#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_15
বোস্টনের সকালগুলো ইদানীং বড্ড বেশি ধূসর আর কুয়াশায় মোড়া থাকে। তবে আজ সকালের কুয়াশাটা যেন পেন্টহাউসের ড্রইংরুমের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। ক্লারা রান্নাঘরের স্ল্যাবের ওপর নিজের আইপ্যাডটা রেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ইউনিভার্সিটির অফিশিয়াল স্টুডেন্ট ফোরামের পেজটা স্ক্রল করতে করতে তার ফর্সা হাতটা কেমন যেন কাঁপছে।। স্ক্রিনে একটা বেনামী পোস্টের নিচে তার ছবি আর মিউনিখের সেই অনাথ আশ্রমের কিছু পুরোনো নথিপত্র কোলাজ করে দেওয়া। ক্যাপশনটা বড্ড নোংরা, “স্কলারশিপের আড়ালে কে এই পরিচয়হীন অনাথ মেয়ে, যে মিলার বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারীকে ব্ল্যাকমেইল করে বিয়ে করেছে?”*
পোস্টের নিচে শত শত স্টুডেন্টের সস্তা মন্তব্য আর ট্রোল। কেউ হাসছে, কেউ কটু কথা বলছে। ক্লারা চশমাটা নাক থেকে খুলে মার্বেলের কাউন্টারের ওপর রাখল। তার নীল চোখ দুটো কান্নায় টইটম্বুর হয়ে উঠেছে, কিন্তু সে জলটা পড়তে দিল না। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডাইনিং টেবিলের দিকে তাকাল। জ্যাক তখন কেবলই শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে। তার চুল থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। পরনে একটা সাধারণ ধূসর রঙের সুতির ট্রাউজার আর কালো টি-শার্ট। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার পর থেকে তার দামী স্যুটগুলো আলমারিতেই বন্দী। কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গিতে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। সে ক্লারার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে এক মূহুর্ত থমকে দাঁড়াল। তারপর খুব শান্ত পায়ে এগিয়ে এসে আইপ্যাডটা নিজের হাতে নিল। স্ক্রিনের লেখাগুলোর ওপর জ্যাকের ধূসর চোখ দুটো মাত্র তিন সেকেন্ড স্থির রইল। ব্যস, ওই তিন সেকেন্ডেই তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল। হাতের জলের গ্লাসটা সে টেবিলের ওপর এত জোরে রাখল যে কিছুটা জল ছিটকে বাইরে পড়ে গেল। কিন্তু তার গলায় কোনো চিৎকার শোনা গেল না। সে খুব নিচু, থমথমে গলায় বলল, “তুমি কি আজ ইউনিভার্সিটিতে যাবে?”
ক্লারা কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে চশমাটা আবার চোখে পরল। বলল, “না গেলে ভাববে আমি ভয় পেয়েছি। আমার কোনো বংশের পরিচয় নেই, এটা তো মিথ্যা নয় মিস্টার মিলার। ভ্যালেরিয়া স্রেফ সত্যটাই একটু কুৎসিতভাবে দেখিয়েছে।”
জ্যাক ক্লারার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে একটা তাজা সাবান আর ঠাণ্ডা বাতাসের সুগন্ধ বের হচ্ছিল। সে ক্লারার থুতনিটা আলতো করে নিজের আঙুল দিয়ে ওপরেু তুলে ধরে বলল, “সত্যি আর নোংরামির তফাতটা আমি ভ্যালেরিয়া লরেঞ্জোকে আজ খুব ভালো করে বুঝিয়ে দেব। তুমি তৈরি হও, আজ আমরা একসাথেই ক্যাম্পাসে যাব।”
–
ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আজ অন্যরকম একটা ফিসফিসানি। জ্যাক আর ক্লারা যখন একসাথে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, চারপাশের চেনা মুখগুলো কেমন যেন আড়চোখে তাকাচ্ছিল। জ্যাকের বন্ধুদের কেউ কেউ লকার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে নিল। গোল্ডেন বয়ের পকেটে আজ টাকা নেই, তাই তার পাশে দাঁড়ানোর সাহসও কারো নেই।
দুপুরের দিকে ক্লারা নিজেকে একটু আড়াল করার জন্য সেন্ট্রাল লাইব্রেরির একদম পেছনের দিকের একটা পুরোনো মেহগনি টেবিল বেছে নিল। চারপাশটা বড্ড শান্ত। সে ফিনান্সের একটা মোটা বই খুলে খুব মন দিয়ে পাতার পর পাতা ওল্টাচ্ছিল। সে আসলে পড়াটা নিচ্ছিল না, স্রেফ দুনিয়াটা থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। ঠিক তখনই টেবিলের ওপাশের চেয়ারটা টেনে জ্যাক এসে বসল। লাইব্রেরির সেই টিমটিমে হলুদ আলোয় জ্যাকের মুখটা কেমন যেন রহস্যময় দেখাচ্ছিল। সে কোনো বই খোলেনি। সে স্রেফ নিজের দু-হাত টেবিলের ওপর রেখে একদৃষ্টে ক্লারার দিকে তাকিয়ে ছিল। ক্লারা একবার চোখ তুলে তাকাল, তারপর আবার বইয়ের পাতায় মন দিল। সে চশমাটা নাকের ওপর একটু সোজা করে নিয়ে ডান হাতের আঙুল দিয়ে বইয়ের একটা পাতা ওল্টাতে চাইল। জ্যাক হঠাৎ টেবিলের ওপর দিয়ে নিজের বড় হাতটা বাড়িয়ে ক্লারার সেই আঙুলগুলো চেপে ধরল।
“তুমি যে বইটার পাতা উল্টোচ্ছো, আমার সেই পাতাগুলোর ওপর হিংসে হচ্ছে। ওগুলো কেন তোমার আঙুলের এত নরম ছোঁয়া পাবে, যা আমি এখনো পাইনি?” ক্লারা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকটা বড্ড জোরে কাঁপতে শুরু করল। সে লাইব্রেরির চারপাশটায় একবার তাকিয়ে জ্যাকের হাত থেকে নিজের আঙুলগুলো ছাড়ানোর চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল, “মিস্টার মিলার, এটা লাইব্রেরি। দয়া করে পাগলামি করবেন না। আর বইয়ের পাতার ওপর কেউ হিংসে করে?”
জ্যাকের আঙুলের বাঁধন একটুও আলগা হলো না। সে খুব শান্ত কিন্তু একরোখা গলায় বলল, “আমি করি। জ্যাক্সন মিলার তার জিনিসের ওপর অন্য কারোর ছোঁয়া সহ্য করে না, সেটা একটা নিস্প্রাণ বইয়ের পাতা হলেও না। এখন বইটা বন্ধ করো, আমাদের লরেঞ্জো কর্পোরেশনে যেতে হবে।”
–
বোস্টনের ডাউনটাউনে লরেঞ্জো কর্পোরেশনের বিশাল কাঁচের বিল্ডিংটা রোদের আলোয় ঝকঝক করছিল। লরেঞ্জো ফ্যামিলির দম্ভ আর ক্ষমতার প্রতীক এই হেড অফিস। রিসেপশনিস্ট যখন জ্যাক আর ক্লারাকে ভেতরেু ঢুকতে বাধা দিতে চাইল, জ্যাক স্রেফ তার দিকে একবার তাকাল। সেই ধূসর চোখের চাউনিতে এমন একটা হিমশীতল আদেশ ছিল যে মেয়েটি আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না। প্রেসিডেন্টের বিশাল লাক্সারি কেবিনে বসে ছিলেন মার্কো লরেঞ্জো এবং তার পাশে সোফায় বসে পা দোলাচ্ছিল ভ্যালেরিয়া। ভ্যালেরিয়ার হাতে একটা দামী কফির মগ, ঠোঁটে সেই বিষাক্ত জয়ের হাসি। জ্যাক কেবিনের দরজাটা কোনো নক না করেই লাথি মেরে খুলে ভেতরেু ঢুকল। ক্লারা তার পেছনে শান্ত পায়ে এসে দাঁড়াল। মার্কো লরেঞ্জো নিজের রিডিং চশমাটা খুলে খুব বিরক্ত গলায় বললেন, “জ্যাক্সন? তোমার বাবা তো তোমাকে অলরেডি মিলার কর্পোরেশন থেকে বের করে দিয়েছেন। এখন এই অফিসে তোমার কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া ঢোকার অধিকার কে দিল?”
