Home "ধারাবাহিক গল্প "Out Of Bounds Out Of Bounds পর্ব-১৯+২০

Out Of Bounds পর্ব-১৯+২০

0
5

#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_19

সাউথ বোস্টনের ‘ম্যাকল্যারেনস গ্যারেজ অ্যান্ড ক্যাফে’-এর ভেতরের বাতাসটা সবসময় পোড়া তেল, গোলমরিচ আর পুরনো কফির গন্ধে ভারী হয়ে থাকে। এখানে সকাল ছয়টার আগে রোদ আসে না, কিন্তু বুড়ো ও’মালির ফ্রাইং প্যান গরম হয়ে যায় পাঁচটা বাজে। ও’মালি লোকটা অদ্ভুত। তার বাঁ চোখে একটা ছানি আছে, আর ডান কানের লতিটা কোনো এক অজানা গ্যাংওয়ারের সময় অর্ধেক উড়ে গিয়েছিল। সে মুখে সবসময় একটা নিভে যাওয়া চুরুট গুঁজে রাখে। লোকটার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সে খদ্দেরদের মেজাজ দেখায়, কিন্তু ডিম ভাজে চমৎকার। ক্লারা ক্যাফের কাঠের ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। এখানে একসময় সে কাজ করত পার্ট টাইম। পরে সমস্যার কারনে বন্ধ করেছিল, এখন কাজের দরকার তাই আবার আসা। এই লোকের আবার দুনিয়ার সব খবর জানা থাকে। নিশ্চয়ই মিলার, অনাথ আশ্রম নিয়ে যা যা কথা উঠেছে সবই তার এতক্ষণে জানা। সে ঢুকতেই দরজার মাথায় ঝোলানো তামার ঘণ্টাটা বাজল। ও’মালি চুলার পেছন থেকে চোখ তুলে তাকাল। তার হাতে একটা বিশাল লোহার হাতা। সে ধোঁয়ার আড়াল থেকে ডার্ক চকোলেট রঙের ডেনিম পরা মেয়েটিকে দেখে বিরক্তিভরে বলল, “আরে, চশমাওয়ালি খুকি! আজ আবার কী সমস্যা? কাল রাতে কি বোস্টনের তুষার তোমার অনাথ আশ্রমে ধস নামিয়েছে, নাকি কোনো চোর এসে তোমার স্কলারশিপের ফাইল চুরি করে নিয়ে গেছে?”

ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে কাউন্টারের সামনের উঁচু কাঠের স্টুলটায় বসল। তার শরীর থেকে বাইরের হিমশীতল বাতাসের একটা মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে। সে খুব শান্ত গলায় বলল, “মিস্টার ও’মালি, আমার অনাথ আশ্রমে ধস নামেনি। আর চোরেরা স্কলারশিপের ফাইল চুরি করে না, ওগুলো ব্যাংক আর উকিলেরা চুরি করে।”

ও’মালি প্যানের ওপর একটা ডিম সজোরে ভেঙে ছ্যাঁৎ করে ফেলে দিল। প্যানের ধোঁয়া তার মুখটা ঢেকে দিল। সে বলল, “কথা তো ভালোই বলো। তা সকাল সাতটায় সাউথ বোস্টনের এই নোংরা ক্যাফেতে কী মনে করে? আমার কাছে তো কোনো রাজকীয় ব্রেকফাস্ট নেই। আছে দুটো হাফ-সেদ্ধ ডিম আর একটা কড়া কালো কফি, যা খেলে তোমার পেট আর মাথা দুটোই একসাথে জ্বলবে।”

“আমি খেতে আসিনি, মিস্টার ও’মালি। আমি কাজ করতে এসেছি।” ক্লারা ব্যাগ থেকে একটা ছোট নোটবুক বের করে কাউন্টারে রাখল। “আপনার ক্যাফের অ্যাকাউন্টিং বেশ কয়েক মাস ধরে ঝুলে আছে শুনলাম। ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে যেকোনো দিন লোক এসে আপনার এই ওভেন আর ডিমের প্যান সীল করে দিয়ে যাবে।”

ও’মালি চুরুটটা মুখ থেকে বের করে কাউন্টারে একটা থুথু ফেলার মতো ভঙ্গি করল। “আমার ট্যাক্স হিসেব করার জন্য মিউনিখ থেকে আসা কোনো মাস্টার্স ডিগ্রিধারী খুকির প্রয়োজন নেই। আমি কাঁচা পয়সা বুঝি, খাতা বুঝি না।”

ক্লারা নোটবুকটা খুলে খুব সহজ আর যুক্তিসঙ্গত গলায় বলল, “আপনি কাঁচা পয়সা বোঝেন, কিন্তু ক্যাশ বাক্সের তলায় যে ছোট ছিদ্রটা আছে, ওটা বোঝেন না। গত তিন মাসে আপনার ক্যাফেতে যতটা মাংসের কিমা কেনা হয়েছে, প্লেটে তার ৩০ ভাগ কম গেছে। আপনার হেলপার থমাস প্রতিদিন বিকেলে দুই কেজি করে কিমা সস্তা দামে পিছনের গলিতে বিক্রি করে দেয়।”

ও’মালি প্যান হাতে থমকে দাঁড়াল। তার সেই এক চোখ ছোট হয়ে গেল। সে কিছুক্ষণ ক্লারার নীল চোখ দুটোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তারপর প্যানটা উনুনে রেখে বিশাল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“তুমি তো মেয়ে বড্ড খাতারনাক! থমাস যে চুরি করছে, তা তুমি কীভাবে জানলে?”

“হিসেব, মিস্টার ও’মালি,” ক্লারা হালকা একটু হাসল। “হিসেব কোনোদিন মিথ্যা বলে না। মানুষ মিথ্যা বলে, ভাগ্য মিথ্যা বলে, এমনকি মানুষের অনুভূতিও মিথ্যা হয়। কিন্তু অংকের যোগ-বিয়োগ কখনো প্রতারণা করে না। আপনি যদি আমাকে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা আপনার হিসেব মেলানোর কাজ দেন, তবে আমি আপনার চুরির দশগুণ টাকা বাঁচিয়ে দেব। আর বিনিময়ে আমাকে প্রতিদিন দশ ডলার আর দুটো শুকনো স্যান্ডউইচ দেবেন।”

ও’মালি চুরুটটা আবার মুখে চেপে ধরল। সে কাউন্টারের ওপর ঝুঁকিয়া পড়ে খুব নিচু গলায় বলল, “দশ ডলার আর দুটো স্যান্ডউইচ? তা তোমার ওই রাজপুত্র বরটা কী করছে? শুনলাম মিলার ফ্যামিলির সেই গোল্ডেন বয় নাকি এক রাতে ফকির হয়ে গেছে? এখন বউয়ের আট ডলারের স্যান্ডউইচে দিন চলবে?”

