#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_13
বোস্টনের আকাশটা আজ সকাল থেকেই কেমন যেন ভারী হয়ে আছে। কুয়াশা আর মেঘ মিলেমিশে চারপাশটাকে একদম ধোঁয়াটে করে তুলেছে। পেন্টহাউসের বড় জানালার কাঁচের ওপাশে তাকালে মনে হয় পুরো শহরটা একটা হালকা সাদা চাদরের নিচে ঘুমিয়ে আছে। আর কতগুলো দিন কেটে গেল।
ক্লারা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা তৈরি করছিল। তার পরনে একটা সাধারণ সুতির অফ-হোয়াইট সোয়েটার। চশমাটা বাষ্পে একটু ঝাপসা হয়ে যাওয়ায় সে এক হাত দিয়ে ওটা খুলে ওল্ড কোটের কোণা দিয়ে মুছে নিল। তার চোখের নিচে হালকা কালচে ছায়া। বিয়ের পর থেকে একটা রাতও সে শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি। একই বিছানায়, মাঝখানে একটা বালিশের বর্ডার রেখে শুয়ে থাকা এই অদ্ভুত মানসিক চাপ তাকে ভেতরেু ভেতরেু ক্ষিয়ি দিয়ে যাচ্ছে। জ্যাক্সন মিলার তখন ড্রইংরুমের বড় সোফাটায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। তার পরনে একটা ডার্ক ব্লু রঙের সোয়েটার, চুলগুলো কপালে এসে পড়েছে। সে খুব মন দিয়ে একটা বাস্কেটবল ম্যাগাজিন ওল্টাচ্ছে। ক্লারা চায়ের কাপটা নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখল। খুব শান্ত গলায় বলল, “আপনার চা।”
জ্যাক ম্যাগাজিন থেকে চোখ তুলে তাকাল। তার ধূসর চোখ দুটোয় সকালের অলস আলো। সে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিল। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আজ আমাদের মিলার ম্যানশনে যেতে হবে। বাবা ডেকেছেন।”
ক্লারা এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল। সে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বলল, “মিলার ম্যানশন? কিন্তু সেখানে আমি কেন যাব? আপনার বাবা-মা তো আমাকে চেনেন না।”
জ্যাক চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, অলস হাসিটা ফুটে উঠল। সে বলল, “চেনেন না বলেই তো চেনাতে নিয়ে যাব। আমি যে গোপনে এই শহরের সবচেয়ে জেদি আর রাগী মেয়েটাকে বিয়ে করে ঘরে তুলেছি, সেটা তো আমার বাবা-মাকে জানাতে হবে, তাই না? আজ রাতে ওখানেই আমাদের ডিনার।” ক্লারা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালার বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। সে খুব ভালো করেই জানে, মিলার ম্যানশনে যাওয়া মানে একটা নতুন ঝড়ের মুখোমুখি হওয়া। কিন্তু তার কাছে এখন আর কোনো বিকল্প নেই। চুক্তির শিকলটা তার পায়ে বড্ড শক্ত করে বাঁধা।
–