জ্যাক খুব অলস ভঙ্গিতে মার্কো লরেঞ্জোর ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়াল। সে দুই হাত টেবিলের ওপর ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে বসল। তার মুখে একটা খুব ঠান্ডা, অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “অধিকার আমি কারো কাছ থেকে চেয়ে নিই না, মিস্টার লরেঞ্জো। আর আমার বাবা আমাকে বের করেছেন, কিন্তু আমার ভেতরের বাস্কেটবল স্কিল বা আমার মাথাটা তো আর ব্যাংক ফ্রিজ করতে পারেনি, পেরেছে?”
ভ্যালেরিয়া সোফা থেকে উঠে এসে বলল, “জ্যাক, তুমি এই সস্তা অনাথ মেয়েটার জন্য আমাদের ফ্যামিলির সাথে শত্রুতা করছ? ও তো একটা পরিচয়হীন…”
জ্যাক ভ্যালেরিয়ার দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখের অলস হাসিটা এক সেকেন্ডে ভ্যানিশ হয়ে গেল। সে খুব ধীর পায়ে ভ্যালেরিয়ার এত কাছে গিয়ে দাঁড়াল যে ভ্যালেরিয়া ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। জ্যাক খুব নিচু, ফিসফিসানি গলায় বলল, “ভ্যালেরিয়া, তুমি ইউনিভার্সিটির ফোরামে যে পোস্টটা করেছ, ওটার আইপি অ্যাড্রেসটা ডিলিট করতে ভুলে গেছ। আমার জিনিসের দিকে যদি আর একবার তোমার ওই নোংরা নখের আঁচড় লাগে তবে লরেঞ্জোদের স্পেনের যে শিপিং ডিল নিয়ে আমার বাবা এত নাচানাচি করছেন, সেই ডিলের চোরাচালানের পুরো ফাইল আমি কাল সকালের আগেই ফেডারেল কোর্টে জমা দিয়ে দেব। তখন এই কাঁচের রাজপ্রাসাদটা জেলের চার দেওয়ালে বদলে যাবে।”
মার্কো লরেঞ্জো এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার কপাল দিয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল। জ্যাক আর কিছু বলল না। বাঁকা হাসল। তারপর ক্লারার হাত ধরে বলল, “ ও পরিচয়হীনা নয়। ওর পরিচয় হচ্ছে ও ক্লারা মিলার। ওর বিকল্প ও নিজেই। ওর যোগ্যতার জন্য কোনো বংশের পরিচয়ের প্রয়োজন নেই। আর সবশেষে বলতে চাই ও আমার বিবাহিত স্ত্রী। আর যেই মুখ আমার স্ত্রীকে নিয়ে নোংরা কথা বলবে সেই মুখ আমার সেলাই করার জন্য ২ বার ভাবতে হবে না। আশা করছি মগজে কথা ঢুকেছে।”
কেবিনের ভেতরের বাতাসটা এক মূহুর্তে ভারী হয়ে গেল। ভ্যালেরিয়ার হাতের কফির কাপটা কেমন যেন কাঁপছে। জ্যাক টেবিলের ওপর রাখা একটা দামী কলম হাতে নিয়ে খুব খামখেয়ালী ভঙ্গিতে ওটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, “আমি বাস্কেটবল কোর্টের রাজপুত্র হতে পারি মিস্টার লরেঞ্জো, কিন্তু মনে রাখবেন কোর্টের বাইরে আমি একটা আস্ত ডেভিল। আমার পকেটে আজ এক সেন্টও নেই, তাই আমার হারানোর কোনো ভয় নেই। যার সব চলে যায়, সে কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়।”
সে কলমটা ঠক করে টেবিলের ওপর ফেলে দিল। তারপর ক্লারার দিকে তাকিয়ে খুব নরম, সাবলীল গলায় বলল, “চলো ক্লারা। এখানে পারফিউমের গন্ধটা বড্ড ছোটলোকি। আমার মাথা ধরছে।”
ক্লারা পুরো সময়টা চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছিল। সে প্রথমবার টের পেল, জ্যাক্সন মিলার শুধু একটা জেদি ছেলেই নয়, তার ক্ষমতার গভীরতা আর বুদ্ধির ধার কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। সে কোনো টাকা-পয়সা ছাড়াই এক রাতে লরেঞ্জো ফ্যামিলির মতো বড় সাম্রাজ্যকে এক মূহুর্তে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিয়ে এল।
তারা যখন লিফট দিয়ে নিচে নামছিল, ক্লারা জ্যাকের মুখের দিকে তাকাল। জ্যাক আবার সেই আগের মতো স্বাভাবিক, অলস ভঙ্গিতে পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লারা নিচু গলায় বলল, “আপনি ওদের ওই শিপিং ফাইলের কথা যা বললেন, ওটা কি সত্যি?”
