#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৮
পীরপুর গ্রামের ওপর দিয়ে শ্রাবণের মেঘ কেটে গিয়ে ভাদ্রমাসের প্রখর রোদ উঠেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে টানা ১৫টি দিন। এই পনেরো দিনে রফিকের বাড়ির উঠোনের হাওয়া, পরিবেশ আর মানুষের রূপ যেন পুরো উল্টে গেছে।
যেই ভিটায় একদিন মরিয়ম ছিল অবহেলিত, নিগৃহীত আর লাঞ্ছিত এক কনিষ্ঠ বউ, আজ সে এই বিশাল শেখ বাড়ির রাজরানী বড় বউ। সকালের মিষ্টি রোদ বারান্দায় এসে পড়ার আগেই মরিয়মের ঘুম ভাঙে। সে এখন আর সকাল-সন্ধ্যা উঠোন ঝাড়ু দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠে না, ডেকচি মাজার কালিতে তার হাত ছোপ ছোপ হয়ে থাকে না। রফিকের কড়া নির্দেশে সংসারের সমস্ত ভারী কাজ এখন শিউলি আর করিমনের ঘাড়ে। মরিয়ম শুধু ধীরপায়ে ঘরের চাবি ঘুরিয়ে তদারকি করে, শাশুড়ির ওষুধপত্র বুঝিয়ে দেয় আর বড় বউয়ের মর্যাদায় সংসারের হাল ধরে রাখে।
মরিয়মের সাজগোজ আর চালচলনেও এসেছে এক অদ্ভুত আভিজাত্য। পরনে সুতির সুন্দর ছাপা শাড়ি, হাতে রফিকের কিনে দেওয়া সেই জোড়া রুলি চুড়ি। তাকে দেখলে এখন গাঁয়ের মুরুব্বিরাও সম্মান দিয়ে ‘বড় বউ’ বলে সম্ভাষণ জানায়।
কিন্তু এই ১৫ দিনে সবচেয়ে বড় যে ঝড়টা বয়ে গেছে, তা হলো জাহিদের মনের ভেতর।
দক্ষিণের দোচালা ঘরের বারান্দার কোণে একটা পুরোনো কাঠের টুলে বসে আছে জাহিদ। হাতের চা-টা কখন ঠান্ডা হয়ে গেছে, সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার চোখ জোড়া আটকে আছে উত্তরের বড় ঘরের বারান্দার দিকে, যেখানে রফিক শেখ আর মরিয়ম মুখোমুখি বসে কথা বলছিল।
রফিক হাটে যাওয়ার আগে মরিয়মের হাতে কিছু বাজার করার ফর্দ বুঝিয়ে দিচ্ছিল। মরিয়ম খুব আলতো করে হেসে রফিকের ফতুয়ার কলারটা একটু সোজা করে দিল। রফিকের সেই কঠিন, রুক্ষ চেহারায় তখন এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসির আলো। দুজনের মধ্যে কোনো লোকদেখানো আতিশয্য নেই, কিন্তু আছে এক পাহাড়সম শ্রদ্ধা আর গভীর সম্মানের বাঁধন।
দৃশ্যটা দেখে জাহিদের বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে চিরে ফেলল। এক পরম বিষাদ আর তীব্র আফসোস এসে তাকে চেপে ধরল।
“কী রে? বড় ভাইয়ের আর সাবেক বউয়ের ঢং দেখা শেষ হইছে? নাকি চোখে ছানি পড়ল?”
শিউলির কর্কশ আর বিষাক্ত গলার আওয়াজে জাহিদের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। জাহিদ মুখ ফিরিয়ে শিউলির দিকে তাকাল। শিউলির পরনে একটা ময়লা শাড়ি, চুলগুলো উস্কোখুস্কো। উঠোনের ঝাড়ুটা একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে জাহিদের সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল।
“সকাল থিকা বসে বসে খালি বড় বউয়ের রূপ গিলতাছিস! ঘরে চাল নাই, তেল নাই সেই খেয়াল আছে? যে পুরুষ নিজের বউরে সুখ দিতে পারে না, সে আবার অন্য নারীর দিকে চাইয়া আফসোস করে! ধিক্কার তোরে!”
জাহিদ বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “তোর মুখটা কি একদিনের জন্যও বন্ধ থাকবে না শিউলি? সকাল থিকা কানের কাছে শুধু ঘ্যানঘ্যান আর মেজাজ দেখানো! এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দিস না তুই।”
শিউলি চোখ-মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কাটল, “শান্তি? তুই মোরে শান্তি দিছোস জাহিদ? রফিক ভাইয়ের ওপর টেক্কা দিতে গিয়া মোরে বিয়ে কইরা আনলি, এখন মোরে দিয়া এই ঘরের দাসের মতো খাটাস! তোর বড় ভাই মরিয়মরে রানীর মতো মাথায় তুলে রাখছে, আর তুই মোরে কী দিছোস? একটা নতুন শাড়ি কিনে দেওয়ার তৌফিক তোর নাই! তুই একটা নিষ্কর্মা, ভেড়া পুরুষ!”