ক্লারা চশমার কাঁচটা জামার কোণ দিয়ে মুছতে মুছতে খুব ধীর, গভীর গলায় বলল, “যে মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য কোটি টাকার রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আসার সাহস রাখে, তাকে ফকির বলাটা বড্ড সস্তা মানসিকতা, মিস্টার ও’মালি। সে ফকির নয়, সে স্রেফ নিজের নতুন মূল্য খুঁজছে।”

ও’মালি কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে কাঠের ডেস্কে চাপড় দিল। “ঠিক আছে। সকাল আটটা থেকে এগারোটা। কাজ ঠিকমতো না হলে স্যান্ডউইচের বদলে শুধুই লাঞ্চনা মিলবে।”

ব্রুকলিনের সাউথ এভিনিউয়ের শেষ মাথায় এক পুরোনো গুদামঘরকে রূপান্তর করে বানানো হয়েছে ‘রেড ভাইপার্স বাস্কেটবল ক্লাব’। জায়গাটা বড্ড পুরোনো। কাঠের মেঝে জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে, আর বাস্কেটের বোর্ডটার কাঁচ অনেক আগেই ভেঙে কাঠের তক্তা দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া হয়েছে। চারপাশের বাতাসে সস্তা ঘাম, পুরোনো চামড়ার বল আর স্যাঁতসেঁতে মেঝের একটা বিশ্রী গন্ধ।

ক্লাবের প্রধান কোচ ম্যাক্সিমিলিয়ান বসে ছিলেন একটা প্লাস্টিকের ভাঙা চেয়ারের ওপর। লোকটার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, এক চোখ কাঁচের, আর বাঁ পায়ে একটা ভারী বুট পরা। তিনি একসময় জাতীয় দলে খেলেছিলেন, কিন্তু হাঁটুর রগ ছিঁড়ে যাওয়ার পর থেকে এই নোংরা গুদামঘরে ব্রুকলিনের ছাদহীন, উশৃঙ্খল কিশোরদের বাস্কেটবল শেখান। জ্যাক্সন মিলার যখন ক্লাবের মরচে ধরা লোহা ঘেঁষে ভেতরে ঢুকল, ম্যাক্সিমিলিয়ান তখন হুইসেলটা মুখে পুরে এক উঠতি বালককে চিল চিৎকার করে গালি দিচ্ছিলেন।
জ্যাকের পরনে কালো স্লীভলেস জ্যাকেট আর ট্রাউজার। তার কাঁধে একটা সুতির পুরোনো তোয়ালে। তার সেই ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির সুগঠিত চেহারা আর কপালে নেমে আসা বাদামী চুলগুলো এই স্যাঁতসেঁতে গুদামঘরের বিষণ্ণ পরিবেশের সাথে একেবারেই মানাচ্ছো না। ম্যাক্সিমিলিয়ান থমকে দাঁড়ালেন। তিনি হুইসেলটা মুখ থেকে বের করে এক চোখ টিপে জ্যাকের দিকে তাকালেন।

“আরে! কে এসেছে দেখো! বোস্টন ইউনিভার্সিটির পোস্টার বয়, কোটিপতি মিলার বংশের একমাত্র রাজপুত্র, যাকে টিভিতে দেখার জন্য খবরের কাগজের সাংবাদিকেরা লাইন ধরে! আমার এই নোংরা আস্তানায় কী মনে করে, মিস্টার মিলার? পথ ভুলে কোনো নাইটক্লাবে যেতে গিয়ে এখানে ঢুকে পড়েছো নাকি?”

ক্লাবের দশ-বারোটা লোকাল ছেলে প্র্যাকটিস থামিয়ে জ্যাকের দিকে তাকালে। তাদের চোখে হিংসা আর কৌতুহল। জ্যাক কিন্তু এতটুকু দমে গেল না। সে পকেটে হাত দিয়ে খুব সহজ, অলস ভঙ্গিতে কোচের দিকে এগিয়ে গেল।

“আমি পথ ভুলিনি, কোচ ম্যাক্সিমিলিয়ান। আমি কাজ খুঁজতে এসেছি।”

ম্যাক্সিমিলিয়ান যেন আকাশে মেঘ না চাইতেই বজ্রপাত শুনলেন। সে বিকট শব্দে হেসে উঠল। “কাজ? আমার এই ভাঙা ক্লাবে কাজ করবে বোস্টনের গোল্ডেন বয়? তোমাকে দেয়ার মতো কোনো দামী গোল্ডেন ট্রফি তো আমার এখানে নেই, ছোকরা!”

“আমার ওসব লাগবে না,” জ্যাক বাস্কেটবল র‍্যাক থেকে একটা পুরোনো, চামড়া ওঠা বল নিজের ডান হাতে তুলে নিল। বলটা তার আঙুলের ডগায় এক মূহুর্তে চড়কার মতো ঘুরতে শুরু করল। সে বলটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল, “আমাকে আপনার টিমের জুনিয়র ছেলেদের সাথে স্কিল ড্রিল করানোর কাজ দিন। প্রতিদিন তিন ঘণ্টা। বিনিময়ে আমাকে কোনো কোটি টাকা দিতে হবে না, স্রেফ আপনার ক্লাবের পুরোনো শাওয়ার রুমটা ব্যবহার করতে দেবেন আর ক্যাশে যা পারেন দেবেন।”

ম্যাক্সিমিলিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার কাঁচের চোখটা যেন আরও ভয়ংকর দেখাল। সে ধীর পায়ে জ্যাকের সামনে এসে দাঁড়াল।