জ্যাক একটু হাসল। সে ক্লারার চশমার ফ্রেমটা আলতো করে ছুঁয়ে বলল, “মিথ্যা। আমার কাছে কোনো ফাইল নেই। কিন্তু চোরের মনে সবসময় পুলিশ বাস করে, ক্লারা। লরেঞ্জোরা বড্ড বেশি পাপ করেছে, তাই ভয়টা ওদের রক্তে মিশে আছে। আর ভয় পাওয়া মানুষদের দমানো বড্ড সহজ।”
–
রাত আটটা। পেন্টহাউসের নিচে তখনো ব্যাংকের সীল মারা নোটিশ ঝুলছে। জ্যাক আর ক্লারা তাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে একটা ছোট ট্রাঙ্ক আর দুটো ব্যাগ নিয়ে ডর্ম রুমের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রোলস রয়েস নেই, তাই তারা একটা সাধারণ লোকাল ক্যাবে বসে আছে। বোস্টনের রাস্তায় তখন হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে। জানালার কাঁচ বেয়ে জলের ফোঁটাগুলো নেমে যাচ্ছে। ক্লারা জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “আপনার বড্ড কষ্ট হচ্ছে, তাই না? পেন্টহাউসের ওই লাক্সারি ছেড়ে আমার ওই ছোট ডর্মের ঘরে থাকা আপনার ইগোতে লাগছে না?”
জ্যাক ক্লারার হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় টেনে নিল। গভীর গলায় বলল,
“আমার জিনিসের দিকে কেউ তাকালে আমি সহ্য করি না, ক্লারা। আমার ওই পেন্টহাউস, গাড়ি আর কোটি কোটি টাকা ওগুলো স্রেফ কাগজের নৌকার মতো ছিল, যা আজ স্রোতে ভেসে গেছে। কিন্তু এই ক্যাবের ভেতর আমার পাশে যে মেয়েটা বসে আছে, সে আমার আসল সব। এই মেয়েটা যতক্ষণ আমার খাঁচায় আছে, জ্যাক্সন মিলার নিজেকে এই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষই মনে করবে।”
ক্লারা কোনো কথা বলল না। সে নিজের চশমাটা নাক থেকে খুলে ক্যাবের সিটের ওপর রাখল। বাইরের সোডিয়াম আলোর হলুদ আভাটা তার চোখে এসে পড়ছিল। সে প্রথমবার জ্যাকের হাতের শক্ত মুঠো থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নেওয়ার কোনো চেষ্টা করল না। ক্যাবটা যখন ইউনিভার্সিটির ডর্মের সামনে এসে থামল, তখন চারপাশের তুষারঝড়টা যেন এক অদ্ভুত শান্তিতে বদলে গেছে। এক নতুন যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও, এই ছোট খাঁচাটুকু এখন তাদের কাছে একটা আস্ত আকাশ মনে হতে লাগল।
চলবে?
