#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৫
পরদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই পীরপুর গ্রামে থমথমে নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল। শ্রাবণের ঘন কুয়াশার মতো হালকা মেঘে চারপাশ ঢেকে আছে। শাশুড়ি রাবেয়া বেগম ভোরেই পাশের গ্রামের পিরের দরগায় মানতের ধাগা বাঁধতে চলে গেছেন। বড় ছেলে রফিকের কড়া শাসনের পর তিনি ঘরে কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাননি।
রফিকও সকালে হাটের পাইকারি বেচাকেনার কাজে পীরপুর বাজারের দিকে রওনা দিয়েছে। যাওয়ার সময় মরিয়মকে বারবার বলে গেছে, “ঘরে থাকবে মরিয়ম। উঠোনে বা বাইরে বেশি ঘোরাঘুরি করবে না। প্রয়োজন হলে আমায় খবর পাঠাবে।”
রফিক চলে যাওয়ার পর মরিয়ম বড় কামরার বারান্দা ঝাড়ু দিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় চাচাতো ভাইয়ের বউ করিমন এক গাল পান চিবোতে চিবোতে উঠোনে এসে হাজির হলো। তার পেছনে ছায়ার মতো এসে দাঁড়াল শিউলি।
করিমন একদম ভালো মানুষের মতো মুখ বানিয়ে মিষ্টি গলায় বলল, “ও বড় বউ বুবু! শোনো না, একটু শোনো। তোমার শাশুড়ি মা তো পিরের দরগায় গেছে। উনার ঘরের পেছনের মাটির সিন্দুকটায় কিছু পুরান কাপড় আর পিতলের ঘটি আছে, যেগুলো দরগায় দেওয়ার কথা ছিল। রফিক ভাই হাটে যাওয়ার আগে আমারে বারে বারে বলে গেছে তোমারে সাথে নিয়ে সিন্দুকটা খুলে সেগুলো বের করতে।”
মরিয়ম ঝাড়ু হাতে নিয়ে একটু ইতস্তত করল। রফিক তো তাকে এমন কিছুর কথা বলে যাননি! সে শান্ত গলায় বলল, “রফিক তো আমাকে কিছু বলে যাননি করিমন আপা। উনি ফিরুক, তারপর না হয় সিন্দুক খুলব।”
শিউলি এবার পাশে এসে খুব নরম গলায় বলল, “ও মরিয়ম বুবু, তুমি কি এখনও আগের রাগ ধরে রাখছ? আমরা তো ভুল বুঝতে পেরেছি। রফিক ভাই তাড়াহুড়ো করে হাটে গেছে বলেই তোমারে বলতে ভুলে গেছে। সিন্দুক না খুললে দরগার লোক এসে জিনিসগুলো নেবে কীভাবে? চল না, একটু সাহায্য করো।”
দুই জায়ের এমন মিষ্টি আর নরম আচরণে মরিয়মের সরল মনটা একটু গলে গেল। সে স্বভাবগতভাবেই নরম আর বিশ্বাসপ্রবণ। সে ভাবল, হয়তো সত্যি রফিক কাজের চাপে বলতে ভুলে গেছেন। তা ছাড়া শিউলি আর করিমন যদি নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ভালো হতে চায়, তবে সংসারটা শান্তিতে ভরে উঠবে।
“ঠিক আছে, চলেন,” মরিয়ম ধীরপায়ে শাশুড়ির বন্ধ ঘরের দিকে পা বাড়াল।
মরিয়ম সিন্দুকের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। চাবির থোকাটা সিন্দুকের তালাতে ঢোকাতেই করিমন আর শিউলির চোখে এক বিষাক্ত চাতুরি ফুটে উঠল।
করিমন ইশারায় শিউলিকে কিছু একটা সংকেত দিল। শিউলি চুপিচুপি ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা জাহিদের ঘরের দিকে চলে গেল।
সিন্দুক খুলতেই মরিয়ম ভেতরে হাত বাড়াল কাপড়গুলো বের করার জন্য। কিন্তু হঠাৎ করিমন এক অদ্ভুত নাটক শুরু করল। সে এক ধাক্কায় সিন্দুকের ভেতরে রাখা একটা পুরোনো পিতলের বড় কলসি নিচে ফেলে দিল। বিকট শব্দে থালা-বাসন আর কলসি ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
মরিয়ম চমকে উঠে দাঁড়াতে যাবে, ঠিক তখনই করিমন নিজের শাড়ির আঁচল টেনে ছিঁড়ে ফেলল এবং চুলগুলো এলোমেলো করে বিকট শব্দে চিৎকার করে উঠল!