“তোমার বাবা তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন, তাই না? বড় ঘরের পাপা’স বয়রা প্রথম ধাক্কাতেই ধসে পড়ে। তুমিও দুই দিনে পালিয়ে যাবে, মিলার।”

জ্যাক বলটা হঠাৎ হাওয়ায় ছুঁড়ে দিয়ে একদম নিখুঁত থ্রি-পয়েন্টার শটে সেই ভাঙা ঝুড়ির ভেতর গলিয়ে দিল। বলটা জালের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় শব্দ হলো। জ্যাক ম্যাক্সের একদম চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, থমথমে গলায় বলল, “আমি পালিয়ে যাওয়ার লোক নই, কোচ। আর বাস্কেটবল কোনো বাপের টাকায় খেলা যায় না, ওটা খেলতে গেলে বুকের ভেতরে একটা কলিজা লাগে। আপনার ছেলেদের প্র্যাকটিস করানোর মেজাজ আমার আছে।”

ম্যাক্সিমিলিয়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর তার সেই রুক্ষ মুখে এক চিলতে কঠিন হাসি ফুটে উঠল।

“ঠিক আছে। কিন্তু কোনো সুবিধা পাবে না। জল তোমাকে পাম্পের থেকে নিজেকে তুলে খেতে হবে, আর ক মেঝে ঝাড়ু দেওয়াটাও কোচের কাজের অংশ। রাজি?”

জ্যাক তার জ্যাকেটের হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিল। “শীটটা দিন কোচ। প্র্যাকটিস কোন সময় থেকে শুরু?”

দুপুরের রোদটা ইউনিভার্সিটির কাঁচের বিল্ডিংয়ের ওপর এসে পড়লেও বাতাসটা বড্ড হিমশীতল। বোস্টন ইউনিভার্সিটির মেইন লবির মাঝখানে চারদিকের স্টুডেন্টদের যাতায়াত। ক্লারা নিজের ফিনান্সিয়াল মডেলিংস ক্লাসের ফাইলপত্র বগলে চেপে লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিল। তার চশমাটা নাকের ওপর খানিকটা নেমে এসেছে। আজ সারা সকাল ও’মালির নোংরা খাতা সামলানোর পর তার শরীরটা বেশ ক্লান্ত। হঠাৎ তার পথের সামনে এসে দাঁড়াল মার্কাস। মার্কাসের পরনে একটা দামী চামড়ার জ্যাকেট, চুলগুলো নিখুঁতভাবে জেল দিয়ে সামলানো। তার ডান হাতে একটা ছোট কাঁচের তোড়া, যাতে গোটা চারেক লাল টিউলিপ ফুল। ফুলের ডগাগুলো রোদে চকচক করছে। মার্কাস সমবেদনাভরা গলায় বলল, “ক্লারা… কেমন আছো? তোমার খবর তো সারা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছে।”

ক্লারা থামল। সে চশমাটা সোজা করে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আমার খবর ছড়িয়ে পড়ার মতো এমন কিছু হয়নি, মার্কাস। আর আমি খুব ভালো আছি।”

মার্কাস হাতের ফুলের তোড়াটা ক্লারার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে এক পা এগিয়ে এলো। “আমি জানি তুমি কেমন আছো, ক্লারা। ওই অহংকারী, বর্বর লোকটার সাথে তুমি যে কী কষ্টে আছো, তা আমি বুঝতে পারি। জ্যাক্সন মিলার তো এক রাতে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এখন শুনলাম সে নাকি রাস্তার কোনো সস্তা জিমে গিয়ে কুলিগিরি করছে! তুমি কেন নিজের জীবনটা ওই ভবঘুরের সাথে নষ্ট করছো?”

ক্লারা মার্কাসের দিকে তাকাল। তার নীল চোখ দুটো যেন এক মুহূর্তে জমাট বরফ হয়ে গেল। সে ফুলের তোড়াটার দিকে একবারও চোখ তুলে তাকাল না।

“তোমার ফুলগুলো বড্ড তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যাবে, মার্কাস,” ক্লারা খুব শান্ত, কিন্তু ব্লেডের মতো ধারালো গলায় বলল। “কারণ এগুলো কেনা হয়েছে অন্যের ওপর দয়া দেখানোর নোংরা মানসিকতা থেকে।”

মার্কাস থমকে গেল। “দয়া? আমি তো তোমাকে ভালোবাসতাম, ক্লারা! আমি তোমার জন্য সবকিছু করতে পারি!”

“ভালোবাসা?” ক্লারা একটু হাসল। “ভালোবাসা কী জিনিস, তা তুমি কোনোদিন শিখতে পারোনি, মার্কাস। যে মানুষটা নিজের বাবার কোটি টাকার সাম্রাজ্য, গোল্ড কার্ড আর কোটিপতি জীবন স্রেফ একটা অনাথ আশ্রমে বাচ্চাদের মাথার ওপরের ছাদ বাঁচানোর জন্য এক মুহূর্তে পায়ে ঠেলে ফেলে দিতে পারে সেই মানুষটার নাম জ্যাক্সন মিলার। সে ভবঘুরে হতে পারে, কিন্তু তার হৃদয়ের যে বিশালতা, ওটা কিনতে গেলে তোমার পুরো পরিবারের সম্পত্তিও কম পড়ে যাবে।”

চারপাশের কয়েকজন স্টুডেন্ট ততক্ষণে তাদের কথা শোনার জন্য গতি কমিয়ে দিয়েছে। মার্কাস অপমানে ফ্যাকাশে হয়ে বলল, “তুমি এক রাত ওর ওই ভাঙা ডর্ম রুমে থেকে ওর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গেছো, তাই না?”