#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_16
বোস্টনের ডাউনটাউনে মিলার কর্পোরেশনের হেডকোয়ার্টারের পঞ্চান্ন তলার কেবিনটা আজ বড্ড বেশি ঠান্ডা। সেন্ট্রাল হিটারটা চললেও কাঁচের দেয়ালের ওপাশ থেকে আসা তুষারঝড়ের ধূসর আলো পুরো ঘরটাকে একটা বরফঘরের মতো বানিয়ে রেখেছে। আর্থার মিলার তার বিশাল টেবিলের ওপাশে বসে আছেন। তার পরনে একটা চারকোল গ্রে রঙের থ্রি-পিস স্যুট, চোখে সোনার ফ্রেমের রিডিং চশমা। টেবিলে রাখা দামী ফাউন্টেন পেনটা দিয়ে সে একটা ফাইলে সই করছে। পেন আর কাগজের ঘর্ষণের খসখস শব্দ ছাড়া পুরো ঘরে আর কোনো শব্দ নেই।
জ্যাক কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরেু ঢুকল। তার পরনে একটা সাধারণ কালো ডেনিম জ্যাকেট আর ট্রাউজার। চুলগুলো কপালে এলোমেলো। পকেটে হাত দিয়ে সে খুব অলস, সাবলীল ভঙ্গিতে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার মুখে কোনো ভয় বা দ্বিধা নেই, ঠিক যেন নিজের চেনা ড্রইংরুমে এসে দাঁড়িয়েছে। আর্থার মিলার ফাইল থেকে চোখ তুললেন না। থমথমে গলায় বললেন, “তুমি লরেঞ্জোদের অফিসে গিয়ে ভ্যালেরিয়াকে থ্রেট করে এসেছ, জ্যাক্সন? তোমার সাহস তো কম নয়।”
জ্যাক টেবিলের সামনের চামড়ার চেয়ারটা টেনে বসল। সে খুব সহজ গলায় বলল, “সাহস একটু বেশিই বাবা, সেটা তো আপনি ছোটবেলা থেকেই জানেন। আর থ্রেট করব কেন? আমি স্রেফ বুঝিয়ে এসেছি আমার জিনিসে হাত দিলে তার মাশুল কতটা ভারী হতে পারে।”
আর্থার মিলার এবার ফাউন্টেন পেনটা টেবিলের ওপর রাখলেন। একটি হালকা ধাতব শব্দ হলো। তিনি চশমাটা খুলে সরাসরি জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকালেন।
“তোমার জিনিস?” আর্থার মিলার একটু নিচু স্বরে হাসলেন, “যে মেয়েটার কোনো ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, একটা পরিচয়হীন অনাথ সে আজ থেকে মিলার বংশের জিনিস হয়ে গেল? আর তার জন্য তুমি লরেঞ্জোদের সাথে আমাদের এত বড় বিজনেস রিলেশনটা ধ্বংস করতে বসেছ?”