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় মিলার ম্যানশনের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছাড়ল। চারদিকের রাস্তাগুলো তুষারপাতে সাদা হয়ে গেছে। ডার্ক ক্রিমসন রঙের রোলস রয়েস গাড়ির পেছনের সিটে জ্যাক আর ক্লারা পাশাপাশি বসে আছে। দুজনের মাঝখানে বেশ খানিকটা দূরত্ব।
ক্লারা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে লিবার্টি স্কয়ারের ল্যাম্পপোস্টগুলোর জ্বলে ওঠা দেখছে।
জ্যাক হঠাৎ তার দিকে না তাকিয়েই বলল, “সোয়েটারটা বড্ড সস্তা দেখায়। মিলার ম্যানশনের ড্রইংরুমে বসার জন্য এটা একদম পারফেক্ট নয়।”
ক্লারা ঘুরে তাকাল। তার নীল চোখ দুটোয় এক চিলতে অভিমানী আলো। সে বলল, “আমার কাছে এর চেয়ে দামী কোনো পোশাক নেই, মিস্টার মিলার। আর আমি তো কোনো সেজেগুজে পুতুল হতে আসিনি। আপনার বাবা-মা আমাকে যেভাবে দেখবে, সেভাবেই আমার সত্যটা জানবে।”
জ্যাক একটু নিচু স্বরে হাসল। সে নিজের সিট থেকে একটু ঝুঁকে ক্লারার খুব কাছাকাছি এল। তার ধূসর চোখের তীব্র চাউনিটা ক্লারার ফর্সা গালে এসে পড়ল। সে ভারী গলায় বলল, “তোমার এই সাধারণ রূপটাই তো বড্ড বিপজ্জনক, ক্লারা। এর ওপর যদি আবার দামী সিল্কের শাড়ি বা গাউন জড়িয়ে নাও, তবে তো এই বোস্টন শহরের পুরুষেরা বাস্কেটবল খেলা ছেড়ে শুধু তোমার দিকেই তাকিয়ে থাকবে। ওসবের দরকার নেই, এই সোয়েটারেই তোমাকে আমার খাঁচার পারফেক্ট পাখি মনে হচ্ছে।” ক্লারা মুখটা ঘুরিয়ে নিল। এই ছেলের কথার পিঠে কথা বলার ধরণটা সে এখনো বুঝে উঠতে পারে না। গাড়িটা তখন বড় হাইওয়ে পার হয়ে মিলার ম্যানশনের বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে থামল।
–
মিলার ম্যানশনটা যেন একটা আস্ত ইউরোপীয় রাজপ্রাসাদ। চারদিকে দামী কাঠের আসবাব, বিশাল ঝাড়বাতির সোনালী আলো, আর দেয়ালে দেয়ালে মিলার বংশের পূর্বপুরুষদের তেলচিত্র। পুরো বাড়িটায় একটা রাজকীয় আভিজাত্য থাকলেও কেমন যেন একটা মরা শান্তি চারদিকে জড়িয়ে আছে। ড্রইংরুমের বিশাল সোফায় বসে ছিলেন আর্থার মিলার, এবং তার পাশে লেডি এলিনর ও লিলিয়ানা। আর্থার মিলারের পরনে একটা ফরমাল স্যুট, তার চোখের চাউনিটা বড্ড রাশভারী আর কঠিন। জ্যাক যখন ক্লারার হাতটা শক্ত করে ধরে ড্রইংরুমে ঢুকল, পুরো ঘরটা এক সেকেন্ডে নীরব হয়ে গেল। ক্লারা নিজের হাতটা জ্যাকের মুঠো থেকে বের করার চেষ্টা করল, কিন্তু জ্যাকের আঙুলগুলোর বাঁধন আরও শক্ত হলো।
আর্থার মিলার নিজের চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন। তার মুখটা কঠিন পাথরের মতো হয়ে গেল। সে সরাসরি জ্যাকের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, থমথমে গলায় বলল, “তাহলে গুজবটা সত্যি, জ্যাক্সন? তুমি লরেঞ্জো পরিবারের সাথে আমাদের এত বড় বিজনেস ডিল নষ্ট করে, এই সাধারণ মেয়েটাকে বিয়ে করেছ?”