ক্লারা তার ফাইলগুলো বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরে সোজা মার্কাসের চোখের দিকে তাকাল।
“আমি অন্ধ হইনি, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। যে ছেলেটা আমাকে কোটি কোটি টাকার ভিড়ে আটকে রাখতে চায়নি, কিন্তু নিজের শেষ কুড়ি ডলার পকেটে নিয়ে আমার সাধারণ ডর্মের ছোট্ট খাটে কোনো জোর না করে শান্ত হয়ে শুয়ে থাকতে পারে তার ভালোবাসাকে সম্মান করার মতো চোখ আমার আছে। তোমার এই সস্তা দয়ার টিউলিপগুলো নিয়ে এবার তুমি সরতে পারো, আমার ক্লাসের দেরি হচ্ছে।”
ক্লারা মার্কাসকে একপাশে ঠেলে পার হয়ে গেল। তার হাঁটার ভঙ্গিতে এক ফোঁটা দ্বিধা নেই। মার্কাস বোকার মতো হাত বাড়িয়ে সেই সস্তা ফুলের তোড়া হাতে করিডোরের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে রইল।

সন্ধ্যা সাতটা। ডর্ম রুমের ভেতরের ঘরটা ছোট স্টাডি ল্যাম্পের লালচে আলোয় উষ্ণ হয়ে উঠেছে। বাইরে ততক্ষণে আবার হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে। জানালার কাঁচের বাইরে বরফের কণাগুলো আছাড় খেয়ে পড়ছে। ক্লারা ঘরের ছোট মেঝেতে বসে একটা প্লাস্টিকের থলে থেকে পাঁচ ডলারের কেনা সামান্য কিছু শুকনো চাল, দুটো পেঁয়াজ আর এক পোয়া মুসুর ডাল বের করছিল। তার সোয়েটারের হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটানো। সে খুব সাবধানে একটা ছোট পাত্রে ডাল ভিজিয়ে রাখার ব্যবস্থা করছে। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ক্লারা দরজা খুলতেই ঘরের ভেতরেু হুড়মুড় করে ঢুকে এলো বাইরে তুষারের তীব্র গন্ধ। জ্যাক দাঁড়িয়ে আছে।
তার চুলগুলো কপালে ভেজা হয়ে লেপ্টে আছে, জ্যাকেটের কাঁধে সামান্য বরফ জমেছে। সারা দিন ব্রুকলিনের ভাঙা মেঝের কঠিন প্র্যাকটিস শেষে তার চোখ দুটো বড্ড ক্লান্ত। জ্যাক ঘরে ঢুকেই জ্যাকেটের পকেটে হাত দিল। সে কোনো কথা বলল না। স্রেফ নিজের ডান হাতটা বের করে ক্লারার সামনে মেলে ধরল। তার হাতের চেটোয় ভাঁজ হয়ে থাকা পঞ্চাশ ডলারের একটা মচমচে নতুন সবুজ কাগুজে নোট।
ক্লারা ডালের পাত্রটা হাতে নিয়ে হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসেই স্তব্ধ হয়ে গেল। সে একবার নোটটার দিকে তাকাল, তারপর একদৃষ্টে জ্যাকের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকাল। জ্যাক একটু লাজুক, খামখেয়ালী ভঙ্গিতে হাসল। সে খুব নিচু, কাঁপানো গলায় বলল, “আজ সারা দিন ব্রুকলিনের ওই নোংরা গুদামঘরের পনেরোটা অবাধ্য ছেলেকে বাস্কেট ড্রিল করালাম। কোচ ম্যাক্সিমিলিয়ান সন্ধ্যাবেলায় খামের বদলে এই মচমচে নোটটা আমার হাতে ছুঁড়ে দিল। এই প্রথম নিজের গায়ের ঘাম বেচে কোনো টাকা পেলাম, মিস ক্যালকুলেটর। তোমার এই ডাল-ভাতের চাল কেনার জন্য কি এটা যথেষ্ট?”

ক্লারা ধীরেু ধীরে মেঝের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চশমার আড়ালে নীল চোখ দুটো হঠাৎ এক অদ্ভুত জলে থলথল করে উঠল। যে ছেলেটা তার জীবনের ২৪ বছরে কোনো দিন জানতো না নিজের উপার্জিত এক ডলারের অনুভূতি কী, যার একটা ঘড়ির দাম ছিল পঞ্চাশ হাজার ডলার সে আজ পঞ্চাশ ডলারের একটা সস্তা নোট এনে কোনো এক মহাকাব্যের বিজয়ের মতো তার সামনে তুলে ধরেছে!
ক্লারা নোটটা হাত বাড়িয়ে নিল না। সে স্রেফ খুব নরম গলায় বলল, “আপনি হাত-মুখ ধুয়ে আসুন, মিস্টার মিলার। আপনার হাত দুটো বড্ড নোংরা হয়ে আছে।”

জ্যাক নোটটা রিডিং টেবিলের ওপর সযত্নে রাখল, যেন ওটা কোনো সাধারণ কাগজ নয়, দুনিয়ার সবচেয়ে দামী হিরে। সে বাথরুমের দিকে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি কাঁদছো কেন, ক্লারা? পেন্টহাউস হারানোর জন্য তো একদিনও এক ফোঁটা জল ফেললে না, আর এই পঞ্চাশ ডলার দেখে চোখ ভেজাচ্ছ?”

ক্লারা চশমাটা খুলে তার সোয়েটারের কোণ দিয়ে চোখ দুটো আলতো করে মুছে নিয়ে বলল, “আমি কাঁদছি না। ডালের মধ্যে এক ফোঁটা জল পড়েছিল, ওটাই ছিটকে চোখে লেগেছে। আপনি গিয়ে মুখ ধুন।”

জ্যাক মৃদু হেসে বাথরুমে ঢুকে গেল। ক্লারা টেবিলের ওপরে রাখা সেই নতুন পঞ্চাশ ডলারের নোটটার ওপর নিজের দুটো আঙুল বোলালো। তার মনে হলো জীবনের আসল সাকসেস কোটি টাকার ব্যাংকে থাকে না, ওটা থাকে নিজের ঘাম ঝরিয়ে আনা সস্তা একটা কাগজের নোটে।

রাত গভীর। বাইরে বরফঝড় থামেনি, বাতাসটা একটানা জানালার গাছে সোঁ সোঁ শব্দ করে ধাক্কা দিচ্ছে। ডর্ম রুমের ছোট মেহগনি কাঠের টেবিলটার ওপর একটা পেন্সিল, দুটো ক্যালকুলেটর আর কয়েকটা সাদা রুল টানা খাতা ছড়ানো। স্টাডি ল্যাম্পের একমাত্র আলোয় ঘরের একপাশে তাদের দুজন ছায়া বিশাল হয়ে দেয়ালে কাঁপছে।