জ্যাক চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে বসল। তার মুখে সেই চেনা খামখেয়ালী ভাব। সে বলল, “বংশের পরিচয় দিয়ে কী হয় বাবা? লরেঞ্জোদের তো মস্ত বড় বংশের পরিচয় আছে, অথচ মেয়েটার বুদ্ধি একটা ড্রেন-লাইনের পোকার মতো। ইউনিভার্সিটির ফোরামে ক্লারার নামে ওসব নোংরা কথা ও-ই লিখিয়েছে।”
আর্থার মিলার টেবিলের ওপর হাত রেখে একটু ঝুঁকে এলেন। তার মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল। তিনি খুব শক্ত গলায় বললেন, “আমি এখানে তোমার বাস্কেটবল কোর্টের নিচুমানের লেকচার শুনতে বসিনি, জ্যাক্সন। তোমাকে শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিতে ডেকেছি। লরেঞ্জোরা অলরেডি আমাদের শিপিং বিজনেসের ওপর প্রেসার ক্রিয়েট করছে। বোস্টন ব্যাংক তোমার অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ করেছে আমারই পারমিশনে। এবার চূড়ান্ত চালটা আমি দেব।”
সে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা আইনি খসড়া বের করে জ্যাকের সামনে ছুঁড়ে দিল।
“এটা একটা অফিশিয়াল ডিভোর্স পেপার। আর এর সাথে আছে একটা হলফনামা যেখানে লেখা আছে তুমি লরেঞ্জোদের কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চাচ্ছ। এটাতে সই করো। তাহলে আজ বিকেলের মধ্যে তোমার গোল্ড কার্ড, তোমার ওই দামী পেন্টহাউস, আর রোলস রয়েসের চাবি তোমার পকেটে ফিরে যাবে। নইলে…”
জ্যাক ডিভোর্স পেপারটার দিকে একবার তাকাল। কাগজের সাদা পৃষ্ঠাগুলো এই ঠান্ডা আলোয় বড্ড ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। সে কাগজটা হাতেও নিল না, স্রেফ একটা আঙুল দিয়ে ওটাকে টেবিলের এক কোণায় সরিয়ে দিল। তার ঠোঁটের কোণে উদাসীন হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “নইলে কী বাবা? রাস্তায় বের করে দেবে?”
“হ্যাঁ।” আর্থার মিলার হুংকার দিয়ে উঠলেন। “নইলে এই মিলার কর্পোরেশনের একটা সেন্টও তুমি পাবে না। এই বোস্টন শহরে তোমার যে কেরিয়ার, তোমার যে গোল্ডেন বয় ইমেজ সবকিছু এক রাতে আমি মাটির সাথে মিশিয়ে দেব। জ্যাক্সন মিলার নামটা এই শহরের মানুষ ভুলে যাবে। তুমি স্রেফ একটা সাধারণ ভবঘুরে হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবে। এবার চুজ করো টাকা, ক্ষমতা আর তোমার এই রাজকীয় লাইফস্টাইল… নাকি ওই অনাথ মেয়েটা?”
কেবিনের ভেতরের নীরবতা যেন এক মূহুর্তে জমে বরফ হয়ে গেল। জ্যাক চেয়ার ছেড়ে ধীরেু ধীরেু উঠে দাঁড়াল। সে তার জ্যাকেটের কলারটা একটু সোজা করে নিল। সে বাবার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুব নিচু, শান্ত গলায় বলল, “আপনার এই কাগজের টাকা আর ক্ষমতার অহংকার বড্ড সস্তা জিনিস, বাবা। আপনি ভাবছেন আপনার এই ব্যাংক ব্যালেন্স কেড়ে নিলে জ্যাক্সন মিলার শেষ হয়ে যাবে? আপনি ভুলে গেছেন আমি যখন বাস্কেটবল কোর্টে নামি, তখন গ্যালারির হাজার হাজার মানুষ মিলার কর্পোরেশনের শেয়ারের দাম দেখে চিৎকার করে না, ওরা আমার হাতের ওই বাস্কেটের ম্যাজিক দেখে চিৎকার করে। আপনার টাকা ছাড়াও আমি জ্যাক্সন মিলারই থাকব, বাবা। কিন্তু আপনি আমার এই মাথাটা কোনোদিনও কিনতে পারবেন না।” আর্থার মিলার স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তিনি ভাবতেও পারেননি তার এই অবাধ্য ছেলে কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য এক সেকেন্ডে এভাবে পায়ে ঠেলে দিতে পারে। জ্যাক নিজের পকেটে হাত দিল। তার পকেটে পেন্টহাউসের সেই দামী স্পেয়ার চাবিটা আর দুটো ক্রেডিট কার্ড ছিল, যা এখনো সীল করা হয়নি। সে খুব ধীর পায়ে টেবিলের সামনে এগিয়ে এল। তারপর খুব শান্ত ভঙ্গিতে চাবি আর কার্ডগুলো আর্থার মিলারের সামনে টেবিলের ওপর ঠক করে ছুঁড়ে দিল। সে বলল, “পেন্টহাউসের চাবিটা রেখে দাও বাবা। আর এই কার্ড দুটোও লক করে দেও। আজ থেকে তোমার দেওয়া একটা সুতোও আমার শরীরে থাকবে না।”