শিউলি ঝনঝন করে বাসনকোপন আছাড় মা-রতে মার-তে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। তার প্রতিটি কথা যেন চাবুকের মতো জাহিদের গায়ে এসে বিঁধল।
জাহিদ মাথা নিচু করে দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা তপ্ত পানি গড়িয়ে পড়ল। এই ১৫ দিন ধরে সে প্রতিনিয়ত হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সে কী হারিয়েছে আর কী বিষ গলায় তুলে নিয়েছে! শিউলি কোনোদিন তাকে ভালোবাসেনি। শিউলি চেয়েছিল শুধু রফিকের ওপর প্রতিশোধ নিতে আর এই ভিটায় নিজের অধিকার খাটাতে। জাহিদকে সে কেবল একটা চালের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। সারাদিন জাহিদকে কটু কথা শোনানো, মেজাজ দেখানো আর অপমান করাই যেন এখন শিউলির নিত্যদিনের কাজ।
জাহিদের মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনগুলোর কথা। স্মৃতির চাদর সরিয়ে তার মন চলে গেল তিন বছর আগের সেই দিনগুলোতে যখন মরিয়ম ছিল তার বউ।
তিন বছর আগে…..
তখন ভাদ্রমাসের এই কড়া রোদেই মরিয়ম উঠোনে ধান শুকাতে দিত। সারাদিন একা হাতে পুরো সংসারের খাটুনি খাটত মেয়েটা। সকাল চারটায় ঘুম থেকে উঠে গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, উঠোন লেপা, শাশুড়ির পা টেপা থেকে শুরু করে রফিকের জামাকাপড় কাচা সবই করত একা মরিয়ম।
জাহিদ তখন কোনো কাজকাম করত না। বন্ধুদের সাথে মোড়ের মাথায় আড্ডা দিয়ে দুপুরে ঘরে ফিরত। তীব্র রোদে ঘেমে-নেয়ে ঘরে ঢুকে জাহিদ যদি একটু মেজাজ দেখাত, মরিয়ম দৌড়ে এসে পাখার বাতাস করত।
একদিন বিকেলের কথা খুব মনে পড়ে জাহিদের। জাহিদের প্রচণ্ড মাথা ধরেছিল। মরিয়ম তখন রান্নাঘরে কাঠের ধোঁয়ায় চোখ লাল করে শাশুড়ির জন্য পিঠা বানাচ্ছিল। জাহিদ ঘরে ঢুকে চিৎকার করে উঠেছিল, “মরিয়ম! ঘরে এসে দেখে যা আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে! তোর পিঠা বানানো কি শেষ হয় না?”
মরিয়ম হাত-মুখ ধুয়ে তড়িঘড়ি করে ঘরে এসেছিল। তার কপালে ঘেমে যাওয়া চুল লেপ্টে ছিল, গায়ে ছিল ধোঁয়ার গন্ধ। সে কপালে জলপট্টি দিতে দিতে পরম মমতায় বলেছিল, “একটু শুয়ে থাকো তো। আমি কপালটা টিপে দিচ্ছি। সরিষার তেল গরম করে এনে দেব?”
জাহিদ কিন্তু সেদিন কোনো দয়া দেখায়নি। সে বিরক্ত হয়ে মরিয়মের হাতটা ঝটক মেরে সরিয়ে দিয়েছিল, “দূর হ এখান থেকে! তোর গা দিয়ে তরকারির আর ধোঁয়ার গন্ধ আসছে! মেজাজ খারাপ করিস না!”
মরিয়ম আঘাত পেয়েছিল, কিন্তু মুখে একটি কথাও বলেনি। শুধু নীরব চোখে একফোঁটা পানি মুছে ঘরে রাখা পুরোনো পাখাটা নিয়ে জাহিদের মাথায় বাতাস করতে শুরু করেছিল। জাহিদ ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত সে একভাবে বসে বাতাস করে গেছে, নিজের কষ্ট বা ক্লান্তি মুখে আনেনি।
এমন শত শত দিন গেছে। জাহিদ যখনই শার্টের বোতাম খুঁজে পেত না, মরিয়ম নিজে হাতে সেলাই করে দিত। জাহিদ হাট থেকে দেরি করে ফিরলে মরিয়ম না খেয়ে বারান্দায় বসে থাকত। জাহিদ একবুক অবহেলা আর তাচ্ছিল্য ছাড়া মরিয়মকে কোনোদিন কিছুই দেয়নি। কোনোদিন একটা মিষ্টি কথা বলেনি, একটা ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকায়নি। মরিয়ম জাহিদকে নিজের স্বামী মেনে মাথার ওপর তুলে রাখত, ভক্তি করত, আর জাহিদ তাকে ভাবত পায়ের দাসী!