জ্যাক একটা চেয়ার টেনে বসে আছে। তার পরনে একটা ধূসর ট্রাউজার আর সাধারণ টি-শার্ট। তার এক হাতে কফির মগ, অন্য হাতে একটা পেন্সিল। সে খুব মন দিয়ে ক্লারার আঁকা ফিনান্সিয়াল মডেলের ছকটা দেখছিল। ক্লারা অন্য চেয়ারে বসে নিজের চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে বলল, “আমাদের এই নতুন আইডিয়ার নাম হবে ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার কনসালটেন্সি’। বোস্টনের ছোট ছোট ব্যবসায়ী, যারা বড় ট্যাক্স ফার্মে কোটি টাকা দিতে পারে না আমরা তাদের খুব কম চার্জে আইনি আর ফিনান্সিয়াল রি-স্ট্রাকচারিং করে দেব।”

জ্যাক পেন্সিলটা দিয়ে টেবিলে ঠকঠক করে আঘাত করে বলল, “বেনেট অ্যান্ড মিলার? মিলার অ্যান্ড বেনেট না কেন, মিস ক্যালকুলেটর? ব্যবসার ব্রেইন কিন্তু আমার।”

ক্লারা চশমার ওপর দিয়ে সরাসরি জ্যাকের ধূসর চোখের দিকে তাকাল। সে খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, “বেনেট নামটা আগে থাকবে, কারণ রেজিস্ট্রি ফাইলিংয়ের চার্জটা আমার এই ক্যাফেটেরিয়ার জমানো টাকা থেকে যাবে। যে টাকা দেবে, তার নাম আগে থাকবে এটাই ফিনান্সের প্রথম নিয়ম, মিস্টার মিলার।”

জ্যাক এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেল। তারপর সে হা-হা করে হেসে উঠল। “তুমি বড্ড সাংঘাতিক মেয়ে, ক্লারা! নিজের বরের থেকেও ব্যবসার হিসেব বুঝে নাও?”

“আপনি এখনো আমার অফিশিয়াল বর নন,” ক্লারা পেন্সিল দিয়ে খাতার একটা জায়গায় গোল দাগ দিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল। “আমরা একটা আইনি শর্তের ফাঁদে বন্দি দু’জন মানুষ। আমাদের মধ্যে কোনো ভালোবাসা নেই, কোনো অধিকার নেই।”

জ্যাকের মুখের সেই হাসির রেখাটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল। সে পেন্সিলটা টেবিলের ওপর রেখে ক্লারার খুব কাছে ঝুঁকে এল। ল্যাম্পের আলোয় জ্যাকের ধূসর চোখ দুটোয় তখন এক অদ্ভুত, নিঃশব্দ আলো জ্বলছিল। সে ভারী গলায় বলল, “অধিকার নেই? আজ সকালে মার্কাস যখন তোমার দিকে ফুলের তোড়া বাড়িয়ে দিয়েছিল, তখন তুমি তাকে যে জবাবটা দিয়েছ ওটা কি স্রেফ আইনি শর্তের কথা ভেবে দিয়েছ, ক্লারা?”

ক্লারা চমকে উঠে জ্যাকের চোখের দিকে তাকাল। তার বুকটা বড্ড জোরে ধড়ফড় করতে শুরু করল। “আপনি… আপনি কীভাবে জানলেন?”

“আমি করিডোরের পেছনের পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়েছিলাম,” জ্যাক খুব নরম ভঙ্গিতে বলল। সে তার লম্বা আঙুল দিয়ে ক্লারার চশমার ফ্রেমটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। “যে মেয়েটা হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আমার সম্মান বাঁচাতে পারে, নিজের বুনো রাগ চেপে মার্কাসকে হারিয়ে দিতে পারে সে বলে আমাদের মধ্যে অধিকার নেই?”

ক্লারা কোনো কথা বলতে পারল না। তার নীল চোখ দুটো যেন চশমার আড়ালে হারিয়ে গেল। জ্যাক খাতাটা বন্ধ করে দিল। সে কফির কাপটা একপাশে সরিয়ে রেখে ক্লারার হাতের ওপর নিজের শক্ত, উষ্ণ হাতটা রাখল। “কাল থেকে আমাদের এই ‘বেনেট অ্যান্ড মিলার’ ফার্মের নতুন যুদ্ধ শুরু হবে, ক্লারা। আমার হাতে টাকা নেই, কিন্তু আমার সাথে তুমি আছো। আর তোমার এই ক্যালকুলেটর ব্রেইন আর আমার বাস্কেটবল স্কিল মিলে আমরা বোস্টন শহরের নতুন ইতিহাস লিখব।”

ক্লারা জানালার ওপাশের অন্ধকার আর দূর নক্ষত্রের আলোর দিকে তাকাল। সে নিজের হাতটা জ্যাকের মুঠো থেকে সরিয়ে নিল না।

চলবে?

#Out_Of_Bounds
#ishrat_jahan_jarin
#part_20

বোস্টন ইউনিভার্সিটির ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের পেছনের মেল-রুমে একটা পুরোনো পেণ্ডুলাম ঘড়ি ঝুলে আছে। ঘড়ির কাঁটা প্রতিবার নড়লে একটা ভারী শব্দ হয়। পোস্টম্যান হ্যান্সেন লোকটির বয়স ষাটের কাছাকাছি। মাথায় একটা উলের টুপি, আর মুখে সবসময় একটা মেজাজী ভাব। পঁচিশ বছর ধরে সে এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে চিঠি বিলায়। বৃষ্টির দিন হোক বা তুষারঝড় হ্যান্সেনের টুপি আর চামড়ার ব্যাগ ভুল হয় না। ক্লারা লবির শেষ কোণায় একটা কাঠের বেঞ্চে বসে নিজের ফিনান্সিয়ালের খাতাগুলো গুছিয়ে রাখছে। হ্যান্সেন তার বিশাল চামড়ার থলে থেকে হালকা হলুদ রঙের একটা খাম বের করে ক্লারার দিকে বাড়িয়ে দিল। খামের ওপর লাল রঙের একখান সিল মার, “সেন্ট মার্থা অয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, মিউনিখ, জার্মানি’।”

