকি আমার ক্যামেরার সামনেও না। খুব শীঘ্রই… খুব শীঘ্রই তোমাকে সম্পূর্ণ নিজের করে নেব। তবে ভালোবাসা জন্য নয়, রিভেঞ্জ চিনো তো?”

আজকের বোস্টন শহরটা বিষণ্ণ কুয়াশায় ডুবে আছে সকাল থেকেই। ক্লারার ঘুম ভাঙল আজ দেরি করে। তাই কোনো রকমে একটা ওভারকোট গায়ে গলিয়ে, চুলগুলো তাড়াহুড়ো করে একটা ক্লিপ দিয়ে খোঁপা বানিয়ে সে ক্লাসরুমে এসে বসে। সে ভেবেছিল প্রক্টরের ল ক্লাসে অন্তত একটু মানসিক শান্তি পাবে। কিন্তু লিলিয়ান হলের বিশাল লেকচার থিয়েটারের পেছনের সারিতে ক্লারা যখন বসল, তার ঠিক পেছনের সিটটা টেনে বসল জ্যাক্সন মিলার। তার শরীর থেকে দামি কোলনের গন্ধ আসছে। এটাকে ভালো ভাষায় সুবাস বললেও ভুল হবে না। যা ক্লারার দুনিয়াটাকে এক মুহূর্তে ওলটপালট করে দিল। ক্লারার ডান পাশের সিটটায় বসল মার্কাস। কাল দুপুরের ঘটনার পর থেকে মার্কাসের মুখটা শক্ত হয়ে আছে, তার চোখ দুটো লাল। অধ্যাপক কার্টার তখন বোর্ডে রোমান ল-এর ধারাগুলো লিখছেন। ক্লাসরুমে পিনপতন নীরবতা। ঠিক তখনই ক্লারা টের পেল পেছনের সিট থেকে একটা হাত খুব আলতো করে তার ঘাড়ের ওপর এসে পড়ল। জ্যাকের লম্বা আঙুলগুলো ক্লারার খোপার ক্লিপটা ছুঁল। ক্লারা শক্ত হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “মিস্টার মিলার, হাত সরান।” জ্যাক কোনো কথা বলল না। একটা মৃদু ধাতব শব্দ হলো, আর এক ঝটকায় সে ক্লারার চুলের ক্লিপটা খুলে নিল। ক্লারার পিঠ বেয়ে তার রেশমি বাদামি চুলগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল দু কাঁধের ওপর। ক্লারা পেছনে ফিরতে গেল, কিন্তু অধ্যাপক কার্টার ঠিক তখনই ঘুরে দাঁড়িয়ে চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন, “এনি প্রবলেম অ্যাট দ্য ব্যাক?” ক্লারা বাধ্য হয়ে মুখ নিচু করে রইল। এই প্রফেসরের ক্লাসে সামান্য শব্দ হলেই উইকআউট করে দেন। এই ক্লাসের গ্রেডটা ক্লারার স্কলারশিপের জন্য জীবন মরণ সমস্যা। জ্যাক পেছন থেকে নিচু গলায় হাসল। সে ক্লারার এক গোছা চুল নিজের আঙুলে জড়াতে জড়াতে ফিসফিস করল, “গান ছেড়ে একসাথে নাচে আর কান্না করে কে?”

“আপনি কি আমার ওপর নজর রাখছেন?”

“না তো এমনি বললাম। কেন তুমিও এসব করো নাকি?”