জ্যাক খুব অলস ভঙ্গিতে একটা সিঙ্গেল সোফায় বসল, আর ক্লারাকে তার পাশের হাতলটায় বসতে বাধ্য করল। সে খুব সহজ গলায় বলল, “গুজব নয় বাবা, একদম সত্যি। কাগজের সইটা আইনি। আর ও কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, ও এখন মিসেস জ্যাক্সন মিলার। আপনার ছেলের একমাত্র অধিকার।”
লেডি এলিনর এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। তিনি তার সোনার ফ্রেমের চশমাটা ঠিক করে নিয়ে ক্লারার দিকে তাকালেন। তার চোখে রাগ ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত কৌতূহল। তিনি খুব ঠান্ডা গলায় বললেন, “মেয়েটির ব্যাকগ্রাউন্ড কী জ্যাক্সন? বোস্টনের কোনো অভিজাত ফ্যামিলি ওডিশন দিলে তো আমি অন্তত ওর নাম জানতাম।”
ক্লারা এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে নিজের চশমাটা নাকের ওপর একটু সোজা করে নিয়ে সরাসরি লেডি এলিনরের চোখের দিকে তাকিয়ে খুব সাবলীল, শান্ত গলায় বলল, “আমার কোনো বড় ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, ম্যাম। আমি জার্মানির মিউনিখের সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমের মেয়ে। বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে ফিনান্স নিয়ে স্কলারশিপে পড়ছি।” এই একটা বাক্যে পুরো ড্রইংরুমের বাতাস যেন জমে বরফ হয়ে গেল। আর্থার মিলারের ইগোতে চরম চাবুকের আঘাত লাগল।
ডাইনিং টেবিলটা তখন নানা পদের দামী খাবারে সাজান। রোস্টেড ল্যাম্ব, ফ্রেশ সালাদ আর স্প্যানিশ ওয়াইন। কিন্তু চারপাশের মানুষগুলোর মনের ভেতরের ক্ষোভ খাবারের সুগন্ধটাকেও বিষাক্ত করে তুলছে। আর্থার মিলার নিজের কাঁটাচামচটা প্লেটের ওপর সজোরে রাখলেন। একটি ধাতব শব্দ হলো। সে ক্লারার দিকে তাকিয়ে খুব অপমানজনক টোনে বললেন, “অনাথ আশ্রমের মেয়ে? যার নিজের নামের পেছনেু কোনো বংশের পরিচয় নেই, সে মিলার বংশের ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে? জ্যাক্সন, তোমার এই পাগলামির খেসারত কতটা কুৎসিত হতে পারে, তোমার কোনো ধারণা আছে? লরেঞ্জো পরিবার আমাদের স্পেনের পুরো শিপিং বিজনেস ব্লক করে দিতে পারে এক রাতের মধ্যে!” ক্লারা প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটো ফেটে জল আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। আত্মবিশ্বাসী মেয়েদের মতো সে খুব ধীর পায়ে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে আর্থার মিলারের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত কিন্তু ধারালো গলায় বলল, “বংশের পরিচয় মানুষের আসল অহংকার হতে পারে না, মিস্টার মিলার। জোর করে কারো ওপর নিজের স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়াটা যে কত বড় পাপ, সেটা বোধহয় আপনারা টাকার গরমে ভুলে গেছেন। আমি এখানে আপনাদের টাকা বা নাম দেখে আসিনি। আপনার ছেলে আমাকে যেভাবে নিয়ে এসেছে, সেটার জবাব ওই ভগবানের খাতায় জমা আছে।”
“ক্লারা! স্টপ ইট!” আর্থার মিলার হুংকার দিয়ে উঠলেন। তার ফর্সা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেল। ঠিক তখনই জ্যাক নিজের চেয়ারটা এক ঝটকায় পেছনেু সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে টেবিলের ওপর হাত রেখে বাবার একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুব ঠান্ডা, প্রায় ফিসফিসানি গলায় বলল, “আমার স্ত্রীর সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়, সেটা মনে হয় তুমি ভুলে গেছো, বাবা। ও অনাথ হতে পারে, কিন্তু আজ থেকে ও মিলার পরিবারের আসল রানী। ওর দিকে যদি আর একটাও অপমানের শব্দ ছুঁড়ে দেওয়া হয়, তবে লরেঞ্জো পরিবার ডিল ক্যানসেল করার আগেই, আমি নিজের হাতে মিলার কর্পোরেশনের পুরো শেয়ার মার্কেটে বিক্রি করে দেব। মনে রাখবে বাবা, আমি বাস্কেটবল কোর্টের রাজাও হতে পারি, আবার এই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় পিশাচও হতে পারি।”