অথচ আজ?
আজ সেই মরিয়ম অন্য এক উচ্চতায়। যে মরিয়মকে জাহিদ ধুলোবালি ভেবেছিল, রফিক শেখ তাকে নিজের মাথার তাজ বানিয়ে নিয়েছে।
স্মৃতির জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এল জাহিদ। তার বুকটা হাহাকার করে উঠল।
সামনে তাকাল সে। রফিক হাটে চলে গেছে। মরিয়ম এখন বড় বারান্দায় একটা কাঠের পিঁড়িতে বসে শাশুড়ি রাবেয়া বেগমের চুলে তেল লাগিয়ে দিচ্ছে। শাশুড়ি, যিনি একদিন মরিয়মকে উঠতে-বসতে খোটা দিতেন, আজ তিনিই মরিয়মের হাত ধরে বলছেন, “বড় বউ, রফিকের জন্য একটু আদার চা করে দিও তো। ওর কাশিটা কমছে না।”
মরিয়ম মৃদু হেসে বলল, “আমি বানিয়ে রেখেছি মা। আপনি চিন্তা করবেন না।”
জাহিদ আর সামলাতে পারল না। সে ধীরপায়ে, অপরাধীর মতো হেঁটে বড় বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। তার পা দুটো যেন ভারী হয়ে আসছিল।
বারান্দার সিঁড়ির কাছে এসে জাহিদ থামল। নিচু গলায়, অতি কষ্টে উচ্চারণ করল, “মরিয়ম…”
মরিয়ম চমকে উঠল। শাশুড়ির চুলে তেল দেওয়া থামিয়ে সে চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে কোনো রাগ নেই, কোনো ঘৃণা নেই আছে এক অতল নীরবতা ও দূরত্ব। যে দূরত্ব পার করার সাধ্য জাহিদের আর নেই।
“কিছু বলবে জাহিদ?” মরিয়মের স্বর একদম শান্ত, সমাহিত।
জাহিদ তোতলে উঠল, “ন-না… মানে… শিউলি বলছিল ঘরে নাকি চা-পাতা শেষ। আর… তোর কি শরীর ভালো? সকালে দেখছিলাম চোখ দুটো একটু লাল…”
মরিয়ম একটু থামল। তারপর খুব মৃদু একটা হাসি ফুটিয়ে তুলল ঠোঁটের কোণে যে হাসিতে কোনো অধিকার নেই, কেবল শালীনতাটুকু লেগে আছে।
“আমার শরীর একদম ঠিক আছে। আর চা-পাতা সিন্দুকের পাশের আলমারিতে রাখা আছে, শিউলিকে গিয়ে নিতে বলো। অন্য কিছু লাগলে উনি হাটে গেছেন, উনি ফিরলে বলো।”
‘উনি’ শব্দটা মরিয়মের মুখে শুনে জাহিদের বুকের ভেতর আবার একটা মোচড় দিল। একদিন এই মেয়েটাই তার জন্য সারাদিন পথ চেয়ে থাকত, আর আজ সে রফিকের সম্মানের ছায়ায় এতটাই সুরক্ষিত যে জাহিদের উপস্থিতি তার মনে কোনো দোলাই দেয় না।
শাশুড়ি রাবেয়া বেগম জাহিদের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললেন, “এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছিস জাহিদ? তোর বউ ঘরে চিল্লাচিল্লি করছে, গিয়ে দেখ। আর বড় বউকে অসময়ে বিরক্ত করিস না।”
জাহিদ আর একটা শব্দও বলতে পারল না। সে ধীরে ধীরে পিছু হটল। নিজের ছোট ঘরের দিকে যাওয়ার সময় সে শুনতে পেল রান্নাঘর থেকে শিউলি আবার চিৎকার শুরু করেছে কোন বাসনে দাগ লেগেছে তা নিয়ে।
জাহিদ দরজার চৌকাঠে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারচ্ছে হাতে থাকা মুক্তাকে যে মানুষ অবহেলা করে কাঁচ মনে করে ফেলে দেয়, সময় তাকে কেমন নির্মম শাস্তি দেয়। মরিয়ম তাকে ভালোবাসা দিয়েছিল, সম্মান দিয়েছিল, কিন্তু সে কুড়িয়ে নিয়েছিল বিষাক্ত কাটাকে।
আজ মরিয়ম রাজরানী হয়ে রফিক শেখের ভিটায় রাজত্ব করছে, আর জাহিদ নিজের তৈরি করা জাহান্নামে বসে তিলে তিলে জ্বলছে। এই আফসোস, এই আত্মগ্লানি হয়তো তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে যার কোনো ক্ষমা নেই, কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই।
চলবে..