“জার্মানি থেকে এসেছে, মিস বেনেট। অফিশিয়াল রেজিস্ট্রি মেল। এয়ার মেইলের স্ট্যাম্প দেখে মনে হচ্ছে বেশ জরুরি,” হ্যান্সেন খুব রুক্ষ গলায় বলল, তবে তার চোখে একটা হালকা কৌতূহল ছিল।

ক্লারা খামটা হাতে নিল। তার হাত দুটো হঠাৎ কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। সে সাবধানে খামের মুখটা ছিঁড়ে ভেতরে থেকে দু-পৃষ্ঠার একটা আইনি নোটিশ বের করল। নোটিশটির ভাষা জার্মা। চিঠিটি লিখেছেন আশ্রমের প্রবীণ আইনজীবী মিস্টার ক্রাউস। প্রথম ছত্রেই লেখা,

প্রিয় ক্লারা, অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে গত সপ্তাহে আমাদের প্রিয় সিস্টার মার্গারেট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তার মৃত্যুর পরেই মিউনিখের মিউনিসিপ্যালিটি আর স্থানীয় ল্যান্ড গ্র্যাবাররা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সিস্টার মার্গারেটের সই করা চুক্তিপত্রের এক বছরের লিজের মেয়াদ আগামী চার দিনের মধ্যে শেষ হচ্ছে। যদি এই চার দিনের মধ্যে তিন হাজার ইউরো (প্রায় চার হাজার ডলার) বকেয়া ট্যাক্স ও লিজের নবায়ন ফি জমা না দেওয়া হয়, তবে তারা আশ্রমের জমি বাজেয়াপ্ত করবে এবং পঁচিশটি বাচ্চাকে সরকারি এতিমখানায় পাঠাবে। তুমি সশরীরে মিউনিখে না এলে এই আইনি ফাইল খোলা সম্ভব নয়।”

ক্লারা চিঠিটা বুকের সাথে চেপে ধরে কাঠের বেঞ্চে বসে রইল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। সিস্টার মার্গারেট নেই! যে মহিলা তাকে ছোটবেলায় বরফের রাতে কোটে জড়িয়ে ডাল-রুটি খাইয়েছিলেন, যিনি তার চশমার প্রথম ফ্রেমটা কিনে দিয়েছিলেন সে মানুষটা আজ আর দুনিয়ায় নেই। আর তার চেয়েও বড় কথা, সেই অনাথ বাচ্চাদের মাথার ওপরের ছাদটা ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। ঠিক তখনই করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় ডক্টর ওয়াটসন। ফিনান্সিয়াল ল-এর প্রবীণ প্রফেসর থামলেন। তিনি ক্লারার ফ্যাকাশে মুখ দেখে এগিয়ে এলেন। “কী হয়েছে, মিস বেনেট? তোমাকে এত বিমর্ষ দেখাচ্ছে কেন?”

ক্লারা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে চিঠিটা ডক্টর ওয়াটসনের হাতে দিল। ডক্টর ওয়াটসন চশমার উপর দিয়ে চিঠিটা পড়ে নিচু গলায় বললেন, “সেন্ট মার্থা ট্রাস্ট? কিন্তু ক্লারা, এই ল্যান্ড গ্র্যাবার কোম্পানির রেজিস্ট্রি নম্বরটা দেখো… ‘এলএম হোল্ডিংস’। এ তো মিউনিখের কোনো সাধারণ কোম্পানি নয়। এটা তো ইউরো-ইউরোপিয়ান শিপিং গ্রুপের একটা শাখা, যার মাদার কোম্পানির অর্ধেকের বেশি শেয়ার রয়েছে আমাদের বোস্টনের ‘মিলার কর্পোরেশন’-এর হাতে!”

ক্লারা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরের রক্ত যেন মুহূর্তের মধ্যে ঠান্ডা হয়ে এলো। আর্থার মিলার! জ্যাকের বাবা! সে শুধু বোস্টনে নয়, মিউনিখের মাটিতেও অনাথ আশ্রমের জমি কাড়ার চাল ছেলেটিকে সোজা করার জন্য অনেক আগেই সাজিয়ে রেখেছিলেন!

ব্রুকলিনের সাউথ গলির বাইরে তখন প্যাঁচপ্যাচে কাদা আর হিমশীতল বৃষ্টি পড়ছে। গলির কোণে একটা পুরনো কাঠের সাইনবোর্ড ঝুলছে, ‘রেড ভাইপার্স জিম’। ভেতরেু স্যাঁতসেঁতে মেঝের ওপর বাস্কেটবল ড্রিল চলছে। জ্যাক্সন মিলার তখন কোর্টের মাঝখানে একাকী পুশ-আপ দিচ্ছিল। তার পিঠ বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল। গায়ের কালো সুতির জামাটা ঘামে ভিজে শরীরের সাথে সেটে আছে। ক্লারা ভিজে কোট গায়ে দিয়ে জিমের দরজায় এসে দাঁড়াল। সে কিন্তু কেঁদে কেটে ব্যাকুল হয়ে জ্যাকের কাছে যায়নি। সে একদম সোজা, স্থির পায়ে গিয়ে জ্যাকের সামনে দাঁড়াল। জ্যাক পুশ-আপ থামিয়ে মুখ তুলে তাকাল। ক্লারার ভিজে চুল আর চশমার ওপর জলের ফোঁটা দেখে সে এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে পড়ল।

“কী হয়েছে, ক্লারা?” সে গামছা দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে খুব থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল।

ক্লারা ব্যাগ থেকে সেই মিউনিখের চিঠি আর ট্যাক্সের কাগজগুলো বের করে জ্যাকের হাতে দিল। খুব সহজ, কিন্তু ব্লেডের মতো ধারালো গলায় বলল, “আপনার বাবা অত্যন্ত চতুর মানুষ, মিস্টার মিলার। সে শুধু আপনার ক্রেডিট কার্ড লক করেই ক্ষান্ত হননি, মিউনিখের সেন্ট মার্থা অনাথ আশ্রমটা গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য উনার ইউরোপিয়ান কোম্পানিকে লেলিয়ে দিয়েছেন। চার দিনের সময় আছে। পাঁচ হাজার ডলার আর দুজন মানুষের ফ্লাইটের টিকিট দরকার। না হলে পঁচিশটা অনাথ বাচ্চা গৃহহীন হবে।”