“ওরে বাবা রে! বাঁচাও! ও রফিক ভাই, ও জাহিদ! দেইখা যাও তোমার বউ আমার ওপর আক্রমণ করছে! চোর… চোর!”
মরিয়ম স্তব্ধ হয়ে গেল, “করিমন আপা! আপনি এসব কী করছেন? কী বলছেন আপনি?”
কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল জাহিদ, আর তার পেছনে গ্রাম্য মাতব্বর ইদ্রিস আলী ও সাথে চার-পাঁচজন প্রতিবেশী! যেন তারা বাইরে আগে থেকেই তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
শিউলি বাইরে থেকে কাঁদতে কাঁদে ভেতরে ঢুকল, “মুরুব্বিরা দেখেন! শাশুড়ি মা ঘরে নাই, রফিক ভাই হাটে গেছে—এই সুযোগে মরিয়ম বুবু শাশুড়ির ঘরের সিন্দুক ভেঙে গহনা আর টাকা চুরি করতে আসছিল! করিমন বুবু বাধা দিতে গেছে বলে উনারে মারধর করছে!”
ইদ্রিস মাতব্বর কড়া চোখে মরিয়মের দিকে তাকালেন, “কী ব্যাপার মরিয়ম? রফিকের সাথে বিয়ে হতেই তোমার এত বড় সাহস হয়ে গেল? শাশুড়ির ঘরের সিন্দুক চুরি করছ?”
মরিয়মের পায়ের নিচের মাটি ধসে গেল। সে কাঁপা গলায় বলল, “মাতব্বর সাহেব! বিশ্বাস করেন, আমি চুরি করতে আসিনি! করিমন আপা আর শিউলি আপাই আমাকে ডেকে এনে সিন্দুক খুলতে বলল! বলল রফিক নাকি বলে গেছে…”
করিমন অমনি ডুকরে কেঁদে উঠল, “মিথ্যা কথা! জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা! মাতব্বর সাহেব, আমি উনারে আটকাইতে গেছিলাম বলেই তো উনি আমারে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল! উনি তো অনেক আগের থেকেই জাহিদকে বলছিল, এই সংসারের সব সোনা-দানা নাকি উনার চাই! রফিক ভাইয়ের বউ হইয়া এখন উনি পুরো ভিটে গ্রাস করতে চায়!”
জাহিদ এগিয়ে এসে কড়া গলায় বলল, “দেখলেন মাতব্বর সাহেব? আমার ভাই রফিক তো উনার রূপের মোহে অন্ধ হয়ে আছে! তাই ওরে কিছু বলে না। কিন্তু এই মাইয়া যে একটা ডাকাত আর চোর, তা আজ প্রমাণ হয়ে গেল! কালকে না হয় অপবাদ ছিল, কিন্তু আজ তো হাতেনাতে ধরা পড়েছে!”
শিউলি বাঁকা হেসে মাতব্বরের দিকে তাকাল, “এখনই রফিক ভাইকে হাট থেকে ডেকে আনা হোক! উনি এসে দেখুন উনার এই সতী-সাধ্বী ‘বড় বউ’ কত বড় ডাকাত! আজ যদি উনার বিচার না হয়, তবে এই গ্রামে কোনো শাশুড়ির সম্পত্তি নিরাপদ থাকবে না!”
গ্রামবাসী ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করল। সবার চোখেই এখন মরিয়মের প্রতি চরম ঘৃণা আর সন্দেহ। মরিয়ম ঘরের দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়াচ্ছে। সে বুঝতে পারল, সে আবার এক কুটিল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। শিউলি আর করিমন দুই জা মিলে এমন এক নিখুঁত ফান্দ পেতেছে, যা থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ সে খুঁজে পাচ্ছে না।
যদি রফিক এসে এই দৃশ্য দেখে? রফিক কি ওকে বিশ্বাস করবে? নাকি গ্রামবাসীর সামনে রফিকের সেই অহংকার আর সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যাবে?
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আবার সেই পরিচিত, ভারী জুতার শব্দ পাওয়া গেল। রফিক শেখ হাট থেকে ফিরে এসেছেন!
উঠোনে দাঁড়িয়ে রফিকের সেই দীর্ঘ ছায়া আর কঠিন রূপ দেখে জাহিদ আর শিউলি মনে মনে হেসে উঠল। তারা ভাবল, আজ রফিক শেখের সেই তেজ শেষ হবে, আজ সে নিজের হাতেই মরিয়মকে দূরে ঠেলে দেবে!
দরজায় এসে দাঁড়ালেন রফিক। উনার রক্তচক্ষু আর থমথমে মুখমণ্ডল দেখে পুরো ঘর এক মুহূর্তের জন্য বরফের মতো জমাট বেঁধে গেল।
চলবে…