ক্লারা থতমত খেয়ে বলল, “না আমি কেন এসব করতে যাবো? এখন আপনি হাত সরান।”

জ্যাক আরেকটু ঝুঁকে এসে বলল, “তোমাকে খোলা চুলে দারুণ লাগে। আমার সামনে নিজেকে এত আড়াল করার চেষ্টা না করলেও চলে।”

মার্কাস এটা দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সিটের ওপর সোজা হয়ে বসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “জ্যাক, নিজের সীমার মধ্যে থাকো। ওটা ল্যাবরেটরি নয় যে তুমি যা খুশি করবে।”

জ্যাক মার্কাসের দিকে তাকালও না। সে ক্লারার কানের খুব কাছে ঝুঁকে এসে বলল, “তোমার পাশের এই ছেলেটা বড্ড বেশি আওয়াজ করছে, ক্লারা। ওকে বলো মুখটা বন্ধ রাখতে, নইলে বাস্কেটবল টিম থেকে ওর নামটা কাটা যাওয়া স্রেফ এক মিনিটের ব্যাপার।”

ক্লারা টেবিলের নিচে নিজের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। সে মার্কাসের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করল চুপ থাকার জন্য। মার্কাস রাগে আর অপমানে ফুঁসতে লাগল, কিন্তু ক্লারার সেই আকুল চাহনি দেখে সে টেবিলের ওপর নিজের হাতটা মুঠো করে বসে রইল। সারাটা ক্লাস ধরে জ্যাক ক্লারার পিঠে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করল, তার চুলে বিলি কেটে দিল। ক্লারা স্রেফ পাথরের মতো স্থির হয়ে রইল।
ক্লাসের ঘণ্টা পড়তেই পরিস্থিতি আরও নোংরা রূপ নিল। অধ্যাপক কার্টার ক্লাস থেকে বের হতেই জ্যাকের ইশারায় বাস্কেটবল টিমের চার পাঁচজন চওড়া কাঁধের প্লেয়ার আর তাদের বান্ধবীরা এসে করিডোরের দরজাটা আটকে দাঁড়াল। পুরো ক্লাসের সাধারণ স্টুডেন্টরা ভয়ে দ্রুত পেছনের দরজা দিয়ে কেটে পড়ল। করিডোরে তখন শুধু ক্লারা, মার্কাস আর জ্যাকের দলবল। জ্যাকের এক বন্ধু মার্কাসের ল্যাপটপ ব্যাগটা এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিল। ভেতরের বইখাতাগুলো ছিটকে পড়ল। মার্কাস তেড়ে যেতেই দুজন প্লেয়ার তাকে শক্ত করে চেপে ধরল।
জ্যাক ক্লারার সামনে এসে দাঁড়াল। তার পকেটে হাত রাখা। সে অলস গলায় বলল, “বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে একটা নিয়ম আছে, মার্কাস। যোগ্যতা ছাড়া কেউ যখন বড় কোনো কিছুর ভাগ বসাতে আসে, তাকে একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।”

জ্যাকের বান্ধবী সিনথিয়া একটু চড়া হেসে ক্লারার জ্যাকেটের কলারটা টেনে ধরে বলল, “এই অনাথ মেয়েটা নাকি আজকাল খুব উড়ছে? জ্যাক, তুমি একে বেশি মাথায় তুলছ।”

ক্লারা সিনথিয়ার হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বলল, “হাত নামাও।”

জ্যাকের চোখের কোণটা এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হলো। সে সিনথিয়াকে ইশারা করল সরে যাওয়ার জন্য। সে মার্কাসের দিকে তাকিয়ে তার বন্ধুদের বলল, “এই ছেলেটাকে লকার রুমে নিয়ে যাও। ওর জার্সিটা আজ একটু ধুয়ে দেওয়া দরকার। আর হ্যাঁ, ও যেন আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে এই ভবনের আশেপাশে না আসে।”