ড্রইংরুমের বড় দরজাটা ঠিক সেই মূহুর্তেই খুলে গেল। আর সেখান থেকে ভেতরেু ঢুকল ভ্যালেরিয়া লরেঞ্জো। তার পরনে একটা ফার কোট, ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। তার সুন্দর মুখে তখন এক কুৎসিত, বিষাক্ত হাসি। সে হিল জুতো খটখট করে ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সে ক্লারার দিকে এক চরম তাচ্ছিল্যের চোখে তাকিয়ে আর্থার মিলারের দিকে বলল, “আঙ্কেল, আপনার এই অবাধ্য ছেলের অহংকার ভাঙার জন্য লরেঞ্জো পরিবার অলরেডি প্রথম চালটা দিয়ে দিয়েছে। আজ বিকেল পাঁচটায় বোস্টন ব্যাংকের মেইন সার্ভার থেকে মিলার কর্পোরেশনের সব অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নোটিশ পাঠানো হয়েছে। জ্যাকের ওই দামী পেন্টহাউস, ওর কেরিয়ার সবকিছুর লাইসেন্স কিন্তু এখন হোল্ডে আছে।”
ভ্যালেরিয়া জ্যাকের দিকে ঘুরে তাকিয়ে খুব বাঁকা হেসে বলল, “কী গো গোল্ডেন বয়? এবার কোন গাড়িটা চড়ে তোমার এই সস্তা বউকে নিয়ে ঘুরবে? রোলস রয়েসের চাবিটা কিন্তু ব্যাংক অলরেডি ক্লেম করেছে।”
পুরো ডাইনিং হল জুড়ে এক গভীর নীরবতা নেমে এল। ক্লারা চশমার আড়াল থেকে জ্যাকের মুখের দিকে তাকাল। সে ভেবেছিল জ্যাক হয়তো রেগে যাবে বা ভেঙে পড়বে। কিন্তু সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে জ্যাক্সন মিলার বড্ড জোরে হেসে উঠল। সে নিজের পকেট থেকে রোলস রয়েসের দামী চাবিটা বের করে ডাইনিং টেবিলের ওপর ঠক করে ছুঁড়ে দিল। তারপর ক্লারার বরফের মতো ঠাণ্ডা হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় নিয়ে খুব সহজ, সাবলীল গলায় বলল, “টাকার অহংকার বড্ড সস্তা জিনিস, ভ্যালেরিয়া। তোমরা আমার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করতে পারো, কিন্তু জ্যাক্সন মিলারের বাস্কেটবল কোর্টের যোগ্যতা ফ্রিজ করার ক্ষমতা তোমাদের লরেঞ্জোদের নেই। চলো ক্লারা, এই বিষাক্ত ড্রইংরুমের দামী খাবারের চেয়ে আমাদের ওই ছোট খাঁচার কফিটার স্বাদ অনেক ভালো।”
জ্যাক ক্লারাকে সাথে নিয়ে খুব ধীর পায়ে মিলার ম্যানশনের সেই রাজকীয় দরজা পার হয়ে বাইরের অন্ধকার তুষারঝড়ের মধ্যে বেরিয়ে এল। ম্যানশনের পেছনে ফেলে রেখে এল এক বিশাল ভাঙা সাম্রাজ্য আর এক নতুন যুদ্ধের সাইরেন।
চলবে?
#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_14
মিলার ম্যানশনের সেই ঝড়টার পর বোস্টনের রাতটা কেমন যেন আরও বেশি থমথমে হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট এখন পুরোপুরি তুষারে ঢাকা। পেন্টহাউসের ভেতরের ফায়ারপ্লেসের লালচে আলোটা দেয়ালে নাচানাচি করছে। ক্লারা সোফার এক কোণায় কুঁকড়ে বসে আছে। তার গায়ে তখনো সেই সাধারণ অফ-হোয়াইট সোয়েটারটা জড়ানো। তার মনটা বড্ড ভারী। আর্থার মিলারের সেই অপমানজনক কথাগুলো এখনো তার কানে তীরের মতো বিঁধছে। নিজেকে বড্ড সস্তা আর অসহায় লাগছিল তার। জ্যাক ঘরটার এক কোণায় দাঁড়িয়ে একটা কাঁচের গ্লাসে বরফ ঢালছে। তার শরীর থেকে ডার্ক চকোলেট আর কড়া হুইস্কির একটা মিশ্র সুগন্ধ বের হচ্ছে। সে গ্লাসটা হাতে নিয়ে ধীর পায়ে ক্লারার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চুলগুলো কপালে এলোমেলো হয়ে আছে। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “ঠাণ্ডা লাগছে?”
