#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৩
শ্রাবণের মেঘ ভাঙা রোদের ছটা পড়েছে মরিয়মের বাপের বাড়ির উঠোনে। চারপাশের বাতাসে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আর উত্তেজনা থমথম করছে। কাল বিকেলে রফিক এসে যে প্রস্তাব দিয়ে গেছে, সারারাত মরিয়মের চোখের পাতা এক হয়নি। শিউলির সেই বিষাক্ত বাঁকা হাসি, জাহিদের গায়ের জোর আর শাশুড়ির কড়া কথাগুলো বার বার তার কানের কাছে গুঞ্জন করে উঠেছে।
আজ পরিস্থিতি তাকে এক কঠিন শান দেওয়া ছুরির মতো ধারালো করে তুলেছে। যে সমাজ তাকে না ভেবে, না জেনে এক রাতে ব্যভিচারী বানিয়ে দিল, সেই সমাজের মুখে চাবুক মা-রার জন্য তাকে এই কঠিন পথেই হাঁটতে হবে।
সকাল আটটা বাজতেই বাপের বাড়ির উঠোনে কাঁচা সুপারি আর খানের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। রফিক কাজী নিয়ে সোজা বাপের বাড়ির উঠোনে এসে হাজির হয়েছে। সাথে নিয়ে এসেছে গ্রামের দুজন মুরুব্বি ও গণ্যমান্য মাতব্বরকে।
মরিয়মের বৃদ্ধ বাবা রহিম শেখ বারান্দার খুঁটি ধরে কাঁপছিলেন। উনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। রফিকের মতো প্রভাবশালী মানুষ যখন স্বয়ং এসে এই বিয়ের প্রস্তাব দিল, তখন বৃদ্ধ বাবার মুখে কোনো শব্দ ফুটল না। কিন্তু মরিয়মের ভাবি আমেনা বেগম উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করছিলেন, “কী রূপের আগুন রে বাপা! এক ভাই ছেড়ে দিল তো কী হইছে, বড় ভাইরে এক রাতেই বশ কইরা ফেলল! কালঙ্কী মাইয়া বললেই তো, এমনি এমনি আর রটে নাই!”
কথাটা রফিকের কানে পৌঁছাতেই সে ঘুরে দাঁড়াল। র-ক্তচক্ষু দিয়ে আমেনা বেগমের দিকে তাকাতেই ভাবি ভয়ে এক পা পিছিয়ে ঘরের ভেতরে কেটে পড়ল।
রফিক শান্ত অথচ ইস্পাতের মতো শক্ত গলায় কাজীকে বলল, “কাজী সাহেব, শরীয়ত ও আইন অনুযায়ী যা যা করণীয়, সব হিসাব চুকিয়ে কাগজ তৈরি করেন। ইদ্দতের নিয়ম আর আগের তালাকের সব আইনি দস্তাবেজ আমি কাল রাতেই তৈরি করে রাখছি। জাহিদ যে মুখে মৌখিকভাবে আর সামাজিকভাবে মরিয়মকে বিদায় দিছে, তার সমস্ত প্রমাণ এখানে আছে।”
কাজী সাহেব চশমাটা নাকের ওপর তুলে কাগজগুলো নেড়েচেড়ে দেখল। রফিকের কথার ওপর কথা বলার সাহস এই পুরো পীরপুর গ্রামে কারও নেই। রফিক শুধু গায়ের জোরে নয়, বুদ্ধিতে আর সম্পদেও এই এলাকার প্রধান কান্ডারী।
মরিয়ম ঘরের ভেতর এক কোণে বসে ছিল। তার পরনে একটা সাধারণ সুতির শাড়ি। চোখে পানি নেই, আছে এক অসীম শুষ্কতা। রফিক ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
“মরিয়ম…” রফিকের কণ্ঠ গম্ভীর, “কাজী সাহেব ডাকছেন। সাইন করতে হবে।”
মরিয়ম ধীরপায়ে উঠে এল। তার হাতের তালু ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। কিন্তু রফিকের শক্ত, নিশ্চল চেহারার দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতর এক অজানা সাহস ভর করল। সে টেবিলে এসে বসল এবং কাজী সাহেবের বাড়িয়ে দেওয়া কলমটা হাতে নিল।