“জ্যাক্সন! তুমি এটা করতে পারো না!” মার্কাস চিৎকার করে উঠল, কিন্তু প্লেয়াররা তাকে জোর করে করিডোর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল। করিডোরে এখন শুধু ক্লারা আর জ্যাক। জ্যাক ক্লারার কবজিটা লোহার মতো শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। ক্লারা ব্যথায় ককিয়ে উঠল, “ছাড়ুন আমাকে! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?” জ্যাক কোনো কথা না বলে তাকে টেনে নিয়ে গেল করিডোরের শেষ মাথায় থাকা একটা পরিত্যক্ত, অন্ধকার সেমিনার রুমে। ভেতরে চেয়ার আর পুরোনো ডেস্ক ছড়ানো। জ্যাক ক্লারাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে লাথি মেরে ভারী কাঠের দরজাটা বন্ধ করে দিল এবং ভেতর থেকে লক করে দিল। ঘরের ভেতর আবছা অন্ধকার। জানালার ভাঙা কাঁচ দিয়ে সামান্য কুয়াশাচ্ছন্ন আলো আসছে। ক্লারা দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়াল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। জ্যাক ধীরপায়ে তার দিকে এগিয়ে এল। তার কোটের বোতামটা খুলতে খুলতে সে ক্লারার এত কাছে এসে দাঁড়াল যে ক্লারা দেয়াল আর জ্যাকের বিশাল শরীরের মাঝে আটকে গেল। জ্যাক তার দুই হাত ক্লারার মাথার দুপাশে দেয়ালে ঠেকিয়ে দিল। ক্লারাকে পুরোপুরি নিজের আওতার মধ্যে নিয়ে এসে সে খুব নিচু, চাবুকের মতো তপ্ত গলায় বলল, “কাল দুপুরে তোমাকে একটা কথা বলেছিলাম না, ক্লারা? আমার জিনিস অন্য কেউ ছুঁলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। আজ ক্লাসে ওই ছেলেটা তোমার কাঁধে হাত দিয়েছিল। কোন সাহসে?”

ক্লারা চশমার ওপাশ থেকে জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকাল। সে বলল, “মার্কাস আমার বন্ধু। আপনার মতো জানোয়ার ও নয়।”

“বন্ধু?” জ্যাকের ঠোঁটের কোণে একটা কুৎসিত হাসি ফুটে উঠল। সে হঠাৎ করেই তার এক হাত নামিয়ে ক্লারার ফর্সা ঘাড়টা শক্ত করে চেপে ধরল। তার বুড়ো আঙুলটা ক্লারার গলার পালসের ওপর চেপে বসল। সে মুখটা ক্লারার ঠোঁটের মাত্র এক ইঞ্চি দূরত্বে এনে ফিসফিস করল, “আজকের পর থেকে ওই ছেলেটা যদি তোমার আশেপাশে আসে, তবে ওর ক্যারিয়ার আমি শেষ করে দেব। আর তুমি? তুমি ভাবছ এই চার দেয়ালের মাঝে তুমি খুব নিরাপদে আছ?”

জ্যাকের অন্য হাতটা ক্লারার কোমরে এসে বসল, এক টানে সে ক্লারার শরীরটা নিজের তৃষ্ণার্ত, শক্ত বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। ক্লারার পুরো শরীরটা অপমানে আর এক অদ্ভুত, অবিন্যস্ত উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল। সে জ্যাকের বুকে হাত দিয়ে ঠেলার চেষ্টা করল, কিন্তু জ্যাকের শরীরটা যেন একটা পাথরের পাহাড়। জ্যাক ক্লারার কানের লতিতে খুব কামড় দেওয়ার মতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। ক্লারা চোখ বন্ধ করে শিউরে উঠল। জ্যাক ফিসফিস করে বলল, “মনে রেখো ক্লারা বেনেট, তুমি এই কাগজে সই করার পর থেকেই আমার। তোমার এই শরীর, তোমার এই রাগ, তোমার এই নীল চোখ সব কিছুর ওপর এখন শুধু আমার অধিকার। এবার বলো, তুমি কার?”

ক্লারা চোখ খুলে সরাসরি জ্যাকের চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো জমানো বিষাদ আর জেদ। সে বলল, “আমি আপনার চরম শত্রু, মিস্টার মিলার। আর আপনার এই অধিকারকে আমি ঘৃণা করি।” জ্যাক ক্লারার ঠোঁটের ওপর নিজের বুড়ো আঙুলটা চেপে ধরে একটু হাসল। সে বলল, “তোমার এই ঘৃণাই আমার সবচেয়ে প্রিয়, মিস ক্যালকুলেটর। দিন তো কেবল শুরু হলো।”

চলবে?