ক্লারা কোনো উত্তর দিল না। সে নিজের হাঁটু দুটো বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে জানালার ওপাশের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। জ্যাক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্লারার খুব কাছে, সোফার ওপর বসল। সে গ্লাসটা সাইড টেবিলে রেখে ক্লারার ফর্সা গালটা নিজের দিকে ফেরাতে চাইল। কিন্তু ক্লারা এক ঝটকায় নিজের মুখটা সরিয়ে নিল এবং নিজের চশমাটা নাকের ওপর আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরল। সে যেন এই কাঁচের আড়ালে নিজেকে জ্যাকের চাউনি থেকে আড়াল করতে চাইছে। জ্যাকের ধূসর চোখ দুটো এক মূহুর্তের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল। সে খুব ধীর পায়ে ক্লারার এত কাছে এগিয়ে এল যে তাদের দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরকে স্পর্শ করছিল। সে নিজের লম্বা আঙুল দিয়ে ক্লারার চশমার ফ্রেমটা আলতো করে ছুঁয়ে খুব নিচু, কাঁপানো গলায় বলল, “তোমার ওই চশমার কাঁচটাকেও আমার মাঝে মাঝে ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করে। ওটা কেন তোমার ওই নীল চোখ দুটোকে আমার চাউনি থেকে আড়াল করে রাখবে?”
ক্লারা চমকে উঠে জ্যাকের চোখের দিকে তাকাল। ক্লারা ফিসফিস করে বলল, “আপনি একটা আস্ত পাগল, মিস্টার মিলার।”
জ্যাক একটু হাসল। সে বলল, “পাগলই সই। এখন চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ো। কাল থেকে আমাদের জীবনটা অন্যরকম হতে যাচ্ছে। আমার এই পতনটাই তো চেয়েছিলে তাই না?”
ক্লারা কিছু বলল না। আপাতত ঝগড়া করার ইচ্ছে নেই। লোকটাকে ঘৃণা করুক আর যাই করুক না কেন সে। তবে এই লোকটা তার জন্য নিজের সব বিসর্জন দিয়েছে। এসব কি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই নাকি অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে?
—
পরদিন সকাল। বোস্টন ব্যাংকের সেই নোটিশটা একদম সত্যি প্রমাণিত হলো। জ্যাকের গোল্ড কার্ড, প্লাটিনাম কার্ড সবকিছু ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকী পেন্টহাউসের নিচে পার্ক করা দামী রোলস রয়েস গাড়িটাও ব্যাংকের লোক এসে নিয়ে গেছে।
ক্লারা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ব্রেড সেঁকছিল। জ্যাকের পরনে আজ কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার। সে খুব অলস ভঙ্গিতে কিচেনের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে কোনো দুশ্চিন্তার রেখা নেই।
ক্লারা কড়াই থেকে রুটিটা প্লেটে নামাতে নামাতে বলল, “আপনার তো সব অ্যাকাউন্ট বন্ধ। পেন্টহাউসটাও নাকি ব্যাংক নিয়ে নেবে শুনলাম। এখন কী করবেন?”
“ব্যাংক নিবে? হা হা হা হাসালে। এসব আমার বাবার কারসাজি। যাতে আমি আমার মত বদলে তার কাছে ফিরত গিয়ে তার সিদ্ধান্ত মেনে নেই।”
“ এখন কি করবেন?”
জ্যাক টেবিলের ওপর রাখা একটা ব্রেড হাতে নিয়ে কামড় দিল। সে খুব নির্বিকার মুখে বলল, “কী আর করব? কেরিয়ারের শুরুতে ট্রেনিংয়ের জন্য ডর্মের সেই সস্তা খাটে ঘুমাতাম, আবার না হয় ওখানেই ফিরে যাব। তবে একটা সুবিধা হয়েছে।”
ক্লারা চশমাটা ঠিক করে বলল, “কী সুবিধা?”