তিনবার কবুল বলার সময় পুরো উঠোন যেন থমকে গিয়েছিল। মরিয়ম যখন সই করল, তখন তার মনে হলো সে শুধু একটা কাবিননামায় সই করছে না, বরং জাহিদ আর শিউলির তৈরি করা ফাঁদে নিজ হাতে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
বিবাহ সম্পন্ন হতেই রফিক কাজীকে বিদায় জানিয়ে মরিয়মের বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পকেট থেকে এক তোড়া টাকা বের করে উনার হাতে দিয়ে বলল, “আপনি চিন্তা করবেন না। মরিয়ম এতদিন ছিল জাহিদের অবহেলিত বউ, কিন্তু আজ থেকে সে রফিক শেখের সম্মানের অংশীদার। উনার গায়ে একটা আঁচড় লাগতেও আমি দেব না।”
রহিম শেখ চোখের পানি মুছে রফিকের হাত দুটো চেপে ধরলেন, “রফিক রে… তোরা দুই ভাই মিলে আমার মেয়েটার জীবনটা কী বানাইলি? তবে আমি জানি, তুই যা করিস ভেবেচিন্তেই করিস। আমার মেয়েটাকে দেখিস বাপ।”
রফিক কোনো উত্তর না দিয়ে মরিয়মের পোটলাটা নিজের হাতে তুলে নিল। তারপর মরিয়মের দিকে তাকিয়ে বলল, “চলো, মরিয়ম। তোমার আসল ঘরে ফিরে যাওয়ার সময় হইছে।”
ঝুম বৃষ্টির পর বিকেলের আলোটা বেশ পরিষ্কার। জাহিদের বাড়ির উঠোনে তখন এক উৎসবের আমেজ। শিউলি নতুন বউয়ের লাল শাড়ি পরে বারান্দায় বসে পান চিবোচ্ছিল, আর জাহিদ মোড়ের মাথা থেকে শিউলির জন্য নতুন মিষ্টি কিনে এনে উজাড় করছিল। শাশুড়ি রাবেয়া বেগম উঠোনে বসে নতুন বউয়ের গুণগান গাইছিলেন। মরিয়মকে বাপের বাড়িতে তাড়িয়ে দিয়ে সে যেন কোনো এক বিরাট যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে।
ঠিক তখনই গেটে এক জোড়া শক্ত জুতার আওয়াজ হলো।
জাহিদ চকিতে ঘুরে তাকাল। গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকছে রফিক শেখ। কিন্তু রফিক একা নন! উনার ঠিক পেছনে, উনার ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে মরিয়ম!
মরিয়মের পরনে একখানা লাল সুতির শাড়ি, আর হাতে রফিকের দেওয়া নতুন এক জোড়া সোনার চুড়ি। মরিয়মের চেহারায় সেইদিনের সেই করুণ অসহায়ত্ব বা কান্না বিন্দুমাত্র নেই। সে মাথা উঁচু করে, সোজা হয়ে রফিকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
জাহিদের হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেটটা মাটিতে পড়ে গেল। শিউলির মুখের হাসি এক লহমায় উবে গেল, তার চোখ দুটো ভয়ে ও বিস্ময়ে কপালে উঠল। শাশুড়ি রাবেয়া বেগম দাঁড়াতে গিয়ে প্রায় আছাড় খাচ্ছিলেন।
জাহিদ দাঁতে দাঁত চেপে এক পা এগিয়ে এল, “রফিক ভাই! এই কুলটা মাইয়াটারে তুমি আবার এই ভিটায় নিয়া আসছ কেন? ওরে না কাল আমি বাইর কইরা দিছি? আর তুই মরিয়ম… তোর লজ্জা করে না? আবার এই ঘরে পা দিতে আইছোস?”
কথাটা শেষ হতেই রফিক এক পা এগিয়ে এল। উনার ধমকে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল, “মুখ সামলে কথা বল, জাহিদ! তোর সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে জানিস?”
