Home "ধারাবাহিক গল্প "অবহেলার মুক্তা অবহেলার মুক্তা পর্ব-০৯

অবহেলার মুক্তা পর্ব-০৯

0
10

#অবহেলার_মুক্তা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_৯

ভাদ্রের প্রখর রোদ ধুয়ে দিয়ে আশ্বিনের এক ভোরবেলা পীরপুর গ্রামে নেমে এল এক নতুন গুঞ্জন। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধে মেখে আসা হালকা হিমেল হাওয়া যেন এক মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল।

কথাটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল পুরো শেখ বাড়িতে বড় বউ মরিয়ম অন্তর্বর্তীকালীন অসুস্থতায় পড়েছে, সে সন্তানসম্ভবা!

খবরটা শোনার সাথে সাথেই জাহিদের বাড়ির উঠোন যেন অগ্নেয়গিরির মুখে গিয়ে দাঁড়াল। সকালে বড় কামরায় যখন গাঁয়ের কবিরাজ মশাই এসে মরিয়মের নাড়ি পরীক্ষা করে সুখবরটা দিলেন, তখন শাশুড়ি রাবেয়া বেগম মুখে এক চিলতে হাসি ফোটালেও উনার চোখে-মুখে নামল ঘোর সংশয়ের ছায়া।

কারণ একটাই—হিসাব!

কাজী ডেকে রফিকের সাথে মরিয়মের বিয়ের বয়স মোটে দুই মাস কয়েক দিন।

খবরটা কানে যেতেই জাহিদের চোখ দুটো হিংসায় আর লোভজনক এক আনন্দে জ্বলে উঠল। সে এক লাফে ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। শিউলি পাশ থেকে মুখ বিকৃত করে বিষ উগরে দিল, “শুনলা জাহিদ? সতী-সাধ্বী বড় বউয়ের গর্ভে নাকি সন্তান আইছে! এখন বলো, এই বাচ্চা কার? দুই মাস আগে রফিক ভাইয়ের সাথে বিয়ে হইছে, তাইলে এই সন্তানের বাপ কে? তোমার রফিক ভাই, নাকি তুমি?”

জাহিদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত মাতাল আশা জেগে উঠল। জাহিদ হিসাব কষল তিন মাস আগে মরিয়ম তার ঘরেই ছিল! তখন তো সে মরিয়মকে তাড়িয়ে দেয়নি, অপবাদ বানিয়ে আলাদা করেছিল মাত্র। তার মানে, মরিয়মের পেটের সন্তান আর কেউ নয়, জাহিদেরই নিজের রক্ত!

এক নিমেষে জাহিদের হারিয়ে যাওয়া অহংকার আর অধিকারবোধ যেন চাঙ্গা হয়ে উঠল। সে হনহন করে উত্তরের বড় বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। উঠোনে তখন শিউলি আর করিমন ভিড় জমিয়েছে, সাথে গাঁয়ের দুই-একজন মুরুব্বিও হাটের দিকে যাওয়ার পথে থমকে দাঁড়িয়েছেন।

জাহিদ বড় ঘরের বারান্দায় উঠে সোজা হাঁক ছাড়ল, “মরিয়ম! বাইরে আয়! আজ সব হিসাবের শেষ দেখে ছাড়ব!”

মরিয়ম ঘরের ভেতর বিছানায় শুয়ে ছিল। খবরটা শুনে তার নিজের বুকের ভেতরটাও তোলপাড় করছে। সে ক্লান্ত ও ফ্যাকাশে মুখে মাথায় আঁচলটা টেনে ধীরপায়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।

জাহিদ এক পা এগিয়ে এসে গর্জে উঠল, “মরিয়ম, কবিরাজ বলে গেল তোর পেটে বাচ্চা! তুই তো দুই মাস আগে রফিক ভাইয়ের ঘরে আসছিস। এর এক মাস আগে তুই আমার ঘরে ছিলি! এই বাচ্চা আমার রক্ত! আমার সন্তান!”