আর্থার মিলার কঠিন গলায় বললেন, “তুমি কিন্তু এক কাপড়ে বের হচ্ছো, জ্যাক্সন। এই বোস্টনের তুষারঝড়ে একটা রাতও টিকতে পারবে না। কাল সকালেই তুমি এই ডেস্কে এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাইবে।”
জ্যাক দরজার দিকে হাঁটা দিল। দরজার হ্যান্ডেলটা ধরে সে একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার মুখে আবার সেই চিরচেনা অলস হাসিটা ফিরে এসেছে। সে বলল, “ক্ষমা আমি শুধু একজনকেই চাইতে পারি বাবা যে ওই মিউনিখের সেন্ট মার্থা আশ্রমের বাচ্চাদের মাথার ওপরের ছাদটা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। আর তুষারঝড়? বাস্কেটবল কোর্টে এর চেয়েও বড় বড় ঝড় আমি একহাতে সামলেছি। ভালো থাকবে, মিস্টার আর্থার মিলার।” সে কেবিনের ভারী দরজাটা টেনে বাইরে বেরিয়ে এল। পেছনেু ফেলে রেখে এল মিলার বংশের এক বিশাল, অহংকারী সাম্রাজ্য আর তার বাবার নিঃসঙ্গ হুংকার।
–
বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা নামল, বোস্টন শহরটা তুষারঝড়ের পেটে চলে গেল। চারদিকের রাস্তাঘাট বরফে ঢেকে গেছে, ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো কুয়াশায় একদম ঝাপসা। জ্যাক লোকাল বাসের পেছনের সিটে বসে আছে। তার পকেটে এখন মাত্র কুড়ি ডলারের একটা নোট। শরীরটা ঠান্ডায় কিছুটা জমে গেছে, কিন্তু তার চোখের চাউনিটা এখনো একরোখা। বাস থেকে নেমে সে ধীর পায়ে ইউনিভার্সিটির সেই ছিমছাম ডর্মের সামনে এসে দাঁড়াল। ক্লারা তখন তার ছোট ডর্ম রুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। জানালার বাইরে একটা পুরোনো, পাতাঝরা মরা গাছ বরফে ঢাকা পড়ে আছে। সে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে এক কাপ গরম চা হাতে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ভাবছে জ্যাকের অ্যাকাউন্ট তো ফ্রিজ হয়ে গেছে, সে এখন কোথায় আছে? লরেঞ্জোদের অফিস থেকে ফেরার পর সে তো আর পেন্টহাউসেও ফেরেনি। ঠিক তখনই ডর্মের নিচে ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটা চেনা ছায়া এসে দাঁড়াল। জ্যাক তার কালো জ্যাকেটের পকেটে হাত দিয়ে, বরফে মাথা ভিজিয়ে একদৃষ্টে ওপরের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। তার শরীরটা কাঁপছে, অথচ তার ঠোঁটের কোণে কি সুন্দর হাসি।
ক্লারা চশমার আড়াল থেকে সেই দৃশ্য দেখে এক মূহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত থেকে চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। কোটিপতি জ্যাক্সন মিলার আজ কোনো রোলস রয়েস ছাড়া, কোনো বডিগার্ড ছাড়া, স্রেফ এক কাপড়ে তার ডর্মের মরা গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আছে!
জ্যাক মাথা তুলে ক্লারার জানালার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, “তোমার ওই ডর্মের ঘরের জানালার বাইরে যে একটা মরা গাছ আছে, আমি সারা রাত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। স্রেফ যদি ওপাশের কাঁচের গায়ে তোমার চশমা পরা ছায়াটা একবার দেখা যায়।” ক্লারা আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সে নিজের সোয়েটারটা জড়িয়ে খুব দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো ডর্মের মেইন গেটের দিকে। এক নতুন এবং অবিশ্বাস্য বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাদের জীবনের এই দ্বিতীয় খণ্ডটা এক চরম মোড় নিল।
চলবে?

