Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-০২

অবহেলার মুক্তা পর্ব-০২

0
8

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_২

শ্রাবণের ঝুম বৃষ্টি ততক্ষণে ধরে এসেছে। বিকেলের থমথমে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে পুরো গ্রামজুড়ে। জাহিদের বাড়ির পরিবেশটা বরফের মতো ঠান্ডা, যেন একটু আগেই একটা বিরাট বড় তান্ডব বয়ে গেছে। মরিয়ম ভিটে ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে উঠেছিল গ্রামের এক কোণে তার বাপের জরাজীর্ণ ভিটায়। কিন্তু তার পেছনে রয়ে গেছে এক বিষাক্ত চক্রান্তের জাল।

পরদিন পড়ন্ত বিকেলে মরিয়ম বাপের বাড়ির উঠোনে একলা বসে চাল ঝাড়ছিল। শান্ত, নিরীহ মেয়েটার বুকের ভেতর যেন তুষের আগুন জ্বলছিল। সে জানত, বাপের ঘরে সে বেশিদিন আশ্রয় পাবে না। বৃদ্ধ বাবা আর ভাবির কড়া চাউনি তাকে মুহূর্তেই বুঝিয়ে দিয়েছে সমাজ যাকে কুলটা বলে দাগিয়ে দিয়েছে, তাকে বাপের ঘরও বেশিদিন ঠাঁই দেবে না।

ঠিক এমন সময় বাপের বাড়ির কাঠের গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন তার ভাসুর রফিক।

উনাকে দেখে মরিয়ম চট করে মাথার ঘোমটা টেনে সোজা হয়ে দাঁড়াল। রফিকের লম্বা, চওড়া গঠন আর মুখে কঠিন ভাব। চিরকাল রফিককে সে নিজের ভাইয়ের মতো মান্য করেছে, যার গাম্ভীর্যকে পুরো গ্রাম সমীহ করে চলে।

রফিক ধীরপায়ে এগিয়ে এসে উঠোনের কাঠের তক্তাপোশটার ওপর বসলেন। উনার চোখে চরম বিরক্তি আর গভীর দুশ্চিন্তার ছাপ।

“মরিয়ম…” রফিকের কণ্ঠস্বর ভারী ও গম্ভীর। “বসো। তোমার সাথে কিছু দরকারি কথা আছে।”

মরিয়ম চোখ নিচু করে বলল, “বলেন রফিক ভাই। আপনি সুস্থ আছেন তো?”

রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে পান বার করে মুখে পুরলেন। “আমি সুস্থ থাকি কীভাবে বলো? যে অন্যায়ের ঝড় আমার আর তোমার ওপর দিয়ে বয়ে গেল, তারপর কি সুস্থ থাকা যায়? তুমি তো রাগ করে ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে এলে। কিন্তু ভেবেছ, এখানে কতদিন থাকতে পারবে?”

মরিয়ম চোখের কোণে জমে থাকা পানিটা আঁচলে চেপে বলল, “যেখানে স্বামীর সম্মান নাই, সেখানে দাসী হয়ে থাকার চেয়ে বাপের বাড়ির এক কোণে পড়ে থাকা অনেক ভালো রফিক ভাই।”

“বাপের বাড়ির এক কোণেও সমাজ তোমারে শান্তিতে থাকতে দেবে না, মরিয়ম,” রফিকের গলার স্বর এবার আরও শক্ত হয়ে উঠল। “তোমার বাবা বৃদ্ধ, ভাই নিজের সংসার সামলাতেই ব্যাকুল। কদিন পর তোমার ভাবি যখন তোমারে নিয়া তাচ্ছিল্য করবে, তখন কোথায় যাবে? আর এই সমাজ? তুমি কি জানো মোড়ের মাথায়, হাটে-বাজারে কী রটানো হইছে?”

মরিয়ম চমকে রফিকের দিকে তাকাল, “কী রটানো হইছে রফিক ভাই?”

“জাহিদ আর শিউলি এই নোংরা খেলাটা হুট করে খেলেনি,” রফিক রূঢ় সত্যটা উগরে দিলেন। “তারা গত কয়েক মাস ধরে পুরো গ্রামে এই বিষ ছড়িয়েছে। আজ পুরো সমাজ জানে তুমি আর আমি নাকি বছরের পর বছর ধরে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলাম! শিউলি নাকি আমাদের হাতেনাতে ধরছিল, তাই আমি উনাকে তাড়াইছিলাম! আর জাহিদ নাকি তোমারে শাস্তি দিতে শিউলিরে ঘরে তুলছে।”

মরিয়মের হাত থেকে চালের কুলাটা খসে মাটিতে পড়ে গেল। সে চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।

“এসব… এসব মিথ্যা কথা মানুষ বিশ্বাস করছে রফিক ভাই?” মরিয়মের গলা কাঁপছিল।

“মানুষ মিথ্যাটাই সহজে বিশ্বাস করে, মরিয়ম,” রফিক তেজের সাথে বললেন। “সমাজ এখন ধরে নিয়েছে যা রটে, তার কিছুটা হলেও ঘটে। এখন বাস্তবতাটা শোনো। এই অপবাদ গায়ে মেখে তোমাকে আর কোনো পুরুষ কোনোদিন বিয়ে করবে না। গ্রামের কোনো পরিবার তোমারে বউ করে ঘরে তুলবে না। আর বাপের বাড়িতেও তুমি বেশিদিন মাথা গুঁজে থাকতে পারবে না। তাহলে তোমার ভবিষ্যৎ কী?”