মরিয়ম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনো উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের ভেতর থেকে ধীরপায়ে বেরিয়ে এল রফিক শেখ।

পরনে সাদা সুতির ফতুয়া আর লুঙ্গি। রফিকের মুখে কোনো উত্তেজনার ছাপ নেই, কিন্তু ওর চোখ দুটো জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো লাল।

জাহিদ রফিককে দেখে আরও বুক ফুলিয়ে বলল, “রফিক ভাই! এতদিন তুই ক্ষমতা দেখিয়ে আমার বউকে কেড়ে নিছিলিস, কিন্তু এই বাচ্চা? এই বাচ্চা তোর না! এই বাচ্চার আসল বাপ আমি! তুই অন্যের সন্তানকে নিজের বলে দাবি করতে পারবি না!”

জাহিদ এবার মরিয়মের দিকে ফিরে নাটকীয় গলায় বলল, “মরিয়ম, তুই ভুল বুঝিস না! আমি স্বীকার করছি আমি ভুল করছিলাম, শিউলির কথায় প্ররোচিত হইয়া তোর গায়ে কাদা ছিটাইছিলাম। কিন্তু আজ যখন তোর পেটে আমার সন্তান আইছে, আমি তোরে আর এই পাপাচারের মধ্যে রাখব না! চল, তুই আর আমার সন্তান আজই আমার ঘরে ফিরে আয়! তোদের দুজনকে আমি মাথায় তুলে রাখব!”

শিউলি চিৎকার করে উঠল, “জাহিদ! তুমি এ কী বলতাছ? ওই কুলটা মাইয়ারে তুমি আবার ঘরে তুলবা?”

“চুপ কর শিউলি!” জাহিদ গর্জে উঠল, “আমার সন্তানের মা মরিয়ম! উনার পেটে আমার রক্ত বেড়ে উঠছে, আমি উনাকে আর রফিক ভাইয়ের আশ্রয়ে থাকতে দেব না!”

উঠোনের সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল। মাতব্বর ইদ্রিস আলীও সেখানে এসে হাজির হয়েছেন। ঘটনা যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে শেখ বাড়ির সম্মান আবার ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।

রফিক শেখ এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। সে এক পা এগিয়ে জাহিদের সোজা মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। ওর দীর্ঘ ছায়া জাহিদের ওপর নামল।

“হয়ে গেছে তোর নাটক জাহিদ?” রফিকের গলার স্বর অতি শান্ত, কিন্তু তাতে ছিল বরফশীতল হিংস্রতা।

জাহিদ তোতলে উঠে বলল, “ন-নাটক কিসের রফিক ভাই? হিসাব তো সোজা! মরিয়মের পেটের বাচ্চা, তোর সাথে বিয়ের বয়স দুই মাস! এই বাচ্চা আমার ছাড়া আর কার হতে পারে?”

রফিক একচিলতে বাঁকা হাসি হাসল। উনার শক্ত হাতটা দিয়ে মরিয়মের কাঁধের পেছনে আড়াল তৈরি করলেন।

“জাহিদ,” রফিক বললেন, “তুই ভুলে যাচ্ছিস, রফিক শেখ কোনোদিন অন্যের আমানতে হাত দেয় না, আর নিজের অধিকার এক চুলও ছাড়ে না। মরিয়ম আজ আমার বিবাহিতা স্ত্রী, এই ঘরের বড় বউ। উনার গর্ভে যেই সন্তানই থাকুক না কেন, সেই সন্তান রফিক শেখের সন্তানের পরিচয়েই এই পৃথিবীতে আসবে!”

জাহিদ চিৎকার করে উঠল, “তুই গায়ের জোর দেখাচ্ছিস রফিক ভাই! অন্যায় করছিস! তুই আরেকজনের বাচ্চার বাপ সাজতে চাস?”

“অন্যায় আমি করছি, না তুই করছিস?” রফিক তেজের সাথে জবাব দিল। “তিন মাস আগে যখন মরিয়ম তোর ঘরে ছিল, তখন তুই উনাকে লাথি মে-রে তাড়িয়ে দিলি! উনার গায়ে পরকীয়ার জঘন্য অপবাদ ছিটিয়ে দিলি! তখন কোথায় ছিল তোর এই ভালোবাসার নাটক? আজ যখন সে আমার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচার পথ খুঁজে পেয়েছে, তখন তুই বাপের অধিকার ফলাতে আসছিস?”