জ্যাক তার খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “আমার কাছে কোনো টাকা নেই মানে তোমার ওই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের জন্য যে লিজের টাকাটা আমি দিয়েছি, ওটা আমার বাবার ক্ষমতাতেও আর বাতিল করার সুযোগ নেই। আইনি ট্রাস্টের টাকা আগেই ট্রান্সফার হয়ে গেছে। তার মানে, তুমি এখন পুরোপুরি আমার খাঁচায় বন্দি।”
ক্লারা ব্রেড সেঁকার চিমটিটা টেবিলের ওপর রেখে দিল। এই ছেলেটার অ্যাকাউন্ট বন্ধ, গাড়ি চলে গেছে, অথচ তার মাথার ভেতর এখনো শুধু ক্লারাকে আটকে রাখার জেদ কাজ করছে! সে বলল, “আজ দুপুরে আমি ইউনিভার্সিটির পেছনের ওই আইরিশ ক্যাফেতে খাব। আমার কাছে মাত্র দশ ডলার আছে। আপনি চাইলে আমার সাথে যেতে পারেন, তবে আপনাকে ওই কমদামি স্যান্ডউইচই খেতে হবে।”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সুন্দর হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “চলো। ৮ নম্বর প্রাইভেট জেট কেনার পর থেকে সস্তা স্যান্ডউইচ খাওয়া হয়নি। আজ ওটার স্বাদ কেমন, দেখা যাক।”
–
আইরিশ ক্যাফেটা বড্ড হিজিবিজি আর ছোট। চারদিকের কাঠের টেবিলগুলো পুরোনো, আর দেয়ালে কান্ট্রি মিউজিকের পোস্টার লাগানো। ক্লারা আর জ্যাক একদম কোণায় একটা টেবিল নিয়ে বসেছিল। জ্যাকের মতো ইউনিভার্সিটির স্টার প্লেয়ার, যে সবসময় দামী রেস্টুরেন্টে খেত, সে আজ একটা ভাঙা চেয়ারে বসে খুব মন দিয়ে পাঁচ ডলারের একটা টুনা স্যান্ডউইচ খাচ্ছে। ক্যাফের অন্য স্টুডেন্টরা তাদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করছে। জ্যাক্সন মিলার এক রাতে নিঃস্ব হয়ে গেছে এই খবরটা অলরেডি ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু জ্যাকের বসার ভঙ্গি বা কথা বলার ধরনে বিন্দুমাত্র দীনতা নেই। সে যেন এখনো এই বোস্টন শহরের অলিখিত রাজা। ক্লারা তার স্যান্ডউইচের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল, “সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আপনার খারাপ লাগছে না?”
জ্যাক স্যান্ডউইচটা প্লেটে রেখে ক্লারার চোখের দিকে তাকাল। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “আমার এই চোখ দুটো শুধু তোমার দিকে তাকাতেই ব্যস্ত, ক্লারা। বাকি দুনিয়া আমার দিকে তাকিয়ে হাসল নাকি কাঁদল, তাতে আমার এক আনাও এসে যায় না। তুমি চশমাটা খোলো তো, স্যান্ডউইচের ধোঁয়ায় কাঁচটা ঝাপসা হয়ে গেছে।”
ক্লারা চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। চশমা ছাড়া তার নীল চোখ দুটো বড্ড নিষ্পাপ আর মায়াবী দেখায়। ঠিক তখনই ক্যাফের দরজা ঠেলে মার্কাস ভেতরেু ঢুকল। মার্কাসের ঠোঁটের ব্যান্ড-এইডটা আজ খুলে ফেলা হয়েছে। সে জ্যাক আর ক্লারাকে একসাথে বসে স্যান্ডউইচ খেতে দেখে থমকে দাঁড়াল। মার্কাসের চোখে রাগ আর দয়া দুটোই একসাথে ফুটে উঠল। সে ধীর পায়ে তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।
মার্কাস জ্যাকের দিকে তাকিয়ে খুব তাচ্ছিল্যের গলায় বলল, “তাহলে গুজবটা সত্যি, মিস্টার মিলার? আপনার বাবা আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন? আর এখন আপনি ক্লারার টাকায় এই সস্তা ক্যাফেতে লাঞ্চ করছেন?”