মরিয়ম হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল, “আল্লাহ! আমি তবে কোথায় যাব? যে পাপ আমি করি নাই, সেই পাপের শাস্তি আমি কেন পাচ্ছি?”

রফিক উঠে দাঁড়ালেন। মরিয়মের একদম মুখোমুখি এসে শক্ত গলায় বললেন, “যে পাপ আমরা করি নাই, সেই পাপের শাস্তি যখন সমাজ আমাদের অলরেডি দিয়ে দিছে… তবে সেই কলঙ্কটাকে সত্যি করে দিলে ক্ষতি কী, মরিয়ম?”

মরিয়ম থমকে গেল। জলভরা চোখে তাকাতেই দেখল রফিকের চাউনিতে এক কঠিন প্রতিজ্ঞার আগুন।
“আ-আপনি কী বলছেন রফিক ভাই?”

“আমি বলছি, আমরা বিয়ে করব।” রফিকের সোজাসাপ্টা জবাব। “তুমি আর আমি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হব।”

“রফিক ভাই!” মরিয়ম আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে গেল, “এ আপনি কী বলছেন! আপনি আমার ভাসুর! জাহিদের আপন বড় ভাই! আপনার সাথে আমার বিয়ে? মানুষ তো আমাদের আরও পাপিষ্ঠ ভাববে! বলবে শিউলি আর জাহিদ যা বলছিল, তা-ই সত্যি!”

“বলুক!” রফিক গর্জে উঠলেন না, কিন্তু উনার গলার গাম্ভীর্যে চারপাশ কেঁপে উঠল। “মানুষ তো এমনিতেও আমাদের পাপিষ্ঠ ভাবছে! তুমি বাপের ঘরে তিলে তিলে ম-রলেও কেউ তোমারে সতী বলবে না। আর জাহিদ? জাহিদ শিউলিরে নিয়ে হাসবে যে সে তোমারে রাজপথের ভিখারি বানিয়ে দিছে!”

রফিক এক পা এগিয়ে এসে মরিয়মের চোখের দিকে তাকালেন।
“মরিয়ম, জাহিদ তোমারে মৌখিকভাবে তাড়িয়ে দিয়ে আর অপবাদ দিয়ে স্ত্রীর সব অধিকার হারিয়েছে। কাজী ডেকে আমি শরীয়ত ও আইন মোতাবেক তোমার ইদ্দত শেষ হওয়ার ব্যবস্থা করব। তারপর আমরা বিয়ে করব। যে অপবাদ ওরা আমাদের গায়ে মাখাইছে, সেই কলঙ্ক সত্যি করেই ওদের মুখে আমি সশব্দে চাবুক মারব! চিন্তা করো না, স্বামীর অধিকার নিয়ে কখনও আসব না।”

মরিয়ম কাঁপতে কাঁপতে বলল, “কিন্তু… কিন্তু সমাজ?”

“সমাজকে আমি দেখে নেব!” রফিক শক্ত গলায় বললেন। “শাহিল আর শিউলি চেয়েছিল তোমারে অনাথ করে রাস্তায় বসাতে। কিন্তু তুমি যদি আমার বউ হয়ে ওই ভিটায় আবার পা দাও, তবে জাহিদের বুকের ওপর পা দিয়ে তোমারে এই সংসারের আসল গিন্নি বানাব। যে ভাই নিজের বউকে কুলটা বানিয়ে আরেকজনকে ঘরে তোলে, সে আমার ভাইয়ের যোগ্য না। উনার চোখের সামনেই তুমি রাজত্ব করবে। এর চেয়ে বড় শাস্তি জাহিদের জন্য আর কী হতে পারে?”

মরিয়ম নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার নরম মন এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু রফিকের প্রতিটি কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর যুক্তি ও আশ্রয়ের সত্যতা সে অস্বীকার করতে পারল না। সত্যি তো, বাপের বাড়ি সে বোঝা হয়ে কতদিন থাকবে? আর যে দাগ লেগে গেছে, তা তো কোনোদিন মুছবে না।

মরিয়ম ধীরকন্ঠে বলল, “আপনি নিশ্চিত রফিক ভাই? এতে আপনার সম্মান নষ্ট হবে না তো?”

রফিক একচিলতে কড়া হাসি হাসলেন, “আমার সম্মান বাঁচানোর জন্য লড়াই করার ক্ষমতা আমার আছে, মরিয়ম । তুমি শুধু বলো অন্যায়কারীদের কাছে হেরে বাপের ঘরে তিলে তিলে ম-রবে, নাকি রফিক শেখের পাশে দাঁড়িয়ে এই কলঙ্ককে বর্ম বানিয়ে ওদের ধ্বংস দেখবে?”

মরিয়ম চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়াল। শ্রাবণের মেঘলা বাতাসে তার চেহারায় এক নতুন আত্মপ্রত্যয় ফুটে উঠল। সে বুঝল, নিজেকে বাঁচাতে আর অপরাধীদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হলে এই কঠিন পথেই তাকে হাঁটতে হবে।

“আমি রাজি, রফিক ভাই। যা ওরা করে নাই বলে রটাইছে, সেটাই সত্যি হবে।”

রফিক মাথা নাড়লেন। “ঠিক আছে। কাল সকালেই কাজী আসবে। তৈরি থেকো।”

রফিক ধীরপায়ে বাপের বাড়ির উঠোন পেরিয়ে চলে গেলেন। পেছনে পড়ে রইল এক নতুন লড়াইয়ের সূচনা, যেখানে এক নিরীহ নারী তার মিথ্যে কলঙ্ককেই বানিয়ে নিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

(চলবে…)