রফিক জাহিদের শার্টের কলারটা এক টানে ধরে মুখটা কাছে এনে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “শুন জাহিদ! মরিয়ম আর এই বাচ্চা কাউকেই আমি তোকে দেব না! রফিক শেখ বেঁচে থাকতে নিজের পরিবারকে তোর মতো পশুর হাতে তুলে দেবে না। মরিয়ম এই ঘরের রানী ছিল, রানী হয়েই থাকবে, আর এই বাচ্চার সমস্ত দায়-দায়িত্ব, পরিচয় আর অধিকার আমার!”

কথাগুলো শুনে জাহিদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, কিন্তু সে শেষ চেষ্টা হিসেবে গাঁয়ের মুরুব্বিদের দিকে ঘুরল, “ইদ্রিস মাতব্বর কাকা! আপনিই বিচার করেন! সমাজের চোখে কোনটা সত্যি? জেনেশুনে আরেকজনের রক্তকে রফিক ভাই নিজের সন্তান বলে জোর করে রেখে দেবে? বাচ্চার আসল বাপ কে, তা না জেনে কি এই সমাজ এই বাচ্চাকে মেনে নেবে?”

পুরো উঠোনে আবার ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। সত্যি, বাচ্চার আসল বাবা কে জাহিদ না রফিক?

মরিয়ম এতদিন জাহিদের ঘরে ছিল, আবার রফিকের সাথেও তার বিয়ের বয়স দুই মাস পার হয়ে গেছে! বাচ্চার পিতৃ পরিচয় নিয়ে এক ধোঁয়াশা ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। কেউ নিশ্চিত হতে পারছে না আসলেই বাচ্চার আসল বাপ কে!

মরিয়ম চোখের পানি মুছে রফিকের চেহারার দিকে তাকাল। রফিকের মুখে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো সন্দেহ নেই। উনার চোখে শুধুই মরিয়মের প্রতি পরম বিশ্বাস আর সুরক্ষার প্রতিজ্ঞা। রফিক জানে, এই সমাজের বিষাক্ত মুখ বন্ধ করতে না পারলে মরিয়ম আর তার অনাগত সন্তান সারাজীবন এই কলঙ্কের বোঝা বয়ে বেড়াবে।

রফিক শেখ মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। উনার বজ্রকণ্ঠ পুরো পীরপুর গ্রামের বাতাসে ধ্বনিত হলো।

“এই বাচ্চার বাপ কে, তা নিয়ে হিসাব কষছিস তো? তোরা ভাবছিস রফিক শেখ জোর জবরদস্তি করে আরেকজনের বাচ্চার ওপর নিজের নাম বসাতে চায়?”
রফিক উনার কড়া নজর জাহিদ আর ইদ্রিস মাতব্বরের ওপর রাখল।

“শোন জাহিদ, আর শোনেন গাঁয়ের মুরুব্বিরা! মুখ দিয়ে ফালতু কথা বলে আর আন্দাজে অপবাদ দিয়ে রফিক শেখের বউয়ের গায়ের ইজ্জত নেওয়া যাবে না। শহরে ডাক্তারদের বড় বড় হাসপাতাল আছে। বিজ্ঞান এখন অনেক দূর এগিয়ে গেছে! সেখানে নাকি র-ক্ত আর মাং-স পরীক্ষা করে বাচ্চার আসল পরিচয় নিখুঁতভাবে বের করা যায়!”

রফিক শেখ চাবুকের মতো শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করল, “কাল সকালেই আমি মরিয়মকে নিয়ে শহরের বড় হাসপাতালে যাব। সেখানে ডাক্তারদের দিয়ে ওই রক্ত আর ডিএনএ (DNA) টেস্ট করানো হবে! রিপোর্টেই দুধের দুধ আর পানির পানি পরিষ্কার হয়ে যাবে এই সন্তানের আসল বাপ কে! রিপোর্ট আসার পর যার রক্ত প্রমাণিত হবে, তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি প্রমাণ হয় জাহিদ আর শিউলি আবারও কোনো কুৎসিত চক্রান্তের নোংরা খেলা খেলছে, তবে রফিক শেখ নিজের হাতে ওদের বিচার করবে!”

ডিএনএ টেস্টের কথা শুনে জাহিদের বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ধক করে উঠল। শিউলি আর করিমন ভয়ে পিছিয়ে গেল।

পীরপুর গ্রামের আকাশে ভাদ্রমাসের রোদ আরও তপ্ত হয়ে উঠল।

চলবে…