জ্যাক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। তার মুখের সেই অলস ভাবটা এক সেকেন্ডে চলে গেল, সেখানে এক জমাট বাঁধা অন্ধকার মেঘ এসে ভর করল। সে টেবিলের ওপর রাখা জলের গ্লাসটা ডান হাত দিয়ে এত জোরে চেপে ধরল যে তার হাতের রগগুলো ফুলে উঠল। জ্যাকের চোখ দুটো মার্কাসের ওপর গিয়ে স্থির হলো। সে খুব নিচু গলায় বলল, “আমি সস্তা চেয়ারে বসি আর রাজপ্রাসাদে থাকি তাতে তোমার মতো একটা মাছিকে হিসেব দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না। আর ক্লারা? ও আমার স্ত্রী। আমি ওর টাকায় খাচ্ছি নাকি ও আমার খাঁচায় আছে, তা নিয়ে যদি আর একটা শব্দও তোমার ওই মুখ থেকে বের হয়, তবে কাল বাস্কেটবল কোর্টের খেলাটা তুমি নিজের পা দিয়ে নয়, হুইলচেয়ারে বসে দেখবে।”
“জ্যাক্সন! থামুন!” ক্লারা মাঝখান থেকে চেঁচিয়ে উঠল। সে মার্কাসের দিকে তাকিয়ে বলল, “মার্কাস, তুমি প্লিজ এখান থেকে যাও। ও এখন ঠিক অবস্থায় নেই।” মার্কাস ক্লারার দিকে একবার গভীর কষ্টে তাকিয়ে ক্যাফে থেকে হনহন করে বের হয়ে গেল।
ক্লারা রাগ করে জ্যাকের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি এখনো বদলাননি। আপনার সব চলে গেছে, অথচ আপনার এই হিংস্র অহংকার এখনো যায়নি!”
জ্যাক টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল। সে ক্লারার খুব কাছে এসে তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে ফিসফিস করে বলল, “আমার অহংকার আমার টাকা দিয়ে ছিল না, ক্লারা। আমার অহংকার তুমি। আর আমার এই অহংকারের দিকে যদি অন্য কেউ দয়ার চোখেও তাকায়, তবে তাকে ধ্বংস করতে আমার এক সেকেন্ডও সময় লাগবে না।”
–
সন্ধ্যা নেমে আসতেই বোস্টন শহরটা আবার এক তীব্র তুষারঝড়ের মুখে পড়ল। পেন্টহাউসের হিটারটা কেমন যেন একটু কম কাজ করছে, তাই ঘরের ভেতর বেশ ঠাণ্ডা। জ্যাক ড্রইংরুমের বড় জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার কাঁধে একটা কালো শাল জড়ানো। সে একদৃষ্টে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তুষারপাত দেখছে। ক্লারা নিজের ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর এক কাপ গরম কফি রেখে দিল। সে খুব নরম গলায় বলল, “কফিটা খেয়ে নিন। বাইরে বড্ড ঠাণ্ডা।”
জ্যাক ঘুরে তাকাল। কফির কাপটার দিকে তাকিয়ে সে একটু হাসল। তারপর ধীর পায়ে এসে ক্লারার সামনে দাঁড়াল। সে ক্লারার ফর্সা কপালে আলতো করে নিজের হাতের তালুটা ঠেকাল। ক্লারার শরীরটা একটু কেঁপে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সরিয়ে নিল না। জ্যাকের হাতটা বড্ড গরম আর আরামদায়ক ছিল।
জ্যাক বলল, “জ্বরটা আবার আসেনি তো? শরীরটা কেমন যেন ঠাণ্ডা লাগছে।”
ক্লারা নিচু গলায় বলল, “আমি ঠিক আছি। আপনি কফিটা খেয়ে নিন।”
জ্যাক কফির কাপটা হাতে নিল। সে ক্লারার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “আমার বাবা ভাবছেন আমি ভেঙে পড়ব। কিন্তু তিনি জানেন না বাঘ যখন দু-পা পিছিয়ে যায়, সে আসলে আরও বড় লাফ দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তুমি আমার সাথে এই যুদ্ধে থাকবে তো?”
ক্লারা জানালার ওপাশের অন্ধকার তুষারঝড়ের দিকে তাকাল। তার মনে হলো, এই হিংস্র, অহংকারী ছেলেটার পাশে থাকতে থাকতে সে নিজেও যেন এক অজানা জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। সে কোনো উত্তর দিল না, স্রেফ নিজের চশমাটা নাকের ওপর একটু সোজা করে নিয়ে কফির ধোঁয়ার ওমটা নিজের বুকে জড়িয়ে নিল।
চলবে?