জ্যাক চিঠির ওপর এক নজর চোখ বুলালো। তার ধূসর চোখ দুটো রাগে ও ঘৃণায় ছোট হয়ে এলো। তার বাবার এই নোংরা চালটা তার রক্তকে এক মুহূর্তে ফুটিয়ে তুলল। কোচ ম্যাক্সিমিলিয়ান প্লাস্টিকের চেয়ারটায় বসে চুরুট টানছিলেন। সে চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “পাঁচ হাজার ডলার? চার দিনে? বোস্টনের ব্যাংক তো তোমার পকেটে এক সেন্টও দেবে না, মিলার। এই টাকা জোগাড় করা অসম্ভব।”

জ্যাক বলটা হাত দিয়ে সজোরে মেঝেতে ট্র্যাপ করল। সে কোচ ম্যাক্সিমিলিয়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে খুব ঠান্ডা, একরোখা গলায় বলল, “অসম্ভব বলে কিছু নেই, কোচ। সাউথ বোস্টনের সেই আন্ডারগ্রাউন্ড নাইট-লিগ বাস্কেটবল টুর্নামেন্টের এন্ট্রি ফি কত?”

ম্যাক্সিমিলিয়ান থমকে গেলেন। সে কাঁচের চোখটা ছোট করে বললেন, “তুমি ওই কসাইখানায় নামবে? ওখানে কোনো রেফারি ফাউল ধরে না, ছোকরা। পা ভেঙে বাড়ি ফিরতে হবে।”

“আমি পা ভেঙে ফিরব নাকি বাস্কেট গলিয়ে ফিরব, ওটা আমার ব্যাপার।” জ্যাকের গলায় এক বিধ্বংসী রাজকীয় অহংকার ফিরে এলো। “উইনিং প্রাইজ কত?”

“তিন হাজার ডলার ক্যাশ।” ম্যাক্সিমিলিয়ান বললেন।

জ্যাক ক্লারার দিকে তাকাল। “তিন হাজার ওখান থেকে আসবে। বাকি দু-হাজার?”

বিকেল সাড়ে চারটে। সাউথ বোস্টনের ‘ম্যাকল্যারেনস ক্যাফে’। বাইরে বৃষ্টি থামলেও আকাশজুড়ে কুৎসিত ধূসর মেঘ। ক্যাফের কাউন্টারে ও’মালি নিজের প্যানের ওপর পেঁয়াজ কুচি ভাজছে।
ক্লারা ক্যাফের কাঠের টেবিলে গিয়ে বসল। তার সামনে তার স্কলারশিপের স্ক্যাচ বই আর একটা ছোট মোড়ক। সে মোড়কটা খুলে কাউন্টারে রাখল। ওটার ভেতরেু ছিল একটা ছোট রূপোর আংটি সিস্টার মার্গারেট তাকে মিউনিখ ছাড়ার সময় দিয়েছিলেন।

“মিস্টার ও’মালি, আমার এই আংটিটা খুব পুরোনো রূপোর। আর আমার ক্যাফেটেরিয়ার জমানো চারশো ডলার আছে। আপনি কি আমাকে এটা বন্ধক রেখে আর আমার আগামী তিন মাসের কাজের অ্যাডভান্স হিসেবে এক হাজার ডলার দিতে পারেন?”

ও’মালি প্যান হাত থেকে নামিয়ে রাখল। সে চুরুটটা মুখ থেকে বের করে ক্লারার চোখের দিকে তাকাল।

“এক হাজার ডলার? তা কী হবে এত টাকা দিয়ে? তোমার সেই রাজপুত্র বর আবার কোন দামী ওয়াইন কিনতে চাচ্ছে?”

ক্লারা একটুও রেগে গেল না। সে চশমাটা সোজা করে খুব ধীর, গভীর গলায় বলল, “মিউনিখের সেই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের মাথার ওপরের ছাদটা কাড়তে চেয়েছেন এক কোটিপতি। আমাকে আর ওকে চার দিনের মধ্যে মিউনিখ পৌঁছাতে হবে। আংটিটা আমার একমাত্র সম্বল, মিস্টার ও’মালি।”

ও’মালি চুরুটের ছাই ঝেড়ে কাউন্টারের তলা থেকে তার কালো স্টিলের ক্যাশ বাক্সটা টেনে বের করল। সে খসখস করে ক্যাশ বাক্স খুলে একশো ডলারের দশটা মচমচে নোট বের করে ক্লারার সামনে ধপাস করে ছুঁড়ে মারল। আর রূপোর আংটিটা তুলে নিয়ে ক্লারার কোটের পকেটে জোর করে গুঁজে দিল।

“আংটি বন্ধক দিতে আসবে না, খুকি! সাউথ বোস্টনের বুড়ো ও’মালি এখনো অতটা মরেনি যে একটা অনাথ মেয়ের রূপোর আংটি বন্ধক রেখে টাকা দেবে,” ও’মালি চোখ রাঙিয়ে চঁচিয়ে উঠল। “টাকাটা আমি আমার ক্যাফের তিন বছরের ট্যাক্সের কাজের মজুরি হিসেবে দিলাম। ফেরত এসে যদি আমার খাতার হিসেব এক সেন্ট এদিক-ওদিক হয়, তবে পুলিশ ডেকে জেলে দেব!”