জাহিদ তোতলে উঠে বলল, “ক-কে আবার? তোর ছেড়ে দেওয়া আর আমার তাড়িয়ে দেওয়া একটা…”
“চুপ!” রফিক গর্জাল। উনার কণ্ঠের তেজ বারান্দার টিনের চালে গিয়ে বাড়ি খেল। “একদম চুপ! তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে এই শেখ বাড়ির বড় বউ, রফিক শেখের বিবাহিতা স্ত্রী মরিয়ম বেগম!”
কথাটা যেন পুরো উঠোনে একটা পরমাণু বোমার মতো ফাটল!
জাহিদ কয়েক পা পিছিয়ে গেল। উনার চোখ দুটো বিশ্বাস করতে পারছিল না। “কী… কী বললি তুই রফিক ভাই? বিয়ে? তুই এই মাইয়াটারে বিয়ে করছিস?”
শিউলি বারান্দা থেকে প্রায় দৌড়ে নিচে নেমে এল। উনার মুখ দিয়ে ফেনা উঠছিল রাগ আর ভয়ে, “রফিক! আপনি এই কাজ করতে পারলেন? যেই মাইয়াটারে নিয়ে আমরা… আই মিন, যেই মাইয়া আপনার সাথে পরকীয়া করার গুঞ্জন উঠছিল, আপনি সেটারে সত্যি সত্যি বউ বানাইয়া ঘরে আনলেন? আপনারা দুইজন কত বড় পাপিষ্ঠ!”
মরিয়ম এবার নীরবতা ভাঙল। সে ধীরপায়ে শিউলির একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার গলার আওয়াজ মিষ্টি, কিন্তু তাতে ছিল চাবুকের মতো বিষের ধার।
“কী বললা শিউলি আপা?” মরিয়ম ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “পাপিষ্ঠ? তোমরা না সারা গ্রামজুড়ে রটাইছিলা যে রফিকের সাথে আমার পরকীয়া চলত? তোমরা না সবাইকে বলছিলা আমরা রাতের অন্ধকারে পাপাচার করতাম? কাল পর্যন্ত তো তোমরা মিথ্যা ছড়াইছিলা। আজ আমরা সেই মিথ্যাটাকেই সত্যি বানিয়ে দিলাম! এতে তো তোমাদের খুশি হওয়ার কথা, তাই না?”
শিউলি বাক্যহারা হয়ে গেল। মরিয়মের গলার এই তেজ সে কোনোদিন শোনেনি।
জাহিদ রাগে কাঁপতে কাঁপতে রফিকের দিকে তেড়ে এল, “রফিক ভাই, তুই আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলি? আমার ছেড়ে দেওয়া বউরে তুই বিয়ে করলি?”
রফিক এক হাত বাড়িয়ে জাহিদের জামার কলার শক্ত করে চেপে ধরল। তারপর মুখটা জাহিদের একদম কাছে নিয়ে বরফশীতল গলায় বলল,”বিশ্বাসঘাতকতা? তুই আমার এক বছর আগে ছেড়ে দেওয়া বেশ্যা শিউলিরে বিয়ে করে এই ভিটায় তুলতে পারিস, আর আমি আইন ও শরীয়ত মেনে তোর তাড়িয়ে দেওয়া নির্দোষ বউকে সম্মান দিয়ে ঘরে তুলতে পারি না?”
রফিক এক ঝটকায় জাহিদকে পেছনে ঠেলে দিল। জাহিদ সামলাতে না পেরে উঠোনের মাটিতে পড়ে গেল।
“শোন জাহিদ,” রফিকের কণ্ঠ এবার পুরো গ্রামের উদ্দেশ্যে ঘোষিত হলো, “তুই চেয়েছিলি মরিয়মকে বাপের ঘরে তাড়িয়ে দিয়ে কুলটা বানিয়ে সারাজীবন তিলে তিলে মা-রতে। তুই ভেবেছিলি শিউলিরে নিয়ে তুই এই ভিটায় রাজত্ব করবি, আর মরিয়ম কেঁদে কেঁদে ভিখারি হবে। কিন্তু আজ থেকে এই বাড়ির চাবি, এই বাড়ির অধিকার আর এই ভিটার রাজত্ব রফিক শেখের বউ মরিয়মের হাতে!”