ক্লারা স্তব্ধ হয়ে গেল। বুড়ো ও’মালির এই কর্কশ চেহারার পেছনে লুকিয়ে থাকা সহজ মনুষ্যত্বটা দেখে তার চোখের কোণায় জল এসে গেল। সে খুব নিচু গলায় বলল, “ধন্যবাদ, মিস্টার ও’মালি। আমি একটা সেন্টের হিসাবও ভুল হতে দেব না।”

তিনদিন পর। সাউথ বোস্টনের এক পরিত্যক্ত টেক্সটাইল মিলের বেসমেন্ট। আগের টাকার সাথে ক্লারা তার সকল সেভিংস দিয়ে টাকার ব্যবস্থা করেছে। জ্যাকের পরিচিত লোক থাকায় টিকিট পেতেও সময় লাগেনি। চারপাশে লাল আর হলুদ বাতির ধোঁয়াশা। শত শত উশৃঙ্খল জুয়াড়ি, স্থানীয় গ্যাংস্টার আর শৌখিন দর্শকেরা লোহার গ্রিল ধরে চিৎকার করছে। মাঝখানের মেঝের কাঠগুলো পুরনো ও পিচ্ছিল। এখানে বাস্কেটবল খেলা হয় না, এখানে হাত-পা ভাঙার যুদ্ধ হয়। প্রতিপক্ষ টিমের নাম ‘সাউথ বোস্টন বুলস’। টিমের ক্যাপ্টেন ব্রুনো ছয় ফুট পাঁচ ইঞ্চির এক জল্লাদমার্কা প্লেয়ার, যার শরীরে অজস্র ট্যাটু। জ্যাক প্র্যাকটিস টি-শার্ট পরে কোর্টে নামল। তার সাথে ছিল ব্রুকলিনের সেই তিনটে সাধারণ লোকাল ছেলে। ক্লারা দর্শকদের গ্যালারির একদম পেছনের এক লোহার রডের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপছে।। খেলার প্রথম দশ মিনিটেই ব্রুনো হিংস্রভাবে জ্যাককে কনুই দিয়ে সজোরে আঘাত করল। জ্যাক মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। তার ডান চোখের কোণ কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। দর্শক গ্যালারিতে তখন বিকট উল্লাস। ক্লারা চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। জ্যাক মেঝের ওপর এক হাঁটু গেড়ে বসল। সে তার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের কোণের জমাট রক্তটুকু মুছে নিল।
সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পরের দশ মিনিটে সাউথ বোস্টনের সেই বেসমেন্ট এক ইতিহাস দেখল। জ্যাকের ফাস্ট-ব্রেক, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং আর থ্রি-পয়েন্টারের ঝড়ে প্রতিপক্ষ পিষে গেল। ব্রুনো তাকে দু-বার ফাউল করে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেও ছুঁতে পারল না। খেলার শেষ পাঁচ সেকেন্ডে জ্যাক তিন জনের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে সজোরে বলটা বাস্কেটের রিংয়ে ড্যাঙ্ক করল। স্কোরবোর্ড জানান দিল: ৪৫ – ৩৮। জ্যাক্সন মিলার ম্যাচ জিতে নিয়েছে! ম্যাচ শেষে কোচ ম্যাক্সিমিলিয়ান তিন হাজার ডলারের রক্তের দাগ লাগা ক্যাশ নোটের বান্ডিলটা জ্যাকের হাতে তুলে দিলেন। জ্যাক ভিড়ের তোয়াক্কা না করে সোজা হেঁটে এসে ক্লারার সামনে দাঁড়াল। তার কাটা চোখের কোণ থেকে তখনও হালকা রক্তের ফোঁটা গড়াচ্ছে, শরীর ঘামে ভেজা। সে নোটের বান্ডিলটা ক্লারার ব্যাগের ভেতর গুঁজে দিয়ে খুব নিচু, হাঁপানো গলায় বলল, “তিন হাজার তৈরি, মিস ক্যালকুলেটর। তোমার ও’মালির এক হাজার আর আমার জমানো শেষ হাজার দিয়ে ফ্লাইটের টিকিট কাটা হয়ে গেছে। মিউনিখ এবার আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে পারে।” ক্লারা তার রুমালটা বের করে খুব সাবধানে জ্যাকের কাটা চোখের কোণের রক্তটুকু আলতো করে মুছে দিল। সে কোনো কথা বলল না, স্রেফ তার নীল চোখ দুটো দিয়ে জ্যাকের ফ্যাকাশে মুখের দিকে এক পরম মমতায় তাকিয়ে রইল।

রাত দুটো। বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। চারপাশে বিশাল কাঁচের দেয়াল। বাইরে বোস্টন শহরের ওপর তুষারপাত শুরু হয়েছে। এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে যাত্রীদের যাতায়াত খুব কম। লুফথানসা এয়ারলাইন্সের মিউনিখগামী বোয়িং ৭৪৭ রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাক আর ক্লারা পাশাপাশি দুই ইকোনমি ক্লাসের উইন্ডো সিটে বসে ছিল। ডেনিম জ্যাকেটের কলার উঁচূ করে জ্যাক তার বিশাল শরীরটা ছোট সিটে কোনোমতে গুটিয়ে রেখেছিল। তার কাটা চোখের ওপরে একটা ছোট ব্যান্ড-এইড লাগানো। ক্লারা জানালার কাঁচের ওপাশে বোস্টনের বিদায় নেওয়া আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।

তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ঝড়। আগে সে এই বোস্টনে এসেছিল স্রেফ একজন সাধারণ স্কলারশিপের ছাত্রী হয়ে। আর আজ সে নিজের সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে এক নিঃস্ব, একরোখা।রাজপুত্রকে।
জ্যাক সিটে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সে অন্ধকারের মধ্যে খুব সাবধানে নিজের শক্ত, উষ্ণ হাতটা বাড়িয়ে ক্লারার কোলেন ওপর রাখা ঠাণ্ডা হাত দুটোকে নিজের মুঠোয় চেপে ধরল। জ্যাক চোখ না খুলেই খুব নিচু, গম্ভীর গলায় বলল, “ভয় পাচ্ছ, ক্লারা?”

ক্লারা জ্যাকের হাতের আঙুলগুলোর শক্ত বাঁধনের দিকে তাকাল। সে নিজের মাথাটা ধীর গতিতে জ্যাকের শক্ত কাঁধের ওপর আলতো করে রাখল।

“না, মিস্টার মিলার,” ক্লারা খুব শান্ত সাবলীল গলায় বলল। “যে মানুষের সাথে এত বড় ঝড় পার করে আসা যায়, তার পাশে থাকলে মিউনিখের বরফকেও আর ভয় লাগে না।”

জ্যাক হালকা একটু হাসল। বিমানের এঞ্জিন গর্জে উঠল। বোয়িং ৭৪৭ বরফঝড় ভেদ করে অসীম আকাশের দিকে ডানা মেলল মিউনিখের বুকে এক নতুন সত্য, ভালোবাসা আর আইনি যুদ্ধ উন্মোচন করার উদ্দেশ্যে।

চলবে?