শাশুড়ি রাবেয়া বেগম এবার বুক চাপড়ে কেঁদে উঠলেন, “ওরে রফিক! তুই নিজের ছোট ভাইয়ের বউরে ঘরে তুললি? গ্রামবাসী আমাদের থুথু দেবে রে! আমি সমাজে মুখ দেখাব কীভাবে?”
রফিক উনার দিকে ঘুরে তাকাল। উনার চোখে কোনো দয়া ছিল না। “মা, যখন তোমার ছোট পোলা জাহিদ আর এই শিউলি মিলে একটা নির্দোষ মেয়ের গায়ে কলঙ্ক ছিটাইছিল, তখন তোমার এই সমাজের কথা মনে পড়ে নাই? যখন জাহিদ নিজের অন্যায় ঢাকার জন্য নিজের ভাইয়ের নামে মিথ্যা অপবাদ বাজারে ছড়াইছিল, তখন তোমার নীতি কোথায় ছিল? আজ সমাজ যা ভাবার ভাবুক! যে কলঙ্ক ওরা আমাদের গায়ে মাখাইছে, সেই কলঙ্ককে বর্ম বানিয়েই আমরা ওদের বুকের ওপর রাজত্ব করব!”
শিউলি কাঁদো কাঁদো গলায় জাহিদের হাত ধরে টানল, “জাহিদ! তুমি কিছু বলছ না কেন? রফিক ভাই আমাদের এভাবে অপমান করছে! ওনাকে বাড়ি থেকে বের করে দাও!”
জাহিদ মাটির দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে মুখে বসে রইল। সে খুব ভাল করেই জানে, এই ভিটার পুরো জমি আর রফিকের গায়ের জোরের সামনে সে একবারে শূন্য। রফিককে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা এই গ্রামে কারও নেই।
রফিক মরিয়মের পোটলাটা ঘরের বড় কামরার বারান্দায় রাখল। যে কামরাটায় আগে রফিক একা থাকত, সেটার দরজা আজ খুলে গেল নতুন বড় বউয়ের জন্য।
রফিক শিউলি আর জাহিদের দিকে ফিরে শেষবারের মতো নির্দেশ দিল, “শিউলি, আজ থেকে তুই এই বাড়ির ছোট বউ। ঘরের রান্নাবান্না, হাঁড়ি মাজা আর ঝাড়ু দেওয়ার কাজ তোর। এতদিন মরিয়ম তোদের সেবা করছে, এখন তুই মরিয়মের দাসী হয়ে থাকবি। আর জাহিদ, তুই যদি এই ঘরে থাকতে চাস, তবে মরিয়মকে ‘বড় ভাবি’ বলে ডেকে সম্মান দিয়ে চলবি। যদি এক চুল এদিক-ওদিক হয়, তবে এক কাপড়ে তোদের দুজনকে এই ভিটা থেকে বের করে দেব!”
কথাগুলো বলে রফিক মরিয়মের দিকে তাকাল। উনার কঠিন চেহারায় এক চিলতে আশ্রয়ের আশ্বাস ভেসে উঠল। “বউজান, তোমার ঘরে যাও। আজ থেকে এই সংসারের সব সিদ্ধান্ত তুমি নিবা।”
মরিয়ম সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে জাহিদ আর শিউলির স্তম্ভিত, পরাজিত মুখের দিকে এক নজর তাকাল। যে শিউলি কাল বিজয়ের হাসি হেসেছিল, আজ তার চোখে শুধুই পরাজয় আর ভয়ের ছাপ। আর যে জাহিদ তাকে দাসী বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল, সে আজ নিজের ভাইয়ের দয়ায় এই ভিটায় পড়ে আছে।
মরিয়ম ধীরপায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো। পথটা সহজ নয়, কিন্তু রফিকের মতো এক পাহাড়ের মতো শক্ত পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে সে আজ আর কোনো অবহেলিত মুক্তা নয় সে এই সংসারের আসল রানী।
চলবে,,,,

